এক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অচেনা নাম ছিলেন গ্রেগরি বোভিনো। বর্তমানে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন দমন অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। মাঠপর্যায়ের কৌশল থেকে শুরু করে তাঁর পোশাক ও বক্তব্য—সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বর্ডার প্যাট্রল) ‘কমান্ডার-অ্যাট-লার্জ’ হিসেবে বোভিনোকে একাধিক শহরের রাস্তায় সরাসরি অভিযান পরিচালনা করতে দেখা গেছে। ছোট করে কাটা চুল, জলপাই রঙের ইউনিফর্ম ও লম্বা সবুজ কোট পরে তিনি নিজেই টহল অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কোথাও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার, কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে প্রকাশ্য বাক্বিতণ্ডা—সব ক্ষেত্রেই তিনি সামনে থেকে উপস্থিত থাকছেন। অন্য অনেক ফেডারেল কর্মকর্তার মতো মুখোশ না পরায় তিনি আরও বেশি নজরে আসছেন।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ছবি ও সিনেমাটিক ভিডিও প্রকাশ করছেন বোভিনো। এসব পোস্টে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দৃঢ়তা এবং ‘মিশন সম্পন্ন করার’ সংকল্প তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে টেলিভিশনের পর্দায়ও তাঁর উপস্থিতি বেড়েছে। মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন অভিযান জোরদার হওয়ার পর সেখানকার নিয়মিত ব্রিফিংয়েও তাঁকে দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিনিয়াপোলিসে সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে দুজন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) অ্যালেক্স প্রিটি নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এ বিষয়ে বোভিনো দাবি করেন, নিহত ব্যক্তি অস্ত্রধারী ছিলেন এবং আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আইন নিজে নিজে কার্যকর হয় না। জীবন বাজি রেখে আইন কার্যকর করতে হয়।”
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) দেশকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে কাজ করছে।
তবে বোভিনোর অভিযানের কৌশলকে অনেকেই আক্রমণাত্মক বলে অভিহিত করছেন। তিনি নিজে এই কৌশলকে ‘টার্ন অ্যান্ড বার্ন’ নামে উল্লেখ করেন। দ্রুত ও কঠোর এই অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে জানালা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে মানুষ আটক করা হচ্ছে। সমর্থকেরা এটিকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে দেখলেও সমালোচকেরা একে ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদী আচরণ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেবি প্রিটজকার অভিযোগ করেছেন, বোভিনো ও তাঁর সহকর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন, যাতে পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ বানানো যায়। শিকাগোসহ বিভিন্ন শহরে পার্কিং লট ও রাস্তায় আকস্মিক ধরপাকড় নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।
এদিকে এসব অভিযোগ নাকচ করে বোভিনো বলেন, তাঁর কর্মকর্তারা আইনসম্মত, নৈতিক ও পেশাদার আচরণ করছেন। উত্তর ক্যারোলিনায় জন্ম নেওয়া বোভিনো ১৯৯৬ সালে বর্ডার প্যাট্রলে যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের সমালোচনা করায় তাঁকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি তাঁর লম্বা সবুজ কোট নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এই কোটকে নাৎসি বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে বোভিনো দাবি করেন, কোটটি তিনি ২৫ বছর আগে কিনেছেন এবং এতে কোনো রাজনৈতিক বার্তা নেই।
সব মিলিয়ে, গ্রেগরি বোভিনো এখন আর কেবল একজন সীমান্ত কর্মকর্তা নন; তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন রাজনীতির প্রতীকী চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযান যেমন সমর্থকদের কাছে কঠোর নিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি, তেমনি সমালোচকদের চোখে তা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।