যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘিত হলে লেবাননের বিরুদ্ধে ‘দ্রুত সামরিক অভিযান’ চালানোর হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির। দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত বিউফোর্ট দুর্গ (আরবিতে কালআত আল-শাকিফ) পরিদর্শনের সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। আনাদোলু সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, রোববার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাপ্রধান ইয়াল জামির ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিউফোর্ট এলাকায় মোতায়েন সেনাদের পরিদর্শন করেন। ওই সফরেই তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ হলে ইসরায়েল দ্রুত সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত থাকবে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বিউফোর্ট দুর্গকে ‘কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে দাবি করা হয়, এলাকাটি হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবকাঠামোতে পরিপূর্ণ। জামির আরও দাবি করেন, ইরানের অর্থায়ন ও সহায়তায় কয়েক দশক ধরে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলোকে লক্ষ্য করে বিস্তৃত সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। তিনি লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করে ওই এলাকা থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দিতে হবে। তবে সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের বিষয়ে লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। গত মে মাসের শেষ দিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ঘোষণা দেন, ইসরায়েলি বাহিনী বিউফোর্ট দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ২০০০ সালের পর এটিই লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি বাহিনীর সবচেয়ে গভীর অগ্রযাত্রা বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ সে সময় জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী দুর্গে প্রবেশের সময় সেখানে তাদের কোনো সামরিক উপস্থিতি ছিল না। সংগঠনটি অভিযোগ করে, প্রচারণার উদ্দেশ্যেই ইসরায়েল ওই এলাকা দখল করেছে। দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা হিসেবে পরিচিত বিউফোর্ট দুর্গ। ২০০০ সালে ইসরায়েলি বাহিনী সেখান থেকে সরে গেলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে এলাকাটি আবারও আলোচনায় আসে। উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল দুই পক্ষের সংঘাত বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মূল কারণগুলো সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। তবে যুদ্ধবিরতির এই উদ্যোগের মধ্যেও সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। লেবাননের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে অন্তত ৪ হাজার ৩০৩ জন নিহত এবং ১২ হাজার ২০২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সংঘাতের কারণে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে বলে লেবাননের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলেও এ বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চার দিনব্যাপী আলোচনার পর দক্ষিণ লেবাননের দুটি এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারে প্রাথমিক চুক্তি করেছে ইসরায়েল। শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় ওই দুটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। চুক্তিটিকে ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই বৃহত্তর শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এমন সময়ে এই অগ্রগতি এলো, যখন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টাকেও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত শান্তিচুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ বলেন, এই চুক্তি লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, লিতানি নদীর উত্তর ও দক্ষিণের দুটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সরে যাবে। তার ভাষ্য, যেসব অবস্থান সামরিক প্রয়োজনের জন্য আর অপরিহার্য নয়, সেখান থেকেই সেনা প্রত্যাহার করা হবে। এর আগে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, লেবানন সরকারের প্রতি সদিচ্ছার বার্তা হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত কয়েকটি এলাকা থেকে প্রতীকীভাবে সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছিল ইসরায়েল। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “এটি কেবল শুরু। সামনে আরও কঠিন পথ রয়েছে। তবে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর অংশ হতে পেরে আমরা সম্মানিত।” তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিনই দক্ষিণ লেবাননে একটি ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। আইডিএফের দাবি, তাদের বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল এমন এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, লিতানি নদীসংলগ্ন নির্ধারিত এলাকাগুলোতে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে মোতায়েন হবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী। নেতানিয়াহু এই সমঝোতাকে ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের অধিকাংশ এলাকায় ইসরায়েলি সেনা অবস্থান বজায় রাখতে পারবে। তিনি আরও বলেন, “এটি ইরানের জন্যও বড় ধাক্কা। তারা চাপ প্রয়োগ করে আমাদের দক্ষিণ লেবানন থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে এটি ইরানের বিষয় নয়।” লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও চুক্তিটিকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনকে আলোচনার আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এর ফলে লেবাননের জনগণ নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত ভূখণ্ডে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধীনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ এই সমঝোতার তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম এক বিবৃতিতে বলেন, এই চুক্তি লেবাননের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে।
লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে সম্প্রতি নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর। গোষ্ঠীটির সেক্রেটারি-জেনারেল নাইম কাসেম এক কড়া বার্তায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের সংগঠন ইসরাইলি আগ্রাসন ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে। সম্প্রতি জনসমক্ষে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে নাইম কাসেম বলেন, ইসরাইলি দখলদারিত্বকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করতে মাঠপর্যায়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী হিসেবে হিজবুল্লাহ তাদের নিয়মিত সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও হিজবুল্লাহ কখনো যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও কোনো অবস্থাতেই তারা মাঠ ছেড়ে যাবে না। হিজবুল্লাহ প্রধানের এই অনমনীয় মন্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। তবে নাইম কাসেমের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, কাগজে-কলমে চুক্তি হলেও ইসরাইলি সেনারা লেবাননের ভূখণ্ডে অবস্থান করা পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই অস্ত্র সমর্পণ করবে না। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলের চলমান শান্তি প্রচেষ্টার মাঝেও এই অঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আসা নিয়ে নতুন করে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত প্রায় তিন বছরে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের মোট ব্যয় প্রায় ২০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে বলে দেশটির একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম জমান ইসরায়েল—যা দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের হিব্রু সংস্করণ—এই তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি পরে আন্তর্জাতিক মাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডও উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতগুলোর ফলে ইসরায়েল সরকারের সরাসরি ব্যয়ই ১১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ব্যাংক অব ইসরায়েলের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এর মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, বেসামরিক বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এবং ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া সামরিক সহায়তার আর্থিক মূল্যও এই হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জামসহ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার পরিমাণ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। তবে ব্যয় শুধু সরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সংঘাতের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের উৎপাদন ক্ষতিও হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের সম্ভাব্য পরিস্থিতি যুক্ত করলে তা ৫৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারি ব্যয়, বিদেশি সামরিক সহায়তা এবং উৎপাদন ক্ষতি একত্রে বিবেচনা করলে সংঘাতগুলোর মোট অর্থনৈতিক প্রভাব প্রায় ২০৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বিশ্লেষণে ব্যক্তিগত ক্ষতি বা বেসরকারি খাতের সব ধরনের লোকসান পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে প্রকৃত অর্থনৈতিক চাপ আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্টরা। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় করের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক সংঘাতকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক সময় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই যুদ্ধগুলোর আর্থিক অভিঘাত আগামী বহু বছর ধরে দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনাদের অবিলম্বে ও শর্তহীন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেম। শুক্রবার (২৬ জুন) এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ভাষণে কাসেম স্পষ্ট করে বলেন, “ইসরায়েলকে লেবাননের প্রতিটি এলাকা থেকে পুরোপুরি সেনা সরিয়ে নিতে হবে। যুদ্ধবিরতি মানে কেবল আংশিক শান্তি নয়—সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বন্ধ হওয়া।” তার মতে, এমন কোনো যুদ্ধবিরতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যেখানে এক পক্ষ হামলা চালিয়ে যাবে, আর অন্য পক্ষ নীরব থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধাপেই লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা উল্লেখ করা হয়। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যেও পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হয়। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি অঞ্চলে এখনো ইসরায়েলি সেনা অবস্থান করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে মাঝে মধ্যেই হামলার ঘটনাও ঘটছে। যদিও ইসরায়েল দাবি করছে, নিরাপত্তাজনিত হুমকি মোকাবিলায় তাদের বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালানোর অধিকার রাখে। এই অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করে নাঈম কাসেম বলেন, “ইসরায়েল কেবল নিরাপত্তার অজুহাতে সেখানে নেই; বরং লেবাননের ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিদেশি সেনা উপস্থিতির কোনো বৈধতা নেই এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব লেবাননের নিজস্ব জাতীয় সেনাবাহিনীর। হিজবুল্লাহ প্রধান আরও সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হলে তাদের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। “প্রতিরোধের অধিকার আমরা সংরক্ষণ করি,”—যোগ করেন তিনি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা প্রসঙ্গে কাসেম দাবি করেন, এই চুক্তি ইরানের কৌশলগত সাফল্যের প্রতিফলন এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক পরাজয়ের ইঙ্গিত বহন করে। ভাষণে লেবাননের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিও বার্তা দেন হিজবুল্লাহ প্রধান। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে সরকার যেন কোনো আপস না করে এবং বিদেশি প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে। “জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগণকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি সরকার নিতে পারে না,”—বলেন তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ বাস্তবায়ন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে কাসেম বলেন, লেবানন এখন একটি নতুন রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং এই সময়ে জাতীয় ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনের বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে।
লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করেছে জার্মানি। দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না বলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের দেওয়া এক বক্তব্যের পর সোমবার (২২ জুন) বার্লিন এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। জার্মান সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব (স্বাধীন রাষ্ট্রীয় অধিকার) ক্ষুণ্ন করে সেখানে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বার্লিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্টিন গিসে বলেন, "এ বিষয়ে ফেডারেল সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছি। এর পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া লেবাননের বেসামরিক জনগণকে তাদের নিজস্ব ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে বাধা দেওয়া যাবে না।" পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে জার্মান সরকারের প্রধান মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি বার্লিনের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছিলেন যে, লেবাননে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ‘কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ বা বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমি আগেই স্পষ্ট করেছি যে, লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে ইসরায়েল তার সেনা প্রত্যাহার করবে না।" মূলত গত শুক্র ও শনিবার দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ২০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালানোর পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। ইসরায়েলের এমন আগ্রাসী অবস্থানের মুখে জার্মানির এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা অবসানের আহ্বান জানানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি সেনা রেখে দেওয়ার এই জেদ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েল সীমান্তের কাছে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ অস্ত্র কারখানার সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। সংস্থাটির অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই স্থাপনাটি ব্যবহার করে উন্নত ড্রোন তৈরি ও পরিচালনা করত, যার পেছনে ইরান-এর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছিল। ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েল সোমবার (২২ জুন) এক প্রতিবেদনে জানায়, দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল জৌন গ্রামে একটি সুড়ঙ্গপথের সন্ধান পায় আইডিএফ। ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে প্রবেশ করে সেনারা পাহাড়ের নিচে নির্মিত একটি বড় ভূগর্ভস্থ স্থাপনা খুঁজে পায়। আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকশ মিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গের গভীরে, প্রায় ২৯ মিটার নিচে অবস্থিত অস্ত্রভান্ডারটি বিস্ফোরণরোধী বিশেষ ইস্পাতের দরজায় সুরক্ষিত ছিল। ভেতরে ড্রোন তৈরির উপযোগী একাধিক কক্ষ, সংরক্ষণাগার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, গত এক দশকে ইরানের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই স্থাপনাটি গড়ে তোলা হয়। চোরাইপথে আনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে সেখানে ড্রোন তৈরি করা হতো এবং সেগুলো দিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা ছিল। অভিযান চালিয়ে ওই স্থান থেকে প্রায় ৫০টি ড্রোন এবং প্রায় আট টন বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইডিএফ। পাশাপাশি পাহাড়ের দক্ষিণাংশে ড্রোন উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ লঞ্চিং পয়েন্টও শনাক্ত করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, উদ্ধার করা ড্রোনগুলো দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি ছিল। এই অভিযানের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর সেই সক্ষমতা অনেকটাই নষ্ট করা গেছে। সম্প্রতি আইডিএফ ওই ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কিছু ছবি প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের সেখানে নিয়ে গিয়ে পুরো এলাকা পরিদর্শনের সুযোগও দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে এখনো হিজবুল্লাহ বা ইরান-এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিতে পারে, বিশেষ করে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি এবং লেবাননে সংঘাত কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিতের মধ্যে ইরানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও দামের পতন অব্যাহত রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের একটি পর্বত রিসোর্টে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অন্তর্বর্তী শান্তি কাঠামোর অধীনে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী চুক্তির দিকে এগোনোর একটি রোডম্যাপ নিয়ে একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা। পাকিস্তান ও কাতার এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করে। এই কাঠামোর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে ২১ আগস্ট পর্যন্ত একটি অনুমোদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান তেল বিক্রি করতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রহণের সুযোগও তৈরি হয়েছে। আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে এবং চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির দিকে অগ্রগতি সম্ভব। তিনি জানান, ইরান পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে এবং বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গঠনে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনো কোনো নতুন আলোচনা বা প্রতিশ্রুতি হয়নি। ভ্যান্স বলেন, আলোচনার সময় কিছু উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই আলোচনার ধারা অব্যাহত রেখেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে ইরানের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জব্দ সম্পদ মুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানিতে ছাড়, বিদেশে জব্দ অর্থের কিছু অংশ মুক্ত করা এবং পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আলোচনায় আরও সিদ্ধান্ত হয় যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাত কমানোর একটি প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হবে। লেবাননে সহিংসতা কমে আসার দাবি করা হলেও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধের প্রভাব এখনো স্পষ্ট। দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরের একটি হাসপাতালের পরিচালক হাসান ওজনি জানান, দীর্ঘ সময় পর টানা দুই দিন তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, তিনি প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রায়ই হাসপাতালে অবস্থান করছেন, কারণ পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। লেবানন সরকার জানিয়েছে, সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং অনেকে এখনো নিরাপত্তাহীনতার কারণে ঘরে ফিরতে পারছে না। এদিকে ইসরায়েল সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চলের আটটি এলাকায় সামরিক সতর্কতা শিথিল করেছে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানে তারা আপত্তি নয়, তবে চুক্তিতে এমন নিশ্চয়তা থাকতে হবে যাতে ইরান সামরিক উদ্দেশ্যে কোনো অর্থ ব্যবহার করতে না পারে।
মিডল ইস্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ নতুন করে চড়তে শুরু করেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি হামলার পর তেহরান ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে চরম প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ইরান থেকে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, যা গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথম কোনো সরাসরি বড় আঘাত। ইরান এই হামলাকে "এক সপ্তাহের টানা ধারাবাহিক অভিযান"-এর সূচনা বলে ঘোষণা করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকেও ইসরাইলি ভূখণ্ডে রকেট হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইসরাইলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'আইরন ডোম' অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্রের এই গর্জন আর সাইরেনের আওয়াজের মধ্যেই ইসরাইলের সাধারণ মানুষকে জীবন বাঁচাতে প্রতিনিয়ত বোমা আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঙ্কারে ছুটতে দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইসরাইলের ভেতরের এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের চিত্র। একদিকে মাথার ওপর উড়ে যাচ্ছে রকেট ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র, অন্যদিকে শহরের রেস্তোরাঁ, খেলার মাঠ বা সমুদ্র সৈকতে নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও সচল রয়েছে। তবে এই স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর আতঙ্ক। তেল আবিব বা জেরুজালেমের প্রতিটি আধুনিক ভবনে এখন বাধ্যতামূলকভাবে বোমা আশ্রয়কেন্দ্র বা বাঙ্কার তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সাইরেন বাজার সাথে সাথে অত্যন্ত অভ্যস্ততার সাথে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। অনেকে একে আমেরিকার 'তুষারপাতের দিন'-এর সাথে তুলনা করে কৌতুকচ্ছলে 'মিসাইল ডে' বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিন বলে অভিহিত করছেন। বিশ্ববাসীর চোখে ইসরাইলকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আগ্রাসী সামরিক শক্তি মনে হলেও, দেশটির সাধারণ নাগরিক ও কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের এই যুদ্ধকে 'অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই' হিসেবে দেখছেন। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান, হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথিদের মতো চতুর্মুখী হুমকির মুখে তাদের এই সামরিক অভিযান কোনো নতুন অঞ্চল দখল বা শাসন পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারেন হাস্কেল স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দশকের পর দশক ধরে আলোচনার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের ভাষাই একমাত্র কার্যকর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর থেকে ইসরাইলের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা হতো, এখন সেখানে শত্রুর ঘরে আঘাত হানার নীতি বা 'অক্টোপাস ডকট্রিন' অনুসরণ করা হচ্ছে, যেখানে ইরানকে এই সব প্রক্সি গোষ্ঠীর মূল চালিকাশক্তি বা অক্টোপাসের মাথা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদিকে, গাজায় ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও প্রতিনিয়ত তা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। অন্যদিকে লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, লেবাননে নির্বিচারে বহুতল ভবন ধ্বংস করার নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সম্ভাব্য বড় শান্তি চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন-ইরান চুক্তি যাই হোক না কেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরাইলি বাহিনী যতদিন প্রয়োজন লেবাননের সীমান্ত নিরাপত্তা জোনে অবস্থান করবে। এই জটিল পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েই গেছে।
লেবাননে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে ইরানের ওপর আরও ভয়াবহ হামলার সরাসরি হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি চরম সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, ইরানকে অবিলম্বে লেবাননে তাদের 'উচ্চ বেতনের প্রক্সি' গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে। তারা যদি তা না করে, তবে গত সপ্তাহে যেভাবে হামলা চালানো হয়েছিল, এবার তার চেয়েও আরও কঠোর ও বড় পরিসরে ইরানে আঘাত হানা হবে। গত শুক্রবার থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর প্রাথমিক শান্তি চুক্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। এর মধ্যেই শনিবার হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার দাবি করে ইরান। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, বিশ্বজ্বালানি পরিবহনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে এখনও অন্যান্য দেশের নৌযান চলাচল করতে পারছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানকে চরম পরিণতি ভোগের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করে তবে তাদের কোনো দেশের অস্তিত্বই থাকবে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকে যদি প্রণালিতে অন্যান্য দেশের তেলের জাহাজের 'ত্রাণকর্তা' হিসেবে কাজ করতে হয়, তবে এর জন্য টোল আদায়ের বা প্রণালির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও হুমকি দেন তিনি। একই সঙ্গে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের 'ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার না ছাড়ার' প্রকাশ্য ঘোষণারও কড়া সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি চরম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, পেজেশকিয়ানকে অবশ্যই কথাবার্তায় লাগাম টানতে হবে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। এর আগে, ইরানের সাথে একটি সংবেদনশীল শান্তি চুক্তি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও চাপ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে রোববারের বার্তায় তিনি পুরো সংঘাতের দায়ভার মূলত ইরানের ওপরই চাপিয়েছেন। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রথম শর্তই ছিল লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে তা অত্যন্ত কঠিন প্রমাণিত হচ্ছে। চলমান এই সংঘাতের জেরে সুইজারল্যান্ডে এমওইউ-এর অধীনে প্রথম দফার শান্তি আলোচনাও বিলম্বিত হয়েছে, যা রোববার থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত চলতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উল্লেখ্য, একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এবং ইউরেনিয়াম মজুতের মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধানের লক্ষ্যে এই সমঝোতা স্মারকে উভয় দেশকেই ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের চলমান হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতময় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তেহরান মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিচ্ছেদ্য জোটে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুই পরম মিত্র দেশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে ইরান বর্তমান লেবানন পরিস্থিতিকে একটি মোক্ষম কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুশতাই সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ইরান বর্তমানে লেবাননকে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে ইসরাইলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার ফাটলকে আরও চওড়া করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে তেহরানের উদ্দেশ্য দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করা বলে মনে হলেও, এর পেছনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তেহরান, বৈরুত, হিজবুল্লাহ এবং খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টও খুব ভালোভাবে জানেন যে, ইসরাইলি আক্রমণ রাতারাতি বা পুরোপুরি বন্ধ করা এই মুহূর্তে খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ নিজেদের ওপর যেকোনো ধরনের আঘাত এলে ইসরাইল নিশ্চিতভাবেই তার কড়া পাল্টা জবাব দেবে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্টের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত না করতে ইসরাইল হয়তো সাময়িকভাবে কিছুটা নমনীয় বা শান্ত আচরণ করতে পারে। তবে যেকোনো উসকানি বা হামলার মুখে তারা নিজেদের সুরক্ষায় তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সামান্যতম দ্বিধা করবে না। ঠিক এই জটিল পরিস্থিতিটিকেই ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের মধ্যকার সুদৃঢ় সম্পর্ককে দুর্বল করার একটি বিশাল সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তেহরানের প্রধান লক্ষ্যই হলো এই দুই দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক জোটে চির ধরানো, আর সেই সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নেই তারা অত্যন্ত সুচারুভাবে তাদের বর্তমান কৌশলগুলো পরিচালনা করছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক স্থল অভিযানে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনীর সপ্তম সাঁজোয়া ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাউল ইসরায়েলি এই দাবি করেছেন। রোববার প্রকাশিত জেরুজালেম পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কর্নেল ইসরায়েলি জানান, তার নেতৃত্বাধীন বাহিনী শুধু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সড়ক দখলই করেনি, বরং গত দুই দশকে হিজবুল্লাহ যে বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, সেগুলোও নিষ্ক্রিয় করেছে। এই অভিযানকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অন্যতম কঠিন প্রকৌশলভিত্তিক সামরিক মিশন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, খাড়া পাহাড়ি পথ, বিস্ফোরক ফাঁদ, অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা ও মর্টারের গোলার মধ্যে দিয়েই সেনাদের অগ্রসর হতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সামনে ভারী বুলডোজার দিয়ে পথ তৈরি করে ট্যাংক এগিয়ে নেওয়া হয়। কর্নেল ইসরায়েলি স্বীকার করেন, সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও পুরো ইউনিটকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারত। বিশেষ করে লিতানি নদী ও সালুকি উপত্যকার দিকে একযোগে অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি করা ছিল অত্যন্ত জটিল ও নজিরবিহীন উদ্যোগ। তিনি ৬০৩তম ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সদস্যদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তাদের দক্ষতা ও সাহসিকতা ছাড়া এই অভিযান সফল করা সম্ভব হতো না। অভিযানের শুরুতেই সপ্তম ব্রিগেড সীমান্তবর্তী তাইবে, মারকাবা ও রাব এল থালাথিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রামগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালায়, যাতে উত্তর ইসরায়েলের দিকে হামলার ঝুঁকি কমানো যায়। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় গোলানি ব্রিগেড। এরপর কান্তারা এলাকায় ‘সিটি অব রিফিউজ’ নামে পরিচিত একটি বড় ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি দখলের অভিযান শুরু হয়। কর্নেলের দাবি অনুযায়ী, কান্তারা অঞ্চলের এই অবকাঠামো প্রায় ২০ বছর ধরে ইরান ও হিজবুল্লাহর সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে অস্ত্রাগার, টানেল, অ্যান্টি-ট্যাংক অবস্থান এবং ইসরায়েলে অনুপ্রবেশের জন্য বিশেষ ঘাঁটি ছিল। এলাকাটি লিতানি নদীর দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং আশপাশের গ্রামগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখত। অভিযান চলাকালে ইসরায়েলি বাহিনী শত শত বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলার মুখে পড়ে বলেও জানান কর্নেল ইসরায়েলি। বিউফোর্ট ও গান্দুরিয়েহ এলাকাতেও হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ ও স্থলভিত্তিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে বলে তার দাবি। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে পুরো এলাকা আগুনে জ্বলছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ লেবাননকে হিজবুল্লাহ একটি বহুস্তরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তর করেছিল—কোথাও রকেট হামলার প্রস্তুতি, কোথাও সীমান্ত অনুপ্রবেশ, আবার কোথাও ইসরায়েলের স্থল অগ্রগতি বিলম্বিত করার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাই ছিল ভূগর্ভে, যা বিমান হামলা থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। টানেল ব্যবস্থার বিষয়ে কর্নেল জানান, কান্তারা ও বিউফোর্টের কিছু টানেলের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার। তার মতে, গাজার তুলনায় লেবাননের এই টানেলগুলো আকারে বড় হওয়ায় সেগুলো শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ ছিল। ড্রোন যুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম বড় হুমকি হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়বে। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ট্যাংকের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন এই সামরিক কর্মকর্তা। তার মতে, আধুনিক ট্যাংক এখন শুধু সাঁজোয়া যান নয়; এটি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং ড্রোন পরিচালনাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধব্যবস্থার অংশে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘাত সেনা সদস্যদের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি করছে, সেটিও স্বীকার করেন কর্নেল ইসরায়েলি। তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে চলমান এই সংঘাতে অনেক কর্মকর্তা ও সৈন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত। বিশেষ করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের দায়িত্বের মেয়াদ কমানো প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি সেনা সদস্যদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তার ভাষায়, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন সেনা সদস্যদের পরিবার—বিশেষ করে তাদের স্ত্রী ও স্বজনরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চললেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ইরান, ইসরায়েল ও লেবাননকে ঘিরে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লেবাননে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যম চ্যানেল ১২ নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। শনিবার (২০ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের চেতনা লঙ্ঘন করে দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। এর ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮৩ জন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পরই তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে। মাত্র কয়েকদিন আগেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি আবার চালু করা হয়েছিল। ইরানের সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি তাদের পক্ষ থেকে নেওয়া ‘প্রথম পদক্ষেপ’। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দক্ষিণ লেবাননে অভিযানরত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বর্তমানে দখলে থাকা এলাকাগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যেকোনো পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে রোববার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন। আলোচনায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারাতেই লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে গত বুধবার চুক্তি স্বাক্ষরের পরও লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় শান্তি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিসহ তেল খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যে হরমুজ প্রণালি, লেবানন পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি আগামী কয়েকদিনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। শনিবার (২০ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিশেষ বিবৃতিতে এই কৌশলগত পদক্ষেপের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। বিবৃতিতে ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যে পূর্ববর্তী সমঝোতা হয়েছিল, ইসরায়েলের এই সামরিক পদক্ষেপ সেই চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। চুক্তি ভঙ্গের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তেহরান স্পষ্ট করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে কেবল প্রাথমিক সতর্কতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, ইসরায়েল যদি লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেহরান আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। মূলত প্রতিপক্ষকে তাদের অঙ্গীকার ও চুক্তির শর্ত মেনে চলতে বাধ্য করতেই এই চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে ইরানের এই ঘোষণার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ফলে এই পথ দীর্ঘসময় বন্ধ থাকলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের এই আকস্মিক ও কঠোর ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ভূত এই উত্তেজক পরিস্থিতির দিকে বিভিন্ন দেশ, পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে।
লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। শনিবার (২০ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিশেষ বিবৃতিতে এই কৌশলগত পদক্ষেপের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। বিবৃতিতে ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যে পূর্ববর্তী সমঝোতা হয়েছিল, ইসরায়েলের এই সামরিক পদক্ষেপ সেই চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। চুক্তি ভঙ্গের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তেহরান স্পষ্ট করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে কেবল প্রাথমিক সতর্কতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, ইসরায়েল যদি লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেহরান আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। মূলত প্রতিপক্ষকে তাদের অঙ্গীকার ও চুক্তির শর্ত মেনে চলতে বাধ্য করতেই এই চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে ইরানের এই ঘোষণার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ফলে এই পথ দীর্ঘসময় বন্ধ থাকলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের এই আকস্মিক ও কঠোর ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ভূত এই উত্তেজক পরিস্থিতির দিকে বিভিন্ন দেশ, পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে।
লেবাননের ভূখণ্ড ও সাধারণ মানুষকে ইসরাইলি বাহিনীর আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি ইসরাইলের বিরুদ্ধে গত ১৬ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের তীব্র অভিযোগ এনেছে। হিজবুল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মাতৃভূমি রক্ষায় যেকোনো ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলায় তাদের যোদ্ধারা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইসলামী প্রতিরোধ বাহিনী’ শত্রুদের যেকোনো পদক্ষেপের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং নিজেদের মাতৃভূমি ও জনগণকে রক্ষায় তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়ে ইসরাইল যে অভিযোগ তুলেছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা আখ্যা দিয়ে দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে গোষ্ঠীটি। হিজবুল্লাহ জোর দিয়ে বলেছে, ইসরাইলি শত্রু পক্ষ বাস্তবে কখনোই কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত বা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেনি। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান, যতদিন প্রয়োজন মনে হবে ততদিন ইসরাইলি সেনারা লেবাননের মাটিতে অবস্থান করবে। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর যেকোনো হামলার জন্য গোষ্ঠীটিকে ‘ভারী মূল্য’ দিতে হবে বলেও তিনি কড়া ভাষায় প্রতিজ্ঞা করেন। এদিকে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) লেবাননে সব ধরনের সামরিক অভিযান ও সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই শান্তি উদ্যোগের তোয়াক্কা না করেই ঘোষণা দিয়েছে যে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর যোদ্ধা ও তাদের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইসরাইলের বিমান ও স্থল অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাঠপর্যায়ে বিবদমান দুই পক্ষের এমন অনড় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একদিকে হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এবং অন্যদিকে চুক্তির তোয়াক্কা না করে ইসরাইলের অভিযান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে এই অঞ্চলে বড় ধরনের মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
দক্ষিণ লেবাননের কাফর তিবনিত গ্রামে হিজবুল্লাহর পৃথক দুটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ইসরাইলি ব্যাটালিয়ন প্রধানসহ অন্তত চার সেনা নিহত এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি বিমান বাহিনী ব্যাপক পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। এই নতুন সহিংসতা চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-কে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, মধ্যরাতের পর কাফর তিবনিত গ্রামে হিজবুল্লাহর একটি সন্দেহভাজন ড্রোন বা ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৪০১তম আর্মার্ড ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডোর গেদালিয়া বেন সিমহন এবং তার ট্যাংকের অন্য তিন ক্রু সদস্য নিহত হন। ৩২ বছর বয়সি বেন সিমহন গত এপ্রিল মাসে এই ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যখন এর আগের কমান্ডার দক্ষিণ লেবাননে গুরুতর আহত হন। এই প্রাণঘাতী হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর একই গ্রামে হিজবুল্লাহর আরেকটি বিস্ফোরক ড্রোন ইসরাইলি কমান্ডো ব্রিগেডের ওপর আঘাত হানে। এতে এক রিজার্ভ অফিসার গুরুতর আহত হওয়াসহ মোট পাঁচ ইসরাইলি সেনা জখম হন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইসরাইলি বিমান বাহিনী লেবাননের নাবাতিয়েহ ও বেকা উপত্যকাসহ অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু করে। আইডিএফের দাবি, হিজবুল্লাহর পুনঃপুন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে এবং এতে হিজবুল্লাহর একাধিক কমান্ড সেন্টার ও রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংসসহ বেশ কিছু প্রতিরোধ যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যরাতের পর থেকে শুরু হওয়া এই ইসরাইলি বিমান হামলার কারণে বহু এলাকায় হতাহতদের উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত অনেক বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা থাকলেও ইসরাইল এই চুক্তির অংশ ছিল না। ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের তাদের নিয়ন্ত্রিত বাফার জোন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা ইরান ও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল বলে গণ্য করা হচ্ছে। এই চরম উত্তেজনার জের ধরেই সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। এই চুক্তিটি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যার কারণে ইসরাইলি কট্টরপন্থী নেতারা এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করছেন। ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ইসরাইলি সেনাদের রক্তের বিনিময়ে কোনো মার্কিন চুক্তির তোয়াক্কা করা হবে না এবং পুরো লেবাননকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া উচিত।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান সংঘর্ষে চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৪০১তম ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডর গেদালিয়া বেন সিমহোন (৩২)। দক্ষিণ লেবাননে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় তিনি নিহত হন। একই ঘটনায় আরও তিন ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সেনাবাহিনী। তবে তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহত বাকি তিন সেনার নাম পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। চলমান লড়াইয়ে উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। এদিকে সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও সীমান্ত অঞ্চলে সামরিক অভিযান ও সংঘর্ষ থামেনি। ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ইরান ও লেবাননকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহায়তার অংশ হিসেবে বেইজিং এই সহায়তা প্রদান করবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান রাজধানী বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ে চীন গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চীন ইরান ও লেবাননকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশ দুটির জনগণকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহায়তা করার পাশাপাশি অর্থনীতি ও জীবিকার উন্নয়নে সহযোগিতা করা হবে।” চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এই সহায়তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র মানবিক সংকট মোকাবিলা নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠন কার্যক্রমকে সহায়তা করা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো তেহরানের জন্য মানবিক সহায়তা ঘোষণা করল বেইজিং। এর আগে মার্চ মাসেও চীন ইরানের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছিল। এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন সমঝোতার আলোচনা চলছে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের অবসান ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। চীনের এই সহায়তা ঘোষণাকে বিশ্লেষকরা যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বেইজিংয়ের সক্রিয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। নতুন করে একাধিক ড্রোন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এ ঘটনার পর ইসরাইলকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার (১৭ জুন) লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ গভর্নরেটে একাধিক হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। হামলাগুলো সংঘটিত হয় এমন এক সময়ে, যখন অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা চলছে। লেবাননের জাতীয় বার্তাসংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, মাইফাদুন এলাকায় দুটি গাড়িকে লক্ষ্য করে পৃথক ড্রোন হামলা চালানো হয়। একই সময়ে শৌকিন গ্রামেও একটি গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। তবে নিহতদের পরিচয় এবং তারা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা আলোচনার পুরো সময়জুড়ে তেহরান বারবার বলে এসেছে, যে কোনো যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। যদিও দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সম্প্রতি দাবি করেন, চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সংঘাতের সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বাস্তবে দক্ষিণ লেবাননে নতুন হামলার ঘটনায় সেই প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক সমন্বয় কেন্দ্র খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে ইসরাইলকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত রয়েছে। এদিকে লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মুহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ। আলোচনায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে ইসরাইলকে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে এবং দখল করা অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ঘোষণার পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের নিরাপত্তা নীতি এবং সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে। এ অবস্থায় অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা এগোলেও মাঠের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। ফলে সংঘাত পুনরায় বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইরান তাদের আশ্বস্ত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনায় লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও দক্ষিণ লেবাননের সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত।
তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক একটি চুক্তির মাধ্যমে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তির তোয়াক্কা না করে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল তাদের সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি এমন একটি হামলায় চারজনের প্রাণহানির পর এবার তেল আবিবকে অত্যন্ত কড়া জবাব দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড 'খাতাম আল-আনবিয়া' ইসরায়েলের এই অব্যাহত আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, "জায়োনিস্ট শাসকগোষ্ঠীর শিশু হত্যাকারী সেনাবাহিনী যদি দক্ষিণ লেবাননে তাদের এই আগ্রাসী ও বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ না করে, তবে তাদের জন্য ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও চরম পরিণতি অপেক্ষা করছে।" বিবৃতিতে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধ অবসানের ওই চুক্তি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল লেবাননে অন্তত "৮৪ বার" যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া সমঝোতা চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও চরম উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।