ব্রেক্সিটের গণভোটের এক দশক পূর্ণ হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি যুক্তরাজ্য। ২০১৬ সালের ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে গণভোটের ফল প্রকাশের পর যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো দেশটির প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি ও জনসেবায় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং এর প্রভাব আগামী বছরগুলোতেও বহাল থাকতে পারে। ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্তিতে জনমতেও পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দেওয়া প্রায় ২৩ শতাংশ ভোটার এখন সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত। কেউ ইউরোপ সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছেন, আবার কেউ মনে করেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, ব্রেক্সিটের ফলে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অর্থাৎ, ব্রেক্সিট না হলে দেশটির অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হতে পারত। এর ফলে সরকারের কর আদায়ও কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবার বাজেটে। লন্ডনের কিংস কলেজের অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক জোনাথন পোর্টেস বলেন, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখন প্রায় স্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে যে ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের গবেষকেরা দুটি পৃথক পদ্ধতিতে ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথম বিশ্লেষণে গত ১০ বছরের প্রবৃদ্ধিকে অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেখানে কোভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, ব্রেক্সিট না হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বড় হতে পারত। দ্বিতীয় বিশ্লেষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে ব্যবসা করা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। এই বিশ্লেষণেও অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ ছোট হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে বাণিজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পর সীমান্তে নতুন কাস্টমস বিধি, অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রশাসনিক জটিলতায় ব্যবসার ব্যয় এবং সময় দুটিই বেড়েছে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্প, কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের এক শুনানিতে এক লজিস্টিকস ব্যবসায়ী জানান, ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপে মাংস রপ্তানিতে একটি কাগজই যথেষ্ট ছিল, অথচ এখন একই পণ্য পাঠাতে প্রয়োজন হয় ২৬টি সরকারি অনুমোদনপত্র। যদিও যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা কার্যকর হলে দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, মাছ ও তাজা মাংস রপ্তানি সহজ হতে পারে। তবে সেটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম। এরই মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় ও জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। ব্রিটেনের ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেশটির খাদ্যপণ্য রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। ব্রেক্সিটের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। কমলার রসের মতো কিছু নিত্যপণ্যের দাম ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দারিদ্র্য বা খাদ্য ব্যাংকের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে শুধু ব্রেক্সিটের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এর পেছনে আরও নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের একমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। বিনিয়োগের ঘাটতি, ধীর প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার সংকট আগে থেকেই ছিল। তবে ব্রেক্সিট এসব সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। জিডিপি কমে যাওয়ার ফলে সরকারের কর রাজস্বও কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবায়। একই সঙ্গে কারাগার ব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতেও আর্থিক চাপ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কারের মাধ্যমে এর প্রভাব কিছুটা কমানো যেতে পারে। অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি থওয়েটসের ভাষায়, বর্তমান ক্ষতির বড় অংশ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতেও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি একই ধরনের চাপে থাকতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু নীতি নিয়ে মন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছিল। কিন্তু আলোচনার বিষয়বস্তুর বাইরে সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয় এক বিশেষ অতিথি। তিনি কোনো রাজনীতিক বা কূটনীতিক নন, মাত্র তিন মাস বয়সী এক শিশু। বৃহস্পতিবার লুক্সেমবার্গে অনুষ্ঠিত ইইউ কাউন্সিলের বৈঠকে নিজের ছেলে অ্যাডামকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন সুইডেনের জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী রোমিনা পোরমোখতারি। ইইউ কাউন্সিলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী পর্যায়ের এমন বৈঠকে কোনো শিশুর অংশগ্রহণের ঘটনা এটিই প্রথম। পোরমোখতারি জানান, কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে নারীদের একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়—এই বার্তা দিতেই তিনি সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কাজ ও পরিবারের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই—এমন একটি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে এর জন্য পরিবারে সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন। ৩০ বছর বয়সী পোরমোখতারি ২০২২ সালে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় সুইডেনের ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী মন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েন। সম্প্রতি মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে তিনি আবার কাজে ফিরেছেন। তার স্বামী বর্তমানে পিতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন এবং আগামী সেপ্টেম্বরে সুইডেনের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এই ছুটি অব্যাহত থাকবে। অ্যাডামের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে লুক্সেমবার্গ সফরে গিয়েছেন। সুইডেনে বিশ্বের অন্যতম উদার প্যারেন্টাল লিভ বা মাতৃত্ব-পিতৃত্বকালীন ছুটি নীতি চালু রয়েছে। দেশটিতে বাবা-মা মিলে প্রায় ১৬ মাসের সবেতন ছুটি পান। এর মধ্যে নির্দিষ্ট সময় বাবা ও মায়ের জন্য পৃথকভাবে বরাদ্দ থাকে, যা একে অপরের কাছে হস্তান্তর করা যায় না। নির্ধারিত সময় ব্যবহার না করলে সেই ছুটি বাতিল হয়ে যায়। ‘ড্যাড মান্থস’ নামে পরিচিত এই নীতির লক্ষ্য বাবাদের সন্তান লালন-পালনে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা। পোরমোখতারি বলেন, সরকারের নীতি এবং সহকর্মীদের সহযোগিতার কারণেই তার কাজের সময় স্বামীর সন্তানের দেখাশোনা করাটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, পরিবারবান্ধব নীতি শুধু ছুটির সুবিধা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাবা-মায়ের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি সহজ করা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে শিশু পরিচর্যা সুবিধা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে পোল্যান্ডের উপ-জলবায়ুমন্ত্রী ক্রিজস্টফ বোলেস্তা বলেন, বৈঠকে একটি শিশুর উপস্থিতি কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেনি। তার ভাষায়, “এটি দারুণ একটি বিষয়। এটি কোনো বাধা নয়, বরং জীবনেরই স্বাভাবিক অংশ।”
আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফেরার প্রায় পাঁচ বছর পর প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আমন্ত্রণে ব্রাসেলসে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে তালেবান প্রতিনিধিদল। ইউরোপে থাকার অধিকার না থাকা এবং আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হওয়া আফগান নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করাই এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর গত সোমবার তালেবানের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে বেলজিয়ামে প্রবেশের জন্য মাত্র এক দিনের ভিসা দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন নিশ্চিত করেছে যে, ২৭ জাতির এই জোটে অবৈধভাবে প্রবেশ করা আফগানদের নির্বাসনের বিষয়ে আলোচনা করতে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এই বৈঠকের অর্থ কোনোভাবেই ব্রাসেলস কর্তৃক তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়। বরং এটি কেবল অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর একটি প্রায়োগিক পদক্ষেপ। ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র মার্কাস ল্যামার্ট সংবাদ সম্মেলনে জানান, যেসব আফগান নাগরিক গুরুতর অপরাধে জড়িত কিংবা যারা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাদের ফেরত পাঠানোর উপায় খুঁজছে ইইউর সদস্য দেশগুলো। মূলত ইউরোপ জুড়ে কট্টর ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান এবং অভিবাসন নীতির প্রতি জনসাধারণের কঠোর মনোভাবের কারণেই ইইউ দেশগুলো অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করছে। এর আগে গত বছর প্রায় ২০টি ইইউ সদস্য রাষ্ট্র গুরুতর অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অভিবাসীদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্কের অভাবে এতদিন তা সীমিত ছিল। তবে ইইউর এমন উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো এই বৈঠক বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনগুলোর দাবি, তালেবান শাসনভার নেওয়ার পর থেকে আফগানিস্তানে নারী অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং দেশটিতে বর্তমানে ভয়াবহ মানবিক ও খাদ্য সংকট চলছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইউরোপীয় কার্যালয়ের পরিচালক ইভ গেডি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মাত্র কয়েক বছর আগেই আফগানিস্তান থেকে ইউরোপীয় কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মরিয়া হয়ে পালানোর দৃশ্য বিশ্ববাসী দেখেছে। এমন একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আফগানদের জোরপূর্বক সেখানে ফেরত পাঠানো হবে চরম অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য।
যুক্তরাজ্যের (ইউকে) ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ঐতিহাসিক বের হয়ে যাওয়ার বা 'ব্রেক্সিট' গণভোটের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এক দশক পর এসে এখন ব্রিটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকই মনে করছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে দেওয়াটা তাদের একটি মস্ত বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। স্বাধীন জনমত জরিপ সংস্থা 'ইউগভ'-এর সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ব্রেক্সিটের পর থেকে অর্থনৈতিক মন্দা এবং স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার হারানোর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে ব্রিটেন তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই এক দশকে দেশটিতে সাতজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছেন, যারা ব্রেক্সিটের পরবর্তী ধাক্কা এবং বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছেন। যুক্তরাজ্যের বাজেট বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইইউ ছাড়ার কারণে ব্রিটেনের উৎপাদনশীলতা, আমদানি ও রপ্তানি ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও সম্প্রতি বলেছেন, ব্রেক্সিটের পরিণতি তাদের আশঙ্কার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। তবে গত ১০ বছরে ব্রিটেনের জনমিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া বয়স্ক নাগরিকদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে মারা গেছেন এবং নতুন প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা যুক্ত হয়েছেন, যারা মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে। বর্তমানে সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ ভোটার পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার জন্য নতুন করে গণভোট চান। তবে ব্রিটেনের বেশ কিছু ডানপন্থী রাজনৈতিক দল এখনো ব্রেক্সিটের পক্ষেই সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন। যদিও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ ইইউ-তে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন, তবুও ব্রিটেনের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা এখনই নতুন কোনো গণভোটের আয়োজন করতে রাজী নন। তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। তবে ব্রেক্সিট যে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি, বরং তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে—তা এখন দেশটির অধিকাংশ মানুষই অকপটে স্বীকার করছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগের পক্ষে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ওই গণভোটে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে এবং ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার বিপক্ষে অবস্থান নেন। এক দশক পরও সেই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতারা। বিশ্বের বৃহত্তম একক বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের কারণে দেশটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক উৎপাদন ২ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে থাকতে পারে। তবে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের মতো বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর কারণে ব্রেক্সিটের পৃথক প্রভাব নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল সন্ডার্স বলেন, ব্রেক্সিট এখনো যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করছে। তার মতে, এর ফলে মোট দেশজ উৎপাদন সম্ভাব্য স্তরের তুলনায় কম রয়েছে, যা সরকারি রাজস্বে ঘাটতি সৃষ্টি করছে এবং কর বৃদ্ধি ও ব্যয় সংকোচনের চাপ তৈরি করছে। তবে ব্রেক্সিট সমর্থনকারী স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান জেসপ বলেন, ইইউ ত্যাগের প্রাথমিক প্রভাব নেতিবাচক হলেও ক্ষতির মাত্রা আশঙ্কার তুলনায় কম ছিল এবং সময়ের সঙ্গে এর প্রভাব আরও কমে আসতে পারে। ব্রেক্সিট প্রচারের সময় কম অভিবাসন, কম নিয়ন্ত্রণ, উন্নত সরকারি সেবা এবং নতুন বাণিজ্যিক সুযোগের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেকগুলো এখনো পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও জাপানের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারের তুলনায় সীমিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮৫৬ বিলিয়ন পাউন্ড। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে নতুন অভিবাসন ব্যবস্থার পর থেকে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন গড়ে বছরে ৫ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। ২০১০-এর দশকে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৩ সালে এটি প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে। চলতি মাসে প্রকাশিত ইউগভ জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন ব্রিটিশের মধ্যে ৬ জন মনে করেন ব্রেক্সিট প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৬ সালের গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের সফটওয়্যার ডেভেলপার জেরেইন্ট বলেন, তখন অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সেবার ওপর চাপ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তবে বর্তমানে সুযোগ পেলে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষেই ভোট দিতেন বলে মন্তব্য করেন। ব্যবসায়িক খাতেও ব্রেক্সিটের প্রভাব স্পষ্ট। ২০২০ সালে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগের পর নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক কার্যকর হয়, যার ফলে কাস্টমস পরীক্ষা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালু হয়। ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্য ইইউর একক বাজার ও কাস্টমস ইউনিয়নের অংশ থাকায় পণ্য, মানুষ ও মূলধনের অবাধ চলাচল নিশ্চিত ছিল। বর্তমানে ইউরোপে রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও পরীক্ষার কারণে সময় ও খরচ দুইই বেড়েছে। লজিস্টিকস ইউকের প্রধান নির্বাহী বেন ফ্লেচার বলেন, ব্যবসায়ীরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেও খরচ বৃদ্ধি এবং প্রধান বাজারে প্রবেশে জটিলতা রয়ে গেছে। জার্মান প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান বোশ জানিয়েছে, ব্রেক্সিটের আগে তাদের ব্রিটিশ শাখা বছরে প্রায় ৪০টি আমদানি লেনদেন পরিচালনা করত, যা বর্তমানে বেড়ে বছরে প্রায় ১০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করেছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো জানিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় বাজার থেকে সরে এসেছে এবং অনেকে এখনো নতুন সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছে। ব্রিটিশ চেম্বার্স অব কমার্সের বাণিজ্যনীতি প্রধান উইলিয়াম বেইন বলেন, ইইউর সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বাড়াতে কার্যকর হয়নি এবং এটি এখনো বাণিজ্যের পথে একটি স্থায়ী বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পর থেকে অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় যুক্তরাজ্যের পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে। অর্থনীতিবিদ পল ডেলসের মতে, এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে ব্রেক্সিট সামগ্রিকভাবে পণ্য বাণিজ্যকে নিরুৎসাহিত করেছে। তবে সেবা খাত তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর যুক্তরাজ্য বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেবা রপ্তানিকারক দেশ এবং আর্থিক সেবা রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। গত বছর দেশটির অর্থনৈতিক উৎপাদনের ১১ শতাংশ এসেছে আর্থিক ও সংশ্লিষ্ট পেশাগত সেবা খাত থেকে। লন্ডন বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান বজায় রেখেছে। ইওয়াইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে আর্থিক সেবা খাতে ৯৪৯টি বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প এসেছে, যা ফ্রান্স ও জার্মানির সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। অর্থনৈতিক প্রভাব সত্ত্বেও ব্রেক্সিট বাতিল করে পুনরায় ইইউতে যোগদানের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিকভাবে এখনো সীমিত। বিষয়টি ব্রিটিশ রাজনীতিতে গভীর বিভাজনের কারণ হয়ে আছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন চুক্তির সম্ভাবনাও আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এসব উদ্যোগের প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে আগের মতো প্রবেশাধিকার পেতে হলে যুক্তরাজ্যকে কিছু নীতিগত স্বায়ত্তশাসন ছাড়তে হতে পারে, যা ব্রেক্সিট বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর একটি ছিল। কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক শন ম্যাকগুইর বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ।
সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির ভোটাররা। ডানপন্থি রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি-ইউডিসি) সমর্থিত এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়েছে ৫৪ শতাংশেরও বেশি। রোববার অনুষ্ঠিত এই গণভোটে প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ার পর দেশটির প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সুইজারল্যান্ডের বিচার ও পুলিশমন্ত্রী বিট ইয়ান্স এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে নাগরিকেরা দেশের স্থিতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং নির্ভরযোগ্যতার পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন। ইউডিসি প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল ২০৫০ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের স্থায়ী জনসংখ্যা কোনোভাবেই যেন ১ কোটি পার না হয়। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৯৫ লাখ, যার মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বিদেশি নাগরিক। ইউডিসির দাবি ছিল, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করা না হলে দেশের আবাসন সংকট, যানজট, অপরাধ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর চাপ আরও বাড়বে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের মানুষের অবাধ চলাচল সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করতে হতো, যা দেশটির অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করত। ভোটের ফলাফলকে হতাশাজনক উল্লেখ করে ইউডিসির সভাপতি মার্সেল ডেটলিং বলেন, হেরে গেলেও ৪৫ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রমাণ করে যে দেশের একটি বড় অংশ বর্তমানের এই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন নীতি পছন্দ করছে না। অন্যদিকে, সুইস ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন জানিয়েছে, এই প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে সুইস জনগণ আত্মগুটিয়ে নেওয়া এবং বিদেশিবিদ্বেষী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এবারের গণভোটে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল রেকর্ড প্রায় ৫৯ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড় উপস্থিতির (৪৯%) চেয়ে অনেক বেশি। একই দিনে অনুষ্ঠিত অন্য আরেকটি গণভোটে সুইস ভোটাররা বেসামরিক সেবায় যোগদানের নিয়ম কঠোর করার সরকারি প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় নতুন অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে অংশীদারত্ব নবায়ন করে অতিরিক্ত ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, নতুন এই অর্থায়নের মাধ্যমে কক্সবাজারে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য জরুরি সহায়তা, সুরক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন মানবিক সেবা অব্যাহত রাখা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীরও সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, নতুন তহবিলের আওতায় শুধু শরণার্থীরাই নয়, কক্সবাজারের প্রায় ৭০ হাজার স্থানীয় বাসিন্দাও উপকৃত হবেন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতেও এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে। নতুন অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যয় করা হবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে। এর আওতায় শরণার্থী শিবিরগুলোতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি ব্যবহারের ফলে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের প্রয়োজন কমে যায়। এতে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাসের পাশাপাশি বন উজাড়ও কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ধোঁয়াজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমে আসে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ফলে শুধু খাদ্য, আশ্রয় বা জরুরি সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার সুযোগ তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেন।” অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন এই দীর্ঘ মানবিক সংকটের সময়ে সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।” উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবির কক্সবাজারে অবস্থান করছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ২০২৫-২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি) অনুযায়ী, চলতি বছরে শরণার্থীদের জরুরি চাহিদা পূরণে প্রায় ৭১ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত পুরো অর্থের সংস্থান হয়নি। এ অবস্থায় ইউএনএইচসিআর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি ও ধারাবাহিক অর্থায়ন অপরিহার্য।
অবৈধ অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের ক্ষমতা বাড়াতে নতুন ও কঠোর অভিবাসননীতির চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। বুধবার স্ট্রাসবুর্গে অনুষ্ঠিত ভোটে অনুমোদন পেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে ‘ডিপোর্টেশন সেন্টার’ বা নির্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের পথও উন্মুক্ত হবে। দীর্ঘ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া শেষে এই সংস্কার এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং ইউরোপজুড়ে জনমতের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ইইউর অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার বলেন, “এই আইন স্পষ্টভাবে বার্তা দিচ্ছে যে পাচারকারীরা নয়, বরং আমরাই সিদ্ধান্ত নেব ইউরোপীয় ইউনিয়নে কে থাকতে পারবে এবং কাকে চলে যেতে হবে।” নতুন আইনে এমন বিধান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ বা বহিষ্কার কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। যেসব অভিবাসীর ইউরোপে থাকার বৈধ অধিকার নেই, তাদের এসব কেন্দ্রে পাঠানোর সুযোগ থাকবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। তবে ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ বেশ কয়েকটি দেশ এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি ইইউভুক্ত দেশগুলোর একটি বড় অংশ এসব কেন্দ্র পরিচালনায় ইউরোপীয় অর্থায়নের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। যদিও ফ্রান্স ও স্পেন এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্র স্থাপনের প্রথম চুক্তি সম্পন্ন করা, যাতে ২০২৭ সাল থেকে এগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।” ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভিবাসন ইস্যুতে জনমত ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলের উত্থানের ফলে সরকারগুলোও অভিবাসন নীতিতে আরও কড়াকড়ি আরোপের পথে হাঁটছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে অভিবাসীর আগমন কিছুটা কমে এলেও ব্রাসেলস এখন মূলত প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ নিজ দেশে ফিরে গেছে। ইইউ কর্মকর্তাদের মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং বহিষ্কার প্রক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অত্যন্ত আগ্রহী বলে জানিয়েছেন জার্মানির ফেডারেল ফরেন অফিসের (এফএফও) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মহাপরিচালক ফ্রাঙ্ক হার্টম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি কঠিন রাজনৈতিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গেছে এবং এর মাধ্যমে দেশটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন সরকার পেয়েছে। জার্মানি এখন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে এবং বিভিন্ন খাতে অংশীদারিত্ব বাড়াতে কাজ করতে চায়। মঙ্গলবার (১৬ জুন) জার্মান দূতাবাসের পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফ্রাঙ্ক হার্টম্যান এবং এফএফওর দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান স্টিফেন কোখ গত ৯ থেকে ১১ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তারা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজের উপস্থিতিতে এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব ড. মু. নজরুল ইসলাম এবং মহাপরিচালক (পশ্চিম ইউরোপ ও ইইউ) মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে উভয় পক্ষই দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় বন্ধন আরও দৃঢ় করতে এবং বাংলাদেশ-ইইউ সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ব্যাপারে তাদের জোরালো আগ্রহের কথা তুলে ধরে। আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষভাবে স্থান পায়। হার্টম্যান বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জার্মানি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সমর্থন বজায় রাখার আহ্বান জানান। জার্মান প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর করা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাট ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানি বাড়াতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমুখী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। হার্টম্যান স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণের আগে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বের ওপর জোর দেন এবং তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ সফরকালে জার্মান কর্মকর্তারা তৈরি পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং টেকসই উন্নয়নমূলক উদ্যোগসমূহ সরাসরি দেখার জন্য কাশিমপুরে ডিবিএল গ্রুপের টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানাও পরিদর্শন করেন।
দীর্ঘ এক দশকের রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্ক ও সমঝোতার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় নীতি “মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট” কার্যকর হয়েছে। শুক্রবার (১২ জুন) থেকে ইউরোপজুড়ে এই নীতির বাস্তবায়ন শুরু হয়, যার মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির নতুন কাঠামো চালু করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের মতে, অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত, কার্যকর ও নিয়ন্ত্রিত করাই এই নতুন চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর ইউরোপজুড়ে যে রাজনৈতিক চাপ ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটেই এই সংস্কার আনা হয়েছে। নতুন নীতির আওতায় ইইউর বাহ্যিক সীমান্ত দিয়ে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের জন্য বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে অভিবাসীদের পরিচয়, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাই করা হবে। প্রাথমিক যাচাই সাধারণত সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন গ্রহণের সম্ভাবনা কম বলে বিবেচিত হবে, তাদের আবেদন সীমান্ত পর্যায়েই দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান আশ্রয় প্রক্রিয়া কমবে বলে আশা করছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ। ইতালি, গ্রিস, স্পেন ও মাল্টার মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অভিবাসন চাপের মুখে ছিল। নতুন চুক্তির অধীনে অন্যান্য সদস্য দেশকে আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ, আর্থিক সহায়তা অথবা প্রশাসনিক সহযোগিতার মাধ্যমে দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হবে। এই ব্যবস্থাকে “সংহতি প্রক্রিয়া” বলা হচ্ছে। চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইউরোড্যাক ডাটাবেজ আরও উন্নত করা হয়েছে। এতে আঙুলের ছাপ, মুখাবয়বের ছবি এবং অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে একজন ব্যক্তি একাধিক দেশে একাধিকবার আশ্রয় আবেদন করতে না পারেন এবং প্রক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। তবে নতুন ব্যবস্থার প্রথম দিনেই ইউরোড্যাক সিস্টেমে কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়, যা কয়েকটি সদস্য দেশের কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব ফেলে। ইউরোপীয় কমিশন একে প্রাথমিক প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নতুন নীতির কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে অনেক আশ্রয়প্রার্থী যথাযথ আইনি সহায়তা ও ন্যায্য শুনানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংস্কার ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে নিয়ে যাবে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতিতে এটি অন্যতম বড় সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আগামী দিনে ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা কোনোভাবেই ১ কোটির ওপরে যেতে দেওয়া যাবে না—ডানপন্থী দলগুলোর এমন একটি বিতর্কিত প্রস্তাব গণভোটে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির নাগরিকরা। প্রাথমিক ফলাফলের বরাত দিয়ে রোববার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এই তথ্য জানিয়েছে। দেশটির শীর্ষ কট্টর ডানপন্থী দল ‘সুইস পিপলস পার্টি’ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এই কঠোর প্রস্তাবটি সামনে এনেছিল। প্রাথমিক ভোট গণনা অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। দেশজুড়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোটার এই ঐতিহাসিক গণভোটে অংশ নেন। সুইজারল্যান্ডের পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন থাকা পপুলিস্ট এই ডানপন্থী দলটি দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসনবিরোধী মনোভাব উসকে আসছিল। বিশেষ করে প্রতিবেশী ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসা কর্মীদের ঢল ঠেকাতে তারা এই গণভোটের আয়োজন করে। সমালোচকরা এই প্রস্তাবটিকে ‘সুইস ব্রেক্সিট’ নামে অভিহিত করেছিলেন। কারণ এই আইন পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং মুক্ত যাতায়াতের চুক্তিগুলো বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ত। যদিও সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের একটি নয়, তবে এটি চারপাশ থেকে অন্যান্য সদস্য দেশগুলো দিয়েই পরিবেষ্টিত। কট্টরপন্থী দলটির দাবি ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসংখ্যা অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে সুইজারল্যান্ডের আবাসন ব্যবস্থা, সামাজিক কর্মসূচি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তবে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার, পার্লামেন্ট এবং প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠন ‘ইকোনমিসুইস’ শুরু থেকেই এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। কারণ দেশটির চিকিৎসা, অর্থায়ন, ওষুধ এবং প্রযুক্তি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলো মূলত বিদেশী দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। সুইজারল্যান্ডের নিয়ম অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সরকারকে বাধ্যতামুলক ব্যবস্থা নিতে হতো। এমনকি জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছালেই রাজনৈতিক আশ্রয়, পারিবারিক পুনর্মিলন এবং রেসিডেন্সি পারমিট দেওয়া বন্ধ করতে হতো। তবে ভোটাররা সচেতনভাবে এই প্রস্তাবটি নাকচ করে দেওয়ায় সুইজারল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যময় সামাজিক কাঠামো আপাতত সুরক্ষিত রইল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় সীমান্ত ও কোস্ট গার্ড সংস্থা ফ্রন্টেক্স। শুক্রবার (১২ জুন) প্রকাশিত সংস্থাটির প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, এ সময়ে প্রায় ৩৯ হাজার অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফ্রন্টেক্সের মতে, অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং অভিবাসীদের উৎসদেশগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’ নামে নতুন একটি নীতিমালা কার্যকর করেছে। এর আওতায় ইইউ সীমান্তজুড়ে অভিবাসীদের জন্য একক ও মানসম্মত যাচাই-বাছাই পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন নীতির প্রয়োগ নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফ্রন্টেক্সের নির্বাহী পরিচালক হান্স লেইটেনস বলেন, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে ইইউ সীমান্তে আগত সবার ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। এতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। তবে সামগ্রিকভাবে সংখ্যা কমলেও কিছু রুটে এখনো অভিবাসন প্রবাহ বেশি রয়েছে। বিশেষ করে মধ্য ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথ এখনো সবচেয়ে ব্যস্ত। অন্যদিকে আফ্রিকান রুটে অনিয়মিত পারাপার সবচেয়ে বেশি কমেছে—এই পথে চলাচল ৭১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসন বেড়েছে, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ৪৬ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্যের বরাতে ফ্রন্টেক্স জানিয়েছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে অবৈধ অভিবাসন কমলেও সমুদ্রপথের ঝুঁকি এখনো উদ্বেগজনক রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর সীমান্তনীতি, উৎসদেশে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কারণে এই পরিবর্তন দেখা গেলেও, অভিবাসন সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং বিভিন্ন রুটে প্রবণতার এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
আর্মেনিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন ইউরোপপন্থী দল। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যগত মিত্র রাশিয়ার বলয় থেকে বের হয়ে ইউরোপের দিকে দেশটির চূড়ান্তভাবে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলো। বুথফেরত ও চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের 'সিভিল কন্ট্রাক্ট' পার্টি অল্প ব্যবধানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে, রুশ-আর্মেনীয় বিলিয়নেয়ার সামভেল কারাপেতিয়ানের নেতৃত্বাধীন 'স্ট্রং আর্মেনিয়া' জোট ২৫ শতাংশ আসন পেয়েছে। এই বিজয়ের ফলে প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ান এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে থেকে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন। এর মধ্যে রয়েছে আজারবাইজানের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। ২০১৮ সালের 'ভেলভেট রেভল্যুশন'-এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সাবেক সাংবাদিক পাশিনিয়ান দাবি করেন, প্রতিবেশীদের সাথে শত্রুতার অবসান ঘটলে আর্মেনিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশিনিয়ানের এই জয়কে ব্রাসেলস স্বাগত জানালেও মস্কো বেশ অসন্তোষের সাথে দেখছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন এই বিজয়কে অভিনন্দন জানিয়ে একে 'গণতান্ত্রিক আর্মেনিয়ার' প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পাশিনিয়ানকে সমর্থন জানিয়ে তাঁকে একজন 'মহান বন্ধু ও নেতা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে ২০২৩ সালে আজারবাইজানের কাছে নাগর্নো-কারাবাখ হারানোর পর এটিই ছিল দেশটিতে প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা নিয়ে বিরোধী দলগুলো পাশিনিয়ানকে তুলোধুনো করার চেষ্টা করেছিল। এই নির্বাচনের আগে থেকেই রাশিয়ার সাথে আর্মেনিয়ার সম্পর্কের ব্যাপক টানাপোড়েন তৈরি হয়। নাগর্নো-কারাবাখ সংকটে রুশ শান্তিরক্ষীরা এগিয়ে না আসায় আর্মেনিয়ার জনগণ রাশিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। এর জবাবে পাশিনিয়ান রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সিএসটিও থেকে আর্মেনিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সতর্ক করেছিলেন যে আর্মেনিয়া ইউক্রেনের পথেই হাঁটছে। নির্বাচনের আগে রাশিয়া আর্মেনিয়ার ওপর বেশ কিছু বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল। তবে নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা ও বিরোধী দলীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের অভিযোগ এনে পাশিনিয়ানের বিরুদ্ধে কিছুটা স্বৈরাচারী আচরণেরও সমালোচনা রয়েছে। যদিও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশটির সাধারণ ভোটাররা রাশিয়ারপন্থী দলগুলোর চেয়ে পাশিনিয়ানকেই কম ক্ষতিকর বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে ইতিমধ্যে আর্মেনিয়াকে ৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ঘোষিত ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘স্বস্তির খবর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তিনি উল্লেখ করেন, চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগজনক। উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, ইউরোপ লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশটির জনগণের পাশে থাকতে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ অব্যাহত রাখা জরুরি।
হাঙ্গেরিতে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পাওয়ার পরপরই দেশটির নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পেতের ম্যাজিয়ার প্রেসিডেন্ট তামাশ সুয়োককে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাজিয়ার সরাসরি প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে বলেন, তিনি হাঙ্গেরীয় জাতির ঐক্যের প্রতিনিধিত্ব করার উপযুক্ত নন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুয়োকের পদত্যাগ করা উচিত। প্রেসিডেন্ট তামাশ সুয়োক বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে তার অবস্থান নিয়ে শুরু থেকেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ম্যাজিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তার দল জনসমর্থনের ভিত্তিতে সংবিধান ও আইন সংশোধনের পথে হাঁটবে। একই সঙ্গে অরবানের নিয়োগ দেওয়া অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও অপসারণের ইঙ্গিত দেন তিনি। এদিকে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন ম্যাজিয়ার, যেখানে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে একা একটি ব্যালকনিতে হাঁটতে দেখা যায়। ভিডিওটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে আলোচনায় এসেছে। গত ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয় পায় ম্যাজিয়ারের দল তিসা পার্টি। এর মাধ্যমে ভিক্টর অরবানের টানা ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। নতুন সরকার দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ম্যাজিয়ার জানিয়েছেন, আগামী মে মাসের মাঝামাঝি তার মন্ত্রিসভা শপথ নিতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থগিত তহবিল ছাড় করানো এবং প্রশাসনিক সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।