যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। দেশটিতে অবস্থিত ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিনে লিমাসলসহ বিভিন্ন শহরে ‘ব্রিটিশ ঘাঁটি হটাও’ স্লোগানে মুখরিত হয়েছে রাজপথ। ঘটনার সূত্রপাত: চলতি সপ্তাহের শুরুতে সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি ‘আরএএফ আক্রোতিরি’-তে (RAF Akrotiri) একটি ড্রোন হামলা হয়, যা ইরান-নির্মিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাত্র দুই দিন আগেই ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই সাইপ্রাসের সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছেন যে, তাদের অজান্তেই দেশটিকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত করা হচ্ছে। উপনিবেশবাদের অবশেষ: ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা পেলেও একটি চুক্তির মাধ্যমে সাইপ্রাসের প্রায় ৩ শতাংশ ভূমি নিজেদের দখলে রাখে যুক্তরাজ্য। আক্রোতিরি এবং ডেকিলিয়া নামের এই দুটি ঘাঁটি মূলত ব্রিটিশ সার্বভৌম এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীরা একে ‘উপনিবেশবাদের অবশেষ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের মতে, এই ঘাঁটিগুলোর মাধ্যমে সাইপ্রাসকে একটি ‘অডুবন্ত বিমানবাহী রণতরি’ হিসেবে ব্যবহার করছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। কেন বাড়ছে ক্ষোভ? ১. নিরাপত্তা ঝুঁকি: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সাইটে ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলার’ জন্য এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এর ফলে ইরান বা তার সহযোগীদের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে সাইপ্রাস। ২. গাজা যুদ্ধে সংশ্লিষ্টতা: অভিযোগ রয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং নজরদারি চালাতে এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। ডিclassified UK-র তথ্যমতে, গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রথম দুই বছরে সাইপ্রাস থেকে ৬০০-এর বেশি নজরদারি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। ৩. অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ: সাইপ্রাসের মোট জিডিপির ১৪ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। যুদ্ধের উত্তেজনায় অনেক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় পর্যটন শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো নিরাপত্তা তথ্য না দিয়ে কেবল নিজেদের সামরিক কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। বর্তমান পরিস্থিতি: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যুক্তরাজ্য সরকার সাইপ্রাসে একটি যুদ্ধজাহাজ এবং দুটি ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ স্থানীয়দের আশ্বস্ত করার বদলে উল্টো উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্রশ্ন তুলছেন— কেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে সাইপ্রাসের সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, সাইপ্রাসের এই জনরোষ কেবল ক্ষণস্থায়ী কোনো বিক্ষোভ নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সার্বভৌমত্ব এবং পশ্চিমা সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক পুঞ্জীভূত বহিঃপ্রকাশ।
প্রবল উত্তেজনা এবং চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মধ্যেই প্রশাসনিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। আগামী রবিবার, ৮ মার্চ থেকে তেহরান প্রদেশের সমস্ত মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা এবং নির্বাহী প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত পরিসরে তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করবে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মাত্র ২০ শতাংশ কর্মী সশরীরে অফিসে উপস্থিত থেকে কাজ পরিচালনা করবেন। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা এই বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে: নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: তেহরান প্রদেশের সকল নারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী বর্তমানে সশরীরে অফিসে আসার পরিবর্তে সম্পূর্ণভাবে 'রিমোট ওয়ার্ক' বা দূরবর্তী অবস্থান থেকে কাজ করবেন। ব্যাংকিং সেবা: জনস্বার্থ বিবেচনায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক খোলা রাখা হবে। জরুরি সেবা সংস্থাসমূহ: জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, পৌরসভা, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপারেশনাল ইউনিটগুলো এই ২০ শতাংশের সীমাবদ্ধতার আওতামুক্ত থাকবে। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি: প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তেহরান প্রদেশের সকল স্তরের ব্যবস্থাপক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থানে যে হামলা চালানো হয়েছে, তার পাল্টা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই প্রশাসনিক এই সচলতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে কার কত সেনা আছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কার ভাণ্ডারে কত অস্ত্র অবশিষ্ট আছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকার হাতে অস্ত্রের "অফুরান ভাণ্ডার" রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হুঙ্কার দিয়ে জানিয়েছে, শত্রুকে প্রতিহত করার সক্ষমতা তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। তবে যুদ্ধের ময়দান বলছে ভিন্ন কথা। আকাশপথে আধিপত্য বনাম অস্ত্রের সংকট তেল আবিব-ভিত্তিক সংস্থা আইএনএসএস-এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতিমধ্যে দুই হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। বিপরীতে ইরান ৫৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩৯১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার হার ৮৬ শতাংশ এবং ড্রোন হামলার হার ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি হয় ইরানের মজুত ফুরিয়ে আসার লক্ষণ, অথবা তারা ভবিষ্যতের বড় কোনো লড়াইয়ের জন্য অস্ত্র জমিয়ে রাখছে। পেন্টাগনের দুশ্চিন্তা ও ট্রাম্পের বৈঠক আমেরিকা সামরিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিশেষ করে 'প্যাট্রিয়ট' ক্ষেপণাস্ত্রের আকাশচুম্বী চাহিদা ওয়াশিংটনকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। ইউক্রেন এবং আরব মিত্রদের সরবরাহ নিশ্চিত করার পর আমেরিকার হাতে এখন মাত্র ১৬০০টির মতো প্যাট্রিয়ট অবশিষ্ট আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলতি সপ্তাহের শেষেই অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন। ইরানের রণকৌশল ও ভূগোলের সুবিধা ইরানের বিমানবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেলেও মাটির নিচে বা পাহাড়ের গুহায় অস্ত্র লুকিয়ে রাখার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় এই দেশে আকাশ থেকে নজরদারি চালিয়ে সব অস্ত্রাগার খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। গাজা বা ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা বলছে, টানা বোমাবর্ষণেও সব অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা সহজ নয়। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্ট-কম) এখন ইরানের উৎপাদন কারখানা এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার ওপর জোর দিচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন, অস্ত্রের লড়াইয়ে ইরান শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সামনে টিকতে পারবে না। দীর্ঘমেয়াদী এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কার ভাণ্ডার অটুট থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ট্রাম্প ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের সময়সীমা নিয়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন। শুরুতে অভিযান দ্রুত শেষ করার কথা বললেও এখন তিনি জানিয়েছেন, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, অভিযানের মেয়াদ নিয়ে এখন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ইরান–এর বিরুদ্ধে মার্কিন লক্ষ্য অর্জন করাই মূল অগ্রাধিকার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর সামরিক অভিযান শুরু হয়। ১ মার্চ ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শেষ হতে পারে। তবে যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি এখন সময়সীমা নির্ধারণ করতে চান না। ব্রিটিশ সাময়িকী Time (magazine)–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানে মার্কিন লক্ষ্য বাস্তবায়নই এখন প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি স্বীকার করেন, জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগ স্বাভাবিক। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আগে জানিয়েছিলেন, অভিযান আট সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের নতুন বক্তব্যে সংঘাত আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রাণহানি অনিবার্য হলেও এটিকে তিনি সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয় মূল্য হিসেবে দেখেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছে CNN।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সংঘাতের আবহে এবার সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঘোষণা দিল ইরান। শুক্রবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মাদ নায়েইনি এক চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরান কেবল প্রস্তুতই নয়, বরং শিগগিরই রণক্ষেত্রে নামানো হতে পারে এমন সব ‘নতুন প্রজন্মের কৌশলগত অস্ত্র’, যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি। আইআরজিসি-র এই শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, ‘ট্রু প্রোমিজ ৪’ অভিযানের আওতায় এ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতার একটি সামান্য অংশ মাত্র। নায়েইনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, ইরানের হাতে এমন সব আধুনিক প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র রয়েছে যা এখনো বড় পরিসরে ব্যবহার করা হয়নি। শত্রুপক্ষকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আগামী প্রতিটি সামরিক অভিযানে ইরান এমন কঠোর আঘাত হানবে যার জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত নয়। মূলত নতুন নতুন যুদ্ধকৌশল ও অপ্রকাশিত অস্ত্রের প্রয়োগই হবে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ। বর্তমান এই সামরিক সংঘাতকে ‘পবিত্র এবং বৈধ যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে নায়েইনি দাবি করেন, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরান এখন কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। ইরানের