বাংলাদেশের নারীদের উদ্দেশে একটাই কথা শিক্ষাই আপনাদের প্রকৃত শক্তি, শিক্ষাই মুক্তির একমাত্র পথ। শিক্ষা ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো টেকসই বিকল্প নেই। জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে নারীরাই পারে নিজেদের ভাগ্য বদলে দিতে, এমনকি বিশ্বজয় করার স্বপ্নও বাস্তবে রূপ দিতে। বিশ্বের নানা প্রান্তে নারীরা আজ অসাধারণ সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন। মহাকাশ থেকে বিজ্ঞান, সাহিত্য থেকে রাজনীতি—সবখানেই তাদের দৃপ্ত পদচারণা। এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে, সুযোগ ও শিক্ষার সমন্বয় ঘটলে নারীরা অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সামাজিক বাধা, কুসংস্কার—এসবের কারণে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। তবুও থেমে গেলে চলবে না। প্রতিকূলতাকে জয় করেই এগিয়ে যেতে হবে। নিজেকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে পারলে একজন নারী শুধু নিজের জীবনই বদলাতে পারেন না, বদলে দিতে পারেন একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি দেশও। শিক্ষা একজন নারীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয় এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও নারীর প্রতি অবমূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। অথচ বিশ্বের অন্য প্রান্তে নারীরা প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে শিক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাই বাংলাদেশের নারীদের প্রতি আহ্বান নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন এবং সেই স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকুন। সমাজের নেতিবাচক ধ্যানধারণাকে উপেক্ষা করে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নারীরাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য নারী তাদের সাহস, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছেন। তাদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন প্রজন্মের নারীরাও এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশাই এখন সময়ের দাবি।
বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা এখন পারস্পরিক আস্থার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও বিআইআইএসএস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ আশিক রহমান। সাক্ষাৎকারে তিনি দুই দেশের সম্পর্কের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। আশিক রহমান বলেন, "চীন বাংলাদেশের এক বিশ্বস্ত বন্ধু। বৈশ্বিক রাজনীতিতে অনেক দেশের মধ্যে আধিপত্যবাদী মনোভাব থাকলেও, চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সব সময় সমতা ও পারস্পরিক উপকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে।" তিনি দুই দেশের সম্পর্কের বিবর্তনকে তিনটি পর্বে ভাগ করেন এবং ২০১৬ সালে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে বর্ণনা করেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল ও ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার কথা তিনি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। সাক্ষাৎকারে চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ নিয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের মতো উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার করে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে চীনের গৃহীত উদ্যোগ বিশ্বের জন্য একটি মডেল। এছাড়াও চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা উদ্যোগসমূহ বাংলাদেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার সাথে পরিপূরক বলে তিনি মনে করেন। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের উদাহরণ টেনে এই গবেষক বলেন, চীন তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের নতুন সরকারও ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি বজায় রেখে চীনের সাথে এই গভীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
'তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯' সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, সরকারি তথ্য গোপন (withhold) করলে বা তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করলে আগের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি জরিমানার বিধান থাকছে। পাশাপাশি, আইনটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধনের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত আইনে কেউ সরকারি তথ্য গোপন করলে প্রতিদিন ২৫০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে আগে এটি ছিল প্রতিদিন ৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, জরিমানার পরিমাণ বাড়ছে পাঁচ গুণ। প্রস্তাবিত খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কেউ যদি দুর্নীতি বা অপরাধ আড়াল করার উদ্দেশ্যে তথ্য গোপন করে, তাহলে জরিমানা আরোপ বাধ্যতামূলক হবে। চারটি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, আইনটির ৫, ৬, ৭ ও ২৭ ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, নাগরিকরা যাতে সহজে ও অবাধে চাহিদামতো সরকারি সেবা-সংক্রান্ত তথ্য পেতে পারে, সে লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন পর্যালোচনা ও সংশোধন করা যেতে পারে। ধারা ৫: তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক ও ডিজিটাল রূপান্তর সংশোধিত ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে তাদের সব তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস ও সূচি প্রস্তুত করতে হবে এবং তা কম্পিউটার বা অন্যান্য উপযুক্ত প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে। এসব তথ্য একটি জাতীয় ই-নেটওয়ার্কের (e-network) মাধ্যমে যুক্ত করে নাগরিকদের জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য করে তুলতে হবে। 'রেকর্ড' বলতে বোঝাবে ফাইল, পাণ্ডুলিপি, মাইক্রো ফিল্ম, চিত্র, অডিও বা ডিজিটাল তথ্যের যেকোনো রূপ। ধারা ৬: তথ্য প্রকাশ ও প্রচার বাধ্যতামূলক প্রত্যেক সরকারি কর্তৃপক্ষকে গৃহীত, চলমান ও প্রস্তাবিত কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করতে হবে। এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে—প্রস্তাবিত বাজেট, প্রকৃত আয় ও ব্যয়, সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, দরপত্রের ফলাফল, চুক্তি, নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদন, প্রকল্প ব্যয় এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের বিবরণ। এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে, যাতে নাগরিকরা সহজেই তা জানতে পারেন। ধারা ৭: জনস্বার্থে তথ্য গোপনের ব্যতিক্রম বর্তমানে এই ধারায় কিছু তথ্য গোপনের সুযোগ থাকলেও, সংশোধনীতে জনস্বার্থ বিবেচনায় এই সীমা আরও নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। দুটি উপধারা যোগ করে বলা হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে তথ্য গোপন করা যাবে, তা স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। ধারা ২৭: জরিমানা বাড়ছে পাঁচগুণ বর্তমানে কেউ সরকারি তথ্য গোপন করলে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। সংশোধিত আইনে তা বাড়িয়ে প্রতিদিন ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। তাছাড়া, যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে তথ্য গোপনের মাধ্যমে দুর্নীতি বা অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে, তাহলে জরিমানা বাধ্যতামূলক হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খাদিজা তাহেরা ববি ইউএনবিকে বলেন, 'জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আইনটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। এখন সংশোধিত খসড়া নিয়ে মতামত গ্রহণ চলছে।' তিনি আরও বলেন, ৩১ জুলাই পর্যন্ত জনমত গ্রহণ চলবে। এরপর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশোধিত আইনটি দ্রুত জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
শিক্ষা মানুষের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও শক্তিশালী রূপান্তরকারী শক্তি। যুগে যুগে সভ্যতার বিকাশের পেছনে শিক্ষা যে বিশাল ভূমিকা রেখেছে, তা ইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব এমন এক পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আর সময়োপযোগী বলে বিবেচিত হচ্ছে না। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তিত চাহিদা আমাদেরকে বাধ্য করছে নতুন করে ভাবতে-কীভাবে আমরা আগামী প্রজন্মকে প্রস্তুত করব। আজকের শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে গড়ে তুললে সে বাস্তব জীবনের অনিশ্চয়তা, জটিলতা ও প্রতিযোগিতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও প্রজ্ঞার অভাবই বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাই প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শুধু তথ্য সরবরাহ করবে না, বরং তথ্যকে বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও প্রয়োগ করার সক্ষমতা তৈরি করবে। এই প্রেক্ষাপটে “স্মার্ট-৫.০ এডুকেশন মডেল” হতে পারে একটি সমন্বিত, মানবিক এবং ভবিষ্যতমুখী শিক্ষাদর্শন, যা শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্যভাণ্ডার হিসেবে গড়ে তুলবে না, বরং তাদেরকে দক্ষ, চিন্তাশীল, নৈতিক, দৃঢ়চেতা এবং প্রযুক্তিসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। এই মডেল এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করবে, যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ একে অপরের সাথে সমন্বয়পূর্বক একজন মানুষকে পূর্ণতা দিবে। এই মডেলের মূল ভিত্তি হবে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান- দক্ষতা (স্কিল), মানসিকতা (মাইন্ডসেট), মনোভাব (অ্যাটিচ্যূড), সহনশীলতা (রেজিলিয়েন্স) এবং প্রযুক্তি (টেকনোলজী)। এই পাঁচটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক এবং সম্মিলিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার কাঠামো তৈরি করবে। প্রথমত দক্ষতা এমন একটি উপাদান যা একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করবে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর ছিল, যেখানে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনই ছিল প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব জীবনে সফল হতে হলে শুধু জ্ঞান থাকলেই হয় না; সেই জ্ঞানকে প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার সক্ষমতাই একজন মানুষের প্রকৃত যোগ্যতা নির্ধারণ করে। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো সমস্যাকে ভেঙে বিশ্লেষণ করতে পারে, সম্ভাব্য কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারে এবং যৌক্তিকভাবে সমাধানের পথ নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে সে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে। এজন্য শিক্ষার প্রতিটি স্তরে অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, দলগত আলোচনা এবং বাস্তব জীবনের উদাহরণকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু উত্তর মুখস্থ করবে না, বরং উত্তর খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটিই শিখবে, যা তাদের চিন্তাশক্তিকে বহুমাত্রিক করে তুলবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোডিং বা প্রোগ্রামিং দক্ষতা আধুনিক যুগে এক ধরনের ভাষায় পরিণত হয়েছে, যা প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি কার্যকর মাধ্যম। এটি শুধু প্রযুক্তিবিদদের জন্য নয়; বরং সকল শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোডিং শেখার মাধ্যমে তারা লজিক্যাল চিন্তা, ধৈর্য এবং সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের অভ্যাস গড়ে তোলে। একটি ছোট প্রোগ্রাম তৈরি করার মধ্য দিয়েও একজন শিক্ষার্থী শিখে নেয় কীভাবে একটি জটিল সমস্যাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সমাধান করতে হয়। এর পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই জ্ঞানকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা। একজন শিক্ষার্থী যদি তার ভাবনা স্পষ্ট, সুসংগঠিত এবং কার্যকরভাবে প্রকাশ করতে পারে, তাহলে সে সহজেই অন্যদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে এবং তার চিন্তার মূল্যায়ন পাবে। তাই মৌখিক উপস্থাপনা, লিখিত প্রকাশ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ এই তিনটি ক্ষেত্রেই দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে দলগত কাজের ক্ষেত্রে কার্যকর যোগাযোগ পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করে এবং যৌথভাবে সাফল্য অর্জনের পথ সুগম করে। এইভাবে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শুধু শিক্ষিত নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত একজন সক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। স্মার্ট-৫.০ মডেলের দ্বিতীয় উপাদান মানসিকতা, যা শিক্ষার্থীর চিন্তার ধরনকে গঠন করবে এবং তার শেখার গভীরতা নির্ধারণ করবে। একটি সুস্থ ও ইতিবাচক মানসিকতা ছাড়া কোনো দক্ষতাই দীর্ঘস্থায়ী বা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে না, কারণ দক্ষতার সঠিক প্রয়োগ নির্ভর করে চিন্তার গুণগত মানের উপর। সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান তথ্যপ্রবাহের যুগে মানুষ প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছে, যার সবই সত্য বা নির্ভরযোগ্য নয়। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদেরকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা তথ্যের উৎস যাচাই করতে পারে, পক্ষপাতদুষ্টতা চিহ্নিত করতে পারে এবং যুক্তির আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। শুধু তথ্য গ্রহণ নয়, বরং তথ্যের ভেতরের অর্থ ও প্রভাব অনুধাবন করার ক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি গ্রোথ মাইন্ডসেট বা বিকাশমুখী মানসিকতা শিক্ষার্থীদেরকে শেখায় যে প্রতিভা জন্মগত কোনো স্থির বিষয় নয়, বরং এটি চর্চা, অধ্যবসায় এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিকশিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদেরকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে উৎসাহিত করে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর করে তোলে। ফলে তারা ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে বরং সেটিকে উন্নতির সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে। মনোভাব হলো এই মডেলের তৃতীয় উপাদান, যা একজন মানুষের চরিত্র, আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলবে। শিক্ষা যদি কেবল দক্ষতা ও জ্ঞান প্রদান করে, কিন্তু একজন মানুষকে মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তুলতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। নৈতিকতা একজন মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, যা তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দায়বদ্ধতা এবং আত্মসম্মান-এই মূল্যবোধগুলো ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা শুধু নিজের স্বার্থে নয়, বরং বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের কথা চিন্তা করে কাজ করতে শেখে। একই সাথে সহমর্মিতা এমন একটি গুণ, যা মানুষকে অন্যের অবস্থান বুঝতে এবং তার অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হতে শেখায়। এটি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম, সমাজসেবামূলক উদ্যোগ এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে এই গুণগুলো বিকশিত করা সম্ভব। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে শেখে এবং ভিন্ন মত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। সহনশীলতা স্মার্ট-৫.