ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী বিএনপি’র কাছে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একই সঙ্গে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফের অভিনন্দন জানিয়েছেন তারা। ইইউ-এর বার্তায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আমাদের অবিচল অংশীদার, বৃহত্তম রপ্তানি বাজার এবং ২০২৫ সালে এফডিআইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আমরা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সম্পৃক্ততা আরও সম্প্রসারণের অপেক্ষায় রয়েছি।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। দায়িত্বে থাকাকালীনই তিনি পাসপোর্টটি জমা দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ আগে ক্ষমতায় থাকাকালীন এই পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার পদমর্যাদার প্রায় ২০ জন ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। তবে এখনো কয়েকজন উপদেষ্টা পাসপোর্ট হস্তান্তর করেননি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত সরকারের মেয়াদকাল অনুযায়ী কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় এবং অতিরিক্ত ছয় মাস পর্যন্ত এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বিদায়ী সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টাই নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। যাঁরা এখনো জমা দেননি, মেয়াদ শেষ হলে তাঁদেরও তা জমা দিতে হবে। পাসপোর্ট হস্তান্তরকারীদের তালিকায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ছাড়াও রয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরারসহ একাধিক উপদেষ্টা ও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠন সম্পন্ন করেছেন।
সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম পেশাদার সাংবাদিকতায় নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তার মাধ্যমে তিনি জানান যে, তিনি ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’ নামক একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কর্মজীবনের এই নতুন যাত্রায় তিনি সকলের দোয়া ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন। উল্লেখ্য, দেশে নতুন সরকার গঠনের পর গত মঙ্গলবার তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। এর ফলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন শফিকুল আলম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে তিনি পুনরায় সরাসরি সাংবাদিকতায় ফেরার ঘোষণা দিলেন।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের এক পোস্টে জানানো হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল পেজটি আর সক্রিয় থাকবে না। গত ১৮ মাস ধরে সবার সমর্থন, আগ্রহ ও গঠনমূলক সমালোচনার জন্য সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ১৪ আগস্ট ‘Chief Adviser GOB (Head of the Government)’ নামে এই পেজটি যাত্রা শুরু করেছিল, যার বর্তমান ফলোয়ার সংখ্যা ৪৪ লাখেরও বেশি। এদিকে, গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পেজটি বন্ধের ঘোষণা এলো।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জয়ী ও পরাজিত সকল প্রার্থীই অভিনন্দনের যোগ্য। তার মতে, হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন, আর যারা জয়ী হননি তারাও মোট ভোটের অর্ধেক ভোটারের আস্থা পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আগামী দিনে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, যা দিয়ে তার ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে। এই ১৮ মাসে দেশের সচলতা ফিরিয়ে আনা, সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন নিশ্চিত করা তার প্রধান লক্ষ্য ছিল। প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের ইতিহাসে একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি ৫ আগস্টের মুক্তির দিন এবং দেশকে সচল করার জন্য ১৮ মাস ধরে যে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন, তার কথাও স্মরণ করেন। মুহাম্মদ ইউনূস জানান, তার ও সহকর্মীদের প্রচেষ্টা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনরায় সক্রিয় ও জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটানো, দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। তিনি বলেন, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা—নতুন বাংলাদেশের জন্ম।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে সগৌরবে বিদায় নিচ্ছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের ৬১তম এবং সর্বশেষ বৈঠকে এই দেড় বছরের শাসনকালকে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে এবারের নির্বাচনকে ‘দেশের ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৈঠক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন দেশ ছিল অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর এবং প্রশাসনিকভাবে বিপর্যস্ত। ১৮ মাস পর আমরা একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং জনগণের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মূল্যায়ন হলো, এই সরকার তাঁর লক্ষ্য অর্জনে ৯০ শতাংশ সফল হয়েছে।” শপথ ও বিদায়ের বিশেষ আয়োজন: আগামী মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এই আয়োজনে এক অনন্য ও প্রতীকী বিদায়ের দৃশ্য দেখা যাবে। প্রেস সচিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা তাঁদের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী গাড়িতে করে অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। কিন্তু শপথ গ্রহণ শেষে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর তাঁরা যখন বাড়ি ফিরবেন, তখন তাঁদের গাড়িতে আর জাতীয় পতাকা থাকবে না—যা এক ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক রীতির প্রতিফলন। নির্বাচনের বিশেষত্ব: প্রেস সচিব আরও উল্লেখ করেন, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো দীর্ঘ সময় পর মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পুলিশের হারানো আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, “এটিই