এই হার্ডলাইন অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে রণক্ষেত্রেও। এই বার্তার পরপরই ইসরায়েলের প্রাণকেন্দ্র তেল আবিব লক্ষ্য করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তাদের উচ্চমাত্রার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রমাণ। সার্বিক পরিস্থিতিতে সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইরানের নতুন অস্ত্রের হুমকি এবং অন্যদিকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে পুরো অঞ্চল একটি প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের এই রণপ্রস্তুতি কেবল আত্মরক্ষামূলক নয়, বরং শত্রুকে সমূলে বিনাশ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্লু-প্রিন্ট বলেই মনে করা হচ্ছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের প্রাথমিক খরচ ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার অতিক্রম করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় কেবল মার্কিন করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। 'সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেস' (CAP) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ পর্যন্ত "অপারেশন এপিক ফিউরি" (Operation Epic Fury)-এর প্রাথমিক খরচ ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ব্যয়। তবে কুইন্সি ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকৃত খরচ এর চেয়েও অনেক বেশি। তাদের দাবি, কাতারে ধ্বংস হওয়া ১.১ বিলিয়ন ডলারের রাডার সিস্টেম এবং শত শত প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহারের খরচ এখনও এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। এই যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজ রেট বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার গ্রুপ এবং ২০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান পরিচালনার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৬০ মিলিয়ন (৬ কোটি) ডলার ব্যয় হচ্ছে। রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিপক্ষে। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও সমর্থন কমতে শুরু করেছে, কারণ যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (Pentagon) যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের জন্য আরও ৫০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিলের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। সাধারণ মানুষ যখন যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট, তখন লকহিড মার্টিন ও নর্থরোপ গ্রুমম্যানের মতো বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। শেয়ার বাজারে প্রতিরক্ষা খাতের এই উল্লম্ফনকে বিশ্লেষকরা "যুদ্ধ থেকে মুনাফা" হিসেবে অভিহিত করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো রাশিয়ার কাছ থেকে বেশি জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই ইরান যুদ্ধ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বিশ্বকে, যেখানে অর্থনীতির চেয়ে সামরিক দম্ভকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
ওমান উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝেই এই রক্তক্ষয়ী হামলার খবর পাওয়া গেল। এই ঘটনায় জাহাজটিতে কর্মরত দুই ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ওমান কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। নিহতরা হলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন আশীষ কুমার এবং ক্রু সদস্য দলীপ সিং। ক্যাপ্টেন আশীষ কুমারের বাড়ি ভারতের বিহারে এবং দলীপ সিং রাজস্থানের বাসিন্দা। ঘটনার বিবরণ: বৃহস্পতিবার এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, পালাউয়ের পতাকাবাহী ‘স্কাইলাইট’ নামের তেলবাহী ট্যাংকারটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করেছিল। ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ উপকূলের কাছে পৌঁছালে জাহাজটি অতর্কিত হামলার শিকার হয়। ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার (এমএসসি) জানিয়েছে, খাসাব বন্দর থেকে মাত্র পাঁচ নটিক্যাল মাইল উত্তরে জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। উদ্ধার অভিযান: ট্যাংকারটিতে মোট ২০ জন ক্রু সদস্য ছিলেন, যাদের মধ্যে ১৫ জন ভারতীয় এবং ৫ জন ইরানি নাগরিক। হামলার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বাকি ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দুই ভারতীয় প্রাণ হারান। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, হামলার তীব্রতায় তাদের দেহ মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। ক্যাপ্টেন আশীষ কুমারের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে তার কেবিন থেকে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর তথ্যমতে, হামলার সময় দলীপ সিং জাহাজের সামনের অংশে ক্যাপ্টেনের সাথেই অবস্থান করছিলেন। এখনও পর্যন্ত এই হামলার দায় কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি এবং ঠিক কী ধরনের অস্ত্র দিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে ওমান সরকার বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। এই হামলাকে ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংঘাতের নতুন ঝুঁকি ও মামদানির অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং জনবহুল শহরে বোমাবর্ষণ পরিস্থিতিকে আয়ত্তের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। মামদানির মতে, মার্কিন জনগণ এমন কোনো নতুন যুদ্ধমঞ্চ চায় না যা কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে। বৈঠকের পরেই সুর বদল কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই সমালোচনার মাত্র দুই দিন আগে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানির একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে যুদ্ধের প্রশ্নে তিনি নিজের অবস্থানে অনড়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে নীতিগত মতভেদ প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও জানান যে, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় নিউইয়র্ক সিটিতে পুলিশি সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। পুরনো শত্রুতা ও বর্তমান বিতর্ক ট্রাম্প ও মামদানির মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। নির্বাচনের আগে মামদানি ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ এবং ট্রাম্প মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট পাগল’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। সাম্প্রতিক এই সংঘাতের জেরে তাদের মধ্যকার পুরনো শত্রুতা ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।
লেবানন সীমান্তে সংঘাতের তীব্রতা এখন চরম পর্যায়ে। বৈরুত থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে তারা লেবাননের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর সফল হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই হামলার সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের দুজন সৈন্য এতে আহত হয়েছেন। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে সরাসরি সংঘাত চললেও রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। তা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ তাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে। সম্প্রতি এক টেলিভিশন ভাষণে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা এই লড়াইকে ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ না করার ঘোষণা দিয়েছেন। হিজবুল্লাহর মূল কৌশল হলো সীমান্ত দিয়ে অনবরত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য এই সংঘাতকে আর্থিকভাবে এবং সামরিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তোলা। বিশেষ করে লেবাননের ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের স্থল অভিযানকে ইসরায়েলের জন্য যতটা সম্ভব প্রাণঘাতী ও কঠিন করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে, দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। লেবানন সরকার এবং সেনাবাহিনী এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। লেবাননের সেনাবাহিনী সীমান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাকে নিষিদ্ধ করার মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিলেও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় এর চেয়ে বেশি কঠোর হতে পারছে না। গতকাল প্রেসিডেন্ট আউন বৈরুতে নিযুক্ত মার্কিন দূতের কাছে ইসরায়েলি হামলা বন্ধে মধ্যস্থতার আবেদন জানিয়েছেন। তবে মার্কিন দূত বা ইসরায়েল পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল উভয় পক্ষই দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়ে আসছে।
ভারত মহাসাগরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় ধ্বংস হয়েছে ইরানের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দেনা’ (IRIS Dena)। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র (AFP) বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই ঘটনার পরপরই শ্রীলঙ্কার জলসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে ইরানের আরও একটি দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ। সাম্প্রতিক এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র অঞ্চলেও বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে। খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া গোলায় ইরানি রণতরী ‘দেনা’ সমুদ্রের তলদেশে তলিয়ে যায়। তবে এই হামলায় কতজন হতাহত হয়েছেন বা ঠিক কোন অবস্থানে হামলাটি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। ইরানের পক্ষ থেকে এই ঘটনার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দ্রুত অন্য একটি যুদ্ধজাহাজকে ওই অঞ্চলের দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় এই জাহাজটি বর্তমানে শ্রীলঙ্কার জলসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সমুদ্রপথে সামরিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই দুই শক্তির অবস্থান ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। শ্রীলঙ্কা সরকার বা ওয়াশিংটন থেকে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে এএফপি জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল। বিষয়টি নিয়ে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান সংঘাতের স্থায়িত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয় ইরান। বরং ওয়াশিংটনকে একটি কঠিন জবাব দেওয়া এবং নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনই এখন তেহরানের মূল অগ্রাধিকার। বুধবার ইরানের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং ‘খতম আল আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’-এর ডেপুটি কমান্ডার জেনারেল কিওমার্স হায়দারি এক সাক্ষাৎকারে এই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে জেনারেল হায়দারি বলেন, যুদ্ধ কতদিন দীর্ঘায়িত হবে তা নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধের আট বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে উপযুক্ত শিক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না। তার মতে, ইরান এখন কেবল যুদ্ধের শেষ দেখেই শান্ত হবে।
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন তেলের ট্যাংকারে দুঃসাহসিক হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আজ বৃহস্পতিবার সকালে এই অভিযানের পর ওই অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি করেছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম ও কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আইআরজিসি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উত্তর উপসাগরীয় এলাকায় এই হামলা চালানো হয়েছে। সংস্থাটি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের সমর্থক কোনো ইউরোপীয় দেশের সামরিক বা বাণিজ্যিক জাহাজকে এই সমুদ্রপথ দিয়ে আর চলাচল করতে দেওয়া হবে না। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, যদি এই দেশগুলোর কোনো জাহাজকে ওই এলাকায় দেখা যায়, তবে সেগুলো আইআরজিসির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান বিভিন্ন প্রস্তাবনা অনুযায়ী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রয়েছে। তেহরান আরও জানিয়েছে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তারা আগেই বিশ্বশক্তিগুলোকে সতর্ক করেছিল। বর্তমান এই হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার তীব্র সমালোচনা করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার সরকারের অবস্থান যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্পেনের জনগণ এই ভয়াবহ "বিপর্যয়ের" বিপক্ষে। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ সতর্ক করে বলেন, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ বিশ্বকে আরও বেশি নিরাপত্তাহীন করে তুলেছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোনোভাবেই একটি উন্নত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করবে না। বর্তমান সংকটকে "মানবতার মহাবিপর্যয়ের সূচনা" হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিয়ে সরকারগুলোর "রাশিয়ান রুলেট" খেলা উচিত নয়। এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্পেনের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি স্পেনের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তবে সানচেজ তার সিদ্ধান্তে অনড় থেকে জানিয়েছেন, স্পেনের মাটি থেকে এমন কোনো অভিযান তিনি সমর্থন করবেন না যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে এবার কঠোর ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। বর্তমানে চলমান যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটানো এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন তিনি। সিডনির লোয়ি ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় কার্নি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি সরাসরি বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তার এই মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে এবং মিত্র দেশগুলোর সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কানাডার অবস্থানের পরিবর্তনকে স্পষ্ট করে তুলছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে স্মরণকালের ভয়াবহতম অভিযানে নেমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন। তার দেওয়া তথ্যমতে, এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবথেকে বড় সামরিক প্রস্তুতি। বিশাল সামরিক বহর ও আক্রমণ মার্কিন সেন্টকম প্রধান জানান, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারের বেশি সেনা, ২০০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, এবং দুটি বিশালাকার বিমানবাহী রণতরী সরাসরি অংশ নিচ্ছে। এছাড়াও আকাশপথে হামলা জোরদার করতে যুক্ত করা হয়েছে বেশ কিছু শক্তিশালী বোমারু বিমান। কুপার স্পষ্ট করেছেন যে, যেসকল লক্ষ্যবস্তু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা হতে পারে, সেগুলো ধ্বংস করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ইরানি নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি অভিযানের প্রথম ধাপেই ইরানি নৌবাহিনীকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। অ্যাডমিরাল কুপার দাবি করেছেন, তারা ইতিমধেই ইরানের ১৭টি জাহাজ ধ্বংস করেছেন। এর মধ্যে ইরানের সবথেকে কার্যকর সাবমেরিনগুলোও রয়েছে। ত্ৰিমাত্রিক হামলা অব্যাহত যুক্তরাষ্ট্র কেবল আকাশ বা সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ নেই। কুপারের মতে, সমুদ্রতল থেকে শুরু করে আকাশপথ এবং সাইবারস্পেস—সবগুলো মাধ্যম ব্যবহার করে ইরানের ওপর নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ওই অঞ্চলে আরও সামরিক সহায়তা পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন।
আধুনিক সমরাস্ত্রের লড়াইয়ে এক নতুন ও উদ্বেগজনক সমীকরণ তৈরি করেছে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন। মাত্র ৩৫ হাজার ডলার মূল্যের এই সস্তা ড্রোন ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে খরচ করতে হচ্ছে লাখ লাখ, এমনকি কোটি ডলারের ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র। এই অসম লড়াইয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে আতঙ্ক ছড়ানোর পর এখন মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে ডেল্টা-উইং ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন মোতায়েন করেছে তেহরান। মাত্র ৩.৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম এই ড্রোনটির উৎপাদন খরচ যেখানে মাত্র ৩৫ হাজার ডলার, সেখানে এটি ধ্বংস করতে ব্যবহৃত একেকটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে ব্যয় হচ্ছে ৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ওপর শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে গত ৪৮ ঘণ্টায় বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, তেহরান প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৫০০টির বেশি ড্রোন ছুড়ে প্রতিপক্ষের রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করছে। ইরানের হাতে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ড্রোনের বিশাল মজুত রয়েছে এবং প্রতি মাসে তারা আরও ৫০০টি ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ‘থাড’ (THAAD) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সময় লাগে তিন থেকে আট বছর। স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো সতর্ক করে বলেছেন, "আমরা যে হারে এগুলো ব্যবহার করছি, সে হারে তৈরি করতে পারছি না।" একটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে একাধিক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা পশ্চিমা সামরিক শক্তিকে এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে ইসরাইল ‘আইরন বিম’ লেজার প্রযুক্তির কথা ভাবলেও তা এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ফলে ড্রোনের এই বিশাল ঝাঁক মোকাবিলায় পেন্টাগন এখন চরম অস্থিরতায় দিন কাটাচ্ছে।
পাকিস্তানে চলমান অস্থির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে সব ধরনের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাময়িকভাবে বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসলামাবাদে অবস্থিত দূতাবাসের পাশাপাশি লাহোর ও করাচি কনস্যুলেটের নির্ধারিত সব ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত করা হয়েছে। খবর আলজাজিরার। বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত আগামী শুক্রবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। রোববার (২ মার্চ) করাচিতে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা করাচির মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে অন্তত ১০ জন নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এর আগে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা নিহত হন। রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। ওই হামলায় খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়। খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। গত রোববার (১ মার্চ) বিক্ষোভকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ২৪ জন নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এবং একাধিক এলাকায় তিন দিনের কারফিউ জারি করে। সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, সোমবার (২ মার্চ) ভোরের আগে গিলগিত-বালতিস্তান অঞ্চলের গিলগিত, স্কারদু ও শিগার জেলায় কারফিউ জারি করা হয়। এসব এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন বিক্ষোভকারী এবং একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন। উদ্ধারকর্মীদের বরাতে জানা যায়, গিলগিতে সাতজন এবং স্কারদুতে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে ১০ জন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হন। রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের দিকে যাওয়ার পথে আরও দুই বিক্ষোভকারী নিহত হন। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ইসলামাবাদ দূতাবাস ও অন্যান্য কনস্যুলেটের নিরাপত্তা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (২ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দূতাবাসের সকল কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এর ফলে নিয়মিত এবং জরুরি—সব ধরনের কনস্যুলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে গত রাতে দুটি ড্রোন হামলার ঘটনার পরপরই কুয়েতে এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এছাড়া গতকাল সোমবার খোদ কুয়েতেই এক ভয়াবহ ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। একের পর এক এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন প্রশাসন তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে যেকোনো বাণিজ্যিক উপায়ে (Commercial flight) নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। মূলত ড্রোন হামলা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যান্ত্রিক ত্রুটি এবং আঞ্চলিক যুদ্ধাবস্থার কারণে মার্কিন স্থাপনাগুলো এখন উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা বজায় থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। সম্প্রতি ইরানে পরিচালিত যৌথ সামরিক অভিযান নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েলি পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘আগাম হামলা’ বা প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক চালিয়েছে। ওয়াশিংটন আগে থেকেই জানত যে ইসরায়েল ইরানে আঘাত হানতে যাচ্ছে এবং সেই প্রেক্ষাপটেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রণকৌশল সাজায় বাইডেন প্রশাসন। সোমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কো রুবিও জানান, ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগে আক্রমণ চালায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা জানতাম ইসরায়েল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এবং এতে আমেরিকান সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। তাই বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আমরা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিই।” মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, এই সংঘাতের জেরে এখন পর্যন্ত ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ইরানের পাল্টা হামলায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত একাধিক মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুতে তেহরান ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ইরান ইতিমধ্যেই ড্রোনের মাধ্যমে উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন উপস্থিতিকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। রুবিও দাবি করেছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ড্রোন সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া। তবে তার একটি মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ১২টিরও বেশি দেশ থেকে তাদের নাগরিকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। লেবানন, সিরিয়া, মিশর ও ইসরায়েলে অবস্থানরত মার্কিনীদের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দ্রুত এলাকা ত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ত্রিভুজমুখী সংঘাত এখন আর কেবল তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না এলে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বাহরাইনে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বাহরাইনের রাজা হামাদ বিন ইসা আল খলিফা। সোমবার (২ মার্চ) দিবাগত রাতে বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুললতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান–কে টেলিফোন করে রাজার পক্ষ থেকে শোকবার্তা পৌঁছে দেন। টেলিফোন আলাপে বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন এবং এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। রাজার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, বাহরাইন সরকার সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জানমাল রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংকটময় সময়ে বাহরাইন সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও সহযোগিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। এর আগে একই দিন বিকেলে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আরেক দফা টেলিফোন আলাপ হয়। সেখানে বাহরাইনের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ জনবহুল এলাকায় পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর বাহরাইনে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিলেও দেশটির উচ্চপর্যায় থেকে নিরাপত্তা আশ্বাস পাওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এদিকে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানো এবং তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিতে সহযোগিতা করবে বলে বাহরাইন সরকার জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের পাশাপাশি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রধানের সদর দপ্তরকেও সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক 'খাইবার' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। আইআরজিসি এই অভিযানকে "ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর অপরাধের কঠোর জবাব" হিসেবে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে তারা দাবি করে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিমানবাহিনীর কমান্ড সেন্টারে আঘাত হানার মাধ্যমে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। ঘটনার মূল বিষয়সমূহ: লক্ষ্যবস্তু: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিমানবাহিনী প্রধানের সদর দপ্তর। ব্যবহৃত অস্ত্র: ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তির ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্র। হামলার ধরন: সরাসরি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। নেপথ্য কারণ: আইআরজিসি’র দাবি অনুযায়ী, এটি ইসরায়েলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিশোধ। তবে এই হামলার ফলে ঠিক কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা হতাহতের সংখ্যা কত, সে বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, এর আগেও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের ঘটনা ঘটলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি এই সংঘাতকে এক নতুন ও ভয়ংকর মাত্রায় নিয়ে গেল।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস