ড. মাহরুফ চৌধুরী
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অপমৃত্যু, তথা খুনের প্রেক্ষিতেই এই লেখাটির শিরোনাম নেওয়া হয়েছে দুটি কালজয়ী গান ও কবিতা থেকে। হায়দার হোসেন (১৯৬৩–) যে আত্মগ্লানি থেকে ‘নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’ উচ্চারণ করেছিলেন, এটি কেবল সেই গানের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং আজকের বাস্তবতায় বেদনাহত অসংখ্য মানুষের মতো আমিও আমার ঘৃণা ও ক্ষোভের ভাষা খুঁজেছি এই উচ্চারণে। এই সুতীব্র ধিক্কার আসলে নিজের অক্ষমতার বিরুদ্ধে, আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে, এবং একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও সরকারের উন্নাসিক মনোভাবের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিবাদ। এখানে ‘আমি’ ব্যক্তিগত হলেও, এর অন্তর্গত বোধটি গভীরভাবে সামষ্টিক; এটি আমাদের সবার দায়বোধের প্রতিফলন। অন্যদিকে, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’- এই উচ্চারণ কেবল একটি কবিতার শিরোনাম বা পঙ্ক্তি নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রত্যাখ্যান। এই পঙ্ক্তিটি উচ্চারণ করতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হয়। যদি এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না-ই হয়, তবে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমি কি এর বাইরে, নাকি এই নির্মম বাস্তবতার নীরব অংশীদার? নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮–২০১৪) যে ‘মৃত্যু উপত্যকা’র কথা বলেছেন, তা কোনো ভৌগোলিক সীমানা নয়; বরং একটি নির্লিপ্ত রাষ্ট্র ও সমাজের ভীতিকর অবস্থার প্রতীক। আজকের লেখার শিরোনাম হিসেবে এই প্রতিবাদী উচ্চারণ আর কেবল গানের কলি ও কবিতার পঙ্ক্তি নয়; এটি আমার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই দেওয়া এক তীব্র ধিক্কার।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মৃত্যু আর ব্যতিক্রম নয়; বরং ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এক নির্মম বাস্তবতা। এখানে মানুষের জীবন নিরাপদ নয়; মৃত্যু হয়ে ওঠে দৈনন্দিন ঘটনা, আর জীবনের মূল্য ধীরে ধীরে অবমূল্যায়িত হচ্ছে। মানুষের মৃত্যুতে মানুষ এতটা আবেগহীন, অনুভূতিহীন ও প্রতিক্রিয়াহীন থাকতে পারে- এই ভাবনাই হৃদয়কে শঙ্কিত ও স্তম্ভিত করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৈতিক দর্শনের ভাষায় বললে, এটি সেই পর্যায়, যেখানে রাষ্ট্র তার মৌলিক ‘সামাজিক চুক্তি’ (সোসাল কন্ট্রাক্ট) রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং নাগরিকের জীবনরক্ষার ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও পালন করতে পারে না। ফলে সামষ্টিক কল্যাণের বোধ থেকে জন্ম নেওয়া ‘দেশ’ ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ যে ভূখণ্ডে জীবন অনিরাপদ, তা মানচিত্রে একটি রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু নৈতিক অর্থে সেটা একজন নাগরিকের কাছে ‘আমার দেশ’ হয়ে উঠতে পারে না। রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রাচীন ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। ইংরেজ চিন্তক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের অবস্থা’র যে চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে মানুষের জীবন ছিল ‘নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, নিকৃষ্ট, হিংস্র এবং সংক্ষিপ্ত’ (সলিটারি, পুওর, নাস্টি, ব্রুটিস এন্ড শট) তথা অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। যেখানে মানুষের জন্য জীবন ছিল অনিরাপদ, বিশৃঙ্খল এবং টিকে থাকার সংগ্রামে ভরপুর। সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করে, সেটিই ‘রাষ্ট্র’ যার মূল ভিত্তি একটি অলিখিত ‘সামাজিক চুক্তি’, যেখানে নাগরিক তার কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে নিরাপত্তার বিনিময়ে। কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে: যদি রাষ্ট্র সেই ন্যূনতম দায়িত্ব অর্থাৎ নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামাজিক চুক্তির বৈধতা কোথায় দাঁড়ায়?
প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের ভিত্তি একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি, যেখানে নাগরিক তার কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখানেই এক মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যদি রাষ্ট্র সেই ন্যূনতম দায়িত্ব তথা নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামাজিক চুক্তির বৈধতা কোথায়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির গভীর সংকট। কারণ যে চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার বৈধতা অর্জন করে, সেই চুক্তির প্রধান শর্তই যদি ভঙ্গ হয়, তবে নাগরিকের আনুগত্য, আস্থা ও কর্তব্যবোধসহ সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র কেবল একটি ক্ষমতার কাঠামোতে পরিণত হয়; কিন্তু ন্যায়, নিরাপত্তা ও মানবিকতার আশ্রয়স্থল হিসেবে তার অস্তিত্ব ক্রমেই ফাঁপা হয়ে যায়। আমাদের দেশের বাস্তবতায় মৃত্যুর প্রকৃতি ও স্বাভাবিকতার ধারণা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ‘দুর্ঘটনা’, ‘আত্মহত্যা’, ‘গণপিটুনী’, ‘গণধোলাই’, ‘ক্রসফায়ার’, ‘রাজনৈতিক সংঘর্ষ’- এই শব্দগুলো যেন একেকটি বিশেষ পর্দা বা চাঁদর, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য। সাধারণ মানুষের ‘সিস্টেমিক’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ অপমৃত্যুকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শব্দের নির্বাচন বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে, এমনকি সহিংসতাকেও এক ধরণের নীরব বৈধতা দিতে পারে। ফলে ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি হিসেবে প্রতিভাত হয় না; বরং সেগুলো একটি অভ্যস্ত, পুনরাবৃত্ত সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নেয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকীকরণ আসলে এক ধরনের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’, যেখানে হত্যার দায় কোনো একক ব্যক্তি বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা একটি সমগ্র সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর বর্তায়।
নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী জোহান গালতুং (১৯৩০–২০২৪) যে ‘কাঠামগত সহিংসতা’-র (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স) ধারণা দিয়েছেন, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর সাযুজ্য রয়েছে। এখানে সহিংসতা সবসময় দৃশ্যমান না হলেও তার প্রভাব প্রতিনিয়ত জীবনহানির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ এখানে হত্যা কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার অবধারিত পরিণতি। এই প্রেক্ষাপটে ফরাসী ইতিহাসবিদ ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘জৈব-রাজনীতি’ (বায়োপলিটিক্স) ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শাসন করে না; বরং মানুষের জীবন, দেহ এবং সমগ্র জনগোষ্ঠির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ফলে কে বাঁচবে, কে মরবে, কোন জীবন মূল্যবান, আর কোন জীবন অবহেলিত- এই প্রশ্নগুলো নিছক নৈতিক বা মানবিক নয়; এগুলো গভীরভাবে রাজনৈতিকও বটে। যখন রাষ্ট্রের উদাসীনতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা ইচ্ছাকৃত নীতির ফলে কিছু মানুষের মৃত্যু ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে, তখন তা আর নিছক দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার এক নীরব কিন্তু কার্যকর রূপ, যেখানে জীবনরক্ষা নয়, বরং জীবনের অবমূল্যায়নই রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে, ইটালীয় চিন্তক জর্জিও আগামবেনের (১৯৪২-) ‘হত্যাযোগ্য’ (হোমো সাকের) ধারণাটি আমাদের এই বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাঁর বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়ে যে, আধুনিক রাষ্ট্র এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি করে, যাদের জীবন আইনের দৃষ্টিতে কার্যত সুরক্ষাহীন; যাদেরকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তা বিশেষভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। অর্থাৎ তারা আইনের ভেতরে থেকেও আইনের সুরক্ষার বাইরে অবস্থান করে; রাষ্ট্রে বা সমাজে তারা এক ধরনের ‘জীবন্ত পরিত্যক্ততা’-র (লিভিং এবানডনমেন্ট) শিকারহয়ে থাকে।
আমাদের সমাজে যখন গণপিটুনী, গুম, খুন-খারাবী বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনা ঘটে এবং তা কার্যত শাস্তিহীন থেকে যায়, তখন সেই ভুক্তভোগীরা যেন প্রাচীন রোমান আইনের ‘হোমো সাকের’ ধারণারই আধুনিক প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। কারণ তখন তাদের মৃত্যু আর বিচারের বিষয় থাকে না; বরং তা এক ধরনের নীরব স্বীকৃতি পেয়ে যায় যেন এই মৃত্যুগুলো ঘটতেই পারে, কিংবা ঘটাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই নির্মম বাস্তবতার মানবিক ব্যথা আমাদের লোকস্মৃতি ও সাহিত্যও প্রতিফলিত হয়েছে। হায়দার হোসেনের গানের পঙক্তি, ‘যার চলে যায় সেই বোঝে, হায় বিচ্ছেদে কী যন্ত্রণা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একেকটি ভাঙা পরিবার, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি আর শূন্যতা। সে যাই হোক, এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে, এদেশে অপমৃত্যু কেবল বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। আর এই কাঠামোর মধ্যে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছি। রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, রাজনৈতিক স্বার্থের প্রাধান্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং সামাজিক নীরবতা সব মিলিয়ে এদেশে এক ধরনের ‘মৃত্যুর সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠেছে। এই সংস্কৃতিতে জীবনের চেয়ে মৃত্যু বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর ন্যায়বিচারের চেয়ে অবিচার বেশি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ফলে প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের সামষ্টিক নৈতিকতার গভীর সংকটকেও উন্মোচন করে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় উৎসবগুলোর তাৎপর্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ঈদ বা স্বাধীনতা দিবসের মতো উদ্যাপন তখন এক ধরনের নৈতিক বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে। একদিকে আমরা স্বাধীনতার গৌরব উদ্যাপন করি, অন্যদিকে সেই স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা মানুষের নিরাপদ জীবন ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে উৎসবগুলো নিছক আনন্দের উপলক্ষ না হয়ে বরং এক ধরনের অস্বস্তিকর আত্মপ্রতারণায় রূপ নেয়, যেখানে উদ্যাপন আর বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর ফাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায় একে বলা যেতে পারে ‘কার্যসম্পাদনমূলক জাতীয়তাবাদ’ (পারফরমেটিভ ন্যাশানালিজম) যেখানে প্রতীকী উদ্যাপন বাস্তব দায়বদ্ধতার অভাবকে আড়াল করে। প্রশ্ন হলো, তাহলে সমাধান কোথায়?
প্রথমত, আমাদের এই বাস্তবতাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা ভাঙতে হবে। সহিংসতার এই স্বাভাবিকীকরণই সংকটকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি। সমাজমনোবিজ্ঞানের আলোচনায় একে ‘সংবেদনশীলতা হ্রাস’ (ডিসেন্সিটাইজেশান) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হতে হতে আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা ভোঁতা হয়ে যায়। এই মানসিক অবস্থা পরিবর্তন ছাড়া কোনো কাঠামোগত সংস্কারপ্রয়াসই টেকসই হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে যাতে করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সমান মূল্য নিশ্চিত করা যায়। এখানে ‘আইনের শাসন’ কেবল একটি প্রশাসনিক নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, যা ছাড়া নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
তৃতীয়ত, সমাজকে তার নৈতিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা আর গ্রহণযোগ্য থাকবে না। কারণ নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না; তা অনিবার্যভাবে অন্যায়ের পক্ষেই কাজ করে। নাগরিক সচেতনতা, নৈতিক সাহস, এবং সক্রিয় সামাজিক প্রতিরোধ- এই তিনটির সম্মিলনেই একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে, যেখানে মানুষের জীবন আর অবহেলার শিকার হবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই ‘সিস্টেমিক’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ এই মৃত্যু উপত্যকা কোনো বাইরের শক্তির তৈরি নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত কর্ম, নীরবতা এবং উদাসীনতারই ফল। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের ‘সামষ্টিক দায়’ (কালেক্টিভ রিসপন্সিবিলিটি), যেখানে অপরাধটি কেবল কিছু মানুষের নয়; বরং একটি সামগ্রিক নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। আমরা যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি না, প্রশ্ন তুলি না, কিংবা নিজেকে দায়মুক্ত ভাবি, তখন নিজেদের অজান্তেই এই সহিংস কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখি। এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, আমাদের হয়তো আবারও ফিরে যেতে হয় সেই আত্মধিক্কারের গভীরতম উচ্চারণে, যা কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯–১৯৭৬) ভাষায়, ‘মনে হয়- ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, ‘মা বসুধা দ্বিধা হও!/ ঘৃণাহত মাটি-মাখা ছেলেরে তোমার/ এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলো হ’তে অন্ধকারে টেনে লও’! এই কাব্যিক আর্তনাদ কেবল ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়; এটি এক গভীর নৈতিক লজ্জা ও প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। অতএব এই ধিক্কার কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র বা সমাজের প্রতি নয়; এটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের প্রতি নিবেদিত এক আত্মসমালোচনা। কারণ সত্যটি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা’ প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই নির্মাণ, আমাদেরই অর্জন। এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়েই হয়তো শুরু হতে পারে পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ, যেখানে আমরা কেবল ভুক্তভোগী নই, বরং দায়-স্বীকারকারী এবং পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠি।
সবশেষে, প্রশ্নটি আর কেবল একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কিংবা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের অস্তিত্বের গভীরে গিয়ে আঘাত হানে। আমরা কেমন সমাজ গড়ছি? আমরা কি এমন এক ভূখণ্ডে বাস করছি, যেখানে মানুষের জীবন নিরাপদ, নাকি এমন এক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেখানে মৃত্যু-ই হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের বাস্তবতা? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি অনিরাপদ জীবন বা অপমৃত্যু আমাদের সম্মিলিত মানবিকতার ওপর একেকটি আঘাত, প্রতিটি অন্যায়-অবিচার আমাদের নৈতিক কাঠামোর ভাঙনের সাক্ষ্য। প্রতিটি অপমৃত্যুর সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া অপরিহার্য। অপরাধ দমনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। অতএব এই ‘মৃত্যু উপত্যকা’ থেকে উত্তরণের পথ শুরু হয় স্বীকারোক্তি থেকে অর্থাৎ আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা, উদাসীনতা ও নীরবতার দায় স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। এর পরেই প্রয়োজন জাগ্রত বিবেক, সক্রিয় নাগরিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার। সাথে সাথে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা, সমাজকে তার নৈতিক ভিত্তিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, এবং ব্যক্তিকে তার মানবিক দায়বোধে উদ্দীপ্ত করা- এই ত্রিমাত্রিক রূপান্তর ছাড়া কোনো স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। নইলে ‘নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার’ কেবল একটি উচ্চারণ হয়েই থেকে যাবে, আর ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ বলে প্রত্যাখ্যানও একদিন নিছক বাগাড়ম্বর হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই এই ধিক্কারকে দায়বোধে, এবং এই প্রত্যাখ্যানকে পরিবর্তনের অঙ্গীকারে রূপ দিতে পারি, তবে হয়তো একদিন আমরা বলতে পারব, ‘এই দেশ মৃত্যু উপত্যকা নয়’; এটি এমন এক মানবিক ভূখণ্ড, যেখানে মানুষের জীবন শুধু টিকে থাকে না, মর্যাদার সঙ্গে বিকশিতও হয়। তখনই গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের (১৯২৫-১৯৮৬) মতই দেশবাসী মুগ্ধতায় সমবেত কন্ঠে গেয়ে উঠতে পারবে, ‘বিশ্ব কবির ‘সোনার বাংলা’,/ নজরুলের ‘বাংলাদেশ’,/ জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’/ রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশ’।
* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। Email: mahruf@ymail.com
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।