রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেখতে দেখতে পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে রুশ সেনাদের রুখে দিতে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের খালি হাতের প্রতিরোধ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে এই যুদ্ধের কৌশল এখন অনেকটাই বদলে গেছে। রুশ অধিকৃত ও অবরুদ্ধ ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে এই প্রতিরোধ এখন পুরোপুরি রূপ নিয়েছে এক রোমাঞ্চকর ‘ছায়া যুদ্ধে’। আর এই আড়ালে থাকা গোপন যুদ্ধের নেপথ্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে একদল নারী ও ছদ্মনামধারী পুরুষ গোয়েন্দা, যাদের প্রতিরোধ কমান্ডাররা আদর করে ডাকছেন ‘ভিদমা’ বা ‘ডাইনি’। বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইউক্রেনের এই ‘ডাইনি বাহিনী’ এবং তাদের ভয়ংকর সব গোয়েন্দা জালের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকৃত ইউক্রেনের এক রুশ সেনা বেশ কয়েক মাস ধরে ভাবছিলেন যে তিনি বুঝি এক নিঃসঙ্গ ইউক্রেনীয় গৃহবধূর প্রেমে পড়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে তাদের দীর্ঘদিনের আলাপচারিতা একসময় গভীর রোমান্সে রূপ নেয়। একদিন ওই নারী সেনাটির সামরিক ক্যাম্প দেখতে চাইলে তিনি একটি ছবি পাঠান, যার ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব আবছাভাবে ঘাঁটির একটি মানচিত্র দেখা যাচ্ছিল। বাস্তবে কিন্তু ওপাশে কোনো নারীর অস্তিত্বই ছিল না। অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (এইচইউআর) একজন পুরুষ কর্মকর্তা। ছবি পাঠানোর মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় সেই সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক বা কো-অর্ডিনেট লক্ষ্য করে নিখুঁত ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। ইউক্রেনীয় লোকগাথায় 'ভিদমা' শব্দের অর্থ এমন এক নারী, যার কাছে বিশেষ কোনো গোপন জ্ঞান থাকে। বর্তমানে এই ডাইনিরা হলেন ইউক্রেনের সেই সাধারণ নারীরা, যাঁরা প্রতিদিন সকালে বাজার করার বাহানায় রুশ চেকপোস্ট পার হন এবং রুশ সেনাদের প্রতিটি গতিবিধি ডায়েরিতে টুকে রাখেন। এই গুপ্তচরবৃত্তির কাজ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। জার্মানি বা পোল্যান্ডে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া সাধারণ ইউক্রেনীয় গৃহিণীরাও এই কিল চেইনের অংশ হয়ে উঠেছেন। তারা বিদেশ থেকেই নিজেদের চেনা অঞ্চলের কোন গুদামঘরটি রুশ বাহিনী ব্যবহার করছে, তা ম্যাপ মিলিয়ে ড্রোনের টার্গেট নিশ্চিত করেন। তবে এই ডাইনি বাহিনীর মূল লক্ষ্য শুধু রুশ সেনাদের হত্যা করা নয়, বরং তাদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি করা। যাতে ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা প্রত্যেক রুশ সেনা বাজারে সবজি বিক্রি করা বয়স্ক নারী, বাসের ড্রাইভার কিংবা সাধারণ পথচারী—সবার দিকে তাকিয়েই নিজেদের নিশ্চিত মৃত্যু দেখতে পায়।
কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর প্রদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের হাজার হাজার কর্মী দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছিলেন। ঠিক এমন সময়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে "জুন হলিডে" শিরোনামে আসা একটি ইমেইল তাদের সাময়িক স্বস্তি ও আনন্দ দিয়েছিল। ইমেইলটিতে নতুন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পেছনে স্বাস্থ্যকর্মীদের কঠোর পরিশ্রম ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করে তাদের একদিনের জন্য 'সবেতন ছুটি' বা পেইড লিভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, এটি মূলত একটি ভুয়া ইমেইল এবং কর্তৃপক্ষের তৈরি করা সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা বা 'ফিশিং টেস্ট'। কর্তৃপক্ষের এই অসংবেদনশীল রসিকতা ও প্রতারণার শিকার হয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন প্রদেশের স্বাস্থ্যকর্মীরা। ইমেইলে বলা হয়েছিল, ছুটির সুবিধাটি পেতে হলে কর্মীদের একটি লিংকে ক্লিক করতে হবে। কিন্তু লিংকে ক্লিক করার পরদিনই তাদের জানানো হয় যে এটি কোনো আসল ছুটি ছিল না, বরং কর্মীদের সাইবার সচেতনতা যাচাই করার জন্য একটি কৃত্রিম পরীক্ষা ছিল। ছুটির এমন নিষ্ঠুর মিথ্যা আশ্বাস পেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে এবং ইতিমধ্যে অন্তত একজন কর্মী ক্ষোভে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জেরি আর্ল এই ঘটনাটিকে একটি ‘নিষ্ঠুর প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমাদের কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর ছুটির লোভ দেখিয়ে এমন তামাশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা এর চেয়ে অনেক ভালো আচরণ পাওয়ার যোগ্য।" অন্যদিকে রেজিস্টার্ড নার্সেস ইউনিয়নের সভাপতি ইভেট কফি এই পরীক্ষাকে চরম 'অসংবেদনশীল এবং অসম্মানজনক' বলে অভিহিত করেছেন এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো প্রায়শই হ্যাকারদের সাইবার হামলার শিকার হয়ে থাকে, তাই এই ধরনের সচেতনতামূলক পরীক্ষা নেওয়া জরুরি বলে মনে করে প্রশাসন। তবে এই বিশেষ ইমেইলটির স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য বোর্ডের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রন জনসন ইতিমধ্যে কর্মীদের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে এই পরীক্ষাটি তাদের কর্মীদের মূল্যায়ন করার সঠিক পদ্ধতি ছিল না এবং কীভাবে এই ইমেইলটি পাঠানো হলো তা খতিয়ে দেখতে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
জার্মানির বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৯০-এর দশকের শুরুর দিকে অবসরের বয়সসীমা ধাপে ধাপে ৭০ বছর করার একটি নতুন সুপারিশে সমর্থন দিয়েছেন দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ। জার্মান পেনশন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন মঙ্গলবার তাদের ৩৩ দফা সুপারিশ পেশ করার পর চ্যান্সেলর এই ঘোষণা দেন। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের ভঙ্গুর পেনশন ব্যবস্থাকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর থেকে বিপুল আর্থিক চাপ কমিয়ে আনা। বর্তমানে জার্মানির নিয়ম অনুযায়ী ২০৩০-এর দশকের শুরুতে যারা অবসরে যাবেন, তাদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে ৬৭ বছর। তবে বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানিয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই বয়সসীমা পর্যায়ক্রমে বাড়াতে হবে, যা ২০৯০-এর দশকের মধ্যে ৭০ বছরে গিয়ে ঠেকবে। চ্যান্সেলর মের্জ আশ্বস্ত করে বলেছেন, "কোনো নাগরিকেরই উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।" এই সংস্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক চুক্তি আরও জোরালো হবে এবং তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হতে পারবে। কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ হলো—শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবদানের অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা, যাতে তহবিলটির আর্থিক মূল্য সুরক্ষিত থাকে এবং বৃদ্ধি পায়। এছাড়া সিভিল সারভেন্ট বা সরকারি আমলা এবং স্বনির্ভর পেশাজীবীদেরও এই বাধ্যতামূলক পেনশন অবদানের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, যারা একটানা ৪৫ বছর কাজ করার পর ৬৩ বছর বয়সে কোনো পেনশন কর্তন ছাড়াই আগাম অবসরের সুবিধা পেতেন, সেই বিশেষ সুযোগটি পুরোপুরি বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি অন্যতম। বর্তমানে দেশটিতে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে দীর্ঘজীবী অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এই সংস্কারের কিছু প্রস্তাব নিয়ে ইতিমধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন এবং বামপন্থী জোটের সদস্যদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, আগাম অবসর বাতিলের সিদ্ধান্তটি নির্মাণ শ্রমিক বা কেয়ারারদের মতো কঠোর পরিশ্রমী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়া শেয়ার বাজারের ওপর পেনশনের নির্ভরতা জার্মানির সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ ভীতির কারণে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছেন। উল্লেখ্য, ১৮৮৯ সালে চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের হাত ধরে জার্মানিতে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সে সময় অবসরের বয়স ৭০ বছরই নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা তৎকালীন গড় আয়ুর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। প্রায় দুই শতাব্দী পর, ২০২১ সালের পর জন্ম নেওয়া জার্মান নাগরিকদের জন্য অবসরের বয়স আবারও সেই ৭০ বছরেই ফিরে যেতে চলেছে। চ্যান্সেলর মের্জ আগামী মাসের সংসদীয় ছুটির আগেই এই ঐতিহাসিক সংস্কার বিলটি সংসদে পাস করার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের (ইউকে) ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ঐতিহাসিক বের হয়ে যাওয়ার বা 'ব্রেক্সিট' গণভোটের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এক দশক পর এসে এখন ব্রিটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকই মনে করছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে দেওয়াটা তাদের একটি মস্ত বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। স্বাধীন জনমত জরিপ সংস্থা 'ইউগভ'-এর সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ব্রেক্সিটের পর থেকে অর্থনৈতিক মন্দা এবং স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার হারানোর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে ব্রিটেন তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই এক দশকে দেশটিতে সাতজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছেন, যারা ব্রেক্সিটের পরবর্তী ধাক্কা এবং বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছেন। যুক্তরাজ্যের বাজেট বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইইউ ছাড়ার কারণে ব্রিটেনের উৎপাদনশীলতা, আমদানি ও রপ্তানি ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও সম্প্রতি বলেছেন, ব্রেক্সিটের পরিণতি তাদের আশঙ্কার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। তবে গত ১০ বছরে ব্রিটেনের জনমিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া বয়স্ক নাগরিকদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে মারা গেছেন এবং নতুন প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা যুক্ত হয়েছেন, যারা মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে। বর্তমানে সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ ভোটার পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার জন্য নতুন করে গণভোট চান। তবে ব্রিটেনের বেশ কিছু ডানপন্থী রাজনৈতিক দল এখনো ব্রেক্সিটের পক্ষেই সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন। যদিও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ ইইউ-তে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন, তবুও ব্রিটেনের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা এখনই নতুন কোনো গণভোটের আয়োজন করতে রাজী নন। তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। তবে ব্রেক্সিট যে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে—তা এখন দেশটির অধিকাংশ মানুষই অকপটে স্বীকার করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিমদের মধ্যে ইসলামিক বা শরিয়াহসম্মত হোম ফাইন্যান্সিং নিয়ে আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে যারা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে প্রচলিত সুদভিত্তিক মর্টগেজ থেকে দূরে থাকতে চান, তাদের জন্য বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভিডিও দেখুন: যুক্তরাষ্ট্রে হালাল মর্টগেজ লোন কীভাবে কাজ করে? মুসলিমদের জন্য বাসা কেনার শরিয়াহসম্মত উপায় বিশ্বব্যাপী ইসলামিক অর্থনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও গড়ে উঠেছে শরিয়াহসম্মত অর্থায়নের একটি স্বতন্ত্র খাত। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুসলিম গ্রাহকদের জন্য এমন কিছু ব্যবস্থা চালু করেছে, যেগুলো সুদের পরিবর্তে সম্পদ, ভাড়া কিংবা অংশীদারিত্বভিত্তিক কাঠামোর ওপর পরিচালিত হয়। অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ইসলামিক ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিংয়ের তিনটি প্রধান মডেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো মুরাবাহা, ইজারা এবং ডিমিনিশিং মুশারাকা। ইসলামিক অর্থনীতির মৌলিক নীতির মধ্যে অন্যতম হলো সুদ বা ‘রিবা’ পরিহার করা। একই সঙ্গে লেনদেনকে বাস্তব সম্পদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা, চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি ও লাভের ন্যায্য বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিংয়ের বিভিন্ন মডেল এসব নীতির আলোকে তৈরি হয়েছে। ভিডিও দেখুন:যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট ছেড়ে কেন জর্জিয়ামুখী বাংলাদেশিরা? ৫ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন আতাহার হোসেন মুরাবাহা পদ্ধতিকে তুলনামূলকভাবে সহজ মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ব্যবস্থায় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রথমে গ্রাহকের পছন্দের বাড়িটি ক্রয় করে। এরপর সেই বাড়িটি মূল মূল্য এবং পূর্বনির্ধারিত লাভ যোগ করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয়। গ্রাহক দীর্ঘমেয়াদে কিস্তির মাধ্যমে সেই অর্থ পরিশোধ করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি বাড়ির মূল্য যদি ৪ লাখ ডলার হয়, তাহলে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান সেটি কিনে নির্ধারিত লাভ যোগ করে ৫ লাখ ডলারে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারে। চুক্তির শুরুতেই মোট মূল্য নির্ধারিত থাকায় ভবিষ্যতে অর্থ পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে না। তবে কিছু গবেষক ও আলেমের মতে, এই মডেলের সঙ্গে প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত মিল রয়েছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ভিডিও দেখুন: নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাড়িভাড়া সংকটের মূল কারণ এবং তা থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায়গুলো বিস্তারিত জানতে সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখুন। অন্যদিকে ইজারা পদ্ধতি মূলত ভাড়াভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা। ‘ইজারা’ শব্দের অর্থ ভাড়া। এই মডেলে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাড়ির মালিক হিসেবে থাকে এবং গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাড়িটি ব্যবহার করেন। এর বিনিময়ে তিনি মাসিক ভাড়া প্রদান করেন। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে মালিকানা অর্জনের সুযোগও থাকে। নির্ধারিত সময় শেষে সম্পূর্ণ মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ইসলামিক স্কলারদের মতে, এই পদ্ধতিতে ঋণের পরিবর্তে সম্পদ ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা হয়, যা ইসলামিক অর্থনীতির নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তবে চুক্তির শর্ত এবং মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং বহুল ব্যবহৃত ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং মডেল হলো ডিমিনিশিং মুশারাকা বা হ্রাসমান অংশীদারিত্ব ব্যবস্থা। অনেক ইসলামিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এই মডেলকে তুলনামূলকভাবে বেশি শরিয়াহসম্মত বলে মনে করেন। এই ব্যবস্থায় বাড়ির মালিকানা শুরু থেকেই গ্রাহক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগাভাগি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বাড়ির মূল্য ৫ লাখ ডলার হলে এবং গ্রাহক যদি ২৫ হাজার ডলার ডাউন পেমেন্ট দেন, তাহলে তিনি শুরুতে বাড়িটির ৫ শতাংশের মালিক হবেন। বাকি ৯৫ শতাংশ মালিকানা থাকবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। পরবর্তী সময়ে গ্রাহক মাসিক ভিত্তিতে দুটি অংশে অর্থ প্রদান করেন। একটি অংশ প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন অংশ ব্যবহারের জন্য ভাড়া হিসেবে এবং অন্য অংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানা ধীরে ধীরে কিনে নেওয়ার জন্য। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কমতে থাকে এবং গ্রাহকের মালিকানা বাড়তে থাকে। চুক্তির নির্ধারিত মেয়াদ শেষে পুরো বাড়ির মালিকানা গ্রাহকের হাতে চলে আসে। ইসলামিক ফাইন্যান্স ল্যান্ডারদের মতে, ঝুঁকি ও মালিকানা ভাগাভাগির কারণে এই মডেলটি অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থনীতির একটি বাস্তব প্রতিফলন। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং খাতে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে Guidance Residential, UIF Corporation, Ijara Community Development Corporation (IjaraCDC), Devon Bank Islamic Financing এবং LARIBA-এর মতো প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং সেবা প্রদান করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই শরিয়াহ উপদেষ্টা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তাদের পণ্য ও সেবার কাঠামো নির্ধারণ করে থাকে। তবে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং নিয়ে সব আলেম ও গবেষকের মধ্যে অভিন্ন মত নেই। কেউ কেউ এটিকে মুসলিমদের জন্য একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখেন। আবার অন্যদের মতে, কিছু মডেলের বাস্তব প্রয়োগ আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে কোনো চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, ফি, মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি এবং শরিয়াহ বোর্ডের মতামত সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামিক অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও শরিয়াহসম্মত আর্থিক সেবার চাহিদা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আর্থিক সচেতনতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং আরও বিস্তৃত হবে এবং বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে দুই মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করে ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন এক নারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাকে মুসলিম নারীদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, “এটি কোনো মুসলিম দেশ নয়, এটি একটি খ্রিস্টান দেশ,” এবং “তোমাদের ইসলামিক দেশে ফিরে যাওয়া উচিত।” ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলে নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকেই ঘটনাটিকে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যের দেশ, যেখানে কোনো ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে হেয় করা গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট নারী তার চাকরি হারিয়েছেন বলে জানা গেছে। তার কর্মস্থল এক বিবৃতিতে জানায়, কর্মীর আচরণ প্রতিষ্ঠানটির মূল্যবোধ ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তারা তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতিতে বলা হয়, “দুঃখজনকভাবে এই কর্মীকে ঘিরে এটিই প্রথম ঘটনা ছিল না, তবে এটিই ছিল শেষ ঘটনা। আমরা প্রত্যেকের মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করি। কিন্তু যখন কোনো কর্মীর কর্মকাণ্ড আমাদের ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন আমাদের পদক্ষেপ নিতে হয়।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “এই সিদ্ধান্তে সবাই সন্তুষ্ট হবেন না। তবে অতীতের ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে আমরা সাবেক ওই কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছি এবং তার ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানাই।” এদিকে ঘটনাটি মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী বলেছেন, মুসলিম আমেরিকানরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক আচরণের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক অবস্থান প্রয়োজন। অন্যদিকে, বরখাস্ত হওয়া নারীর সমর্থনে একটি অনলাইন তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে কয়েক হাজার ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে সমর্থন বা পুরস্কৃত করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির সংস্কৃতি জোরদার করা জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় বৈচিত্র্য, অভিবাসন এবং সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল এস্টেট বাজারবিষয়ক সংস্থা জিলোর নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি অঙ্গরাজ্যে এখন অন্তত এমন একটি শহর রয়েছে যেখানে প্রাথমিক বা সাধারণ মানের একটি বাড়ি কিনতেই ১০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এই নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড ২৪২টি শহরে সাধারণ একটি প্রাথমিক বাড়ির মূল্য কমপক্ষে ১০ লাখ ডলার বা তার চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগের তুলনায় এই সংখ্যাটি প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ মহামারির আগের সময়ে দেশটির মাত্র ৮০টি শহরে এই মূল্যের বাড়ি বা প্রোপার্টি দেখা যেত। রিয়েল এস্টেট সংস্থা জিলোর পক্ষ থেকে মূলত একটি স্থানীয় আবাসন বাজারের সবচেয়ে কম মূল্যের এক-তৃতীয়াংশ বাড়ি বা প্রোপার্টিকে প্রাথমিক বাড়ি বা 'স্টার্টার হোম' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে। বর্তমানে আমেরিকার ২৬টি অঙ্গরাজ্যের মোট ২৪২টি শহরে এই প্রাথমিক বা প্রবেশিকা স্তরের বাড়ির মূল্য ১০ লাখ ডলারের ঘর স্পর্শ করেছে। জিলোর পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও দেশটির ২২৬টি শহরে এই ধরনের প্রাথমিক বাড়ির মূল্য অন্তত ১০ লাখ ডলার ছিল, যা এক বছরের ব্যবধানে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবাসন খাতের এই ঊর্ধ্বমুখী চিত্রটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে করোনাকালীন সময়ের আবাসন খাতের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখনো দেশটির বাজারে পুরোপুরি রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তীব্র আবাসন সংকট এবং তার সাথে ঐতিহাসিকভাবে কম বন্ধকী বা মরগেজ সুদের হারের কারণে সৃষ্ট বিপুল চাহিদার ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এই স্টার্টার হোমগুলো কেনা এক প্রকার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। যদিও দেশব্যাপী একটি সাধারণ মানের প্রাথমিক বাড়ির গড় বাজার মূল্য এখনো প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। তবে নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর ও উন্নত এলাকায় এই দামের পার্থক্য আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। করোনা মহামারির আগে এই ধরনের উচ্চ মূল্যের প্রাথমিক বাড়িগুলো মূলত আমেরিকার সমুদ্র উপকূলবর্তী অল্প কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি আর কেবল উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন অংশে একটি ডিম্বাকৃতির প্যাটার্নে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে আবাসন খাতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সামগ্রিক চিত্রটিকেই সরাসরি প্রতিফলিত করে। নতুন এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে মহামারির পর থেকে আমেরিকার মানুষের আবাসন ব্যয়ের এই বিশাল পরিবর্তন দেশের মধ্যভাগের রাজ্যগুলোতেও বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বর্তমানে মোট ১০৫টি শহর নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যটি পুরো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে, যেখানে সাধারণ একটি প্রাথমিক বাড়ি কিনতেই ক্রেতাদের অন্তত ১০ লাখ ডলার বা তার চেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পাশাপাশি নিউইয়র্ক এবং নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের পরিস্থিতিও বেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই দুটি অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে বর্তমানে এমন শহরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১টিতে, অথচ মহামারির আগে এই দুই অঞ্চলে এমন শহরের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২টি। এই হিসাব থেকে এটি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোতে আবাসন সংকট এবং ক্রেতাদের প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে। মেট্রোপলিটন বা বড় নগর অঞ্চলগুলোর হিসাবের দিক থেকে বর্তমানে নিউ ইয়র্ক সিটি মেট্রো এলাকাটি সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, যার মধ্যে নিউ জার্সি এবং পেনসিলভেনিয়ার কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই পুরো মেট্রো অঞ্চলে এমন শহরের সংখ্যা মোট ৬৩টি। নিউ ইয়র্কের পরেই ৩৭টি শহর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সান ফ্রান্সিসকো মেট্রো এলাকা। এছাড়াও শীর্ষ পাঁচের মধ্যে থাকা অন্য প্রধান অঞ্চলগুলোর মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেসে ৩৩টি, সান জোসে ১৩টি এবং মিয়ামিতে ৮টি এমন শহর রয়েছে যেখানে সাধারণ বা প্রাথমিক স্তরের বাড়ির মূল্য এখন ১০ লাখ ডলারের ওপরে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালত লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘সাংকচুয়ারি সিটি’ নীতির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের করা মামলা খারিজ করে দিয়েছে। অভিবাসন নীতি নিয়ে ফেডারেল সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রেক্ষাপটে আদালতের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করেছিল যে লস অ্যাঞ্জেলেসের সাংকচুয়ারি সিটি নীতি ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা সীমিত করছে এবং এর ফলে অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি এবং মামলাটি খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে প্রশাসনকে সংশোধিত অভিযোগ দাখিলের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। সাংকচুয়ারি সিটি নীতির আওতায় অনেক শহর ও স্থানীয় প্রশাসন ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নির্দিষ্ট তথ্য বিনিময় বা অভিবাসন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ সীমিত রাখে। এ ধরনের নীতির সমর্থকদের দাবি, এতে অভিবাসী সম্প্রদায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বেশি আস্থা রাখতে পারে এবং অপরাধ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত হয়। অন্যদিকে নীতির সমালোচকদের মতে, স্থানীয় প্রশাসনের এ ধরনের সীমাবদ্ধতা ফেডারেল অভিবাসন আইন কার্যকর করার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কমিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও আইনি লড়াই নতুন নয়। বিশেষ করে সাংকচুয়ারি সিটি নীতি নিয়ে ফেডারেল সরকার ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য কিংবা শহর প্রশাসনের মধ্যে বহুবার বিরোধ দেখা গেছে। সাম্প্রতিক এই রায় সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত শুধু লস অ্যাঞ্জেলেসের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সাংকচুয়ারি সিটি নীতি অনুসরণকারী শহর ও স্থানীয় প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি অভিবাসন ইস্যুতে ফেডারেল ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে চলমান বিতর্কেও এ রায়ের প্রভাব পড়তে পারে।
শিকাগোর ট্রাম্প টাওয়ারের সামনের রাস্তার নাম পরিবর্তন করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নামে নামকরণের একটি প্রস্তাবের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন শহরটির মেয়র ব্র্যান্ডন জনসন। এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বাধা বা নিয়ম পরিবর্তনের জন্য তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছেন। চলতি সপ্তাহে এক বিবৃতিতে শিকাগোর মেয়র ব্র্যান্ডন জনসন বলেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার ব্যতিক্রমী ও অনন্য নেতৃত্বের বিষয়ে কোনো ধরনের বিতর্কের অবকাশ নেই। এই বিশেষ সম্মাননা প্রদানের লক্ষ্যে জীবিত কোনো ব্যক্তির নামে রাস্তার নামকরণ না করার যে দীর্ঘদিনের নিয়ম রয়েছে, সেটি সংস্কার করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। এর ফলে ভবিষ্যতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট শিকাগোবাসীদেরও একই ধরনের সম্মাননা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন তিনি। মূলত শিকাগোর অ্যালডারম্যান ব্রেন্ডন রেইলি এই নতুন অধ্যাদেশটি সিটি কাউন্সিলে উত্থাপন করেছেন। এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হলো ওবাশ অ্যাভিনিউ নামক রাস্তাটির একটি অংশকে সম্মানসূচক 'বারাক হুসেইন ওবামা ওয়ে' হিসেবে পুনর্নামকরণ করা। এই নির্দিষ্ট রাস্তাটি সরাসরি ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে দিয়ে চলে গেছে এবং বর্তমানে এই পুরো প্রস্তাবটি পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে রয়েছে। এই পুরো পরিকল্পনাটির পেছনে কেবল শিকাগোর মেয়রের একক সমর্থন নয়, বরং এর সপক্ষে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের স্বাক্ষর সংবলিত একটি বিশাল আবেদনপত্র বা পিটিশন জমা পড়েছে, যা এই উদ্যোগের প্রতি সাধারণ মানুষের ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়। এই ঐতিহাসিক নামকরণের ক্ষেত্রে বর্তমানে একমাত্র মূল অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে শিকাগো শহরের একটি প্রাচীন আইনি নিয়ম বা বিধান। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সম্মানসূচক রাস্তার নামকরণ কেবল সেই সমস্ত ব্যক্তিদের স্মরণে করা সংরক্ষিত থাকে, যারা ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন বা আমাদের মাঝে আর বেঁচে নেই। যেহেতু বারাক ওবামা এখনো জীবিত, তাই এই আইনি জটিলতা কাটাতে মেয়র ব্র্যান্ডন জনসন ইতিমধ্যে আইনটি পুরোপুরি পরিবর্তন বা সংস্কার করার বিষয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছেন। মজার বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই একই ভবনের গায়ে বিশাল আকৃতির সোনালী অক্ষরে নিজের নাম স্থায়ীভাবে খোদাই করেছিলেন, তখন এই ধরনের কোনো নিয়মের প্রসঙ্গ ওঠেনি। ট্রাম্প নিজেই অবশ্য অতীতে একই ধরনের আইনি নিয়মের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যখন তিনি আমেরিকার কাগজের মুদ্রায় নিজের ছবি যুক্ত করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ীও মুদ্রায় ছবি স্থান পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রয়াত বা মৃত হতে হয়। শিকাগো শহর কর্তৃপক্ষ অবশ্য বেশ কয়েক বছর আগেই ট্রাম্পের নামে থাকা সম্মানসূচক রাস্তার নামফলকটি সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করেছে। ট্রাম্পের সেই পুরনো সম্মাননা কেড়ে নেওয়ার পর এখন শহর প্রশাসন সেই একই স্থানে ওবামার নাম যুক্ত করার জন্য ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওবামার মধ্যনাম 'হুসেইন' শব্দটিকে নেতিবাচক বা ব্যঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। শিকাগো শহর কর্তৃপক্ষ এখন ট্রাম্পের সেই ব্যঙ্গকে এক প্রকার জবাব দিতেই তার মালিকানাধীন ভবনের ঠিক সামনের সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে 'হুসেইন' নামটি স্থায়ীভাবে ঝুলিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করেছে জার্মানি। দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না বলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের দেওয়া এক বক্তব্যের পর সোমবার (২২ জুন) বার্লিন এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। জার্মান সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব (স্বাধীন রাষ্ট্রীয় অধিকার) ক্ষুণ্ন করে সেখানে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বার্লিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্টিন গিসে বলেন, "এ বিষয়ে ফেডারেল সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছি। এর পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া লেবাননের বেসামরিক জনগণকে তাদের নিজস্ব ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে বাধা দেওয়া যাবে না।" পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে জার্মান সরকারের প্রধান মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি বার্লিনের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছিলেন যে, লেবাননে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ‘কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ বা বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমি আগেই স্পষ্ট করেছি যে, লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে ইসরায়েল তার সেনা প্রত্যাহার করবে না।" মূলত গত শুক্র ও শনিবার দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ২০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালানোর পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। ইসরায়েলের এমন আগ্রাসী অবস্থানের মুখে জার্মানির এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা অবসানের আহ্বান জানানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি সেনা রেখে দেওয়ার এই জেদ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
শাহারিয়া নয়ন
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
মৃদুল রহমান
ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিদেশি সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) পশ্চিম তীরের গুশ এৎজিয়ন এলাকায় রিজার্ভ যুদ্ধ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন নেতানিয়াহু। এ সময় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বছরের পর বছর ধরে যে সহায়তা ইসরায়েল পেয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা থাকলেও ভবিষ্যতের বাস্তবতায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। নেতানিয়াহুর ভাষায়, “আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছি। কিন্তু এখন সময় এসেছে নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করার। আমাদের একটি স্বাধীন অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।” তিনি আরও বলেন, ইরান এবং তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে এই সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। আগামী কয়েক দশকে দেশের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে বর্তমান শক্তি ও প্রস্তুতির ওপর। সে কারণেই এখন থেকেই সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরেই নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানোর কথা বলে আসছেন। তবে তার সাম্প্রতিক এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারণী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল তার প্রতিরক্ষা নীতিতে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশটির নিজস্ব সামরিক শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার কৌশল সামনে আনছে সরকার। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে অনেকেই ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চীনের তৈরি জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া এই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও বহাল রেখেছে এবং বিষয়টি নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে। সরকারি একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে দুই দেশের সামগ্রিক সহযোগিতার পাশাপাশি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ সফরে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, “এখনো আলোচনা পর্যায়েই বিষয়টি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ নিয়ে কথা হবে, তবে মূলত দরকষাকষি বা আলোচনাই হবে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে।” গত শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সার্বিক দিক তুলে ধরা হয়। সেখানে সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, এ ধরনের ক্রয়প্রক্রিয়া মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। তিনি উল্লেখ করেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের এবং এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এর আগে গত বছরের মার্চে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের সময়ও মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ২০টি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কিনতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগটি মূলত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনার অংশ। বর্তমানে বিমান বাহিনীর বহরে থাকা এফ-৭ সিরিজের পুরোনো যুদ্ধবিমান এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ ধীরে ধীরে অপ্রচলিত হয়ে পড়ছে। এসবের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন যুদ্ধবিমান যুক্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে, যাতে দেশের আকাশসীমার নিরাপত্তা এবং সমুদ্রসীমায় নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধবিমানগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো মডেলের। আধুনিকায়নের জন্য নতুন যুদ্ধবিমান প্রয়োজন। চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চলছে—এটা ইতিবাচক দিক।” জে-১০ সিই মূলত চীনের বিমান বাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি মডেলের রপ্তানি সংস্করণ। গত বছর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় পাকিস্তান এই মডেলের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতের ফরাসি নির্মিত রাফায়েল বিমান ভূপাতিত করার দাবি করায় এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। বাংলাদেশে যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৬ সাল থেকেই এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চলছিল। ফ্রান্সের রাফায়েল, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়ামের ইউরোফাইটার টাইফুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬—এই তিন ধরনের যুদ্ধবিমান নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঢাকা সফরকালে রাফায়েল কেনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চীনের সঙ্গে চলমান আলোচনা সফল হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
গাছ যে কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, বরং একটি জীবন্ত সত্তা—এই ধারণাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে কানাডার একটি ছোট পৌরসভা। দেশটির কুইবেক প্রদেশে মন্ট্রিল থেকে প্রায় ৪০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত তেরাস-ভদ্রেয়ঁ শহর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, গাছেরও জীবনধারণ, স্বাভাবিক বৃদ্ধি, অখণ্ডতা ও বংশবৃদ্ধির অধিকার রয়েছে। কানাডীয় সংবাদমাধ্যম সিবিসি’র প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রায় দুই হাজার বাসিন্দার এই শহরে গত ৯ জুন সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাস হয়, যার মাধ্যমে গাছকে আইনি মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শহরের মেয়র মিশেল বুর্দো জানান, পৌর কাউন্সিলের সব সদস্য একমত হয়েই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পৌরসভার বিদ্যমান সব নিয়মকানুন ও উপবিধি পুনর্বিবেচনা করা হবে। গাছ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং কোনো গাছ কাটা হলে তার পরিবর্তে নতুন গাছ লাগানোর বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক জলবায়ু সংকটের অভিজ্ঞতা। গত কয়েক বছরে তেরাস-ভদ্রেয়ঁ তিনবার বড় ধরনের বন্যার মুখোমুখি হয়েছে। মেয়র বুর্দোর ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গাছই ‘আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু’। তিনি বলেন, গাছ এক ধরনের প্রাকৃতিক বা সবুজ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে—যা শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর মান উন্নয়ন, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উদ্যোগের পেছনে একটি সাংস্কৃতিক প্রভাবও কাজ করেছে। কুইবেকের চলচ্চিত্র নির্মাতা অঁদ্রে দেসরোশের নির্মিত ‘দেস আর্ব্রেস এ দেস আর্তস’ নামের একটি চলচ্চিত্র স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করে। ছবিটি দেখার পর অনেকেই উপলব্ধি করেন, গাছ কেবল স্থির বস্তু নয়; তারা শ্বাস নেয়, পরিবেশের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে এবং শিকড়ের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। মেয়র বুর্দো বলেন, “গাছ মানুষের মতোই একটি জীবন্ত সত্তা। তারা পানি গ্রহণ করে, বেঁচে থাকে এবং আমাদের নানা বিপদ থেকে রক্ষা করে।” পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব দ্য রাইটস অব দ্য ট্রি’-তে প্রথম পৌরসভা হিসেবে স্বাক্ষর করেছে তেরাস-ভদ্রেয়ঁ। ইন্টারন্যাশনাল অবজারভেটরি অব নেচার রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘোষণাপত্রের মূল তিনটি নীতি হলো—পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব গাছের ওপর নির্ভরশীল, গাছের সঙ্গে মানুষের ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি বজায় রাখা জরুরি এবং গাছ একটি জীবন্ত সত্তা, যা মানবজাতির জন্য সামগ্রিকভাবে উপকারী। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ইয়েনি ভেগা কার্দেনাস সিবিসিকে বলেন, গাছের নিজস্ব মর্যাদা ও উপলব্ধি রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, এটি আবেগের বিষয় নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা—গাছের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা আছে। বিশ্বজুড়ে প্রকৃতি ও পরিবেশকে আইনি অধিকার দেওয়ার যে প্রবণতা বাড়ছে, এই সিদ্ধান্ত তারই একটি অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর আগে ২০২১ সালে কানাডার কুইবেকেই ম্যাগপাই নদীকে ‘আইনগত ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, যা পরিবেশ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেরাস-ভদ্রেয়ঁর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য শহর ও দেশগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে, যেখানে পরিবেশ রক্ষাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আরও শক্তিশালীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পথ তৈরি হবে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সমঝোতা প্রক্রিয়া নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এই মুহূর্তে তেহরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার। সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র ভিত্তিতে দুই দেশ নতুন করে আলোচনায় বসেছে এবং এই প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। ইসহাক দার জানান, আলোচনার পরবর্তী ধাপ মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে—ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, তেহরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি। এসব বিষয়ে বিশদ পর্যালোচনার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে তিনটি পৃথক কারিগরি দল গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই সমঝোতা প্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী কাঠামোয় নিয়ে যেতে উভয় পক্ষের জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও প্রয়োজন হলে পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৭ বছর পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি আলোচনায় বসতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই অগ্রগতিকে তিনি ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো গোপন সমঝোতা নয়—বরং লিখিত ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র মাধ্যমেই পুরো প্রক্রিয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক মজুত কমানোর মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুটি বহু বছর ধরেই ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের মূল দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা জোরদার করতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্ক মিলে ‘আর-৪ ফোরাম’ নামে একটি নতুন আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে। ইসহাক দার বলেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক জোট নয়; বরং প্রায় ৫০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী একটি যৌথ উদ্যোগ, যা লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর এবং আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ জোরদারে ভূমিকা রাখবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই এই সমঝোতা কাঠামোকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নিরসনে একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সংলাপ সফল হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।