০ মডেলের চতুর্থ উপাদান, যা একজন শিক্ষার্থীকে জীবনের অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্যে স্থির থাকতে এবং এগিয়ে যেতে শক্তি জোগাবে। বাস্তব জীবন কখনোই পূর্বনির্ধারিত পথে চলে না; বরং এটি নানাবিধ বাধা, পরিবর্তন এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যদি সামান্য প্রতিবন্ধকতায় হতাশ হয়ে পড়ে, তাহলে তার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে যায়। তাই তাকে মানসিকভাবে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে সে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে ভয় না পেয়ে বরং তা মোকাবেলার সাহস অর্জন করে। প্রতিটি ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার অভ্যাস তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। অভিযোজন ক্ষমতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তনই একমাত্র স্থায়ী সত্য। প্রযুক্তির অগ্রগতি, কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির দ্রুত রূপান্তর শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিনিয়ত নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করছে। তাই তাদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা অজানা পরিস্থিতিতেও আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে পারে, নতুন দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী থাকে এবং পরিবর্তনকে সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে গ্রহণ করে। এই মানসিক দৃঢ়তা ও নমনীয়তার সমন্বয়ই একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য সত্যিকার অর্থে প্রস্তুত করে তোলে। প্রযুক্তি হলো স্মার্ট-৫.০ মডেলের পঞ্চম এবং শেষ উপাদান, যা পুরো মডেলকে একটি আধুনিক, কার্যকর এবং ভবিষ্যতমুখী কাঠামো প্রদান করবে। প্রযুক্তি আজ আর কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি শিক্ষা, কর্মজীবন এবং দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ক্লাউড প্রযুক্তির বিকাশ মানুষের শেখার ধরনকেই বদলে দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কারণ এখন শিক্ষার্থীরা কেবল বইয়ের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং তারা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন রিসোর্স এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ টুলের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করছে। প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অবদান হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার নিজস্ব সক্ষমতা, আগ্রহ এবং শেখার গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এগোতে পারে। এতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত সহায়তা পায় এবং অগ্রসর শিক্ষার্থীরা আরও গভীরভাবে শেখার সুযোগ পায়। তবে প্রযুক্তির এই বিস্তৃত ব্যবহারের সাথে সাথে এর নৈতিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল সাক্ষরতা তাই শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়; বরং এটি তথ্য যাচাই, সাইবার নিরাপত্তা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের একটি সমন্বিত চর্চা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিকে কেবল ব্যবহারই করে না, বরং তা বুঝে, মূল্যায়ন করে এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে শেখে। স্মার্ট-৫.০ এডুকেশন মডেল মূলত একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে শিক্ষাকে একটি স্থির কাঠামো নয়, বরং একটি গতিশীল ও ক্রমবিবর্তনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এখানে শিক্ষক আর একমুখী জ্ঞানপ্রদানকারী নন; বরং তিনি একজন সহায়ক, যিনি শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিজের চিন্তার জগৎ তৈরি করতে উৎসাহিত করেন। এই মডেলে শেখার প্রক্রিয়া একমুখী নয়, বরং দ্বিমুখী এবং পারস্পরিক, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই একে অপরের কাছ থেকে শেখে। শিক্ষার্থীরা এখানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, যারা নিজেদের শেখার দায়িত্ব নিজেরাই গ্রহণ করে এবং নতুন জ্ঞান অর্জনে কৌতূহলকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে শ্রেণিকক্ষের প্রচলিত ধারণাও পরিবর্তিত হয়। শেখা আর নির্দিষ্ট সময় বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠে। ফলে শিক্ষা জীবনের সাথে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত হয় এবং তা কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই মডেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের প্রতিটি অংশীদারের সক্রিয় ভূমিকা থাকবে। প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে তা বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক এবং সৃজনশীল চিন্তাকে উৎসাহিত করে। শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক পাঠ্যসূচি নয়, বরং এমন বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ক্ষমতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা উন্নত করে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে, যাতে তারা নতুন শিক্ষাদর্শন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পদ্ধতির সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে। একজন প্রশিক্ষিত ও সচেতন শিক্ষকই পারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মডেলের মূল্যবোধগুলো সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে। একই সাথে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন অপরিহার্য, যাতে শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমে আসে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পায়। ইন্টারনেট সংযোগ, ডিভাইসের প্রাপ্যতা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সব মিলিয়ে, এই মডেলের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে একটি সমন্বিত, দূরদর্শী এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার উপর, যা শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে ভবিষ্যত উপযোগী করে তুলতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, স্মার্ট-৫.০ এডুকেশন মডেল শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপদ্ধতি নয়; এটি একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যা আমাদেরকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়-শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে তা পরিচালিত হওয়া উচিত। এই মডেল শিক্ষাকে কেবল তথ্য অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে, বরং একজন মানুষের সামগ্রিক বিকাশের ধারাবাহিক যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তারা আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল এবং মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে, যারা নিজের জীবনকে অর্থবহ করতে পারে এবং একই সঙ্গে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এই মডেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মনির্ভরতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের জটিল বাস্তবতায় তাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। ভবিষ্যতের বিশ্ব হবে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবর্তনশীল, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো জ্ঞান বা দক্ষতা দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে না। তাই এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদেরকে আজীবন শেখার বা জীবনব্যাপী শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে এবং পরিবর্তনের সাথে নিজেকে ক্রমাগত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। স্মার্ট-৫.০ এডুকেশন মডেল সেই প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করে, যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তি একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে একটি টেকসই শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলে। এটি শিক্ষার্থীদেরকে কেবল কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করে না; বরং তাদেরকে উদ্ভাবক, চিন্তাশীল এবং সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, যারা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। অতএব, এখনই সময় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্মূল্যায়ন করার এবং তা সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার। শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই মডেলের মূল দর্শন শিক্ষার প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা আগামী প্রজন্মকে শুধু জ্ঞানী নয়, বরং প্রজ্ঞাবান, মানবিক এবং দূরদর্শী করে তুলবে। স্মার্ট-৫.০ এডুকেশন মডেল সেই পথনির্দেশনা প্রদান করে, যার মাধ্যমে আমরা একটি আলোকিত, দক্ষ এবং নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। মোঃ আবদুর রহমান মিঞা, অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), ঢাকা (প্রাবন্ধিক, লেখক ও গবেষক) ই-মেইল: arahmanmiah@gmail.com
ড. মাহরুফ চৌধুরী | ২৫ মার্চ ২০২৬ । যুক্তরাজ্য ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রেঅভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এই অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮)‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনিদেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়।স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরোনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গেজার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অপরকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তাপুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কারপ্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তাঁর ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবেযেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। * লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। Email: mahruf@ymail.com
আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। আজ বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ প্রস্তুতি সভা শেষে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পরিবহনে কোনো ধরনের অবৈধ চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না। সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মন্ত্রী চাঁদা ও চাঁদাবাজির মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, “বাস মালিক বা সমিতি যদি নিজেদের সংগঠনের স্বার্থে সমঝোতার ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট চাঁদা গ্রহণ করে, তবে সেটি আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধ। কিন্তু সাধারণ যাত্রী বা চালকদের জিম্মি করে যদি কেউ অবৈধ উপায়ে চাঁদাবাজি করে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না। আমরা এটা হতে দেব না।” বিগত বছরের ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম আরও জানান, গতবার নৌ ও সড়কপথের ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক ছিল। এবার সেই সেবার মান আরও উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঈদযাত্রায় যাত্রী সাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ঈদের আগে ও পরে মোট ১০ দিন (৫ দিন করে) বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় জ্ঞান ও মেধার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের কাঁধে থাকলেও দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রধান দিকনির্দেশক হলেন এদেশের জ্ঞানী-গুণীজনরা। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত ‘একুশে পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৯৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রবর্তিত এই পদক কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং এটি আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় ইতিহাসের প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের স্মারক। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষা, সাহিত্য ও শিল্পচর্চাকে রাজনীতিকীকরণ করা সভ্য সমাজের কাম্য নয়। বর্তমান সরকার একটি নৈতিক মানসম্পন্ন উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর, যেখানে বিজ্ঞজনদের অবাধ বিচরণ ও সঠিক দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলনের শহীদ ও সংগ্রামীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এবার আমরা ভাষা আন্দোলনের ৭৫ বছরে পদার্পণ করছি। ভাষা শহিদদের ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একদিন বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করে পায়ে হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দেন এবং নিজ হাতে এ বছরের বিজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেন। এ বছর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রম করার পর রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ এখন অস্তিত্ব রক্ষার নয়, বরং গুণগত রূপান্তরের। উন্নয়নকে টেকসই করা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক পরিসরে আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান তৈরি—এসবই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসে অগ্রগতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রাজনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সংগ্রাম, ত্যাগ ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাজনীতি জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তবে স্বাধীনতার পর বাস্তব রাজনীতিতে আদর্শের জায়গায় অনেক সময় দলীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতির প্রতি একদিকে প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে সংশয় তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনীতিকে জনকল্যাণভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নীতি, কর্মসূচি ও জবাবদিহি হবে আস্থার ভিত্তি। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটের দিনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় আচরণে তার প্রতিফলন জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সক্রিয় সংসদীয় চর্চা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন মিলেই কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে ওঠে। নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল শর্ত। নিরপেক্ষ ও আস্থাভাজন নির্বাচন ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা কমানো সম্ভব নয়। তাই নীতিনির্ভর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ সামাজিক বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সংসদে কার্যকর বিতর্ক, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং সংলাপভিত্তিক রাজনীতি একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ। বিরোধিতা শত্রুতা নয়, বরং বিকল্প নীতি প্রস্তাবের সুযোগ—এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। নেতৃত্ব বিকাশের কাঠামো শক্তিশালী করা এবং তরুণদের নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা রাজনীতিকে আধুনিক ও গতিশীল করতে সহায়ক হবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আয় বৈষম্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠছে। উন্নয়ন যদি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে। তাই বাজেট প্রণয়ন ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সংসদীয় তদারকি ও জবাবদিহি জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন রাজনীতির মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি নাগরিক আস্থা ক্ষুণ্ন করে। তাই প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার, তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর অংশগ্রহণ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন—এসব মিলিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, সক্রিয় নাগরিক সমাজ ও সচেতন জনগণের সমন্বয়ে রাজনীতি যদি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে, তবে সংকটের বদলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। মো: আবদুর রহমান মিঞা লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতি এবং ধর্মান্ধতা কোনোভাবেই একুশের মূল আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা আমাদের বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেখানে ধর্ম কিংবা জাতিগত বিভেদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধীসহ সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার হরণ করেন, তারা আসলে একুশের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। এই ধরনের বৈষম্যমূলক মানসিকতাকে আধুনিক বাংলাদেশে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে। টিআইবি প্রধান এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যেখানে একুশের মূলমন্ত্র অর্থাৎ সাম্য, সামাজিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। তার মতে, একুশের প্রকৃত চেতনা ধারণ করতে হলে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাই হবে ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্মান। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
দেশের নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষকদের রাজপথের আন্দোলন পরিহার করে শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "শিক্ষকরা রাজপথ দখল করে আন্দোলন করার সুযোগ নেই। শিক্ষকতা এবং আন্দোলন একসাথে করা সম্ভব নয়।" শিক্ষকদের যেকোনো যৌক্তিক দাবি মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সতর্ক অবস্থান ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, “আমরা জানি কোন বিষয় দেওয়া সম্ভব আর কোনটা সম্ভব নয়। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর, আমরা তাদের পাশেই আছি। আশা করি তারা আমাদের এই বার্তাটি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন এবং রাজপথ ছেড়ে শিক্ষা কার্যক্রমে মনোনিবেশ করবেন।” তিনি শিক্ষকদের সরাসরি রাজপথে না নেমে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী দেশের গত কয়েক বছরের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, "দেশে আর কখনও 'অটোপাশ' বা 'মব সংস্কৃতি' ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।" বিগত সময়ে শিক্ষার্থীদের একাংশের চাপের মুখে অটোপাশের সিদ্ধান্তের ফলে যে অস্থিরতা ও মানের অবনতি ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি বর্তমান সরকার হতে দেবে না বলে তিনি সতর্ক করেন। শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে ড. মিলন জানান, সরকারের বিশেষ 'ভিশন' অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য। এক নজরে শিক্ষামন্ত্রীর মূল বক্তব্য: শিক্ষকদের রাজপথের আন্দোলন বর্জন করার আহ্বান। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের দাবি পর্যালোচনার আশ্বাস। ভবিষ্যতে 'অটোপাশ' পদ্ধতি চিরতরে বন্ধের ঘোষণা। শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের 'মব জাস্টিস' বা বিশৃঙ্খলা সহ্য না করার হুঁশিয়ারি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও আলোচনায় এসেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তারাবির নামাজ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নির্বাচনে পর্দার আড়ালের নানা প্রস্তাব ও চাপের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। ঢাকা-৮ আসনের এই প্রার্থী স্পষ্ট করে বলেন, "আমাদের মেরে ফেললে মেরে ফেলুক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা আমরা বন্ধ করব না।" নির্বাচন চলাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেন, সেই সময় অনেক 'ক্রিমিনাল', প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং এমনকি প্রশাসনের কিছু লোকও তাকে আপসের প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনি বলেন, "প্রশাসনের লোকজন এসে বলেছিল মুখ বন্ধ রাখলে জিতিয়ে দেবে। কিন্তু আমি কারও সঙ্গে ডিল বা আপস করিনি।" উল্লেখ্য, ঢাকা-৮ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে লড়ে তিনি বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কাছে পরাজিত হন। তবে পুরো প্রচারণাজুড়ে আক্রমণাত্মক ও সাহসী মন্তব্যের জন্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত ছিলেন। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে এনসিপির এই নেতা উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, "আপনারা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ভ্যানগার্ড হয়ে দাঁড়ান। আমরা রমজানজুড়ে সন্ত্রাসীদের কাছে হেদায়েতের দাওয়াত দিয়ে যাব।" ভবিষ্যতে ভোট চুরির চেষ্টা হলে কঠোর প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, "কেউ ভোট চুরি করতে আসলে তার হাত-পা ভেঙে দেব। এটা ওসমান হাদির আসন, এখানে আমরা ইনসাফের বাংলাদেশ কায়েম করব।" আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কৌশলী উত্তর দেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, "নির্বাচন আমাদের মূল টার্গেট না। আমাদের লক্ষ্য হলো বিদ্যমান পচা সিস্টেমের পরিবর্তন করা।" তাঁর এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নির্বাচনের ফলাফলে দমে না গিয়ে তিনি এবং তাঁর দল আগামীতে মাঠের রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
দেশের কূটনীতিতে নতুন দিগন্তের আভাস দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ চালিয়ে যাবে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক আলাপকালে তিনি সরকারের এই কূটনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরেন। শামা ওবায়েদ জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের মেরুদণ্ড সোজা রেখে বিদেশে একটি স্থিতিশীল এবং সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কসহ আরও কিছু দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে বর্তমানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করবে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে স্থগিত থাকা ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত পুনরায় চালু করার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। শামা ওবায়েদ আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, কোনো বিশেষ দেশের প্রতি অতি-নির্ভরশীলতা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে। চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ও কূটনৈতিক মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শামা ওবায়েদের 'মেরুদণ্ড সোজা রেখে কূটনীতি' করার এই বার্তা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্র নীতির এক শক্তিশালী প্রতিফলন। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক গণভোট নিয়ে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আব্দুন নূর তুষারের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। তুষার দাবি করেছিলেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটের সংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪১ লাখের এক বিশাল ফারাক রয়েছে। তবে এই তথ্যকে পুরোপুরি ‘ভুয়া’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) প্রেস উইংয়ের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই বিভ্রান্তি নিরসন করা হয়। ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার রাতে, যখন আব্দুন নূর তুষার তাঁর ব্যক্তিগত প্রোফাইলে দাবি করেন— গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ মিলিয়ে মোট ৩ কোটি ২৫ লাখ ভোট পড়েছে, অথচ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাকি চার কোটি ৪১ লাখ ভোট কোথায় গেল?” তাঁর এই পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং জনমনে সন্দেহের দানা বাঁধে। তবে প্রেস উইং সরাসরি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, গণভোটে প্রকৃতপক্ষে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি ভোট কাস্ট হয়েছে। এর মধ্যে ভোট প্রদানের পদ্ধতিগত ভুলের কারণে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আব্দুন নূর তুষারের দেওয়া পরিসংখ্যানটি সম্পূর্ণ ভুল এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি অপচেষ্টা মাত্র। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এ ধরণের স্পর্শকাতর বিষয়ে সঠিক তথ্য যাচাই না করে কোনো কিছু শেয়ার না করার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং গুজব রুখতেই প্রেস উইং এই তাৎক্ষণিক ব্যাখা প্রদান করে।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল। সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর কোনো ধরনের নির্দিষ্ট আক্রমণ বা দমনের ঘটনা তাদের নজরে আসেনি। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডো। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে নানা আকুফো-আডো বলেন, "আমাদের পর্যবেক্ষক দলের কাছে এমন কোনো সরাসরি রিপোর্ট আসেনি যে, নির্বাচনের সময় কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী আক্রান্ত হয়েছে। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি, কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতির হার তুলনামূলক কম ছিল এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটাররা আমাদের কাছে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়গুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করব।" নির্বাচন প্রক্রিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, "সামগ্রিকভাবে এই নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আমরা মনে করি এটি একটি গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।" তিনি আরও যোগ করেন যে, একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পর্যবেক্ষক দলটি তাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছে যে, যদিও দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, তবুও অন্য প্রায় সব প্রার্থীর জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ, প্রার্থী নিবন্ধন এবং ফলাফল গণনার প্রক্রিয়া ছিল উন্মুক্ত ও অবাধ। প্রায় ২ হাজার প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছে বলে মনে করে কমনওয়েলথ। নানা আকুফো-আডো তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, নির্বাচনের এই ধারা ভবিষ্যতে দেশের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ ও শিক্ষা অঙ্গনের অস্থিরতা নিয়ে এক নিবিড় বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। তাঁর মতে, গত কিছুদিন ধরে দেশে একটি বিশেষ রাজনৈতিক হাইপ তৈরির চেষ্টা চলেছিল, যার নেপথ্যে ছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ড. কামরুল হাসান মামুন দাবি করেন, দেশজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট মতাদর্শের উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনকে বিজয়ী করা। তিনি বলেন, “অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ভিসি নিয়োগ দিয়ে ডাকসুসহ দেশের ছাত্র সংসদগুলোতে বিজয়ী করে একটি রাজনৈতিক হাইপ তৈরির চেষ্টা আমরা দেখেছি। এতে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে দেশ কি আফগানিস্তানের পথে যাচ্ছে কি না কিংবা দেশ মব (Mob) সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়বে কি না।” প্রশাসনের উচ্চপদে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনরায় নিয়োগদানকেও তিনি এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন। এছাড়াও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ‘বট বাহিনী’ বা কৃত্রিম প্রচারকদের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, “এই বট বাহিনীরা মূলত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, যারা মুক্তমত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করেছিল। শিল্প-সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর বড় ধরনের আঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এমনকি ক্যাম্পাসে নারীদের পোশাক ও চলাফেরার ওপর একটি অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের রায়ের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে আপাত রক্ষা করেছে।” নির্বাচন প্রসঙ্গে অধ্যাপক মামুন বিএনপির ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, “এই নির্বাচনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হলো বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঝুঁকে পড়া। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের ওপর আস্থা রাখা এর একটি বড় প্রমাণ।” তবে বিশাল এই বিজয়ে দলটিকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, “ভূমিধস বিজয় বাংলাদেশে এই প্রথম নয়। এর আগেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এমন জয় পেয়েছে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আকাশে না উড়ে মাটির কাছাকাছি থাকা। দেশকে মাথায় রেখে কাজ করলেই কেবল দেশের এবং দলের মঙ্গল হবে। দেশ এক বিশাল ক্রান্তিকাল থেকে রক্ষা পেলেও আগামীর পথ চলায় সামান্য ভুল বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে ঐতিহাসিক গণভোটকে সামনে রেখে দেশের তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি এক শক্তিশালী ও দিকনির্দেশনামূলক আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তরুণ কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের হাতে থাকা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং এটি আইন, ন্যায় এবং গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। সাবেক সেনাপ্রধান তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, বিগত ফ্যাসিবাদের দুঃসময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও তাদের কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয়নি। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, “প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ হলো জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পক্ষাবলম্বন। এই দায়িত্ব সাহসিকতার সাথে পালন করলে সশস্ত্র বাহিনী আবারও জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হবে।” সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি চারটি বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন: প্রথমত, রাজনৈতিক চাপে যদি পুলিশ বা জনপ্রশাসন কোথাও দুর্বলতা দেখায়, তবে সেনা কর্মকর্তাদের অকুতোভয় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা স্থানীয় প্রভাব উপেক্ষা করে কেবল প্রচলিত আইন ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান কিংবা ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের মতো যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে নাগরিকরা বুঝতে পারে রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। চতুর্থত, বলপ্রয়োগের চেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতির মাধ্যমে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোকেই প্রকৃত দক্ষতার পরিচয় হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। আগামীকালকের এই দ্বিমুখী ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশজুড়ে যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার মাঝে সাবেক সেনাপ্রধানের এই বার্তা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে এবং সাধারণ ভোটারদের মনে স্বস্তি ফেরাতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী ঢাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে দেখা দিয়েছে এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। ঢাকা-৯ আসনের আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা এবং ঢাকা-১৩ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ—উভয়েই যে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেখানকার ভোটার নন তারা। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন ব্যালট পেপারে নিজের নামের পাশে বা নিজের প্রতীকে সিল মারার কোনো আইনি সুযোগ থাকছে না তাদের জন্য। ববি হাজ্জাজের ভোট ঢাকা-১৭ আসনে ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। এই আসনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের হেভিওয়েট প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক। তবে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ববি হাজ্জাজ এই এলাকার ভোটার না হওয়ায় তিনি এখানে ভোট দিতে পারবেন না। তাঁর নাম রয়েছে ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার তালিকায়। ইসি সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩ নম্বর কেন্দ্রে তাঁর ভোট দিতে হবে, যেখানে তাঁর ভোটার ক্রমিক নম্বর ৬৭৮২। ঢাকা-৯ আসনে লড়া তাসনিম জারার ভোট ঢাকা-১১-তে এদিকে ঢাকা-৯ (মুগদা, সবুজবাগ ও খিলগাঁও) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন তরুণ চিকিৎসক ডা. তাসনিম জারা। প্রচারণার ময়দানে তিনি নিজেকে এলাকার ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবে পরিচয় দিলেও দাপ্তরিক নথিতে দেখা যাচ্ছে তিনি আসলে ঢাকা-১১ আসনের নিবন্ধিত ভোটার। ইসির ওয়েবসাইট ও ভোটার স্লিপ অ্যাপস অনুযায়ী, তাঁর ভোটকেন্দ্র খিলগাঁও বি-জোন পূর্ব এলাকার প্রাইম স্কুল অ্যান্ড কলেজ (কেন্দ্র নম্বর ৮০)। বর্তমানে পরীবাগের বাসিন্দা হলেও আইন অনুযায়ী তাকে ঢাকা-১১ আসনেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। ভোটারদের প্রতিক্রিয়া নিজেদের আসনে ভোটার না হওয়ায় এই দুই প্রার্থীর এমন পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, প্রার্থী যে আসনের প্রতিনিধি হতে চান, সেখানকার ভোটার হলে স্থানীয়দের সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। তবে দেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী ভোটার তালিকায় নাম আছে এমন যেকোনো আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন, যদিও তাকে ভোট দিতে হয় নিজ এলাকাতেই। ১২ ফেব্রুয়ারির এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে এই দুই আলোচিত প্রার্থীর ভাগ্য কী হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ—এমন মত প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকরা। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা শিক্ষাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্র কেবল জ্ঞানার্জনের পরিসর না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার মঞ্চে রূপ নিচ্ছে। স্বাধীনতার পর শিক্ষার লক্ষ্য ছিল যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক নাগরিক তৈরি করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারাবাহিক নীতির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষানীতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যক্রম পুনর্লিখন, ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা কিংবা পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বাতিল করার প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য গুরুত্ব পেলে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষকরা যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে না পারেন, তবে শ্রেণিকক্ষও মুক্তচিন্তার জায়গা হয়ে উঠতে পারে না—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব থাকলেও, দলীয় রাজনীতির প্রভাব বাড়লে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নষ্ট হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর পড়ে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। কোন গবেষণা ‘সংবেদনশীল’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’—এ ধরনের অলিখিত সীমারেখা গবেষণার স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র না হয়ে কেবল ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা ও রাজনীতি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না, কারণ রাষ্ট্রকে শিক্ষানীতি নির্ধারণ করতে হয়। তবে সেই নীতির ভিত্তি হওয়া উচিত গবেষণা, সামাজিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ—দলীয় মতাদর্শ নয়। এজন্য পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বদলীয় ঐকমত্যভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়নই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ হতে পারে। কারণ শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল ভিত্তি। সেখানে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে সমাজে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংঘাতের পেছনেও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাই শিক্ষাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, জাতি গঠনের ভিত্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। নিশীথ সিংহ রায় কলকাতা (ভারত)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রণডঙ্কা বাজছে দেশজুড়ে। বিশেষ করে রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর আসন ঢাকা-৮ এখন সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই আসনে ভোটারদের সম্ভাব্য পছন্দ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার ও গবেষণা সংস্থা ‘সোচ্চার-টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ’। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সংস্থাটির নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, জনপ্রিয়তার দৌড়ে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা মির্জা আব্বাসকে বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছেন জামায়াত সমর্থিত জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। মোট ৫২১ জন উত্তরদাতার মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা-৮ আসনের ৪৮.৪ শতাংশ (২৫২ জন) ভোটার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ৩২.১ শতাংশ (১৬৭ জন) ভোটারের সমর্থন। অর্থাৎ জনপ্রিয়তায় তরুণ এই প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছেন অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ। জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, নির্বাচনি এলাকার ৯.৮ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তারা ঠিক কাকে ভোট দেবেন। এছাড়া ৫.৮ শতাংশ উত্তরদাতা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তারা এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে ইচ্ছুক নন। বাকি ৩.৫ শতাংশ ভোটার অন্যান্য ছোট দলের প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং ০.৬ শতাংশ ভোটার তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম প্রকাশ করতে রাজী হননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এই জরিপের ফলাফল ঢাকা-৮ আসনের রাজনৈতিক মেরুকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সমর্থন এবং এনসিপি-জামায়াত জোটের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণাই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে এই সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের প্রকৃত ব্যালটে এই জরিপের প্রতিফলন কতটুকু ঘটে।
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে একটি গভীরভাবে প্রোথিত ধারণা তৈরি হয়েছে—শিক্ষাব্যবস্থা মূলত প্রশাসনের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে দল ক্ষমতায় আসে, শিক্ষা ব্যবস্থার দিশাও ঠিক হয় তাদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী। এর ফলে শিক্ষা কোনো সুদূরপ্রসারী জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারে না; বরং তা এক ধরনের দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়। পূর্ববর্তী সরকারের গৃহীত নীতি ভালো না মন্দ—এই প্রশ্ন মুখ্য নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে সেই নীতি বর্তমান শাসকের মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। অথচ শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, কিংবা কোনো একক সরকারের কৃতিত্বও নয়। শিক্ষা হলো একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা বারবার এই সত্য ভুলে যাই—বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রধান কারণ, শিক্ষা সম্পর্কে একটি সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি এখনও আমাদের সমাজে গড়ে ওঠেনি। শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে না দেখে আমরা তাকে ভোগ্যপণ্যের কাতারে বসিয়ে দিয়েছি। ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যে প্রবণতাগুলি দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষা আজ আর কেবল জ্ঞানার্জন ও মননচর্চার ক্ষেত্র নয়, ক্রমশ তা রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার একটি মঞ্চে রূপ নিচ্ছে। স্বাধীনতার পর ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলা। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই পাঠ্যক্রম, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষার কাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শগত পরিবর্তন শিক্ষাব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। সরকার বদলালেই পাঠ্যক্রম বদলানো, ইতিহাসের ব্যাখ্যা নতুন করে রচনা করা কিংবা পূর্বতন সিদ্ধান্ত বাতিল করার প্রবণতা শিক্ষাকে এক অনিশ্চিত পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্র করে তুলেছে। বিশেষত ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সবচেয়ে প্রকট। কোন বিষয় পড়ানো হবে আর কোনটি বাদ যাবে—এই সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই একাডেমিক আলোচনার বদলে রাজনৈতিক স্বার্থের নিরিখে নেওয়া হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়। শিক্ষার মেরুদণ্ড যদি হয় শিক্ষক, তবে সেই শিক্ষক সমাজও আজ রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দলীয় আনুগত্য যদি যোগ্যতা ও মেধাকে ছাপিয়ে যায়, তবে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক। শিক্ষক যখন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন না, তখন শ্রেণিকক্ষ আর মুক্ত চিন্তার পরিসর হয়ে উঠতে পারে না। এতে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। অথচ শিক্ষার গুরুত্ব এমন হওয়া উচিত ছিল যে সমাজের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় তার স্থান থাকবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা ও শিক্ষক উভয়েই রাজনৈতিক আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে গর্ব করতে ভালোবাসি। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ সমাজের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখছে কিনা, সে প্রশ্ন খুব কমই তুলি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকে অনেক সময় গণতান্ত্রিক অধিকার বলে যুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কি আদৌ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হওয়া উচিত? শিক্ষক আসেন শিক্ষা দিতে, শিক্ষার্থী আসে শিক্ষা গ্রহণ করতে—সেই পরিসর কীভাবে রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত হয়, তা নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্যই গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে ছাত্র রাজনীতির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যখন তা সরাসরি দলীয় রাজনীতির সম্প্রসারিত রূপ নেয়, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নষ্ট হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর—যার ফল আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক চাপ অনেক সময় সূক্ষ্ম অথচ গভীরভাবে কাজ করে। কোন গবেষণা গ্রহণযোগ্য, কোন বিষয় সংবেদনশীল—এই অলিখিত নিয়ম গবেষণার স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। প্রশ্ন করার সাহস ও ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র না হয়ে কেবল ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত, তবে তা কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়ায় নয়—তা হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বার্থে গঠনমূলক ও স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ। এ কথা সত্য যে শিক্ষা ও রাজনীতি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। রাষ্ট্রকে শিক্ষানীতি নির্ধারণ করতেই হয়। কিন্তু সেই নীতির ভিত্তি হওয়া উচিত গবেষণা, সামাজিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ—দলীয় মতাদর্শ নয়। শিক্ষা যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়, তার মূল্য দিতে হবে গোটা জাতিকেই। আজ প্রয়োজন একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানা—যেখানে রাজনীতি থাকবে নীতি নির্ধারণে, কিন্তু শিক্ষার অন্তঃসারকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। পাঠ্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ ও গবেষণার ক্ষেত্রে একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষার গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব নয়। সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়নই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ। শিক্ষা হলো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। সেখানে যদি রাজনৈতিক স্বার্থের ভারী যন্ত্র প্রবেশ করে, তবে সেই ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আজ চারদিকে যে অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজন চোখে পড়ছে, তার শিকড় অনেকাংশেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতায় নিহিত। তাই এখনই সময়—শিক্ষাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নয়, জাতি গঠনের ভিত্তি হিসেবে দেখার। দেরি হলে তার মাশুল দিতে হবে আগামী প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। লেখক: নিশীথ সিংহ রায়
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক বিশেষ মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ‘সবুজ টেকসই অর্থনীতি’র চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল শীর্ষক এই ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি জানায়, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হলে তা প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হিসেবে গণ্য হবে না। সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদিও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ, কিন্তু দলটির একটি বিশাল সমর্থক ও ভোটার গোষ্ঠী রয়েছে। নির্বাচনী তথ্য ও জরিপ অনুযায়ী, এই বিশাল ভোটব্যাংক নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গবেষণা সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মতামত এবং অংশগ্রহণকে যদি পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়, তবে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একটি টেকসই ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে এবং বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল অর্জনে সব প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ ও তাদের সমর্থকদের অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য বলে মনে করে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন, ভোটারদের একটি বড় অংশকে প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটানো কঠিন হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews