ইরানের রাজধানী তেহরানের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা প্যালেস্টাইন স্কয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে একটি বড় বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। বিলবোর্ডে ট্রাম্প, তার স্ত্রী ও সন্তানদের ছবির নিচে মার্কিন পতাকায় মোড়ানো কফিনের ছবি দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা রয়েছে, ‘রক্তের বদলে রক্ত’। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যে বিলবোর্ডটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, বিলবোর্ডটি তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ারে স্থাপন করা হয়েছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং ট্রাম্পের সন্তানদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের নিচে মার্কিন পতাকায় মোড়ানো একাধিক কফিনের প্রতীকী ছবি দিয়ে প্রতিশোধের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে তেহরানের এঙ্গেলাব স্কয়ারেও আরেকটি বিলবোর্ডে ট্রাম্পকে খোলা কালো কফিনে শোয়ানো অবস্থায় দেখানো হয়। সেখানে ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় ‘We Kill Trump’ বা ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’ লেখা ছিল। এসব বিলবোর্ড এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে আনা হয়েছে, যখন ইরানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও প্রকাশ্যে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ার ও এঙ্গেলাব স্কয়ারের বড় বড় দেয়ালচিত্র ও বিলবোর্ড দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের জন্য পরিচিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী নানা প্রচারণায় এসব স্থান নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, তার বা তার পরিবারের ওপর ইরানের পক্ষ থেকে কোনো হামলার চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব দেবে। সাম্প্রতিক বিলবোর্ডগুলো দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজধানী তেহরানের আকাশসীমায় সোমবার কঠোর ফ্লাইট নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে ইরান। নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে তেহরানের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে এবং নির্ধারিত অনেক ফ্লাইট স্থগিত বা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাজধানীর আকাশসীমায় আজ যাত্রীবাহী বিমান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে তেহরানের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রী গ্রহণ ও ছাড়ার কার্যক্রম সীমিত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে এ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত কারণ প্রকাশ করেনি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অনেক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন আগেই ইরানের আকাশপথ এড়িয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছিল। সর্বশেষ এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় ইউরোপ-এশিয়া রুটে চলাচলকারী কিছু বিমানের পথ আরও পরিবর্তিত হতে পারে। আকাশসীমায় এমন বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সময়সূচি, অপারেশনাল ব্যয় এবং যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের ভ্রমণের আগে নিজ নিজ এয়ারলাইনের সর্বশেষ ফ্লাইট তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং নতুন নির্দেশনা এলে তা অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানের সামরিক সক্ষমতায় এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও অপেক্ষার পর অবশেষে ইরানের ক্রয়াদেশ দেওয়া ২০টি অত্যাধুনিক সু-৩৫ বা সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রথম ব্যাচের উৎপাদন সম্পন্ন করেছে রাশিয়া। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর অন্তর্ভুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দূরপাল্লার আকাশ অভিযানে ইরানের কৌশলগত আধিপত্য এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। 'মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন'-এর তথ্যমতে, রাশিয়ার কোমসোমলস্ক-অন-আমুর প্ল্যান্টে তৈরি হওয়া এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো চূড়ান্ত হস্তান্তরের আগে বর্তমানে রাশিয়াতেই অবস্থান করছে। তবে এই বিমানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক ব্যয়ভার ইতিমধ্যেই বহন করছে ইরান। মূলত ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত এক ঐতিহাসিক মেগা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ইরান সর্বমোট ৪৮টি সু-৩৫ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দিয়েছিল, যার প্রথম চালান এখন সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। ন্যাটো কর্তৃক 'সুপার ফ্ল্যাঙ্কার' নামে পরিচিত এই সু-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলো সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। এগুলো প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার যুদ্ধসীমায় শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম। সংক্ষিপ্ত বা অস্থায়ী রানওয়ে থেকে উড্ডয়নের সক্ষমতা থাকায় যুদ্ধের ময়দানে এই যুদ্ধবিমানকে নিষ্ক্রিয় করা বেশ কঠিন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধের কারণে রাশিয়া সাধারণত বছরে মাত্র ১৪টির মতো সু-৩৫ তৈরি করলেও, বর্তমানে ইরানের এই ক্রয়াদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আগামী কয়েক বছর খোদ রুশ বিমানবাহিনীর জন্যই নতুন সুখোই সরবরাহের পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এদিকে, ইরানের হামাদান বিমানঘাঁটির অবকাঠামোগত সংস্কারের কারণে যুদ্ধবিমানগুলো তেহরানে পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হলেও চলতি ২০২৬ সালের মধ্যেই এগুলোর সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে তেহরানের এই সমরাস্ত্র চুক্তি কেবল সু-৩৫-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইতিমধ্যেই ইরানি পাইলটরা রাশিয়ার দেওয়া ইয়াক-১৩০ ট্রেইনার বিমানে উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এর পাশাপাশি তেহরান আরও ১২টি তুলনামূলক সাশ্রয়ী সু-৩০এসএম২ ফাইটারের অর্ডার দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার সু-৫৭ কেনারও জোরালো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে বাধ্য হয়ে সেকেলে মার্কিন যুদ্ধবিমানের (যেমন- এফ-১৪, এফ-৪) ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে শক্তিশালী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তুললেও এভিয়েশন বা আকাশ সক্ষমতায় তারা বেশ পিছিয়ে ছিল। বর্তমানে রাশিয়ার সাথে এই কৌশলগত চুক্তির ফলে ইরানের সেই দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানকে ঘিরে শোকের পাশাপাশি প্রবল রাজনৈতিক আবহও দেখা গেছে। রাজধানীর প্রধান শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেয়। অনুষ্ঠানজুড়ে বারবার ধ্বনিত হয় ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ চাই’ স্লোগান, যা পুরো পরিবেশকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। রাষ্ট্রের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিদায় অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ তেহরানে জড়ো হন। অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, কালো শোকপতাকা এবং খামেনির প্রতিকৃতি। শোক প্রকাশের পাশাপাশি উপস্থিত অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন স্লোগানে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত জনতার কণ্ঠে আরও শোনা যায়, ‘আমাদের স্লোগান একটাই—প্রতিশোধ’ এবং ‘আমাদের নেতার রক্ত বৃথা যাবে না’—এ ধরনের স্লোগান। এসব স্লোগান শোকানুষ্ঠানকে শুধু ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় আচারেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তা রাজনৈতিক বার্তারও রূপ নেয়। বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয় এবং অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। বিপুল জনসমাগমের কারণে পুরো এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে চলবে শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী মরদেহ বিভিন্ন শহরে নেওয়ার পর দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে উচ্চারিত যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শোকানুষ্ঠানের দৃশ্য ও স্লোগান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই নিজেদের বিমানবাহিনীকে অভাবনীয় মাত্রায় শক্তিশালী করতে রাশিয়ার সঙ্গে বিশাল সামরিক চুক্তির পথে হেঁটেছে ইরান। জানা গেছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তেহরানের কাছে ৩০টি অত্যাধুনিক ‘সু-৩৫’ ফাইটার জেট হস্তান্তর করতে যাচ্ছে মস্কো। রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ২০টি যুদ্ধবিমানের উৎপাদন পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি ১০টি ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এটিই হতে যাচ্ছে ইরানের সবচেয়ে বড় সামরিক অস্ত্র চুক্তি। মূলত রাশিয়ার কাছ থেকে মোট ৪৮টি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘সু-৩৫’ যুদ্ধবিমান কিনছে তেহরান। বর্তমানে ইরানের বিমানঘাঁটিগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে, যা শেষ হলেই এই যুদ্ধবিমানগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে। এই বৃহৎ চুক্তির পাশাপাশি ইরান সম্প্রতি রাশিয়ার কাছ থেকে ১২টি ব্যবহৃত ‘সু-৩০এসএম২’ দূরপাল্লার ফাইটার জেটেরও অর্ডার দিয়েছে, যা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের ‘সু-৫৭’ স্টিলথ ফাইটার জেট কেনার বিষয়েও দুপক্ষের আলোচনা বেশ ইতিবাচকভাবে এগিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিবর্তিত সামরিক ভারসাম্য ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও ইরানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, রাশিয়ার তৈরি এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের বিমানবাহিনীর আক্রমণ ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আমলের পুরোনো এফ-৪ এবং এফ-৫ বিমান ব্যবহার করেই ইরান যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের নিশ্ছিদ্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার যুদ্ধ ব্যাসার্ধের সু-৩৫ যুক্ত হলে আঞ্চলিক আকাশসীমায় তেহরানের সামরিক প্রভাব ও আধিপত্য যে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক একটি চুক্তির মাধ্যমে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তির তোয়াক্কা না করে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল তাদের সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি এমন একটি হামলায় চারজনের প্রাণহানির পর এবার তেল আবিবকে অত্যন্ত কড়া জবাব দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড 'খাতাম আল-আনবিয়া' ইসরায়েলের এই অব্যাহত আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, "জায়োনিস্ট শাসকগোষ্ঠীর শিশু হত্যাকারী সেনাবাহিনী যদি দক্ষিণ লেবাননে তাদের এই আগ্রাসী ও বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ না করে, তবে তাদের জন্য ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও চরম পরিণতি অপেক্ষা করছে।" বিবৃতিতে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধ অবসানের ওই চুক্তি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল লেবাননে অন্তত "৮৪ বার" যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া সমঝোতা চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও চরম উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছে তেহরান।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির খসড়া প্রস্তুত বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়ে অনড় অবস্থান জানিয়েছে ইরান। মার্কিন মিত্র ইসরায়েল দাবি করেছে, ট্রাম্প তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে চুক্তির আওতায় ইরানের সমস্ত সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান জব্দ বা সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা 'ইরনা' (IRNA) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই বিষয়টি তাদের আলোচনার টেবিলেই নেই। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর দুই দেশের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা অবসানে গত এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে স্থায়ী সমঝোতার ক্ষেত্রে এই দুটি প্রধান শর্ত এখন বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম 'মেহর নিউজ'-এর মাধ্যমে ফাঁস হওয়া খসড়া চুক্তির তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে যুদ্ধাবসান, ইরানের অবরুদ্ধ ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ খালাস, তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত এবং ইরানি বন্দরের ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তেহরান। তবে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের অবরুদ্ধ তহবিলের অর্ধেক মুক্তি এবং তেল নিষেধাজ্ঞা স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না। একই সাথে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার বিষয়েও জোর দিয়েছে তেহরান, যার অধীনে আন্তর্জাতিক নৌযানগুলোকে এই পথ দিয়ে পারাপারের জন্য ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি নিতে হবে। ইরানের এই অনমনীয় মনোভাব সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী এবং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইতিমধ্যেই এই খসড়া অনুমোদন করেছেন। খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার খবর আসার পর ট্রাম্প ইরানে পূর্বনির্ধারিত একটি বড় বিমান হামলা বাতিল করেন এবং শীঘ্রই চুক্তির সময় ও স্থান ঘোষণা করা হবে বলে জানান। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপের পর পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, যেকোনো চুক্তিতে অবশ্যই তেহরানের পারমাণবিক উপাদান অপসারণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংসের কঠোর শর্ত থাকতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তার প্রধানমন্ত্রিত্ব থাকাকালীন ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
ইরানের ওপর সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলাগুলো মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, এই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি দায় রয়েছে এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা বাড়ছে, তার পরিণতি ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে। সোমবার (৮ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল বাঘেই বলেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বৃহত্তর কৌশলগত সমন্বয়ের অংশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। বাঘেইর ভাষ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির অবস্থান ‘রাজনৈতিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সোমবার ভোরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। এতে ওই শিল্প কমপ্লেক্সের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এরই মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে। ওই সময়ের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর আঘাত হানে। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে শান্তি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। তুরস্কভিত্তিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির দিকে তেহরানকে বাধ্য করতেই এই পদক্ষেপ বিবেচনায় নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৬ হাজার সেনাসহ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং একাধিক যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হতে পারে। পাশাপাশি চলতি মাসের শেষ দিকে আরও প্রায় ৪ হাজার ২০০ অতিরিক্ত সেনা যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়টি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগামী ২২ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হচ্ছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে। এমনকি পেন্টাগন শুধু সেনা মোতায়েন নয়, সম্ভাব্য সরাসরি হামলা বা স্থল অভিযানের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—ইরানের পারমাণবিক উপাদান অপসারণ, হরমুজ প্রণালি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে উপকূলজুড়ে মেরিন বাহিনী মোতায়েন, এবং ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপ-এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো পদক্ষেপ। তবে এসব পরিকল্পনা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পেন্টাগন। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি আরও জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ইতিহাসে এবার ইসরায়েলে সবচাইতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। বুধবার চালানো এই হামলায় কেঁপে উঠেছে তেল আবিবসহ ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনথ জানিয়েছে, ইসরায়েলের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১০টি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। হামলার সময় সাইরেনের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে কয়েক লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, বেশ কিছু এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র ক্লাস্টার ওয়ারহেড বহন করছিল যা জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তেল আবিব ছাড়াও শেফেলা এবং জেরুজালেম এলাকায় সতর্ক সংকেত বাজানো হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত এই হামলায় কোনো নিহতের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এই হামলার পরপরই ইসরায়েলি বিমান বাহিনী তেহরানে ভয়াবহ পাল্টা হামলা শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। তেহরানের কয়েক ডজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এই সংঘাত শুরু হয়েছে যা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। উভয় দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় এ পর্যন্ত এক হাজার তিনশ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। এর পর থেকেই ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং বিমান চলাচলে চরম বিঘ্ন ঘটছে। জর্ডান ও ইরাকেও হামলার খবর পাওয়া গেছে যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। বড় শক্তিগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে প্রতিদিন আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে। বিশ্ববাসী এখন চরম উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছে যে এই সংঘাতের শেষ কোথায়। আপাতত কোনো পক্ষই নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না যা যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে নিজের দেশেই অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন তেহরানে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্সেই দেদভ। তিনি জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে খামেনি জনসমক্ষে উপস্থিত হচ্ছেন না। রুশ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেদভ বলেন, “জনগণের বোঝা উচিত, তার জনসমক্ষে না আসার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইরান সরকার বারবার জানিয়েছে, নতুন নেতা দেশে আছেন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে জনসমক্ষে আসা থেকে বিরত আছেন।” তিনি আরও বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিই মূল কারণ। এখনও পর্যন্ত খামেনির সঙ্গে তার কোনো সরাসরি বৈঠক হয়নি। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন নেতাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন এবং তেহরানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। এর আগে বিভিন্ন মহলে খামেনির অবস্থান নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। জনসমক্ষে না আসায় এমন গুঞ্জন ছড়ায় যে, তার বেঁচে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করেছে, দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেঁচে আছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
ইরানের রাজধানী তেহরানে রোববার (২৯ মার্চ) ভোরে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, বিস্ফোরণের সঠিক স্থান ও কারণ সম্পর্কে পরে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হবে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তাদের সাংবাদিকরা উত্তর তেহরানে সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। ওই সময়ে সেখানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। তবে কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরবর্তীতে আলজাজিরা জানায়, বাংলাদেশ সময় সকাল প্রায় ১১টায় উত্তর তেহরানে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আরও কয়েকটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ ধরা পড়ে। এরপর সাংবাদিকরা একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি ওঠতে দেখেছেন। উল্লেখ্য, ওই এলাকায় অনেক সামরিক স্থাপনা থাকলেও সাধারণ মানুষের আবাসস্থলও রয়েছে। তাই নতুন হামলার সঠিক লক্ষ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর থেকে সংঘর্ষ চলছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে, যা সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সূত্র: আলজাজিরা
ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনা ঘটে শনিবার (২৮ মার্চ) ভোরে। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্য উদ্ধৃত করে আল জাজিরা এ খবর প্রকাশ করেছে।
হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে চালু করার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার তেহরান জানায়, স্পেনের পক্ষ থেকে আসা অনুরোধ তারা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, যেসব জাহাজ ‘শত্রুভাবাপন্ন দেশের’ নয়, সেগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালী পার হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ইউরোপীয় কোনো দেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের বার্তা এই প্রথম দিল ইরান। স্পেন শুরু থেকেই মার্কিন-ইসরাইলি হামলার সমালোচনায় সরব ছিল এবং এই অভিযানকে ‘অবৈধ’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্পেনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস জানায়, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি স্পেনের অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে তেহরান। তাই মাদ্রিদের অনুরোধগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘকে জানায়, ‘অশত্রু’ দেশের জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় সমন্বয় করলে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে পারবে। ইরানের অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত। তবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কিছু দেশের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের একটি তেলবাহী জাহাজ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদে প্রণালী অতিক্রম করেছে। একইভাবে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তাদের জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ইরান ইতোমধ্যে ১০টি তেলবাহী জাহাজকে প্রণালী পার হতে দিয়েছে। এসবের মধ্যে পাকিস্তানের পতাকাবাহী কিছু জাহাজও রয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনের বাণিজ্যিক নৌবহর তুলনামূলকভাবে ছোট। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে তাদের বহরে ৯১টি জাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি তেলবাহী ও গ্যাসবাহী জাহাজও অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।