প্রথম নির্বাচন যেখানে গুম ও খুনের শিকার হওয়া পরিবার এবং জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী দলগুলো সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনের পর দেশের কোথাও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি, যা এক নজিরবিহীন অর্জন।” আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও আইনি সুরক্ষা: নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও থাকছে বড় চমক। এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কাতার এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া প্রতিটি জনকল্যাণমূলক অধ্যাদেশ ও সংস্কার প্রস্তাব আগামী সংসদ আইনি রূপ দেবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে হাতিয়ার একটি অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া ড. ইউনূস সরকারের এই অধ্যায় আগামী মঙ্গলবারের শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক অবিনাশী স্মৃতি হিসেবে রয়ে যাবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মর্যাদাপূর্ণ ফলাফলে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার এক বিশেষ বার্তায় তিনি এই অভিনন্দন জানান। শুভেচ্ছা বার্তায় ড. ইউনূস নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী ফলাফলকে অত্যন্ত শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণভাবে গ্রহণ করার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণা পরবর্তী সময় পর্যন্ত ডা. শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সংযম এবং কর্মীদের প্রতি শান্তিপূর্ণ আচরণের আহ্বান দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা উল্লেখ করে বলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েরই দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, জামায়াতে ইসলামী একটি গঠনমূলক বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখবে। পরিশেষে, জাতীয় ঐক্য সুসংহত করার ক্ষেত্রে ডা. শফিকুর রহমানের ভবিষ্যৎ ভূমিকার প্রতিও তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দু'হাজার চবিবশ সলের ৩০ জুন এবং দু'হাজার পঁচিশ সালের ৩০ জুনে সম্পদ কত ছিল তা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের স্ত্রী-স্বামীর ৩০ জুন ২০২৪ ও ৩০ জুন ২০২৫ তারিখের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হলো। ৩০ জুন, ২০২৪-এ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের আর্থিক সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৩ টাকার। নন-ফাইনান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণ ২০ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা এবং বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত পরিসম্পদ ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪০ টা মোট সম্পদের পরিমাণ ১৪ কোটি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা। একবছর পরে ২০২৫ এর ৩০ জুনে মুহাম্মদ ইউনূসের আর্থিক সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪০১ টাকার। নন-ফাইনান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণ ২১ লাখ ৬ হাজার ২৫০ টাকা এবং বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত পরিসম্পদ ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৪ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকা। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী/মেয়াদী আমানতে বৃদ্ধি, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শেয়ার প্রভৃতি কারণে মোট সম্পদের পরিবৃদ্ধি হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে দেশে আর অপশাসন ফিরে আসবে না এবং বাংলাদেশ এক নতুন পথে এগোবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, সামনে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সোমবার সচিবদের সঙ্গে আয়োজিত এক গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য তুলে ধরেন তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। প্রেস সচিব জানান, অনুষ্ঠানে সিনিয়র সচিব ও সচিবসহ প্রায় ৭০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা সীমিত পরিসরে বক্তব্য দেন এবং পরে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন। আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অতীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো প্রকৃত অর্থে নির্বাচন ছিল না, বরং ভুয়া নির্বাচন ছিল। তবে এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি এবং দেশ প্রায় লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোট দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনবে। তার মতে, এই প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা সরাসরি দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোটারদের সুবিধার্থে একটি অ্যাপ চালু করা হয়েছে এবং প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে পৃথক নির্বাচনভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি ‘নির্বাচন বন্ধু হটলাইন–৩৩৩’ চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার এবং সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক নির্বাচন পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসছেন, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত বহন করে। আগের তিনটি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নির্বাচনী পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বড় কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি এবং নির্বাচনী প্রচারণা শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সচিবদের ধন্যবাদ জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গত ১৮ মাসে প্রশাসনের কাজ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। এ সময়ে প্রায় ১৩০টি অধ্যাদেশ জারি ও বাস্তবায়নে সচিবরা কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সামনে আরও উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশে এসে শিল্পকারখানা স্থাপন করবেন এবং তরুণ জনগোষ্ঠী বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে অন্যান্য দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে বলেও জানান তিনি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা।
পবিত্র শবে বরাতকে আল্লাহর রহমত লাভের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা এবং মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক বাণীতে পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা এ আহ্বান জানান। আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে পালিত হবে পবিত্র শবে বরাত। হিজরি সনের শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী রাত শবে বরাত হিসেবে পালন করে থাকেন মুসলমানরা। পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে উল্লেখ করা হয়, পবিত্র শবে বরাত আমাদের জীবনে রহমত, মাগফেরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। হাদিসে বর্ণিত আছে, এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে বিশেষভাবে ক্ষমা করেন। তাই এ রাতকে সৌভাগ্যময় রজনি হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মহিমান্বিত এই রাতে আমরা ইবাদত-বন্দেগি, দান-সদকার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও ক্ষমা লাভ করতে পারি। আত্মসমালোচনা ও তওবার মাধ্যমে জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা অর্জন করতে পারি আল্লাহ তায়ালার অসীম অনুগ্রহ, বরকত ও মাগফেরাত। তিনি বলেন, পবিত্র শবে বরাতকে আল্লাহর রহমত লাভের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে আমরা দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা করি এবং মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। সকল অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও কুসংস্কার পরিহার করে শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুপম সৌন্দর্যে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনকে আলোকিত করি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সকলকে ক্ষমা ও হেফাজত করুন। আমীন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চীন-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব ফোরামের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করেছেন। গত বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটির প্রতিনিধিদলে চীনের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী, বায়োমেডিকেল, অবকাঠামো, ডিজিটাল ও আইন খাতের প্রতিনিধি এবং শিল্পনেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বৈঠকে সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক ও খ্যাতনামা বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী সিন-ইউয়ান ফু অধ্যাপক ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের সঙ্গে যৌথভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শুক্রবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বৈঠকে ‘ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজি’র পরিচালনা পর্ষদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওং এবং ‘ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকের (সিঙ্গাপুর)’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউচিং ইয়াও বাংলাদেশে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের কথা জানান। অন্তত ২২টি দেশে টিকা রপ্তানি করা এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পিসিভি ও এইচপিভি টিকা উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ায়তেও তাদের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন সিঙ্গাপুর রোবোটিকস সোসাইটির সহসভাপতি জিনসং ওয়াং, ফোর্ডাল ল ফার্মের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ইউয়ান ফেং, বেইজিং উতং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লি রান, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রকল্প বিষয়ক সহসভাপতি গাও ঝিপেং, চায়না হুনান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বিনিয়োগ পরিচালক শু তিয়ানঝাও, চায়না সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের সহসভাপতি হুয়া জিয়ে, পাওয়ার চায়না ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বৈদেশিক বাজার বিষয়ক মহাব্যবস্থাপক চেন শুজিয়ান, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মা শিয়াওইউয়ান এবং চীন-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব ফোরামের মহাসচিব অ্যালেক্স ওয়াং জেকাই। চীনা প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশন নিয়ে তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। বৈঠকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মাইক্রোক্রেডিট আন্দোলনের সূত্র ধরে চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চীনের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে তিনি মানুষের জীবনে পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। পরে সেই ধারণা অনুসরণ করে চীন নিজস্ব কর্মসূচি চালু করে। গত বছরের মার্চে চীন সফরের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ওই সফরে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রেসিডেন্ট আমাকে জানিয়েছেন, আমার বই তিনি পড়েছেন এবং নীতিগুলো অনুসরণ করেছেন, যা আমার জন্য আনন্দের মুহূর্ত ছিল। শিগগিরই নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন, তবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কাজ চলমান থাকতে হবে। স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, স্বাস্থ্যখাতই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসক ও রোগীর সংযোগ, চিকিৎসা ইতিহাসের ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই লক্ষ্য। পাশাপাশি, ওষুধ খাতে সামাজিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। অধ্যাপক ইউনূস জানান, অল্প খরচে উৎপাদিত ওষুধ উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়, এ অবস্থা বদলাতে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান তারা। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত টিকার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও স্মরণ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, মানুষ মারা যাচ্ছিল, অথচ কেউ কেউ লাভ করছিল, এটা লজ্জাজনক। এ সময় উত্তরাঞ্চলে ‘হেলথ সিটি’ গড়ার ভাবনার কথাও তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, সেখানে ১ হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র, টিকা উৎপাদন ও ওষুধ শিল্পসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম এক জায়গায় গড়ে তোলা হবে। এতে প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও ভুটানের মানুষও উপকৃত হতে পারবেন। বৈঠক শেষে অধ্যাপক ইউনূস ধারাবাহিক সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৫-২০২৮ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হলো আমদানি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে প্রণয়ন করা যাতে রপ্তানিমুখী কার্যক্রমকে উৎসাহ দেওয়া যায় এবং দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীল অবদান রাখা যায়। শফিকুল আলম বলেন, রপ্তানি সক্ষমতা নির্ভর করছে আমদানি নীতি কতটা কার্যকরভাবে প্রণীত হচ্ছে তার ওপর। নতুন নীতি আমদানি প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক সুবিধা বাড়াবে। এবার কাস্টমস শুল্ক ও অন্যান্য কর ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে, যা মোট রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়ক হবে। এছাড়া ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের দ্বিতীয়বার যাচাই-বিশ্লেষণের সুযোগ থাকবে, যা আগে সম্ভব ছিল না। তিনি আরও জানান, নতুন নীতি বাস্তবায়নের ফলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজ হবে। দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন যে বিদ্যমান পরিবেশ পুরোপুরি বাণিজ্য-সহায়ক নয়। নতুন নীতির মাধ্যমে তা আরও সহায়ক হবে এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রেস সচিব বলেন, নতুন বিধান অনুযায়ী রপ্তানিমুখী শিল্প যেমন—তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, জাহাজ নির্মাণ, আসবাবপত্র ও ফার্নিশিং খাতের কারখানা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করতে পারবে। এতে এসব খাতের রপ্তানির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। নতুন আমদানি নীতি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি রপ্তানি খাতকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের ৫ বছরের বেশি সরকারি চাকরি করা উচিত নয় বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের পাঁচ বছরের বেশি চাকরি করা উচিৎ না। তাহলে তার মাইন্ড সেট হয়ে যায়। সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর পর পর নতুন করে শুরু করা উচিত। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্য পরিবর্তন হলেও মানুষরা সেই প্রতিষ্ঠানে পুরোনো ধ্যান ধারণা নিয়ে বসে রয়েছে।’ আজ বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এর ওয়েবসাইট ও লোগো উন্মোচন করেন। সবাইকে চাকরির দিকে না ঝুঁকে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সবার জন্য চাকরি নিশ্চিতের ধারণা একটি ভুল জিনিস। এটি একটি দাস প্রথার শামিল। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সরকারকে সহায়তা করতে হবে। জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে জুলাই আন্দোলন যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিল, তেমনই ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন করবে। জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে।’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। পরে প্রধান উপদেষ্টা প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
সবার জন্য চাকরি নিশ্চিতের ধারণা একটি ভুল জিনিস উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এটি দাস প্রথার শামিল। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সরকারকে সহায়তা করতে হবে। আজ (২৮ জানুয়ারি) বুধবার দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো–২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকার শুধু একটি সিস্টেম তৈরি করে দেবে এরপর জনগণ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি ব্যবহার করবে এটাই তথ্যপ্রযুক্তির প্রকৃত শক্তি। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের উদাহরণ টেনে বলেন, তিন পার্বত্য জেলায় থাকা প্রায় আড়াই হাজার স্কুলের মধ্যে মাত্র ১২টিতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। যেসব স্কুলে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে ইন্টারনেটই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষক। ড. ইউনূস বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পর যে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি মহাশক্তিশালী সরকারের পতনের পথ তৈরি করেছিল। তিনি মনে করেন, এই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যেই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক নেতৃত্বের বীজ নিহিত রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জালিয়াতিতে সেরা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে হলে এই জালিয়াতির সংস্কৃতি বন্ধ করতেই হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে মাথা উঁচু করে চলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে, শুধু সঠিক পথে এগোতে হবে। সরকারি চাকরির কাঠামো নিয়েও ভিন্নমত প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার পাঁচ বছরের বেশি একই চাকরিতে থাকা উচিত নয়, কারণ এতে চিন্তাধারা স্থবির হয়ে পড়ে এবং সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। একইভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর পরপর নতুন করে শুরু করা প্রয়োজন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল খাতই মূল চালিকাশক্তি। এই খাত থেকেই সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য সব খাতে পরিবর্তন আসবে। তবে নাগরিক সেবার ডিজিটালাইজেশন এখনও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews