- প্রচ্ছদ
- Topic
ন্যাটো
ডেনমার্কের ১৯ বছর বয়সী রাজকুমারী ইসাবেলা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় যোগ দিয়েছেন। ইউরোপজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ডেনমার্ক যখন সামরিক নিয়োগ সম্প্রসারণ করছে, ঠিক সেই সময়েই দেশটির রাজপরিবারের এই সদস্যের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজকুমারী ইসাবেলা হলেন ডেনমার্কের রাজা দশম ফ্রেডেরিক এবং রানি মেরির কন্যা। রাজপরিবারের সদস্য হলেও দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তিনি সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। তিনি ১ হাজার ৬০০ নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যের সঙ্গে মোট ১১ মাসের সামরিক সেবা সম্পন্ন করবেন। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ মাস থাকবে মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তী ছয় মাস থাকবে কার্যকরী সামরিক দায়িত্ব। তিনি স্লাগেলসে শহরে অবস্থিত গার্ড হুসার রেজিমেন্টে প্রশিক্ষণ নেবেন বলে জানানো হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং উত্তর ইউরোপে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদারের প্রেক্ষাপটে ডেনমার্ক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যও ডেনমার্কে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিয়ে আলোচনাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কৌশলগত ও প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক—দুই পক্ষই বারবার স্পষ্ট করেছে, অঞ্চলটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো ধরনের দাবি তারা গ্রহণ করবে না। প্রতিরক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে ডেনমার্ক সামরিক নিয়োগে নারীদেরও বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে আগে যেখানে সামরিক সেবার মেয়াদ ছিল চার মাস, এখন তা বাড়িয়ে ১১ মাস করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবছর নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যের সংখ্যা আরও আড়াই হাজার বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। রাজকুমারী ইসাবেলা তার বড় ভাই যুবরাজ ক্রিশ্চিয়ানের পথ অনুসরণ করছেন। যুবরাজ ক্রিশ্চিয়ানও একই গার্ড হুসার রেজিমেন্টে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছিলেন। ডেনিশ সংবাদমাধ্যম বিটি (BT)-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজকুমারীর সামরিক সেবার সব ব্যয় বহন করবেন রাজা ফ্রেডেরিক ও রানি মেরি। তবে ইসাবেলা সেনাসদস্যদের জন্য নির্ধারিত খাবার ভাতা ও বেতন গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০২৫ সালে ডেনিশ রাজপরিবারের জন্য বরাদ্দ বাজেট ছিল ১ কোটি ৭২ লাখ ডেনিশ ক্রোনার। রাজপরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সেবাস্টিয়ান ওলডেন-ইয়র্গেনসেন স্প্যানিশ সাময়িকী হোলা!-কে বলেন, ইসাবেলার এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পেশায় যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত নয়। তার ভাষায়, যদি তিনি ভবিষ্যতে সামরিক কর্মকর্তা হওয়ার পরিকল্পনা করতেন, তাহলে নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর মতো অন্য কোনো শাখা বেছে নেওয়াই বেশি স্বাভাবিক হতো। গত মাসে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, জোটের প্রতিটি ভূখণ্ড রক্ষায় তাদের দেশ প্রস্তুত, যার মধ্যে ডেনমার্কের নিজস্ব ভূখণ্ডও রয়েছে। ডেনমার্কের পাশাপাশি সুইডেন ও নরওয়েও নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু করেছে। অন্যদিকে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, সব সদস্যদেশ এখনো সেই লক্ষ্য পূরণের পথে সমানভাবে এগোতে পারেনি।
আঙ্কারায় ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলনের সমান্তরালে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরামে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আয়োজিত এই ফোরামে বিমান প্রতিরক্ষা, নজরদারি ড্রোন এবং স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যৌথভাবে উৎপাদনের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতকে আরও শক্তিশালী করবে। ঘোষিত চুক্তিগুলোর মধ্যে সুইডিশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘সাব’ নিশ্চিত করেছে যে, ন্যাটোর আকাশসীমা সুরক্ষায় ১০টি ‘গ্লোবালআই’ এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফট কেনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মাইকেল জোহানসন জানান, ২০৩০ সালের মধ্যেই এগুলোর সরবরাহ শুরু হতে পারে এবং প্রতিটি বিমানের আনুমানিক মূল্য পড়বে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি, মার্কিন ডিফেন্স জায়ান্ট ‘লকহিড মার্টিন’ এবং জার্মানির ‘রাইনমেটাল’ একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর অধীনে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে, অর্থাৎ জার্মানিতে যৌথভাবে ‘অ্যাটাকমস’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা হবে। এছাড়া ইউরোপের মাটিতে লকহিড মার্টিনের উন্নত পিএসি-৩ (PAC-3) এয়ার ডিফেন্স মিসাইলের জন্য একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার ঘোষণাও দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা আন্ডারসেক্রেটারি মাইকেল ডাফি। অন্যদিকে, নজরদারি ও কৌশলগত পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে জানান, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি ও ডেনমার্ক যৌথভাবে নর্থরপ গ্রুম্যানের উৎপাদিত পাঁচটি ‘এমকিউ-৪সি ট্রাইটন’ (MQ-4C Triton) উচ্চ-উচ্চতার নজরদারি ড্রোন ক্রয়ের আগ্রহপত্রে স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি, এয়ারবাস এ৪০০এম কার্গো বিমানের সমন্বয়ে একটি কৌশলগত এয়ারলিফ্ট ফ্লিট চালু করবে ন্যাটো। একই সাথে তাদের বিদ্যমান এ৩৩০ এমআরটিটি ট্যাঙ্কার বিমান বহর আরও বৃদ্ধি করা হবে। মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একটি নতুন চুক্তি হয়েছে; জার্মানির রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইসার অ্যারোস্পেস’ কানাডার ‘ম্যারিটাইম লঞ্চ সার্ভিসেস’-এর সঙ্গে পূর্ব কানাডার নোভা স্কোশিয়া স্পেসপোর্টে তাদের ‘স্পেকট্রাম’ রকেটের জন্য একটি ডেডিকেটেড লঞ্চ প্যাড তৈরির চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের কোয়ালিশন সরকার তাদের দেশের সামরিক খাতের বাজেট বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধির একটি খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবিত নতুন বাজেট অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৯৭০ কোটি ইউরো, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার। বর্তমান বছরের তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। সোমবার দেশটির মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এই খসড়া বাজেটে জার্মানির মোট ফেডারেল ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৪০ কোটি ইউরো। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই বিশাল বাজেটের একটি বড় অংশই ব্যয় করা হবে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং নতুন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের পেছনে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মূলত ন্যাটোর প্রতিরক্ষা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমে আসার সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে দেশটির মূল সামরিক বাজেট যেখানে ৮ হাজার ২৭০ কোটি ইউরো ছিল, তা আগামী বছর এক লাফে অনেকখানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যয় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি ইউরোতে নিয়ে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। নতুন এই খসড়া বাজেটে কেবল ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা বাবদ ১ হাজার১৬০ কোটি ইউরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে এই বার্ষিক সহায়তার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে ৮৫০ কোটি ইউরো করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতের এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কেবল আগামী বছরের মূল ফেডারেল বাজেটেই ১১ হাজার ৮৭০ কোটি ইউরোর নতুন ঋণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই খসড়া বাজেটটি চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য দেশটির পার্লামেন্টের অনুমোদন পেতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যকার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বিপাক্ষিক বিরোধটি ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে আরও একবার নতুন করে উসকে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মেলোনির একটি সম্পাদিত ছবি পোস্ট করে ট্রাম্প কড়া মন্তব্য করার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মূল ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সপ্তাহে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে সাম্প্রতিক জি-সেভেন সম্মেলনে জর্জিয়া মেলোনি তাঁর সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের এই দাবিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে ইতালি কখনো কারও কাছে হাত পাতে না। মেলোনির এই জবাবের পর ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে একটি সম্পাদিত ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে ইঙ্গিত করা হয় যে ইতালির প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহী। ছবিটির ক্যাপশনে ট্রাম্প লেখেন যে মেলোনির বিরুদ্ধে এখন একটি আইনি নিষেধাজ্ঞা বা রেস্ট্রেইনিং অর্ডার জারি করা প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। ইতালির একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেলোনি বলেন যে তিনি আমেরিকার বিরোধী নন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। তবে তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবসময় স্পষ্টভাষী ও খোলামেলা কথা বলা পছন্দ করেন এবং দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই কুরুচিপূর্ণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বাদানুবাদের জেরে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তাঁর পূর্বনির্ধারিত ওয়াশিংটন সফর বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পদক্ষেপে ইতালির সমর্থন না দেওয়া এবং দ্বিপাক্ষিক নীতিগত পার্থক্যের কারণে দুই নেতার মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই টানাপোড়েন চলছিল। তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটোর ৩৬তম শীর্ষ সম্মেলনে এই দুই বিশ্ব নেতার মুখোমুখি বসার কথা রয়েছে।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে এক সামরিক বিশ্লেষক সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে এই সামরিক জোটের ভেতরে গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ফাটল তৈরি হচ্ছে। জার্মান প্রবীণ সামরিক বিশ্লেষক থমাস উইগোল্ড এক সাক্ষাৎকারে জানান, ট্রাম্প প্রশাসন প্রশাসনিকভাবে ন্যাটোকে দুর্বল করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে খুব দ্রুত এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাহ্যিকভাবে সামরিক পর্যায়ে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও রাজনৈতিকভাবে ন্যাটোর পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। এমনকি সম্প্রতি গত ২ জুলাই ইউরোপে নিয়োজিত মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেলকে হঠাৎ পরিবর্তন করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামরিক ক্ষেত্রেও এখন আর আগের মতো সুসম্পর্ক নেই। এবারের আঙ্কারা সম্মেলনের মূল আলোচনাই হবে—যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তবে ইউরোপ কীভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করবে। এই অনিশ্চয়তার মাঝেই জার্মানি ন্যাটোর ভেতরে আরও বড় দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। আঙ্কারা সম্মেলনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় নেতারা ন্যাটোকে 'আরও বেশি ইউরোপ-বান্ধব' করার ব্যাপারে জোর দেবেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চলে গেলেও জোটটি টিকে থাকতে পারে। ইতিমধ্যে গত ১২ মাসে ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো বাড়িয়েছে। এর মধ্যে কেবল জার্মানিই তার সামরিক ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ইউরো বৃদ্ধি করে মোট ১২৪ বিলিয়ন ইউরোতে নিয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। আঙ্কারার এই ৩৬তম শীর্ষ সম্মেলনটি ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপ-আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠেয় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি আগামী ৭ ও ৮ জুলাই দুই দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি ‘অ্যালিস ইন আঙ্কারা’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তর, মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স (এমএসসি) এবং সেটার (SETA) যৌথ উদ্যোগে এই আন্তর্জাতিক ফোরামের আয়োজন করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ‘আঙ্কারা প্যালাস’ ভবনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও নীতি-নির্ধারকদের উপস্থিতিতে মোট ৪৫টি সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। অফিশিয়াল ন্যাটো সম্মেলনকে আরও ফলপ্রসূ করতে এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। দুই দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন প্যানেল আলোচনা ও গোলটেবিল বৈঠকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে কথা হবে। এর মধ্যে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং হাইব্রিড হুমকির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। এছাড়াও ইউক্রেন যুদ্ধের নিরাপত্তা, জ্বালানি করিডোর সংকট এবং কৃষ্ণসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিকের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও এতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আয়োজনের মাধ্যমে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের সময়ে বৈশ্বিক কূটনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে আঙ্কারা।
ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সক্ষমতা ও সৈন্য কমিয়ে নিলে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটে (ন্যাটো) তুরস্কের গুরুত্ব ও ভূমিকা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের সেনাপ্রধান জেনারেল অনো আইশেলশেইম। তুরস্কের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দেশটির ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকা শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের কারণে ন্যাটোর কাছে আঙ্কারা দিন দিন আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠেয় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই কথা বলেন। ডাচ সেনাপ্রধান জানান, আঙ্কারা সম্মেলনটি ন্যাটোর জন্য বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মোড় হিসেবে চিহ্নিত হবে। জোটের বর্তমান শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আগের সম্মেলনে নির্ধারিত প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা। নেদারল্যান্ডস এ ক্ষেত্রে একটি শ্বেতপত্র বা হোয়াইট পেপার প্রস্তুত করেছে এবং তারা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় ৫ শতাংশে নিয়ে যেতেও নিজেদের সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে। জেনারেল আইশেলশেইম স্পষ্ট করে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে তাদের সামরিক শক্তি গুটিয়ে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এখন ইউরোপীয় দেশগুলোকেই ন্যাটোর ভেতর বড় ধরনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। তিনি এটিকে ইউরোপের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সাথে তিনি চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা নিরসনে এই সম্মেলন থেকে একটি শান্তির পথ খোঁজার তাগিদ দেন। নতুন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ন্যাটোর নতুন রূপ বা 'ন্যাটো ৩.০' ভিশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডাচ সেনাপ্রধান বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য আমাদের এখন সহনশীল সমাজ এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প দরকার। সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে শুধু অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের পেছনে ছুটলে হবে না, একই সাথে স্বল্প খরচের হালকা চালকহীন ড্রোন (ইউএভি) এবং কম খরচের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। আর তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ইতিমধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জনে দারুণ সক্ষমতা দেখিয়েছে। তুরস্কের অনন্য গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভৌগোলিক কারণেই তুরস্ক ন্যাটোর দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের মূল অভিভাবক এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর এই জোটে তুরস্কেরই রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম সশস্ত্র বাহিনী। মার্কিনরা নিজেদের গুটিয়ে নিলে ন্যাটোর যে শক্তির ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণে তুরস্কের সামরিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি হবে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো পরিদর্শন করে নিজের মুগ্ধতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্প এখন অনেক এগিয়ে এবং তাদের সাথে যৌথ সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
রাশিয়া যেকোনো সময় মরিয়া হয়ে ন্যাটোর শক্তি পরীক্ষা করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে বাল্টিক সাগরে অবস্থিত নিজেদের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোটল্যান্ড দ্বীপে ব্যাপক সামরিক ও বেসামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে সুইডেন। পুতিনের সম্ভাব্য আকস্মিক হামলা প্রতিহত করতে এই দ্বীপে শত শত তরুণ-তরুণীকে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সী তরুণী এলা আদমানসহ অনেক নতুন রিক্রুট এখন সেখানে দিনরাত কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সুইডিশ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক ছিটমহল কালিনিনগ্রাদ থেকে মাত্র ২৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটির ওপর আকস্মিক আকাশ বা নৌ হামলা হতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গোটল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, সে পুরো বাল্টিক সাগরের আকাশ ও নৌপথের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। ২০০৫ সালে এই দ্বীপ থেকে সামরিক রেজিমেন্ট পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে ক্রাইমিয়া ও ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর ২০১৮ সাল থেকে এখানে নজিরবিহীন গতিতে পুনরায় সামরিক ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ শুরু হয়। গোটল্যান্ডের সামরিক প্রধান কর্নেল আন্দ্রেয়াস গুস্তাফসন জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের সব দেশ সামরিক সরঞ্জাম কিনতে শুরু করায় ভারী অস্ত্র বা কামান পেতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে যেকোনো মূল্যে গোটল্যান্ডকে রক্ষা করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইউক্রেনের সাথে কোনো যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তি হলে রাশিয়া দ্রুত তাদের সেনাদের ফিনল্যান্ড বা বাল্টিক দেশগুলোর দিকে নিয়োজিত করতে পারে। তাই তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদেরও স্বনির্ভর করার জন্য 'স্টার্ক সকেন' নামক একটি বিশেষ সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসকেরা নিজেদের উদ্যোগে বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করছেন। কোনো কারণে দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও যেন সাধারণ মানুষ অন্তত দুই সপ্তাহ স্বনির্ভর থাকতে পারে, সেই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সুইডেনের সিভিল ডিফেন্স এজেন্সির ডিরেক্টর জেনারেল মিকেল ফ্রিসেল জানান, গোটল্যান্ডকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করতে একটি শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি একটি স্থিতিস্থাপক বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। এই দ্বীপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা সফল হলে তা পুরো ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় অবদান রাখবে। এই বছরই দ্বীপে একটি জরুরি বেসামরিক স্থানান্তর মহড়াও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ন্যাটো সম্মেলনে তুর্কি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য; মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মূল কারণ হিসেবে ফিলিস্তিন ইস্যুর কথা উল্লেখ মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হলো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেছেন, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে স্বাধীন, সার্বভৌম ও ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সম্ভব নয়। সোমবার (২৯ জুন) তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন এরদোয়ান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। এরদোয়ান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মূল কারণ ফিলিস্তিন ইস্যু। তিনি ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর প্রতি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান ভূমি দখল ও বসতি স্থাপন বন্ধ না হলে এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ন্যাটোকে সামনে রেখে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তা বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। জোটের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধ, সংকট, সন্ত্রাসবাদ এবং অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে ন্যাটোকে তার নিরাপত্তা কৌশল পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। এরদোয়ান বলেন, পুরোনো নিরাপত্তা ধারণা ও কাঠামো একে একে ভেঙে পড়ছে। কিন্তু তার পরিবর্তে কী ধরনের নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে বিশ্ব ক্রমেই আরও বেশি উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত প্রচলিত ধারণাগুলোর অনেকটাই এখন কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও লেবাননের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মানবতার বিবেককে নাড়া দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ন্যাটোর প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সংহতি আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, টেক্সাস থেকে আঙ্কারা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নিঃশর্ত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি যাতে স্থায়ী সমাধানে রূপ নেয়, সে লক্ষ্যে তুরস্ক পাকিস্তান, কাতার এবং অন্যান্য মিত্র দেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি লেবাননসহ অঞ্চলের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ওপরও নিবিড় নজর রাখছে আঙ্কারা। এরদোয়ান বলেন, ‘গণহত্যাকারী গোষ্ঠীর উসকানিকে কোনোভাবেই সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তারা আমাদের অঞ্চলে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সহ্য করতে পারে না, বরং এটিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে দেখে।’
