মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে মুখোমুখি অবস্থানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় ইরানি নৌবাহিনী। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, ছয়টি ইরানি গানবোট ট্যাংকারটিকে থামার নির্দেশ দিলেও মার্কিন নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপে সেটি নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়। তবে এই সামরিক উত্তেজনার আড়ালে বইছে ভিন্ন এক কূটনৈতিক হাওয়া। ঘটনার নেপথ্যে যা জানা যাচ্ছে: সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেক জানিয়েছে, ইরানি নৌযানগুলো সতর্ক থাকলেও কোনো সরাসরি আগ্রাসন দেখায়নি। তারা মূলত আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। একদিকে সামরিক হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে বসার আগ্রহ—ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিষ্কার করেছেন যে তারা সংঘাত নয়, বরং শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে ফিরছে। একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য সফরে রয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠকের পর তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসতে পারেন। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই অবস্থান কি কেবলই সামরিক শক্তি প্রদর্শন, নাকি ওয়াশিংটনের সাথে বড় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগের একটি কৌশলগত চাপ? সময় ও কূটনীতিই বলে দেবে আগামীর পথ।
হরমোজ প্রণালীতে মার্কিন তেলবাহী জাহাজকে ইরানের গানবোট ধাওয়া ও চ্যালেঞ্জ করেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেক। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ওমান থেকে প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল উত্তরে প্রণালীটি অতিক্রম করার সময় ‘স্টেনা ইম্পারেটিভ’ নামের জাহাজটির গতিরোধ করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সশস্ত্র সদস্যদের বহনকারী তিনজোড়া ছোট বোট। নিরাপত্তা সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ইরানি বোটগুলো রেডিওর মাধ্যমে জাহাজটিকে ইঞ্জিন বন্ধ করে তল্লাশির জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেয়। তবে জাহাজটির ক্যাপ্টেন সেই নির্দেশ অমান্য করে দ্রুত গতিতে নিজ গন্তব্যে এগিয়ে যান। সংস্থাটি জোর দিয়ে জানিয়েছে যে, জাহাজটি ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করেনি এবং বর্তমানে এটি মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজের পাহারায় নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। এর আগে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও জাহাজটির পরিচয় প্রকাশ করেনি। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ফারস জানিয়েছে, একটি নামহীন জাহাজ অবৈধভাবে তাদের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। ইরানি বাহিনী জাহাজটির প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র দেখতে চাইলে সেটি দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করে। বিশ্বের জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই হরমোজ প্রণালী দীর্ঘকাল ধরেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহেও আইআরজিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মার্কিন হামলার আশঙ্কায় এই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সূত্র: আল আরাবিয়া
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক হুমকির কড়া নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন সামরিক আগ্রাসন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত করা লিখিত বক্তব্যে লাভরভ এসব কথা বলেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এবং চাপ কমাতে রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। রাশিয়ার শীর্ষ এই কূটনীতিক বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার হুমকি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। লাভরভ আরও সতর্ক করে বলেন, ‘বিদেশি প্ররোচনায় সৃষ্ট অস্থিরতা’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যদি ‘২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত আগ্রাসন’ আবারও পুনরাবৃত্তি করা হয়, তাহলে তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এদিকে একই দিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ক্রেমলিনও জানায়, ইরান ইস্যুতে উত্তেজনা কমাতে মস্কো তার কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ বা সংরক্ষণসংক্রান্ত বিষয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করে আসছে রাশিয়া, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ দূর করা যায় এবং উত্তেজনা হ্রাস পায়। পেসকভ বলেন, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন দেশের জন্য বিরক্তিকর বা উদ্বেগজনক বিষয়গুলো দূর করার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে আসছে। তিনি আরও জানান, রাশিয়া সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে এবং সংঘাত উসকে দেওয়ার পরিবর্তে উত্তেজনা প্রশমনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। সূত্র: প্রেস টিভি
উত্তর আরব সাগরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী USS Abraham Lincoln-এর দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসা একটি ইরানি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান। মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে U.S. Central Command। বিবৃতিতে বলা হয়, ড্রোনটি রণতরীর নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করায় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে হামলা চালানো হয়। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানান, নৌবহরের কাছাকাছি অননুমোদিতভাবে ড্রোনের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক জলসীমায় গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সংঘর্ষ এড়াতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব সাগর ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই এই অঞ্চলে সামরিক নজরদারি ও উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এ ঘটনার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এমন ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ি। গত ৩১ জানুয়ারি (শনিবার) তেহরানের ইমাম খোমেনি হুসাইনিয়ায় আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে দেওয়া ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হুমকির কড়া সমালোচনা করেন। খামেনেয়ি তার ভাষণে বলেন, "আমেরিকানরা যদি এবার যুদ্ধ শুরু করার ধৃষ্টতা দেখায়, তবে সেটি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। মাঝেমধ্যেই তারা যুদ্ধজাহাজ, বিমান আর সামরিক শক্তির ভয় দেখায়—এসব আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়।" মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরানি জাতি এসব ফাঁকা বুলিকে ভয় পায় না এবং এ ধরনের হুমকি ইরানের জনগণের মনোবলকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারবে না। নিজের দেশের অবস্থান পরিষ্কার করে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ইরান কখনোই নিজে থেকে কোনো যুদ্ধ শুরু করবে না বা অন্য কোনো দেশ আক্রমণ করতে চায় না। তবে কেউ যদি ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানে বা হয়রানি করার চেষ্টা করে, তবে ইরানি জাতি তার এমন ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেবে যা আগ্রাসনকারীরা কল্পনাও করতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতের অনেক ষড়যন্ত্রের মতো এবারের ‘আমেরিকান-জায়নবাদী ফিতনা’র আগুনও ইরানি জনগণ নিজেদের ঐক্য দিয়ে ছাই করে দিয়েছে। তিনি বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন যে, শত্রুরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই হতাহতের সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত করে বিশ্বদরবারে প্রচার করার চেষ্টা করেছে। পরিশেষে খামেনেয়ি তার বক্তব্যে আগামীর যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়ানো নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে নীরব অবস্থান নিয়েছে ইসরায়েল। ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানানো ছাড়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন, নীরব থেকেছে তার সরকারও। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতাই আসলে ইসরায়েলের কৌশল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় ২৫ বছর কাজ করা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক উপস্থিতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কা নেতানিয়াহুর কাছে একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’। তার মতে, নেতানিয়াহু এই মুহূর্ত কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চান না। ইসরায়েলের সাবেক সিগন্যাল গোয়েন্দা কর্মকর্তা আসাফ কোহেন বলেন, ইসরায়েল চায় এবার যুক্তরাষ্ট্রই নেতৃত্ব দিক। তার কথায়, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী, সামরিক সক্ষমতা বেশি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও অনেক বেশি। তাই ইসরায়েল ইচ্ছা করেই নীরব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নীরব সমন্বয় ইসরায়েলের নীরবতার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান শ্লোমি বাইন্ডার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৈঠকে ইরানের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ড্যানি সিত্রিনোভিচের দাবি, নেতানিয়াহু গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে সরকার পরিবর্তনমূলক বড় ধরনের হামলার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার মতে, মাসের শুরুতে নেতানিয়াহু যখন ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপে সংযত থাকতে বলেন, তখন আসলে তার আপত্তি ছিল—প্রস্তাবিত হামলাটি খুবই সীমিত। এর আগেও নেতানিয়াহু ইরানিদের তাদের সরকারের বিরুদ্ধে ‘দাঁড়িয়ে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত বছর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই বার্তা দেন। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য লাভ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত প্রতীকী হামলা থেকে শুরু করে পূর্ণমাত্রার সরকার পরিবর্তন—সব ধরনের বিকল্প বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। একদিকে প্রকাশ্যে যেমন তিনি সামরিক হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাবও দিচ্ছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশ সতর্ক করে বলছে, ইরানের সরকার উৎখাতের চেষ্টা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তবে ইসরায়েলের ভেতরে অনেকে এটিকে নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ইসরায়েলের ধারণা, তেহরানে সরকার পরিবর্তন হলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এবং ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে, হিজবুল্লাহসহ ইরানসমর্থিত আঞ্চলিক মিলিশিয়াগুলোর শক্তিও দুর্বল হবে। ইসরায়েলের আলমা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, শুধু লেবানন সীমান্তেই হিজবুল্লাহর হাতে এখনো প্রায় ২৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট রয়েছে। তবে ইসরায়েলের কিছু আইনপ্রণেতা মনে করেন, সীমিত হামলা বা নতুন কোনো চুক্তি উল্টো ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ তাতে বর্তমান ইরানি সরকার টিকে যাবে। বিরোধী দল ইয়েশ আতিদের সংসদ সদস্য মোশে তুর-পাজ বলেন, ‘পূর্ণমাত্রার অশুভ শক্তির মোকাবিলা কখনো সীমিতভাবে করা যায় না।’ প্রতিশোধের আশঙ্কা ও ঝুঁকি গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালালে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর কিছু ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে তেল আবিবের আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে, এতে অন্তত ২৮ জন নিহত হন। বিশ্লেষকদের মতে, সেই সংঘর্ষ থেকে ইরান শিক্ষা নিয়েছে এবং কৌশল বদলেছে। বর্তমানে তারা আবার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গড়ে তুলছে। সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তেল আবিবে ‘তাৎক্ষণিক ও নজিরবিহীন’ জবাব দেওয়া হবে। ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, নেতানিয়াহুর ভয় হলো—ইসরায়েল আবারও বড় ধরনের হামলার শিকার হবে, কিন্তু ইরানে সরকার পরিবর্তন হবে না। তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি বন্ধ করতে হলে সরকার পরিবর্তন জরুরি, আর তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব। সুযোগ না ঝুঁকি? বিশ্লেষকদের মতে, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের সামরিক প্রতিরক্ষা দুর্বল, আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব হয়েছে এবং দেশের ভেতরে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে—এই পরিস্থিতি অনেকের চোখে একবার আসা সুযোগ। আসাফ কোহেন বলেন, ‘ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। অনেকেই মনে করেন, এখন না করলে আর কখনো করা যাবে না।’ তবে ঝুঁকিও কম নয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির চারপাশে সামরিক ও ধর্মীয় জোটে বড় কোনো ফাটল নেই। বিরোধী আন্দোলনও বিভক্ত। সরকার পতন হলে কে ক্ষমতায় আসবে, তা অনিশ্চিত। গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই ভয়াবহ হতে পারে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু এ বছর নির্বাচনের মুখে রয়েছেন। হামাসের হামলার পর ‘নিরাপত্তার প্রতীক’ হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি ফেরাতে তিনি মরিয়া। ইরানে সরকার পরিবর্তন বা খামেনির হত্যাকাণ্ড তার জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে, আবার বড় ঝুঁকিও। সিত্রিনোভিচের ভাষায়, ‘এটি এক ধরনের হিসাব করা জুয়া। নেতানিয়াহু পরদিন কী হবে, তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তার লক্ষ্য—ট্রাম্পের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখানো যে তিনি ইরানি সরকার ধ্বংস করেছেন। যদি নিশ্চিত হন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি যাবে, তবে এই ঝুঁকি নিতে তিনি প্রস্তুত।’ তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর, আর এটাই ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। সূত্র: বিবিসি
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে বিশ্বজুড়ে নতুন এক পারমাণবিক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত নিজেদের সকল কর্মীকে যেকোনো সময় সরিয়ে নেওয়ার জন্য মস্কো এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা ‘রোসাটম’-এর প্রধান আলেক্সি লিখাচেভ আজ এক বিবৃতিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। লিখাচেভ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানের ভূখণ্ডে বা পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে কোনো ধরণের কালক্ষেপণ না করেই তাৎক্ষণিক এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া কার্যকর করা হবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। লিখাচেভ এক ভয়াবহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এই কেন্দ্রে কোনো ধরণের আঘাত মানে হবে ১৯৮৬ সালের চোরনোবিল বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি, যা গোটা পৃথিবীর জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।” উল্লেখ্য, গত জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলায় বুশেহর কেন্দ্রটি রক্ষা পেলেও এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে সেখানে শত শত রুশ বিশেষজ্ঞ কর্মরত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান এবং ইরানের জলসীমায় একের পর এক শক্তিশালী নৌবহর পাঠানোর ঘটনায় মস্কো আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ওমান উপসাগর ও আরব সাগরে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র সজ্জিত মার্কিন রণতরী অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন করে আরও একটি বহর পাঠানোর ঘোষণা দিলেও চূড়ান্ত হামলার সময় নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি। তবে রাশিয়ার এই আকস্মিক ‘ইভাকুয়েশন’ বা সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে বড় কোনো সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক বিপর্যয়ের এই শঙ্কা এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান এখন ওয়াশিংটনের এই সাঁড়াশি চাপের বিপরীতে কী ধরণের প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইরানের পরিস্থিতি মস্কো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন। ক্রেমলিনে বৃহস্পতিবার আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে এই কথা বলেন পুতিন। খবর দিয়েছে রয়টার্স। সম্প্রতি আমিরাতে অনুষ্ঠিত রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই প্রেক্ষাপটে পুতিন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে আমিরাতের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা দেখতে আগ্রহী। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক ব্যবহারের ফলে অঞ্চলে ‘অস্থিরতা’ সৃষ্টি হতে পারে এবং তা বিপজ্জনক ফলাফল ডেকে আনতে পারে। পেসকভের মন্তব্য আসে একদিন পরে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করেছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত চুক্তি করতে আলোচনায় বসতে হবে, নয়তো মার্কিন আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে। তবে ইরান এখনো তাদের অবস্থানে অনড়। তেহরান জানিয়েছে, যুদ্ধ হলে হামলার দায় আমেরিকাকে নিতে হবে।
ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশটির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একই সঙ্গে রাশিয়াকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাঁ-নোয়েল বারো সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের সরকার, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ ও ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সদস্যরা এবং ইন্টারনেট সেন্সরের জন্য দায়ী সংস্থাগুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি রাজনৈতিক চুক্তি করবেন, যার মাধ্যমে আইআরজিসিকে ইইউ-এর সন্ত্রাসী সংস্থার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে শক্তিশালী এই গার্ডদের ইসলামিক স্টেট এবং আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সমমানের অবস্থানে রাখা হবে। এ পদক্ষেপ ইরানের নেতৃত্বের প্রতি ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি প্রতীকী পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হবে। ব্রাসেলসে বৈঠকের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশ নীতি প্রধান কায়া কলাস বলেন, যদি আপনি সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করেন, আপনাকেও সন্ত্রাসীর মতো বিবেচনা করা উচিত। আইআরজিসি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর শিয়াদের ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়। বর্তমানে তারা দেশের অর্থনীতি ও সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক প্রোগ্রামের তত্ত্বাবধান করছে।
সম্ভাব্য সামরিক হামলা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ইরানে হামলা করা ভুল। আবার যুদ্ধ শুরু করাও ভুল। ইরান আবার পরমাণু ইস্যুতে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, আমি সবসময় আমার মার্কিন বন্ধুদের বলি—ইরানিদের সঙ্গে বিষয়গুলো একে একে সমাধান করুন। প্রথমে পরমাণু ইস্যু দিয়ে শুরু করুন। সেটা মিটলে পরে অন্য বিষয়গুলোতে যান। তার এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বে একটি যুদ্ধবহর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ইরানে বিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নাকচ করেনি। ইন্টারনেট বন্ধসহ কঠোর দমননীতির পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো কঠোর, কখনো নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে এসেছে। গত সপ্তাহে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইরানের পরিস্থিতিকে একটি নতুন পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে—এমন যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে তুরস্ক অবস্থান নেবে। তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন যে কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে ইরান এই কঠিন সময় কাটিয়ে উঠতে পারবে। বুধবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে ফোনালাপ হয়। সেখানে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয় বলে এক তুর্কি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। আল-জাজিরাকে ফিদান বলেন, ইরানের সঙ্গে সমস্যাগুলো আলাদাভাবে সমাধান করা উচিত। সব বিষয় একসঙ্গে প্যাকেজ করলে ইরানের পক্ষে তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, এতে ইরান নিজেদের জন্য অপমানজনক মনে করতে পারে, যা তাদের নেতৃত্বের কাছেও ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে। ফিদান জানান, গত বছর তেহরান সফরের সময় তিনি ইরানকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি সম্ভব বলে মনে করেন। সূত্র: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনার প্রেক্ষাপটে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন ড্রোন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ক্যামেরন চেল। এই কানাডিয়ান ড্রোন সিস্টেম বিশেষজ্ঞ সতর্কতা জারি করে বলেছেন, ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোনের ‘ঝাঁক’ মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী রণতরি এবং বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ভিত্তিক ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ড্রাগনফ্লাই’-এর সিইও এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্যামেরন চেল এই বিষয়ে তার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। ফক্স নিউজের বরাতে জানা যায়, চেলের মতে ইরান এখন তুলনামূলক সস্তা এবং চালকবিহীন আকাশযানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। এটি এক ধরনের কার্যকর ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’, যা দিয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং উন্নত সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব। স্বল্প খরচে বড় আঘাত: ক্যামেরন চেল যুক্তি দেখান যে, ইরান মাত্র কয়েক কোটি ডলার খরচ করে এমন ড্রোন সক্ষমতা তৈরি করেছে যা দিয়ে ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা তীব্র গণ-আক্রমণ চালানো সম্ভব। এতে স্বল্পমূল্যের ওয়ারহেড এবং সাধারণ লঞ্চ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করা: ড্রোনের বিশাল ঝাঁক যখন একসাথে আক্রমণ করে, তখন প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা ও মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমগুলো সেই চাপের মুখে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, একসাথে শত শত ড্রোনের আক্রমণ সামলানোর সক্ষমতা প্রথাগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কৌশল: ড্রাগনফ্লাইয়ের প্রধান জানান, ইরান তাদের এই রিমোট-কন্ট্রোলড ড্রোনগুলোকে বিশেষভাবে নকশা করেছে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উচ্চ-মাত্রার হামলা চালানোর জন্য। নৌ-প্রতিরক্ষায় ঝুঁকি: প্রচলিত নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাধারণত বড় মিসাইল বা যুদ্ধবিমান মোকাবিলার জন্য তৈরি। কিন্তু ক্ষুদ্র ও অসংখ্য ড্রোনের আক্রমণ মোকাবিলায় এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। উল্লেখ্য, ক্যামেরন চেলের প্রতিষ্ঠান ‘ড্রাগনফ্লাই’ জননিরাপত্তা, কৃষি এবং শিল্প পরিদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ড্রোন সমাধান দিয়ে থাকে। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান ড্রোন শক্তি মার্কিন নৌবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের জন্য এক নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সোমবার জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমান আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় তারা কেবল সংলাপ ও উত্তেজনা হ্রাসকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ মনে করে। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই যেকোনো বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। বিরোধ নিরসনে সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনৈতিক উপায়কেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশটি। ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা এক চরমে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, একটি বিশাল মার্কিন ‘‘নৌবহর’’ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সঙ্গী তিনটি ডেস্ট্রয়ার ইতিমধ্যে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে ওমান উপসাগরের সন্নিকটে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন এবং ইসরাইল ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে তারা সামরিক হস্তক্ষেপ এমনকি শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনের পথেও হাঁটতে পারে। তবে ইউএই-র এই ঘোষণা ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এই অঞ্চলে সামরিক অপারেশনের জন্য আমিরাতের ভূখণ্ড ও লজিস্টিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিপরীতে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো ধরণের আগ্রাসনের জবাবে তারা এমন এক ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখাবে যা যুক্তরাষ্ট্র কল্পনাও করতে পারবে না। গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো ১২ দিনের যুদ্ধের পর তেহরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বিশ্ববাসী ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। এমতাবস্থায় ইউএই-র এই নিরপেক্ষ অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মার্কিন সামরিক বাহিনী সোমবার জানিয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী ও তার সঙ্গে থাকা স্ট্রাইক গ্রুপটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানে গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিমানবাহী রণতরী ও তার সহগামী জাহাজগুলোকে এই অঞ্চলে মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তীতে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছেন, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে সব বিকল্প এখনো টেবিলে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর দায়িত্বে থাকা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, স্ট্রাইক গ্রুপটি বর্তমানে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে’। ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয় ডিসেম্বরের শেষ দিকে, মূলত অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে। তবে জানুয়ারির ৮ তারিখ থেকে টানা কয়েক দিন ধরে ব্যাপক সড়ক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে কর্তৃপক্ষ নজিরবিহীন দমন অভিযান চালিয়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসা ধর্মীয় নেতৃত্ব বিক্ষোভ সত্ত্বেও টিকে আছে। তবে ব্যবস্থার অনেক বিরোধী মনে করছেন, পরিবর্তনের সবচেয়ে সম্ভাব্য চালিকাশক্তি হতে পারে বাইরের হস্তক্ষেপ। ট্রাম্প বারবার ইরানকে সতর্ক করেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানিদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সহায়তা আসছে’। তবে চলতি মাসের শুরুতে তিনি হামলার নির্দেশ দেওয়া থেকে সরে আসেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের চাপের মুখে তেহরান আট শতাধিক পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, দেশটি ‘নিজেদের সক্ষমতার ওপর আত্মবিশ্বাসী’। আব্রাহাম লিংকনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের একটি যুদ্ধজাহাজের আগমন ইরানি জাতিকে রক্ষার ক্ষেত্রে ইরানের দৃঢ়তা ও সংকল্পে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ২,০০০ মাইল দীর্ঘ এক ভয়াবহ বরফ ও তুষার ঝড় দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আবহাওয়াবিদদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই ঝড়ে বরফ, তুষারপাত ও হিমশীতল বৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাব পড়তে পারে দেশের মধ্য-পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বহু রাজ্যে। ঝড়ের আগেই শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। CNN–এর আবহাওয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ঝড়ের তীব্রতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও কিছু রাজ্যে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত রাজ্য (High Impact) টেক্সাস (Texas) ঝড়ের সূচনা এখান থেকেই। ভারী বরফ জমে বিদ্যুৎ লাইন ভেঙে পড়া, ব্ল্যাকআউট ও মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ওকলাহোমা (Oklahoma) বরফালার সঙ্গে তীব্র ঠান্ডা। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা। আর্কানসাস (Arkansas) হিমশীতল বৃষ্টি ও বরফের স্তর জমে চলাচল প্রায় অচল হতে পারে। কেন্টাকি (Kentucky) মধ্য-পশ্চিম থেকে পূর্বাঞ্চলের সংযোগস্থল হওয়ায় তুষারপাত ও বরফের যুগপৎ প্রভাব পড়তে পারে। ওহাইও (Ohio) ভারী তুষার ও তীব্র ঠান্ডায় বিমান ও সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা। মাঝারি ঝুঁকির রাজ্য (Moderate Impact) টেনেসি (Tennessee) – বরফ ও তুষারের মিশ্র প্রভাব জর্জিয়া (Georgia) – বিশেষ করে উত্তর জর্জিয়ায় বরফ ঝড়ের সতর্কতা নর্থ ক্যারোলিনা (North Carolina) – হিমশীতল বৃষ্টি ও বরফ জমার ঝুঁকি সাউথ ক্যারোলিনা (South Carolina) – সীমিত এলাকায় বরফালার সম্ভাবনা ভার্জিনিয়া (Virginia) – তুষার ও ঠান্ডার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে তুলনামূলক কম ঝুঁকির রাজ্য (Lower Impact) মেরিল্যান্ড (Maryland), ওয়াশিংটন ডিসি, পেনসিলভানিয়া (Pennsylvania), নিউ ইয়র্ক (New York), ম্যাসাচুসেটস (Massachusetts) — এসব রাজ্যে ঝড় পৌঁছালেও প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে, তবে তুষারপাত ও শীতজনিত দুর্ভোগ পুরোপুরি এড়ানো যাবে না। পরিবহন ও জনজীবনে প্রভাব ঝড়ের আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন বড় বিমানবন্দরে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সড়কে না নামার পরামর্শ দিচ্ছে। প্রস্তুতি ও সতর্কতা জরুরি খাবার, পানি ও ওষুধ মজুত রাখুন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার প্রস্তুতি নিন স্থানীয় আবহাওয়া সতর্কতা ও নির্দেশনা নিয়মিত অনুসরণ করুন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঝড় আগামী কয়েক দিন ধরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন রাজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিস্থিতির অবনতি হলে আরও জরুরি সতর্কতা জারি করা হতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই দীর্ঘ ছুটি কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইসলামী ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) দিবাগত রাতে পবিত্র শবেবরাত পালিত হবে। এ উপলক্ষে ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) হওয়ায়, মাত্র এক দিনের ছুটি নিলেই টানা চার দিনের অবকাশ উপভোগ করা সম্ভব হবে। কারণ ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার—সাপ্তাহিক ছুটি। এদিকে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন উপলক্ষে সরকার ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে এখানেও টানা চার দিনের ছুটি মিলছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি থাকবে। নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, বছরটিতে মোট ১৪ দিন সাধারণ ছুটি এবং ১৪ দিন নির্বাহী আদেশে ছুটি নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে ৯ দিন শুক্রবার ও শনিবারের সঙ্গে মিলেছে। এছাড়া, ২০২৬ সালে ধর্মভিত্তিক ঐচ্ছিক ছুটিও নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৫ দিন; হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৯ দিন; খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৮ দিন; বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৭ দিন এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২ দিন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়াতে পারে যৌনাঙ্গ আক্রান্তকারী পরজীবী,সতর্ক করলেন বিজ্ঞানীরা স্নেইল ফিভার’ নামে পরিচিত এক ধরনের পরজীবী বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ত্বকের ভেতর দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করা এই পরজীবী দীর্ঘদিন রক্তে নীরবে অবস্থান করে এবং পরে ডিম পাড়ে,যা লিভার, ফুসফুসও যৌনাঙ্গসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হতে পারে। ভয়াবহ বিষয় হলো,বছরের পর বছর শরীরে অবস্থান করলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি শনাক্তই নাও হতে পারে। শামুকের মাধ্যমে ছড়ানোএ পরজীবীর কারণেই রোগটির নামকরণ করা হয়েছে স্নেইল ফিভার।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, রোগটি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। কারণ পরজীবীটির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটছে, যার ফলে এটি নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন এক সময়ে এই সতর্কবার্তা এলো,যখন৩০ জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে পালন করছে ডব্লিউএইচও।এ দিবসের লক্ষ্য হচ্ছে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবীও ছত্রাকজনিত রোগগুলোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো,যা সাধারণত দরিদ্র অঞ্চলের শত কোটিরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করে। কীভাবে ছড়ায় স্নেইল ফিভার : এই পরজীবী বহন করে নির্দিষ্ট এক ধরনের শামুক।যেসব পানিতে ওই শামুক বসবাস করে,সেখানে পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ যদি সেই পানিতে গোসল করেন বা সংস্পর্শে আসেন,তবে লার্ভা ত্বকের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। পরজীবীগুলো এমন এনজাইম নিঃসরণ করে,যা ত্বক ভেদ করতে সক্ষম। দেহে প্রবেশের পর লার্ভাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বাসা বাঁধে।স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে। কিছু ডিম মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে গেলেও বহু ডিম শরীরের ভেতরের টিস্যুতে আটকে থাকে। এতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষ করে তলপেট যৌনাঙ্গে ডিম জমে থাকলে ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস নামের জটিল রোগ দেখা দেয়। এতে পেটব্যথা, ক্যানসার এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাওনতুন উদ্বেগ: সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে স্নেইল ফিভার চিকিৎসাযোগ্য। ডব্লিউএইচও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—যেমন শিশু কৃষিশ্রমিকও জেলেদের প্রতি বছর এই ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়া সতর্ক করেছেন, নতুন কিছু ধরন শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। হাইব্রিড পরজীবীর আশঙ্কা: গবেষণায় দেখা গেছে,মানুষের শরীরের পরজীবীওপ্রাণীর শরীরের পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিশে ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র ধরন তৈরি করছে। এসব হাইব্রিড পরজীবী মানুষ ওপ্রাণী—উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে।মালাউইতে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, নমুনার সাত শতাংশ পরজীবীই ছিল হাইব্রিড,যা গবেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। অধ্যাপক মুসায়া বলেন,এভাবে যদি প্রকৃতিতে সংক্রমণ চলতেই থাকে, তাহলে সংখ্যাটা এক সময় বেশ বড় হয়ে যাবে।তিনি আরও বলেন, গবেষণা যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় করা হয়েছে,এজন্য এটি হয়তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। শনাক্তকরণে জটিলতা: গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষের যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ঘটালেও তা শনাক্ত করা কঠিন। কারণ এসব ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ পরজীবীর মতো দেখায় না। অনেক সময় উপসর্গগুলোকে যৌনবাহিত রোগ ভেবে ভুল করা হয়।চিকিৎসা না হলে বন্ধ্যত্ব, যৌনাঙ্গে ক্ষত এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এপ্রসঙ্গে অধ্যাপক মুসায়া বলেন,“ভাবুন তো,কোনো নারী যদি সন্তান ধারণ করতে না পারেন... আমাদের সংস্কৃতিতে সন্তান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান না হলে ওই নারীকে নানাভাবে কটূক্তি করেন মানুষরা। যা খারাপ এবং খুবই কষ্টের একটি রোগ। বৈশ্বিক প্রস্তুতি: ডব্লিউএইচও’র স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা.আমাদু গারবা জিরমে বলেন,রোগটি একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ।তিনি জানান,কিছু দেশে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ না থাকলেও প্রাণীদের শরীরে পরজীবী রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নতুন এই হুমকি মোকাবিলায় ডব্লিউএইচও কৌশল পরিবর্তন করছে।সংস্থাটি প্রাণীদের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশকে হাইব্রিড পরজীবী নিয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা দিয়েছে। যদিও ২০০৬থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাপক ওষুধ বিতরণের ফলে সংক্রমণ ৬০শতাংশ কমেছে, তবে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এই অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদকঃ শ্যামল সান্যাল