রাশিয়ায় ইন্টারনেটের ওপর ক্রেমলিনের ক্রমবর্ধমান কড়াকড়ি এবং নতুন আইনি বিধিনিষেধের কারণে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন দেশটির জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসন সম্প্রতি ইন্টারনেটে তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিমা প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর প্রভাব কমাতে যে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে, তার ফলে আয়ের উৎস হারানোর পাশাপাশি আইনি জটিলতায় পড়ার শঙ্কায় আছেন হাজারো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। সিএনএন-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাশিয়ার নতুন এই নীতিমালার আওতায় অনেক বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ভিপিএন (VPN) ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো রাশিয়ায় নিষিদ্ধ ছিল, তবে অনেক ইনফ্লুয়েন্সার ভিপিএন ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সরকারের নতুন সেন্সরশিপ আইন এখন সেই পথও বন্ধ করে দিচ্ছে। রুশ ইনফ্লুয়েন্সারদের মতে, এই বিধিনিষেধ কেবল তাদের বাকস্বাধীনতাই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং তাদের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিচ্ছে। রাশিয়ার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম 'ভিকে' (VK) বা 'টেলিগ্রাম' ব্যবহারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হলেও, সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের মতো বিজ্ঞাপনের সুযোগ বা আয়ের সংস্থান নেই বলে দাবি করছেন তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিন প্রশাসন মূলত ইন্টারনেটে একটি 'ডিজিটাল দেয়াল' তৈরি করতে চাইছে, যাতে বাইরের বিশ্বের কোনো তথ্য বা প্রভাব রুশ নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে না পারে। এই সেন্সরশিপের ফলে রাশিয়ার তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যে রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারতসহ কয়েকটি দেশকে সাময়িক ছাড় দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই সুবিধা আর বাড়ানো হবে না বলে জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, এই ছাড়ের বড় সুবিধাভোগী ছিল ভারত। হরমুজ প্রণালির আশপাশে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও দিল্লি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি চালিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলে সেই সুযোগ আর থাকবে না। সরকারি সূত্রের বরাতে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর ভারত রাশিয়া থেকে প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল তেল কেনার অর্ডার দেয়। এর আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতের শোধনাগারগুলো—যেমন রিলায়েন্স—রাশিয়ার রসনেফট ও লুকওইলের মতো কোম্পানি থেকে তেল সংগ্রহ করেছিল। এদিকে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইরানের তেলের ওপর দেওয়া সাধারণ লাইসেন্স আর নবায়ন করা হবে না। উল্লেখ্য, মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের শোধনাগারগুলোকে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাঙ্কার থেকে তেল কেনার অনুমতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে ইরানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ছাড় দেওয়া হয়। রাশিয়ার তেলের ক্ষেত্রে এই সুবিধার মেয়াদ ছিল ১১ এপ্রিল পর্যন্ত, আর ইরানের তেলের জন্য তা ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধের কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে চীন—এমন প্রেক্ষাপটে এগিয়ে এসেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে মস্কো সহায়তা দিতে প্রস্তুত। বুধবার (১৫ এপ্রিল) বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, রাশিয়ার কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে এবং যারা পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা করতে চায়, তাদের পাশে দাঁড়াতে দেশটি প্রস্তুত। লাভরভ আরও উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও রাশিয়া-চীন সম্পর্ক দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। এদিকে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধের কারণে চীনের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ, চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের তেলের বড় ক্রেতা। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেইজিংকে ইরানি তেল কেনার সুযোগ দেওয়া হবে না। এই অবস্থায় রাশিয়ার এমন প্রস্তাবকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন কৌশলগত সমীকরণের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র: আল-জাজিরা
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেস্কিয়ান এর সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি এই প্রস্তাব দেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। এর আগে পাকিস্তানে প্রায় ২১ ঘণ্টার ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। এই অচলাবস্থার মধ্যেই পুতিন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ক্রেমলিনের বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে একটি “ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি” প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে প্রস্তুত। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের “দ্বিমুখী নীতি” এবং “একতরফা মনোভাব”কে আলোচনার প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চললে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যানস ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগে অনীহাকেই প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, আলোচনার বেশিরভাগ বিষয়ে অগ্রগতি হলেও ইরান যদি পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখে, তবে সেই সমঝোতার কোনো মূল্য থাকবে না। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার মধ্যস্থতা উদ্যোগ নতুন কূটনৈতিক পথ খুলে দিতে পারে, তবে পারমাণবিক ইস্যুতে মতপার্থক্য দূর না হলে স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কীভাবে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে একটি বিশাল রাষ্ট্রের জনমত নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন—সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সেই জটিল বাস্তবতা। দীর্ঘদিন মস্কোতে কর্মরত সাংবাদিক মার্ক বেনেটস তাঁর বই ‘দ্য ডিসেন্ট’-এ দেখিয়েছেন, ধারাবাহিক মিথ্যাচার ও তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে কীভাবে রাশিয়ার জনগণের যুক্তিবোধ দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। এক প্রতিবেদনে দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, এই প্রক্রিয়া এতটাই গভীরে গিয়েছে যে মানুষ অনেক সময় তথ্যকে মিথ্যা জেনেও তা বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতিক ইলিয়া ইয়াশিন কারাগারে থাকার সময় এক সহবন্দির কাছ থেকে শুনেছিলেন, ইউক্রেন ‘নাজিতে ভরা’। অথচ সেই বন্দি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রায়ই মিথ্যা প্রচার করে। তবুও বিকল্প নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে তিনি সেই প্রচারণাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘দ্বৈত বাস্তবতা’ই পুতিনের প্রোপাগান্ডার মূল শক্তি—মানুষ জানে তথ্য বিকৃত হতে পারে, কিন্তু বিকল্প না থাকায় সেটিকেই মেনে নেয়। পুতিনের ভাবমূর্তি গঠনে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ গ্লেব পাভলোভস্কি। তিনি এমন এক নেতার চিত্র তৈরি করেন, যিনি শক্তিশালী, রহস্যময় এবং জনগণের রক্ষক। এই ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র ম্যাক্স অটো ভন স্টিয়ারলিটজ-এর আদলে পুতিনকে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় পুতিনকে এমনভাবে তুলে ধরা হয় যেন তিনি সর্বশক্তিমান সিদ্ধান্তদাতা—যিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এমনকি ২০০০ সালের কুরস্ক সাবমেরিন দুর্ঘটনায় ১১৮ নাবিক নিহত হলেও তাঁকে সরাসরি দায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে দেওয়া হয়নি। প্রোপাগান্ডার আরেকটি কৌশল হলো ‘ভালো জার, খারাপ কর্মকর্তা’ তত্ত্ব—রাষ্ট্রে কোনো ব্যর্থতা হলে তা পুতিনের নয়, বরং অধস্তনদের দায় বলে তুলে ধরা হয়। 'এর উদাহরণ হিসেবে স্থানীয় নেতা আলেক্সান্ডার শেসতুনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়, যিনি একটি পরিবেশগত প্রকল্পের বিরোধিতা করায় দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পুরোপুরি প্রচারণার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। এমনকি ২০১৪ সালে মস্কোর একটি বড় যুদ্ধবিরোধী সমাবেশকে টেলিভিশনে প্রায় ফাঁকা দেখানো হয়েছিল। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি নয়, বরং জনগণের মধ্যে অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি করা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ মনে করে, তাদের জীবনের সিদ্ধান্ত মস্কোতেই নেওয়া হয়—ফলে প্রতিবাদের কোনো অর্থ নেই। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে জনগণের মধ্যে গর্বের অনুভূতি তৈরি করা হয়, যেমন ক্রিমিয়া দখল নিয়ে উল্লাস। যদিও এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এই প্রোপাগান্ডার নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, জীবনমান কমেছে, অনেক এলাকায় মৌলিক সুবিধার অভাব রয়ে গেছে। তবুও রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এসব বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই কৌশল শুধু রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের প্রোপাগান্ডা কার্যকর হতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কীভাবে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে একটি বিশাল রাষ্ট্রের জনমত নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন—সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সেই জটিল বাস্তবতা। দীর্ঘদিন মস্কোতে কর্মরত সাংবাদিক মার্ক বেনেটস তাঁর বই ‘দ্য ডিসেন্ট’-এ দেখিয়েছেন, ধারাবাহিক মিথ্যাচার ও তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে কীভাবে রাশিয়ার জনগণের যুক্তিবোধ দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। এক প্রতিবেদনে দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, এই প্রক্রিয়া এতটাই গভীরে গিয়েছে যে মানুষ অনেক সময় তথ্যকে মিথ্যা জেনেও তা বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতিক ইলিয়া ইয়াশিন কারাগারে থাকার সময় এক সহবন্দির কাছ থেকে শুনেছিলেন, ইউক্রেন ‘নাজিতে ভরা’। অথচ সেই বন্দি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রায়ই মিথ্যা প্রচার করে। তবুও বিকল্প নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে তিনি সেই প্রচারণাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘দ্বৈত বাস্তবতা’ই পুতিনের প্রোপাগান্ডার মূল শক্তি—মানুষ জানে তথ্য বিকৃত হতে পারে, কিন্তু বিকল্প না থাকায় সেটিকেই মেনে নেয়। পুতিনের ভাবমূর্তি গঠনে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ গ্লেব পাভলোভস্কি। তিনি এমন এক নেতার চিত্র তৈরি করেন, যিনি শক্তিশালী, রহস্যময় এবং জনগণের রক্ষক। এই ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র ম্যাক্স অটো ভন স্টিয়ারলিটজ-এর আদলে পুতিনকে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় পুতিনকে এমনভাবে তুলে ধরা হয় যেন তিনি সর্বশক্তিমান সিদ্ধান্তদাতা—যিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এমনকি ২০০০ সালের কুরস্ক সাবমেরিন দুর্ঘটনায় ১১৮ নাবিক নিহত হলেও তাঁকে সরাসরি দায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে দেওয়া হয়নি। প্রোপাগান্ডার আরেকটি কৌশল হলো ‘ভালো জার, খারাপ কর্মকর্তা’ তত্ত্ব—রাষ্ট্রে কোনো ব্যর্থতা হলে তা পুতিনের নয়, বরং অধস্তনদের দায় বলে তুলে ধরা হয়। এর উদাহরণ হিসেবে স্থানীয় নেতা আলেক্সান্ডার শেসতুনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়, যিনি একটি পরিবেশগত প্রকল্পের বিরোধিতা করায় দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পুরোপুরি প্রচারণার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। এমনকি ২০১৪ সালে মস্কোর একটি বড় যুদ্ধবিরোধী সমাবেশকে টেলিভিশনে প্রায় ফাঁকা দেখানো হয়েছিল। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি নয়, বরং জনগণের মধ্যে অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি করা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ মনে করে, তাদের জীবনের সিদ্ধান্ত মস্কোতেই নেওয়া হয়—ফলে প্রতিবাদের কোনো অর্থ নেই। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে জনগণের মধ্যে গর্বের অনুভূতি তৈরি করা হয়, যেমন ক্রিমিয়া দখল নিয়ে উল্লাস। যদিও এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এই প্রোপাগান্ডার নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, জীবনমান কমেছে, অনেক এলাকায় মৌলিক সুবিধার অভাব রয়ে গেছে। তবুও রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এসব বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই কৌশল শুধু রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের প্রোপাগান্ডা কার্যকর হতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ কর্মী ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনই নিচ্ছে না রাশিয়া। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়ায় এই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ঝুঁকি এখনো কাটেনি। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে এবং কর্মীদের ফেরার সময় আসেনি। রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে তিনি বলেন, “যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা স্পষ্ট নয়।” সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-এর তথ্যমতে, বুশেহর কেন্দ্রে কর্মরত ৬৩৯ জনের মধ্যে ৬১১ জনকে ইতোমধ্যে আর্মেনিয়ার মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক সীমিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, ইরানের একমাত্র কার্যকর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহর, যা রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত ও পরিচালিত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে কেন্দ্রটি অন্তত চারবার হামলার শিকার হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি হলেও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার এই সতর্ক অবস্থান বজায় থাকতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার কাছে দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব থেকে তারা সরে আসছেন না। এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে মস্কোর কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সোমবার (৬ এপ্রিল) রাতে এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, কিয়েভ এমন একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, যা কার্যকর হতে পারে যদি রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করে। তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করে, তবে ইউক্রেনও একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকবে। তিনি বলেন, এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে মার্কিন পক্ষের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহেও ইস্টার উপলক্ষে একই ধরনের শর্তে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন জেলেনস্কি। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশেই অর্থডক্স খ্রিস্টানদের মধ্যে আসন্ন রোববার ইস্টার উদযাপিত হওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়া এই প্রস্তাবের জবাবে ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন ব্যবহার করেছে। গত সপ্তাহে কিয়েভের প্রস্তাবে মস্কোর প্রতিক্রিয়া খুব ইতিবাচক ছিল না। তারা জানায়, পৃথক যুদ্ধবিরতির বদলে একটি সামগ্রিক শান্তি চুক্তির দিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এদিকে সোমবার কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ওডেসা শহরে রাতভর হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ইস্টারকে কেন্দ্র করে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী নয় বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশেষ এই সময়কে ঘিরে বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও রাশিয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে—তাদের কাছে কোনো কিছুই যেন পবিত্র নয়।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আলটিমেটাম’ বা হুমকির ভাষা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। মস্কোর মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল না করে কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোনো উচিত। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এ সময় দুই পক্ষই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং উত্তেজনা প্রশমনে চলমান প্রচেষ্টার সফলতা কামনা করেন। ফোনালাপে সের্গেই লাভরভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হুমকির ভাষা পরিহার করে এবং আলোচনায় ফিরে আসে, তাহলে সংকট নিরসনে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব। তিনি কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাশিয়া ও ইরান উভয়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে—বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের—এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে, যা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে মস্কো।
রাশিয়ার দাবি, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো দেশটির বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন অভিযোগ করেছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। রুশ বার্তা সংস্থা তাস খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। জাখারোভার মতে, ন্যাটোর বাড়তে থাকা সামরিক ব্যয় ও নিয়মিত মহড়া ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়—জোটটি আগামী বছরগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সামরিক মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ন্যাটোর ২০২৫ সালের কার্যক্রম প্রতিবেদন উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, বৈশ্বিক উত্তেজনা বাড়ার পেছনে জোটটির ভূমিকা স্পষ্ট। তার দাবি, ওই বছর ন্যাটোর মোট সামরিক ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত ব্যয়ের বড় একটি অংশ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও কেন রাশিয়াকে প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। জাখারোভা আরও জানান, গত বছর ন্যাটোর অধীনে শতাধিক সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি সদস্য রাষ্ট্রগুলো আলাদাভাবে শত শত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করেছে, যেখানে অংশীদার দেশগুলোর অংশগ্রহণও বাড়ছে। তার অভিযোগ, এসব মহড়ায় শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, আক্রমণাত্মক কৌশলও অনুশীলন করা হচ্ছে, যা জোটটির মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে ন্যাটোর পক্ষ থেকে রাশিয়াকে ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। আকাশসীমা লঙ্ঘন, নাশকতা ও সাইবার হামলার মতো অভিযোগ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এমন বক্তব্যে ন্যাটো ও মস্কোর মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর একটি পরিবহন বিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। ক্রাইমিয়ার রাজধানী সিমফেরোপোলের নিকটবর্তী পাহাড়ি বনাঞ্চলে বিমানটি বিধ্বস্ত হলে এতে থাকা ২৯ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের তথ্য অনুযায়ী, বিধ্বস্ত এএন-২৬ (An-26) মডেলের বিমানটিতে ৬ জন ক্রু এবং ২৩ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাউকেই জীবিত উদ্ধার করতে পারেনি। রাশিয়ার তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় অনুযায়ী ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্রের বাখচিসারাই জেলার কুইবিশেভো গ্রামের কাছে বিমানটি উড্ডয়নরত অবস্থায় বিধ্বস্ত হয়। যদিও তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে ঠিক কী কারণে বিমানটি ভূপাতিত হলো সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি। বর্তমানে দুর্ঘটনাস্থলে বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে এবং ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইস্টার উপলক্ষে প্রস্তাবিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি-এর দেওয়া এ প্রস্তাবকে ‘অস্পষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছে ক্রেমলিন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, এই প্রস্তাবে স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজন ইউক্রেনেরই বেশি বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে সোমবার অর্থোডক্স ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আসন্ন ১২ এপ্রিলের ইস্টার উপলক্ষে সাময়িক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান জেলেনস্কি। তিনি এই উদ্যোগকে ‘আপসের একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। তবে রাশিয়ার মতে, এমন প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। পেসকভ দাবি করেন, রুশ বাহিনী বর্তমানে বিভিন্ন ফ্রন্টে অগ্রসর হচ্ছে কোথাও দ্রুত, কোথাও ধীরগতিতে। এ অবস্থায় ইউক্রেনের নেতৃত্বকে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, দেরি হলে সেই সিদ্ধান্তের মূল্য আরও বেড়ে যাবে। রাশিয়ার এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তারা বর্তমান সামরিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের ওপর চাপ ধরে রাখতে চায়। গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একতরফাভাবে ইস্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও, উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। তখন জেলেনস্কি ওই বিরতি ৩০ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৩০ দিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি পুতিন। এবার জেলেনস্কি জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস বাজারে চাপ কমানো যায়। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি পেসকভ। তিনি শুধু জানান, রাশিয়া তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে। বিশেষ করে বাল্টিক সাগর অঞ্চলের উস্ত-লুগা ও প্রিমোরস্ক বন্দরে ধারাবাহিক আঘাত হানা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে কিয়েভ। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহল এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে নিজের দেশেই অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন তেহরানে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্সেই দেদভ। তিনি জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে খামেনি জনসমক্ষে উপস্থিত হচ্ছেন না। রুশ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেদভ বলেন, “জনগণের বোঝা উচিত, তার জনসমক্ষে না আসার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইরান সরকার বারবার জানিয়েছে, নতুন নেতা দেশে আছেন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে জনসমক্ষে আসা থেকে বিরত আছেন।” তিনি আরও বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিই মূল কারণ। এখনও পর্যন্ত খামেনির সঙ্গে তার কোনো সরাসরি বৈঠক হয়নি। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন নেতাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন এবং তেহরানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। এর আগে বিভিন্ন মহলে খামেনির অবস্থান নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। জনসমক্ষে না আসায় এমন গুঞ্জন ছড়ায় যে, তার বেঁচে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করেছে, দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেঁচে আছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
ইউক্রেন–এর বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়া–র বোমা হামলায় অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৪ জন। অন্যদিকে, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ এলাকায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে মস্কো। রোববার (২৯ মার্চ) স্থানীয় সময় দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্ক শহরে রুশ বাহিনী গ্লাইড বোমা হামলা চালায়। এতে হতাহতের পাশাপাশি কয়েকটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিয়েভের আঞ্চলিক প্রশাসনের অভিযোগ, বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। একই দিনে ওডেসা শহরে মাতৃসদন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটে, যেখানে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। এর জবাবে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে হামলার তৎপরতা বাড়িয়েছে। বাল্টিক সাগরের উস্ত-লুগা বন্দর এলাকায় ড্রোন হামলার পর আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার দাবি, এসব হামলা রাশিয়ার জ্বালানি ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশলের অংশ। এদিকে বেলগোরোদ অঞ্চলেও ইউক্রেনের ড্রোন হামলার দাবি করেছে রাশিয়া। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দিকে শত শত ড্রোন ও একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিয়েভের দাবি, এর মধ্যে অধিকাংশ ড্রোন প্রতিহত বা ভূপাতিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এখন দুই পক্ষের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়েছে রাশিয়া এবং সেই তথ্য তুলে দেওয়া হয়েছে ইরানের হাতে। জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী, রুশ স্যাটেলাইটগুলো চলতি সপ্তাহে অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার ছবি তুলেছে এবং তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই নজরদারির তালিকায় কুয়েত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ও ব্রিটিশ ঘাঁটিসহ ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই ইরান দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে দুটি মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছিল। যদিও মিসাইলগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, তবে এটি ইরানের দীর্ঘপাল্লার হামলার সক্ষমতা বিশ্বের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছে। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলেনস্কি বলেন, "এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক যে একদিকে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে, আর অন্যদিকে সেই আক্রমণকারী দেশটিই এমন দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে যারা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলছে।" ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্প্রতি রাশিয়ার তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাময়িক শিথিলতার দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেছেন। পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাশিয়া ইরানকে কেবল মার্কিন সামরিক সম্পদের অবস্থান বা গতিবিধিই জানাচ্ছে না, বরং শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে হামলা চালানোর কৌশলগত পরামর্শও দিচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন গোয়েন্দা সংক্রান্ত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রাশিয়ার দাগেস্তান প্রজাতন্ত্র থেকে ইরানে পৌঁছেছে প্রায় ১৫০ টন খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর একটি বিশাল মানবিক সহায়তা চালান। দাগেস্তানের গভর্নর সের্গেই মেলিকভ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গভর্নর জানান, এই সহায়তা সামগ্রীগুলো ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হস্তান্তর করা হবে, যারা পরবর্তীতে এগুলো দেশটির দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দাগেস্তান পরিবহন মন্ত্রণালয়, মাখাচকালায় অবস্থিত রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় এবং ‘পিওর হার্ট’ চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের যৌথ সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এর আগে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আজারবাইজানের আস্তারা সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৩০০ টনেরও বেশি ওষুধ ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রাশিয়ার এই ধারাবাহিক মানবিক সহায়তা দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, মস্কো তেহরানকে কিছুটা সহায়তা দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সহায়তা সরাসরি যুদ্ধ অংশগ্রহণ নয়; বরং গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া উন্নত স্যাটেলাইট তথ্যের মাধ্যমে ইরানকে মার্কিন নৌ ও বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছে। এ কাজে রাশিয়ার “লিয়ানা” নামে পরিচিত একটি গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ব্যবহার হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সহায়তায় উৎক্ষেপিত ইরানের “খৈয়াম” স্যাটেলাইটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই স্যাটেলাইট উচ্চমানের ছবি সরবরাহ করতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানকে আরও কার্যকর করে তুলছে। অন্যদিকে, পেন্টাগন মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার খবর অস্বীকার করেছে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাশিয়ার দেওয়া এই গোয়েন্দা সহায়তা সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা একমুখী নয়। ২০২২ সাল থেকে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে আসছে। এখন সেই প্রযুক্তির উন্নত সংস্করণ আবার ইরানের কাছেই ফিরে আসছে। উদাহরণ হিসেবে, সাম্প্রতিক এক হামলায় ব্যবহৃত ইরানি ড্রোনে রাশিয়ার তৈরি এমন একটি নেভিগেশন প্রযুক্তি পাওয়া গেছে, যা ইলেকট্রনিক বাধা বা জ্যামিং এড়াতে সক্ষম। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত কৌশলের মতোই এই প্রযুক্তি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সাহায্য করছে। তবে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা থাকলেও রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই কারণে মস্কো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করলেও, ক্রেমলিনের জন্য তা এক অভাবনীয় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কেবল তেলের দামই বাড়াচ্ছে না, বরং রাশিয়ার ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ মেটানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তেলের বাজারে রাশিয়ার দাপট দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া তাদের অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজার পর তেলের বৈশ্বিক দাম বেড়ে যাওয়ায় পুতিন প্রশাসন এখন পূর্ণ বাজারমূল্যে তেল বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর জ্যেষ্ঠ সহযোগী বেন কাহিল জানান, এই সংঘাতের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। যেখানে রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, সেখানে এখন উপচে পড়ছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাজকোষ। কেবল তেল নয়, লক্ষ্য গ্যাস ও সার ইরান সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে কেবল জ্বালানি তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সারের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেহেতু রাশিয়া এই দুটি পণ্যের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক, তাই বিশ্বজুড়ে হাহাকার তৈরি হওয়ায় রাশিয়ার মুনাফা লাভের পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির ‘সবচেয়ে বড় বিজয়ী’ হলো রাশিয়া। খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ফেলো আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকো জানান, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাশিয়া এক ভয়াবহ বাজেট সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা পুতিনকে ‘সময় কিনে’ দিয়েছে। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চলতি বছরে যে ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা ছিল, তা এখন ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, রাশিয়ার অর্থনীতির পালে তত বেশি হাওয়া লাগবে—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিয়ে সরাসরি ইরানকে সামরিক ও খাদ্য সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানকে ড্রোন, উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য সরবরাহ করছে মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি ড্রোন রাশিয়া ব্যবহার করার পর থেকে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এবার রাশিয়া পাল্টা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ার এই সহায়তা কেবল সামরিক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ক্রেমলিন। গতকাল প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাশিয়ার এমন পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তখন মস্কোর এই প্রকাশ্য অবস্থান তেহরানকে নতুন করে শক্তি জোগাবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের এই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। দুই দেশের মধ্যে এই বিনিময় প্রথা বা 'পারস্পরিক সহযোগিতা' আগামী দিনে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একদিকে রাশিয়া যেমন ইরানের কাছ থেকে ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে ইউক্রেন ফ্রন্টে সুবিধা পাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানও রাশিয়ার উন্নত মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ও রসদ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এই জোটবদ্ধতা বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন ব্লকের জন্ম দিচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সাইপ্রাসকে সুরক্ষা দিতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ 'ড্রাগন' পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্ব হওয়ায় লন্ডনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিন। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের তথাকথিত 'মিলিটারি আমব্রেলা' বা সামরিক সুরক্ষা বলয় পুরোপুরি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। রাশিয়ান সংবাদ সংস্থা তাস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেলিন জানান, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মুখে ব্রিটিশ পরিকল্পনাকারীরা কার্যত অপ্রস্তুত ছিলেন। স্থানীয় রাজনীতিকরাও সরকারের এই সামরিক অদূরদর্শিতার কড়া সমালোচনা করছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাইপ্রাসের মতো দেশগুলো ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দেয় এই আশায় যে, সংকটের সময় লন্ডন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে, প্রয়োজনের সময় ব্রিটিশদের এই সুরক্ষা ব্যবস্থা কোনো কাজেই আসছে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের এই 'সতর্ক অবস্থান' মূলত তাদের সামরিক সীমাবদ্ধতাকেই বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা দ্রুত নিরসনে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি-এর সঙ্গে ফোনালাপে তিনি এই আহ্বান জানান। পরে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, লাভরভ জোর দিয়ে বলেছেন—বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সংঘাত বন্ধ করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ সময় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, চলমান সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ক্যাস্পিয়ান সাগর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে—এ নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews