ওমানের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি একটি বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাঙ্কারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হামলার পর জাহাজটি নিরাপদে তার গন্তব্যের দিকে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে এবং এতে কোনো ক্রু সদস্য আহত হননি। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) জানায়, ওমান উপকূলের পোর্ট বো এলাকার কাছ থেকে প্রায় ছয় নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থানকালে ট্যাঙ্কারটিকে লক্ষ্য করে একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এটি জাহাজটির সামনের অংশে আঘাত হানে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় জানায়, হামলার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং জাহাজের সকল নাবিক নিরাপদ রয়েছেন। একই সঙ্গে তারা নিশ্চিত করে যে, হামলার কারণে সমুদ্রে কোনো তেল বা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশগত ক্ষতি হয়নি। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ট্যাঙ্কারটি তার নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে হামলার পেছনে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পর আন্তর্জাতিক নৌ কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। পাশাপাশি ওই সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো তৎপরতা দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে।
সাম্য, ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখে উদ্যাপিত মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবটি বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সারা দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। ঈদুল ফিতরের মতো এ ঈদে চাঁদ দেখার অপেক্ষা থাকে না। নির্ধারিত তারিখ জানা থাকায় আগেভাগেই শুরু হয় প্রস্তুতি। পশু কেনা, কোরবানির আয়োজন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের জন্য গ্রামে ফেরা, সবকিছুই সম্পন্ন করেন মানুষ আগে থেকেই। এবারের ঈদ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাওরের ফসলহানি, হাম রোগে শিশু মৃত্যুর ঘটনা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। আয়-ব্যয়ের টানাপোড়েনের মধ্যেও মানুষ উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রস্তুত হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলনের আনন্দেই খুঁজে নেওয়া হচ্ছে স্বস্তির মুহূর্ত। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, "ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুস্রা ঈদ কোরবানি দে কোরবানি দে শোন্ খোদার ফর্মান তাকিদ।" দেশজুড়ে ঈদের জামাতে অংশ নিতে ভোর থেকেই মুসল্লিদের ভিড় দেখা গেছে মসজিদ ও ঈদগাহগুলোতে। নতুন অথবা পরিষ্কার পোশাক পরে, সুগন্ধি মেখে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করছেন। নামাজ শেষে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বার্তা। ঈদুল আজহার মূল অনুষঙ্গ কোরবানি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সামর্থ্যবান মুসলমানরা পশু কোরবানি করেন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমার ঈদগাহের কাছে না আসে।” বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে দুম্বা, ভেড়া ও উট কোরবানির প্রচলন রয়েছে। এ অঞ্চলে অতীতে ছাগল কোরবানির প্রচলন বেশি থাকায় ঈদুল আজহা ‘বকরিদ’ নামেও পরিচিত ছিল। দেশভাগের পর গরু কোরবানির হার ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। ইসলামে কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রেও মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়ের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোরবানিদাতা নিজের জন্য এক অংশ রেখে বাকি অংশ আত্মীয়স্বজন ও অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। এর মাধ্যমে সমাজে সাম্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঈদুল আজহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অনন্য আত্মত্যাগের ঘটনা। মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে পুত্রকে কোরবানি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। পরে আল্লাহর ইচ্ছায় হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। সেই ঘটনার স্মৃতিতেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি করেন। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং মনের ভেতরের লোভ-লালসা ও কুপ্রবৃত্তিকে দমন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। পবিত্র কোরআনের সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর মাংস বা রক্ত পৌঁছায় না, পৌঁছে মানুষের তাকওয়া। রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৮টায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে মোট পাঁচটি ঈদের জামাতের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম জামাত সকাল ৭টায় এবং পরবর্তী জামাতগুলো সকাল ৮টা, ৯টা, ১০টা ও বেলা পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর বাইরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ এবং দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ময়দানেও বৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা এসব জামাতে অংশ নিতে সমবেত হয়েছেন। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের দিন রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। তুলনামূলকভাবে শুষ্ক থাকতে পারে খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঈদুল আজহা ত্যাগ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের দ্বারে এসেছে। তিনি আল্লাহর কাছে দেশ, জাতি ও সমগ্র মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কামনা করেন। ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদমাধ্যমগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ আয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে বিশেষ খাবার পরিবেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পবিত্র হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা আরাফাতের ময়দানে লাখো হাজির উপস্থিতিতে হজের খুতবা দিয়েছেন মসজিদে নববির ইমাম শেখ আলী আল-হুদাইফি। মঙ্গলবার মসজিদে নামিরা থেকে দেওয়া এই খুতবায় তিনি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির জন্য আহ্বান জানান। মরুর তীব্র গরমের মধ্যেই এদিন আরাফাতের ময়দানে হাজিরা একত্রিত হন। প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও লাখো মুসল্লি নামাজ আদায় ও ইবাদতে অংশ নেন। খুতবা শেষে শেখ আল-হুদাইফি আবেগঘন মোনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি হাজিদের হজ কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও শান্তি এবং হাজিদের নিরাপদে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্যও প্রার্থনা জানান। মোনাজাতে তিনি বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি মুসলিমদের অবস্থার উন্নতি করুন। তাঁদের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে দিন এবং তাঁদের সত্যের পথে পরিচালিত করুন।” সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, খুতবায় শেখ আল-হুদাইফি হজের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, হজ ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ। এর ভিত্তি হলো আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। তিনি বলেন, হজ বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের মুসলিমদের মধ্যে পরিচিতি, সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও ঐক্যের গুরুত্বপূর্ণ মিলনমঞ্চ। খুতবায় তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, তাকওয়ার গুরুত্ব এবং মুমিনদের জন্য আল্লাহর সাহায্যের বিষয়েও আলোচনা করেন। একই সঙ্গে উত্তম আচরণ ও সত্য কথা বলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শেখ আল-হুদাইফি হাজিদের গুনাহ, ঝগড়া-বিবাদ এবং রাজনৈতিক বা দলীয় স্লোগান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ভোর থেকেই হাজিরা মক্কার নিকটবর্তী ৭০ মিটার উঁচু জাবালে রহমতে সমবেত হন। সাদা ইহরাম পরিহিত অবস্থায় তারা পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় অংশ নেন। প্রায় ১৪০০ বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই পাহাড়েই বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। এসপিএ জানায়, খুতবা শেষে হাজিরা সুন্নাহ অনুযায়ী জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে কসর করে আদায় করেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মসজিদে নামিরা ইসলাম ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর একটি। কারণ, এই স্থানেই মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণ প্রদান করেছিলেন। নামিরা পাহাড়ের নামানুসারে মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে। আরাফাতের ময়দানের উত্তরে অবস্থিত এই মসজিদ মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে। মিন, আরাফাত ও মুজদালিফার মধ্যে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। সৌদি আরবের পরিবহন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক সংস্থা মক্কা জেনারেল ট্রান্সপোর্ট সেন্টার জানিয়েছে, সকাল ৭টা ৫৬ মিনিটের মধ্যেই হাজিদের আরাফাতে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম শেষ হয়। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দুই ঘণ্টা আগেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। হাজিদের যাতায়াতে শাটল বাস, সাধারণ যানবাহন এবং আল মাশায়ের আল মুকাদ্দাসাহ মেট্রোরেল ব্যবহার করা হয়।
সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ৮ জিলহজ থেকে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। হজ আদায়ের জন্য চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৫ লাখের বেশি মুসলিম মক্কায় সমবেত হয়েছেন। জীবনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য অন্তত একবার হজ আদায় ফরজ, যা অধিকাংশ মুসলিমের জীবনের অন্যতম বড় আকাঙ্ক্ষা। হজের আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত পাঁচ দিনে সম্পন্ন হয়। এ সময় হাজিরা পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত করেন এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন, যা তওয়াফ নামে পরিচিত। কাবা কী কাবা আরবি শব্দ, যার অর্থ ঘনক বা চতুষ্কোণ ঘর। এটি ইসলামের পবিত্রতম স্থান এবং মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। বিশ্বের সব মুসলিম নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ান, যাকে কিবলা বলা হয়। ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থেকেও মুসলিমরা একই কেন্দ্রের দিকে মুখ করে ইবাদত করেন। কাবা শরিফের উচ্চতা ১৩ দশমিক ১ মিটার, দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৮ মিটার এবং প্রস্থ ১১ দশমিক ৩ মিটার। কাবার ইতিহাস মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কাবা নির্মাণ করেন। পবিত্র কোরআনে এই নির্মাণের উল্লেখ রয়েছে। ইসলামের আগমনের আগে কাবা ছিল বিভিন্ন গোত্রের উপাসনালয়। ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবার ভেতরের মূর্তিগুলো অপসারণ করেন এবং একে এক আল্লাহর ইবাদতের স্থানে পরিণত করেন। প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মুসলিম এখানে সমবেত হন। কাবার ভেতরে কী আছে কাবা শরিফের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি সোনার দরজা রয়েছে, যা মাটি থেকে দুই মিটারেরও বেশি উঁচুতে স্থাপন করা। প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি এই দরজার উচ্চতা ৩ দশমিক ১ মিটার এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৯ মিটার। বছরে সাধারণত দুইবার কাবার ভেতর পরিষ্কারের জন্য দরজা খোলা হয়। ভেতরের অংশ অত্যন্ত সরল। ছাদ ধরে রাখতে তিনটি কাঠের স্তম্ভ রয়েছে এবং ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি আছে। মেঝে ও দেয়াল মার্বেল পাথরে আবৃত এবং ছাদ থেকে লণ্ঠন ঝোলানো থাকে। ভেতরের দেয়ালের কিছু অংশ কাপড়ে ঢাকা, যা ঐতিহাসিকভাবে লাল, সবুজ ও গাঢ় নীল রঙের হয়ে থাকে। কিসওয়া কী কিসওয়া হলো কালো রেশমি কাপড়, যা কাবা শরিফকে আবৃত করে রাখে। এর ওপর সোনার সুতা দিয়ে পবিত্র কোরআনের আয়াত খচিত থাকে। আরবি শব্দ ‘কিসওয়া’ অর্থ আবরণ বা ঢেকে রাখা। বর্তমানে একটি কিসওয়া তৈরিতে প্রায় ৬৭০ কেজি রেশম ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে ২৪ ক্যারেট সোনার সুতা এবং রুপার সুতা দিয়ে কারুকাজ করা হয়। পুরো কাপড়টি ৪৭টি অংশে তৈরি এবং এর উচ্চতা প্রায় ১৪ মিটার। কাবার দেয়ালের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উচ্চতায় যে অলংকৃত বেল্ট থাকে, সেটি হিজাম নামে পরিচিত। দরজার ওপর ঝোলানো সুসজ্জিত পর্দাকে বলা হয় সিতারা। কেন কাবা ঢেকে রাখা হয় কাবা শরিফকে সুরক্ষা, সম্মান এবং সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য কিসওয়া দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ঐতিহাসিকভাবে এটি ভক্তি ও শ্রদ্ধার একটি প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। ধারণা করা হয়, ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই কাবা ঢাকার প্রচলন শুরু হয়। কেউ কেউ মনে করেন, ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আস’আদ কামিল প্রথম কাবা ঢেকেছিলেন। অন্য মত অনুযায়ী, হজরত ইসমাইল (আ.) এ কাজ শুরু করেন, যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বর্তমানে কিসওয়া প্রাকৃতিক রেশম দিয়ে তৈরি করা হয়। রেশম প্রথমে বিশেষভাবে পরিষ্কার করে ধোয়া হয়, এরপর গরম পানিতে ধুয়ে প্রাকৃতিক রং ফিরিয়ে আনা হয় এবং শেষে কালো রঙে রঞ্জিত করা হয়। মক্কার বিশেষ কারখানায় ২৪০ জনের বেশি দক্ষ কর্মী আধুনিক প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সমন্বয়ে এটি তৈরি করেন। একটি কিসওয়া তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় আড়াই কোটি সৌদি রিয়াল। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিসওয়ার রঙ পরিবর্তিত হয়েছে। সাদা, সবুজ, হলুদসহ নানা রঙ ব্যবহার করা হলেও আব্বাসীয় আমলে কালো রঙকে স্থায়ী পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিসওয়া বছরে একবার পরিবর্তন করা হয়। পুরোনো কিসওয়া সরিয়ে নতুনটি পরানো হয়। পুরোনো কিসওয়ার মূল্যবান অংশ সংরক্ষণ করা হয় এবং কিছু অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দেওয়া হয়। হজের সময় কিসওয়ার নিচের অংশ ওপরে তুলে রাখা হয়, যাতে বিপুলসংখ্যক হাজির স্পর্শ থেকে কাপড়টি সুরক্ষিত থাকে।
ইসলামে মক্কা ও মদিনা কেবল ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থান নয়, বরং ইবাদত ও দোয়া কবুলের বিশেষ বরকতময় নগরী হিসেবে পরিচিত। কোরআন ও হাদিসে এই দুই পবিত্র নগরীর নির্দিষ্ট কিছু স্থান ও সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা অত্যধিক বলে বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে উল্লেখিত ১০টি বিশেষ স্থান তুলে ধরা হলো- ১. মসজিদুল হারাম মক্কার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মসজিদুল হারামে এক রাকাত নামাজ অন্য মসজিদে এক লাখ রাকাতের সমান বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। ইবাদতের এই মহা মর্যাদাপূর্ণ স্থানে দোয়ার গুরুত্বও অত্যধিক। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪০৬) ২. তাওয়াফের সময় কাবা শরিফকে ঘিরে তাওয়াফের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নবীজি (সা.) দোয়া করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৮৯২) ৩. মুলতাজাম কাবা শরিফের দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানকে মুলতাজাম বলা হয়। এখানে নবীজি (সা.) বুক লাগিয়ে দোয়া করেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে। সাহাবিরাও এই স্থানে দোয়া করতেন। (বাইহাকি, শুয়াবুল ইমান, হাদিস: ৩৭৬৭) ৪. সাফা ও মারওয়া হজ ও ওমরাহর গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাফা-মারওয়া সাঈ। নবীজি (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দীর্ঘ দোয়া করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮) ৫. আরাফার দিন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান হজের অন্যতম প্রধান রুকন। হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনের দোয়া সবচেয়ে উত্তম দোয়া। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৮৫) ৬. মুজদালিফা আরাফাত থেকে ফেরার পর হাজিরা মুজদালিফায় রাত যাপন করেন, যা ‘মাশআরুল হারাম’ নামে পরিচিত। এখানে ফজরের পর দীর্ঘ সময় দোয়া করার বর্ণনা রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮) ৭. মিনা প্রান্তর মিনায় জামারাতে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের পর দোয়া করা সুন্নত। নবীজি (সা.) প্রথম ও মধ্যম জামারাতে পাথর নিক্ষেপের পর দীর্ঘক্ষণ দোয়া করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৫২) ৮. জমজমের পানি জমজম কূপের পানি ইসলামে বরকতময় নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত। হাদিসে বলা হয়েছে, জমজম যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, আল্লাহ তা পূরণ করেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩০৬২) ৯. মাকামে ইবরাহিম কাবা নির্মাণের সময় হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দাঁড়ানোর পাথরকে মাকামে ইবরাহিম বলা হয়। এখানে নামাজ আদায় ও দোয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২৫) ১০. রিয়াজুল জান্নাহ ও মসজিদে নববি মদিনায় নবীজি (সা.)-এর রওজা ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানকে রিয়াজুল জান্নাহ বলা হয়, যা বিশেষ ফজিলতের স্থান হিসেবে পরিচিত। পুরো মসজিদে নববিতেই ইবাদত ও দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩৩৫)
পবিত্র হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ‘ওকুফে আরাফাহ’ পালনে মঙ্গলবার (তারিখ উল্লেখিত নয়) সৌদি আরবের আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লাখো মুসল্লি। মিনা থেকে যাত্রা করে তারা আরাফাতে পৌঁছে দিনভর ইবাদত, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে মশগুল থাকেন। সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১৬ লাখের বেশি হজযাত্রী আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন। জিলহজ মাসের নবম দিনে ফজরের পর থেকেই তাঁরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থান নিতে শুরু করেন। গতকাল মিনায় অবস্থান শেষে হজযাত্রীরা সকালে আরাফাতের উদ্দেশে রওনা হন। পবিত্র এই প্রান্তরে পৌঁছে তাঁরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদত ও আত্মসমীক্ষায় সময় কাটান। হাজিদের কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত হয় তালবিয়া, তাকবির ও দোয়া। আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকে হজের মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই দিনটিকেই হজের পরিপূর্ণতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হয়। দুপুরের দিকে আরাফাতের মসজিদে নামিরা থেকে খুতবা প্রদান করা হবে বলে জানা গেছে। এরপর হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে কসর আদায় করবেন, যা হজের বিশেষ একটি বিধান। হাদিস অনুযায়ী, আরাফাতের দিনে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন। এই বিশ্বাস থেকেই হাজিরা দিনটিকে ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে বিদায় হজের সময় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে ন্যায়বিচার, মানবসমতা ও পারস্পরিক অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আরাফাতের ময়দানের অন্যতম স্থান ‘জাবাল আর-রাহমাহ’ বা রহমতের পাহাড়, যেখানে বহু হাজি দোয়ার জন্য সমবেত হন। বিশ্বাস করা হয়, এটি আদম ও হাওয়ার পুনর্মিলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। হজযাত্রীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা সহায়তা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি সেবা। এ বছর উচ্চ তাপমাত্রার কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হজযাত্রীদের পর্যাপ্ত পানি পান, ছাতা ব্যবহার এবং রোদ এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দিয়েছে। সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত থেকে মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে তাঁরা মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করবেন এবং রাতটি ইবাদত ও বিশ্রামে কাটাবেন। ফজরের পর শয়তানকে প্রতীকীভাবে পাথর নিক্ষেপের জন্য সাতটি পাথর সংগ্রহ করবেন। পরবর্তী ধাপে ১০ জিলহজ মিনায় ফিরে কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং ইহরাম পরিবর্তনের মাধ্যমে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। শেষ দশ রাত যেমন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, তেমনি এই দশ দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় সময় হিসেবে বিবেচিত। সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক, এই সময়ে বিভিন্ন আমলের মাধ্যমে বেশি সওয়াব অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এই বরকতময় দিনগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে আল্লাহর জিকির করার কথা বলা হয়েছে। হজ পালনকারীরা তালবিয়া পাঠ করেন, আর যারা হজে যাননি তারা বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণে সময় কাটাতে উৎসাহিত হন। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে। এ সময় দান-সদকার গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা, সেবা করা কিংবা মানুষের উপকারে আসা কাজও সদকার অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে বা গোপনে আল্লাহর পথে ব্যয়কারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ পুরস্কার। জিলহজের নবম দিন, অর্থাৎ আরাফার দিনে রোজা রাখাকে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রোজা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। এই সময় নফল ইবাদত হিসেবে চাশতের নামাজ আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সূর্যোদয় থেকে জোহরের আগ পর্যন্ত অন্তত দুই রাকাত নামাজ আদায়কে উৎসাহিত করা হয়। এছাড়া পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা, উপহার বিনিময় এবং ভালো আচরণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আরাফার দিন বিশেষ দোয়ার গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সামর্থ্য থাকলে হজ পালনকে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। কোরবানির বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি করা এবং এর মাংস দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার মাধ্যমে ত্যাগ ও সহমর্মিতার শিক্ষা পাওয়া যায়। এ সময় পরিবার ও সমাজে ভালো কাজের আহ্বান জানানো এবং অন্যদের উৎসাহিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরপুরুষ বা গায়েরে মাহরামের সামনে পর্দা করার ক্ষেত্রে নারীরা মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি খোলা রাখতে পারবেন কি না, এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় তিনি এই বিষয়ে আলেমদের মতভেদ এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা তুলে ধরেন। শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নারীদের বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। অনেক মুফাসসিরের মতে, পর্দার জন্য যে পোশাক পরা হয় তার বাইরের অংশটুকু প্রকাশ হওয়া স্বাভাবিক। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, মুখমণ্ডল পর্দার অন্তর্ভুক্ত। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মানুষের সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্র হলো তার মুখমণ্ডল। সেটি খোলা থাকলে সৌন্দর্য আবৃত করার ঐশী নির্দেশ পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিপালিত হয় না। হজরত আয়েশা (রা.)-এর হজের সফরের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, আম্মাজান আয়েশা (রা.) কোনো গায়েরে মাহরাম পুরুষকে আসতে দেখলে মাথার কাপড় টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, মুখমণ্ডল পর্দারই অংশ। তিনি আরও বলেন, প্রাচীন আমলের আলেমদের কেউ কেউ মুখমণ্ডল খোলা রাখার কথা বললেও বর্তমানে হিজাব পরার যে ঢং—যেখানে মুখমণ্ডলকে আলাদা করে প্রদর্শন করা হয়—তা পর্দার প্রকৃত সীমানার মধ্যে পড়ে না। শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, মুখমণ্ডল ঢেকে রাখাই অধিকতর নিরাপদ ও অগ্রগণ্য মত। তবে প্রাচীন আলেমদের ‘খোলা রাখা জায়েজ’ বলার অর্থ এই নয় যে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা যাবে; বরং সেটি পর্দার বিশেষ পরিস্থিতির আলোকে বলা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে হিজাবের মাধ্যমে সৌন্দর্য প্রদর্শনের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা পর্দার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের অভিজ্ঞতা আরও সহজ ও সমৃদ্ধ করতে এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সৌদি আরব। মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ (মসজিদুল হারাম) এবং মদিনার মসজিদে নববীতে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক বহুভাষিক ‘ইন্টারক্টিভ স্মার্ট স্ক্রিন’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত এই স্ক্রিনগুলো হজযাত্রীদের ডিজিটাল গাইড হিসেবে কাজ করবে। সৌদি আরবের ‘প্রেসিডেন্সি অফ রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স’ জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো হাজিদের কথা চিন্তা করে এই স্ক্রিনগুলোতে ৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ভাষা যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে হজযাত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় তথ্য, কোরআনের ডিজিটাল সংস্করণ এবং হজের বিভিন্ন নিয়মাবলী সম্পর্কে জানতে পারবেন। স্মার্ট স্ক্রিনের বিশেষত্ব: ১. নির্ভুল নির্দেশনা: হজযাত্রীরা যেকোনো বিভ্রান্তি এড়াতে এই স্ক্রিন থেকে সরাসরি নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে পারবেন। ২. সহজ নেভিগেশন: বিশাল এলাকায় হারিয়ে যাওয়া রোধে এবং যাতায়াতের সঠিক পথ খুঁজে পেতে এই ডিজিটাল ম্যাপ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ৩. ডিজিটাল লাইব্রেরি: স্ক্রিনগুলোতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে হাজিরা মোবাইলেই ডাউনলোড করতে পারবেন বিভিন্ন দরকারি ইসলামিক বই ও দোয়া। ৪. নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা: মক্কার নারী প্রার্থনা এলাকাগুলোতেও আলাদাভাবে এই স্মার্ট স্ক্রিনগুলো স্থাপন করা হয়েছে যাতে নারী হজযাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে তথ্য সেবা পেতে পারেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যেই এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব আনা হয়েছে। এর ফলে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ার পাশাপাশি হজযাত্রীরা কোনো সাহায্যকারী ছাড়াই নিজের ভাষায় সবকিছু বুঝে নিতে পারবেন।
ভারতের উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে একটি পুরোনো মসজিদ উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্টেশন পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের কারণ দেখিয়ে 'সংমরমার মসজিদ' নামক প্রায় ৭৬ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ সরিয়ে ফেলার নোটিশ জারি করেছে। আগামী ২৭ এপ্রিলের মধ্যে মসজিদটি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, মসজিদটি রেলের মালিকানাধীন জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত এবং এটি স্টেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। তারা সতর্ক করে বলেছে যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মসজিদটি সরানো না হলে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে এবং এর খরচ মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছ থেকে আদায় করা হবে। অন্যদিকে, মসজিদ কমিটি রেলওয়ের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, মসজিদটি একটি নিবন্ধিত 'ওয়াকফ' সম্পত্তি এবং ১৯৫০ সাল থেকে এর দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। এমনকি ১৯৬১ সালে মসজিদটির সংস্কার কাজও করা হয়েছিল। মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে এই নোটিশ দিয়েছে। তারা ইতোমধ্যে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং এই উচ্ছেদ আদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশে গত কয়েক বছরে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উপাসনালয় এবং স্থাপনা উচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকরা এই ধরণের পদক্ষেপে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আপাতত বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন থাকায় পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে আছে উভয় পক্ষ।
ইসলাম ধর্মে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, যাকে সপ্তাহের ‘ঈদের দিন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই দিনের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদিকে এই দিনটি উপহার দিয়ে ধন্য করেছেন। জুমার দিনেই হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে এবং এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। জুমার দিনের বরকত লাভে মুসলিমদের জন্য কিছু বিশেষ আমলের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: জুমার নামাজ আদায়: এটি গুনাহ মাফের অন্যতম বড় মাধ্যম। এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সময়ের সগিরা গুনাহগুলো এর মাধ্যমে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। দ্রুত মসজিদে গমন: জুমার নামাজের জন্য আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা: ইমাম যখন খুতবা প্রদান করেন, তখন কোনো কথা না বলে মনোযোগ সহকারে তা শোনা ওয়াজিব বা আবশ্যক। সুরা কাহাফ তিলাওয়াত: জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করলে দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়টি পাঠকের জন্য নূর বা আলোকবর্তিকা হয়ে থাকে। অধিক হারে দরুদ পাঠ ও দোয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এবং দোয়া করা জুমার দিনের শ্রেষ্ঠ আমলগুলোর একটি। বিশেষ করে আসরের পরের সময়টিতে দোয়া কবুলের এক বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে। জুমার দিনের এই ইবাদত ও আমলগুলো পালনের মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অর্জন করতে পারেন।
চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমকে সামনে রেখে অননুমোদিতভাবে হজ পালন ও এতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যথাযথ পারমিট ছাড়া হজের চেষ্টা করলে বা সহায়তা করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল ২০২৬) থেকে শুরু হয়ে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ পারমিট ছাড়া হজ পালনের চেষ্টা করলে বা মক্কার পবিত্র স্থানগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করলে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে সেসব ভিজিট ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও, যারা নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করে মক্কায় অবস্থান করবেন। অননুমোদিত হজে সহায়তাকারীদের জন্য শাস্তির মাত্রা আরও ভয়াবহ। যারা অবৈধভাবে ভিসা তৈরি, পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা হোটেল ও বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন, তাদের সর্বোচ্চ ১ লাখ রিয়াল জরিমানা গুণতে হবে। অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই জরিমানার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন জব্দ করারও নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে এবং পরবর্তী ১০ বছরের জন্য তাদের সৌদি আরবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। হজের পবিত্রতা রক্ষা এবং হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সূত্র: খালিজ টাইমস
স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত স্পষ্ট ভারসাম্য রক্ষা করেছে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, পুত্রবধূর জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা সরাসরি ‘ফরজ’ বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নয় এবং এটি না করলে তিনি গুনাহগার হবেন না। তবে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের স্বার্থে নৈতিক ও দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে এই দায়িত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। শরীয়ত অনুযায়ী, বাবা-মায়ের খেদমত ও ভরণ-পোষণের মূল দায়িত্ব সরাসরি সন্তানের (স্বামীর) ওপর বর্তায়। ফলে স্বামী তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক বাবা-মায়ের খেদমতে বাধ্য করতে পারেন না। তবে সুখী দাম্পত্যের ভিত্তি কেবল ‘ফরজ’ বা আইনি মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি গড়ে ওঠে পারস্পরিক ত্যাগ ও সহানুভূতির ওপর। স্বামী যেমন স্ত্রীর জন্য অনেক কাজ করেন যা তার ওপর ফরজ নয়, তেমনি স্ত্রীরও উচিত স্বামীর বাবা-মাকে নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান করা। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ আব্দুস সালাম চাটগামীর ফতোয়া অনুযায়ী, মানবিক সহানুভূতি ও উত্তম আচরণের (হুসনে মু‘আশারাত) দাবি হিসেবে পুত্রবধূর উচিত শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা। বিশেষ করে শাশুড়ি ও শ্বশুরের হৃদয় জয় করা দাম্পত্য জীবনের প্রশান্তির অন্যতম চাবিকাঠি। তবে সেই খেদমত অবশ্যই স্ত্রীর সক্ষমতা এবং শরিয়তের সীমানার মধ্যে হতে হবে। একইভাবে সংসারে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে শ্বশুর-শাশুড়িরও বিশেষ ভূমিকা পালনের নির্দেশ রয়েছে। তাদের কর্তব্য হলো পুত্রবধূকে কন্যার মর্যাদা দেওয়া, তাকে সম্মান করা এবং তার সুখ-দুঃখে শরিক হওয়া। উভয় পক্ষ যদি কেবল অধিকারের দাবি না তুলে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের মনোভাব পোষণ করে, তবেই একটি সুন্দর ও আদর্শ পরিবার গঠন সম্ভব।
মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে উট ‘কাসওয়া’ কেবল যাতায়াতের বাহন ছিলেন না, বরং নবুয়তের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। হিজরতের সময় মক্কা থেকে মদিনায় যাত্রাপথে কাসওয়া নবীজির (সা.) সঙ্গে ছিলেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর সাহাবিরা প্রতিযোগিতা শুরু করেছিলেন, নবীজি (সা.) কার বাড়িতে অবস্থান করবেন। তখন তিনি বলেছিলেন, “উটকে ছেড়ে দাও, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট।” কাসওয়া হিজরতের সময় মদিনার একটি খালি জায়গায় বসে পড়ে, যেখানে পরবর্তীতে মসজিদে নববী নির্মিত হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, কাসওয়ার গতিবিধিও আল্লাহর বিশেষ ইশারার অধীনে ছিল। হোদাইবিয়ার সন্ধিতেও কাসওয়া অলৌকিক আচরণ দেখায়। মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছানোর পর হঠাৎ বসে যায়। সাহাবিরা মনে করলেন, ‘উট ক্লান্ত হয়ে গেছে’, কিন্তু নবীজি (সা.) ব্যাখ্যা করলেন, “কাসওয়া ক্লান্ত হয়নি; বরং আল্লাহ তাকে থামিয়েছেন।” এই ঘটনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক হোদাইবিয়ার সন্ধি সম্পন্ন হয়। নবীজি (সা.) কাসওয়ার প্রতি সদয় ও যত্নশীল ছিলেন। তিনি উটটিকে পর্যাপ্ত খাবার এবং বিশ্রাম দিতেন। নবীজির (সা.) ইন্তেকালের পর কাসওয়া শোকাহত হয়ে খাবার ও পানি গ্রহণ বন্ধ করে এবং কয়েক দিনের মধ্যে মারা যায়। সাহাবিরাও কাসওয়াকে কেবল পশু হিসেবে নয়, বরং নবীজির ছায়াসঙ্গী এবং আল্লাহর নির্দেশের বাহক হিসেবে সম্মান করতেন। বদর যুদ্ধে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কাসওয়া নবীজির সঙ্গে ছিল। মুসলিম উম্মাহর জন্য কাসওয়ার জীবন শিক্ষা দেয়-আল্লাহর সিদ্ধান্তে পূর্ণ আস্থা রাখা এবং নবীজির জীবনাচারের প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুষঙ্গের গুরুত্ব বোঝার এক জীবন্ত উদাহরণ।
নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠ করার পর দরূদ পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল যা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিংবা মতান্তরে ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়। সাধারণত নামাজের মধ্যে দরূদে ইবরাহিম পাঠ করা অধিক উত্তম কারণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে এটি বিশেষভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। তবে অনেকেরই এই বিশেষ দরূদটি পুরোপুরি মুখস্থ না থাকায় তারা কেবল ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ পাঠ করেন এবং এতে নামাজ হবে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। ইসলামি ফকিহ ও আলেমদের মতে নামাজের শেষ বৈঠকে যেকোনো স্বীকৃত ও সঠিক দরূদ পাঠ করলেই নামাজের এই সুন্নাতটি পুরোপুরি আদায় হয়ে যাবে। বিখ্যাত আলেম ইবনে হাজার হাইতামি রহ. ও হানাফি ফকিহগণের বক্তব্য অনুযায়ী দরূদে ইবরাহিম সর্বোত্তম হলেও অন্য যেকোনো শব্দে দরূদ পড়লে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না। যেহেতু ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ একটি স্বীকৃত ও পূর্ণাঙ্গ দরূদ তাই নামাজে এটি পাঠ করাকেও ধর্মীয় আইন অনুযায়ী যথেষ্ট বলে মনে করা হয়। তবে একজন সচেতন মুসলিমের জন্য নামাজের প্রতিটি দোয়া ও বিশেষ করে দরূদে ইবরাহিম সহিহভাবে শিখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ও ভাগ্যের বিষয়। ইবাদতের পূর্ণ সওয়াব ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দরূদে ইবরাহিম মুখস্থ না থাকলে তা অবহেলা না করে দ্রুত মুখস্থ করে নেওয়া প্রত্যেক মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব। ধর্মীয় এই বিধানটি সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে নামাজের একাগ্রতা বাড়ে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। নামাজ, দরূদে ইবরাহিম, ইসলাম ও জীবন, নামাজের দোয়া, মাসয়ালা, দরূদ পাঠের নিয়ম, ইসলামি প্রশ্ন উত্তর, ইবাদত, নামাজের বিধান, সুন্নাত, রাসূলের দরূদ, নামাজের মাসায়েল, ইসলামি শিক্ষা, ধর্মীয় জিজ্ঞাসা, নামাজের ফজিলত।
বাংলাদেশি হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের সেবার মান বাড়াতে এবং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রী ড. তৌফিক বিন ফাউজান আল রাবিয়াহর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)। সোমবার (৩০ মার্চ) সৌদির স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় মদিনার কিং সালমান আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ধর্মমন্ত্রী সৌদি আরবের আধুনিক হজ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হাজিদের কল্যাণে একটি লিখিত প্রস্তাবনা সৌদি মন্ত্রীর নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে, যা আগামীতে ওমরাহ ও হজ পালনে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তৃতীয় ওমরাহ ও ভিজিট ফোরামে যোগদানের জন্য বর্তমানে সৌদি আরব অবস্থান করছেন বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রী। বৈঠকে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনা শেষে উভয় পক্ষ একে অপরকে সৌজন্য উপহার প্রদান করেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের ধর্মীয় ও কূটনৈতিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার হজ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রম সুসংহত করতে ২৫ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করেছে। রোববার (২৯ মার্চ) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কমিটির সভাপতি হয়েছেন ধর্মমন্ত্রী। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগ প্রধানকে সদস্য-সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। কমিটিতে আরও রয়েছেন জনপ্রশাসন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, অর্থ সচিব, বিমান সচিব, তথ্য সচিব, গৃহায়ন সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, নৌসচিব, ধর্ম সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব ও স্বাস্থ্যশিক্ষা সচিবসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিটির কার্যপরিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, হজ প্যাকেজ অনুমোদন এবং জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। সরকার আশা করছে, কমিটির মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও প্রভাবশালী হবে, যাতে প্রতিটি যাত্রী নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে হজ পালন করতে পারেন।
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা—আনন্দ, সম্প্রীতি ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ। তবে এই আনন্দঘন দিনে ইসলামের নির্ধারিত কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে, যা মেনে চলা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের দিনে করণীয় ঈদের দিনটি শুরু হয় পবিত্রতা ও ইবাদতের মাধ্যমে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী- গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: ঈদের সকালে গোসল করা সুন্নাত। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। তাকবির পাঠ: ঈদের দিন বেশি বেশি তাকবির পড়া সুন্নাত। এটি আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। উত্তম পোশাক পরিধান: সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন বা পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরা উচিত। এটি আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ। তাকওয়া অর্জন: বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আত্মিক পবিত্রতা বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঈদুল ফিতরের আগে খাওয়া: ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে বিজোড় সংখ্যক খেজুর খাওয়া সুন্নাত। ফিতরা আদায়: ঈদের নামাজের আগে ফিতরা প্রদান করা জরুরি, যাতে অসহায় মানুষেরাও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে। ঈদগাহে যাওয়া: সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া এবং ভিন্ন পথে ফিরে আসা সুন্নাত। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া: ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শুভেচ্ছা বিনিময়: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ বলে পরস্পর শুভেচ্ছা জানানো উত্তম আমল। ঈদের দিনে যা করবেন না ঈদের আনন্দ যেন ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি- ঈদের দিনে রোজা রাখা: সম্পূর্ণ হারাম। মুহাম্মদ (সা.) এই দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। অপ্রয়োজনীয় নফল নামাজ: ঈদের নামাজের আগে বা পরে ঈদগাহে কোনো নফল নামাজ আদায় নেই। ইবাদতে অবহেলা: ব্যস্ততার কারণে ঈদের নামাজ অবহেলা করা উচিত নয়। বিদআত ও কুসংস্কার: ধর্মে নেই এমন কাজকে ইবাদত মনে করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অপচয় ও অনৈতিক কাজ: ঈদের আনন্দ যেন অপচয়, জুয়া বা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে পরিণত না হয়। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, ঈদ শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার চর্চারও একটি বড় সুযোগ। তাই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তা শরিয়তের নির্দেশনা মেনে উদযাপন করা হয়।
দেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ফলে আগামীকাল শনিবার (২১ মার্চ) মুসলিমরা উদ্যাপন করবেন পবিত্র ঈদুল ফিতর। আনন্দঘন এই দিনে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঈদগাহসহ বিভিন্ন মসজিদে ২ রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। দীর্ঘ সময় বিরতির কারণে অনেকেই ঈদের নামাজের নিয়ত, নিয়ম এবং তাকবির ভুলে যান। তাই এখানে ঈদের দিন যথাযথভাবে নামাজ পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হলো— ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ত আরবি: نَوَيْتُ أنْ أصَلِّي للهِ تَعَالىَ رَكْعَتَيْنِ صَلَاةِ الْعِيْدِ الْفِطْرِ مَعَ سِتِّ التَكْبِيْرَاتِ وَاجِبُ اللهِ تَعَالَى اِقْتَضَيْتُ بِهَذَا الْاِمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهْةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَر বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকাআতাইন সালাতিল ইদিল ফিতরি মাআ সিত্তাতিত তাকবিরাতি ওয়াজিবুল্লাহি তা’আলা ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমামি মুতাওয়াঝঝিহান ইলা ঝিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার। অর্থ: “আমি ঈদুল ফিতরের ২ রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ৬ তাকবিরের সঙ্গে এই ইমামের পেছনে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর জন্য আদায় করছি — ‘আল্লাহু আকবার।’” ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম ঈমামের তাকরিরে তাহরিমা “আল্লাহু আকবার” বলে হাত বাঁধা শুরু করতে হবে। তাকবিরে তাহরিমার পর ছানা পড়তে হবে: “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়াতাআলা যাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।” এরপর অতিরিক্ত ৩ তাকবির প্রদান করা হবে, প্রথম ও দ্বিতীয় তাকবিরে উভয় হাত তুলে ছেড়ে দিতে হবে। তৃতীয় তাকবিরে হাত তাকবিরে তাহরিমার মতো বাঁধতে হবে। এরপর আউজুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহসহ সুরা ফাতিহা পড়া এবং আরেকটি সুরা সংযোজন করে প্রথম রাকাত সম্পন্ন করতে হবে। দ্বিতীয় রাকাতে একইভাবে বিসমিল্লাহ, ফাতিহা ও আরেকটি সুরা পড়া হবে এবং ৩ অতিরিক্ত তাকবির দেওয়া হবে। তারপর নিয়মিত রুকু-সিজদা সম্পন্ন করে বৈঠকে বসা, তাশাহহুদ, দরূদ ও দোয়া পড়ার মাধ্যমে নামাজ শেষ হবে। নামাজের পর তাকবির ঈদের নামাজের সালাম ফেরানোর পর তাকবির পড়তে হয়। আরবি ও বাংলা উচ্চারণ নিম্নরূপ: আরবি: اَللهُ اَكْبَر اَللهُ اَكْبَر لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَر اَللهُ اَكْبَروَلِلهِ الْحَمْد বাংলা: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া-লিল্লাহিল হামদ্।” এ সময় ইমাম দু’টি খুতবা দেবেন। মুসল্লিদের মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনতে হবে।
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। শুক্রবার সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে এক ফালি রুপালি চাঁদ দেখা মাত্র ঘরে ঘরে বেজে উঠল ঈদের চিরচেনা সুর, ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর আজ শনিবার সারা দেশে উদ্যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এই দিন ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির এক বড় উপলক্ষ। রমজান মাসব্যাপী ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট উপভোগ করে দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা, আজ তার পূর্ণতা পায়। ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে সমাজের সকলের জন্য উৎসব নিশ্চিত করা হয়, যা ঈদের সাম্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ। যাত্রী ও ভ্রমণকারীদের ভিড়ে গত কয়েকদিন ধরেই বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে ছিল তীব্র ব্যস্ততা। দীর্ঘ সময়ের যানজট ও ক্লান্তি আজ ম্লান হয়ে গেছে প্রিয়জনের সঙ্গে পুনর্মিলনের আনন্দে। ঘরে ফিরেই অনুভূত হয় পরিবার ও বাড়ির উষ্ণতা, মায়ের হাসি ও ভাইবোনের খুনসুটি। উৎসবের প্রস্তুতি ও প্রার্থনা রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল, সবখানেই এখন ঈদের আমেজ। পাড়ার দোকানগুলোতে ছিল আতর, টুপি, সেমাই ও চিনি কেনার ভিড়। ভোর থেকেই গৃহিণীরা রান্নাবান্নার শেষ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। রাজধানীর বিউটি পার্লারগুলোয় লম্বা লাইন এবং রাতভর চলছিল মেহেদি আঁকার আয়োজন। দেশের নানা প্রান্তে বসেছে ঈদমেলা, যা চারপাশে আনন্দ ও রঙিন উৎসবের আবহ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাসস জানিয়েছে, দেশের প্রধান ঈদ জামাত সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক ইমামতি করবেন। আবহাওয়া বা অন্যান্য কারণে যদি জাতীয় ঈদগাহে জামাত সম্ভব না হয়, তবে সকাল ৯টায় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি পর্যায়ক্রমিক জামাত সকাল ৭টা থেকে বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। নামাজ শেষে মানুষ একে অপরকে বলবেন “ঈদ মোবারক” এবং কবরস্থানে প্রিয়জনদের রুহের মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করবেন। বিকেলে পরিবারসহ বেড়াতে যাওয়াও ঈদের আনন্দের অংশ। সম্প্রীতি ও আগামীর অঙ্গীকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তারা দেশবাসীর সুখ, সমৃদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, তবে উৎসবের আনন্দে তা প্রভাব ফেলতে পারেনি। সামর্থ্য অনুযায়ী সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই আনন্দকে আরও পূর্ণতা দেবে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর পঙ্ক্তিই আজকের ঈদের মর্ম—“যারা জীবন ভ’রে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী, সেই গরীব, এতিম, মিসকিনে দে যা কিছু মফিদ, ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।” আজকের দিন শুধু আনন্দের নয়, বরং মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকারের প্রতীক। ঈদ যেন সকলের জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও আনন্দ বয়ে আনে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা ও তার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, পারামাট্টা নদীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪৭ বছর বয়সী মওলিক ধান্ধুকিয়া এবং তার ছয় বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সিডনির কনকর্ড এলাকার কাছে একটি নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী কন্যা। কিছু সময় পর নদীতে জরুরি পরিস্থিতির খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। আরও পড়ুন...টেক্সাসে স্বামীর গুলিতে স্ত্রী নিহত, পরে পুলিশের গুলিতে স্বামী নিহত; দুই শিশুকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের কিছু আগে মওলিক ধান্ধুকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিশুটির সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুকন্যার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার তদন্তে সহায়তার জন্য আশপাশের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার রাউস হিলের ক্যাসেলব্রুক ক্রেমেটোরিয়ামে বাবা ও মেয়ের যৌথ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। শোকবার্তায় লেখা হয়েছে, “দুই কোমল ও সদয় আত্মা, যারা চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।” তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে কয়েক দফা নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। একবার তার স্ত্রী প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়াও তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। আরও পড়ুন...টেক্সাসে বিস্ফোরণের আগুনে পুড়েও বাড়ি ও নাতি-নাতনিদের বাঁচালেন এক সাহসী দাদা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে জিমে ব্যায়াম করার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাতের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগা শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তার জীবনের অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমআরআই পরীক্ষায় তার মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশে স্নায়ুর ওপর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মওলিক ধান্ধুকিয়া পেশাগত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি সাউথ ইস্টার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্টে অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এই ঘটনার পর পরিবারটির জন্য সহায়তা তহবিলও গঠন করেছেন স্বজন ও পারিবারিক বন্ধুরা। তহবিল সংগ্রহের আহ্বানে বলা হয়েছে, প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়া একসঙ্গে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ▶️ ট্রাম্পের লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের তহবিলের অর্থ শেষকৃত্যের ব্যয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নিকট আত্মীয়দের যাতায়াত ও আবাসন খাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস্টিন ম্যাকডোনাল্ড ঘটনাটিকে “পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। আমরা সব দিক থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং কোনো সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা হবে না।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে শেষকৃত্যের খবর আরও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে। স্বজন ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।