মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ এগিয়ে নিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে পাকিস্তান। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরব সফর শেষে কাতারে পৌঁছেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছালে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল-মুরাইখির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। পরে কাতারের সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সফরকালে কাতারের আমিরের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন শাহবাজ শরিফ। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংলাপের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, এটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর তিন ধাপের আঞ্চলিক সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য। এর আগে তিনি সৌদি আরব সফর করেন এবং সফরের শেষ ধাপে তুরস্কে যাওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সৌদি আরব সফরকালে জেদ্দায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতা নিয়ে আলোচনা করেছেন শাহবাজ শরিফ। ইসলামাবাদ এই সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় বলে জানানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি টেকসই করা এবং পরবর্তী দফার আলোচনার পথ সুগম করতে পাকিস্তান একযোগে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। কাতার সফর সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই অংশ।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে তিন দিনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর শেষ করে কাতার ত্যাগ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। আজ দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল আজিজ আল-খুলাইফি। এরপরই তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে বিমান যোগে রওয়ানা হন। এই ত্রিদেশীয় সফরে স্টারমার অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা করেন। গত বুধবার জেদ্দায় সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে তার ফলপ্রসূ বৈঠক হয়। এরপর বৃহস্পতিবার তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং সর্বশেষ কাতার সফর করেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে ব্রিটেনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পারস্য উপসাগরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের 'অবৈধ কর্মকাণ্ড' ও হামলার কারণে সৃষ্ট ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য তেহরানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে কাতার। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে কাতার এই দাবি জানায়। কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ চলাকালীন কাতারের ভূখণ্ডে ইরানের চালানো হামলায় যে পরিমাণ জানমালের ক্ষতি হয়েছে, তার দায় ইরানকে নিতে হবে। চিঠিতে কাতার স্পষ্ট করে বলেছে, "ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের এই বেআইনি পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার আওতায় পড়ে। কাতার রাষ্ট্রের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ইরান তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।" বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ কাতার এই হামলার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। কাতার-এনার্জি (QatarEnergy)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের হামলায় কাতারের এলএনজি (LNG) রপ্তানি ক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বার্ষিক রাজস্ব আয়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে দেশটি, যা ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা জাগিয়েছে। জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে কাতার আরও জোর দিয়ে বলেছে যে, ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো ছিল সম্পূর্ণ 'বেসামরিক'। এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। দোহা নিরাপত্তা পরিষদকে তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং এ ধরনের 'গুরুতর লঙ্ঘন' বন্ধে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। উল্লেখ্য, তেহরানের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই তারা এসব হামলা চালিয়েছে। শুধু কাতার নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলোও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে কাতারে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় একটি তেল ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে একটি লক্ষ্যভেদ করে ট্যাঙ্কারটিতে আঘাত হানে। মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে দুটি সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। তবে তৃতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি কাতারএনার্জি-এর ইজারা নেওয়া একটি তেলবাহী জাহাজে আঘাত করে। হামলার পর ট্যাঙ্কারটির ২১ জন ক্রু সদস্যকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায়, জাহাজটির বাম পাশে আঘাত লাগে। তবে জাহাজে থাকা সকল নাবিক নিরাপদে আছেন। সংস্থাটি আরও জানায়, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবেশগত ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ কোনো একক দেশের সিদ্ধান্তে নয়, বরং এই অঞ্চলের সকল দেশের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজ এক সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা বজায় রাখা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। কাতার মনে করে, এই জলপথের নিরাপত্তা এবং এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি রক্ষায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে দোহা।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে কাতারের দোহায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের কনস্যুলার সেবা সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে। সেই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সম্ভাব্য যেকোনো হামলার বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দূতাবাসের এক জরুরি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে সীমিত সংখ্যক জরুরি কর্মীদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মার্কিন নাগরিকদের সর্বদা সতর্ক থাকতে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো সতর্কবার্তা পাওয়া মাত্রই নিরাপদ স্থানে গিয়ে 'মাথা নিচু করে আত্মরক্ষা' বা 'ডাক অ্যান্ড কাভার' পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মূলত নিরাপত্তার স্বার্থেই এই আগাম পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন ও মিসাইল হামলার হুমকির মধ্যে কাতার ও ইউক্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এক ঝটিকা সফরে বের হন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর কাতারের সঙ্গে এই চুক্তি তার সফরের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। ইউক্রেনের পক্ষে চুক্তিতে সই করেছেন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আন্দ্রি নাটোভ এবং কাতারের পক্ষে সই করেছেন কাতার সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জসিম বিন মোহাম্মদ আল-মান্নাই। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ কেবল প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়, বরং প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক বিনিয়োগের পথও প্রসারিত করবে। বিশেষ করে, গত এক মাসে ইরানের সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব ড্রোন ও মিসাইল প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করতে আগ্রহী ইউক্রেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য এমন মিত্র প্রয়োজন, যাদের আর্থিক সক্ষমতা এবং সামরিক রসদ সরবরাহের সামর্থ্য বেশি। বর্তমান সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে বেশি, তখন কাতার ও সৌদি আরবের সমর্থন কিয়েভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) দেশগুলোর অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এই কড়া হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে আল থানি বলেন, "যেখানে অঞ্চলের ভবিষ্যৎ মানচিত্র আঁকা হচ্ছে, সেখানে জিসিসি রাষ্ট্রগুলোর অনুপস্থিত থাকার কোনো সুযোগ নেই।" তিনি স্পষ্ট করেন যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, এই প্রণালীটি কোনো পক্ষই রাজনৈতিক দর কষাকষি বা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। এটি যেকোনো পরিস্থিতিতে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত রাখতে হবে। আল থানি সতর্ক করে বলেন, "হরমুজ প্রণালীর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যেকোনো চেষ্টা বা একে জিম্মি করার প্রচেষ্টা কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক সরাসরি হুমকি।"
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই কাতারের জলসীমায় দেশটির সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। নিয়মিত মিশন পরিচালনার সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে গালফ নিউজ। দুর্ঘটনার পরপরই হেলিকপ্টারের ক্রু ও যাত্রীদের উদ্ধারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলগুলো বর্তমানে নির্ধারিত জলসীমায় নিবিড় তল্লাশি চালাচ্ছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় বজায় রেখে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে হেলিকপ্টারটিতে ঠিক কতজন আরোহী ছিলেন, সে বিষয়ে কাতার সরকার এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই দুর্ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রতি ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত জোরালো হলে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালায় ইরান। যদিও অধিকাংশ হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, তবুও এই সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেই কারিগরি ত্রুটির কারণে কাতার সেনাবাহিনীর এই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর সামনে এলো।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, কাতারের রাস লাফান জ্বালানি কমপ্লেক্সে হামলায় দেশটির সামরিক সামর্থ্যের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ভবিষ্যতে যদি ইরানি স্থাপনার ওপর পুনরায় হামলা হয়, সংযম আর বজায় রাখা হবে না। আরাঘচি সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ প্রকাশিত পোস্টে বলেন, ‘সংযত থাকার একমাত্র কারণ ছিল আন্তর্জাতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান ও অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখানো।’ তিনি আরও যোগ করেন, যুদ্ধের ইতি টানতে হলে ইরানের বেসামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও সমাধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মাঝেও ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করছে। আরাঘচির হুঁশিয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বর্তমান সংঘাত ‘ভয়াবহ উত্তেজনা’ তৈরি করেছে, তবে যুদ্ধের সূচনা করেছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার দোহার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেন। আল থানি বলেন, ইরান প্রতিশোধ নিতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছে। তবে শত্রুতা অবিলম্বে বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা ছাড়া বিকল্প নেই। সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদানও ইরানের হামলাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলই যুদ্ধের সূচনাকারী। তবে ইরানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে যাতে আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি না পায়। উল্লেখ্য, সংবাদ সম্মেলনের ঠিক আগে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার সতর্ক সংকেত হিসাবে সাইরেন বাজে ওঠে। তবুও পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনটি সম্পন্ন হয়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের হামলার পর দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় পৌনে ৭টার দিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাস লাফফান শিল্পাঞ্চলে সৃষ্ট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি সেবা সংস্থার কর্মীরা কাজ করছেন। তারা আরও জানায়, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে কাতার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, লাস রাফফান এলাকার গ্যাস স্থাপনায় হামলার ফলে যে আগুন লেগেছিল, তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে কয়েক ঘণ্টা পর নতুন করে শিল্পাঞ্চলে আগুনের ঘটনা ঘটে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা
ইরান সীমা লঙ্ঘন করেছে উল্লেখ করে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে কাতার। রাস লাফান গ্যাস স্থাপনায় ইরানের হামলার পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিক, অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলার মাধ্যমে ইরান সব সীমা অতিক্রম করেছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই অযৌক্তিক হামলার সম্ভাব্য পরিণতি থেকে অঞ্চলকে রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। সূত্র: আল জাজিরা
কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় পুনরায় হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান যদি ‘অযৌক্তিকভাবে একটি নিরীহ দেশ কাতার-এ হামলা করার সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে ইসরাইল সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আর কোনো আক্রমণ চালাবে না। নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, আবার হামলা হলে—ইসরাইলের সহায়তা থাকুক বা না থাকুক—সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রকে এত শক্তিশালী বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হবে, যা ইরান আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। তিনি আরও বলেন, ইরানের ভবিষ্যতের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা বিবেচনা করে তিনি এমন মাত্রার সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ অনুমোদন দিতে চান না। তবে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনায় আবার হামলা হলে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবেন না। এছাড়া তিনি দাবি করেন, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলের আগের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা কাতার কেউই আগে থেকে কিছু জানত না। তার মতে, ইরান কাতারে হামলার সিদ্ধান্ত না নিলে ওই গ্যাসক্ষেত্রে আর কোনো হামলা হবে না। সূত্র: আল জাজিরা
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে, যেখানে জ্বালানি স্থাপনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরান কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে, গত ১৮ মার্চ ইরানের বুশেহর অঞ্চলের উপকূলবর্তী আসালুয়েহ এলাকায় অবস্থিত সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র এবং উত্তরাঞ্চলের বন্দর আনজালিতে নৌবাহিনীর একটি স্থাপনায় হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়, যেখানে ইরান ও কাতার যৌথভাবে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই হামলার পর তেহরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে কাতার সতর্ক করে জানায়, জ্বালানি খাতে আঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কিছু তেল ও গ্যাস স্থাপনার আশপাশে অবস্থানরত মানুষদের এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানায়। এরপর রাতেই বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কাতারের রাস লাফফান শিল্পাঞ্চল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির হাবশান গ্যাসক্ষেত্র ও বাব তেলক্ষেত্র এবং সৌদি আরবের দুটি তেল শোধনাগারের কথা বলা হয়েছে। কাতার জানায়, হামলার ফলে রাস লাফফান এলাকায় আগুন লাগে এবং কিছু অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়, যদিও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের একটি গ্যাসক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, ইরান মূলত মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্য করলেও বাস্তবে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ঘটনার সময় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিভিন্ন আরব ও ইসলামিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে ছিলেন, যেখানে চলমান সংকট ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। হামলার পর কাতার এটিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে এবং দেশে অবস্থানরত ইরানি সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থির পরিস্থিতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে এবার ঈদুল ফিতরের নামাজ উন্মুক্ত ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে না। জননিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ইবাদতের জন্য শুধুমাত্র মসজিদের ভেতরেই নামাজ আদায় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ইসলামি বিষয়াবলি, ওয়াক্ফ ও জাকাত’ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়ে কোনো উন্মুক্ত স্থানে ঈদের নামাজের আয়োজন হবে না। মুসল্লিদের নিজ নিজ এলাকার মসজিদে নামাজ আদায়ের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং বাড়তি ভিড় সামলানোর জন্য সব মসজিদ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে কাতার সরকারও। কাতারের ওয়াক্ফ ও ইসলাম ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১ মার্চ থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো উপমহাসাগরীয় অঞ্চল অস্থির হয়ে উঠেছে। তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাতার ও সংলগ্ন অঞ্চলে জানমালের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশ দুটি বড় জমায়েত এড়িয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। বুধবার ইরানের গ্যাস অবকাঠামোতে হামলা চালায় ইসরায়েল। এই হামলার জবাবে ইরান হুঁশিয়ারি দেয় যে তারা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাবে। একই সঙ্গে, ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঘণ্টার মধ্যে কাতারের রাস লাফফান প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনায় ইরান হামলা চালায়। হামলার কারণে স্থাপনাটিতে আগুন জ্বলে ওঠে। তবে আগে থেকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কারণে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। হামলার এক ঘণ্টার মধ্যে কাতার সরকারও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে নিরাপত্তার জন্য সাবধান থাকার আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই উত্তেজনা প্রান্তিক প্রভাব ফেলতে পারে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে।
ইরান বুধবার (১৮ মার্চ) সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার হুমকি দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশিত সতর্কবার্তায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থানরত নাগরিক, বাসিন্দা ও কর্মীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খবরটি দিয়েছে রয়টার্স। সতর্কবার্তায় সৌদি আরবের সামরেফ রিফাইনারি ও জুবাইল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল হোসন গ্যাস ফিল্ড এবং কাতারের মেসাইদ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স, মেসাইদ হোল্ডিং কোম্পানি ও রাস লাফান রিফাইনারিকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই কেন্দ্রগুলো এখন সরাসরি ও বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হামলা চালানো হতে পারে। তাই সকলকে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।” ইরানের এই সতর্কতা আসে দেশটির দক্ষিণ পার্স এবং আসালুয়েহ অঞ্চলের তেল স্থাপনায় হামলার পরপরই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হতে পারে, এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরনের হুঁশিয়ারি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির সংকেত বহন করছে। ফলে তেল ও গ্যাস শিল্পের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনার মুখে। এমন নাজুক সময়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জরুরি ফোনালাপ করেছেন সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সৌদ। তিনি কাতারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ খলিফা বিন হামাদ আল থানি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ সাইফ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলার ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা হুমকি মোকাবেলায় তারা ঐক্যবদ্ধ। বিশেষ করে কাতারের নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৌদি আরব সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাব প্রশমিত করতে এবং নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে বড় শক্তিগুলো এখন একজোট হয়ে কাজ করছে।
ইরান হামলা বন্ধ না করলে কূটনৈতিক আলোচনার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এই অবস্থান তুলে ধরা হয়। ব্রিফিংয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, হামলা চলতে থাকলে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তারা যদি হামলা বন্ধ করে, তাহলে আমরা কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে পেতে পারি। কিন্তু যতক্ষণ আমাদের দেশগুলো হামলার শিকার হচ্ছে, ততক্ষণ কমিটি গঠনের সময় নয়। আল-আনসারি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশগুলোর নিরাপত্তা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি এবং অবিলম্বে হামলা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি যে কমিটির কথা উল্লেখ করেন, সেটি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রস্তাব করেছিলেন। প্রস্তাবিত ওই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোতে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার অভিযোগ তদন্ত করা। যদিও ইরান এসব হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে কাতার সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আল-আনসারি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হুমকি ও হামলা বন্ধ হয়নি। তিনি জানান, সম্প্রতি একটি ক্ষেপণাস্ত্র দোহার একটি আবাসিক এলাকার দিকে ছোড়া হয়েছিল, যা প্রতিহত করা হয়েছে। ওই সময় সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে কিছু এলাকায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কাতারের কর্মকর্তারা জানান, সরিয়ে নেওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ও ছিল। এর মধ্যে রয়েছে Google, American Express এবং Microsoft। আল-আনসারি বলেন, কাতার পরিস্থিতি শান্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা চলছে বলে তিনি জানেন না।
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ার মধ্যে লেবাননে ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে। সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মিত্রদেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এর জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। একই সময়ে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ শুরু করলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হামলা চালায়। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। শুক্রবার এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। তারা এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে উল্লেখ করে। বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ইসরাইলকে যেন লেবাননের ওপর ধারাবাহিক হামলা বন্ধ করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। কাতার আরও জানায়, লেবাননের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি তাদের সমর্থন অটুট থাকবে। একই সঙ্গে দেশটির স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নেওয়া সব উদ্যোগকে তারা সমর্থন জানায়। এদিকে গত সোমবার থেকে লেবাননে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৬৮৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে ৯৮ জন শিশু রয়েছে। পাশাপাশি এসব হামলার ফলে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews