হলিউড অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসন স্বীকার করেছেন, নিখুঁত ‘কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য’ বলে বাস্তবে কিছু নেই। বিশ্বজুড়ে খ্যাতি, ব্যস্ত ক্যারিয়ার এবং কোটি ডলারের আয় থাকা সত্ত্বেও জীবনের কোনো না কোনো অংশে সবসময়ই ঘাটতি থেকে যায় বলে মনে করেন তিনি। মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠান “সিবিএস সানডে মর্নিং”-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। স্কারলেট বলেন, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে পুরোপুরি ভারসাম্য রাখা সম্ভব নয়—এ বিষয়টি মেনে নেওয়াই আসলে প্রথম ধাপ। তার ভাষায়, “সব সময় জীবনের কোনো না কোনো জায়গায় একটা ঘাটতি থেকেই যায়। সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁতভাবে করা সম্ভব না। তাই নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া শিখেছি।” মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজেকেই সবকিছু ঠিকভাবে সামলানোর চাপ দিয়েছেন। তবে সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমানে স্কারলেট জোহানসন একদিকে যেমন অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত, অন্যদিকে পরিবার ও ব্যবসাও সামলাচ্ছেন। কৌতুক অভিনেতা কলিন জোস্টের সঙ্গে তার সংসার এবং দুই সন্তান রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি নিজের ত্বক পরিচর্যা ব্র্যান্ডও চালু করেছেন তিনি। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্কারলেট জোহানসনের আয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। একই সঙ্গে চলতি বছরের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেত্রী হিসেবেও তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সাফল্য নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে বলে জানান এই অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একবার একজন তাকে বলেছিলেন, “আপনি যদি একজন অভিভাবক হিসেবে ৭৫ শতাংশ সময়ও ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটাই অনেক বড় অর্জন।” স্কারলেটের মতে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা এবং মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে কর্মজীবন ও পরিবার একসঙ্গে সামলানো মানুষদের মধ্যে।
ফোর্বসের জরিপে আয়ের দিক থেকে ফুটবল জগতের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন পর্তুগালের তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা টানা চতুর্থ এবং সব মিলিয়ে ষষ্ঠবারের মতো ফোর্বসের সর্বোচ্চ আয়কারী অ্যাথলেট নির্বাচিত হয়েছেন। গত ১২ মাসে কর এবং এজেন্ট ফি বাদে রোনালদোর আনুমানিক আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ডলারে। এর মধ্যে সৌদির ক্লাব আল নাসরের খেলার চুক্তি থেকে তিনি পেয়েছেন ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাকি ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার এসেছে বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাত থেকে। ফোর্বসের আয়ের তালিকায় ষষ্ঠবার শীর্ষে উঠে রোনালদো এখন বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডানের পাশে স্থান করে নিয়েছেন। এই তালিকায় রেকর্ড ১১ বার শীর্ষে থেকে তার ওপরে আছেন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের গলফ কিংবদন্তি টাইগার উডস। ৩০ কোটি ডলার আয়ের মাধ্যমে রোনালদো মুষ্টিযোদ্ধা ফ্লয়েড মেওয়েদার জুনিয়রের ২০১৫ সালের আয়ের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেছেন। ১৯৯০ সালে ফোর্বস অ্যাথলেটদের আয়ের তালিকা প্রকাশ শুরুর পর এটি এক বছরে যৌথভাবে সর্বোচ্চ আয়ের অনন্য রেকর্ড।
এভিয়েশন বা বিমান চলাচলের ইতিহাসে ‘প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ’ বা সংক্ষেপে ‘প্যান অ্যাম’ একটি রূপকথার নাম। ১৯২৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই মার্কিন বিমান সংস্থাই বিশ্ববাসীকে প্রথম দূরপাল্লার বিমান ভ্রমণের স্বাদ দিয়েছিল। তবে ভুল ব্যবসায়িক কৌশল আর বৈশ্বিক সংকটের কারণে ১৯৯১ সালে বন্ধ হয়ে যায় এই কিংবদন্তি ব্র্যান্ড। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর, সেই গৌরবময় সোনালী অতীতকে ফিরিয়ে আনতে একবিংশ শতাব্দীতে এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্যোক্তা ক্রেইগ কার্টারের নেতৃত্বাধীন একদল বিনিয়োগকারী প্যান অ্যামের সমস্ত স্বত্ব ও লাইসেন্স কিনে নেন। তাঁদের লক্ষ্য—প্যান অ্যামকে কেবল একটি বিমান সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি প্রিমিয়াম লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা। নস্টালজিয়ার জাদুতে সফল ‘এয়ার ক্রুজ’ দীর্ঘ ৩০ বছর বন্ধ থাকলেও বিমানপ্রেমীদের মনে প্যান অ্যামের আবেদন যে ফুরিয়ে যায়নি, তার প্রমাণ মেলে গত বছরের (২০২৫) জুন মাসে। সে সময় প্যান অ্যামের লোগো ও নীল-সাদা রঙে সজ্জিত একটি বিশেষ বিমান ১২ দিনের এক ঐতিহাসিক ‘এয়ার ক্রুজ’ বা বিমান সফরের আয়োজন করে। আইসল্যান্ড এয়ার থেকে লিজ নেওয়া বোয়িং ৭৫৭-২০০ বিমানটিতে মাত্র ৫০টি বিলাসবহুল আসন ছিল। নিউইয়র্ক থেকে রওনা হয়ে বারমুডা, লিসবন, মার্সেই, লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডের শ্যাননের মতো পুরোনো রুটে যাতায়াত করা এই সফরের টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। চড়া দাম সত্ত্বেও মাত্র তিন দিনের মধ্যে সফরের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এই সাফল্যই বিনিয়োগকারীদের বাণিজ্যিকভাবে আবারও আকাশে ফেরার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ফেরা ও নতুন পরিকল্পনা প্যান অ্যামের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং এভিয়েশন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এড ওয়েগেল জানান, প্যান অ্যামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা হিসেবে আকাশে ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। তবে এবার বোয়িং নয়, প্যান অ্যামের নতুন চালিকাশক্তি হবে ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের ‘এয়ারবাস এ২২০’ এবং ‘এ৩২০’ মডেলের বিমান। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমেরিকার মিয়ামি শহরকে প্রধান কেন্দ্র (বেস) করে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বাজারগুলোকে লক্ষ্য করে চার্টার্ড এবং নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। এই বিমানগুলোতে ইকোনমি থেকে শুরু করে প্রিমিয়ার তিন শ্রেণির আসন বিন্যাস থাকবে। তবে বিমান সংকটের কারণে প্রথম ফ্লাইটের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। ভবিষ্যতের প্যান অ্যাম হোটেল ও রেস্তোরাঁ: বিমান সংস্থার পাশাপাশি জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতেও প্যান অ্যামের নাম যুক্ত হচ্ছে। আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার কমার্স শহরে চালু হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ‘প্যান অ্যাম হোটেল’। বিখ্যাত হোটেল চেইন হিলটনের ব্যবস্থাপনায় এই হোটেলে থাকবে আশির দশকের বিমান ভ্রমণের নস্টালজিক আবহ। এছাড়া ২০২৬ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কের একটি বিমানবন্দরে চালু হবে প্রথম ‘প্যান অ্যাম রেস্তোরাঁ’। ২০২৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের প্যান অ্যাম লাউঞ্জ এবং ঘড়ি ও লেগো সেটের মতো বিভিন্ন লাইসেন্সড পণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা প্যান অ্যামের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা দারুণ এক রোমাঞ্চকর উদ্যোগ বললেও এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিমান শিল্প বিশ্লেষক অ্যাডিসন শোনল্যান্ডের মতে, বর্তমানের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে নতুন একটি প্রিমিয়াম বিমান সংস্থার টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে চলমান জ্বালানি সংকট যখন প্রতিষ্ঠিত বিমান সংস্থাগুলোকেই ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য করছে, তখন প্যান অ্যামের মতো ব্যয়বহুল ব্র্যান্ডের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ কতটা মসৃণ হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
নব্বইয়ের দশকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মাত্র কয়েকটি টেবিল নিয়ে যে বাংলা বইমেলার সূচনা হয়েছিল, তা আজ প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৫ বছরের এই দীর্ঘ পথচলা কেবল বই বিক্রির ইতিহাস নয়, বরং প্রবাসের মাটিতে বাঙালির ভাষা ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক অনন্য সংগ্রাম। চলুন জেনে নিই এই ঐতিহাসিক যাত্রার পেছনের অজানা গল্প। প্রবাসের মাটিতে বাঙালির অস্তিত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতির এক গভীর ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা। সুদীর্ঘ ৩৫ বছরের এই পথচলা নিছক কোনো বার্ষিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভিন্ন এক বাস্তবতায় যেখানে ভাষা ও পরিচয়ের সংকট প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, সেখানে এই মেলা প্রবাসীদের আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের এক সৃজনশীল প্রয়াস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আয়োজনের পরতে পরতে মিশে আছে বহু মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমের এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। সময়ের পরিক্রমায় এই মেলা কেবল বই বিক্রির স্থান থেকে রূপ নিয়েছে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের অনন্য এক কেন্দ্রে। এখানে যেমন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সঙ্গে পাঠকের এক নিবিড় সংযোগও তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য এটি একধরনের ‘সাংস্কৃতিক ঘর’ তৈরি করেছে। এর সুবাদে মেলাটি এখন প্রবাসী বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও সৃজনশীল ধারাবাহিকতার এক অনন্য দলিল হিসেবে কাজ করছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সেসময় নিউইয়র্কে ‘মুক্তধারা’র কার্যক্রমকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আয়োজকদের মতে, প্রকৃত অর্থে বইমেলার জন্ম হয় ১৯৯২ সালে। সাত তরুণের অদম্য উদ্যম নিয়ে সে বছর বইমেলার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। এই উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন বিশ্বজিত সাহা, হারুন আলী, আবদুর রহিম বাদশা, ছাখাওয়াত আলী, সজল পাল, শামীম হোসেন এবং দিলদার হোসেন দিলু। ১৯৯২ সালে ব্রুকলিনের একটি পাবলিক স্কুল এবং কুইন্সের একটি ছোট্ট চার্চে টেবিলের ওপর বই সাজিয়ে প্রথম মেলার আয়োজন করা হয়। প্রবাসজীবনের নানা সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলা ভাষাকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক স্বদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাই ছিল এর মূল চালিকাশক্তি। প্রথম দিকের সেই ক্ষুদ্র আয়োজন ধীরে ধীরে নিউইয়র্কের বাঙালি সমাজে এক বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ নেয়। শুরুর দিকে তারিক মাহবুবের একটি প্রতিষ্ঠান এবং বিএটিএস মেলায় স্টল দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। পরবর্তীকালে বইমেলাটি মূলত কুইন্সকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং অ্যাস্টোরিয়া, উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসের মতো এলাকায় গত তিন দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ২০২৩ সাল থেকে মেলাটির স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার (জেপিএসি)। সবুজে ঘেরা পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক এই পরিবেশ অনেকের কাছেই ঢাকার বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের আবহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের প্রেক্ষাপটটি প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। সেসময় প্রবাসে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন বা ভাষা-সাংস্কৃতিক চেতনা প্রকাশের মতো কোনো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম ছিল না। সেই শূন্যতা থেকেই আয়োজকরা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে একটি অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। সেটি কেবল একটি প্রতীকী নির্মাণ ছিল না, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে দৃশ্যমান করে তোলার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। ওই বছরই ‘মুক্তধারা নিউইয়র্ক’ এবং ‘বাঙালি চেতনা মঞ্চ’ যৌথভাবে বইমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা করে। প্রথমদিকে এই উদ্যোগ ছিল নিখাদ আবেগ ও ভাষা-ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। কিন্তু আয়োজকরা দ্রুতই উপলব্ধি করেন, কেবল আবেগ দিয়ে এমন বৃহৎ উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। এটিকে টেকসই করতে প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সেই লক্ষ্যেই বইমেলাকে একটি নিয়মিত আয়োজনে পরিণত করার পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় সাহিত্য আলোচনা, সেমিনার ও কবিতা পাঠের মতো বহুমাত্রিক কার্যক্রম। ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশকরা সরাসরি অংশগ্রহণ শুরু করলে এই মেলা বৈশ্বিক রূপ পেতে শুরু করে। ২০০৬ সালে ‘মুক্তধারা নিউইয়র্ক’ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন’-এ রূপ নেয়। এই রূপান্তর প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। উদ্যোক্তারা কেবল মেলার আয়োজন করেই থেমে থাকেননি। প্রবাসে বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে বাংলা বই পৌঁছে দেওয়ার অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের মধ্যে প্রায় ২৬টি লাইব্রেরিতে বাংলা বই সরবরাহ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে বইমেলায় একটি নতুন সাংগঠনিক ধারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। রোটেশনাল নেতৃত্ব, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রবীণ-নবীনের সেতুবন্ধনের মাধ্যমে এটিকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। হাসান ফেরদৌস, ড. নূরুন নবী, রোকেয়া হায়দারসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে এর নেতৃত্বের ভার সামলেছেন। মেলার উদ্বোধকদের তালিকাতেও রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রায় পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছেন শহীদ কাদরী, হুমায়ূন আহমেদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বাংলা সাহিত্যের দিকপালরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সেলিনা হোসেন, পবিত্র সরকার, ফরিদুর রেজা সাগর, মুহম্মদ নূরুল হুদা, শাহাদুজ্জামান এবং ২০২৬ সালে ইমদাদুল হক মিলনের মতো বিশিষ্টদের অংশগ্রহণ এই মেলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারির সময়ও এই মেলার পথচলা থেমে থাকেনি। পৃথিবীর সবকিছু স্থবির হয়ে পড়লেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সেবার ১০ দিনব্যাপী এক ভার্চ্যুয়াল বইমেলার আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালে ৩২তম আসরের মাধ্যমে মেলাটি আবারও সশরীরে আয়োজনের ধারায় ফেরে। ২০২৪ সালের ৩৩তম মেলাটি ‘যত বই, তত প্রাণ’ স্লোগানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করে। সেবার প্রায় ৪০টি প্রকাশনা সংস্থা ও শতাধিক লেখক এতে অংশ নেন। ২০২৫ সালের ৩৪তম আসরটি ছিল আরও বহুমাত্রিক। ইতিহাস, সাহিত্য ও চিত্রকলার সমন্বয়ে মেলাটি সেবার একটি পূর্ণাঙ্গ উৎসবে পরিণত হয়। ২৫টির বেশি প্রকাশনা সংস্থা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি অতিথির সমাগম ঘটে এই আসরে। সাদাত হোসাইনের উদ্বোধনে ওই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন ফিলিস টেইলর। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে রেহমান সোবহান, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, রওনক জাহান ও সিতারা বেগমের মতো বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বইমেলা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ভাষা ও একুশের চেতনা, যা নতুন প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এটি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য-বাজার। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এটি বাংলা সাহিত্যের এক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। তৃতীয়ত, এটি প্রবাসীদের জন্য একটি উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর বা পাবলিক স্পেস। এখানে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য ও সমকালীন পরিচয়ের নানা জটিল প্রশ্ন নিয়ে প্রতিনিয়ত মুক্ত আলোচনা হয়। বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই বইমেলা প্রমাণ করেছে যে, এটি কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়। এটি একটি ভাষার টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ঐতিহ্যের ধারাবাহিক হস্তান্তর। ১৯৯২ সালের সেই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ আন্তর্জাতিক বাংলা সংস্কৃতির এক সুপ্রতিষ্ঠিত মঞ্চ। ২০২৬ সালের আসন্ন ৩৫তম আসর এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার আরও একটি পরিণত ও শক্তিশালী ধাপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলেই প্রত্যাশা প্রবাসী বাঙালিদের।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নীতির আওতায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অধিকাংশ অভিবাসীকে গ্রিন কার্ডের আবেদন সম্পন্ন করতে নিজ দেশে ফিরে যেতে হতে পারে। এতে দেশটিতে বৈধভাবে থাকা হাজারো শিক্ষার্থী, কর্মী, পর্যটক এবং ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (ইউএসসিআইএস) নতুন একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হবে। এতদিন অনেক অভিবাসী “অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারতেন। নতুন নীতির ফলে অধিকাংশ আবেদনকারীকে নিজ দেশে ফিরে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে অভিবাসী ভিসার আবেদন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ছাত্র ভিসাধারী, অস্থায়ী কর্মী এবং মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করা অভিবাসীদের ওপর। কারণ আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য দেশ ছাড়ার পর অনেকেরই পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ জটিল হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে কড়াকড়ি রয়েছে। এছাড়া যেসব ব্যক্তি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে অবস্থান করেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লে অনেক ক্ষেত্রে ১০ বছরের পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন। সাবেক ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা মাইকেল ভালভার্দে বলেছেন, এই নীতি প্রতি বছর লাখো পরিবার ও নিয়োগদাতার পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তার মতে, “যারা নিয়ম মেনে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন, তাদের জন্যও এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।” বাইডেন প্রশাসনের সময় ইউএসসিআইএসে কর্মরত সাবেক কর্মকর্তা ডগ র্যান্ড বলেন, প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই “অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস” প্রক্রিয়ায় গ্রিন কার্ড পান। নতুন পরিবর্তনের ফলে এসব আবেদনকারীর বিশাল অংশ সমস্যায় পড়তে পারেন। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আইনের মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে এবং বিভিন্ন “ফাঁকফোকর” ব্যবহারের সুযোগ কমে আসবে। ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে বলেন, “অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কেউ যদি গ্রিন কার্ড চান, তবে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া তাকে নিজ দেশে ফিরে আবেদন করতে হবে।” তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে প্রশাসন। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসাধারী, শরণার্থী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৈধ অভিবাসন আরও সীমিত করার বৃহত্তর নীতির অংশ। নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নব্বইয়ের দশকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মাত্র কয়েকটি টেবিল নিয়ে যে বাংলা বইমেলার সূচনা হয়েছিল, তা আজ প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৫ বছরের এই দীর্ঘ পথচলা কেবল বই বিক্রির ইতিহাস নয়, বরং প্রবাসের মাটিতে বাঙালির ভাষা ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক অনন্য সংগ্রাম। চলুন জেনে নিই এই ঐতিহাসিক যাত্রার পেছনের অজানা গল্প। প্রবাসের মাটিতে বাঙালির অস্তিত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতির এক গভীর ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা। সুদীর্ঘ ৩৫ বছরের এই পথচলা নিছক কোনো বার্ষিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভিন্ন এক বাস্তবতায় যেখানে ভাষা ও পরিচয়ের সংকট প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, সেখানে এই মেলা প্রবাসীদের আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের এক সৃজনশীল প্রয়াস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আয়োজনের পরতে পরতে মিশে আছে বহু মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমের এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। সময়ের পরিক্রমায় এই মেলা কেবল বই বিক্রির স্থান থেকে রূপ নিয়েছে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের অনন্য এক কেন্দ্রে। এখানে যেমন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সঙ্গে পাঠকের এক নিবিড় সংযোগও তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য এটি একধরনের ‘সাংস্কৃতিক ঘর’ তৈরি করেছে। এর সুবাদে মেলাটি এখন প্রবাসী বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও সৃজনশীল ধারাবাহিকতার এক অনন্য দলিল হিসেবে কাজ করছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সেসময় নিউইয়র্কে ‘মুক্তধারা’র কার্যক্রমকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আয়োজকদের মতে, প্রকৃত অর্থে বইমেলার জন্ম হয় ১৯৯২ সালে। সাত তরুণের অদম্য উদ্যম নিয়ে সে বছর বইমেলার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। এই উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন বিশ্বজিত সাহা, হারুন আলী, আবদুর রহিম বাদশা, ছাখাওয়াত আলী, সজল পাল, শামীম হোসেন এবং দিলদার হোসেন দিলু। ১৯৯২ সালে ব্রুকলিনের একটি পাবলিক স্কুল এবং কুইন্সের একটি ছোট্ট চার্চে টেবিলের ওপর বই সাজিয়ে প্রথম মেলার আয়োজন করা হয়। প্রবাসজীবনের নানা সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলা ভাষাকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক স্বদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাই ছিল এর মূল চালিকাশক্তি। প্রথম দিকের সেই ক্ষুদ্র আয়োজন ধীরে ধীরে নিউইয়র্কের বাঙালি সমাজে এক বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ নেয়। শুরুর দিকে তারিক মাহবুবের একটি প্রতিষ্ঠান এবং বিএটিএস মেলায় স্টল দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। পরবর্তীকালে বইমেলাটি মূলত কুইন্সকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং অ্যাস্টোরিয়া, উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসের মতো এলাকায় গত তিন দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ২০২৩ সাল থেকে মেলাটির স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার (জেপিএসি)। সবুজে ঘেরা পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক এই পরিবেশ অনেকের কাছেই ঢাকার বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের আবহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের প্রেক্ষাপটটি প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। সেসময় প্রবাসে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন বা ভাষা-সাংস্কৃতিক চেতনা প্রকাশের মতো কোনো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম ছিল না। সেই শূন্যতা থেকেই আয়োজকরা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে একটি অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। সেটি কেবল একটি প্রতীকী নির্মাণ ছিল না, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে দৃশ্যমান করে তোলার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। ওই বছরই ‘মুক্তধারা নিউইয়র্ক’ এবং ‘বাঙালি চেতনা মঞ্চ’ যৌথভাবে বইমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা করে। প্রথমদিকে এই উদ্যোগ ছিল নিখাদ আবেগ ও ভাষা-ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। কিন্তু আয়োজকরা দ্রুতই উপলব্ধি করেন, কেবল আবেগ দিয়ে এমন বৃহৎ উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। এটিকে টেকসই করতে প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সেই লক্ষ্যেই বইমেলাকে একটি নিয়মিত আয়োজনে পরিণত করার পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় সাহিত্য আলোচনা, সেমিনার ও কবিতা পাঠের মতো বহুমাত্রিক কার্যক্রম। ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশকরা সরাসরি অংশগ্রহণ শুরু করলে এই মেলা বৈশ্বিক রূপ পেতে শুরু করে। ২০০৬ সালে ‘মুক্তধারা নিউইয়র্ক’ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন’-এ রূপ নেয়। এই রূপান্তর প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। উদ্যোক্তারা কেবল মেলার আয়োজন করেই থেমে থাকেননি। প্রবাসে বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে বাংলা বই পৌঁছে দেওয়ার অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের মধ্যে প্রায় ২৬টি লাইব্রেরিতে বাংলা বই সরবরাহ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে বইমেলায় একটি নতুন সাংগঠনিক ধারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। রোটেশনাল নেতৃত্ব, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রবীণ-নবীনের সেতুবন্ধনের মাধ্যমে এটিকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। হাসান ফেরদৌস, ড. নূরুন নবী, রোকেয়া হায়দারসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে এর নেতৃত্বের ভার সামলেছেন। মেলার উদ্বোধকদের তালিকাতেও রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রায় পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছেন শহীদ কাদরী, হুমায়ূন আহমেদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বাংলা সাহিত্যের দিকপালরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সেলিনা হোসেন, পবিত্র সরকার, ফরিদুর রেজা সাগর, মুহম্মদ নূরুল হুদা, শাহাদুজ্জামান এবং ২০২৬ সালে ইমদাদুল হক মিলনের মতো বিশিষ্টদের অংশগ্রহণ এই মেলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারির সময়ও এই মেলার পথচলা থেমে থাকেনি। পৃথিবীর সবকিছু স্থবির হয়ে পড়লেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সেবার ১০ দিনব্যাপী এক ভার্চ্যুয়াল বইমেলার আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালে ৩২তম আসরের মাধ্যমে মেলাটি আবারও সশরীরে আয়োজনের ধারায় ফেরে। ২০২৪ সালের ৩৩তম মেলাটি ‘যত বই, তত প্রাণ’ স্লোগানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করে। সেবার প্রায় ৪০টি প্রকাশনা সংস্থা ও শতাধিক লেখক এতে অংশ নেন। ২০২৫ সালের ৩৪তম আসরটি ছিল আরও বহুমাত্রিক। ইতিহাস, সাহিত্য ও চিত্রকলার সমন্বয়ে মেলাটি সেবার একটি পূর্ণাঙ্গ উৎসবে পরিণত হয়। ২৫টির বেশি প্রকাশনা সংস্থা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি অতিথির সমাগম ঘটে এই আসরে। সাদাত হোসাইনের উদ্বোধনে ওই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন ফিলিস টেইলর। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে রেহমান সোবহান, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, রওনক জাহান ও সিতারা বেগমের মতো বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বইমেলা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ভাষা ও একুশের চেতনা, যা নতুন প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এটি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য-বাজার। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এটি বাংলা সাহিত্যের এক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। তৃতীয়ত, এটি প্রবাসীদের জন্য একটি উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর বা পাবলিক স্পেস। এখানে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য ও সমকালীন পরিচয়ের নানা জটিল প্রশ্ন নিয়ে প্রতিনিয়ত মুক্ত আলোচনা হয়। বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই বইমেলা প্রমাণ করেছে যে, এটি কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়। এটি একটি ভাষার টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ঐতিহ্যের ধারাবাহিক হস্তান্তর। ১৯৯২ সালের সেই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ আন্তর্জাতিক বাংলা সংস্কৃতির এক সুপ্রতিষ্ঠিত মঞ্চ। ২০২৬ সালের আসন্ন ৩৫তম আসর এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার আরও একটি পরিণত ও শক্তিশালী ধাপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলেই প্রত্যাশা প্রবাসী বাঙালিদের।
নিউ ইয়র্ক সিটির বাসিন্দাদের জন্য স্বল্পমূল্যে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ ম্যাচ দেখার সুযোগ নিয়ে বিশেষ টিকিট লটারি কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে সিটি প্রশাসন। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্বাচিত আবেদনকারীরা মাত্র ৫০ ডলারে বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচের টিকিট কেনার সুযোগ পাবেন। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি জানান, সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য মোট এক হাজার সাশ্রয়ী টিকিট সংরক্ষণ করা হয়েছে। ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে! সাতটি ম্যাচের জন্য এসব টিকিট বরাদ্দ থাকবে, যার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ এবং দুটি নকআউট পর্বের খেলা। প্রতিটি টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ ডলার। তবে এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ রাখা হয়নি। এছাড়া নির্বাচিত দর্শকদের জন্য মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাতায়াতের বিনামূল্যে বাস সুবিধাও রাখা হয়েছে। সিটি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লটারির আবেদন শুরু হবে আগামী ২৫ মে সকাল ১০টা থেকে। আবেদন করতে হবে অনলাইনের মাধ্যমে। তবে আবেদন গ্রহণের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের ঠিকানা পরে প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই কর্মসূচিতে কেবল নিউইয়র্ক সিটির বাসিন্দারাই আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীদের পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করা হবে। প্রতিদিন একজন ব্যক্তি একবার করে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। একাধিক আবেদন করলে তা বাতিল হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। লটারির মাধ্যমে নির্বাচিতদের কাছে ইমেইল বা ফোনে যোগাযোগ করা হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টিকিট কেনার সুযোগ পাবেন বিজয়ীরা। মেয়র মামদানি বলেন, বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই কর্মজীবী ও মধ্যবিত্ত ফুটবলপ্রেমীদের কথা বিবেচনায় এনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতির সময় আমরা দেখছি টিকিটের দাম কয়েকশ থেকে হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অথচ অসংখ্য মানুষ জীবনে একবার হলেও বিশ্বকাপের ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে চান।” সাম্প্রতিক বিভিন্ন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কিছু ম্যাচের সাধারণ ক্যাটাগরির টিকিটের দাম ২২০ থেকে ৪১৫ ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পুনরায় বিক্রির বাজারে এসব টিকিটের দাম আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘোষণার অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় টিম ওয়ে এবং ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি হোস্ট কমিটির প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স ল্যাসরিও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কের বহুজাতিক সম্প্রদায়ের ফুটবল উন্মাদনা এবং বিশ্বকাপ ঘিরে বাড়তে থাকা আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
হলিউড অভিনেত্রী স্কারলেট জোহানসন স্বীকার করেছেন, নিখুঁত ‘কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য’ বলে বাস্তবে কিছু নেই। বিশ্বজুড়ে খ্যাতি, ব্যস্ত ক্যারিয়ার এবং কোটি ডলারের আয় থাকা সত্ত্বেও জীবনের কোনো না কোনো অংশে সবসময়ই ঘাটতি থেকে যায় বলে মনে করেন তিনি। মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠান “সিবিএস সানডে মর্নিং”-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। স্কারলেট বলেন, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে পুরোপুরি ভারসাম্য রাখা সম্ভব নয়—এ বিষয়টি মেনে নেওয়াই আসলে প্রথম ধাপ। তার ভাষায়, “সব সময় জীবনের কোনো না কোনো জায়গায় একটা ঘাটতি থেকেই যায়। সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁতভাবে করা সম্ভব না। তাই নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া শিখেছি।” মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজেকেই সবকিছু ঠিকভাবে সামলানোর চাপ দিয়েছেন। তবে সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমানে স্কারলেট জোহানসন একদিকে যেমন অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত, অন্যদিকে পরিবার ও ব্যবসাও সামলাচ্ছেন। কৌতুক অভিনেতা কলিন জোস্টের সঙ্গে তার সংসার এবং দুই সন্তান রয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি নিজের ত্বক পরিচর্যা ব্র্যান্ডও চালু করেছেন তিনি। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্কারলেট জোহানসনের আয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। একই সঙ্গে চলতি বছরের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেত্রী হিসেবেও তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সাফল্য নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে বলে জানান এই অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একবার একজন তাকে বলেছিলেন, “আপনি যদি একজন অভিভাবক হিসেবে ৭৫ শতাংশ সময়ও ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটাই অনেক বড় অর্জন।” স্কারলেটের মতে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা এবং মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে কর্মজীবন ও পরিবার একসঙ্গে সামলানো মানুষদের মধ্যে।
ফোর্বসের জরিপে আয়ের দিক থেকে ফুটবল জগতের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন পর্তুগালের তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা টানা চতুর্থ এবং সব মিলিয়ে ষষ্ঠবারের মতো ফোর্বসের সর্বোচ্চ আয়কারী অ্যাথলেট নির্বাচিত হয়েছেন। গত ১২ মাসে কর এবং এজেন্ট ফি বাদে রোনালদোর আনুমানিক আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ডলারে। এর মধ্যে সৌদির ক্লাব আল নাসরের খেলার চুক্তি থেকে তিনি পেয়েছেন ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাকি ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার এসেছে বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাত থেকে। ফোর্বসের আয়ের তালিকায় ষষ্ঠবার শীর্ষে উঠে রোনালদো এখন বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডানের পাশে স্থান করে নিয়েছেন। এই তালিকায় রেকর্ড ১১ বার শীর্ষে থেকে তার ওপরে আছেন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের গলফ কিংবদন্তি টাইগার উডস। ৩০ কোটি ডলার আয়ের মাধ্যমে রোনালদো মুষ্টিযোদ্ধা ফ্লয়েড মেওয়েদার জুনিয়রের ২০১৫ সালের আয়ের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেছেন। ১৯৯০ সালে ফোর্বস অ্যাথলেটদের আয়ের তালিকা প্রকাশ শুরুর পর এটি এক বছরে যৌথভাবে সর্বোচ্চ আয়ের অনন্য রেকর্ড।
এভিয়েশন বা বিমান চলাচলের ইতিহাসে ‘প্যান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারওয়েজ’ বা সংক্ষেপে ‘প্যান অ্যাম’ একটি রূপকথার নাম। ১৯২৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই মার্কিন বিমান সংস্থাই বিশ্ববাসীকে প্রথম দূরপাল্লার বিমান ভ্রমণের স্বাদ দিয়েছিল। তবে ভুল ব্যবসায়িক কৌশল আর বৈশ্বিক সংকটের কারণে ১৯৯১ সালে বন্ধ হয়ে যায় এই কিংবদন্তি ব্র্যান্ড। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর, সেই গৌরবময় সোনালী অতীতকে ফিরিয়ে আনতে একবিংশ শতাব্দীতে এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্যোক্তা ক্রেইগ কার্টারের নেতৃত্বাধীন একদল বিনিয়োগকারী প্যান অ্যামের সমস্ত স্বত্ব ও লাইসেন্স কিনে নেন। তাঁদের লক্ষ্য—প্যান অ্যামকে কেবল একটি বিমান সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি প্রিমিয়াম লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা। নস্টালজিয়ার জাদুতে সফল ‘এয়ার ক্রুজ’ দীর্ঘ ৩০ বছর বন্ধ থাকলেও বিমানপ্রেমীদের মনে প্যান অ্যামের আবেদন যে ফুরিয়ে যায়নি, তার প্রমাণ মেলে গত বছরের (২০২৫) জুন মাসে। সে সময় প্যান অ্যামের লোগো ও নীল-সাদা রঙে সজ্জিত একটি বিশেষ বিমান ১২ দিনের এক ঐতিহাসিক ‘এয়ার ক্রুজ’ বা বিমান সফরের আয়োজন করে। আইসল্যান্ড এয়ার থেকে লিজ নেওয়া বোয়িং ৭৫৭-২০০ বিমানটিতে মাত্র ৫০টি বিলাসবহুল আসন ছিল। নিউইয়র্ক থেকে রওনা হয়ে বারমুডা, লিসবন, মার্সেই, লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডের শ্যাননের মতো পুরোনো রুটে যাতায়াত করা এই সফরের টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। চড়া দাম সত্ত্বেও মাত্র তিন দিনের মধ্যে সফরের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এই সাফল্যই বিনিয়োগকারীদের বাণিজ্যিকভাবে আবারও আকাশে ফেরার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ফেরা ও নতুন পরিকল্পনা প্যান অ্যামের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং এভিয়েশন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এড ওয়েগেল জানান, প্যান অ্যামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা হিসেবে আকাশে ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। তবে এবার বোয়িং নয়, প্যান অ্যামের নতুন চালিকাশক্তি হবে ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের ‘এয়ারবাস এ২২০’ এবং ‘এ৩২০’ মডেলের বিমান। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমেরিকার মিয়ামি শহরকে প্রধান কেন্দ্র (বেস) করে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বাজারগুলোকে লক্ষ্য করে চার্টার্ড এবং নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। এই বিমানগুলোতে ইকোনমি থেকে শুরু করে প্রিমিয়ার তিন শ্রেণির আসন বিন্যাস থাকবে। তবে বিমান সংকটের কারণে প্রথম ফ্লাইটের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। ভবিষ্যতের প্যান অ্যাম হোটেল ও রেস্তোরাঁ: বিমান সংস্থার পাশাপাশি জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতেও প্যান অ্যামের নাম যুক্ত হচ্ছে। আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার কমার্স শহরে চালু হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ‘প্যান অ্যাম হোটেল’। বিখ্যাত হোটেল চেইন হিলটনের ব্যবস্থাপনায় এই হোটেলে থাকবে আশির দশকের বিমান ভ্রমণের নস্টালজিক আবহ। এছাড়া ২০২৬ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কের একটি বিমানবন্দরে চালু হবে প্রথম ‘প্যান অ্যাম রেস্তোরাঁ’। ২০২৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের প্যান অ্যাম লাউঞ্জ এবং ঘড়ি ও লেগো সেটের মতো বিভিন্ন লাইসেন্সড পণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা প্যান অ্যামের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা দারুণ এক রোমাঞ্চকর উদ্যোগ বললেও এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিমান শিল্প বিশ্লেষক অ্যাডিসন শোনল্যান্ডের মতে, বর্তমানের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে নতুন একটি প্রিমিয়াম বিমান সংস্থার টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে চলমান জ্বালানি সংকট যখন প্রতিষ্ঠিত বিমান সংস্থাগুলোকেই ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য করছে, তখন প্যান অ্যামের মতো ব্যয়বহুল ব্র্যান্ডের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ কতটা মসৃণ হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
লেখকঃ ফয়সাল চৌধুরী
মৃদুল রহমান
থাইল্যান্ড সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ৯০টির বেশি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল অবস্থানের সময়সীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ দিনের বেশি দেশটিতে থাকতে হলে পর্যটকদের ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। সরকারি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, আগে কোভিড পরবর্তী অর্থনীতি চাঙা করতে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ৯৩টি দেশের পর্যটকদের ৬০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়াই থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে সম্প্রতি মন্ত্রিসভা সেই সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। নতুন নীতিমালায় বিদেশি পর্যটকদের অবস্থানের সময়সীমা দেশভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা হবে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে। নিরাপত্তা জোরদার এবং ভিসা ব্যবস্থায় জটিলতা কমানোর লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে মাদক ও মানবপাচারের মতো অপরাধে বিদেশি নাগরিকদের জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষার জন্য বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হয়েছে। ৬০ দিনের ভিসামুক্ত সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, ইতালি ও স্পেন ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব দেশের নাগরিকদেরও ৩০ দিনের বেশি অবস্থানের জন্য ভিসা নিতে হবে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে। সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একই দেশের নাগরিকদের জন্য একাধিক ভিসা সুবিধা থাকায় অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হতো। নতুন নীতির মাধ্যমে সেই জটিলতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পর্যটননির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিচিত থাইল্যান্ডে ২০১৯ সালে প্রায় ৪ কোটি পর্যটক ভ্রমণ করেছিলেন। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে পর্যটন খাত পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও সাম্প্রতিক নিরাপত্তা উদ্বেগ নীতিগত এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চীনে দীর্ঘ তিন দশক ধরে নিজস্ব বাড়ির মালিক হওয়া ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য। সরকারি নীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পারিবারিক মূল্যবোধ মিলিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী আবাসন সংস্কৃতি। তবে ধীরগতির অর্থনীতি ও দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকট সেই স্বপ্নকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে নতুন বাড়ি বিক্রির পরিমাণ নেমে এসেছে ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে। ২০২১ সালে যেখানে নতুন বাড়ি বিক্রির মূল্য ছিল ১৬ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, সেখানে গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে। ম্যাককোয়ারি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের অর্থনীতিবিদেরা চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানান, নতুন বাড়ি বিক্রির পরিমাণ গত বছর ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে এবং এই নিম্নমুখী প্রবণতা দ্রুত থামার কোনো ইঙ্গিত নেই। বেইজিংয়ের ৩৬ বছর বয়সী গ্রাফিক ডিজাইনার কাই ইয়োচেংও আপাতত বাড়ি কেনার পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। তিনি বলেন, ভাড়া বাসায় থাকলে অনেক সময় অস্থায়ী জীবনের অনুভূতি তৈরি হয় এবং নিজের ইচ্ছামতো ঘর সাজানোর স্বাধীনতা থাকে না। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি ভাড়াতেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তার ভাষায়, “হিসাব করলে ভাড়া থাকাই বেশি যৌক্তিক মনে হয়। তবে মনের ভেতরে নিজের একটি বাড়ির ইচ্ছা এখনো আছে।” চীনে বাড়ির মালিক হওয়া কেবল সম্পত্তির মালিকানা নয়, এটি পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এরিক ফং বলেন, কনফুসীয় পারিবারিক মূল্যবোধ চীনা সমাজে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে এবং পরিবারকে কেন্দ্র করেই জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৮০-এর দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর চীনের কমিউনিস্ট সরকার ধীরে ধীরে কর্মস্থলনির্ভর আবাসন ব্যবস্থা কমিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানাকে উৎসাহিত করতে শুরু করে। ১৯৯০-এর দশকে ভর্তুকিনির্ভর নীতির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির অধ্যাপক হুয়াং ইউচিন বলেন, অনেক মানুষ খুব কম দামে হঠাৎ করেই বাড়ির মালিক হয়ে যান। এতে বিপুলসংখ্যক ভাড়াটিয়া একসময় বাড়ির মালিক শ্রেণিতে পরিণত হন। চীনা সমাজে সঞ্চয়ের প্রবণতাও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে। দ্রুত বাড়তে থাকা সম্পত্তির দাম আবাসন খাতকে জনপ্রিয় বিনিয়োগে পরিণত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক গ্রামীণ অভিবাসী শহরে বাড়ি কিনে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চেয়েছেন। আবার সন্তানদের বিয়ের সম্ভাবনা বাড়াতেও বাবা-মায়েরা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে দিয়েছেন। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের প্রতি ১০টি পরিবারের ৯টিরই নিজস্ব বাড়ি রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ আবাসন মালিকানার হার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির মালিকানার হার প্রায় ৬৫ শতাংশ। উচ্চশিক্ষার ঋণ ও বাড়ির বাড়তি মূল্য অনেক তরুণকে দীর্ঘ সময় ভাড়ায় থাকতে বাধ্য করছে। তবে চীনের আবাসন খাতের দ্রুত উত্থানের সঙ্গে তৈরি হয়েছে বড় ঝুঁকিও। প্রবৃদ্ধির সময় অনেক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিপুল ঋণ নেয়। অতিরিক্ত নির্মাণের কারণে বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় ফাঁকা আবাসিক অঞ্চল ও অবিক্রীত প্রকল্প। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২০ সালে চীনের কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়। আবাসন খাত, যা একসময় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৩০ শতাংশ জুড়ে ছিল, তা নিয়ন্ত্রণে নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়। এই পদক্ষেপে ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ কমলেও সম্পত্তির দাম দ্রুত পড়ে যায়। অনেক ক্রেতা অসম্পূর্ণ বা বিলম্বিত ফ্ল্যাটের মুখোমুখি হন। ঋণসংকটে পড়ে বড় বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও ধসে পড়ে। চীনের অন্যতম বৃহৎ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এভারগ্রান্ডকে ২০২৪ সালে হংকংয়ের একটি আদালত বিলুপ্তির নির্দেশ দেয়। কান্ট্রি গার্ডেন ও ভ্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও আর্থিক চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যসংঘাতের আশঙ্কা। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতারা এখন আরও সতর্ক। কাই ইয়োচেং বলেন, তিনি ভবিষ্যতে বাড়ি কিনতে চান, তবে আগামী কয়েক বছরে সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও আবাসন খাত এখনো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মার্চ মাসেও দেশজুড়ে নতুন বাড়ির দাম কমেছে, যদিও কয়েকটি বড় শহরে সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান কুশম্যান অ্যান্ড ওয়েকফিল্ডের কর্মকর্তা ঝ্যাং শিয়াওদুয়ান বলেন, সরকারের ইতিবাচক বার্তা থাকলেও বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতার বড় ধরনের পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে না। গত বছর চীন ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করলেও সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় সেই প্রবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কুনমিং শহরের ৩০ বছর বয়সী আলোকচিত্রী ম্যান্ডি ফেং বলেন, বাড়ির দাম কমলেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে। তার ভাষায়, “মানুষ বাড়ি কিনতে চায় না, এমন নয়। কিন্তু আয় অনিশ্চিত এবং উপার্জন কম থাকলে কেউ ঋণ নিতে সাহস পায় না।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে আবাসন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাচ্ছে। বেইজিংয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ঝো ঝ্যাং বলেন, তিনি সম্ভবত নিজের সন্তানদের জন্য বাড়ি কিনবেন না, যদিও নিজের ফ্ল্যাট কিনতে বাবা-মায়ের সহায়তা পেয়েছিলেন। তার মতে, চীনের আবাসন বাজার ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশের মতো হয়ে উঠছে, যেখানে ভবিষ্যতে ভাড়া বাসায় থাকার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটির বিধায়কদলের বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী-কেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি হতে যাচ্ছেন রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী। শুক্রবার (৮ মে) কলকাতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি দলীয় বিধায়কদের সঙ্গে আলোচনা শেষে শুভেন্দুকে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। অমিত শাহ জানান, দলনেতা নির্বাচনের জন্য একাধিক প্রস্তাব উঠলেও প্রতিটি প্রস্তাবেই একমাত্র নাম ছিল শুভেন্দু অধিকারীর। দ্বিতীয় কোনো নাম না আসায় সর্বসম্মতিক্রমেই তাকে নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দুর নামই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল। দলের ভেতরে তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। রাজ্যের রাজনীতিতে তার উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে একাধিক নির্বাচনী লড়াই। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় পান। এরপর সাম্প্রতিক নির্বাচনেও নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্রেই লড়াই করে তিনি আবারও মমতাকে পরাজিত করেন, এবং আগের তুলনায় ব্যবধানও বাড়ান। সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা খুঁজছেন বলে মন্তব্য করেছেন এক বিশ্লেষক। তার মতে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতের সামনে প্রেসিডেন্টের অবস্থান রক্ষা করা। তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো দ্রুত চুক্তির ইঙ্গিত তিনি দেখছেন না। তার মতে, পরিস্থিতি এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, ট্রাম্প চীনে সফরের আগে কিছু অর্জন দেখাতে চেয়েছিলেন, তবে তিনি হরমুজ প্রণালী খুলতে সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো প্রচেষ্টাতেই সফল হননি। এই বিশ্লেষকের দাবি, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করলে তেহরান নতি স্বীকার করবে। তবে বাস্তবে তা ঘটেনি। আলি আকবর দারেইনি আরও বলেন, “ইরান কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না। এমনকি ভবিষ্যতেও তা সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ চলাচল করে, ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।