ইউক্রেন যুদ্ধের চরম চাপের মুখে পড়ে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করতে পোল্যান্ড অথবা বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে রাশিয়া একটি বড় ধরণের সামরিক 'উসকানি' বা হাইব্রিড হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তের দুটি সদস্য দেশের গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণে ক্রেমলিন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে এবং এই অচলাবস্থা ভাঙতেই পুতিন এমন বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে পারেন। লাটভিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাশিয়া বাল্টিক দেশ বা পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে সামরিক উসকানির প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক আক্রমণ হবে না, বরং ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের সাহায্যে 'হাইব্রিড হামলা' হতে পারে। আরেকটি ন্যাটো সদস্য দেশের একজন সিনিয়র রাজনৈতিক সূত্রও নিশ্চিত করেছেন যে পুতিন এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়ার মতো ছোট ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ওপর মার্কিন সমর্থন ঠিক কতটা মজবুত, তা পরীক্ষা করার জন্য একটি গোপন পরিকল্পনা করছেন। এই উসকানির মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমা বিশ্বকে এই বার্তা দেওয়া যে তারা যেন ইউক্রেনকে সহায়তা করা বন্ধ করে, অন্যথায় তাদের নিজেদের দেশেও বড় সমস্যা তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম নিজস্ব দূরপাল্লার ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে প্রায় ২০০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোসহ বিভিন্ন তেল শোধনাগারে ভয়াবহ হামলা চালায়, যার ফলে ক্রেমলিন এখন ব্যাকফুটে চলে গেছে। চ্যাথাম হাউজের রাশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কেয়ার জাইলস বলেন, মস্কো কখনোই নিষ্ক্রিয়ভাবে নিজেদের পরাজয় মেনে নেবে না, বরং তারা যুদ্ধকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। এদিকে চলতি মাসেই তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটোর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে জোটের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। এর আগে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড ও জার্মানির ডিএইচএল পার্সেলের ভেতরে রাশিয়ান অগ্নিবোমা পাওয়া গিয়েছিল এবং গত সেপ্টেম্বরে ১৯টি রাশিয়ান ডেকয় ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশ সীমায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর পুতিন যদি নিজেকে চরম কোণঠাসা মনে করেন, তবে তিনি ন্যাটোর ওপর যেকোনো সময় ক্ষিপ্ত হয়ে আঘাত করতে পারেন যা পুরো ইউরোপের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে তেহরান। ইরানের দাবি, ইউরোপের কয়েকটি দেশ মার্কিন অভিযানে সহায়তা করেছে এবং ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। তবে ইতালি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে রুটের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেছে, তারা সরাসরি সামরিক অভিযানের অনুমতি দেয়নি; কেবল প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে, তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহি করতে হবে। তিনি ন্যাটো মহাসচিবের বক্তব্যকে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি বলে দাবি করেন। ইরানের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ইতালি ও রোমানিয়ার নাম উল্লেখ করে বলা হয়, এই দুই দেশের সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে হবে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সহায়তা করেছে। তেহরানের ভাষ্য, এ ধরনের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, ইউরোপীয় মিত্ররা বিভিন্নভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে। তিনি দাবি করেন, ইতালিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি থেকে শত শত মার্কিন সামরিক বিমান উড্ডয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া রোমানিয়াও আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে রুটের এই বক্তব্যের পরই ইতালির সরকার কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো বলেন, ইতালি কোনো সরাসরি যুদ্ধ অভিযান অনুমোদন করেনি। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ইতালির সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ন্যাটো মহাসচিবের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে, দেশটি প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের সহায়তা দিয়েছিল এবং এ বিষয়ে সংসদ ও জনগণকে সম্পূর্ণ তথ্য জানানো হয়েছিল কি না। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভিযোগ, ন্যাটো মহাসচিবের মন্তব্য এবং ইতালির পাল্টা ব্যাখ্যা মিলিয়ে বিষয়টি এখন কূটনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও আলোচনা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আসন্ন ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগেই তুরস্কের প্রতি বন্ধুত্বের এক বড় বার্তা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কংগ্রেসের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আঙ্কারার কাছে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার মূল্যের যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বুধবার এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। জানা গেছে, ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের এই প্যাকেজের আওতায় তুরস্কের কাছে বেশ কয়েক ডজন ইঞ্জিন বিক্রি করা হবে। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই)-এর তৈরি এই ইঞ্জিনগুলো তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম যুদ্ধবিমান 'কান' (Kaan)-এ ব্যবহৃত হবে। প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ২০১৬ সালে এই মেগা প্রকল্পটির সূচনা করেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে সাধারণত উষ্ণ সম্পর্কই বজায় ছিল। ট্রাম্প একাধিকবার তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের প্রশংসাও করেছেন। তবে, আঙ্কারা রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রকল্প থেকে তুরস্ককে বাদ দেয় এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছিল। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস এই নতুন ইঞ্জিন চুক্তির অনানুষ্ঠানিক পর্যালোচনা চলাকালীন আপত্তি তুলেছিলেন এবং এখনও এর পক্ষে সবুজ সংকেত দেননি। তা সত্ত্বেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং এরপর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করবে। প্রায় এক বছর আগে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই ইঞ্জিন বিক্রির প্রক্রিয়াটি আটকে থাকা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সেই জট খুলতে চলেছে। উল্লেখ্য, আগামী ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কে ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জোটে ব্যয়ভার বণ্টন, প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখার বিষয়ে মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে বিদ্যমান উত্তেজনার মাঝেই এই সম্মেলন আয়োজিত হতে যাচ্ছে।
ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা জোরদারের অংশ হিসেবে আগামী শরৎ মৌসুমে লাটভিয়ায় ৮৫০ সদস্যের একটি সামরিক ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করবে ডেনমার্ক। বর্তমানে দেশটিতে অবস্থানরত সুইডিশ সেনা কন্টিনজেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবে ডেনিশ বাহিনী। বুধবার ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েপে ব্রুস দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, “রাশিয়াকে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা পালন করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তা সবাই দেখতে পাচ্ছে এবং বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর।” ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোপেনহেগেন। ইউক্রেনে যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে জোটভুক্ত দেশগুলো সামরিক উপস্থিতি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। লাটভিয়াসহ বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলো ওই অঞ্চলে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন বৃদ্ধি করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের সময় পর্যাপ্ত সমর্থন না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের সমালোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি জার্মানিতে মোতায়েন মার্কিন সেনার সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানান। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। লাটভিয়ায় ডেনমার্কের নতুন সেনা মোতায়েনকে ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জোটটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে চায়।
ইউরোপে ন্যাটোর (ন্যাটো) সামরিক অভিযানে নিয়োজিত মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের এই শক্তিশালী সামরিক জোটের প্রতি মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ন্যাটোতে নিয়োজিত ফাইটার জেট ও সামুদ্রিক নজরদারি বিমানের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সাথে ইউরোপে মোতায়েন করা একটি সাবমেরিন, একটি বিমানবাহী রণতরী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) এবং বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং আমেরিকা অঞ্চলে নিজেদের সামরিক শক্তি পুনঃবিন্যাস করার কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তাদের এই সামরিক উপস্থিতি কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ন্যাটোতে বরাদ্দকৃত এফ-১৬ এবং এফ-১৫ই ফাইটার জেটের সংখ্যা ১৫০টি থেকে কমিয়ে ১০০টিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক নজরদারি বিমান ২৬টি থেকে কমিয়ে ১৫টি করা হচ্ছে এবং ৮টি আকাশসীমায় জ্বালানি সরবরাহকারী (এয়ার রিফুয়েলিং) বিমান পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এছাড়া, ইউরোপের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত দুটি বোম্বার টাস্ক ফোর্সের একটিকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর করা হবে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম একটি সাবমেরিন ও একটি বিমানবাহী রণতরীকেও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। রাশিয়ার কাছ থেকে সম্ভাব্য সামরিক হুমকির মুখে যখন পুরো ইউরোপ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, ঠিক তখনই মার্কিন এই সামরিক সংকোচন ন্যাটোর নজরদারি এবং দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে ন্যাটোর পক্ষ থেকে মার্কিন এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট আনাদোলু নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন, জোটটি যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এবং এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ব্যবস্থার একটি অংশ। তিনি বলেন, এই পরিবর্তন একক কোনো মিত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং এটি জোটের অভ্যন্তরে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তবে মার্কিন জেনারেল অ্যালেক্স গ্রিনকেভিচ বার্লিনে এক এয়ারশোতে জানান, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোকে এখন নিজস্ব ড্রোন এবং দূরপাল্লার সমরাস্ত্রের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর সমালোচনা করে আসছেন এবং তিনি ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী ৭-৮ জুলাই তুরস্কে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে, যাকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ন্যাটোর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে দিতে এবার কি তবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘মুসলিম ন্যাটো’? পশ্চিম এশিয়া তথা মুসলিম বিশ্বের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এক বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। আগামী সপ্তাহেই তুরস্কে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এক মেগা বৈঠক, যেখানে অংশ নিতে যাচ্ছে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মিশর। তুরস্কের 'আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরাম'-এর সমান্তরালে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে যোগ দেবেন। মূলত আমেরিকা, চীন কিংবা রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো যাতে নিজস্ব একটি সামরিক ও নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সম্ভাব্য জোটকে 'মুসলিম ন্যাটো' হিসেবে অভিহিত করছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এই চার দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যৌথ নিরাপত্তা কৌশলের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভিনদেশের হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর ভিত্তি করেই এই জোট গঠিত হচ্ছে। যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে পশ্চিমা শক্তির একাধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। একই সাথে কাশ্মীর ইস্যুসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন মেরুকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি অবরোধের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ একাধিক মিত্র দেশ স্পষ্ট করেছে, তারা এই অবরোধে অংশ নিয়ে নতুন কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রস্তাবিত এই উদ্যোগে সাড়া না দেওয়ায় ন্যাটো জোটের ভেতরে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলো বলছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ না হলে তারা এমন কোনো পদক্ষেপে যুক্ত হবে না। মিত্র দেশগুলোর মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সংঘাত বাড়ানোর মতো কোনো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ন্যাটোর বিভিন্ন দেশ এই অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে। তবে বাস্তবে মিত্রদের অনীহা প্রকাশ পাওয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ইরান ইস্যুতে সমর্থন না দেওয়ায় ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ বাতিলের কথাও তুলেছিলেন ট্রাম্প। পাশাপাশি যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, সেসব দেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়েও তিনি ভাবছেন বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব আরও বাড়াতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে আবারও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। হোয়াইট হাউস–এ ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে–এর সঙ্গে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন করে ইঙ্গিত দেন। পোস্টে তিনি বলেন, প্রয়োজনের সময় ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি এবং ভবিষ্যতেও দাঁড়াবে না। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে ‘বড় কিন্তু খারাপভাবে পরিচালিত বরফখণ্ড’ বলে উল্লেখ করেন তিনি, যা অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার তার আগের পরিকল্পনারই ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাব ন্যাটোর বেশ কয়েকটি মিত্র দেশের বিরোধিতার মুখে পড়ে। বিষয়টি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কেও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। বৈঠক শেষে সিএনএন–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুটে বলেন, আলোচনা ছিল ‘খোলামেলা’। তিনি আরও মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর বিশ্ব পরিস্থিতি ‘আরও নিরাপদ’ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের পুনরায় এমন মন্তব্য ন্যাটোর অভ্যন্তরে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত সমর্থন না পাওয়ায় ন্যাটো মিত্রদের কড়া সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ডেনমার্কের অধীন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন মন্তব্য করে জোটের ভেতরে অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছেন তিনি। বুধবার ওয়াশিংটনে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে–এর সঙ্গে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমাদের প্রয়োজনের সময় ন্যাটো পাশে ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।’ বৈঠকের পর সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুটে বলেন, ইরান যুদ্ধের সময় বেশ কিছু ন্যাটো দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাশিত সহায়তা দেয়নি, যা নিয়ে ট্রাম্প ‘স্পষ্টতই হতাশ’। তবে তিনি আলোচনাকে ‘খোলামেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জোট ছাড়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। এর আগে হোয়াইট হাউস–এর মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানান, মিত্র দেশগুলো ‘আমেরিকান জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’—এই বিষয়টি নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে। ইরান যুদ্ধের সময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে ন্যাটোর কয়েকটি দেশ সাড়া দেয়নি। কেউ আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, আবার কেউ সরাসরি সামরিক সহায়তা থেকেও বিরত ছিল। এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলেও আখ্যা দেন। বিতর্ক আরও বাড়িয়ে ট্রাম্প বৈঠকের পর গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘বিশাল, কিন্তু দুর্বলভাবে পরিচালিত এক বরফখণ্ড।’ তাঁর এই মন্তব্য ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। এদিকে ২০২৩ সালের একটি আইনে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ন্যাটো ত্যাগ করা সম্ভব নয়। তবুও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য জোটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরান ইস্যুতে ন্যাটোর রহস্যময় নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় এবার সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার হোয়াইট হাউসে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নিজের চরম হতাশার কথা জানান তিনি। মূলত ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ন্যাটোর দেশগুলোর সরাসরি অংশ না নেওয়া নিয়েই এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৈঠকের পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প এক বিস্ফোরক পোস্টে লেখেন, "আমাদের প্রয়োজনের সময় ন্যাটো পাশে ছিল না। ভবিষ্যতেও তাদের পাশে পাওয়ার কোনো আশা নেই।" মার্ক রুটেকে সচরাচর 'ট্রাম্প হুইস্পারার' বলা হয়, কারণ তিনি ট্রাম্পের মেজাজ বুঝে সুকৌশলে সম্পর্ক বজায় রাখতে দক্ষ। এদিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুট বলেন, "আমাদের মধ্যে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। দুই বন্ধুর মধ্যে যেমনটা হয়, ঠিক তেমনই।" তবে রুটের এই কূটনৈতিক বক্তব্য ট্রাম্পের কঠোর মনোভাবকে কতটা শান্ত করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ও তার দাম্পত্য জীবন নিয়ে কটাক্ষ করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ইরান-যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে অংশ না নেওয়াকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প ম্যাখোঁর ব্যক্তিগত জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছেন। স্থানীয় সময় গত বুধবার ওয়াশিংটনের একটি মধ্যাহ্নভোজে ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করতে গিয়ে ট্রাম্প ফরাসি উচ্চারণ অনুকরণ করে বলেন, “ম্যাখোঁর স্ত্রী তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, আর ম্যাখোঁ এখনও তার চোয়ালে ঘুষির ধাক্কা সামলাচ্ছেন।” ট্রাম্প এই মন্তব্য করেছেন ২০২৫ সালের একটি ভিডিও দেখার পর, যেখানে ভিয়েতনাম সফরের সময় ব্রিজিত ম্যাখোঁকে বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামার আগে হালকা ধাক্কা দিচ্ছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অশোভন’ ও ‘মানসম্মত নয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হ্যানয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “এর জবাব দেওয়ার দরকার নেই। এ ধরনের মন্তব্য মার্জিত এবং সম্মানজনক নয়। আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফিরিয়ে আনা।” ফ্রান্সের রাজনৈতিক মহলও ট্রাম্পের এই আচরণকে সমালোচনা করেছে। সংসদের নিম্নকক্ষের সভাপতি ইয়েল ব্রাউন-পিভেট বলেন, “এ সময় যখন বিশ্বের ভবিষ্যৎ ও ইরানের লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে, একজন রাষ্ট্রপতি হাসছে ও অন্যকে উপহাস করছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয়।” কট্টর-বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউড-এর সমন্বয়ক ম্যানুয়েল বোম্পার্ডও ম্যাখোঁর সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন। রক্ষণশীল ফরাসি দৈনিক লে ফিগারো ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘আরেকটি বিতর্কিত মন্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সাম্প্রতিক এক কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলে সাহায্য পেলে খুশি হব, যদিও আমরা দুষ্কৃতকারী ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মূলের ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়ছি। যদি পারেন, অবিলম্বে জাহাজ পাঠান।” এরপর ট্রাম্প ফরাসি উচ্চারণে ম্যাখোঁর জবাব অনুকরণ করে বলেন, “না না না, আমরা তা করতে পারি না, যুদ্ধ জেতার পর করতে পারব।” মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ট্রাম্প নিজেও ন্যাটোকে ‘কাগজের বাঘ’ আখ্যা দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পোল্যান্ড। এতে পশ্চিমা জোটের ভেতরে সমন্বয় ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশ বলেছেন, তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে দেশের আকাশসীমা ও ন্যাটোর পূর্ব সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে সেগুলো অন্য অঞ্চলে পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য ইরানি হামলা প্রতিরোধে পোল্যান্ডের কাছে অন্তত দুটি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছিল। তবে ওয়ারশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজস্ব নিরাপত্তা বিবেচনায় তারা এ অনুরোধ রাখতে পারছে না। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চললেও ইরান পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি। পাল্টা হামলায় মার্কিন ঘাঁটি ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি ন্যাটো জোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থান ভবিষ্যতে পশ্চিমা জোটের ঐক্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এরই মধ্যে স্পেনও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।