মো: আবদুর রহমান মিঞা
লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক
মেরিন প্রসেসিং জোন, কক্সবাজার
বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী সামুদ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থানে থেকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগকারী হিসেবে, বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সমুদ্র সম্পদ ও বাণিজ্যের ওপর নতুন করে জোর দিচ্ছে। দীর্ঘদিন আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় নদীমাতৃক পরিচয় প্রাধান্য পেলেও সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি ততটা কাঠামোবদ্ধভাবে অগ্রাধিকার পায়নি। অথচ বঙ্গোপসাগর কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি খাদ্য, জ্বালানি, খনিজ, জৈবপ্রযুক্তি, পরিবহন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বিশ্বব্যাপী ব্লু ইকোনমি এখন একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক ধারণা, যেখানে সমুদ্রসম্পদকে টেকসইভাবে ব্যবহার করে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন প্রতিষ্ঠার ধারণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চল হবে না; বরং সমুদ্রভিত্তিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা এবং রপ্তানিকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার একটি সমন্বিত কাঠামো হতে পারে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ, যা সুপরিকল্পিত কৌশল ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের সম্ভাব্য বাজার বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই বৈশ্বিক সামুদ্রিক খাদ্য বাজারের দিকে নজর দিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, স্কুইড, অক্টোপাস, টুনা এবং বিভিন্ন শেলফিশের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে সামুদ্রিক প্রোটিনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাদ্য, লো-ফ্যাট প্রোটিন এবং সামুদ্রিক উৎসের সাপ্লিমেন্ট এখন উচ্চমূল্যের বাজার তৈরি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য সামুদ্রিক পণ্যের বড় আমদানিকারক। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চিংড়ি রপ্তানির মাধ্যমে কিছুটা অবস্থান তৈরি করেছে, কিন্তু পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন এখনো সীমিত। একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন থাকলে কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে ফিলেট, রেডি-টু-কুক, রেডি-টু-ইট, স্মোকড, ক্যানড এবং ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।
সামুদ্রিক খাদ্যের বাইরে আরও বিস্তৃত বাজার রয়েছে। সামুদ্রিক শৈবাল বা সি-উইড এখন বৈশ্বিকভাবে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী এবং বায়োফুয়েল শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোরিয়া, জাপান এবং চীন বহু আগে থেকেই সি-উইড চাষ ও প্রক্রিয়াকরণে অগ্রগামী। ইউরোপেও উদ্ভিজ্জ বিকল্প খাদ্যের বাজার বাড়ছে, যেখানে সামুদ্রিক উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে সি-উইড চাষ শুরু করেছে। যদি একটি ডেডিকেটেড জোনে এর প্রক্রিয়াকরণ, শুকানো, প্যাকেজিং এবং রপ্তানি সুবিধা গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। একইভাবে সামুদ্রিক কোলাজেন, জেলাটিন, ফিশ অয়েল, ওমেগা-৩ ক্যাপসুল এবং সামুদ্রিক বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ও নিউট্রাসিউটিক্যাল বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য।
আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হচ্ছে সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ ও অফশোর জ্বালানিকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাপোর্ট সার্ভিস শিল্প। যদিও বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র খনিজ অনুসন্ধান বা অফশোর জ্বালানি উত্তোলন এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে, তবু ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিকল্পনায় এই খাতের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য গ্যাস ব্লক, সাবমেরিন খনিজ সম্পদ, এমনকি অফশোর উইন্ড এনার্জি প্রকল্প নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করলে একটি সম্পূর্ণ নতুন শিল্প ইকোসিস্টেম তৈরি হবে। অফশোর প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, সাবসি কেবল ও পাইপলাইন স্থাপন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট, বিশেষায়িত জাহাজ সার্ভিসিং, ড্রিলিং যন্ত্রাংশ সংযোজন ও মেরামত, নিরাপত্তা সরঞ্জাম উৎপাদন, লজিস্টিক ব্যাকআপ—এসব কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে এ ধরনের বেশিরভাগ প্রযুক্তি ও সাপোর্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন যদি পরিকল্পিতভাবে এসব সাপোর্ট ইন্ডাস্ট্রিকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে ধীরে ধীরে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের শিল্পায়ন ঘটবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাজারেও বাংলাদেশ একটি সাপোর্ট হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ভবিষ্যৎ অফশোর কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলে।
ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের একটি বড় কৌশলগত শক্তি। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান, বঙ্গোপসাগর হয়ে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে সরাসরি প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনকে কার্যকর করে তুলতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পায়রা বন্দরের উন্নয়ন এবং গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি নোঙর করতে পারবে। এতে ট্রানশিপমেন্ট নির্ভরতা কমবে এবং রপ্তানি সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে। সামুদ্রিক পণ্য, বিশেষ করে হিমায়িত খাদ্য, দ্রুত পরিবহন ও নির্ভরযোগ্য কোল্ড চেইন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। উপকূলসংলগ্ন একটি জোনে আধুনিক হিমায়িত সংরক্ষণাগার, আইওটি-নিয়ন্ত্রিত কোল্ড স্টোরেজ, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার স্থাপন করলে পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে দেরি হবে না এবং গুণগত মানও বজায় থাকবে। ট্রেসেবিলিটি ও সার্টিফিকেশন সহজ হলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে প্রবেশ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি ও সংযোগ প্রকল্পগুলো কার্যকর হলে নেপাল, ভুটান কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারেও সামুদ্রিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
