উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এমন দেশগুলোতে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে ইরাকে নতুন গোপন সেল গঠন করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে এবং ইরাকের পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পাশ কাটিয়ে এসব সেল পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ইরাকের আটটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি ইরাকে তিন থেকে চারটি গোপন সেল গঠন করেছে। প্রতিটি সেলে প্রায় ১০ জন করে বাছাই করা ইরাকি শিয়া যোদ্ধা রয়েছেন। তিনটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব সেল ২০ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত দক্ষিণ ইরাকের বসরা ও সামাওয়ার কাছাকাছি মরুভূমি এলাকা থেকে কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে অন্তত সাতটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব সেলের অনেক সদস্যকে ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ থেকে নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার যোদ্ধা নিয়ে গঠিত এই জোটটি ইরাকের কট্টরপন্থী শিয়া গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম। তবে নতুন সেলগুলো ওই জোটের প্রচলিত কমান্ড কাঠামোর বাইরে কাজ করছে এবং সরাসরি আইআরজিসির নির্দেশনা অনুসরণ করছে বলে দাবি করেছে রয়টার্সের সূত্রগুলো। আটটি সূত্রের মধ্যে রয়েছেন দুইজন ইরাকি সামরিক কর্মকর্তা, একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং পাঁচজন স্থানীয় মিলিশিয়া কমান্ডার। রয়টার্স বলছে, ইরাকে এই ধরনের গোপন সেল গঠনের বিষয়টি আগে প্রকাশ্যে আসেনি। পাঁচজন মিলিশিয়া কমান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা কমে আসা এবং ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আইআরজিসি তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনছে। শিয়া-অধ্যুষিত ইরাকে বহু সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অধিকাংশের সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন এবং ইরাকজুড়ে বিস্তৃত ইরানের তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় এসব গোষ্ঠী। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপের পর ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর ব্যানারে পরিচালিত গোষ্ঠীগুলো ইরাকে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনার বিরুদ্ধে একাধিক ড্রোন ও রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও কয়েকটি প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ বা প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যায়নি। গত বছর থেকে ইরাকের কয়েকটি প্রভাবশালী শিয়া গোষ্ঠী ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে অস্ত্র সমর্পণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কার্যক্রমে বেশি মনোযোগ দিতে প্রস্তুত। শাসক শিয়া জোটের দুই আইনপ্রণেতা এবং ইরাকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জসিম আল-বাহাদলি জানিয়েছেন, শিয়া গোষ্ঠীগুলোর এই অবস্থানের কারণেই আইআরজিসি সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে। ইরাকে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার জন্য বাগদাদ সরকারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের এমন অবস্থানের পর চলতি মাসে ‘আসাইব আহল আল-হাক’ এবং ‘ইমাম আলী ব্রিগেডস’ নামে দুটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র সমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেয়। শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী বিষয়ে গবেষক জসিম আল-বাহাদলি বলেন, আইআরজিসির গড়ে তোলা নতুন দলগুলো আকারে ছোট হলেও মতাদর্শগতভাবে অধিক কঠোর এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। তার মতে, অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবেই ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির মধ্যে টেলিফোনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) অনুষ্ঠিত এই ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কাতারের ভূমিকার প্রশংসা করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাতারের গঠনমূলক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সমঝোতা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কাতারের আমির আরও বলেন, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখতে দোহার কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকবে। দুই নেতার আলোচনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। সূত্র: কাতার নিউজ এজেন্সি
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আসন্ন আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে সন্তুষ্ট না হলে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সম্মতি দেবে না ফ্রান্স। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আলোচনায় শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বারো বলেন, ইরানের কাছ থেকে বড় ধরনের ছাড় নিশ্চিত হলেই কেবল জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং ভেটো ক্ষমতাধারী দেশ হিসেবে ফ্রান্সের অবস্থান ছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব নয়। তার ভাষায়, “ইরানের অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন আনাই আমাদের লক্ষ্য। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে এই সংকটের সমাধানে ফ্রান্সের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার বাইরে থাকা ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি পরবর্তী দফার আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইরানের ওপর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহুপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি তখনই বিবেচনা করা হবে, যখন তেহরানের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হবে। ইইউভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজা কালাস। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। কাজা কালাস বলেন, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূল হলে ইইউ-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো অবশ্যই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা উপযুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। তবে আমরা এখনও সেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি।’ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ৭০০-এরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর বহুপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইউরোপে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ জব্দের মতো কঠোর ব্যবস্থা। এর আগে, ইউরোপের শীর্ষ চার দেশ ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ অবসান, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে দুই দেশের একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পরই মূলত ইউরোপের দেশগুলো থেকে এই ইতিবাচক সাড়া আসে। এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি—এই চার (ই-৪) দেশ গত রোববার জানায়, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের চুক্তি হওয়ার পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচির পরবর্তী পদক্ষেপ ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে তারা দেশটির ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে প্রস্তুত। যৌথ বিবৃতিতে চার দেশের নেতারা আরও বলেছেন, ‘ইরান যেন কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, আমরা সেই লক্ষ্যে আমেরিকা, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে কাজ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন চুক্তির পর ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেছে ওয়াশিংটন। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর থাকা নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি চুক্তি বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, চুক্তির কিছু বিষয় নিয়ে তার ব্যক্তিগত আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি এতে অনুমোদন দিয়েছেন। খামেনির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তাকে আশ্বস্ত করার পরই তিনি চুক্তিতে সম্মতি দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরান তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসেছে বা যুক্তরাষ্ট্রের সব অবস্থান মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি খামেনির মন্তব্যের জবাব না দিলেও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বিশেষভাবে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। এদিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, চুক্তি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছে। এই সময়ে দুই দেশ বিভিন্ন কারিগরি ও রাজনৈতিক বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করবে। ভ্যান্স জানান, আলোচনার পরবর্তী ধাপ পরিচালনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে সুইজারল্যান্ড সফর করতে পারেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান চুক্তির সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের সুযোগ পাবে না। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ও স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এ ছাড়া চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। তবে ওই তহবিলে অর্থায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে জানানো হয়েছে। চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। প্রয়োজন হলে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষরের একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, দুই পক্ষ ইতোমধ্যে দূরবর্তী পদ্ধতিতে নথিতে স্বাক্ষর করায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চুক্তি বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ বৈরিতার পর এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনা কতটা কার্যকরভাবে এগিয়ে যায় এবং উভয় পক্ষ চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিকতা দেখায় তার ওপর।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সপরিবারে হত্যা এবং একই দিনে মিনাব শহরের একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ১৬৮ জন শিশু শিক্ষার্থীকে হত্যার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে তীব্র যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রথমে ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের হুমকি দেওয়া হলেও, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা ও ইসরাইলে পাল্টা আঘাত শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলারের ব্যয়বহুল রাডার সিস্টেম ইরানের স্বল্প মূল্যের ড্রোনের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর অবশেষে মার্কিন প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে এবং ইরানের শর্ত মেনেই সমঝোতায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক বিজয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। যুদ্ধ বন্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে আলোচনার টেবিলে রাখা ১৪ দফার একটি সমঝোতা প্রস্তাবে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সই করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার রাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তির ইলেকট্রনিক সংস্করণে সই করার মাধ্যমে তেহরানের চূড়ান্ত স্বীকৃতি নিশ্চিত করেন। আজ সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক শহরে এই অন্তর্বর্তী চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে যাচ্ছে, যেখানে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি প্রণয়নের লক্ষ্যে পরবর্তী রূপরেখা নিয়ে দুপক্ষ আলোচনা করবে। এই আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। এছাড়া মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশও এই আলোচনায় অংশ নেবে। অনানুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে আসা চুক্তির খসড়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এতে মূলত ইরানের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করা হবে এবং দেশটির অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য ৩ হাজার কোটি ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। পাশাপাশি, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য, ব্যাংকিং, বিমা ও পরিবহন খাতের ওপর থেকে সব ধরনের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এর বিপরীতে ইরান স্পষ্ট করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না এবং পরমাণু বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনার বিষয়টি পরবর্তী সময়ের জন্য রাখা হয়েছে। এই চুক্তির ইতিবাচক প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ৩ ডলার কমে বর্তমানে ৭৮.৬৪ ডলারে নেমে এসেছে। এদিকে ইরানের সাথে এই চুক্তি করায় মার্কিন অভ্যন্তরীণ politics বা রাজনীতিতে সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে সমালোচকদের ‘বোকা ও হিংসুক’ আখ্যা দিয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, মার্কিন শেয়ারবাজার যখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এবং তেলের দাম কমছে, তখন এমন সমালোচনা স্রেফ নির্বুদ্ধিতা। অন্যদিকে, এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, কোনো চাপ বা হুমকিতে তাঁরা নিজেদের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে বিকিয়ে দেননি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে চুক্তি ঘোষণার পর লেবানন ও গাজায় ইসরাইলি সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও হামলা পুরোপুরি থামেনি এবং গতকালও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে বহুল প্রত্যাশিত শান্তি চুক্তি অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঐতিহাসিক সাক্ষী হতে সুইজারল্যান্ড সফরে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে এই সফরের স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ইতিমধ্যে ইলেকট্রনিক উপায়ে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে এই চুক্তিটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আর এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের পূর্বনির্ধারিত প্রস্তাবিত সুইজারল্যান্ড সফরটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের পরবর্তী কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক কয়েক স্তরের প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সমর্থন ও সহযোগিতা সর্বদা অব্যাহত থাকবে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যকার এই সমঝোতা স্মারক অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেবে এবং এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ওই অঞ্চলে আরোপিত তাদের নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক সহযোগীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের প্যালেস অব ভার্সাইয়ে মোমবাতির আলোয় নৈশভোজের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। সেই বিশেষ মুহূর্তে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং উপস্থিত অন্যান্য বিশ্বনেতারা তালি দিয়ে এই চুক্তিকে স্বাগত জানান। প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘‘এইমাত্র চুক্তিতে স্বাক্ষর করলাম।’’ অন্যদিকে এই চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইরান প্রশাসনও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শান্তি চুক্তির মূল দলিলটি দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটবে বলে আশা করছে আন্তর্জাতিক মহল। সূত্র: এএফপি এবং ডন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া উচিত। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের অনেক অর্থ আটকে রেখেছি। সেই অর্থ আমাদের নয়, ইরানের। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমরা সেই অর্থ জব্দ করেছিলাম। আমার বিশ্বাস, একসময় সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ধরে রাখতে এ ধরনের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, “যদি বৈধ অর্থ ফেরত না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউই ডলারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে চাইবে না।” সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। চলমান আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো। বিশেষ করে লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম সীমিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রাম্প জানান, ইরান যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং সমঝোতার শর্তগুলো মেনে চলে, তাহলে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা সরাসরি কোনো অর্থ সহায়তা দিচ্ছি না। তবে ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে এবং ইতিবাচক পথে এগোয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে পারবেন।” তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে ইরান বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের মতে, দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। সংবাদ সম্মেলনে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চললে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো দুই দেশের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে যেকোনো চূড়ান্ত সমঝোতার আগে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার গতিপথই নির্ধারণ করবে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এর প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের ১১টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তি সমঝোতার খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলাচল করা জাহাজগুলোর মধ্যে আটটি পণ্যবাহী জাহাজ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি হয়ে ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করে। নতুন সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকে লক্ষ্য করে আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। এর বিনিময়ে আগামী ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ ও শুল্কমুক্ত যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান নিয়ে দেওয়া একটি পোস্ট সরিয়ে ফেলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পরবর্তীতে পুনরায় দেওয়া পোস্টে আসন্ন আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কোনো উল্লেখ রাখা হয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শেহবাজ শরিফ তার আগের পোস্টে বলেছিলেন, পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারী কাতারের সমর্থনে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করতে ২০২৬ সালের ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। তবে পরে তিনি সেই পোস্টটি সরিয়ে ফেলেন এবং সংশোধিত পোস্টে অনুষ্ঠান বা চুক্তি স্বাক্ষর সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ করেননি। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা আপাতত নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা আগেও শুক্রবারের বৈঠকটি নিশ্চিত ছিল। কিন্তু যখন দুই পক্ষের (ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র) প্রেসিডেন্টরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়, তখন শুক্রবারের বৈঠকের বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সময়সূচি এবং চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান স্পষ্ট নয়, ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘ব্যর্থতার দলিল’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। গালিবাফ বলেন, ‘এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল। জনগণ তা দেখবে এবং বিচার করবে।’ তিনি আরও বলেন, ইরান বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে। তার মতে, রণক্ষেত্রের বিজয় এই আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। গালিবাফ বলেন, ‘বর্তমান আলোচনা এবং পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে পার্থক্য হলো, আজ এই রণক্ষেত্রের বিজয়ের পতাকা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।’ তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া প্রতিটি যুদ্ধ, যদি শেষ পর্যন্ত একটি আইনি ও রাজনৈতিক দলিলে পরিণত না হয় এবং সেই বিজয়গুলো লিপিবদ্ধ না করা হয়, তবে তা কোনো সুফল বয়ে আনবে না।’ ইরানের এই শীর্ষ আলোচকের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা প্রক্রিয়া নিয়ে দেশটির কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা আদালতে দাখিল করা শপথনামায় দাবি করেছেন, ইরানে সামরিক অভিযানের সময় ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘গ্রোক’ ব্যবহার করেছে মার্কিন প্রশাসন। নথি অনুযায়ী, ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ২ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ২ হাজারের বেশি অস্ত্র ব্যবহারের অভিযানে এ প্রযুক্তি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পেন্টাগনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা ক্যামেরন স্ট্যানলি আদালতে জমা দেওয়া শপথনামায় গ্রোককে “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি বিভিন্ন মিশন-গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটিই সম্ভবত প্রথমবারের মতো কোনো সরকারি নথিতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হলো যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ইলন মাস্কের এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তবে পেন্টাগনের সামরিক কর্মকাণ্ডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বেসামরিক হতাহতের ঘটনাগুলো সামনে আসার পর এআই-নির্ভর লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন ও হামলা পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন এই তথ্য সামনে আসে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার সংগঠন এনএএসিপির করা একটি মামলার শুনানিতে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান এক্সএআই-এর ‘কলোসাস ২’ ডেটা সেন্টার প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই অন্তত ৫৭টি গ্যাসচালিত টারবাইন পরিচালনা করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ বা পরিচ্ছন্ন বায়ু আইন লঙ্ঘন করে। মামলার নথিতে গ্রোকের জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, যা পরে জনসমক্ষে আসে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ‘ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ঘটায়নি’ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ঘটনাটি এখনও তদন্তাধীন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভুল হয়ে থাকে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ওই কাজ করেনি। যুদ্ধে ভুল হয়েই থাকে। যুদ্ধ খুবই নিষ্ঠুর। বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন।” গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই মিনাবের ওই বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় ১৭৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হন। এদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হতে পারে। তদন্তের পরিধি ইতোমধ্যে বাড়িয়েছে পেন্টাগন। তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ বা স্বীকার করেনি। হামলার পরপরই ট্রাম্প কোনো প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই এর জন্য ইরানকে দায়ী করেছিলেন। পরে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বলেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে এবং তদন্তের ফলাফল তিনি মেনে নেবেন। গত মাসে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর প্রধান জানান, তদন্ত প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। কারণ, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়টি ইরানের একটি সক্রিয় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সীমানার ভেতরে অবস্থিত। তবে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিদ্যালয়টির সংরক্ষিত ওয়েবসাইট তথ্য অনুযায়ী, এটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর একটি স্থাপনার পাশেই অবস্থিত ছিল। এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভবত পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত বহুল আলোচিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) খুব শিগগিরই কার্যকর হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমঝোতা কার্যকর করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও এই জলপথে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্পষ্ট ভাষায় জানান, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা স্মারকটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।” তিনি বলেন, এই চুক্তিকে সামনে রেখে আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তী কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে। পাকিস্তানের উদ্যোগে এবং কাতারের সহায়তায় অনুষ্ঠেয় এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এটি ইতিবাচক বার্তা দেবে বলেও মনে করা হচ্ছে। শাহবাজ শরিফ এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলবে। তার ভাষায়, “এই সমঝোতা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এই জলপথ স্বাভাবিকভাবে চালু হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিশেষ করে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত পরিস্থিতি প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতেও ভূমিকা রাখবে।
দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বহুল আলোচিত একটি সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছে। ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শিরোনামের এই চুক্তিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি মুখোমুখি না হয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তির মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে শিথিল করার কথাও বলা হয়েছে। তবে পুরো চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় শুরুতে সমালোচনা তৈরি হয়। পরবর্তীতে সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ আংশিক বিবরণ প্রকাশ করে। মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সমঝোতার ফলে দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হবে এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগও তৈরি হবে। তিনি বলেন, ইরান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে যুক্তরাষ্ট্রও ইতিবাচক সাড়া দেবে এবং অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়ানো হবে। জানা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকটি স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশ বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক সংঘাত বন্ধে সম্মত হয়েছে। বিশেষ করে লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে উভয় পক্ষ স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করবে। পাশাপাশি একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ তুলে নেবে। একই সময়ের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, যার মধ্যে সমুদ্রের মাইন অপসারণও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে ইরান। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে এই সমঝোতায়। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের নিয়ে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরির কথা জানিয়েছে, যা ইরানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান আবারও জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের পথে যাবে না। মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় নিষ্ক্রিয় করার বিষয়েও দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) তদারকির ভূমিকা পালন করবে। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান স্তর অক্ষুণ্ন রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি পর্যন্ত পথ সহজ হবে না বলেও সতর্ক করছেন তারা।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ইরান ও লেবাননকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহায়তার অংশ হিসেবে বেইজিং এই সহায়তা প্রদান করবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান রাজধানী বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ে চীন গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চীন ইরান ও লেবাননকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশ দুটির জনগণকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহায়তা করার পাশাপাশি অর্থনীতি ও জীবিকার উন্নয়নে সহযোগিতা করা হবে।” চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এই সহায়তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র মানবিক সংকট মোকাবিলা নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠন কার্যক্রমকে সহায়তা করা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো তেহরানের জন্য মানবিক সহায়তা ঘোষণা করল বেইজিং। এর আগে মার্চ মাসেও চীন ইরানের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছিল। এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন সমঝোতার আলোচনা চলছে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের অবসান ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। চীনের এই সহায়তা ঘোষণাকে বিশ্লেষকরা যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বেইজিংয়ের সক্রিয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান এখন কার্যত প্রয়োজন হলে যে কোনো সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনটি সূত্রের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এই কৌশলগত জলপথ নিয়ে ইরানের প্রভাব ও সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এই মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলমান সংঘাত চলাকালীন ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পদক্ষেপ আবারও নেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণ। একজন সূত্র সিএনএনকে বলেন, “আমরা এখন কার্যত ইরানকে এই প্রণালীর ওপর প্রভাবশালী অবস্থানে বসিয়ে দিয়েছি, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।” আরেকটি সূত্র জানায়, যুদ্ধ চলাকালে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে লক্ষ্যভিত্তিক হামলার মাধ্যমে ‘অসামরিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা’ও অর্জন করেছে, যা ভবিষ্যতে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত না মানে, তবে তারা কোনো সুবিধা পাবে না। তার ভাষায়, “প্রণালী খোলা থাকলেই কেবল সুবিধা দেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, যা নির্ভর করবে ইরানের বাস্তব অগ্রগতির ওপর। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো চূড়ান্ত রূপরেখা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী আবার পুরোপুরি চালু হলেও অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে, যার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান এবং মাইন স্থাপনের সক্ষমতা এই প্রণালীকে ভবিষ্যতেও ঝুঁকিপূর্ণ রাখতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে চাপ তৈরির বিকল্প কৌশল নিয়েও ভাবছে, যা কার্যকর হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরও বড় বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, কারণ উভয় পক্ষই এখন কৌশলগত এই জলপথকে ভবিষ্যৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পূর্ণাঙ্গ পাঠ দ্রুত প্রকাশের চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তির লিখিত ভাষাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ এতে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আড়ালের সমঝোতা বা ‘ব্যাক-চ্যানেল’ অঙ্গীকারগুলোর প্রতিফলন নেই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে কর্মকর্তারা জানান, চুক্তির পাঠ ইচ্ছাকৃতভাবে বেশ অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সামনে শুরু হতে যাওয়া জটিল ও কারিগরি পর্যায়ের সরাসরি আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ইরান নিজ দেশের জনগণের কাছে চুক্তিটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যে দেড় পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের কথা বলেছেন, তাতে ইরানের দেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের উল্লেখ নেই। তাদের দাবি, এসব প্রতিশ্রুতিই যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তিতে সম্মত হতে অতিরিক্ত আস্থা জুগিয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “এমওইউর ভাষা নিয়ে মানুষের বেশি কিছু অনুমান করা উচিত নয়।” তিনি চুক্তিটিকে মূলত একটি “রাজনৈতিক দলিল” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, “আসল দলিলের চেয়ে আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই চুক্তি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা করা এবং জব্দকৃত অর্থ ছাড়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব হবে।” তবে তিনি স্পষ্ট করেন, আলোচনায় অগ্রগতির ওপর নির্ভর করেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও তহবিল ছাড় করা হবে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও শর্ত নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত এসব সুবিধা কার্যকর হবে না। চুক্তির পাঠ দেখেছেন এমন একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, এতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই ইউরেনিয়াম ধ্বংসের প্রক্রিয়া তদারকি করবে। চুক্তিতে কেবল বলা হয়েছে, ইরান “কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না”। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তিতেও তেহরান একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, আনুষ্ঠানিক নথিতে না থাকলেও গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশিত কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সমন্বয়ে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংসে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিষয়টিও রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। চুক্তির আর্থিক অংশে তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে ইরান ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি উন্নয়ন তহবিল থেকে সুবিধা পেতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স দুজনই জোর দিয়ে বলেছেন, এই তহবিলে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা হবে না। ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের বিষয়েও চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ আলোচনায় অগ্রগতি হলে এসব সম্পদ ধাপে ধাপে ছাড় করা হবে এবং ইরানের জন্য সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রি করতে পারবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা ছাড়পত্রও যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, চুক্তিটি পুরোপুরি “কর্মসম্পাদনভিত্তিক”। ইরান কেবল তখনই এর সুবিধা পাবে, যখন তারা চুক্তির সব শর্ত মেনে চলবে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরপেক্ষ করা এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বাধা না দেওয়া। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ না হলেও এর কপি ইতোমধ্যে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি–৭ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইউরোপীয় ও অন্যান্য দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘুরছে বলে জানা গেছে। ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে বিভিন্ন দেশের নেতা ট্রাম্পের কাছে চুক্তির কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছেন বলে জানা যায়। চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। তাদের জানতে চাওয়া, ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত একটি কাঠামোগত চুক্তি কেন এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি প্রকাশ করতে চায়। তবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর অনুরোধে প্রকাশের সময়সূচি সমন্বয় করা হচ্ছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “কাতার ও পাকিস্তান পুরো আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। তারা চেয়েছে চুক্তি প্রকাশের প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হোক।” সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা দ্রুত চুক্তির পাঠ প্রকাশ করতে আগ্রহী হলেও ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার প্রতি কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই চুক্তির পাঠ প্রকাশ করা হোক। তারা আমাদের শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছে। তবে আমরা এর আগেই প্রকাশের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছি।” কর্মকর্তাদের মতে, বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির অবস্থান। তিনি সমঝোতা স্মারকে নীরব সমর্থন দিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে তিনি কোনো বিবৃতি দেবেন কি না, তা নিয়েও তেহরানে আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনি একটি “আনুষ্ঠানিক পরিবেশে” চুক্তিটি প্রকাশ করতে চান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দলিলটির বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি এতটাই সন্তুষ্ট যে চাইলে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে শব্দে শব্দে তা পড়ে শোনাতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, বাকি অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী দফার আলোচনা প্রথম পর্বের তুলনায় অনেক সহজ হবে। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমাকে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা “পরীক্ষামূলক পর্ব” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটন মূল্যায়ন করবে ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কতদূর ছাড় দিতে প্রস্তুত। একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা মূলত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিয়েই বেশি মনোযোগী। শেষ পর্যন্ত আস্থা তৈরি এবং বাস্তব বিষয়গুলোতে অগ্রগতি অর্জনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত নতুন চুক্তির আওতায় ইরানে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বেসরকারি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চুক্তি সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তহবিলটির অর্ধেকেরও বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র জানায়, চলমান সংঘাতের স্থায়ী অবসান এবং একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয় পক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে উৎসাহিত করতেই এই তহবিলের ধারণা তৈরি করা হয়েছে। আগামী শুক্রবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তহবিলটির পুরো অর্থই আসবে বেসরকারি খাত থেকে। এতে কোনো সরকারি অর্থ বা অনুদান থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন কোম্পানি এতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। গত রোববার মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতার কথা জানান। চুক্তি কার্যকর হলে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো যুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ বা পুনর্গঠন তহবিল নয়; বরং একটি বেসরকারি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম। তহবিলের অর্থ মূলত জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদন ও লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ করা হবে। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান প্রথমে যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে বিকল্প হিসেবে ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল’ গঠনের ধারণা সামনে আসে। এই তহবিলের আওতায় যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মোবারকেহ স্টিল কমপ্লেক্স, বিভিন্ন তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। দীর্ঘ কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল ইরানের অর্থনীতি। অথচ দেশটির রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুদ। পাশাপাশি ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যা এবং পেট্রোকেমিক্যাল, খনি, কৃষি ও পর্যটনের মতো সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। সূত্রটি জানিয়েছে, ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা বা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনার সঙ্গে এই তহবিলের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এটি কার্যকর হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিন প্রকল্পের কাঠামো, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ চলবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই উদ্যোগে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তান বা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এদিকে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরানকে এই তহবিলের সুবিধা পেতে হলে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থার মতো কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কোম্পানি তহবিলে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও কৌশলগত কারণে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। আগামী দুই মাসে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে দুই দেশ। সূত্র: রয়টার্স
ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল দেওয়ার খবর সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ওয়াশিংটন সরাসরি তেহরানকে কোনো অর্থ দিচ্ছে না; বরং সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অন্য দেশগুলোর বিনিয়োগের পথ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বিষয়টি পরিষ্কার করেন। ‘দ্য মেগান কেলি শো’-তে সাংবাদিক মেগান কেলির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে এবং তাদের আচরণে পরিবর্তন আনে, তাহলে দেশটির ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। এতে করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে। ভ্যান্স উদাহরণ দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি ইরানে কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করতে চায়, তাহলে বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর কারণে তা সম্ভব নয়। তবে ইরান শর্ত পূরণ করলে এই বাধাগুলো শিথিল হতে পারে। তিনি আরও বলেন, “যারা বলছেন আমরা ইরানকে অর্থ দিচ্ছি, তারা ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। আমরা কেবল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে ইরান তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনলে অন্যান্য দেশ সেখানে বিনিয়োগ করতে পারবে এবং দেশের পুনর্গঠন ও জনগণের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।” এদিকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কাঠামোগত চুক্তির অংশ হিসেবে একটি বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যার আকার হতে পারে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এই তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত হয়েছে। তবে এই তহবিল সরকারি নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনো অর্থ বা অনুদান থাকবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশসমূহ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বেসরকারি কোম্পানিগুলো এতে বিনিয়োগ করবে। জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মতো খাতে এসব অর্থ ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ নামে পরিচিত এই তহবিলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয় পক্ষকে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়া। একটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে তেহরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন সরাসরি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। পরিবর্তে বিনিয়োগনির্ভর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রস্তাব সামনে আনে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান বৈশ্বিক বিনিয়োগ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। যদিও দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ—বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস ও তেলের মজুদ রয়েছে সেখানে। পাশাপাশি বড় জনসংখ্যা ও সম্ভাবনাময় শিল্পখাত থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগের অভাবে সেসব সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সূত্রগুলো আরও জানায়, সম্ভাব্য এই তহবিল গঠন এবং কার্যক্রম শুরু হবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর। সমঝোতা স্মারক সইয়ের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে বিনিয়োগ কাঠামো চূড়ান্ত করা হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণ ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা চলবে। এর আগে গত রোববার (১৪ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক কাঠামোতে সম্মত হওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে বলে জানানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি অর্থ সহায়তার পরিবর্তে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হলে তা ইরানের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চুক্তির বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই এর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক। মঙ্গলবার (১৬ জুন) ইরান সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের আগেই এই পদক্ষেপ কার্যকর হয়েছে। ওই কূটনীতিক বলেন, ইরানের বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আরোপিত প্রায় দুই মাসের অবরোধ প্রত্যাহার ছিল তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি। তার ভাষায়, “আমরা শুরু থেকেই অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। এখন তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগেই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে।” এর আগে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক পোস্টে জানান, তিনি ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে এই ঘোষণার পরও পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বহুজাতিক নৌ নিরাপত্তা সংস্থা জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) সোমবার জানায়, চলমান যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ শুক্রবার পর্যন্ত বহাল থাকার কথা। ফলে বাস্তবে অবরোধ কতটা প্রত্যাহার হয়েছে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে। এর আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। এর জবাবে ইরানও অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন তেহরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সাম্প্রতিক আলোচনায় সেই অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ প্রত্যাহার কার্যকর হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা বাস্তবায়ন এবং যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বের ওপরই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুন্দর পিচাইয়ের বক্তব্য চলাকালীন ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ ও অনুষ্ঠান বর্জনের (ওয়াকআউট) ঘটনা ঘটেছে। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সুন্দর পিচাই প্রধান বক্তা হিসেবে মঞ্চে ওঠার পরপরই এই ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, সুন্দর পিচাই বক্তব্য শুরু করার মুহূর্তেই সমাবর্তনস্থলে উপস্থিত ১০০ জনেরও বেশি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী তাদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এ সময় তারা "ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন" (ফিলিস্তিনের মুক্তি চাই) বলে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিতে দিতে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। কট্টর বামপন্থী ছাত্র সংগঠন 'স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন' এবং 'নো টেক ফর অ্যাপার্থাইড'-এর যৌথ আহ্বানে এই প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে ইসরায়েল সরকারের সাথে গুগলের ১.২ বিলিয়ন ডলারের ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি 'প্রজেক্ট নিম্বাস'-কে দায়ী করা হচ্ছে। আমাজনের সাথে যৌথভাবে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে গুগল ইসরায়েল সরকারকে ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, গুগলের এই প্রযুক্তি ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি এবং ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও গুগল বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এটি কেবল সরকারি বেসামরিক কাজের জন্য একটি ক্লাউড সেবা। উল্লেখ্য, সুন্দর পিচাই নিজে ১৯৯৫ সালে এই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই মেটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসে তাকে এমন নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে পড়তে হলো। এর আগে ২০২৪ সালেও এই প্রজেক্ট নিম্বাসের বিরুদ্ধে গুগলের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবস্থান ধর্মঘট করলে গুগল কয়েক ডজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছিল। চলতি বছর আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের লক্ষ্য করে শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগেই অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গুগলের সাবেক সিইও এরিক শ্মিড বক্তব্য দিতে গেলে এআই প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে শিক্ষার্থীরা তাকে ধুয়ে দেয়। তবে স্ট্যানফোর্ডের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এই তুমুল হট্টগোল ও কক্ষ ত্যাগের মাঝেও সুন্দর পিচাই তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ভূ-রাজনীতির চেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার্থীদের আশাবাদী থাকার পরামর্শই বেশি প্রাধান্য পায়।