যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ 'জি'-এর ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয়েছিল ইরান। তবে খেলা শুরুর আগে স্টেডিয়ামজুড়ে আবারও এক নজিরবিহীন ও বৈরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মাঠে যখন ইরানের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছিল, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক তীব্র ক্ষোভে দুয়োধ্বনি ও ভুভুজেলা বাজিয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এর আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের নিজেদের প্রথম ম্যাচেও একই ধরনের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল দলটিকে। ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামের ফিফা ঘোষক উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্য করে ‘শান্তির জন্য হাততালি’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠের রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সাধারণ দর্শকদের কাছ থেকে সেই আহ্বানে খুবই মৃদু সাড়া পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইরানের এই বিশ্বকাপ অভিযান এমন এক সময়ে শুরু হলো যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছেন। ম্যাচটি শুরুর আগে স্টেডিয়ামের বাইরে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ জন বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে ইরান সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীরা জানান, তারা এই ম্যাচটি গ্যালারিতে বসে দেখতে চান না, কারণ এতে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করা বোঝাবে। মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর বিপুলসংখ্যক ইরানি নাগরিক দেশ ছেড়ে ফ্লোরিডা ও লস অ্যাঞ্জেলেসে আশ্রয় নেন। বর্তমানে ইরানের বাইরে লস অ্যাঞ্জেলেসকেই ইরানি সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় বাসস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও ইসরায়েলের ওপর মার্কিন হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শুরু থেকেই দলটির বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে চরম বিতর্ক চলছিল। এর আগে জানুয়ারি মাসে ইরানে গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারের কঠোর দমনে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার জের ধরে সম্প্রতি ইরানি ফুটবল দল তাদের প্রশিক্ষণ শিবির অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছিল। এছাড়া তাদের বেশ কয়েকজন স্টাফকে মার্কিন ভিসা না দেওয়া এবং সমর্থকদের টিকিট বাতিল করার বিষয়ে ফিফার কাছে অভিযোগ করেছিল ইরান ফুটবল ফেডারেশন। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনো মিথ্যা অজুহাতে ইরানি দলকে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ করানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে সোমবার সকালে এক জরুরি শুনানির পর ইরানের বিপ্লব-পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক পতাকা স্টেডিয়ামে বহনের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন মার্কিন আদালত। ওই পতাকায় বর্তমান পতাকার মতোই রং থাকলেও মাঝে একটি সিংহ ও সূর্যের প্রতীক রয়েছে, যা দেশটির পূর্ববর্তী শাহ আমলের শাসনের প্রতিনিধিত্ব করে। ফিফার নিয়মানুযায়ী স্টেডিয়ামের ভেতর যেকোনো ধরনের ‘রাজনৈতিক, আপত্তিকর বা বৈষম্যমূলক’ পোশাক এবং পতাকা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে বিচারক কার্টিস কিন তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, বাক-স্বাধীনতা অবশ্যই অত্যন্ত পবিত্র এবং সমাজের অন্যতম ভিত্তি। তবে কোনো বেসরকারি সম্পত্তির ওপর বেসরকারি পক্ষের ক্ষেত্রে এর নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং পূর্ববর্তী মামলার নজির অনুযায়ী এটি একটি যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ। তাই ফিফার নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে করা আবেদনটি খারিজ করা হলো।
কিউবার কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম শীর্ষ নায়ক বা ‘হিরো’র কন্যা আলিনা রোসালেস আগুয়েরেতাকে (৩৭) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির অভিবাসন ও সীমান্ত এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা। ট্যুরিস্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান করে একটি ক্লিনিকে প্লাস্টিক সার্জন হিসেবে কাজ করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত আলিনা কিউবার অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রভাবশালী জেনারেল উলিসেস রোসালেস দেল তোরোর কন্যা। আইসিই এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলিনা রোসালেস আগুয়েরেতা পেশায় একজন প্রশিক্ষিত প্লাস্টিক সার্জন। তিনি ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর বি-২ ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ওরাল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালের মে মাসে তার সেই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি অবৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান। গত ২৬ মে মিয়ামির একটি প্লাস্টিক সার্জারি ক্লিনিকে সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় কেন্দ্রীয় অভিবাসন এজেন্টরা তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। আলিনার বাবা ৮৪ বছর বয়সী জেনারেল উলিসেস রোসালেস দেল তোরো কিউবার ইতিহাসের একজন অন্যতম প্রভাবশালী কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ব। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি কিউবান বিপ্লবের সময় ফিদেল কাস্ত্রো এবং রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে যুদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দেশটির বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাকে ‘হিরো অব দ্য রিপাবলিক অব কিউবা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়া তিনি কিউবার কৃষিমন্ত্রী এবং কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবেও শীর্ষ দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সংস্থা আইসিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলিনা রোসালেস আগুয়েরেতার বিরুদ্ধে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তিনি আইসিই হেফাজতে রয়েছেন এবং অভিবাসন আদালতের বিচারকের সামনে শুনানির জন্য অপেক্ষা করছেন। এই বিষয়ে আরও তথ্য হাতে এলে তা পরবর্তীতে জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর দেশটিতে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছে, যার অংশ হিসেবে কিউবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজনদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আলিনা গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিন আগেই আদিস লাস্ট্রেস মোরেরা নামের আরেক কিউবান নারীকে গ্রেপ্তার করে লুইজিয়ানার একটি আইসিই ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। ওই নারী কিউবার সামরিক বাহিনী পরিচালিত এবং দেশটির অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী গোপন প্রতিষ্ঠান ‘গায়েসা’র (GAESA) প্রেসিডেন্ট তথা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিয়া গুইলারমিনা লাস্ট্রেসের আপন বোন।
নিজেদের যুদ্ধবিমানের বহর সচল রাখতে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে বাতিল ও অবসরে যাওয়া ৯টি জাগুয়ার যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। তবে এই বিমানগুলো সরাসরি আকাশে ওড়ানোর জন্য নয়, বরং ভারতের নিজস্ব যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও পুনঃব্যবহারযোগ্য উপাদান সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে স্কোয়াড্রন সংকট এবং খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র ঘাটতির মুখে থাকা ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনুমোদিত ৪২টি স্কোয়াড্রনের বিপরীতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সক্রিয় স্কোয়াড্রন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৯টিতে। এর মধ্যে এখনও জাগুয়ার যুদ্ধবিমানের ৬টি স্কোয়াড্রন পরিচালনা করছে তারা। সারা বিশ্বের মধ্যে বর্তমানে ভারতীয় বিমান বাহিনীই একমাত্র সামরিক বাহিনী, যারা এখনও এই পুরোনো জাগুয়ার যুদ্ধবিমান সচল রেখেছে। এই বিমানগুলো থেকে ল্যান্ডিং গিয়ার, হাইড্রোলিক ব্যবস্থা, অ্যাভিওনিক্স এবং রোলস-রয়েস অ্যাডুর ইঞ্জিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে নিজেদের ঘাটতি মেটাবে ভারত। বিদেশ থেকে অবসরপ্রাপ্ত জাগুয়ার সংগ্রহ করার ঘটনা ভারতের জন্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ফ্রান্স, ওমান এবং যুক্তরাজ্য থেকে অবসরে যাওয়া জাগুয়ার বিমান সংগ্রহ করেছিল দেশটি। ২০১৮ সালে ফ্রান্স বিনামূল্যে ৩১টি অবসরপ্রাপ্ত জাগুয়ার বিমান, ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ ভারতকে দিয়েছিল এবং ওমানের সঙ্গেও ২০টির বেশি ভালো মানের অবসরপ্রাপ্ত জাগুয়ার হস্তান্তরের চুক্তি হয়েছিল। মূলত ১৯৮০-এর দশকে প্রথম এই মডেলের যুদ্ধবিমান সংগ্রহ শুরু করেছিল ভারত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, গত এক দশকে তাদের জাগুয়ার বহরের প্রায় অর্ধেক বিমানকে আধুনিক মানের ‘ড্যারিন-৩’ (DARIN-III) প্রযুক্তিতে উন্নীত করা হয়েছে। এই আধুনিকায়নের ফলে বিমানগুলোতে উন্নত রাডার সংযোজন, একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত, ভূখণ্ডের মানচিত্র তৈরি এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। তবে বহরের বাকি পুরোনো বিমানগুলোর পেছনে নতুন করে বিনিয়োগ করাকে উপযুক্ত মনে না করায়, সেগুলো আগামী ২০২৮ সাল থেকে ধীরে ধীরে অবসরে পাঠানো শুরু হবে। এক সময় ড্যারিন-৩ উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মাধ্যমে পুরোনো অ্যাডুর ইঞ্জিনের পরিবর্তে হানিওয়েল এফ-১২৫এন ইঞ্জিন বসানোর পরিকল্পনা করেছিল ভারতীয় বিমান বাহিনী। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সেই পরিকল্পনা পরে বাতিল করা হয়। নতুন কোনো যুদ্ধবিমান বহরে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করতে এবং আগামী দশকজুড়ে জাগুয়ারের সেবা নিশ্চিত করতেই ভারত এই বাতিল বিমানগুলো সংগ্রহের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের তীব্র অভিযোগের মুখে ফলাফল বাতিল করে অবশেষে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ভারতের অন্যতম কঠিন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। রবিবার (২১ জুন) দেশটির ২০ লক্ষাধিক হবু চিকিৎসককে পুনরায় এই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। মূল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে বিক্রি হওয়ার খবরটি সামনে আসার পর নজিরবিহীন এই সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। এবারের পুনঃপরীক্ষায় যেকোনো ধরণের জালিয়াতি রুখতে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে বিমানবন্দর-সদৃশ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কেন্দ্রে প্রবেশের মুখে শিক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি, মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে স্ক্যানিং এবং বায়োমেট্রিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এছাড়া কেন্দ্রের বাইরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিলেন। দীর্ঘ কয়েক মাসের চরম অনিশ্চয়তা এবং মানসিক ধকলের পর এই পুনঃপরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ভারতের মেডিকেল কলেজগুলোতে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান। ফলে কাঙ্ক্ষিত একটি আসনের জন্য অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ধরে নামী কোচিং সেন্টারে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে এবং দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নেন। এই কেলেঙ্কারির জেরে গত সপ্তাহে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ 'টেলিগ্রাম' সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সরকার। নতুন পরীক্ষার প্রশ্নও এই প্ল্যাটফর্মে বিক্রির চেষ্টার খবরের পর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ইন্টারনেট বাক-স্বাধীনতা কর্মীরা এর সমালোচনা করলেও শুক্রবার দেশটির আদালত সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে বৈধ বলে রায় দেয়। ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান একটি 'স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ' পুনঃপরীক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় একটি বড় ধরণের তদন্ত শুরু করেছে সরকার। ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বিতর্ক ও আস্থার সংকটের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে একটি নতুন ডিজিটাল স্কোরিং সিস্টেম চালুর পর মূল স্কুল-সমাপনী পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে বড় ধরণের ত্রুটির অভিযোগ ওঠে। সেই সময় খাতার অনুলিপি চেয়ে ৪ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। শিক্ষকেরা জানান, খাতা মূল্যায়নের সময় তারা নিজেরাও ওই নতুন সফটওয়্যারটি বুঝতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এদিকে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার এই ব্যর্থতা এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভের মাঝে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) নামের একটি নতুন ব্যঙ্গাত্মক গ্রুপ দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ইতিমধ্যে দলটির অনুসারী সংখ্যা ২২ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আন্দোলনকারীরা এই অব্যবস্থাপনার দায়ে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা ‘জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব’ বা বার্থরাইট সিটিজেনশিপের ঐতিহাসিক অধিকার রক্ষা নিয়ে দেশটিতে নতুন করে এক বড় ধরণের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর প্রথম লাইনেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা প্রাকৃতিক নিয়মে নাগরিকত্ব পাওয়া এবং মার্কিন বিচারব্যবস্থার অধীনস্থ সকল ব্যক্তিই দেশটির পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। এই নিয়মের অধীনে মা-বাবার পরিচয় বা বংশমর্যাদা যাই হোক না কেন, মার্কিন মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করে। তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশ এই ঐতিহাসিক অধিকারটিকে এক বড় ধরণের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রবিবার (২১ জুন) মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর সাংবিধানিক বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট এই নাগরিকত্ব ধারার সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, আমেরিকার মাটিতে জন্মালে যে কেউ নাগরিক হবেন—এই বিষয়ে সংবিধানে কোনো অস্পষ্টতা বা দ্বিমত নেই। এর কেবল দুটি অত্যন্ত সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে, যা হলো কোনো বিদেশি কূটনীতিকের সন্তান অথবা দেশ আক্রমণকারী কোনো বিদেশি সেনাবাহিনীর সন্তান। এই দুটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সবার ক্ষেত্রেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়মটি শতভাগ প্রযোজ্য। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে যে, আমেরিকার সাধারণ মানুষ এই বিষয়ে প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে, নথিপত্রহীন বা অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদেরও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত, পক্ষান্তরে বাকি ৪৯ শতাংশ নাগরিক এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। জনগণের এই মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝেই গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সেই আদেশে বলা হয়, ১৪তম সংশোধনীকে কখনই এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি যাতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকেই বিশ্বজনীনভাবে নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে। এই আদেশের মাধ্যমে মূলত দেশটিতে অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার পুরোপুরি অস্বীকার করার কথা বলা হয়। এই নিয়ম কার্যকর হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি শিশু সরাসরি নাগরিকত্বহীনতার সংকটে পড়বে। তবে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত নির্বাহী আদেশটি জারির পরপরই দেশটির একটি নিম্ন আদালত সেটির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা ব্লক আরোপ করে। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন রয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮৫৭ সালে প্রথমবার নাগরিকত্বের এই স্পর্শকাতর বিষয়ে রায় দিয়েছিল, যা ‘ড্রেড স্কট বনাম স্যান্ডফোর্ড’ মামলা নামে পরিচিত। আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্টের মতে, এটিকে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক এবং লজ্জাজনক রায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ সেই রায়ে আদালত বলেছিল যে, কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি—তিনি দাস হোন বা মুক্ত—কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারবেন না। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ট্যানি তাঁর রায়ে উগ্র মন্তব্য করে বলেছিলেন, এই নিয়ম পছন্দ না হলে সংবিধান সংশোধন করা হোক। আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর ১৮৬৮ সালে, যখন কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার ও সমতা নিশ্চিত করতে সংবিধানে বিখ্যাত ১৪তম সংশোধনী পাস করা হয়। পুনর্গঠন কংগ্রেসের মূল লক্ষ্যই ছিল ৪০ লাখের বেশি প্রাক্তন দাস ও সকল অভিবাসীর সন্তানদের মার্কিন নাগরিকত্ব দেওয়া। এর প্রায় ৩০ বছর পর ১৮৯৫ সালে ‘ওয়ং কিম আর্ক’ নামের এক মার্কিন বংশোদ্ভূত চীনা নাগরিকের মামলাকে কেন্দ্র করে এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারটি আরও বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সান ফ্রান্সিসকো শহরে জন্ম নেওয়া ওয়ংকে একবার চীন সফর শেষে পুনরায় আমেরিকায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি আদালতে নিজের নাগরিকত্বের অধিকারের পক্ষে লড়াই করেন এবং তীব্র বর্ণবাদের যুগেও সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পক্ষে রায় দেয়। তবে বর্তমান যুগেও এর কিছু ভিন্নমত রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজার্স স্মিথ মনে করেন, সংবিধানে এই ধারাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হওয়ায় অনেক বিষয় সেখানে সরাসরি বলা নেই। বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের বিষয়ে সংবিধান রচনার সময় স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত স্মিথের এই গবেষণাকেই তাদের আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে স্মিথ নিজে ট্রাম্পের এই কট্টর অভিবাসী বিরোধী কঠোর পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছেন এবং তাঁর গবেষণা বর্ণবাদী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের সিংহভাগ দেশ, বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যেই জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়ার এই নিয়ম থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে আয়ারল্যান্ড ছিল ইউরোপের সর্বশেষ দেশ, যারা তাদের দেশের ৭৯ শতাংশ জনগণের ভোটের ভিত্তিতে এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। অন্যদিকে, আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট মনে করেন যে, অভিবাসীদের এই দ্রুত নাগরিকত্ব ও অধিকার দেওয়ার কারণেই আমেরিকা আজ অনন্য। তিনি জানান, আমেরিকার ফরচুন ৫০০ কোম্পানির প্রায় অর্ধেকই পরিচালিত হচ্ছে অভিবাসী বা তাদের সন্তানদের দ্বারা। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সাথে দ্বিমত পোষণ করলেও ফ্রস্ট মনে করেন, এই বিতর্কের মাধ্যমে আমেরিকার আদি ও আসল মূল্যবোধ, যা রাজতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের জন্মগত সমতাকে ধারণ করে, তা নিয়ে পুনরায় নতুন করে ভাবার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর এই কারণে সাংবিধানিক গ্যারান্টির এই ধারাটি আমাদের জাতীয় মূল্যবোধের স্বার্থেই বজায় রাখা উচিত। সূত্র: সিবিএস নিউজ
আমেরিকার তরুণ প্রজন্মের মাঝে চাকরি পাওয়ার পরও স্বাধীনভাবে আলাদা থাকার চেয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বাসায় থাকার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রিয়েলটর ডটকম এর সাম্প্রতিক এক নতুন গবেষণামূলক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী মার্কিন তরুণদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই (প্রায় ৩০ শতাংশ) এখনো তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করছেন। রোববার (২১ জুন) ফক্স ফাইভ আটলান্টার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তরুণদের সিংহভাগই বেকার নন, বরং তাদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই (৭০ শতাংশ) বর্তমানে নিয়মিত চাকরি করছেন এবং ভালো বেতন পাচ্ছেন। রিয়েলটর ডটকম-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক হ্যানা জোনস জানান, অতীতে ধারণা করা হতো যে কেবল চাকরি না পাওয়া বা ক্যারিয়ার শুরু করতে না পারা তরুণরাই বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। কিন্তু নতুন এই পরিসংখ্যান সেই প্রচলিত ধারণা বা ন্যারেটিভকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেন, “২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের যারা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই কর্মজীবী। সামগ্রিকভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকার এই হার দিন দিন বাড়ছে, যার অর্থ এই বৃদ্ধির পেছনে বেকাররা নন, বরং চাকরিজীবী প্রাপ্তবয়স্করাই মূল ভূমিকা রাখছেন। বর্তমান যুগে একটি নিয়মিত পে-চেক বা বেতন পাওয়াটাই যে স্বাধীনভাবে বসবাসের একমাত্র চাবিকাঠি নয়, এই গবেষণা তারই প্রমাণ।” প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন (২০.৪%) তরুণ বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করেছেন, যা ২৫ বছর আগের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী অপেক্ষাকৃত বড় তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার গত ২৫ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০০ সালে যেখানে এই বয়সীদের মাত্র ৭.১% বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন, গত বছর তা এক লাফে বেড়ে ১২.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। চাকরি থাকার পরও তরুণদের নিজেদের আলাদা বাসা তৈরি করতে না পারার এই চিত্র মার্কিন অর্থনীতি ও আবাসন খাতের এক বড় সংকটকে নির্দেশ করছে। গবেষণায় তরুণদের নিজস্ব বাসা না কিনতে পারার পেছনে আমেরিকার বর্তমান আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ির গড় বা মিডিয়ান মূল্য ছিল ৪,৩০,০০০ মার্কিন ডলার, যা করোনা মহামারির আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় ৩৪.৪% বেশি। অন্যদিকে, বাড়ি ভাড়ার খরচও প্রাক-মহামারি যুগের চেয়ে প্রায় ১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি তরুণদের মাথার ওপর থাকা বিপুল ঋণের বোঝাও একটি বড় কারণ। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেশির ভাগ ঋণই স্টুডেন্ট লোন, গাড়ি কেনার লোন এবং ক্রেডিট কার্ডের বকেয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা তাদের সম্পদ তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। তবে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা মানেই যে তরুণরা সেখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা আরামে থাকছেন, তা কিন্তু নয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) এক জরিপে দেখা গেছে, ঘরে থাকা তরুণদের মধ্যে ৭২%-ই কোনো না কোনোভাবে সংসারের খরচ চালাতে অবদান রাখছেন। এর মধ্যে ৬৫% তরুণ বাজারের খরচ, ইউটিলিটি বিল বা অন্যান্য পারিবারিক খরচ মেটাতে টাকা দিচ্ছেন এবং প্রায় ৪৬% তরুণ বাবা-মায়ের ঘরের ভাড়া বা মর্টগেজের কিস্তি দিতে সরাসরি সাহায্য করছেন। তরুণদের এই দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান শুধু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতাই খর্ব করছে না, বরং তাদের মধ্যবিত্ত বাবা-মায়ের ওপরও বড় ধরণের আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। আবাসন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অনেক প্রবীণ দম্পতি সন্তানরা বড় হওয়ার পর তাদের বড় বাড়ি বিক্রি করে ছোট বাসায় চলে যাওয়ার (ডাউনসাইজিং) পরিকল্পনা করলেও সন্তানদের কারণে তা পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের বড় বাড়ির পেছনে উচ্চ মর্টগেজ, ট্যাক্স এবং অতিরিক্ত ইউটিলিটি বিলের বোঝা টেনে যেতে হচ্ছে। এর ফলে মার্কিন আবাসন বাজারে এখন দুই প্রজন্মের পরিবর্তে তিন প্রজন্মের একসঙ্গে থাকার উপযোগী বড় বাড়ির চাহিদাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে একটি প্রাথমিক ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনার ঋণের সুদের হার বা ‘মর্টগেজ রেট’ গত এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে দেশটির বন্ধকী অর্থায়ন জায়ান্ট ‘ফ্রেডি ম্যাক’। সোমবার (২২ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স ফাইভ আটলান্টার এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সাময়িক শান্ত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা কমে আসায় মর্টগেজের এই পতন ঘটেছে। ফ্রেডি ম্যাকের প্রাইমারি মর্টগেজ মার্কেট সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর মেয়াদী ফিক্সড বা স্থায়ী মর্টগেজের গড় হার গত সপ্তাহের 6.52% থেকে কমে এখন 6.47%-এ দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ঠিক এই সময়ে এই সুদের হার ছিল 6.81%। ফ্রেডি ম্যাকের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্যাম খাটার এক বিবৃতিতে বলেন, "সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য প্রমাণ করছে যে মার্কিন ক্রেতারা বাজারে ফিরছেন। খুচরা বিক্রি বৃদ্ধি এবং নতুন বাড়ি কেনার আগ্রহ বাড়ার কারণে বাজারে আবাসনের চাহিদা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হচ্ছে।" একই সময়ে ১৫ বছর মেয়াদী ফিক্সড মর্টগেজের গড় হারও সামান্য কমে 5.84% থেকে 5.81%-এ নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া তীব্র সামরিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারগুলো চরম অস্থিতিশীল ছিল, যার ফলে মর্টগেজ রেটও বেশ উঁচুতে অবস্থান করছিল। তবে গত ১৭ জুন ফ্রান্সের এক শীর্ষ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারকে (MoU) সই করেন, যেখানে ইরানি কর্মকর্তারাও দূর থেকে যুক্ত হয়ে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এই সাময়িক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী—অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর থেকে কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাদের আটকে থাকা বৈদেশিক সম্পদ অবমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। স্থায়ী চুক্তির জন্য দুই দেশকে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। রিয়েলটর ডটকম-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ অ্যান্থনি স্মিথ বলেন, "বিগত সপ্তাহগুলোতে আমরা দেখেছি যে শান্তি আলোচনার সামান্য অগ্রগতির পরেই আবার নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হচ্ছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক, কারণ স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই খসড়া চুক্তিতে সই করেছেন।" সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্টগেজ রেট সরাসরি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর সুদের হারের সাথে যুক্ত না থাকলেও, এটি ১০ বছর মেয়াদী মার্কিন ট্রেজারি নোটের মুনাফার (Yield) সাথে ওঠানামা করে, যা গত শুক্রবার বিকেলে 4.45%-এর কাছাকাছি ছিল। এদিকে, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত বুধবার এক নীতি নির্ধারণী বৈঠকে তাদের মূল সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ইরান সংকটের কারণে বাজারে এখনও মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি থাকায় ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ-এর নেতৃত্বে এই প্রথম কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার 3.5% থেকে 3.75% এর ঘরেই রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফেডের ওপেন মার্কেট কমিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জ্বালানি খাতসহ কিছু নির্দিষ্ট সেক্টরে সরবরাহ ঘাটতির কারণে মূল্যস্ফীতি এখনও তাদের নির্ধারিত 2% লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। অর্থনীতিবিদ স্মিথ ফেড চেয়ারম্যানের এই পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, নতুন চেয়ারম্যান ওয়ারশ দায়িত্ব নিয়েই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে সুদের হার সহজে কমানোর দিন আপাতত শেষ এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট কোনো ভবিষ্যৎ নির্দেশনা না দেওয়ায় বাজার কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আর এই কারণেই ইরান যুদ্ধবিরতির সুফলের পরেও মর্টগেজ রেট যতটা দ্রুত কমার কথা ছিল, ফেডের কঠোর অবস্থানের কারণে তা হয়তো কিছুটা ধীর গতিতে কমবে। তবে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই চুক্তি মার্কিন আবাসন খাতে বড় ধরণের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়েতে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ডেল্টা এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্সের দুটি যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক বিমানের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের উপক্রম হয়েছে। একদম শেষ মুহূর্তে চালকের বুদ্ধিমত্তায় এবং বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপে এক বড় ধরনের এভিয়েশন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন দুই বিমানের শত শত যাত্রী। শনিবার সকালের এই অত্যন্ত বিপজ্জনক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাটি মার্কিন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নজরে আসার পর তারা পুরো বিষয়টির ওপর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফ্লাইট লগ এবং ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, টেক্সাসের ডালাস থেকে ওড়ে আসা ডেল্টা এয়ারলাইন্সের একটি নির্দিষ্ট যাত্রীবাহী বিমান বস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার জন্য রানওয়ের একদম কাছাকাছি চলে এসেছিল। ঠিক একই সময়ে ডেল্টা বিমানের অবতরণস্থলের একটি ইন্টারসেক্টিং বা আড়াআড়ি রানওয়ে ব্যবহার করে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান উড্ডয়ন প্রক্রিয়া শুরু করছিল। দুই বিমানের গতিপথ ও সময় একই রেখায় চলে আসায় ডেল্টা বিমানের পাইলট অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অবতরণ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন। ডেল্টা এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বিমানটির ফ্লাইট নম্বর ২৩৫১ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এয়ারলাইন্সের অফিশিয়াল মুখপাত্র জানান, রানওয়েতে অন্য বিমানটি দেখতে পেয়ে তাদের ফ্লাইটের অভিজ্ঞ ক্রু সদস্যরা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন করেন। এরপর তারা অত্যন্ত সফলভাবে ‘গো-অ্যারাউন্ড’ বা জরুরি অবতরণ বাতিলের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে বিমানটিকে পুনরায় আকাশে উড়িয়ে নেন। ঘটনার সময় ওই ডেল্টা বিমানে ১২৯ জন সাধারণ যাত্রী এবং ৬ জন পেশাদার ক্রু সদস্য অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে বিমানটি অন্য একটি নিরাপদ রানওয়েতে অবতরণ করে এবং যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবে নেমে যান। ভয়াবহ এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি নিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইন্স এবং বস্টন লোগান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা হলে তারা এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। উভয় সংস্থাই মিডিয়া এবং জনসাধারণের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ও বিবৃতির জন্য বিষয়টিকে সরাসরি ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। মার্কিন বিমান চলাচল আইন ও নিয়ম অনুযায়ী, রানওয়েতে কোনো ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে বিমান দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে পাইলট বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের নির্দেশে ‘গো-অ্যারাউন্ড’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা একটি নিয়মিত কার্যক্রম। বস্টন বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া এই মুখোমুখি সংঘর্ষের পরিস্থিতিটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক একাধিক বিমান দুর্ঘটনা ঘটার কারণে এভিয়েশন খাতের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত শনিবারই ফ্রান্সে একটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় এক সুপরিচিত গেমিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নিহত হয়েছেন। এর ঠিক দুদিন আগে টেক্সাসের ল্যারেডোতে একটি ব্যক্তিগত বিজনেস জেট বিমান বিধ্বস্ত হয়ে একজন আরোহী প্রাণ হারান। ফলে একের পর এক এসব দুর্ঘটনার মাঝে এই ঘটনাটি মার্কিন বিমান প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছে। এছাড়াও গত সোমবার ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেসে একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী বি-৫২ বোমারু বিমান আকস্মিকভাবে বিধ্বস্ত হয় এবং বিমানে থাকা ৮ জন ক্রু সদস্যের সকলেই ঘটনাস্থলে নিহত হন। তারও আগে গত রবিবার মিসৌরিতে স্কাইডাইভিংয়ের একটি বিনোদনমূলক ছোট বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। বিশ্বজুড়ে পরপর ঘটে যাওয়া এই সমস্ত প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনার আবহে বস্টনের মাটিতে ডেল্টা ও আমেরিকান এয়ারলাইন্সের এই কাছাকাছি চলে আসার ঘটনাটিকে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগোর একটি বিশিষ্ট মসজিদে ভয়াবহ এক গণগুলিবর্ষণের ঘটনার ঠিক এক মাস পূর্তির দিনে আবারও হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে সেখানে নিয়োজিত একজন অত্যন্ত সতর্ক নিরাপত্তা প্রহরীর বুদ্ধিমত্তা এবং দূরদর্শিতার কারণে এবার এক বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। গত মে মাসে কেইনি ক্লার্ক এবং ক্যালেব ভাজকুয়েজ নামের দুই কিশোর উগ্রবাদীর ভয়াবহ বন্দুক হামলায় ওই উপাসনালয়ে তিনজন মুসল্লি নিহত হয়েছিলেন। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে মসজিদটিতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি রাখা হয়েছে। সোমবার (২২ জুন) মার্কিন গণমাধ্যমের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো নামের ওই মসজিদে গত বৃহস্পতিবার এই উদ্বেগজনক ঘটনাটি ঘটে। মসজিদের ইমাম তাহা হাসান জানান, তাদের একজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রহরী লক্ষ্য করেন যে একটি সন্দেহভাজন গাড়ি মসজিদের চারপাশ দিয়ে বারবার চক্কর দিচ্ছে। বিষয়টি দেখে তার মনে সন্দেহ জাগলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে তথ্যটি দেওয়ার সাথে সাথেই মসজিদের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অ্যাকশনে যান এবং আশেপাশের অন্যান্য পুলিশ ইউনিটকে ওই নির্দিষ্ট গাড়ির বিবরণ ও নম্বর জানিয়ে দেন। সান ডিয়েগো পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, মসজিদ থেকে কিছুটা দূরেই পুলিশ কর্মকর্তারা সন্দেহভাজন ওই গাড়িটিকে আটক করতে সক্ষম হন এবং গাড়ির চালককে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেন। আটককৃত চালকের গাড়িটির ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ সদস্যরা একটি নাৎসি উগ্রবাদী আদর্শের পতাকা এবং অত্যন্ত রহস্যময় একটি ক্যানিস্টার বা সিলিন্ডার পাত্র উদ্ধার করেন। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের বিশেষ বোমা ও অগ্নিসংযোগ বিষয়ক তদন্তকারী দল ‘মেট্রো আর্সন স্ট্রাইক টিম’-কে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। ক্যানিস্টারটি পরীক্ষার সময় নিরাপত্তার খাতিরে আশেপাশের সমস্ত বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে খালি করে দেওয়া হয়েছিল। মসজিদের ইমাম তাহা হাসান এই ঘটনার পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "ঠিক এক মাস আগের হামলার বার্ষিকীর দিনে এই ঘটনাটি ঘটায় আমাদের পুরো মুসলিম কমিউনিটি এবং আশেপাশের সব মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তবে আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ যে সেই সময় পুলিশ কর্মকর্তারা মসজিদের ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন এবং তারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সাড়া দিয়েছেন।" গত মে মাসের ১৮ তারিখে ঘটে যাওয়া ওই প্রথম হামলায় মসজিদের বীর নিরাপত্তা প্রহরী এবং আট সন্তানের জনক আমিন আবদুল্লাহ নিজের জীবন দিয়ে অনেক মুসল্লির প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। ওই হামলায় নাদের আওয়াদ এবং মনসুর কাজিহা নামের আরও দুই মুসল্লি নিহত হন। পূর্বের ওই হামলায় দুই বন্দুকধারী কিশোর নিজেরা একটি উগ্রবাদী ইশতেহার লিখেছিল এবং হামলার ঘটনাটি অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভস্ট্রিম করেছিল। সেই লাইভ ভিডিওতে হামলাকারী ক্লার্কের গায়ে নাৎসি প্রতীক দেখা গিয়েছিল এবং শেষ মুহূর্তে সে তার সহযোগী ভাজকুয়েজকে গুলি করার পর নিজে আত্মহত্যা করে। পুলিশ পরবর্তীতে তাদের গাড়ি থেকে ইসলামভীতি বা মুসলিম বিদ্বেষী বিভিন্ন ধরণের লেখা উদ্ধার করেছিল। পূর্বের সেই ভয়াবহ স্মৃতি কাটিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এই মুসলিম সমাজ যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই এই নাৎসি পতাকাসহ নতুন করে গাড়ি আটকের ঘটনাটি পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সান ডিয়েগো পুলিশ বিভাগ এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে বর্তমানে ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোর ওপর আর কোনো সরাসরি বা সক্রিয় হুমকি নেই এবং পুরো ঘটনার তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। এদিকে মসজিদের পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, তারা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরাপত্তার স্বার্থে একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার সাথে কাজ শুরু করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার এই মসজিদে আসা সমস্ত দর্শনার্থীদের জন্য এখন থেকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে শরীর তল্লাশি করা এবং মসজিদে প্রবেশের পূর্বে সমস্ত ব্যাগ বা বড় ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখার মতো কঠোর নিয়মাবলী কার্যকর করার বিষয়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রান-অফে ডানপন্থী আইনজীবী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বলে প্রাথমিক ভোট গণনায় জানা গেছে। রোববার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি ৪৯.৭ শতাংশ ভোট পান, অন্যদিকে বামপন্থী সিনেটর ইভান সেপেদা পান ৪৮.৭০ শতাংশ ভোট। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের ৯৯.৯ শতাংশ ফলাফলের ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, এই জয়কে কলম্বিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে ডানপন্থী শক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণায় আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর নীতির সমালোচনা করেন এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনেন। তিনি প্রচারণায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা বন্ধ করার ঘোষণা দেন এবং তেল ও গ্যাস খাত সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দেন। বিজয় উদ্যাপন অনুষ্ঠানে আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, “আমি সব কলম্বিয়ানদের জন্য শাসন করব।” তিনি দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর বারানকিয়ায় সমর্থকদের সামনে এই বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে অভিনন্দনমূলক ফোন পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। জানা গেছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির নাগরিক এবং বিভিন্ন দেশে তার সম্পত্তি রয়েছে। অন্যদিকে পরাজিত প্রার্থী ইভান সেপেদা জানিয়েছেন, তিনি প্রাথমিক ফলাফলের পূর্ণ ও বিস্তারিত পুনর্গণনার অপেক্ষায় আছেন। তিনি প্রায় ৩৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর কথাও উল্লেখ করেন। সেপেদা বলেন, “আমরা আলোচনার জন্য উন্মুক্ত, আমরা সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত, যদি তা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং অর্জিত সামাজিক অগ্রগতিকে ধরে রাখে।” নির্বাচন ঘিরে কলম্বিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। কিছু অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও মাদক পাচারের কারণে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী, প্রাক্তন ডানপন্থী প্যারামিলিটারি গোষ্ঠী থেকে গঠিত অপরাধচক্র এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যে সংঘাত চলমান রয়েছে। প্রচারণার সময় আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা ঘোষণা দেন, তিনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তি আলোচনা বাতিল করবেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বিমান হামলা চালিয়ে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবেন। ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে চলা দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে ২০১৬ সালে ফার্ক (FARC) বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি চুক্তির পর কিছু অঞ্চলে উন্নয়ন দেখা গেলেও মাদকচক্র ও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা এখনো রয়ে গেছে। ইভান সেপেদার সমর্থকরা ফলাফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। এক সমর্থক মার্গারিটা রেস্ত্রেপো বলেন, “আবারও ক্ষোভ জয়ী হয়েছে। ভিন্নমত গ্রহণের প্রবণতা এখনও রয়ে গেছে।” এই নির্বাচনকে লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক ডানপন্থী রাজনৈতিক উত্থানের ধারার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে চিলি, আর্জেন্টিনা, কোস্টারিকা, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরেও সাম্প্রতিক নির্বাচনে ডানপন্থী নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেছে।
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
শাহারিয়া নয়ন
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
মৃদুল রহমান
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে টানা অস্থিরতার মধ্যে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। সোমবার (২২ জুন) লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দলীয় আইনপ্রণেতাদের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। সাধারণ নির্বাচনে জনগণ তাদের এলাকার প্রতিনিধিকে ভোট দিয়ে হাউস অব কমন্সে পাঠান। যে দল সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, সেই দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে দলের ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলে, সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী বদলানো সম্ভব। এই ব্যবস্থার কারণেই গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে নজিরবিহীনভাবে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন ঘটেছে। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে এখন পর্যন্ত সাতজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে একজন নেতা ডাউনিং স্ট্রিটে অবস্থান করতেন—উইনস্টন চার্চিল, মার্গারেট থ্যাচার বা টনি ব্লেয়ারের মতো নেতারা বছরের পর বছর ক্ষমতায় ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অস্থিরতার সূচনা ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট থেকেই। ওই গণভোটে অল্প ব্যবধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় আসে, যা দেশের রাজনীতিতে গভীর বিভাজন তৈরি করে। গণভোটের ফল প্রকাশের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। এরপর দায়িত্ব নেন থেরেসা মে, কিন্তু দলীয় বিভক্তির কারণে তিনি ব্রেক্সিট কার্যকর করতে গিয়ে চাপে পড়ে ২০১৯ সালে সরে দাঁড়ান। তার উত্তরসূরি বরিস জনসন ‘ব্রেক্সিট সম্পন্ন’ করার অঙ্গীকারে ক্ষমতায় এলেও, কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিধিনিষেধ ভঙ্গসহ একাধিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারির জেরে শেষ পর্যন্ত তাকেও পদত্যাগ করতে হয়। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সময়কাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ব্যর্থতায় মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় তাকে সরে যেতে হয়। এরপর দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে না পারায় ২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভদের পরাজয় ঘটে। ওই নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি এবং কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যেই তার সরকার নানা সংকটে পড়ে। নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং জনসমর্থন হ্রাস—সব মিলিয়ে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির হতাশাজনক ফল দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা পদত্যাগ করেন এবং স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। শেষ পর্যন্ত দলীয় চাপে নতি স্বীকার করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। বক্তব্যে স্টারমার বলেন, “আগামী নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি সঠিক ব্যক্তি কি না—সে প্রশ্ন উঠেছে। আমি সেই প্রশ্নের উত্তর মেনে নিচ্ছি।” তিনি জানান, নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এদিকে তার পদত্যাগের পর লেবার পার্টির নতুন নেতা কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নাম সামনে আসছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, আগামী জুলাইয়ের শুরুতে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত দুই-দলীয় রাজনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে আসছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দল, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। জনমত বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৬ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন এখন যুক্তরাজ্যের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। দলের অভ্যন্তরীণ চাপ, জনসমর্থনের ক্রমাগত পতন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তার এই সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্টারমারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতৃত্বেও নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনোমিস্ট–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্টারমারের পদত্যাগ একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার সরকারের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী হতে থাকে। নির্বাচনের সময় এড়িয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট সামনে এলে বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সরকার কর বৃদ্ধি এবং ব্যয় সংকোচনের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে স্টারমার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। জেফরি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিতর্কিত পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে, যেখানে লেবার পার্টি বড় ধরনের ভরাডুবির মুখে পড়ে। এর পরপরই সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংসহ প্রায় ১০০ জন এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন। স্টারমারের সরে দাঁড়ানোর পর লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বিভিন্ন পূর্বাভাসভিত্তিক বাজারের তথ্য বলছে, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম এখন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৫ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। ‘কিং অব দ্য নর্থ’ খ্যাত বার্নহাম সম্প্রতি নিজের রাজনৈতিক শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছেন। গত ১৮ জুন মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে তিনি ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। এর আগে স্থানীয় নির্বাচনে এই আসনে ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ এগিয়ে থাকলেও উপনির্বাচনে বার্নহামের এই জয় তাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে তিনি পার্লামেন্টে প্রবেশের মাধ্যমে দলের নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেন। নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতায় বার্নহামের পাশাপাশি ওয়েস স্ট্রিটিং ও সাবেক সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নসের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তাদের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। নিয়ম অনুযায়ী, লেবার পার্টির ৪০৩ জন এমপির মধ্যে অন্তত ৮১ জনের সমর্থন পেলে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন পাবেন। এরপর দলের সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যদের ভোটে চূড়ান্ত নেতা নির্ধারিত হবে। তবে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এগিয়ে থাকলেও বার্নহামের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ইউগভের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মে থেকে জুনের মধ্যে তার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহার হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে দ্রুত জনআস্থা পুনরুদ্ধারের কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে। একদিকে স্থবির অর্থনীতিকে গতিশীল করা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্ক—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা—এই দুই ক্ষেত্রেই তাকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। নতুন নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি কোন পথে এগোয়, এখন সেই দিকেই নজর সবার।
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের কারাবন্দি সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ তার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চান। দীর্ঘদিন ধরে বন্দি অবস্থায় থাকায় তিনি নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না—এই কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছে তার দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি)। রোববার (২১ জুন) দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, রশিদ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কারাগারে থাকার কারণে এলাকার মানুষের সমস্যা-অভিযোগ সংসদে তুলে ধরতে পারছেন না এবং তাদের জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ফলে জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি সরে দাঁড়াতে চান। এআইপি জানিয়েছে, রশিদের এই অনুরোধ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা জরুরি বৈঠকে বসছেন, যা টানা দুই দিন চলবে। বৈঠক শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ৫৮ বছর বয়সী শেখ আবদুল রশিদ, যিনি ‘ইঞ্জিনিয়ার রশিদ’ নামেই বেশি পরিচিত, কাশ্মীরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা নেওয়ার পর তিনি প্রায় এক দশক জম্মু-কাশ্মীর প্রজেক্টস কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনে কাজ করেন। কৈশোর থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রশিদ তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন আবদুল গণি লোনের নেতৃত্বাধীন পিপলস কনফারেন্সে যোগ দিয়ে। ২০০৫ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলায় তাকে আটক করা হয়। বর্তমানেও তিনি কারাবন্দি অবস্থায় রয়েছেন, যা তার রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। এখন দলের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন রশিদের সমর্থক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত করেন এবং আলোচনাকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক বলে উল্লেখ করেন। শাহবাজ শরিফ জানান, আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ নির্ধারণের বিষয়ে সম্মতি। তিনি আরও জানান, পুরো প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংলাপ প্রক্রিয়ায় এই বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আলোচনার পরিবেশকে তিনি শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে পাকিস্তান সবসময় তার সক্রিয় ও আন্তরিক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। উল্লেখ্য, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র–এর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের উদ্দেশ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সুইজারল্যান্ড–এ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।