দেশীয় বাজারের সম্ভাবনাও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত বাড়ছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। কর্মজীবী পরিবার বাড়ার ফলে দ্রুত প্রস্তুতযোগ্য ও নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুপারশপ সংস্কৃতি, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং হোম ডেলিভারি সেবা খাদ্য বিপণনের ধরণ বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে সামুদ্রিক মাছ মূলত কাঁচা অবস্থায় বাজারে বিক্রি হতো, এখন সেখানে হিমায়িত, পরিষ্কার, কাটাকাটা ও প্যাকেটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাটারিং শিল্পের সম্প্রসারণও সামুদ্রিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়িয়েছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ, বিশেষ করে উপকূলীয় ও নগরকেন্দ্রিক পর্যটন, সামুদ্রিক খাদ্যের চাহিদাকে আরও প্রসারিত করছে। একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন যদি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করে, তবে একই সঙ্গে দেশীয় বাজারেও শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করা সম্ভব। এতে আমদানি নির্ভরতা কমবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং ভোক্তারা মানসম্মত পণ্য পাবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারেও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে, যা রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা শুরু থেকেই বাস্তবভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো কাঁচামালের স্থিতিশীল ও টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করা। সামুদ্রিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিয়মিত ও মানসম্মত মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদের ওপর। কিন্তু অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা, অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ নিধন এবং সমুদ্র দূষণের কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অম্লতা পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও ফ্রিক্যুয়েন্সী বৃদ্ধি মাছের প্রজনন ও আবাসস্থলকে প্রভাবিত করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আহরণযোগ্য মজুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যদি এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে শিল্প সম্প্রসারণ করা হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই কাঁচামাল সংকট দেখা দিতে পারে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন উভয়কেই বিপদে ফেলবে।
এ কারণে টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে আহরণ কোটা নির্ধারণ, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা, গভীর সমুদ্রে লাইসেন্সপ্রাপ্ত জাহাজের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। স্যাটেলাইট মনিটরিং, ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম, ডিজিটাল লাইসেন্সিং এবং সমুদ্র টহল জোরদার করা হলে নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় জেলেদের বিকল্প আয় কর্মসূচি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে উৎসাহিত হন। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও শিল্প সম্প্রসারণের মধ্যে ভারসাম্য না রাখলে একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকবে না।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মান এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা। ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন–এর খাদ্য নিরাপত্তা মান অত্যন্ত কঠোর। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র–এ রপ্তানির জন্য খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের বিধি মানতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতুর উপস্থিতি, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, অপর্যাপ্ত হাইজিন বা সঠিক লেবেলিং না থাকা—এসব কারণে চালান বাতিল হতে পারে। অতীতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল, যা শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। একটি মাত্র ত্রুটি পুরো খাতের সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
তাই মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, বাধ্যতামূলক ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম এবং হাইজিন প্রটোকল নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন পর্যায় থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কোন মাছ কোথায় ধরা হয়েছে, কীভাবে সংরক্ষণ হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত হয়েছে-তার পূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে ক্রেতার আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন যেমন হ্যাজার্ড এনালাইসিস এন্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্টস (এইচএসিসিপি), ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও) মানদণ্ড বা টেকসই মৎস্যসনদ অর্জনের উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং কারখানার অবকাঠামোগত মান উন্নয়নও অপরিহার্য। মান নিয়ন্ত্রণকে যদি জোনের কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত করা যায়, তাহলে রপ্তানি ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামো নির্মাণ ও বিনিয়োগ ব্যয়। আধুনিক হিমায়িত প্রক্রিয়াজাত কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ, স্বয়ংক্রিয় প্যাকেজিং লাইন, বর্জ্য শোধনাগার, পরিবেশসম্মত পানি পরিশোধন ব্যবস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ—এসব স্থাপনে বিপুল মূলধন প্রয়োজন। উপকূলীয় এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, সাইক্লোন প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু সহনশীল স্থাপনা গড়ে তুলতেও অতিরিক্ত ব্যয় হয়। যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না করা হয়, তবে পরিবেশ দূষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ। কর ছাড়, শুল্ক সুবিধা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে রেয়াত, সহজ ঋণ সুবিধা এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে সরকার প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করবে এবং বেসরকারি খাত উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নেবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা বহুপাক্ষিক অর্থায়নও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অর্থায়নের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন পরিবেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা স্পষ্ট থাকে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, কাঁচামাল সরবরাহ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ সমাধান করতে পারলে একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন কার্যকরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত দৃঢ়তা ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না। তবে চ্যালেঞ্জগুলো শুরু থেকেই বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ মানবসম্পদ। দক্ষ টেকনোলজিস্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিশেষজ্ঞ, সামুদ্রিক বায়োটেক গবেষক এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপক তৈরিতে সময় লাগে। কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্লু ইকোনমি উপযোগী পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে। শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
পঞ্চম চ্যালেঞ্জ পরিবেশগত ঝুঁকি। উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প স্থাপন করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক না হলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জিরো লিকেজ, ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট এবং বায়োডিগ্রেডেবল প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড বজায় রাখলে আন্তর্জাতিক বাজারেও ইতিবাচক ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলভিত্তিক যেকোনো শিল্প উদ্যোগের জন্য বড় ঝুঁকি, আর মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভারী বর্ষণ ও উপকূল ক্ষয়ের মুখোমুখি হয়। অতীতে সাইক্লোন সিডর এবং সাইক্লোন আম্ফান–এর মতো ঘূর্ণিঝড় শিল্প অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। একটি মেরিন জোনে হিমায়িত সংরক্ষণাগার, বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাসায়নিক ও জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকায় দুর্যোগের সময় ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি হতে পারে। তাই শুরু থেকেই সাইক্লোন-প্রতিরোধী স্থাপনা, উঁচু প্লিন্থ লেভেল, শক্তিশালী ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ, দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা এবং জরুরি সরিয়ে নেওয়ার প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি বীমা কাভারেজ, দুর্যোগ ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নকশা নিশ্চিত করা হলে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
প্রশাসনিক সমন্বয় এখানে কেন্দ্রীয় গুরুত্বের বিষয়। সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াকরণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, শিল্প স্থাপন, রপ্তানি অনুমোদন, বন্দর ব্যবহার, কাস্টমস কার্যক্রম—এসবের সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা যুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, সমুদ্রসম্পদ ও সামুদ্রিক সীমা সংক্রান্ত বিষয়, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, রপ্তানি মান নিয়ন্ত্রণ, শিল্প নিবন্ধন—প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। যদি সমন্বিত নীতি কাঠামো ও একক জানালা পদ্ধতি না থাকে, তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই একটি সুসংহত ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের অধীনে জোন পরিচালনা করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে, দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হবে এবং প্রশাসনিক জট কমবে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)–এর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রাসঙ্গিক। ইপিজেড পরিচালনা, শ্রম ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অনুরূপ কাঠামো অনুসরণ করে বা তাদের সম্পৃক্ত করে মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন পরিচালিত হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা, শ্রমমান রক্ষা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা, অনলাইন অনুমোদন, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আরও বাস্তবসম্মত হবে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা একটি কঠিন বাস্তবতা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ বহু বছর ধরে সামুদ্রিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ভিয়েতনাম সামুদ্রিক রপ্তানিতে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি; তারা ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য, চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্র্যান্ড উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। থাইল্যান্ড উন্নত ক্যানিং প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাজার দখল করেছে। ইন্দোনেশিয়া বৃহৎ উৎপাদনভিত্তি ও বহুমুখী পণ্যের কারণে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে। এসব দেশের শক্তি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার কৌশল। বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু কাঁচা বা প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি যথেষ্ট হবে না। পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে, যেমন রেডি-টু-কুক, রেডি-টু-ইট, উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত সামুদ্রিক খাদ্য, নিউট্রাসিউটিক্যাল বা সামুদ্রিক বায়োপ্রোডাক্ট। একই সঙ্গে সরবরাহ চেইনের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করা যায়। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মান, ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণ করলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। পাশাপাশি নতুন বাজার অনুসন্ধানও জরুরি। আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রক্রিয়াজাত সামুদ্রিক খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। এসব অঞ্চলে বাণিজ্য মিশন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং বাজার গবেষণার মাধ্যমে প্রবেশের কৌশল নিলে ঝুঁকি বৈচিত্র্যকরণ সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে একটি মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত অর্থনৈতিক উদ্যোগ হতে পারে। এটি কেবল রপ্তানি আয় বাড়ানোর প্রকল্প নয়; বরং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিকে একটি সুসংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার প্রচেষ্টা। বর্তমানে ব্লু ইকোনমি নিয়ে নীতি আলোচনা থাকলেও বাস্তবায়ন কাঠামো এখনো বিকাশমান। একটি পরিকল্পিত জোন গবেষণা, উদ্ভাবন, মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পায়নকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে পারে। তবে সফলতার জন্য কয়েকটি শর্ত অপরিহার্য। প্রথমত, টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত আহরণ বা পরিবেশগত ক্ষতি না ঘটে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সার্টিফিকেশন অনুসরণ করতে হবে, যাতে বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত না হয়। তৃতীয়ত, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি প্রশিক্ষণ, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। চতুর্থত, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, কারণ উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখোমুখি। সর্বশেষ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি আস্থা পায়। সুপরিকল্পিত নীতি, সমন্বিত নেতৃত্ব এবং বাস্তবভিত্তিক কৌশল থাকলে মেরিন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে এবং ব্লু ইকোনমিকে একটি কার্যকর প্রবৃদ্ধির স্তম্ভে পরিণত করতে সক্ষম হতে পারে।
(লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক)
ই-মেইল: arahmanmiah@gmail.com
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস