হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা ঘনীভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরান প্রসঙ্গে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার (১৮ এপ্রিল) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে প্রশ্নকারীকে কার্যত বেরিয়ে যেতে বলেন। সিবিএস নিউজের সাংবাদিক অলিভিয়া রিনাল্ডি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর এক মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে জানতে চান, ইরানি গানবোট দুটি জাহাজে গুলি চালানোর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী। প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প দৃশ্যত বিরক্ত হয়ে বলেন, “আউট। সবাইকে ধন্যবাদ।” এরপরই ব্রিফিং কার্যত শেষ হয়ে যায়। উপস্থিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রেসিডেন্টকে স্পষ্টতই রাগান্বিত দেখাচ্ছিল। এর আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ সামরিক সূত্রের দাবি, ইরানের দুটি গানবোট একটি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে এ ধরনের ঘটনার খবর নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিতিশীলতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি’ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় গত ৯ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে এই চুক্তির ঘোষণা আসে, যা মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতিরই একটি অংশ। ২০১৩ সালের ‘টিকফা’ চুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই নতুন চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যকার ৬.১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। চুক্তির উল্লেখযোগ্য দিক হলো শুল্কায়ন প্রক্রিয়া। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনবে এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তা শূন্য শতাংশ হবে। তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ মেকানিজম রাখা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহারের ভিত্তিতে শূন্য শুল্কে পোশাক রপ্তানির সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। বিনিময়ে বাংলাদেশকেও মার্কিন কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধা অপসারণের কঠিন শর্ত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন মানসম্পন্ন মোটরযান, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত পরীক্ষা ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। চুক্তিতে কেবল বাণিজ্য নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকারের মতো বিষয়গুলোও যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল কর না বসানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ কিছু দেশ থেকে পারমাণবিক সরঞ্জাম কেনা এবং সংবেদনশীল প্রযুক্তি সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতার শর্ত রয়েছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনা এবং আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। চুক্তিতে শ্রম অধিকার ও পরিবেশ রক্ষায় আইএলও মানদণ্ড অনুসরণ এবং ট্রেড ইউনিয়ন আইন সংশোধনের কঠোর বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য কিছু সুযোগ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো বেশ প্রভাবশালী। শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। আজ প্রকাশ করা হলো এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির প্রথম পর্বের অনুবাদ।
নিউ জার্সির ইলিভেন্থ ডিস্ট্রিক্ট কংগ্রেসনাল আসনের উপনির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন উদারপন্থী ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যানালিলিয়া মেহিয়া। রিপাবলিকান প্রার্থী জো হ্যাথাওয়েকে পরাজিত করে তিনি এই জয় ছিনিয়ে নেন। নিউ জার্সির বর্তমান গভর্নর মিকি শেরিল নিয়ম অনুযায়ী কংগ্রেস সদস্যের পদ ত্যাগ করার পর এই আসনটি শূন্য হয়েছিল। ভোট শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস মেহিয়াকে বিজয়ী ঘোষণা করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রাইমারি নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই মেহিয়া এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের ওপর একটি ‘পরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি রিপাবলিকানদের নীতির সমালোচনা করে স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানি খাতে সাধারণ মানুষের কর সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। মেহিয়ার এই লড়াইয়ে তাঁর পাশে ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিক ও স্বতন্ত্র সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয় মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সফলতাকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে নিউ জার্সির ইলিভেন্থ ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হলো।
বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ লিও। তিনি বলেছেন, মুষ্টিমেয় স্বৈরশাসকের কারণে বিশ্ব ধ্বংসের মুখে পড়ছে। ক্যামেরুনে দেওয়া এক বক্তব্যে পোপ লিও বলেন, মানবিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও পুনর্গঠনের পরিবর্তে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে যুদ্ধ ও অস্ত্রায়নে, যা মানবতার জন্য গভীর হুমকি। তার এই মন্তব্য আসে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সমালোচনার জবাবে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প পোপকে লক্ষ্য করে একাধিক মন্তব্য করেন এবং তাকে ‘পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থ’ বলে অভিহিত করেন। পোপ লিও আরও বলেন, যুদ্ধের পক্ষে ধর্মকে ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যারা ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে সামরিক বা রাজনৈতিক স্বার্থকে বৈধতা দিতে চায়, তারা পবিত্রতাকে অপবিত্র করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি এক উল্টে যাওয়া বিশ্ব, যেখানে ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে”—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে আফ্রিকা সফরের অংশ হিসেবে ইয়াউন্দে সফর করেন পোপ লিও। সেখানে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট পল বিয়া-কে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে ধনী ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। পরবর্তীতে তিনি বানমেন্ডা সফর করেন, যেখানে ২০১৭ সাল থেকে চলমান বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাতে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে উদ্ভূত এই সংকটে ইংরেজিভাষী অঞ্চলগুলোর স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে ফরাসিভাষী কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘর্ষ চলমান রয়েছে। পোপের সফর উপলক্ষে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তিন দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। তবে শান্তি আলোচনায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলেও পোপ লিও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সংঘাত এখনো ধর্মীয় যুদ্ধে রূপ নেয়নি এবং খ্রিষ্টান ও মুসলিম নেতাদের যৌথ উদ্যোগে শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব। সূত্র: আল জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে সিরিয়া থেকে নিজেদের সর্বশেষ সেনাসদস্যদের প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল ২০২৬) হাসাকাহ অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘কাসরাক’ সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন বাহিনী সরে যাওয়ার মাধ্যমে দেশটিতে দীর্ঘ এক দশকের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটল। ২০১৫ সাল থেকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মার্কিন সেনারা সিরিয়ায় অবস্থান করছিল। সিরীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সেনারা ঘাঁটিটি ত্যাগ করার পরপরই সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ৬০তম ডিভিশন সেখানে প্রবেশ করে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের সম্ভাব্য হামলা এড়াতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মার্কিন সেনা ও সরঞ্জামগুলো জর্ডান সীমান্ত দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঘাঁটিটি সিরীয় সরকারি বাহিনী ও সিরীয় ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) অধীনে রয়েছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে একে এসডিএফ-কে জাতীয় কাঠামোর সাথে একীভূত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মূলত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে বাশার আল-আসাদকে পরাজিত করে ক্ষমতায় বসা আহমেদ আল-শারা সরকারের সাথে এসডিএফ-এর চুক্তির ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। নতুন এই সরকারকে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই সমর্থন দিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের সাথে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই সেনা প্রত্যাহার বড় ভূমিকা রাখবে। ইরানের সাথে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননে ইসরায়েলের সাথে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার মধ্যেই মার্কিন সেনারা সিরিয়া ত্যাগ করল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ বন্ধের’ নীতির অংশ হিসেবে এর আগে আল-তানফ এবং আল-শাদাদি ঘাঁটি থেকেও সেনা সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন থেকে সিরিয়া রাষ্ট্র নিজেই তার ভূখণ্ডে সন্ত্রাসবাদ দমনের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে বলে দামেস্ক সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে এক ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই পথটি পুনরায় খুলে দিতে মাইন অপসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আধুনিক প্রযুক্তির এসব মাইনের সঠিক অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় পুরো অভিযানটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বড় যুদ্ধজাহাজগুলো ধ্বংস হলেও তেহরান ছোট নৌযানের সাহায্যে হরমুজের বিভিন্ন অংশে মাইন পেতে রেখেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, ইরানের হাতে এখনো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ছোট মাইনবাহী নৌকা অক্ষত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মূলত ‘মাহাম-৩’ এবং ‘মাহাম-৭’ নামের দুই ধরনের আধুনিক মাইন ব্যবহার করেছে। এই মাইনগুলো জাহাজের সংস্পর্শে না এসেও কেবল চৌম্বকীয় বা শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। এমনকি ইরান নিজেও এখন সব মাইনের সঠিক অবস্থান শনাক্ত বা অপসারণ করতে সক্ষম নয় বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই মাইন অপসারণে ‘নাইফফিশ’ এবং ‘আচারফিশ’-এর মতো চালকবিহীন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। তবে এই মাইন পরিষ্কারকারী যানগুলো সহজেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমুদ্রপথ বন্ধ করা নিষিদ্ধ হলেও, দুই দেশের কেউই ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে স্বাক্ষর করেনি। ফলে এই আইনি জটিলতা ও যুদ্ধের রেশ কাটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দ্য গার্ডিয়ানের সূত্রমতে, দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় থাকায় ইরান মাইন পোঁতার বিস্তারিত মানচিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। এই মাইন আতঙ্ক বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
প্রায় আট সপ্তাহের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হওয়ার পর, আগামী ১৬ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, উভয় পক্ষের আলোচক দল পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রথম দফার বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ নেতৃত্ব দেন। সেখানে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিপূর্বে নিজেকে জয়ী দাবি করেছিলেন, তবুও রণাঙ্গনের চেয়ে কূটনীতিকেই এখন প্রাধান্য দিচ্ছে সব পক্ষ। তবে ইসরায়েলের অতীত ইতিহাস এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েই গেছে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে ফোনালাপে বর্তমান পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন। সৌদি আরব এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের স্থায়ী অবসানে এই সংলাপ-প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাসী এখন ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এই আলোচনা সফল হলে কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়াসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত হতে পারে। সংঘাতের পুনরায় বিস্তৃতি রোধে ইসরায়েলের সদিচ্ছাই এখন বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ঐতিহাসিক চুক্তির ‘খুবই কাছাকাছি’ অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরসহ প্রায় সব শর্তে রাজি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল ২০২৬) হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। ট্রাম্প জানান, আগে যেসব বিষয়ে ইরান অনড় অবস্থানে ছিল, এখন তারা সেসব দাবি মানতে রাজি হয়েছে। যদি এই চুক্তি চূড়ান্ত হয় এবং তা পাকিস্তানের ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত হয়, তবে তিনি পাকিস্তান সফরে যেতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই সপ্তাহান্তেই দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে পরবর্তী বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হবে। তবে নতুন চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এই মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি না হয়, তবে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হবে। প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ বাহিনীর অবরোধ অত্যন্ত কার্যকরভাবে বজায় রয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক চাপ ও অবরোধের কারণেই ইরান আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা
ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের আশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল ২০২৬) এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১ শতাংশেরও বেশি কমে প্রতি ব্যারেল ৯৮.০৫ ডলারে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেল প্রতি ৯৪ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে সম্প্রতি সংঘাত থামার ইঙ্গিত মেলায় তেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং চলতি পুরো সপ্তাহজুড়েই দাম ৯০ ডলারের ঘরে অবস্থান করছে। এদিকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। মূলত এই ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আভাসই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমাতে প্রধান ভূমিকা রাখছে।
ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প -এর সামরিক তৎপরতা সীমিত করার প্রস্তাব মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। ফলে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে কংগ্রেসে বিভক্ত মতামত আবারও স্পষ্ট হলো। বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধ ক্ষমতাবিষয়ক বিলটি ২১৩-২১৪ ভোটে নাকচ হয়। বিলটির লক্ষ্য ছিল, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানো রোধ করা। এর আগে একদিন আগে ইউনাইটেড স্টেটস সিনেটে একই ধরনের একটি প্রস্তাব খারিজ হয়। ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থিত সেই উদ্যোগ সিনেটে টানা চতুর্থবার ব্যর্থ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের এই ভোট প্রতীকী গুরুত্ব বহন করলেও এটি দেখিয়েছে, ইরান প্রশ্নে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে মতভেদ এখনও গভীর। গত মাসের শুরুতে প্রতিনিধি পরিষদে একই ধরনের একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছিল। তখন ভোটের ফল ছিল ২১২-২১৯। সর্বশেষ ভোটে কয়েকজন সদস্য অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযান ৬০ দিনের বেশি চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সূত্র: বিবিসি
মার্কিন সিনেটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানসংক্রান্ত সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ আবারও ব্যর্থ হয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ৪৭ জন এবং বিপক্ষে ৫২ জন সিনেটর ভোট দেন। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে একজন ভোটদানে বিরত ছিলেন। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো সিনেটে ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ভেস্তে গেল। ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানে সামরিক অভিযান চালানো বন্ধ রাখা। তারা জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে চাপ অব্যাহত রাখতে প্রতি সপ্তাহেই প্রস্তাবটি তোলা হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল প্রথম ভোট। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পরবর্তী আলোচনাতেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি, যদিও উভয় পক্ষই নতুন করে আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখিয়েছে। যুদ্ধবিরতির আগে ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দেন। এমনকি ৭ এপ্রিল তিনি কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দেন, যা কংগ্রেসে তার ক্ষমতা সীমিত করার দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে। প্রস্তাবটির সমর্থকদের দাবি, ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করেছেন। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে, আর প্রেসিডেন্ট কেবল জরুরি আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অবস্থানকে বৈধ বলে দাবি করেছে। তাদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করে আসছে। ভোটের আগে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি এই সংঘাতকে ‘ভুলভাবে পরিচালিত যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এতে প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। তার দাবি, এই সংঘাতে প্রতি সপ্তাহে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়ছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর জিম রিচস বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যেই কাজ করছেন। তিনি প্রস্তাবটিকে আগের মতোই পুনরাবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেন।
ইরানকে কোনো ধরণের মরণাস্ত্র সরবরাহ না করতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্মতি দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, বেইজিংয়ের এই সিদ্ধান্তে তিনি অত্যন্ত খুশি এবং এটি হরমজ প্রণালী স্থায়ীভাবে খুলে দিতে সহায়তা করবে। আগামী ১৪ ও ১৫ মে দ্বিতীয় মেয়াদে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। সেখানে শি জিনপিংয়ের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের সাথে যেকোনো শান্তি চুক্তির প্রধান শর্ত হবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করা। পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়া তেহরান কোনো সমঝোতা করতে পারবে না। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ চাইলেই খুব দ্রুত শেষ হতে পারে। তবে ইরানকে বুঝতে হবে যে তাদের কাছে পারমাণবিক মরণাস্ত্র রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, আমেরিকা চাইলে এক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সেতু গুঁড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু তারা তা চায় না। ন্য্যাটোর সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে এই যুদ্ধে মিত্ররা আমেরিকাকে কোনো সহায়তা করেনি। ইউরোপের এই জোটের পেছনে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিপদের সময় ন্যাটো মিত্ররা তাদের পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এমনকি যুদ্ধের সময় অনেক দেশ মার্কিন যুদ্ধবিমানকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন বেশ জটিল। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনো বজায় রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের সাথে ট্রাম্পের এই কথিত সমঝোতা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মোড় নতুন দিকে ঘুরতে পারে এবং হরমজ প্রণালীর সংকট নিরসনে পথ সুগম হবে।
ইরানি বন্দরে আমেরিকার কঠোর নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে লোহিত সাগরসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ রুদ্ধ করে দেওয়ার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। বুধবার ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার জানিয়েছে, আমেরিকা যদি তাদের বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তবে তা চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল হবে। জেনারেল আলী আবদুল্লাহি এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মার্কিন আগ্রাসন চলতে থাকলে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগর দিয়ে কোনো দেশের আমদানি-রপ্তানি চলতে দেওয়া হবে না। এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ঘোষণা করেছিল যে, তারা ইরানের সব বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে এবং সব দেশের জাহাজের ওপর সমভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা ছাড়াই ব্যর্থ হওয়ার পর গত রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কঠোর নৌ-অবরোধের নির্দেশ দেন। সেন্টকম জানিয়েছে, অবরোধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো জাহাজই মার্কিন সীমানা পার হতে পারেনি এবং ছয়টি জাহাজকে পথ পরিবর্তন করে পুনরায় ইরানি বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। গদর উপসাগর থেকে রাস আল হাদ্দ পর্যন্ত বিশাল এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনী অবস্থান নিয়েছে। ফলে ওমান সাগর থেকে আরব সাগরে জাহাজ চলাচলের প্রধান রুটটি এখন কার্যত মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নৌ-ট্রাফিক ডাটা অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমজ প্রণালী দিয়ে অন্তত ১৫টি জাহাজ চলাচল করেছে। যার মধ্যে গ্যালাক্সি গ্যাস, অল নাজির এবং গ্রিসের বেশ কিছু তেল ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই নতুন হুমকির ফলে বিশ্ববাজারে পণ্য সরবরাহ ও তেলের দামে বড় ধরণের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক জাহাজ সংঘাত এড়াতে মাঝপথ থেকে ফিরে যাচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে এবং দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার পথ সুগম করতে উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদল নিয়ে তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির। বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) আল-জাজিরা ও ডন নিউজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার অংশ হিসেবেই এই ঝটিকা সফর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আগামী দুই দিনের মধ্যে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির অসাধারণ কাজ করছেন এবং পাকিস্তানই এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার যোগ্য।” এমনকি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ‘প্রায় শেষের পথে’। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি জানিয়েছিলেন, গত রবিবারের বৈঠকটি অমীমাংসিত থাকলেও পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। বাঘায়ি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইরানের ‘অনস্বীকার্য অধিকার’। তবে তিনি একটি সমঝোতার সুযোগ রেখে জানান যে, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ও ধরণ নিয়ে তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখলে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং ওমান সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার কঠোর হুমকি দিয়েছে ইরান। বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়কারী সর্বোচ্চ অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’র কমান্ডার আলি আবদুল্লাহি এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অবরোধের মাধ্যমে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল ট্যাংকারের জন্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা হলে সেটি চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল হবে। ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। তার আগেই আবদুল্লাহির এই মন্তব্য দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিল। ইরানের এই হুমকি এমন সময়ে এলো যখন দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সংলাপের প্রস্তুতি চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে ইসলামাবাদে ‘কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে’ এবং ইরান যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হলেও নতুন বৈঠকের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত নয়। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তেহরান এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে লেগো-থিমযুক্ত অ্যানিমেশন ভিডিও প্রচারের দায়ে ইরানপন্থী একটি ইউটিউব চ্যানেল সরিয়ে দিয়েছে গুগল। ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ নামের ওই চ্যানেলটি তাদের প্ল্যাটফর্মে স্প্যাম এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে বলে জানিয়েছে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ইউটিউবের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিয়মিত পর্যালোচনার অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা স্প্যাম, স্ক্যাম বা প্রতারণামূলক কাজ সমর্থন করি না যা ইউটিউব কমিউনিটির সুযোগ গ্রহণ করে।’ ভিডিওতে যা ছিল চ্যানেলটি মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরি করত। কোনো একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্প মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারছেন। অন্য একটি ভিডিওতে তাঁকে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা যায় যেখানে নিজেকে ‘পরাজিত ব্যক্তি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অনেক ভিডিওতে শিয়া ইসলামি ঐতিহ্যের প্রতীকগুলো ব্যবহার করে মার্কিন নীতির সমালোচনা করা হতো। নেপথ্যের কারণ ইউটিউব সুনির্দিষ্টভাবে চ্যানেলটির কোনো ভিডিওর কথা উল্লেখ না করলেও জানিয়েছে, নীতিমালা লঙ্ঘনের কারণেই এটি বন্ধ করা হয়েছে। তবে এর আগে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও পর্যবেক্ষণ সংস্থা চ্যানেলটিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অনুসারী বলে তকমা দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নিজেকে ‘মিস্টার এক্সপ্লোসিভ’ পরিচয় দিয়ে বিবিসিকে জানান, তাদের দলে ১০ জনের কম সদস্য কাজ করেন এবং ইরান সরকার তাদের অন্যতম ‘গ্রাহক’। এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া চ্যানেলটি বন্ধের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তারা লেখে, ‘আমাদের লেগো-স্টাইল অ্যানিমেশনগুলো কি আসলেই হিংসাত্মক?’ তারা দাবি করে, এটি মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি বড় যুদ্ধের ময়দান হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন ইরানপন্থী চ্যানেলগুলো ব্যঙ্গচিত্র ব্যবহার করছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের নানা ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে কাটল এক নির্ঘুম ও চরম উত্তেজনাপূর্ণ রাত। কয়েক দশকের বৈরিতা কাটিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা এক টেবিলে বসলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে ঐতিহাসিক এই সংলাপ। তবে আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রায় ‘৮০ শতাংশ কাজ’ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত মুহূর্তে কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে মতভেদের কারণে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা। মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার চার দিন পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হোটেলের তিনটি পৃথক উইংয়ে চলেছে এই কূটনৈতিক লড়াই—একপাশে মার্কিন প্রতিনিধি দল, অন্যপাশে ইরানিরা এবং মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে চলা এই আলোচনায় ফোনের ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বার্তার জন্য প্রতিনিধিদের বারবার মূল কক্ষের বাইরে আসতে হয়েছে। আলোচনার সাথে পরিচিত ১১টি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দুই পক্ষই চুক্তির অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে শেষ মুহূর্তে অচলাবস্থা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরানকে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী কোনো টোল ছাড়াই উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অন্যদিকে, ইরানের দাবি ছিল জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা হবে না—এমন নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেন, বিশেষ করে অতীতে আলোচনার মধ্যেই মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি কড়া অবস্থান নেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং চিৎকার শোনা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার কয়েক দফায় ‘চা-বিরতি’ ডাকেন এবং উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার জানিয়েছেন, সমস্যা সমাধানের জন্য এখনো পূর্ণ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সোমবার সকালে ইরান থেকে ফোন করা হয়েছে এবং তারা একটি চুক্তিতে আসতে আগ্রহী। যদিও হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস জানিয়েছেন, মার্কিন অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি—ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুই দেশেরই এখন উত্তেজনা কমানো প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ, আর ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দেশটিকে চাপের মুখে রেখেছে। জেডি ভ্যান্স আলোচনার সমাপ্তি টেনে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা একটি সমঝোতার পদ্ধতি দিয়ে এসেছি যা আমাদের চূড়ান্ত অফার। দেখা যাক ইরানিরা এটি গ্রহণ করে কি না।”
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন নৌ-অবরোধকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর ও ‘অবৈধ যুদ্ধনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বাঘাই প্রশ্ন তোলেন, একটি ‘অবৈধ ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’ কি বৈশ্বিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত দিয়ে জয় করা সম্ভব? তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। তার এই মন্তব্য আসে এমন সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জাহাজগুলোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানি কোনো জাহাজ মার্কিন অবরোধের আওতাধীন এলাকায় কাছাকাছি এলে তা ‘তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হবে’। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইতোমধ্যে ইরানের বহু নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সমুদ্রপথে অবৈধ কার্যক্রম দমনে যে কৌশল ব্যবহার করা হয়, ইরানের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, পাল্টাপাল্টি এমন কড়া অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন আন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট(আইস)-এর হেফাজতে এক মেক্সিকান অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে আইস হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৭-এ পৌঁছানোর বিষয়টি সামনে এনেছে। মৃত ব্যক্তির নাম আলেহান্দ্রো ক্যাবরেরা ক্লেমেন্তে (৪৯)। তিনি উইন করেকশনাল সেন্টার -এ আটক ছিলেন। আইস-এর পাঠানো নোটিফিকেশন অনুযায়ী, ১১ এপ্রিল তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেলে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সকাল ৮টা ৫১ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া কঠোর অভিবাসন অভিযানের পর থেকে আইস হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্লেমেন্তে এই সময়ের মধ্যে ১৫তম মেক্সিকান নাগরিক, যিনি আটক অবস্থায় মারা গেলেন। মেক্সিকোর কূটনীতিক ভেনেসা কালভা রুইজ এই মৃত্যুগুলোকে “অ্যালার্মিং” ও “অগ্রহণযোগ্য প্রবণতা” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এসব ঘটনা পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, পরিচালনাগত দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য অবহেলার ইঙ্গিত দেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আইস ডিটেনশন সেন্টারগুলোর পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও বন্দীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। এদিকে আইস জানিয়েছে, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাই নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। তবে সমালোচকরা বলছেন, শুধু তদন্ত নয়—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি অবরোধের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ একাধিক মিত্র দেশ স্পষ্ট করেছে, তারা এই অবরোধে অংশ নিয়ে নতুন কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রস্তাবিত এই উদ্যোগে সাড়া না দেওয়ায় ন্যাটো জোটের ভেতরে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলো বলছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ না হলে তারা এমন কোনো পদক্ষেপে যুক্ত হবে না। মিত্র দেশগুলোর মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সংঘাত বাড়ানোর মতো কোনো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ন্যাটোর বিভিন্ন দেশ এই অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে। তবে বাস্তবে মিত্রদের অনীহা প্রকাশ পাওয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ইরান ইস্যুতে সমর্থন না দেওয়ায় ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ বাতিলের কথাও তুলেছিলেন ট্রাম্প। পাশাপাশি যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, সেসব দেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়েও তিনি ভাবছেন বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব আরও বাড়াতে পারে।
নিজেকে যিশুর আদলে উপস্থাপন করে একটি ছবি পোস্ট করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে বিতর্ক বাড়তে থাকায় তিনি ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুছে ফেলেন। ট্রাম্পের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ পোস্ট করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ওই ছবিতে দেখা যায়, সাদা পোশাকে ট্রাম্প একজন অসুস্থ ব্যক্তির কপালে হাত রেখে তাকে সুস্থ করে তুলছেন। অনেকেই ছবিটিকে যিশুর অলৌকিক নিরাময়ের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। ছবিটি প্রকাশের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গন ও ধর্মীয় মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এমনকি ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্য থেকেও সমালোচনা উঠে আসে। খ্রিষ্টান কর্মী শন ফিউচট ছবিটি অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে রক্ষণশীল কর্মী রাইলি গেইনস মন্তব্য করেন, ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে এমন উপস্থাপন অনুচিত। খ্রিষ্টান ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্কের সাংবাদিক ডেভিড ব্রোডিও এটিকে ‘সীমা অতিক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে সমালোচনার মুখে পড়লেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেননি। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ছবিটি তাকে একজন ‘চিকিৎসক’ হিসেবে তুলে ধরেছে। তার ভাষায়, ‘আমি মানুষকে ভালো করি, অনেক ভালো করি।’ উল্লেখ্য, এই ছবি পোস্টের কয়েক ঘণ্টা আগেই ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ-এর সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। পোপ সাম্প্রতিক সংঘাতকে ‘অমানবিক সহিংসতা’ হিসেবে অভিহিত করায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews