পারস্য উপসাগরের উপকূলে ইসরায়েল এবং মার্কিন হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকলেও, সমুদ্রের গভীরে ও পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অপ্রতিরোধ্য বাহিনী। সামরিক বিশেষজ্ঞরা যাকে বলছেন ‘মস্কুইটো ফ্লিট’ বা মশা বাহিনী। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)-এর এই ছোট, দ্রুতগামী এবং চটপটে নৌবহরটি এখন হরমুজ প্রণালীর নৌ-বাণিজ্যের জন্য প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইআরজিসি-এর এই নৌবাহিনী মূলত একটি ‘গেরিলা বাহিনী’ হিসেবে সমুদ্রে কাজ করে। যেখানে ইরানের মূল নৌবাহিনী বড় যুদ্ধজাহাজে বিশ্বাসী, সেখানে আইআরজিসি গুরুত্ব দেয় ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (asymmetrical warfare) বা ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলের ওপর। টেনেসির চ্যাটানুগা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ গোলকার বলেন, "আইআরজিসি সরাসরি ধ্রুপদী নৌ-যুদ্ধে না গিয়ে অতর্কিত আক্রমণ এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশলে দক্ষ।" সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক মেরিটাইম এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২০টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। যার বেশিরভাগই আইআরজিসি-এর ড্রোন বা ভ্রাম্যমাণ লাঞ্চার থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরানের মূল নৌবাহিনীর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও, আইআরজিসি-এর এই ছোট নৌযানগুলোর সংখ্যা এখনও শত শত বা হাজারও হতে পারে। এই ‘মশা বাহিনী’র বিশেষত্ব হলো এদের আকার। এগুলো এতই ছোট যে স্যাটেলাইট ইমেজে ধরা পড়ে না। ইরানের পাথুরে উপকূলের গভীর গুহায় বা সুরক্ষিত ঘাঁটিতে এগুলো এমনভাবে লুকিয়ে রাখা হয় যে কয়েক মিনিটের নোটিশে অভিযানে নামতে পারে। এই বোটগুলো ঘণ্টায় ১০০ নটের বেশি (প্রায় ১১৫ মাইল) গতিতে চলতে সক্ষম। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন, তবুও মার্কিন রণতরীগুলো হরমুজ প্রণালীর সরু পথে টহল দিতে সতর্ক থাকছে। কারণ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে এখানে সতর্ক হওয়ার মতো সময় পাওয়া যায় না। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান অ্যাডমিরাল গ্যারি রুগহেড বলেন, "আইআরজিসি-এর এই বাহিনী সবসময়ই একটি বিঘ্নকারী শক্তি। তারা কখন কী করবে, তা বোঝা দায়।" উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মূল সেনাবাহিনীর ওপর অনাস্থা থেকেই এই সমান্তরাল বাহিনী গঠন করেছিলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। ১৯৮৬ সালে গঠিত এই নৌ-শাখাটি এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের সম্মুখভাগে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন একগুচ্ছ কঠোর শর্তারোপ করেছে ইরান। এখন থেকে এই কৌশলগত জলপথ ব্যবহারের জন্য ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ-শাখার পূর্ব অনুমতি এবং নির্ধারিত টোল বা মাশুল প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এই ঘোষণা দিয়ে বলেন, "হরমুজ প্রণালীতে নতুন সামুদ্রিক শাসন ব্যবস্থা (Maritime Regime) মেনে চলার সময় এসেছে।" নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র আইআরজিসি অনুমোদিত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করে যাতায়াত করতে পারবে। ইব্রাহিম আজিজি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি জাহাজের চলাচলে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে, তবে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন করা হবে।" একই সুর শোনা গেছে ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সামরিক সদর দপ্তর থেকেও। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের অবাধ চলাচলের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালীতে এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল থাকবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চেকপয়েন্ট। ইরান এই কৌশলগত অবস্থানকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি বাজারে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে চায়। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যেকোনো কূটনৈতিক দরকষাকষিতে এটিকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে তেহরান। এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকেও হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। মূলত মার্কিন অবরোধের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান এই পথ দিয়ে ট্রানজিট চার্জ বা টোল আদায়ের কৌশল গ্রহণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত আরোপ করেছে ইরান। দেশটির এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন থেকে প্রণালি পার হতে হলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনুমতি নিতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে আইআরজিসির অনুমোদন সাপেক্ষে চলাচল করতে হবে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজসহ সব বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি দিয়ে পারাপারের অনুমতি পাবে। তবে সামরিক বা নৌবাহিনীর জাহাজের ক্ষেত্রে এই অনুমতি প্রযোজ্য হবে না। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ঘোষণা দিয়েছিলেন, লেবাননে কার্যকর যুদ্ধবিরতির সময় ১০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকলেও ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ বহাল থাকবে এবং কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করা হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে প্রণালি উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা, অন্যদিকে আইআরজিসির অনুমতির শর্ত—এই দুই অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ৪০ দিনের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সত্য সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। বিবিসির ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স সংবাদদাতা জিয়ার গোলের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সংঘাতের শুরুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সামরিক স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়, তখন তেহরান তাদের রণকৌশল বদলে ফেলে। তারা প্রচলিত যুদ্ধের বদলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করে। উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের সিংহভাগ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন যে, এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়া সম্ভব। গত কয়েক সপ্তাহে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। মূলত এই চাপের মুখেই ওয়াশিংটন নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচলিত সামরিক শক্তির চেয়েও এই জলপথ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ইরানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্তত ৫২ জন জ্যেষ্ঠ সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, যা দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুকে দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। খামেনির পর জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আলী লারিজানি এবং আলী শামখানি-ও পৃথক হামলায় নিহত হন বলে জানা গেছে। এতে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সামরিক নেতৃত্বেও একের পর এক ক্ষতি হয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ বাঘেরি নিহত হওয়ার পর দায়িত্ব নেওয়া আব্দোলরাহিম মুসাভি-ও একই পরিণতির শিকার হন। পাশাপাশি খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের কমান্ডার গোলামালি রশিদ নিহত হওয়ায় যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতায় বড় ধাক্কা লাগে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-এর নেতৃত্বেও বড় ক্ষতি হয়েছে। বাহিনীর প্রধান হোসেইন সালামি এবং তাঁর উত্তরসূরি মোহাম্মদ পাকপোর নিহত হন। এতে বাহিনীর স্থল, নৌ ও মহাকাশ—তিনটি শাখাই দুর্বল হয়ে পড়ে। মহাকাশ বাহিনীর প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ নিহত হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি বড় ধাক্কা খেয়েছে। নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি নিহত হওয়ায় পারস্য উপসাগরে ইরানের উপস্থিতিও দুর্বল হয়েছে। গোয়েন্দা কাঠামোতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব এবং আইআরজিসির গোয়েন্দা প্রধান মোহাম্মদ কাজেমি নিহত হওয়ায় গোটা গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে সমন্বয় সংকট তৈরি হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যাকাণ্ডের পর আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে জানা গেছে। এতে কর্মসূচির অগ্রগতিতে বড় প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মূল ব্যক্তি কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর কুদস ফোর্সের নেটওয়ার্কেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং ইরানের সামরিক কমান্ড, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত করছে—আধুনিক যুদ্ধ এখন কেবল ময়দানে নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ইরানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন নেতৃত্ব তৈরি, নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন পাল্টা প্রস্তাব ও পাল্টাপাল্টি হামলায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ থামাতে Pakistan-এর মধ্যস্থতায় দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে Iran। উল্টো তেহরান ১০ দফা নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সব ধরনের সংঘাত বন্ধ ও তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবকে ‘অপর্যাপ্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump। হোয়াইট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, ইরানকে দেওয়া তাঁর সময়সীমাই চূড়ান্ত এবং এই প্রস্তাবগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। এরই মধ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই হামলার পর থেকে একের পর এক উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দাপ্রধান মেজর জেনারেল মাজিদ খাদেমি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েল, যা পরে ইরানও নিশ্চিত করে। এ ছাড়া আইআরজিসির কুদস ফোর্সের একটি আন্ডারকভার ইউনিটের প্রধানকে হত্যার দাবিও করেছে ইসরায়েল, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক হামলা ইরানের সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে পাল্টা হামলা জোরদার করেছে ইরান। Israel-এর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। জেরুজালেম, তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হাইফায় এক আবাসিক ভবনে হামলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলেও। ইরান-সমর্থিত হামলায় বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। অন্যদিকে ইরান ও Lebanon-এ ইসরায়েলের পাল্টা বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতির বদলে উত্তেজনা আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইরানকে সমঝোতায় আসতে ১০ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন, যার সময়সীমা প্রায় শেষের দিকে। এই সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের আকাশসীমায় আরও একটি অত্যাধুনিক মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) দেশটির মধ্যাঞ্চলে এই ঘটনা ঘটেছে বলে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিমানটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এর পাইলটের পরিণতি সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ সংঘাতের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনো মার্কিন স্টিলথ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করল তেহরান। এর আগে গত ১৯ মার্চও একটি এফ-৩৫ বিমান ভূপাতিত করার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান, যদিও ওয়াশিংটন তখন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে শুক্রবারের এই চাঞ্চল্যকর দাবি নিয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করারও দাবি করেছিল ইরান। যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। দুই পক্ষের মধ্যে চলছে ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলা। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই সংঘাতের প্রলেপ এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। বুধবার (১ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কোনোভাবেই শত্রুদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না। আইআরজিসি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডকে 'হাস্যকর কার্যকলাপ' হিসেবে অভিহিত করে স্পষ্ট করেছে যে, বর্তমানে এই প্রণালির ওপর তাদের দৃঢ় ও দাপুটে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আইআরজিসির এই হুঁশিয়ারির কিছুক্ষণ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেন। ট্রাম্প জানান, ইরানের রাষ্ট্রপতি তার কাছে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে এই প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে তিনি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি যখন পুরোপুরি "উন্মুক্ত, বাধামুক্ত ও নিরাপদ” হবে, কেবল তখনই তিনি যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভাববেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে তেহরান সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। দুই দেশের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথকে কেন্দ্র করে তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সূত্র: আলজাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও আশপাশের বাসিন্দাদের দ্রুত এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে হামলার জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও নজরদারিতে এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে Google, Apple, Meta, Tesla এবং Boeing-সহ অন্তত ১৫টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় আগামীকাল রাত ৮টার পর এসব প্রতিষ্ঠানের স্থাপনায় হামলা চালানো হতে পারে। সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থানরত কর্মী ও সাধারণ মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই এ ধরনের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এতে শুধু সামরিক নয়, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চ্যালেঞ্জ জানানো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাবশালী কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি নিহত হয়েছেন। সোমবার (৩০ মার্চ) আইআরজিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, গুরুতর আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছেন, বন্দর আব্বাসে তাদের বাহিনীর একটি ‘নির্ভুল ও প্রাণঘাতী অভিযানে’ তাংসিরি ও আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কমান্ডার তাংসিরির মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য এক মাসব্যাপী যুদ্ধের পর সরাসরি স্থল অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও মার্কিন বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানের রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ চালাবে এবং এরপর বিমান হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। এই যুদ্ধের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে খারগ দ্বীপ, যেখান থেকে ইরান তার ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি করে। এছাড়া কেশম দ্বীপ এবং আবু মুসা দ্বীপও মার্কিন নিশানায় রয়েছে। তবে সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, পারস্য উপসাগরীয় এই দ্বীপগুলো দখল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেখানে যাতায়াত সহজ হলেও মার্কিন সেনারা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: সিএনবিসি
ইরানের নজিরবিহীন হামলার হুমকির মুখে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থিত বিখ্যাত 'আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত' (এইউবি) তাদের সশরীরে পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোববার (২৯ মার্চ) এক জরুরি বার্তায় জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আগামী সোম ও মঙ্গলবার সব ক্লাস অনলাইনে পরিচালিত হবে। ক্যাম্পাসে কেবল জরুরি প্রয়োজনে সীমিত সংখ্যক কর্মী উপস্থিত থাকবেন। এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একটি হুঁশিয়ারিকে কেন্দ্র করে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাদের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়েছে। এর প্রতিবাদে আইআরজিসি স্পষ্ট আল্টিমেটাম দিয়েছে যে, সোমবার (৩০ মার্চ) তেহরান সময় দুপুর ১২টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ওই হামলার নিন্দা না জানায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাল্টা হামলার শিকার হবে। তারা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ক্যাম্পাস থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করার পরামর্শ দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ফাদলো খৌরি এক বিবৃতিতে জানান, যদিও এখন পর্যন্ত সরাসরি হামলার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই, তবুও বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা থাকলেও বৈরুতের এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র: আল আরাবিয়া
ওমান উপকূলে একটি মার্কিন সামরিক সহায়তাকারী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। শনিবার (২৮ মার্চ) আইআরজিসি-র খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওমানের সালালাহ বন্দর থেকে কিছুটা দূরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরব সাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথে এই অভিযান চালানো হয়। বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, এই হামলা ওমানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেনি। ইরান সর্বদাই প্রতিবেশী দেশ ওমানের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে হামলায় মার্কিন জাহাজটির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা অভিযানের বিস্তারিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। উল্লেখ্য, ওমান সংলগ্ন এই জলসীমা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালির সাথে যুক্ত। চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এই হামলা ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সূত্র: আলজাজিরা
ফ্রান্সে জি–সেভেন শীর্ষ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান “কয়েক মাস নয়, কয়েক সপ্তাহের” মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তিনি সামরিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করলেও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য স্পষ্ট এবং দ্রুত তা অর্জনের জন্য তারা প্রস্তুত। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ জানান, ইরান শুধু রাশিয়ার মিত্র নয়, বরং কৌশলগত অংশীদার। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। ল্যাভরভ যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক কপটতারও অভিযোগ করেন এবং বলেন, ইরানকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের মাধ্যমে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন ঘাঁটিগুলো দ্রুত খালি করুন। আইআরজিসি দাবি করেছে, মার্কিন সেনাদের যেকোনো অবস্থানেই হামলা চালানো তাদের পবিত্র দায়িত্ব। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১.০৬ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ১০ দিন স্থগিত রেখেছেন, তবুও তেলের দাম কমেনি। সৌদি আরবের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা আইআরজিসি সম্পাদিত বলে দাবি করছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির সতর্ক করেছেন, চলমান যুদ্ধের কারণে সেনা সংকট গভীর হচ্ছে এবং সাধারণ অভিযানও পরিচালনা করতে অসুবিধা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে থাকা কিছু সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ইরান এবং লেবাননের বিরুদ্ধে চলমান হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১,১১৬ জনে পৌঁছেছে। ইরানের কোম শহরে এক আবাসিক এলাকায় হামলায় কমপক্ষে ১৮ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। আইআরজিসি হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, যাতে মার্কিন-সহ মিত্র দেশগুলোর জাহাজ প্রভাবিত হয়। এছাড়া ইরানের দাবি অনুযায়ী, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কেও হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার অভিযোগ উঠেছে। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক হামলার সতর্কতা জারি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দ্রুত কর্মস্থল ত্যাগ করতে বলেছে। পাশাপাশি এসব স্থাপনার এক কিলোমিটার এলাকার ভেতরে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস কমান্ডার সাইয়েদ মজিদ মুসাভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। এর প্রতিক্রিয়া এবার আগের মতো সীমিত থাকবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানাগুলোর কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করা উচিত, কারণ যেকোনো সময় পাল্টা হামলা শুরু হতে পারে। তবে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, আরদাকান শহরের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরও কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়ানোর ঘটনা ঘটেনি। উল্লেখ্য, ওই স্থাপনায় ‘ইয়েলোকেক’ উৎপাদন করা হতো, যা ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং পরবর্তীতে পারমাণবিক জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র একটি সাম্প্রতিক ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সরাসরি যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসি-র তেহরান শাখার সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা রহিম নাদালি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রহিম নাদালি জানান, ‘ফর ইরান’ নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় শিশুদের টহল দেওয়া, চেকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং লজিস্টিক সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। আইআরজিসি-র দাবি, অনেক কম বয়সী কিশোররা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের প্রবল দাবির মুখে এই বয়সসীমা কমিয়ে ১২ বছরে আনা হয়েছে। তবে তেহরানের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিশুদের সামরিক কাজে ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও, ইরান সেই অঙ্গীকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো বলছে, শিশুদের এমন বিপজ্জনক কাজে ব্যবহার তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। অতীতেও ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে শিশুদের ব্যবহার এবং তাদের ওপর নির্যাতনের একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমানে ইরানে কয়েক মিলিয়ন শিশু শ্রমিক মানবেতর জীবন যাপন করছে, তার ওপর এই নতুন সামরিক ডিক্রি শিশুদের ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে মার্কিন যুদ্ধবিমানে হামলার এক চাঞ্চল্যকর দাবিকে কেন্দ্র করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ উপকূলীয় সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর এলাকায় তারা একটি মার্কিন এফ-১৮ যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিবিসি ফার্সির বরাত দিয়ে জানা গেছে, গতকাল ইরানি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে মার্কিন এই শক্তিশালী যুদ্ধবিমানটিকে চাবাহারের আকাশে উড়তে দেখা যায়। বিবিসির ফ্যাক্ট-চেকিং বিভাগ ভিডিওগুলো যাচাই করে নিশ্চিত করেছে যে, এর মধ্যে অন্তত একটি ভিডিও চাবাহার বন্দর এলাকার টিস সেতুর কাছে ধারণ করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উড়ন্ত এফ-১৮ বিমানটিকে লক্ষ্য করে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হচ্ছে এবং এক পর্যায়ে বিমানটির লেজের অংশে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। তবে বিস্ফোরণের পর বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ বা ভিডিও ফুটেজ সামনে আসেনি। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এক পাল্টা বিবৃতিতে তারা জানায়, ওই অঞ্চলে তাদের কোনো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়নি। আকাশসীমার এই সংঘাতের খবরটি নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছে।
ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌ-কমান্ডার আলী রেজা তাংসিরিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল। তেহরান এখন পর্যন্ত এই খবরের আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত না করলেও, এই দাবি সত্য হলে তা ইরানের সামরিক কাঠামোর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হবে। কমান্ডার তাংসিরি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তাই নন, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রধান কারিগর ছিলেন। গত কয়েক দিনে তিনি এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছিল। একের পর এক শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে হারিয়ে ইরান বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাংসিরির মতো ব্যক্তিত্বের প্রস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন হামলা, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং একের পর এক শীর্ষ কমান্ডারের বিদায়—তাত্ত্বিকভাবে যেকোনো দেশের শাসনব্যবস্থা ধসে পড়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে গেলেও ইরানের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো অবিশ্বাস্যভাবে টিকে আছে। কেন পতন ঘটছে না তেহরানের? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর নেপথ্যে রয়েছে দেশটির বিশেষ 'সমান্তরাল রাষ্ট্র' কাঠামো। আইআরজিসি: পতন ঠেকানোর মূল শক্তি ইরানের মূল শক্তি কেবল তাদের প্রথাগত সেনাবাহিনী নয়, বরং 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর' বা আইআরজিসি। এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল রাষ্ট্র কাঠামো। গত কয়েক সপ্তাহের সংঘাত ও ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় আইআরজিসির বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হলেও তাদের চেইন অফ কমান্ডে কোনো ছেদ পড়েনি। সংস্থাটির নীতিই হলো—একজন নিহত হলে তাৎক্ষণিকভাবে শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য পরবর্তী নেতৃত্ব সর্বদা প্রস্তুত থাকে। বাসিজ মিলিশিয়া ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসির অধীনে থাকা প্রায় ১০ লাখ সদস্যের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী 'বাসিজ' এখনো রাজপথে সক্রিয়। ইসরায়েলি বাহিনী বাসিজ চেকপোস্টগুলোতে হামলা চালালেও, তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে তাদের টহল কমেনি। বিশেষ করে সরকারবিরোধী যেকোনো বিক্ষোভ দমনে এই বাহিনী কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। ৬০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে প্রশাসন। রহস্যময় নতুন নেতৃত্ব ও রণকৌশল নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তবে তার নামে নিয়মিত লিখিত বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের কমান্ড কাঠামো পঙ্গু হওয়ার দাবি করলেও, বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে। সম্প্রতি ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরও তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
ইরানের বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে জাতীয় নিরাপত্তার হাল ধরলেন অভিজ্ঞ রেভোলিউশনারি গার্ড (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলী লারিজনির মৃত্যুর পর শূন্য হওয়া সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান পদে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয়ের যোগাযোগ বিষয়ক উপ-প্রধান মেহেদি তাবাতাবায়ি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর চার দশক ধরে ইরানের সামরিক, বিচার বিভাগ এবং বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি, যেখানে কুর্দি গোষ্ঠীসহ আন্তঃসীমান্ত আধাসামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলায় বিশেষ পারদর্শিতা দেখান। পরবর্তীতে তিনি আইআরজিসি-র সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জোলঘাদরের নিয়োগকে ইরানের হার্ডলাইন বা কট্টরপন্থী অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি কেবল সামরিক কৌশলবিদই নন, বরং দেশটির নীতি-নির্ধারক সংস্থা 'এক্সপেডিয়েন্সি ডিসসার্নমেন্ট কাউন্সিল'-এরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বাসিজ এবং আনসার-ই-হিজবুল্লাহর মতো আধাসামরিক বাহিনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও বিরোধী দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আলী লারিজনির হত্যাকাণ্ডের পর জোলঘাদরের মতো একজন 'ব্যাটল-টেস্টেড' কমান্ডারকে বেছে নিয়ে ইরান বিশ্বকে তার কঠোর নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের বার্তাই দিল।
পারস্য উপসাগর উপকূলীয় আকাশসীমায় একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট জানিয়েছে, অনুপ্রবেশকারী ড্রোনটি শনাক্ত করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বিমান প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি মানববিহীন আক্রমণ ব্যবস্থা শনাক্ত করা হয়। পরে সেটিকে লক্ষ্য করে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সেটি ধ্বংস করা হয়। এর আগে গত ১৯ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছিল, তারা একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রও একটি যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়টি শত্রু যুদ্ধবিমান এবং ১২৭টি ড্রোন ভূপাতিত বা প্রতিহত করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি। সূত্র: প্রেস টিভি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘প্রতারক মার্কিন প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সংস্থাটি বলেছে, ট্রাম্পের ‘পরস্পরবিরোধী আচরণ’ ইরানকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না এবং তারা চলমান সংঘাত থেকে দৃষ্টি সরাবে না। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে এই মন্তব্য করা হয়। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বক্তব্য ও পদক্ষেপে অসঙ্গতি রয়েছে, যা ইরানের অবস্থান পরিবর্তনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এই প্রতিক্রিয়া এসেছে এমন এক সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। তবে তেহরান এর আগেও একাধিকবার এ ধরনের কোনো আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যই দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী বক্তব্য চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলছে। সূত্র: আল-জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews