মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নাটকীয় পালাবদল ঘটেছে। একদিকে প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার বন্ধ—এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার ইরান হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিক মহলে আশার সঞ্চার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও জাহাজ চলাচল তেহরান নিয়ন্ত্রণ করবে। এই ঘোষণার প্রভাব দ্রুতই বিশ্ববাজারে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়। তবে পরিস্থিতি বেশিক্ষণ স্থিতিশীল থাকেনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র জানায়, কোনো শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ ঘোষণা করে। আইআরজিসি জানায়, প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়াকে শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং নির্দেশ অমান্যকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। পরিস্থিতির উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে ওমান উপকূলের কাছে দুটি জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের নৌবাহিনী ‘শত্রুদের নতুন করে পরাজয়ের স্বাদ’ দিতে প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই টানাপোড়েন মূলত বৃহত্তর কৌশলগত দ্বন্দ্বের অংশ। জাহাজ চলাচল ছাড়াও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো গভীর। এদিকে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নাও হতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি খারাপ হলে পুনরায় সামরিক হামলা শুরু হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। অন্যদিকে ইরানও আপসহীন অবস্থানে রয়েছে। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আরও আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজাঈ এ হুমকি দেন। বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘পুলিশের ভূমিকা’ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কাজ নয়। তিনি দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সহজেই মার্কিন জাহাজ লক্ষ্য করে ধ্বংস করতে সক্ষম। রেজাঈ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সাহস পায় না। তার ভাষায়, ইরান তাদের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি ছাড়বে না এবং আলোচনার শর্ত নির্ধারণ করবে তেহরানই। এদিকে, সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। দাবি করেন, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ইরান ‘হাজার হাজার জিম্মি’ ধরে বিপুল অর্থ আদায় করতে পারবে। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক বিমানবাহী রণতরী অঞ্চলটিতে অবস্থান করছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও আগের দফার দীর্ঘ আলোচনায় কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি, তবে হোয়াইট হাউস চুক্তির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক হুমকি ও কূটনৈতিক তৎপরতা—দুই দিক থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মার্কিন অবরোধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের বিপরীতে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আর এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনকে আলোচনায় ফেরাতে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নির্দেশে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের লক্ষ্য ছিল দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলা। তবে আরব কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিচালিত হয়। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালি-তে হামলার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে, যার ফলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায় এবং তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব প্রণালীতেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এদিকে ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীদের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান তাদের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গাজা যুদ্ধের সময় হুতিরা এই পথে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ওয়াশিংটন। তবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন সামরিক উত্তেজনার বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের মতে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবহার সীমিত করার মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে, যা এক ধরনের অর্থনৈতিক সন্ত্রাসের শামিল। তিনি আরও জানান, এ ধরনের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত রয়েছে। ভ্যান্স বলেন, ইরান যদি এই নীতি অব্যাহত রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে কোনো ইরানি জাহাজ অবাধে চলাচল করতে না পারে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে ওয়াশিংটন। তিনি আরও জানান, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখন ইরানের ওপরই বর্তায়। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ইরানকে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে এবং এমন একটি কঠোর যাচাইব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা নিশ্চিত করবে দেশটি কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-ও একই বিষয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি কঠোর বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এবং একটি টেকসই সমঝোতায় পৌঁছাতে নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো। গত ৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি বজায় রাখতে এবং এর মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর জন্য জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে আলোচনার পরবর্তী ভেন্যু কোথায় হবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে নিরলস কাজ করছেন। এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান, যাদের সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক ও মিসর। আপাতত লক্ষ্য হলো আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত দেড় মাস বাড়ানো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানিয়েছেন, চরম উত্তেজনার মধ্যেও যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে। তিনি বলেন, "ইসলামাবাদে একটানা ২১ ঘণ্টা সরাসরি আলোচনা হয়েছে, যার সাক্ষী আমি নিজে। কিছু বাধা থাকলেও সেগুলো নিরসনের চেষ্টা চলছে।" জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে আলাপকালেও তিনি শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইসলামাবাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপের পরিকল্পনাকে 'যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন' বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হলেও আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ-চলাচলের নিশ্চয়তা চায়। অন্যদিকে, ইরান চাইছে আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি, ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য গ্যারান্টি। তেহরানের দাবি, কোনো ছাড় দেওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে আগে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য ইরান আবারও ইসলামাবাদকে পছন্দ করছে। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং পাকিস্তানের ওপর আস্থার কারণে তারা এখানেই ফিরতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র লজিস্টিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে বিকল্প কোনো দেশের কথা ভাবছে। কূটনীতিকদের মতে, মূল ইস্যুগুলোতে একমত হতে পারলে ভেন্যু নিয়ে এই মতবিরোধ বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীন, ব্রিটেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই সংলাপকে 'ভঙ্গুর' হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শান্তি প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীরা ২২ এপ্রিলের সময়সীমার আগে একটি 'টেকনিক্যাল উইন্ডো' তৈরির চেষ্টা করছেন, যাতে অন্তত ৪৫ দিনের অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় দফার রাজনৈতিক আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন নৌ-অবরোধকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর ও ‘অবৈধ যুদ্ধনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বাঘাই প্রশ্ন তোলেন, একটি ‘অবৈধ ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’ কি বৈশ্বিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত দিয়ে জয় করা সম্ভব? তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। তার এই মন্তব্য আসে এমন সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জাহাজগুলোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানি কোনো জাহাজ মার্কিন অবরোধের আওতাধীন এলাকায় কাছাকাছি এলে তা ‘তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হবে’। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইতোমধ্যে ইরানের বহু নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সমুদ্রপথে অবৈধ কার্যক্রম দমনে যে কৌশল ব্যবহার করা হয়, ইরানের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, পাল্টাপাল্টি এমন কড়া অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরি। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, USS Abraham Lincoln গত শনিবার ইরান উপকূল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) দূরে অবস্থান করছিল। BBC Verify-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধজাহাজের সবচেয়ে কাছের অবস্থান। উপগ্রহচিত্রে রণতরিটিকে ওমান উপসাগরের পূর্ব প্রান্তে দেখা গেছে, যা ইরানি উপকূল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। এ ছাড়া একই ছবিতে আরও দুটি যুদ্ধজাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর আকার ও কাঠামো মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলোও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্ট্রাইক গ্রুপের অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সামরিক অবস্থান কৌশলগত চাপ বাড়ানোর অংশ হতে পারে এবং এটি অঞ্চলে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো ধরনের আলোচনায় বসবে না তেহরান। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে এই কড়া শর্তের কথা জানিয়েছেন। শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে ইরানি প্রতিনিধিরা সেখানে পৌঁছেছেন এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি দল রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে স্পিকার ঘালিবাফের এই নতুন বার্তায় নির্ধারিত এই বৈঠক এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ঘালিবাফ স্পষ্ট করে বলেছেন, "আলোচনা শুরুর আগেই এই দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে।" এদিকে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ ও ট্যাংকার থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। শুক্রবার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন জানিয়েছে, এখন থেকে এই পথে যাতায়াতের টোল কেবল ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’-এ পরিশোধ করতে হবে। এর আগে এই টোল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনা মুদ্রা ইউয়ানে নেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও তেহরান এখন নিজস্ব মুদ্রাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। ভারতের মুম্বাইস্থ ইরানি কনস্যুলেট জেনারেলও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্র: আলজাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে ইরান। দেশটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী নীতি’ বন্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলা থামলেই কেবল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আবার খুলে দেওয়া হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ এক সাক্ষাৎকারে জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে তিনি কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, একদিকে চাপ প্রয়োগ করা আর অন্যদিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি প্রত্যাশা—দুটি একসঙ্গে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে ওয়াশিংটনকে ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। খতিবজাদেহ আরও বলেন, ইরান আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করবে। তবে সেটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে তাদের নীতি পরিবর্তন করে কিনা তার ওপর। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং হরমুজ প্রণালি এ ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধবিরতির মাত্র একদিন পরই ইরানকে ঘিরে নতুন করে কড়া বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইরানের আশেপাশে বজায় থাকবে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দেওয়া ওই বার্তায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, বিমান এবং সামরিক সদস্যদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানকে মোকাবিলা করতে এবং প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে এই প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যদি কোনো কারণে চুক্তি সম্পন্ন না হয়—যদিও তিনি সেটিকে খুব কম সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছেন—তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ দিকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অতীতের তুলনায় বড় ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করা এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এদিকে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখন প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষা করছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে টোল বা শুল্ক আরোপের বিষয়টি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া উচিত, ইরানের নয়। বাংলাদেশ সময় সোমবার মধ্যরাতে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমরাই কেন টোল নেব না? আমি বরং সেটাই করতে চাই, তাদের নিতে দেওয়ার চেয়ে।” তাঁর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। এই প্রণালিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে। সম্প্রতি তেহরান প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজের ওপর নতুন টোল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ইরান এটিকে তাদের সার্বভৌম অধিকারের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তবে ট্রাম্পের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধির কারণে এই নৌপথে শুল্ক আরোপের অধিকার তাদেরই থাকা উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো পক্ষের টোল আরোপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি চাইলে ইরানের বিশাল তেলের ভাণ্ডার এবং দেশটির প্রধান তেল হাব ‘খারগ দ্বীপ’ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের তেল দখল করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্যতম বিকল্প। ট্রাম্পের মতে, দ্বীপটি দখল করা হবে অত্যন্ত সহজ কারণ সেখানে তেমন কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে, এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানে ইতিবাচকভাবে ‘সরকার পরিবর্তন’ বা রেজিম চেঞ্জ সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষায়, আগের সরকারের শীর্ষ নেতারা প্রায় সবাই মারা গেছেন এবং এখন যারা পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন তারা বেশ যুক্তিসঙ্গত আচরণ করছেন। গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকেও তিনি একই সুরে বলেছিলেন যে, আগের নেতাদের হঠানোর মাধ্যমেই সরকার বদল হয়ে গেছে এবং ইরান এখন আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে আসতে পারে। তবে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আরও সাড়ে তিন হাজার মার্কিন সেনা পৌঁছেছে। খারগ দ্বীপ দখলের হুমকিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং প্রধান তেল টার্মিনাল। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপটি হাতছাড়া হলে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এদিকে কুয়েতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় একজন ভারতীয় কর্মী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের ড্রোন যুদ্ধ কৌশল প্রয়োগ করছে ইরান—এমনটাই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ফাইবার অপটিক তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এফপিভি (FPV) ড্রোনের ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, জ্যামিং-প্রতিরোধী ড্রোন বাগদাদে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটির ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। এসব হামলায় একটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ও একটি আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফাইবার অপটিক নিয়ন্ত্রিত এসব ড্রোন ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে থামানো যায় না, যা প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকাংশে অকার্যকর করে দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছেন। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে স্থল ও নৌ অভিযান চালানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাহিনীকে এমন এক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হতে পারে, যেখানে ড্রোনই প্রধান হুমকি—যা ইরাক বা আফগানিস্তানের পূর্ববর্তী যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন। ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কফম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো এফপিভি ড্রোন প্রযুক্তি ও এর সামরিক প্রভাব পুরোপুরি অনুধাবনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার মার্শাল মার্টিন স্যাম্পসনের মতে, পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী এ ধরনের ড্রোন হামলার ক্ষেত্রে ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোন প্রযুক্তি উন্নত করতে মস্কো যেমন কাজ করছে, তেমনি সেই অভিজ্ঞতা তেহরানও গ্রহণ করছে। ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রি জাগোরোদনিয়ুক বলেন, দুই দেশের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। এদিকে, যুদ্ধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠেছে এফপিভি ড্রোন। অনেক ক্ষেত্রে ২০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ড্রোন নিয়ন্ত্রিত ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে। তবে পেন্টাগন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনো এই নতুন ধরনের যুদ্ধ বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তজনা ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারির মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার মুখে এই স্থগিতাদেশ আসার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। ট্রাম্পের এই নির্দেশের পর ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—উভয় ধরনের তেলের দামই ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর আগে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, তাদের কোনো জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে তারা আরব দেশগুলোর বড় তেল ও গ্যাস ফিল্ডগুলো উড়িয়ে দেবে। এই উত্তেজনায় বিশ্ব জ্বালানি বাজার টালমাটাল হয়ে পড়ে এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আল জাজিরার তথ্যমতে, জিএমটি ১১:০৮ নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ১৫ শতাংশ কমে ৯৬ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ১৩.৫ শতাংশ কমে ৮৫.২৮ ডলারে অবস্থান করছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, হামলার ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ আসায় তা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই সংকট পুরোপুরি না মেটা পর্যন্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আসবে কি না, তা নিয়ে এখনও সংশয় কাটেনি।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা শুরু করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যেই তাদের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে তেহরানের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং এই বিষয়ে আলোচনার জন্য ইরানের দরজা সবসময় খোলা। আরাগচি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোন কোন জাহাজ যাতায়াত করবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইরানের সামরিক বাহিনী। সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে বিশেষ নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, গত শনিবার ভারতে গমনাগমনকারী দুটি তেলের ট্যাংকার এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি নিরাপদে অতিক্রম করেছে। তবে কৌশলগত কারণে তিনি যোগাযোগকারী অন্যান্য দেশগুলোর নাম প্রকাশ করেননি। চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে না। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদী আত্মরক্ষার জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আন্তর্জাতিক শক্তির সহযোগিতা চাইছেন, অন্যদিকে ইরান সরাসরি দেশগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে দেশটি "প্রচুর অর্থ উপার্জন" করে। তবে এই আর্থিক লাভের চেয়েও বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকেই নিজের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন তিনি। মেরিল্যান্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প সরাসরি ইরানকে "শয়তান সাম্রাজ্য" হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক শক্তিতে সমৃদ্ধ হতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই তার প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। আর্থিক মুনাফার চেয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাম্প্রতিক কঠোর বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের এমন কড়া বার্তা ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ট্রাম্পের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা এবং ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি সামরিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ইরানিদের রক্তের বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট করেন যে, শহীদদের প্রতিদান দিতে ইরান কোনো দ্বিধা করবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ৮ মার্চ তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাটি উল্লেখ করেন। ওই হামলায় ১১০ জন শিশুসহ মোট ১৬৮ জন নিহত হয়েছে বলে তিনি জানান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে এবং তাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘটনাটি তদন্তাধীন বলে জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এই ভাষণে নতুন নেতা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনীকে অবিলম্বে সব ঘাঁটি বন্ধ করার আলটিমেটাম দিয়েছেন, অন্যথায় সেগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছেন। আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেছেন মোজতবা খামেনি। তিনি জানান, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাসী এবং তাদের লক্ষ্য কেবল মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো। যতদিন ইরানের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে, ততদিন এই প্রতিরোধ ও হামলা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের ভবিষ্যতের স্বার্থে সর্বোচ্চ নেতার পদের গুরুত্ব বজায় রাখার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করা হবে। যুদ্ধের দশম দিনে এসে ইরানের পক্ষ থেকে এমন কঠোর অবস্থান প্রকাশ করা হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের বৈদেশিক নীতি উপদেষ্টা কামাল খারাজি সোমবার তেহরানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নেই। তার মতে, এই সংঘাত এখন কেবল ‘অর্থনৈতিক আঘাতের’ মাধ্যমেই শেষ হতে পারে। খারাজি বলেন, যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংঘাত থামাতে বাধ্য করতে পারে। তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় আরব দেশ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে সংঘাত দ্রুত বন্ধ করা যায়। খারাজির ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে বিভিন্ন দেশে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে এবং তখন অন্য দেশগুলোর হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠবে। এদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারেও। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় আহত এক মার্কিন সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ সময় সোমবার রাতে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। সেন্ট্রাল কমান্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি বাহিনীর হামলার সময় গুরুতর আহত হওয়া ওই সেনাসদস্য রোববার রাতে মারা যান। গত ১ মার্চ সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার সময় তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চলমান সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে এ নিয়ে মোট সাতজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, নিহত সেনাসদস্যের পরিবারের সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর ২৪ ঘণ্টা পর তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সূত্র: আল জাজিরা
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গ্যাসের দাম গত ছয় দিনে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, বর্তমানে তার অগ্রাধিকার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির বাজার দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তাই সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন নেই। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র–এর লুইজিয়ানা ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে জরুরি তেলের বড় মজুত রয়েছে। তবে আপাতত এই মজুত ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেই। ট্রাম্পের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। এর আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–এর মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ২১ দিন আলোচনা চলে, যা ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। পরবর্তীতে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী, যার নাম দেওয়া হয় অপারেশন এপিক ফিউরি। একই সময়ে ইসরায়েল অপারেশন রোরিং লায়ন নামে অভিযান শুরু করে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং রয়টার্স তথ্য প্রকাশ করেছে।
ইরানকে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান–এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না দেশটি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ইরানের জন্য এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাদের তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন। তার মতে, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ইরানের পুনর্গঠনে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে, যাতে দেশটি আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে। এর আগে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্য অঞ্চলটির উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews