বিশ্ব টেনিস র্যাঙ্কিংয়ের সাবেক দুই নম্বর তারকা ও তিউনিসিয়ান গর্ব ওনস জাবেউর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। তবে এবার শুধু র্যাকেট হাতে নয়, বরং মানবতার পক্ষে তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং ব্যক্তিগত জীবনের নতুন এক অধ্যায় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনের গাজা পরিস্থিতি, টেনিসে লিঙ্গবৈষম্য এবং প্রথম সন্তান জন্মের পর কোর্টে ফেরার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এই ‘মিনিস্টার অফ হ্যাপিনেস’। গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাবেউর বলেন, "একজন অ্যাথলেট হিসেবে কথা বলাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যখন শিশুদের ক্ষুধার্ত থাকতে দেখি বা নিরপরাধ মানুষদের প্রাণ হারাতে দেখি, তখন টেনিস কোর্টের জয়-পরাজয় গৌণ হয়ে যায়।" গাজা ইস্যুতে কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার শিকার হলেও, ন্যায়ের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। পাশাপাশি টেনিস বিশ্বে নারীদের সমান অধিকার এবং লিঙ্গবৈষম্য নিয়েও মুখ খুলেছেন এই তিনবারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালিস্ট। টেনিসের বড় আসরগুলোতে নারী ও পুরুষ খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রচারের ক্ষেত্রে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করার আহ্বান জানান তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে জাবেউর এখন এক নতুন রোমাঞ্চের অপেক্ষায়। তিনি প্রথমবারের মতো মা হতে চলেছেন। তবে মা হওয়া মানেই যে ক্যারিয়ারের ইতি, তা মানতে নারাজ এই তিউনিসিয়ান। কিম ক্লিইস্টার্সের মতো কিংবদন্তিদের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, মা হওয়ার পর আরও শক্তিশালী হয়ে টেনিস কোর্টে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তার। জাবেউর বলেন, "আমি নিজেকে সময় দিতে চাই, দেখতে চাই আমার শরীর কীভাবে সাড়া দেয়। তবে আমি নিশ্চিতভাবেই আবারও টেনিস র্যাকেট হাতে ফিরব এবং আগামী কয়েক বছর সর্বোচ্চ পর্যায়ে লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।" তার এই ঘোষণা ভক্তদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। মাঠ ও মাঠের বাইরে সমানভাবে প্রভাবশালী এই অ্যাথলেট আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং এক বৈশ্বিক পরিবর্তনের দূত।
গাজার এক অস্থায়ী তাবু। ভেতরে বসে আছেন ৬২ বছর বয়সী বৃদ্ধা ইনাম আল-দাহদুহ। কোলে তার ছয় নাতি-নাতনি। হাতে একটি ছবি—যাতে রয়েছে তার আদরের তিন ছেলের মুখ। আজ ১৭ এপ্রিল, ফিলিস্তিনি বন্দি দিবস। কিন্তু ইনামের জন্য এই দিনটি উৎসবের নয়, বরং সীমাহীন যন্ত্রণার। গত দুই বছর ধরে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি তার তিন সন্তান মাহমুদ, আলা এবং দিয়া। তারা বেঁচে আছেন কি না, কেমন আছেন—তার কোনো সঠিক উত্তর নেই এই মায়ের কাছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজার আল-শিফা হাসপাতালের কাছে নিজ বাড়ি থেকে তাদের ধরে নিয়ে যায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেই অভিযানে নিহত হন ইনামের স্বামী নাঈমও। এরপর থেকে যাযাবর জীবন আর সন্তানদের ফেরার প্রতীক্ষায় দিন কাটছে এই বৃদ্ধার। তবে ইনামের উদ্বেগ এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি পার্লামেন্টে বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রেখে একটি নতুন আইন পাস হয়েছে। ইনাম বলেন, "ক্ষুধা, কষ্ট বা নির্যাতন—সবই হয়তো ওরা সহ্য করে নেবে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড? একজন মা হিসেবে এই আতঙ্ক নিয়ে আমি কীভাবে শান্তিতে থাকি?" বন্দি অধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৯,৬০০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি রয়েছেন, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি। এদের মধ্যে ৩৫০ জন শিশুও রয়েছে। কারাগারের ভেতর অমানবিক পরিবেশ এবং বন্দিদের মৃত্যুর খবরে ইনামের মতো হাজারো ফিলিস্তিনি মা আজ দিশেহারা। ইনম তার বড় ছেলে মাহমুদের সন্তানদের পবিত্র কোরআন শেখাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তার ছেলেরা নির্দোষ এবং একদিন তারা ফিরে আসবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তার আকুতি, "একজন বন্দিরও বেঁচে থাকার এবং সম্মানের অধিকার আছে। এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে বিশ্বকে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে।"
ফিলিস্তিনিদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন এবং বর্ণবাদী নীতি অনুসরণের অভিযোগে ইসরায়েলকে জাতিসংঘ (UN) থেকে স্থগিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের পার্লামেন্ট স্পিকার নুমান কুর্তুলমুস। ইস্তাম্বুলে আয়োজিত ১৫২তম ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU) অ্যাসেম্বলির উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এই দাবি উত্থাপন করেন। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাতে জানা গেছে, কুর্তুলমুস তার ভাষণে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৭৪ সালে বর্ণবাদী নীতির কারণে যেভাবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে জাতিসংঘ থেকে স্থগিত করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ইসরায়েল বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের জন্য পৃথক আইন এবং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চালু রেখেছে, যা স্পষ্টত একটি বর্ণবাদী বা 'অ্যাপার্থাইড' ব্যবস্থার প্রতিফলন। ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলা ও গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা চরম সংকটের মুখে পড়বে। কুর্তুলমুস আরও সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব, নির্বিচারে আটক এবং অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
ফিলিস্তিনের সমর্থনে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার জেরে ফ্রান্সে এক বছরের বেশি সময় বন্দী থাকার পর অবশেষে দেশে ফিরেছেন ইরানি নাগরিক মাহদিয়া এসফানদিয়ারি। বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে বন্দী বিনিময়ের অংশ হিসেবেই তিনি মুক্তি পেয়েছেন। মাহদিয়া এসফানদিয়ারি ২০১৮ সাল থেকে ফ্রান্সে বসবাস করছিলেন এবং লিঁও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে সেখানে অনুবাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের অভিযানের পর গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার প্রতিবাদে এবং ফিলিস্তিনের সমর্থনে অনলাইনে সরব হওয়ায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘সন্ত্রাসবাদে উস্কানি’ দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করে। তেহরানে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাহদিয়া ফ্রান্সের বিচারব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “সবার কাছে এখন এটা পরিষ্কার যে, অন্তত ফ্রান্সে মতপ্রকাশের কোনো স্বাধীনতা নেই। আমার বিরুদ্ধে আদালতের রায়টি ছিল চরম অন্যায়।” উল্লেখ্য, গত বছর অক্টোবরে জামিনে মুক্তি পেলেও তাঁর ওপর নানা বিধিনিষেধ ছিল। মাহদিয়ার এই মুক্তি এমন এক সময়ে এলো, যখন এক সপ্তাহ আগেই ইরান তাদের দেশে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বন্দী দুই ফরাসি নাগরিক সিসিল কোহলার এবং জ্যাক প্যারিসকে মুক্তি দিয়েছে। যদিও ফ্রান্স সরাসরি এটিকে ‘বন্দী বিনিময়’ হিসেবে স্বীকার করেনি, তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা আগেই জানিয়েছিল যে, ফরাসি নাগরিকদের মুক্তির বিনিময়ে মাহদিয়াকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ফ্রান্সে মাহদিয়ার মুক্তির দাবিতে এর আগে তেহরানে ফরাসি দূতাবাসের সামনে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক বিক্ষোভও প্রদর্শন করেছিল।
ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি ফাতাহ নেতা মারওয়ান বারঘোতির ওপর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের খবর নিশ্চিত করেছেন তার আইনজীবী। সম্প্রতি বারঘোতির সাথে কারাগারে দেখা করার পর আইনজীবী বেন মারমারেলে জানান, গত কয়েক সপ্তাহে তার মক্কেল অন্তত তিনবার বড় ধরনের সহিংস হামলার শিকার হয়েছেন। আইনজীবী মারমারেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে এই পরিস্থিতিকে "গভীর উদ্বেগজনক" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, গত ২৪শে মার্চ বারঘোতির সেলে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কুকুর লেলিয়ে দেয় ইসরায়েলি কারারক্ষীরা। এছাড়া গত ৮ই এপ্রিল তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে মারধর করা হয়। এর ফলে তিনি দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও প্রায় দুই ঘণ্টা তাকে কোনো চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়নি। মারমারেলে বলেন, "এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি পরিকল্পিত নির্যাতনের অংশ। সহিংসতা এবং সুচিকিৎসার অভাব তার জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।" উল্লেখ্য, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০২ সালে ইসরায়েল বারঘোতিকে গ্রেপ্তার করে। তাকে পাঁচটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও বারঘোতি বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ফিলিস্তিনিদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেতা এবং অনেকেই তাকে 'ফিলিস্তিনের নেলসন ম্যান্ডেলা' হিসেবে গণ্য করেন।
বিশ্ববাসীর নজর যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক আলোচনার দিকে, ঠিক তখনই অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন ও হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র সেটেলাররা (দখলদার বসতি স্থাপনকারী)। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াফা’ পশ্চিম তীরের বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতার একাধিক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, আজ সকালেই ইসরায়েলি বাহিনীর কড়া পাহারায় উগ্রপন্থী ইহুদি সেটেলাররা পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে উসকানিমূলক তালমুডিক আচার অনুষ্ঠান পালন করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। অন্যদিকে, হেব্রন শহরের উত্তর-পূর্বে আশ-শুয়ুখ নামক এলাকায় এক ফিলিস্তিনি নাগরিকের বাড়ি দখলের চেষ্টা চালায় সশস্ত্র সেটেলাররা। তবে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী হেব্রন শহরের কেন্দ্রস্থল সিল করে দেয় এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। নাবলুসের উত্তর-পশ্চিমে বুরকা গ্রামের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় দুই ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ৬২ ও ২৪ বছর বয়সী দুই ব্যক্তিকে তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করেছে ইসরায়েলি সেনারা। এছাড়া জেরিকোর উত্তরে আইন আল-আউজা ঝরনার কাছে পানির পাইপলাইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সেটেলাররা এবং বেথলেহেমের দক্ষিণে কৃষি জমি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বিচারে এই হামলা ও সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় পশ্চিম তীরে চরম মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে।
ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বিন-গভির আবারও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছেন। রোববার (১২ এপ্রিল) কড়া পুলিশি পাহারায় তার এই সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জর্ডান ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে 'উস্কানিমূলক' এবং 'আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন' বলে অভিহিত করেছে। আল-আকসা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এক ভিডিও বার্তায় বিন-গভির বলেন, "আজ নিজেকে এখানে মালিক (কর্তা) বলে মনে হচ্ছে।" তিনি আরও জানান, এই স্থানে ইহুদিদের প্রার্থনা ও যাতায়াতের সুযোগ আরও বাড়াতে তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। দশক পুরোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা (স্ট্যাটাস কু) অনুযায়ী, জর্ডানের তদারকিতে থাকা আল-আকসা প্রাঙ্গণে অমুসলিমরা কেবল পর্যটক হিসেবে প্রবেশ করতে পারেন, কিন্তু সেখানে তাদের প্রার্থনা করার কোনো অধিকার নেই। বিন-গভিরের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই সফরের সময় মন্ত্রী সেখানে প্রার্থনাও করেছেন, যা দীর্ঘদিনের বিদ্যমান নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, বিন-গভিরের এই পদক্ষেপ পবিত্র স্থলের অবমাননা এবং এটি একটি অগ্রহণযোগ্য উস্কানি। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কার্যালয় সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আরও নষ্ট করবে। উল্লেখ্য, আল-আকসা মসজিদ মুসলমানদের জন্য বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান এবং ইহুদিদের কাছে এটি 'টেম্পল মাউন্ট' নামে পরিচিত। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিন-গভিরের এ ধরনের সফরের পর বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অতীতে নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন যে, আল-আকসার স্থিতাবস্থা পরিবর্তনে তার সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনি প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির মধ্যে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সোচ্চার মাহমুদ খালিলের সর্বশেষ আপিলও খারিজ করেছে বোর্ড অফ ইমিগ্রেশন অ্যাপিলস এর ফলে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের বাস্তব ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। খালিলের আইনজীবীদের বরাতে জানা যায়, অভিবাসন আপিল বোর্ড বৃহস্পতিবার তার বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ ফাইনাল অর্ডার অফ রিমুভাল জারি করেছে। সাধারণত এই বোর্ডের সিদ্ধান্তগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য দেয়নি। ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরব এই শিক্ষার্থী রায়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত “পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। এক বিবৃতিতে খালিল অভিযোগ করেন, আমি যে একমাত্র কাজ করেছি তা হলো ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা। আমাকে শাস্তি দিতে এই প্রশাসন অভিবাসন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে। তবে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই রায় সত্ত্বেও খালিলকে এখনই আটক বা বহিষ্কার করা সম্ভব নয়। কারণ, তিনি একই সঙ্গে ফেডারেল আদালতে একটি পৃথক মামলা লড়ছেন, যা এখনো বিচারাধীন। সেই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহিষ্কার প্রক্রিয়া স্থগিত থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা শুধুমাত্র একটি অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয় নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম অভিবাসন আইন প্রয়োগ—এই জটিল প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে সোচ্চার বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অভিবাসন আইনের প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আদালতগুলোতে কঠোরতা বৃদ্ধি, আপিল খারিজের হার বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীল মামলাগুলোতে প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। মাহমুদ খালিলের মামলাটি সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারী গোষ্ঠী ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ পুলিশ। শনিবারের এই সমাবেশে কয়েকশ মানুষ অংশ নেন, যেখানে পুলিশের ব্যাপক কড়াকড়ি লক্ষ্য করা গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা "আমি গণহত্যার বিরোধী, আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থক" লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে সেন্ট্রাল লন্ডনে জড়ো হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সমাবেশ চলাকালীন পুলিশ বেশ কয়েকজনকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেয় এবং কয়েকজনকে আটক করে। এমনকি লাঠি হাতে থাকা এক বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকেও পুলিশি পাহারায় সরিয়ে নিতে দেখা যায়। বিক্ষোভের আয়োজক সংস্থা ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’ (DOJ) সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে যেন অবিলম্বে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং সন্ত্রাসবাদ আইনের আওতায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনার প্রেক্ষাপট: প্যালেস্টাইন অ্যাকশন মূলত একটি সরাসরি অ্যাকশন গ্রুপ, যারা ইসরায়েলি অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার এই গোষ্ঠীটিকে 'সন্ত্রাসবাদী সংগঠন' হিসেবে তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সংগঠনটির সদস্য হওয়া বা সমর্থন জানানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যার সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছরের কারাদণ্ড। আইনি লড়াই ও পুলিশের অবস্থান: চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘বেআইনি’ ও ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী’ বলে রায় দিয়েছিলেন। আদালতের এই রায়ের পর শুরুতে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছিল যে, তারা সমর্থনকারীদের গ্রেপ্তার করবে না। কিন্তু গত ২৫ মার্চ পুলিশ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে পুনরায় গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেয়, যা নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কায়সার জোহরা নামে এক অ্যাক্টিভিস্ট আল-জাজিরাকে বলেন, "পুলিশের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তারা সাধারণ মানুষের সুরক্ষা বা অধিকারের তোয়াক্কা করে না, বরং সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নই তাদের মূল কাজ।" আয়োজকদের মতে, শনিবারের এই সংহতি সমাবেশে প্রায় ১,৫০০ মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। এদিকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের করা আপিল আবেদনের শুনানি আগামী ২৮ ও ২৯ এপ্রিল উচ্চ আদালতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত বিশেষ 'শান্তি বোর্ড' (Peace Board) তীব্র অর্থ সংকটের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এই সংকটের কারণে গাজা উপত্যকায় শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন হাতে নিয়েছিল, তা কার্যত থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। রয়টার্সের শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প গাজা নিয়ে যে বিশেষ পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল এই শান্তি বোর্ড। তবে দাতাগোষ্ঠী এবং মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ অর্থ সহায়তা না পাওয়ায় বর্তমানে বোর্ডটি তহবিল সংকটে ভুগছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদারদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বড় একটি অংশ এখনো পাওয়া যায়নি। মূলত গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কী—এমন রাজনৈতিক জটিলতার কারণে অনেক দেশই বড় অংকের বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করছে। ট্রাম্পের এই 'গাজা পরিকল্পনা'র অন্যতম লক্ষ্য ছিল দ্রুত সময়ের মধ্যে গাজা উপত্যকায় আধুনিক আবাসন, ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং অবকাঠামো নির্মাণ করা। এর মাধ্যমে অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তহবিলের অভাবে বর্তমানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং প্রাথমিক কারিগরি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব খাটিয়ে দ্রুত সমাধান চাইলেও আর্থিক বাস্তবতা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তি বোর্ড যদি শিগগিরই বড় কোনো বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে না পারে, তবে গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, যা ওই অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনার মাঝে গাজার এই পুনর্গঠন প্রকল্প ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ে অর্থ ছাড় না হলে এই পরিকল্পনা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর বিধিনিষেধ ও নজরদারি উপেক্ষা করে এক লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি মুসল্লি জুমার নামাজ আদায় করেছেন। আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রমজানের শেষদিকের এক বিশেষ আবহে এই বিশাল জনসমাগম ঘটে। ফিলিস্তিনি সংবাদ মাধ্যম ও ওয়াকফ কাউন্সিলের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ভোর থেকেই জেরুজালেম এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আল-আকসা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। তবে ওল্ড সিটি এলাকায় ইসরায়েলি পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে অনেককেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশি ও পরিচয়পত্র যাচাইয়ের নামে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। নামাজ শেষে উপস্থিত হাজার হাজার মুসল্লি ফিলিস্তিনের মুক্তি এবং আল-আকসার পবিত্রতা রক্ষার পক্ষে স্লোগান দেন। সাম্প্রতিক সময়ে গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এবারের জুমার নামাজকে ফিলিস্তিনিদের ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, প্রতি বছরই রমজান মাস এবং জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে আল-আকসা প্রাঙ্গণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। তবে বাধা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় আবেগ ও জাতীয় অধিকার রক্ষায় ফিলিস্তিনিরা আপসহীন। এদিকে, জুমার নামাজ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও এলাকাটিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আল-আকসার প্রবেশপথগুলোতে এখনো মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী।
ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়নের এক ভয়াবহ নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে ইসরায়েল। সম্প্রতি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে পাস হওয়া নতুন এক আইনে ফিলিস্তিনি শিশুদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকরা এই আইনকে ‘জল্লাদ আইন’ (The Gallows Law) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গত ৩০ মার্চ ইসরায়েলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই বিলে বলা হয়েছে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী হামলায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আইনে শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ছাড় বা বয়সের সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। ইসরায়েলি সামরিক আদালতগুলোতে বর্তমানে ১২ বছর বয়সী শিশুকেও বিচার করার বিধান রয়েছে, যা এখন এই প্রাণঘাতী আইনের আওতায় চলে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই আইন কেবল প্রাপ্তবয়স্ক নয়, বরং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ফিলিস্তিনি শিশুদেরও ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে পারে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করে জানিয়েছে, এই আইন পাসের মাধ্যমে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এক আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্ত করার ৯০ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে এবং আপিলের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই আইনের অন্যতম প্রধান সমর্থক। তিনি বারবার দাবি করে আসছেন যে, যারা ইসরায়েলিদের ওপর হামলা চালায় তাদের একমাত্র পরিণতি হতে হবে মৃত্যু। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইন মূলত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি এবং তাদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমন করার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল-প্যালেস্টাইন (DCIP) এর তথ্যমতে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রতি বছর শত শত ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করে এবং তাদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। নতুন এই আইন কার্যকর হলে সামরিক আদালতে শিশুদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আরও সংকুচিত হবে এবং সামান্য অজুহাতে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। ইতিমধ্যেই এই বিতর্কিত আইনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এই আইনকে ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এটি দ্রুত বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও ব্রিটেন এক যৌথ বিবৃতিতে এই আইনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে নির্বিচারে হত্যার পাশাপাশি এখন ‘আইনের’ দোহাই দিয়ে শিশুদের ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া ইসরায়েলের চরম অমানবিকতারই প্রতিফলন। তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর
ফরাসি-ফিলিস্তিনি আইনজীবী এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য রিমা হাসানকে আটক করেছে ফ্রান্সের পুলিশ। 'সন্ত্রাসবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়া' বা উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে আজ বৃহস্পতিবার ফরাসি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। তবে তার দল 'লা ফ্রান্স ইনসুমিজ' (এলএফআই) এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনপন্থীদের কণ্ঠরোধ করার একটি রাজনৈতিক অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। ফরাসি পত্রিকা লে পারিসিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে ইসরায়েলের বেন গুরিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলার সাথে জড়িত কোজো ওকামোতো-কে নিয়ে একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের প্রেক্ষিতে তদন্তের অংশ হিসেবে রিমাকে আটক করা হয়। যদিও রিমা হাসান পরবর্তীতে এক্স (সাবেক টুইটার) থেকে সেই পোস্টটি মুছে ফেলেছিলেন। এলএফআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলাঁশঁ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, "একটি রিটুইটকে কেন্দ্র করে রিমা হাসানকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ ফ্রান্সে এখন আর পার্লামেন্টারি মেম্বারদের কোনো দায়মুক্তি বা ইমিউনিটি নেই। এটি অসহনীয়।" সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আটকের সময় রিমার কাছে সামান্য পরিমাণ 'সিনথেটিক ড্রাগ' পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এই বিষয়ে রিমা হাসান বা তার আইনজীবীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ৩৩ বছর বয়সী রিমা হাসান ২০২৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচক হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত। গত বছর গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী বহরেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনী আটকে দেয়। রিমার এই আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এলএফআই-এর পার্লামেন্টারি মেম্বার সোফিয়া চিকিরু বলেন, "ফরাসি পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থাকে ফিলিস্তিনি জনগণের সমর্থকদের ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।" দলের অন্য এক নেত্রী মাথিল্ড প্যানট একে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর 'নজিরবিহীন দমনপীড়ন' বলে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে রিমা হাসান অভিযোগ করেছিলেন যে তাকে কানাডায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, যাকেও তিনি এক ধরণের 'সেন্সরশিপ' বলে দাবি করেছিলেন। এখন ফ্রান্সে তার এই আটক হওয়ার ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে ইউরোপে চলমান উত্তজনাকে আরও উসকে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের সামরিক আদালতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য পাস হওয়া নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্বের প্রভাবশালী আটটি মুসলিম দেশ। দেশগুলোর দাবি, এই আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও উসকে দেবে। ইসরায়েলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই বিতর্কিত আইনের আওতায়, কোনো ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায়, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের সমর্থকদের দাবি, এটি ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হামলা বা অপহরণ রুখতে এক শক্তিশালী 'প্রতিরোধক' হিসেবে কাজ করবে। তবে এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে আটটি মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই আইনটি মূলত ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠরোধ এবং বর্ণবাদী বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার একটি অপপ্রয়াস। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সদর দপ্তরের সামনে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশগুলো অবিলম্বে এই আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, এই আইনের ফলে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর দমন-পীড়ন আরও বাড়বে এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে সামরিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই যে বিতর্ক রয়েছে, এই আইনের ফলে তা আরও ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের বিভিন্ন বিতর্কিত আইন ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারিত্ব নিয়ে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো সরব ভূমিকা পালন করে আসছে। এই নতুন আইন সেই কূটনৈতিক বিরোধকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেল।
অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনে গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। একদিকে পবিত্র স্থানগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী সহিংসতা। আল জাজিরার সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে ফিলিস্তিনের বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলো এখনো কার্যত অবরুদ্ধ। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ফিলিস্তিনিরা সেখানে প্রবেশ করতে পারছেন না। বিশেষ করে জুমার নামাজে অংশ নিতে আসা মুসল্লিদের ওপর কড়াকড়ি ও তল্লাশির নামে হয়রানি চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে পবিত্র নগরীজুড়ে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত এক সপ্তাহে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জেনিন, নাবলুস এবং তুলকারেম এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলা ও স্থল অভিযানে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ইসরায়েলিদের হামলায় ফিলিস্তিনি কৃষকরা তাদের কৃষি জমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন। সহিংসতার পাশাপাশি গাজা উপত্যকায় খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করলেও ত্রাণ সরবরাহে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। সাপ্তাহিক এই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পথে, যেখানে হাজার হাজার আহত মানুষ নূন্যতম চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন। ফিলিস্তিনে চলমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পবিত্র স্থানগুলোতে ইবাদতের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এবং অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না, বরং দিন দিন তা আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, পবিত্র স্থানগুলো বন্ধ রাখা এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষ মৃত্যুদণ্ড আইনের কঠোর সমালোচনা করে একে 'বর্ণবাদের পথে আরও এক ধাপ' হিসেবে অভিহিত করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে তৈরি এই আইন বিচারব্যবস্থাকে চরম বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেয়া এক বিবৃতিতে সানচেজ সরাসরি এই পদক্ষেপের নিন্দা জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই আইনটি কেবলমাত্র অ-ইহুদি বা ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর মতে, একই অপরাধের জন্য ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের আলাদা শাস্তির বিধান কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। তিনি একে "অপ্রতিসম ব্যবস্থা" হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "একই অপরাধ কিন্তু ভিন্ন শাস্তি—এটি বিচার নয়। এটি বর্ণবাদের (Apartheid) দিকে আরও একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ। বিশ্ববাসী এই পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকতে পারে না।" আন্তর্জাতিক মহলে সানচেজের এই মন্তব্য বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যেখানে সামরিক আদালতে ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, অথচ একই ধরণের অপরাধে ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। স্পেনের এই অবস্থানকে মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের লক্ষ্যে ইসরায়েলের বিতর্কিত নতুন আইন পাসের পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জার্মানি এই পদক্ষেপকে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘পশ্চাৎপদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইইউর মুখপাত্র আনোয়ার এল আনোউনি বলেন, "ইসরায়েলের এই মৃত্যুদণ্ড বিলটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনের এই বৈষম্যমূলক প্রকৃতি স্পষ্টতই একটি পশ্চাৎপদ পদক্ষেপ।" এদিকে, ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে এই বিল পাসের সিদ্ধান্তে গভীর দুঃখ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জার্মানি। জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র জানান, তারা নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এই আইনটি কেবল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের ওপর একচেটিয়াভাবে প্রয়োগ করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা চরম উদ্বেগের বিষয়। ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থানের কথা বললেও, এমন আইন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে বার্লিন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৩৯০ জনেরও বেশি সহকর্মী নিহতের ঘটনায় একটি স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন জাতিসংঘ ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার (UNRWA) বিদায়ী প্রধান ফিলিপ লাজারিনি। জেনেভায় নিজের শেষ কার্যদিবসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই দাবি জানান। লাজারিনি বলেন, গাজায় চলমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমাদের কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অবরুদ্ধ গাজায় জীবন রক্ষাকারী ত্রাণ ও সেবা কার্যক্রমের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে ইউএনআরডব্লিউএ, যা কার্যত সেখানকার অধিকাংশ মানুষের জন্য একমাত্র রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিকল্প। এই সংস্থাটির কর্মীদের ওপর এ ধরণের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসরাইলের সংসদ নেসেটে সোমবার একটি আইন পাস হয়েছে, যা প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের অনুমতি দেয়। মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনি নেতারা এই আইনকে বৈষম্যমূলক ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। আইনটি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে পাস করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলিদের হত্যা করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডই হবে প্রধান শাস্তি। আইনটির পক্ষে ছিলেন কট্টর ডানপন্থি ইসরাইলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, যিনি ৬২-৪৮ ভোটে পাস হওয়ার পর সংসদে শ্যাম্পেনের মাধ্যমে উদযাপন করেন। এই আইনটি এমন সময় এসেছে যখন গাজায় ইসরাইলি হামলা, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অভিযান ও বসতি সম্প্রসারণ এবং হাজার হাজার গ্রেফতারের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসরাইলের নাগরিক অধিকার সমিতি ইতিমধ্যেই এই আইনটির বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এটিকে “বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং উল্লেখ করেছে, অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ইসরাইলের সার্বভৌমত্বাধীন নয়। ফিলিস্তিনি দল হামাসও আইনটি তীব্রভাবে নিন্দা করেছে, বলেছে এটি বন্দি ফিলিস্তিনিদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে। গাজা-ভিত্তিক ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্র পিএইচসিআর এই আইনকে “আইনের আড়ালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইসরাইলি দীর্ঘদিনের নীতি আরও দৃঢ় করার চেষ্টা” বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও ইসরাইলকে আইনটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে এবং উল্লেখ করেছে যে, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সূত্র: আল জাজিরা
ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট। সোমবার (৩০ মার্চ) বিলটি দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা পাঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন পায়। ইসরায়েলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিলটির পক্ষে ৬২ জন সংসদ সদস্য ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট পড়ে ৪৮টি এবং একজন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। আইনটির পক্ষে ভোট দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও। আইনটি পাস হওয়ায় ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ উন্মুক্ত হলো, যা ইতোমধ্যে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আজ ৩০ মার্চ, ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক 'ভূমি দিবস' (Land Day)-এর ৫০তম বার্ষিকী। তবে এমন এক সময়ে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকাংশ ভূমি হারিয়ে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ভূমি দখলের হার নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫,০০০ দুনাম জমি নতুন করে বাজেয়াপ্ত করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ, যা ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গাকে আরও সংকুচিত করে ফেলেছে। ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গ্যালিলি অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের বিশাল জমি দখলের ঘোষণা দিলে শুরু হয় প্রতিবাদ ও ধর্মঘট। সেই আন্দোলনে ছয়জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান, যার স্মরণে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়। তবে ৫০ বছর পর এসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পশ্চিম তীরের 'এরিয়া সি' (Area C) অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও উচ্ছেদের কারণে পুরো বেদুইন গ্রামগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে প্রায় ৪,৭৬৫ জন ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ভূমি দখলের এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি কৃষকদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক কৃষক তাদের কয়েক দশকের পুরনো জলপাই গাছ নিজ হাতে কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন যেন ইসরায়েলি বুলডোজার সেগুলো উপড়ে না ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের এই 'ডি ফ্যাক্টো অ্যানেক্সেশন' বা কার্যত দখলদারিত্বের ফলে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এই ভূমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেও মাঠ পর্যায়ে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও লাঞ্ছনা অব্যাহত রয়েছে, যা এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews