ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। গত কয়েকদিন ধরে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তরগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভিড় আর ফুলেল শুভেচ্ছার মাঝেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে ‘একান্ত সচিব’ (পিএস) ও ‘সহকারী একান্ত সচিব’ (এপিএস) নিয়োগ নিয়ে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। পিএস পদে নিয়োগ পেলেন যারা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অভিজ্ঞ উপসচিব মুহাম্মদ হাসনাত মোর্শেদ ভূঁইয়া। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের পিএস হয়েছেন উপসচিব এ বি এম ইফতেখারুল খন্দকার। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সরিষাবাড়ীর ইউএনও তাসনিমুজ্জামান এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের পিএস হয়েছেন ইউএনও মো. তাছবীর হোসেন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর পিএস হয়েছেন সামিউল আমিন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে এসেছেন মাহবুবুর রহমান। এপিএস হিসেবে যাদের নাম চূড়ান্ত: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে ৯ জন এপিএস নিয়োগের তথ্য জানানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এপিএস হয়েছেন মো. ইউনুস আলী। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের এপিএস হয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদের এপিএস হিসেবে মো. আকবর হোসেন এবং ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর এপিএস হিসেবে আল মুনজির বিন ওবায়েদ নিয়োগ পেয়েছেন। বিশেষভাবে আলোচিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. খাইরুল আমিন। তদবির বনাম অনীহা— এক বিচিত্র সমীকরণ: সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, পিএস হওয়ার জন্য যেমন একদল কর্মকর্তার মধ্যে জোর তদবির রয়েছে, তেমনি অন্য একটি অংশ এই পদে আসতে অনীহা দেখাচ্ছেন। তদবিরকারীদের বড় লক্ষ্য থাকে পিএস হিসেবে সফল হলে পরবর্তীতে ‘জেলা প্রশাসক’ (ডিসি) হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা। অন্যদিকে, অনেক দক্ষ কর্মকর্তা ‘রাজনৈতিক তকমা’ লেগে যাওয়ার ভয়ে পিএস হতে চাইছেন না। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে বা রাজনৈতিক পটভূমিতে কোনো রদবদল হলে এই কাজের কারণে তাদের পদোন্নতি আটকে যেতে পারে। তবে নতুন সরকার প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিদেরই এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা করছে। খুব দ্রুতই বাকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পিএস ও এপিএস নিয়োগের কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।
জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কেন্দ্রবিন্দু ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ (আইসিটি)-এর নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেড় বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামকে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন দেশের প্রথিতযশা আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এই নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তাজুল ইসলামের দেড় বছর: এক সাহসিকতার ইতিহাস ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পর ৭ সেপ্টেম্বর আইসিটির হাল ধরেছিলেন তাজুল ইসলাম। তাঁর দেড় বছরের কর্মমেয়াদে জুলাই গণহত্যার বিচারে অভাবনীয় গতি আসে। তাঁর টিমের কঠোর পরিশ্রমে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ২৬ জন অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা নিশ্চিত হয়। এছাড়া আয়নাঘর বা গুমের ঘটনায় জড়িত প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রেও তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। বিদায় বেলায় তাজুল ইসলাম বলেন, "রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সাথে প্রশাসনিক পরিবর্তন স্বাভাবিক। আমি আশা করি, নতুন যিনি আসছেন তিনি বিচারপ্রার্থী ও নির্যাতিত মানুষের কথা মাথায় রেখে সুবিচার নিশ্চিত করবেন।" কে এই আমিনুল ইসলাম? নতুন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জে। তিনি এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি এখন থেকে ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’-এর সমান পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন বিদায়ী প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার দায়িত্ব নিয়েই আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে তাঁর লক্ষ্য পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, "আমি জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি শহীদের রক্তের মর্যাদা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ট্রাইব্যুনালের চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় আমি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পূর্ণ সহযোগিতা করব। আমার স্পষ্ট বার্তা হলো— যারা নির্দোষ তারা কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হবেন না, কিন্তু যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের সর্বোচ্চ সাজা পেতেই হবে।" নির্বাচিত সরকারের অধীনে বিচারকাজে আরও গতি আসবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের চিত্র আইসিটিতে বর্তমানে ২৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, যার মধ্যে ২১টি মামলার বিচার সচল রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড এবং রামপুরা গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলো এখন রায়ের অপেক্ষায়। বর্তমানে ৪৫৭ জন আসামির মধ্যে ১৬১ জন গ্রেপ্তার থাকলেও ২৯৩ জন এখনো পলাতক। নতুন নেতৃত্বের অধীনে এই পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনা এবং বিচার কাজ শেষ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদেশে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর দাবি, বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এলেও তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকরা সেই সফরগুলোতে বাধা হয়ে দাঁড়ান। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট দুটি দেশের আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, গত ডিসেম্বরে কসোভোর একটি অ্যাসেম্বলিতে ‘কি-নোট পেপার’ উপস্থাপনের জন্য তাঁকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তাঁকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এরপর কাতারের আমিরের পক্ষ থেকে আসা একটি আমন্ত্রণের বিষয়ে তিনি অত্যন্ত অবাক করা এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কাতারে একটি আন্তর্জাতিক সামিটে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল, যেখানে কেবল রাষ্ট্রপতিরই অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সফরটি বাতিল করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক নজিরবিহীন কৌশলের আশ্রয় নেয়। মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রপতির নামে একটি চিঠির খসড়া তৈরি করে পাঠানো হয়, যেখানে লেখা ছিল— ‘রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি ওই সামিটে অংশ নিতে পারছেন না।’ রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, এই চিঠি তৈরির আগে তাঁর সাথে কোনো পরামর্শই করা হয়নি। এমনকি তাঁকে সেই খসড়া চিঠিতে সই করার জন্য রীতিমতো চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "সংবিধান অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপতি কি এতটাই রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকেন যে তিনি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যেতে পারবেন না?" পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রাষ্ট্রপতি সেই চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে পাল্টা প্রতিবাদ জানান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আচরণকে ‘শিষ্টাচারবহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেন। তবে সেই প্রতিবাদের কোনো জবাব তিনি পাননি। সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ করে বলেন, তাঁকে বিদেশ সফরে যেতে না দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর নাম ও পরিচয়কে আড়াল করে রাখা। তৎকালীন সরকার চায়নি কোথাও রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি থাকুক বা জনগণ তাঁর সম্পর্কে জানুক। এই সংকীর্ণ মানসিকতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনই নয়, দেশের ভেতরেও তাঁকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় রেওয়াজ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে এভাবে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর চিফ প্রসিকিউটর পদে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবগঠিত সরকার। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের পরিবর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রোববার রাতে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি প্রকাশ করার পর থেকে আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্রমতে, অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম দেশের একজন প্রথিতযশা আইনজীবী। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন দুর্নীতি মামলায় তাঁর আইনি দলের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। আইনি মহলে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সর্বজনবিদিত। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সরকারের এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে ইতোমধ্যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। গত রবিবার আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান তাঁর কার্যালয়ে তাজুল ইসলামকে ডেকে পাঠান। সেই বৈঠকেই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসার বিষয়ে সরকারের উচ্চ মহলের আগ্রহের কথা জানানো হয়। যদিও এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাজুল ইসলামের পক্ষ থেকে কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া যখন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে প্রসিকিউশন টিমের শীর্ষে এমন রদবদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে আমিনুল ইসলামের অন্তর্ভুক্তি বিচার কাজকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করবে বলে আশা করছে সরকার। খুব দ্রুতই এই নিয়োগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, “অনেক দিন ধরেই শুনে আসছিলাম যে তারেক রহমান নাকি এখন আর জিয়াউর রহমানের ধারায় নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দেখলাম, তিনি স্পষ্টভাবেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করছেন। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব মন্তব্য করেন তিনি। পাঠকদের পড়ার সুবিধার্থে ফারুকীর স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো: বেশ কিছুদিন আগে একজন আমাকে একটা ছবি পাঠায়। ছবিটার অথেনটিসিটি যাচাই করার জন্য একজনকে দেই। ছবিটা ছিল ১৯৫৩ সালে প্রভাত ফেরি শেষে মোনাজাতরত মানুষের। এর মধ্যে আজকে ফাহাম আব্দুস সালামের সৌজন্যে ওই ছবিটা টীকাসহ পাইলাম। আর গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারে মোনাজাত আদায় করলেন। অনেক দিন ধরে শুনতেছিলাম, তারেক রহমান এখন আর জিয়াউর রহমানের লাইনে নাই। আমি তো দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর উনি পরিষ্কার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন। জিয়াউর রহমানের পথটা কী? সেটা হইলো আমাদের ধর্মীয় পরিচয়-আচার-রীতি না লুকাইয়াই আমরা একটা বহু জাতি-বহু ধর্ম-বহু ভাষার মানুষের রিপাবলিক বানাইতে পারি। যেই রিপাবলিকের মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দেয়, চাইলে মোনাজাত পড়তে পারে, আবার গাইতেও পারে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো….’, যেই রিপাবলিক কারো হেজেমনিক পারপাস সার্ভ না কইরা আত্মপরিচয় গইড়া তুলতে পারে, যেই রিপাবলিকের মানুষেরা তার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়া গৌরব করে এবং স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজন হইলে চব্বিশ ঘটাইয়া দিতে পারে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হইলো- কে বা কারা কোন সংকোচে এই মোনাজাতকে আমাদের কালেকটিভ মেমোরি থেকে মুছে দিতে চাইলো? এর পেছনের রাজনীতিটাই বাংলাদেশের অনেকগুলা সাংস্কৃতিক সংকটের একটা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের সিংহভাগ মানুষ ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছেন। মোট সংগৃহীত ভোটের ৬২ শতাংশেরও বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারের পথ সুগম হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কেবল আইনপ্রণেতা হিসেবেই নন, বরং একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই পরিষদকে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। কী কী পরিবর্তন আসছে সংবিধানে? গণভোটের রায়ে যে বিষয়গুলো নিশ্চিত হতে যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র নির্বাহী ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি এখন স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এছাড়া, এক ব্যক্তি জীবনে দুই মেয়াদের বেশি বা ১০ বছরের অধিক সময় প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—এই যুগান্তকারী প্রস্তাবেও সায় দিয়েছেন ভোটাররা। উচ্চকক্ষ নিয়ে নতুন বিতর্ক: গণভোটের জয় সত্ত্বেও একটি বিষয়ে বড় ধরণের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে সরাসরি বলা হয়েছে, সংসদের উচ্চকক্ষ (সিনেট) গঠিত হবে জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ‘ভোটের আনুপাতিক হারে’। এর বিপরীতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির ইশতেহারে বলা ছিল উচ্চকক্ষ হবে ‘আসন সংখ্যার ভিত্তিতে’। পরিসংখ্যান বলছে, ভোটের হার বা ‘পিআর পদ্ধতি’ অনুসরণ করলে উচ্চকক্ষ ১০০ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ৫২-৫৩টি এবং জামায়াত জোট ৩৮টির মতো আসন পাবে। কিন্তু আসন সংখ্যার ভিত্তিতে হলে বিএনপি জোট একাই ৭০টি আসন পাবে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, বিএনপির ইশতেহার সরাসরি জনগণের ভোটে পাস হয়নি, কিন্তু আনুপাতিক হারের বিষয়টি গণভোটের ব্যালটে ছিল এবং জনগণ তাতে ‘হ্যাঁ’ বলেছে। ফলে জনরায়ের প্রাধান্য কোন দিকে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আশা ও চ্যালেঞ্জ: যদিও বিএনপির কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত ছিল, তবুও অধিকাংশ সংস্কার প্রস্তাবে দলগুলোর ঐকমত্য রয়েছে। আইনজীবী ও বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারকে এই ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাতে হবে, অন্যথায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও বৈধতা সংকটে পড়তে পারে। ১৮০ দিনের এই সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী সময়ে এখন আলোচনার তুঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার ও শীর্ষ পদে রদবদল। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রাক্কালে কে হচ্ছেন নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি), তা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। যদিও বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত রয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে—জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী পেশাদারিত্ব ফেরাতে নতুন আইজিপি নিয়োগের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পুলিশের সর্বোচ্চ এই পদটি পেতে ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নতুন আইজিপি হওয়ার দৌড়ে এখন পর্যন্ত ৩ জন হেভিওয়েট কর্মকর্তা এগিয়ে আছেন: ১. একেএম শহীদুর রহমান: বর্তমানে র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্বরত এই কর্মকর্তা বিসিএস ১২তম ব্যাচের। বরিশাল ও নোয়াখালীতে এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শহীদুর রহমান ২০২৫ সালে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান। তাঁর বর্তমান পদের মেয়াদ আগামী ১৫ মার্চ শেষ হতে যাচ্ছে। ২. আলী হোসেন ফকির: এপিবিএন প্রধান হিসেবে কর্মরত এই কর্মকর্তা বিসিএস ১৫তম ব্যাচের। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে অন্যায়ভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন এবং অতিরিক্ত আইজিপি পদে উন্নীত হন। ৩. হাসিব আজিজ: বর্তমানে সিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্বরত হাসিব আজিজও ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ঝিনাইদহ, ফেনী ও চট্টগ্রামে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে তিনিও আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন। পাশাপাশি বিশেষায়িত বাহিনী র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমানের নাম গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। সূত্রমতে, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত ও কোণঠাসা হয়ে থাকা চার শতাধিক মেধাবী কর্মকর্তার একটি বড় অংশ নতুন সরকারের কাছে নিজেদের মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে নিজেদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছেন। নতুন সরকার ও আগামীর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একজন সৎ, সাহসী এবং 'পুলিশিং' বোঝেন এমন কর্মকর্তাকেই বাহিনীর অভিভাবক হিসেবে বেছে নিতে চান। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাহিনীর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে নতুন আইজিপির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লায় এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়েছে। প্রথাগত রাজনীতির হেভিওয়েটদের ভিড়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন কুমিল্লার ৫ জন তরুণ ও মেধাবী নেতা। জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে যে আটটিতে বিএনপি, একটিতে জামায়াত, একটিতে এনসিপি এবং একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, তার মধ্যে এই ৫ জনের সরাসরি সংসদে অভিষেক দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংসদে যাওয়া কুমিল্লার সেই ৫ নতুন মুখ হলেন: ১. কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস): বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। ২. কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার): জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। ৩. কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া): দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিন। ৪. কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা): স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম। ৫. কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ): বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম। সবচেয়ে আলোচিত বিজয়টি এসেছে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে। ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিজয়ী হওয়ার পর এক ভিডিও বার্তায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমি ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছি। যারা আমাকে ভোট দেননি, তাদেরও মন জয় করে আমি সবার প্রতিনিধি হতে চাই। সমাজকে এমনভাবে সাজাবো যেখানে আমার কট্টর শত্রুর প্রতিও কেউ অবিচার করতে পারবে না।” অন্যদিকে, কুমিল্লা-৫ আসনের নবনির্বাচিত এমপি জসিম উদ্দিন এক অনন্য রাজনৈতিক শিষ্টাচারের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পর তাঁর এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতাকর্মী বা তাঁদের ঘরবাড়িতে কোনো ধরণের হামলা বা প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “শান্তি ও সহনশীলতাই আমাদের মূল অঙ্গীকার। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড ঘটলে আইন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।” কুমিল্লা-২ আসনের অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তাঁর মূল লক্ষ্য হবে নির্বাচনি এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এবং সংসদে বলিষ্ঠ কণ্ঠে কুমিল্লার সমস্যার কথা তুলে ধরা। স্থানীয় ভোটারদের মনে এখন নতুন এক আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে ‘কুমিল্লা বিভাগ’ করার দীর্ঘদিনের দাবি এবার সংসদে নতুন জোরালো ভূমিকা পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রবীণদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই ৫ নতুনের উদ্যম কুমিল্লার ভাগ্যোন্নয়নে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে ফলাফল বর্জন করলেও দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি (ITV)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। শনিবার ভোরে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, “আমি এমন একজন মানুষ যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করি। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক বা প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, সংলাপই আমার জীবনের মূল কৌশল।” তিনি দাবি করেন, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, এই নির্বাচনটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে বড় ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় সংসদে অনেক বেশি প্রভাব অর্জন করতে পারে। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতির তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লিবারেলদের মতো কোনো বড় দলকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন দেওয়া হতো, তবে সেটা যেমন হতো, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখন ঠিক তেমনই। এটাকে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু বলা যায় না।” তবে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর সাফাই গেয়ে জয় দাবি করেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে কোনো কারচুপি হয়নি, বরং বিরোধীরাই সেগুলো বর্জন করেছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তিনি বলেন, “দেশে যে অল্পসংখ্যক পর্যবেক্ষক রয়েছেন, তারা সরকারের কড়া পাহাড়ায় চলাফেরা করছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় তাদের পক্ষে প্রকৃত চিত্র দেখা সম্ভব নয়।” নিজ দেশে ফেরার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী জয় বলেন, “আমরা অবশ্যই একদিন দেশে ফিরব। দেখুন—তারেক রহমান, যিনি একসময় দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি যদি আজ সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তবে আমাদের জন্য পরিস্থিতি চিরকাল এমন থাকবে না।” মা শেখ হাসিনার ফেরার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি নিশ্চিত যে শেখ হাসিনা একদিন বাংলাদেশে ফিরবেন, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর ফেরা ‘একেবারেই নিরাপদ’ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেওয়া জয়ের এই সাক্ষাৎকারটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং অন্যদিকে বিজয়ী পক্ষের সাথে আলোচনার প্রস্তাবকে বিশ্লেষকরা এক নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) জেলার ফুলগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলায় ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা, দোকানপাট ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে ‘ধানের শীষ’ সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে এবং এক হৃদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুলগাজীর মুন্সিরহাট বাজারে জামায়াত সমর্থিত ব্যবসায়ীদের অন্তত পাঁচটি দোকানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মুন্সিরহাট ইউনিয়ন কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. সুমনকে দলীয় সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফুলগাজী উপজেলা বিএনপি জানিয়েছে, দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থী এবং কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ১০-১২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে, দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নে জয়নাল আবেদীন দুলাল নামের এক জামায়াত কর্মীর ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তবে ঘটনার সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি ঘটে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে; হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নিজের সন্তানের ওপর এমন নৃশংস হামলার খবর সইতে না পেরে স্ট্রোক করে মারা যান দুলালের মা রৌশন আরা বেগম। এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহিংসতার ছায়া পড়েছে ছাগলনাইয়াতেও। সেখানে এক জামায়াত নেতার তিনটি খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জামায়াত নেতারা অবিলম্বে এসকল হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। ফেনীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) জানিয়েছেন, প্রাপ্ত প্রতিটি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ধানের শীষের সমর্থকদের পিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন জসিম উদ্দিন (৩০) নামে এক যুবক। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়েছে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আবদুল্লাহ গ্রামে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। নিহত জসিম মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের ‘ফুটবল’ প্রতীকের সমর্থক ছিলেন। ওই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কামরুজ্জামান বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। নিহতের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে ৫০-৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল জসিমদের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তারা জসিম উদ্দিন, তাঁর বৃদ্ধ বাবা মাফিক নায়েব এবং দুই ভাই মোখলেস ও মহসিনকে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে জসিম মারা যান। নিহতের বড় ভাই মসিউর নায়েব অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের একমাত্র দোষ ছিল আমরা ফুটবল প্রতীকের নির্বাচন করেছিলাম। নাসির দেওয়ান ও তাঁর ছেলে শাকিল দেওয়ানের নেতৃত্বে আমাদের ওপর এই তান্ডব চালানো হয়েছে। ওরা আমার ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।” উল্লেখ্য, শাকিল দেওয়ান মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বরত। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শাকিল দেওয়ান দাবি করেছেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং সকালে জসিমদের পক্ষ থেকেই আগে হামলা চালানো হয়েছিল। মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচনি দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাখা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনের পর এমন সহিংসতায় পুরো চরাঞ্চলে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফেনীর মহিপালে আওয়ামী অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অকুতোভয় লড়াই করে দেশজুড়ে আলোচিত হওয়া সেই ‘জুলাই যোদ্ধা’ সায়েম উদ্দিনের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের কোরবানপুর রাস্তার মাথা এলাকায় একদল দুষ্কৃতকারী তাঁর ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালায়। সায়েম উদ্দিন ফেনীর আল-জামেয়াতুল মালাহিয়া কামিল মাদরাসার ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ৪ আগস্ট মহিপালে যখন চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি চলছিল, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদের ওপর থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর সেই সাহসিকতার দৃশ্য সে সময় নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল এবং তিনি বিপ্লবের এক প্রতীকী মুখ হয়ে উঠেছিলেন। এনসিপি’র ফেনী-৩ আসনের এম্বাসেডর আবদুল্লাহ আল জোবায়ের জানান, রাত ৮টার দিকে সায়েমকে একা পেয়ে ৪-৫ জন সন্ত্রাসী পার্শ্ববর্তী নির্জন স্থানে ডেকে নেয়। সেখানে তারা সায়েমকে কিল-ঘুষি, লাথি এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রচণ্ড আঘাত করে। সায়েমের দাবি অনুযায়ী, হামলাকারীরা মুখপরিচিত এবং তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ঘটনার খবর পেয়ে আবদুল্লাহ আল জোবায়ের তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে গিয়ে সায়েমকে উদ্ধার করেন এবং ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করান। বীর যোদ্ধার ওপর হামলার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান ছাত্রশিবিরের ফেনী শহর সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যান্য সহযোদ্ধারা। তাঁরা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুফতি আব্দুল হান্নান বলেন, "বিপ্লবের একজন আলোচিত বীরকে এভাবে মারধর করা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আমরা তাঁর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছি এবং প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।" বর্তমানে সায়েম ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রুবাইয়াত বিন করিমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই বিষয়ে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, "জেলায় কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে দল প্রশ্রয় দেবে না। জড়িতরা যেই হোক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা পুলিশ সুপারকে অনুরোধ জানিয়েছি।" দাগনভূঞা থানার ওসি মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে একজন জুলাই যোদ্ধার ওপর এমন হামলার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল রদবদল ঘটে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এক সময়ের দাপুটে রাজনৈতিক শক্তি এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা) এবারের নির্বাচনে এক চরম লজ্জাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। সারা দেশে ২০০টি আসনে প্রার্থী দিলেও একটি আসনেও জয়ের মুখ দেখতে পারেনি দলটি। এমনকি দলটির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর রংপুরেও ধুলোয় মিশে গেছে লাঙ্গল। রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ৩০টিতেই জাপা প্রার্থী দিয়েছিল, কিন্তু কুড়িগ্রাম, নীলফামারী বা রংপুরের কোথাও তারা জয়ী হতে পারেনি। এরশাদের এই দুর্গে এবার জয়জয়কার দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের এবং নব্য রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। লাঙ্গলের চরম ভরাডুবির দিনে সাধারণ মানুষের রায় গেছে মূলত ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘শাপলা কলি’র বাক্সে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে মূলত জামায়াত জোটের সঙ্গে বিএনপির। বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে জাপার ভূমিকা সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দলটির অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। বিশেষ করে ভারতের সাথে সখ্যতা এবং জিএম কাদেরের ‘ভারতীয় দালাল’ ভাবমূর্তি ভোটারদের বিমুখ করেছে। ২০২৩ সালে দিল্লি সফর শেষে ভারতের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে না পারার মতো স্পর্শকাতর মন্তব্য জাপার রাজনৈতিক অবস্থানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কর্তৃক ‘ব্ল্যাকমেইল’ হওয়ার দোহাই দিলেও জনগণ আর জিএম কাদেরের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল—রওশন এরশাদ ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদের আলাদা গ্রুপ হওয়া—দলটিকে ভেতর থেকে আরও জরাজীর্ণ করে তুলেছে। চার দশকের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় সংসদ একটিও লাঙ্গল প্রতীক ছাড়াই গঠিত হতে যাচ্ছে। অধিকাংশ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক মৃত্যু এখন এক রূঢ় বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে এক রুদ্ধশ্বাস ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। আওয়ামী আমলের ‘আমি-ডামি’ আর ‘নিশিরাতের ভোটের’ গ্লানি মুছে ভোটাররা এবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়েছেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের নির্বাচন ছিল ‘জায়ান্ট কিলার’দের দখলে। দেশের রাজনীতির বহু হেভিওয়েট এবং আলোচিত মুখ এবারের ব্যালট যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের পরাজয়। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার লবির কাছে মাত্র ২ হাজার ৭০২ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। কক্সবাজার-২ আসনেও হার মেনেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। একইভাবে সুনামগঞ্জ-২ আসনে প্রখ্যাত আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং সিলেট-৬ আসনে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন ধানের শীষের প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রবিন্দুতে লড়াই ছিল সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ। ঢাকা-৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরুণ তুর্কি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বর্ষীয়ান নেতা মির্জা আব্বাসের কাছে মাত্র ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। অন্যদিকে, ঢাকা-১৪ আসনে ‘মায়ের ডাক’-এর সানজিদা ইসলাম তুলিকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন গুম থেকে ফেরা ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম আরমান। ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াতের ডা. খালিদুজ্জামান শক্ত লড়াই দিলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পিরোজপুরের ফলাফল ছিল মিশ্র। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বড় ছেলে শামীম সাঈদী পরাজিত হলেও ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদে আসছেন। এদিকে, জুলাই বিপ্লবের পরিচিত মুখ সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর পরাজিত হয়েছেন। ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা ডা. তাসনিম জারাও বড় ব্যবধানে হেরেছেন। বিস্ময়কর ফলাফল দেখা গেছে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার ক্ষেত্রে। বগুড়া-২ আসনে তিনি মাত্র ৩ হাজার ৪২৬ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্যও এই নির্বাচন ছিল বিপর্যয়কর; দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর ফয়জুল করীমসহ চরমোনাই পীরের তিন ভাইই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন এবং কেউ কেউ জামানতও হারিয়েছেন। এছাড়াও নজরুল ইসলাম মঞ্জু, ফুটবলার আমিনুল হক, মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং জুনায়েদ আল হাবীবের মতো আলোচিত প্রার্থীরাও এবারের নির্বাচনে জয়ের স্বাদ পাননি। মূলত ভোটাররা এবার ব্যক্তি পরিচিতির চেয়ে দলীয় মেরুকরণ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেই ব্যালট পেপারে প্রাধান্য দিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বরগুনা-২ (পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী) আসনে দেখা গেল এক বিরল ও প্রশংসনীয় চিত্র। নির্বাচনের উত্তাপ আর রেষারেষি পেছনে ফেলে রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়েছেন এই আসনের দুই শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী প্রার্থী নুরুল ইসলাম মনি আজ শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর পরাজিত প্রার্থী ডা. সুলতানের বাসভবনে গিয়ে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগীর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নেতার সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকালে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “রাজনীতি করতে গিয়ে ভোটের মাঠে অনেক সময় অনেক তিক্ত কথা বলতে হয়, তবে সেই অধ্যায় এখন শেষ। আমরা মূলত দুই ভাই। আমাদের মধ্যে দীর্ঘ ৪০ বছরের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে যা বাকি জীবনও অটুট থাকবে। এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে এই এলাকার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করা।” বিজয়ী প্রার্থীর এমন মহানুভবতা ও উদারতাকে স্বাগত জানিয়েছেন ডা. সুলতান। তিনি অত্যন্ত সহজভাবে নির্বাচনি ফলাফল মেনে নিয়ে বলেন, “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জয়-পরাজয় থাকবেই, এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। এখন সময় সংকীর্ণতা ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনপদে উন্নয়ন নিশ্চিত করার।” একই সাথে তিনি পাথরঘাটা ও বামনা এলাকার সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য নবনির্বাচিত এমপির প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই নেতার এই হৃদ্যতাপূর্ণ সাক্ষাতের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যদিও কেউ কেউ এটি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন, তবে বরগুনা-২ আসনের সচেতন সাধারণ ভোটাররা এই পদক্ষেপকে নতুন বাংলাদেশের ইতিবাচক রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন সম্প্রীতির চর্চা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত কমাতে এবং সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটে চট্টগ্রামের নির্বাচনি ময়দানে এক অভূতপূর্ব ও বৈচিত্র্যময় চিত্র ফুটে উঠেছে। নির্বাচনে চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনেই বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হলেও, দলটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও মাঠের প্রচারণাকে পাশ কাটিয়ে অনেক আসনেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১৩ এবং চট্টগ্রাম-১৬ আসনের ফলাফল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই বিএনপি ও জোটের নেতাকর্মীরা বাজার, গ্রাম-গঞ্জ এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরে ‘না’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তাদের মূল দাবি ছিল, এই সংস্কার প্রস্তাব গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করবে। তবে বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাধারণ ভোটাররা প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য দেখালেও রাষ্ট্র সংস্কার বা গণভোটের প্রশ্নে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিজস্ব বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেছেন। চট্টগ্রামের আসনভিত্তিক ফলাফল একনজরে: চট্টগ্রামের বেশিরভাগ আসনে বিএনপির আধিপত্য থাকলেও গণভোটের রায় ছিল বৈচিত্র্যময়: চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই): বিএনপির নুরুল আমিন বিজয়ী। এখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১,১৮,১৯৮টি এবং ‘না’ ৮৮,৪৯০টি। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী): ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জয়ী হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট (১,২০,১৮২) ছাপিয়ে গেছে ‘না’ ভোটকে (৮৫,৬২২)। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া): হুম্মাম কাদের চৌধুরী জয়ী। এখানেও ‘হ্যাঁ’ ভোট (৯৭,১৮৫) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং): সাঈদ আল নোমান জয়ী; ‘হ্যাঁ’ ভোট ১,৩২,১০০ এবং ‘না’ ৭১,৩৩৯। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী): এই আসনটি ব্যতিক্রমী চিত্র দেখিয়েছে। এখানে সরওয়ার জামাল নিজাম জয়ী হয়েছেন এবং ভোটাররা দলীয় আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘না’ ভোটকে (১,২৪,৬২৯) জয়ী করেছেন, যেখানে ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ৮০,৫৮০ ভোট। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী): এই আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জয়ী হয়েছেন। এখানেও সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১,৩৬,৮৪০টি। ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেকে প্রার্থী হিসেবে বিএনপিকে পছন্দ করলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই ‘হ্যাঁ’ বাক্সে সিল মেরেছেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনের এক ভোটার মোহাম্মদ শাহিন জানান, কেন্দ্রে গিয়ে পরিবেশ ও সার্বিক দিক বিবেচনা করে তিনি শেষ মুহূর্তে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাঠের প্রচারণা এবং ব্যালট বক্সের এই বিপরীতমুখী অবস্থান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের ভোটাররা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। দলীয় প্রার্থীর প্রতি সমর্থন থাকলেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা নিজস্ব মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে পিছপা হননি। চট্টগ্রামের এই নির্বাচনি ফলাফল আগামীর রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফলে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় চিত্র ফুটে উঠেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৪২টি দল কোনো আসনেই জয়লাভ করতে পারেনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটারদের রায় মূলত বড় দুই জোটের দিকেই ঝুঁকেছে, যার ফলে ছোট এবং নতুন দলগুলোর অধিকাংশই নির্বাচনী মাঠ থেকে ধুয়েমুছে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রেখেছে। এর মধ্যে এককভাবে বিএনপি জিতেছে ২০৭টি আসনে। জোটের শরিক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলন ১টি করে আসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই জোটে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৯টি আসন পেয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে। এছাড়া তরুণদের নিয়ে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি এবং খেলাফত মজলিসের দুই অংশ মিলিয়ে ৩টি আসন লাভ করেছে। সংসদের বাকি আসনগুলোর মধ্যে ৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই) ১ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়ে সংসদে আসার টিকিট পেয়েছেন। একটি আসনের ফলাফল আইনি বা কারিগরি কারণে এখনো স্থগিত রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে কৌশলগত ভোট দেওয়ার প্রবণতা এবং জোটভিত্তিক মেরুকরণ প্রবল ছিল। ফলে ৫১টি দল মাঠে থাকলেও নতুন সংসদে কণ্ঠস্বর থাকবে মাত্র ৯টি দলের। এই ফলাফল বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বড় দলগুলোর প্রভাবকে আরও সুসংহত করল, যা ছোট দলগুলোর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ দুই দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর লড়াই শেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত সর্বশেষ ফলাফলে দেখা গেছে, ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। এর ফলে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে দলটি। এবারের নির্বাচনে বিএনপির এই বিশাল বিজয়ে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী প্রার্থীদের পারফরম্যান্স। দলটির মনোনীত ছয়জন নারী প্রার্থী নিজ নিজ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ধরাশায়ী করে বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়াও একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও আলোচিত মুখ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। সংসদে আসা ধানের শীষের সেই সাহসী নারী সংসদ সদস্যরা হলেন: ১. মানিকগঞ্জ-৩: আফরোজা খান রিতা ২. ঝালকাঠি-২: ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টু ৩. সিলেট-২: তাহসিনা রুশদীর লুনা ৪. ফরিদপুর-২: শামা ওবায়েদ ৫. ফরিদপুর-৩: নায়াব ইউসুফ কামাল ৬. নাটোর-১: ফারজানা শারমিন পুতুল পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ ভোটারদের সমর্থন এবং মা-বোনদের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটই বিএনপিকে এই বিশাল ব্যবধানে জয়ী হতে সাহায্য করেছে। দীর্ঘ ২০ বছর পর দলটির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। এখন দেশবাসীর নজর নতুন মন্ত্রিসভার গঠন এবং আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনার রোডম্যাপের দিকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণে এসে রাজধানীসহ সারা দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তিন ভিন্ন দলের প্রার্থীর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থন ও অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। আবদুল্লাহ আল জাবেরের পোস্টে উঠে এসেছে ঢাকা-৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা-৮ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনির নাম। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিকভাবে এই তিনজনের অবস্থান ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তারা অভিন্ন—আর তা হলো শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার চাওয়া। জাবের লিখেছেন, “১২ তারিখের নির্বাচনে এদের কেউ আদৌ জিতবেন কিনা জানি না। তবে তারা খুব স্বতঃস্ফূর্ত এবং বোল্ডলি হাদি হত্যার বিচার চেয়েছেন। এবং ক্ষমতায় গেলে হাদি হত্যার বিচার করবেন বলে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।” তবে সরাসরি ভোট চাওয়ার প্রথাগত রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমরা তাদের জন্য ভোট চাই না। আপনি অবশ্যই আপনার দৃষ্টিতে যাকে সবথেকে সৎ এবং যোগ্য মনে হবে তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। তবে যে বা যারাই হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকবেন, ইনসাফের লড়াইয়ে অকুতোভয় থাকবেন, আপনাদের প্রতি আমাদের সীমাহীন ভালোবাসা ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকবে।” ইনকিলাব মঞ্চের এই শীর্ষ নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, বিজয় যে দলেরই হোক না কেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো জমিনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফ কায়েম করা। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর এই বার্তাটি বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক আদর্শের ঊর্ধ্বে গিয়ে যারা ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলছেন, তাদের প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের এই নৈতিক সমর্থন ভোটের লড়াইয়ে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জেন জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম CNN একে আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নির্বাচন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি নির্ধারণ করবে—জেন জি প্রজন্ম যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা কতটা বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে। তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে লাখো তরুণ-তরুণী দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে রাস্তায় নেমে আসে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে দেশ ত্যাগ করেন—যে দৃশ্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সিএনএন উল্লেখ করে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ছিল। বিরোধীদের দাবি ছিল, ওই সময়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ঘটেছে এবং ভিন্নমত দমনে কঠোরতা দেখানো হয়েছে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই শাসনের অবসান ঘটায় বহু মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মির্জা শাকিল সিএনএনকে বলেন, “এই বিপ্লব দেখিয়েছে—জেন জি চাইলে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমরা প্রমাণ করেছি, সংগঠিত হলে তরুণরাই ইতিহাস বদলাতে পারে।” সিএনএন-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের এই তরুণ আন্দোলন শুধু দেশীয় রাজনীতিতেই প্রভাব ফেলেনি; বরং এটি নেপাল ও মাদাগাস্কারসহ বিভিন্ন দেশে যুবনেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে, যেখানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরকার পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জনগণের প্রত্যাশা—এই ভোটের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে দেশ এগিয়ে যাবে। এখন দেশজুড়ে অপেক্ষা একটাই—ভোটের রায়। জেন জি বিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, এই নির্বাচন সেই পরিবর্তনকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে, সেটাই দেখার বিষয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার তুলনায় অনেকটাই শীতল সম্পর্ক বজায় রেখেছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, আর শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় নির্বাসনে ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে চীন নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ শেখ হাসিনার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বেড়েছে, আর আসন্ন নির্বাচনের পর তা আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, আকার ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে চীন ঢাকায় বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তের কাছাকাছি একটি ড্রোন কারখানা নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বেইজিং। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে। চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পসহ বিভিন্ন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এসব বৈঠকে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার অপরাধের সঙ্গে ভারত জড়িত ছিল। যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দিয়ে আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে দিচ্ছে, সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা ব্যবসা করা মানুষ মেনে নেবে না।’ তবে তারেক রহমান নিজে তুলনামূলক সংযত বক্তব্য দিয়েছেন। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে চাই, তবে অবশ্যই সেটা হবে আমার জনগণ ও দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে।’ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে, বিশেষ করে ক্রিকেটকে ঘিরে। বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার পর হিন্দু সংগঠনগুলোর চাপের মুখে জনপ্রিয় বাংলাদেশি বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের একটি দল থেকে বাদ দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ মার্চ থেকে মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য আইপিএলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি–মার্চে অনুষ্ঠেয় পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানায়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকেই সরে আসে। এদিকে, উভয় দেশই একে অপরের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক যোগাযোগও বিরল হয়ে উঠেছে। তবে গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানান। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। বিশেষ করে গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গণ-অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের নির্দেশ দেয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে এই দাবি আরও জোরালো হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দমন অভিযানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়। যদিও শেখ হাসিনা এসব হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ‘ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন’ নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী একে অপরকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। জামায়াতের দাবি, বিএনপি ভারতের খুব কাছাকাছি, আর বিএনপি অভিযোগ করছে, জামায়াতের সঙ্গে ভারতের পুরোনো শত্রু পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি এক নির্বাচনি সমাবেশে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি ও পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডির প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘দিল্লি নয় পিণ্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।’ ভারতের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে যে দলই সরকারই গঠন করুক, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে নয়াদিল্লিকে। তবে এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। চীন গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চীনা পণ্যের আমদানি মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশ। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকে চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের আদানি গ্রুপসহ একাধিক ভারতীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও, কোম্পানিটির পতনের পর নতুন কোনো চুক্তি হয়নি। নয়াদিল্লির থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্টান্টিনো জাভিয়ার বলেন, ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকট থেকে সুবিধা নিয়ে চীন প্রকাশ্যে ও আড়ালে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে চীন নিজেকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ চীন বেশি অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়। এছাড়া হিন্দু-অধ্যুষিত ভারতের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে অস্থিরতার সময় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে না। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিন বলেন, ‘ঢাকা ও নয়াদিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের জন্য বেইজিংয়ের সঙ্গে পূর্ণ গতিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে।’ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়া মানেই ভারতের গুরুত্ব কমে যাওয়া নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের চীন ও ভারত—দু’দেশকেই প্রয়োজন। বিষয়টি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও কোনো সরকারই ভারতের গুরুত্ব উপেক্ষা করার মতো বোকামি করবে না।’ ভৌগোলিকভাবে তিন দিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে ভারত, আর বাকি একদিকে অর্থাৎ দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে নয়াদিল্লির জন্যও স্থলসীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক জরুরি। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতবিরোধী বিদ্রোহীদের দমনেও সহায়তা করেছিল। সরকারি তথ্যমতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশই ভারতের প্রধান রপ্তানির জায়গা। আদানি গ্রুপ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহও বাড়িয়েছে, যদিও শেখ হাসিনার আমলে নির্ধারিত উচ্চ শুল্ক নিয়ে বেশ সমালোচনা করেছে বর্তমান সরকার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারত সহায়তা করলেও, দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ ছিল বাংলাদেশের মানুষের। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে পানি বণ্টন বিরোধ, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং অনেক বাংলাদেশির চোখে অজনপ্রিয় শেখ হাসিনা শাসনকে ভারতের বৈধতা দেয়া। জামায়াতপন্থি ও জেন জি-সমর্থিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতারাও ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেন, ‘এটা শুধু নির্বাচনি বক্তব্য নয়। তরুণদের মধ্যে নয়াদিল্লির আধিপত্যবোধ গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে, আর এটি এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।’ সূত্র: রয়টার্স।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস