- প্রচ্ছদ
- Topic
বন্যা
শক্তিশালী উপকূলীয় ঝড়ে নিউ জার্সির সার্ফ সিটির রাস্তায় পানি জমেছে। এর মধ্যে প্লাবিত একটি রাস্তায় হাঙরের মতো একটি প্রাণী সাঁতার কাটার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক পোস্ট এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে প্রাণীটিকে রাস্তার জমে থাকা পানির মধ্য দিয়ে একটি বাড়ির গাড়ি রাখার জায়গার দিকে যেতে দেখা যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ ১২ জানিয়েছে, ভিডিওটি তাদের এক দর্শক পাঠিয়েছেন। প্রাণীটি হাঙর কি না, তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা এটিকে সম্ভাব্য হাঙর দেখা যাওয়ার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এদিকে ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, ঝড়ের প্রভাবে নিউ জার্সির উপকূলে প্রবল বাতাস, উঁচু ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। নিচু উপকূলীয় এলাকায় পানি ঢুকে রাস্তা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল। ভাইরাল ভিডিওতে প্রাণীটির পরিচয় নিয়ে আলোচনা চললেও এর প্রজাতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পূর্ণিমার জোয়ারের সঙ্গে শক্তিশালী নর’ইস্টারের প্রভাব মিলিয়ে নিউইয়র্কের উপকূলীয় এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। সপ্তাহান্তে পূর্ব উপকূলে ভারী বৃষ্টি ও ঘণ্টায় ৫০ মাইলের বেশি বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তবে ঝড়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব নিউইয়র্ক সিটির পূর্বদিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় নগরীতে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। আবহাওয়াবিদদের মতে, জার্সি শোর, লং আইল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল এবং নিউ ইংল্যান্ড উপকূলে ঝড়ের প্রভাব বেশি হতে পারে। নিউইয়র্ক সিটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উপকূলীয় বন্যা। বিশেষ করে স্ট্যাটেন আইল্যান্ড ও লং আইল্যান্ডের নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জোয়ারের সময় পানি ঢুকে সাময়িক বন্যা দেখা দিতে পারে। শনিবার পূর্ণিমার কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় জোয়ারের উচ্চতা বাড়বে। এর সঙ্গে উপকূলের দিকে প্রবাহিত শক্তিশালী বাতাস যুক্ত হওয়ায় স্ট্যাটেন আইল্যান্ড ও লং আইল্যান্ডে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১ থেকে ২ ফুট বেশি উঠতে পারে। সমুদ্রসৈকতগুলোতেও শক্তিশালী রিপ কারেন্টের আশঙ্কা রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতে বড় ধরনের নগর বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জোয়ারের সময় ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার বন্যা হতে পারে। শুক্রবার থেকে শনিবারের মধ্যে ঝড়ের মূল অংশ মেট্রোপলিটন এলাকার কাছাকাছি থাকবে। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া নিউইয়র্কের পাঁচ বরোর পূর্বদিকে, বিশেষ করে সাফোক কাউন্টির দিকে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা ঝড়ের আগে বাসাবাড়ির বাইরে থাকা হালকা আসবাব, ময়লার পাত্র ও অন্যান্য ঢিলা জিনিস নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি জোয়ারের সময় স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূল এবং লং আইল্যান্ডের উত্তর উপকূলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবার নিউইয়র্কে বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো আবহাওয়া থাকতে পারে। রোববারও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। সোমবার নাগাদ আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে উষ্ণ গালফ স্ট্রিমের ওপর দিয়ে কয়েক দিন ধরে ঝড়টি চলাচল করায় এর মধ্যে ক্রান্তীয় ঝড়ের কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। এমন পরিস্থিতিতে ঝড়টি সাবট্রপিক্যাল ঝড়ের মতো আচরণ করতে পারে। তবে এর গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তন নিয়ে পূর্বাভাস আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হবে।
নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যার জেরে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে থাকার পর অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন এক কর্মী। ভয়ংকর সেই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ জানান, বন্যার পানি যখন সুড়ঙ্গে ঢুকতে শুরু করে, তখন তিনি তার সহকর্মীদের দ্রুত ওই স্থান থেকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে অন্যদের নিরাপদে সরিয়ে দিতে গিয়ে নিজে বের হওয়ার আর পর্যাপ্ত সময় পাননি তিনি। নিজের কর্তব্যের প্রতি অবিচল সঞ্জয় বলেন, বিপদের মুহূর্তে সহকর্মীদের ফেলে নিজে পালিয়ে যাওয়াটা তার কাছে কোনোভাবেই সঠিক মনে হয়নি; কারণ তার প্রধান দায়িত্বই ছিল অন্যদের জীবন রক্ষা করা। সুড়ঙ্গের ঘুটঘুটে অন্ধকারে কাটানো সেই দীর্ঘ নয় দিনের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, বেঁচে ফেরার আশা জাগিয়ে রাখতে তিনি অনবরত মন্ত্র জপ করতেন। সেই চরম প্রতিকূল ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্তে আটকে থাকা আরও তিন-চারজন কর্মীর সঙ্গে কোনোমতে যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে সঞ্জয় সাহকে জীবিত অবস্থায় সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনা হয়। তার সঙ্গে উদ্ধার পাওয়া আরেকজন ভাগ্যবান কর্মী হলেন মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহার্জন। নেপালের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে তাদের এই ফিরে আসা শুধু বেঁচে ফেরার গল্প নয়, বরং চরম বিপদের মুহূর্তে দায়িত্ববোধ ও অদম্য সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে হেলিকপ্টার উড়িয়ে মাত্র ছয় দিনে প্রায় ১০০টি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন দেশটির প্রথম নারী হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে তিমুরে এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর আকাশপথে দুর্গতদের সরিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ৪০ বছর বয়সী প্রিয়া অধিকারী উচ্চ উচ্চতায় উদ্ধার অভিযানে অভিজ্ঞ পাইলট। গত কয়েক দিনে তিমুরে ও আশপাশের দুর্গম এলাকায় প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার একসঙ্গে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। একই এলাকায় একাধিক হেলিকপ্টারকে প্রায় একই সময়ে অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে হয়েছে। এ সময় পাইলটদের রেডিওতে নিয়মিত সমন্বয় করতে হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ধসে পড়া পাহাড়ি মাটি ও কাদায় তৈরি অনিরাপদ ভূমি। অনেক জায়গায় মাটি এতটাই নরম ও অস্থিতিশীল ছিল যে হেলিকপ্টার নিরাপদে অবতরণ করে ইঞ্জিন বন্ধ করাও সম্ভব হয়নি। ফলে যাত্রীদের দ্রুত তুলে নিয়ে আবার উড্ডয়ন করতে হয়েছে। প্রিয়া অধিকারী জানিয়েছেন, এবারের দুর্যোগের ভয়াবহতা তার বহু বছরের অভিজ্ঞতাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তিমুরে এলাকায় তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন, আবার একই সঙ্গে হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় থাকা জীবিত মানুষকেও উদ্ধার করেছেন। প্রথম দুই দিনেই তিমুরে থেকে ২০০ জনের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অধিকারীর বিমান চালনার যাত্রা শুরু হয় কিছুটা ভিন্নভাবে। পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করেন। পরে হেলিকপ্টার চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হলে ফিলিপাইনে প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৭ সালে পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর উচ্চ উচ্চতায় উদ্ধার অভিযানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। তার কয়েকটি উদ্ধার অভিযান প্রায় ৬ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছে। নেপালে গত ২৬ আগস্ট শুরু হওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টারই হয়ে উঠেছে প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। আজও বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চলছে। প্রিয়া অধিকারী বলেন, টানা উদ্ধার অভিযানে পাইলটরা শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই তাদের প্রশিক্ষণের অংশ। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জীবিত মানুষকে হেলিকপ্টারের দিকে হাত নাড়তে দেখা তাদের আবারও আকাশে উড়তে অনুপ্রাণিত করেছে।
ফিলিপাইনের এক যুগল প্রমাণ করেছেন, দৃঢ় ইচ্ছা ও ভালোবাসার কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগও হার মানে। প্রবল বর্ষণ ও বন্যার কারণে চারপাশ যখন তলিয়ে গেছে, ঠিক তখনই ম্যানিলার উত্তরাঞ্চলীয় হাগোনয় শহরের সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট গির্জায় কোমরসমান ঘোলা পানিতে দাঁড়িয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন লেইন লিজা গালাং এবং গিলবার্ট চিকো। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী বিয়ের আয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত এক মাস ধরে টানা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে ফিলিপাইনের এই অঞ্চলটি ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। আগস্ট মাসে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৩৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় ওই গির্জাটিও প্রায় এক মাস ধরে আংশিকভাবে পানির নিচে তলিয়ে আছে। এ কারণে গির্জা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই যুগলকে বিয়ের অনুষ্ঠান আপাতত স্থগিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে নিজেদের সিদ্ধান্তে অটুট থেকে এই দুর্যোগের মাঝেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। কনে লেইন লিজা বন্যার পানিতে হাঁটার সুবিধার্থে তার বিয়ের গাউনটির নিচের অংশ কেটে কিছুটা ছোট করে নিয়েছিলেন। উঁচু কাঠামোর একটি রিকশায় চড়ে তারা গির্জার প্রাঙ্গণে পৌঁছান, যাতে পানিতে নামার আগে পোশাক ভিজে বা নষ্ট না হয়। বিয়ের চিত্রগ্রাহক মিক্কো রে আলফোনসো জানান, এই যুগলের ভালোবাসার কাছে কোনো বাধাই টিকতে পারেনি। গির্জার ভেতরে ১৫ জনেরও কম অতিথির উপস্থিতিতে এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। গির্জার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্লাস্টিকের ফুলে সাজানো ফাঁকা বেঞ্চের সামনে কনেকে জড়িয়ে ধরে আছেন তার বাবা-মা। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, কোমরসমান পানিতে হেঁটে বিয়ের আংটি হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক কিশোর। মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বর গিলবার্ট চিকো জানান, তাদের বিয়েটি মূলত ডিসেম্বরে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গোড়ালিতে আঘাত পাওয়ার কারণে তিনি বাধ্য হয়ে আগেভাগেই ছুটি নিয়ে দেশে ফেরায় বিয়ের তারিখ এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানো শত শত ছবির সামনে ভিড় করছেন স্বজনরা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মরদেহের ছবিও সেখানে রাখা হয়েছে। গত সপ্তাহে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় নেপালে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের বাইরে দেয়ালে টাঙানো এসব ছবির সামনে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ। কেউ ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন স্বজনের মুখ, আবার কেউ নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে জানতে চাইছেন, তাদের নিখোঁজ আত্মীয়ের কোনো সন্ধান পাওয়া গেছে কি না। নিখোঁজ চাচাতো বোনের সন্ধানে প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন স্বাতী সিগদেল। তিনি বলেন, ‘তিন দিন আগে আমরা এখানে ওর ছবি লাগিয়েছি। কিন্তু এখনও কোনো খবর পাইনি।’ কিছু ছবি নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম, পরিচয় ও যোগাযোগের নম্বরসহ পোস্টারে লাগানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো ছবির নিচে হাতে লেখা হয়েছে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য। একটি ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতির মাথার ওপরে বড় করে ‘নিখোঁজ’ লেখা রয়েছে। অন্য একটি ছবিতে এক তরুণের ছবি দেওয়ার পাশাপাশি তার বাম হাতের ট্যাটুর ছবিও রাখা হয়েছে, যাতে সহজে তাকে শনাক্ত করা যায়। স্বপ্না নেউপানে নামের এক নারী বলেন, ‘আমরা একটি অলৌকিক ঘটনার আশায় আছি।’ তার মামার পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ। তিনি বলেন, ‘এই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার ছবি দেখা খুবই কঠিন।’ এদিকে প্রায় ৯০০ মানুষ বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। কাঠমান্ডুর বাগমতী নদীর তীরে পশুপতিনাথ মন্দিরে এমন কয়েকটি পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের প্রতিকৃতি তৈরি করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে। এমনই একটি পরিবার ২১ বছর বয়সী সাবিনের প্রতিকৃতি তৈরি করে ধর্মীয় আচার পালন করে। হিন্দু পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করার সময় পরিবারের সদস্যরা প্রতিকৃতিতে পানি ঢালেন। পরে চিতায় আগুন দেওয়া হয়। সাধারণত মৃত ব্যক্তির জন্যই এ ধরনের ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। তবে হাসপাতালের ‘ছবির দেয়ালের’ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাতী সিগদেল এখনো আশা হারাননি। গত সোমবার থেকে প্রতিদিন সেখানে আসছেন তিনি। সিগদেল বলেন, ‘কোনো খবর পাওয়ার আশায় আমি প্রতিদিন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসি।’ নেপালের এই ‘ছবির দেয়াল’ এখন নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে থাকা অসংখ্য পরিবারের কাছে শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন ছবি যুক্ত হচ্ছে সেখানে, আর প্রতিটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে স্বজনরা খুঁজছেন একটি পরিচিত মুখ—হয়তো মিলবে প্রিয় মানুষটির কোনো সন্ধান।
গত ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ১৯ বছর বয়সী তরুণ বিনোদ। রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। ছেলের সন্ধানে চোখেমুখে ক্লান্তি ও বিষাদ নিয়ে মাইলের পর মাইল পাহাড়ি পথ হেঁটে চলেছেন প্রায় ৫০ বছর বয়সী টালকা সদা। সমতলভূমির জেলা সপ্তরীর বাসিন্দা সদার একমাত্র ছেলে বিনোদের সঙ্গে ওই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে থাকা ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী আরও চার তরুণের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে শোকাহত স্ত্রীর কান্না ও নিজের বুক ফাটা হাহাকার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন এই বাবা। ছেলের খোঁজে বের হওয়ার জন্য চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে সদাকে। প্রতি ১০০ রুপিতে ২০ রুপি সুদের শর্তে মাত্র ২ হাজার নেপালি রুপি ধার করে ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন তিনি। প্রথমে বাসে করে ৯ ঘণ্টার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান রাজধানী কাঠমান্ডুতে। বন্যার পর অনেককে সেখানে বিমানে করে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রথমে বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গে বেঁচে যাওয়া মানুষ এবং লাশের তালিকায় ছেলেকে খুঁজেছেন সদা। মর্গের বাইরে রাখা বিকৃত ও শনাক্তকরণের অনুপযোগী লাশের ছবিগুলোর ভিড়েও তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন সন্তানকে, তবে কোনো খোঁজ মেলেনি। কাঠমান্ডুতে সন্ধান না পেয়ে বিনোদের কর্মস্থলের নিকটবর্তী জেলা নুয়াকোটের দিকে হেঁটে রওনা দেন দুই ভাই। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর ত্রিশূলী শহরে পৌঁছান তারা। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটি কমলা রঙের পলিথিনকে রেইনকোট হিসেবে ব্যবহার করছেন সদা। ত্রিশূলীতে একটি লজে থাকতে গিয়ে ধার করা টাকার ১ হাজার ৫০০ রুপিই খরচ হয়ে যায়, বিনিময়ে জোটে কেবল এক বাটি ভাত। ক্ষুধা ও ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক, যা তাদের বাড়ি ফেরা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অসংখ্যবার ছেলের মুঠোফোনে কল করেও কোনো সাড়া পাননি সদা। চরম অসহায়ত্বের মাঝেও তিনি অলৌকিক কিছুর আশায় বুক বাঁধছেন, হয়তো ছেলে দৌড়ে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতার কঠিন ধাক্কায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। অন্তত ছেলের কর্মস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত হাল ছাড়তে রাজি নন এই বাবা। তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে পুনরায় রওনা দেওয়ার সময় চরম ক্ষোভ ও হতাশায় তিনি চিৎকার করে জানান, কেউ সাহায্য না করলে বা জবাব না দিলে তিনি থানায় আগুন ধরিয়ে দেবেন। এক অসহায় বাবার এই হুঁশিয়ারি মূলত সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ।
নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৬ আগস্ট শুরু হওয়া এই প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত এক হাজার তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯১৬ জন। উচ্চভূমি থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, বরফশীতল পানি, পাথর ও কাদার স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও জনপদ। চারদিকে শুধু স্বজনহারা মানুষের কান্না আর ধ্বংসস্তূপের চিত্র, যা পুরো এলাকাকে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় মৃতদেহ শনাক্ত করা এবং ধর্মীয় রীতি মেনে পৃথকভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ নিহতদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর গণকবরের মাধ্যমে দাফন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চিতওয়ান জেলায় এরই মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চিরায়ত দাহ ও প্রার্থনার রীতির বদলে এই গণকবরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্যোগের ভয়াবহতার সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্রটি দেখা গেছে নুয়াকোট জেলায়। সেখানে দুর্গম এলাকায় ড্রোন দিয়ে তল্লাশি চালানোর সময় পুলিশ একটি মাত্র বাড়ির ভেতর থেকেই ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। হিমালয়ঘেঁষা এই বিপর্যয়ের ভয়াবহ প্রভাব কেবল নেপালের সীমানাতেই আটকে নেই; নদীর ভাটির স্রোতে ভেসে যাওয়া অন্তত ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এই ভয়াবহ দুর্যোগকে ‘অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকাজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে এবং উদ্ধার তৎপরতায় আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে সপ্তাহান্তে আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় তিন বন্ধুর মধ্যে দুজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং তৃতীয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিহতরা হলেন টেক্সাসের গ্রানবারি শহরের ৪৬ বছর বয়সী চিকিৎসক ডা. জন জিউস্টি এবং ৪২ বছর বয়সী ব্রেন্ট রোজেনক্রাঞ্জ। তাদের আরেক বন্ধু ৫৩ বছর বয়সী টিমোথি অ্যালেন স্মিথের সন্ধানে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার ক্যানিয়নে প্রবেশ করে এই তিন বন্ধু ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যাম্পগ্রাউন্ডে গিয়েছিলেন। সেখানে দুদিন ঘুরে মাছ ধরার পর হাভাসুপাই গার্ডেনস হয়ে তাদের ফেরার কথা ছিল। ব্যক্তিজীবনে নিহত ও নিখোঁজ তিনজনেরই স্ত্রী ও তিনটি করে সন্তান রয়েছে। পরিবারের শোকবার্তায় ডা. জিউস্টিকে একজন নিবেদিতপ্রাণ বাবা এবং বাস্তব জীবনের ‘সুপারহিরো’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্যদিকে, নিহত রোজেনক্রাঞ্জ ছিলেন একজন আজীবন মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক, যিনি সর্বদা তার প্রিয়জনদের পাশে থাকতেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। নিখোঁজ স্মিথের পরিবার জানিয়েছে, তিনি প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসতেন এবং হাইকিং বা ক্যাম্পিং করতে পছন্দ করতেন এই মর্মান্তিক ঘটনায় পরিবারগুলো গভীরভাবে শোকাহত এবং উদ্ধারকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রতি তারা বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মাত্র দুদিনে ছয় মাসের সমান বৃষ্টিপাতের ফলে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ব্রাইট অ্যাঞ্জেল এবং ফ্যান্টম র্যাঞ্চ এলাকায় এই প্রলয়ঙ্করী বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে ১৫ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়ালেও, উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতায় ৬১ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ায় বর্তমানে কেবল স্মিথই নিখোঁজ রয়েছেন। সোমবারের টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আকস্মিক এই বন্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে প্রাণে বেঁচে ফেরা পর্যটক এরিকা ভায়োলা জানান, রেঞ্জারদের নির্দেশে তারা যখন প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছিলেন, ঠিক তার দশ মিনিট পরেই পারাপারের জন্য ব্যবহৃত পদচারী সেতুটি বন্যার তোড়ে ভেসে যায়। পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিকের ওপর থাকা প্রায় সবগুলো সেতুই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ক্যানিয়নের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের জন্য পালানোর কোনো পথ অবশিষ্ট ছিল না।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ডের রোজলিন হাইটসের বাসিন্দা অমিতা আমিন। চলতি সপ্তাহে ওই অঞ্চলের গ্রাম ও উপত্যকাগুলোতে আকস্মিক বন্যার পানি আছড়ে পড়লে সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর যে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, ৬৭ বছর বয়সী অমিতা তাদেরই একজন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, অমিতা একটি ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে নেপাল থেকে তিব্বতে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে এটি ছিল তার সপ্তম তীর্থযাত্রা। তার ছেলে ডা. ধ্রুব আমিন জানান, নিখোঁজ হওয়ার আগে তার মায়ের সর্বশেষ অবস্থান ছিল এমন একটি ভবনে, যা পরবর্তীতে বন্যার ভয়াবহ আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। অমিতার সঙ্গে ধ্রুব আমিনের শাশুড়ি তেজাল ব্যোমেশ প্যাটেল এবং পারিবারিক বন্ধু জিতেন্দ্র মনুভাই প্যাটেলও ছিলেন। অমিতার স্বামী মহেন্দ্র আমিন জানান, ঘটনার পর থেকে ওই গ্রুপের কোনো সদস্যের সঙ্গেই তারা আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। গত বুধবার আঘাত হানা এই প্রলয়ংকরী বন্যার পর ওই অঞ্চলে ব্যাপক তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৫৪৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্তত দুই হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা যখন ধ্বংসস্তূপ ও প্লাবিত এলাকায় নিরলস তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন অমিতা আমিনের পরিবারও তাকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে আছে। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে মহেন্দ্র আমিনের আবেগঘন বার্তা— 'তুমি যদি আমাকে দেখে থাকো, তবে ফিরে এসো। আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।'
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে একটি ভবনে আটকে পড়া বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বুধবার, ২৬ আগস্ট, ভোতে কোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার পর চারদিকে পানি ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়লে তারা ওই ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরে উদ্ধারকারীরা তাদের নিরাপদে বের করে আনেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনটির চারপাশে প্রবল স্রোতে পানি ও কাদা ছুটে যাচ্ছে। আশপাশের এলাকা ভয়াবহভাবে প্লাবিত হলেও ভবনটি টিকে থাকায় ভেতরে থাকা মানুষগুলো সাময়িকভাবে নিরাপদ আশ্রয় পান। নেপালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত নদী থেকে ৫৩৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদেশি পর্যটকসহ বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। রসুয়া জেলায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বন্যায় আটকে পড়া ১ হাজার ৫৪৫ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। এর মধ্যে রসুয়া থেকে ৬৪৪ জন, নুওয়াকোট থেকে ৮৯৮ জন এবং ধাদিং থেকে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভয়াবহ এই বন্যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অনেক সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। হেলিকপ্টারের পাশাপাশি স্থলপথে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যার ঝুঁকি এখনো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার, নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ওই ভবনে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর নিরাপদে উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি এখন স্বস্তির একটি খবর হয়ে এসেছে।
নেপালে এক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। বিপর্যয়ের পর নিখোঁজদের যে দীর্ঘ তালিকা তৈরি হয়েছে, তাতে নাম রয়েছে প্রভাত সাজিপা (৪৮) নামের ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রযুক্তি কর্মীর। নেপালি কর্তৃপক্ষের প্রকাশ করা ৬৫ জন নিখোঁজ মার্কিন নাগরিকের প্রাথমিক তালিকায় তার নাম উঠে এসেছে। লিঙ্কডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, সাজিপা ২০১৬ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারাভিত্তিক ডেটা স্টোরেজ কোম্পানি ‘পিওর স্টোরেজ’-এ ইঞ্জিনিয়ারিং লিডার হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সিসকোতেও কাজ করেছেন। তার ভাতিজি কাব্যা কৌলাগি জয়তীর্থ বিবিসিকে জানিয়েছেন, সাজিপা দীর্ঘদিন ধরে ‘ইশা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি অলাভজনক আধ্যাত্মিক সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। সংস্থাটির একটি দল নেপালের ওই অঞ্চলে ভ্রমণের সময় এই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দলটির অন্তত ৮০ জন সদস্য এখনও নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ২২ জন মার্কিন নাগরিক। ইশা ফাউন্ডেশনের প্রধান জাগ্গি বাসুদেব বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় জানান, বন্যার ঠিক আগে দলটি জিরং-এর একটি ইমিগ্রেশন ভবনে অবস্থান করছিল। জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানার মাত্র ৯ মিনিট আগে তিনি দলনেতার কাছ থেকে শেষ বার্তা পান। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচু থেকে একটি হিমবাহের একাংশ ভেঙে উপত্যকায় আছড়ে পড়লে এই ভয়াবহ ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফধসের সৃষ্টি হয়। হিমবাহ ধসের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও এর ফলে সৃষ্ট বিশাল জলরাশি ও ধ্বংসস্তূপ নেপালের বহু বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, বন্যার তোড়ে অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ২৫ মাইল রাস্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাশাপাশি একাধিক গ্রাম ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে তিব্বতীয় কর্মকর্তারাও এই বিপর্যয়ে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নেপালে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, তারা নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে স্থানীয় প্রশাসন ও ট্যুর অপারেটরদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, অন্তত ৯০ জন মার্কিন নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং মাত্র তিনজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় একটি বৃদ্ধনিবাস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ২৪ ঘণ্টা আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ৯৪ বছর বয়সী গুনাকেশারি বোহারা। বুধবার, ২৬ আগস্ট রাশুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যার পর উদ্ধারকারীরা পাশের নুওয়াকোট জেলার তুপছে এলাকায় কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে তাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গুনাকেশারি রাশুয়ার একটি সরকারি বৃদ্ধনিবাসে থাকতেন। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে পুরো স্থাপনাটি ভেসে যায়। ওই প্রতিষ্ঠানে থাকা অন্য বাসিন্দা ও কর্মীদের কেউ বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। গুনাকেশারিকে সেখানকার একমাত্র জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর সদস্যরা একটি এক্সকাভেটর ব্যবহার করে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তার কাছে পৌঁছান। পরে তাকে সেখান থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। উদ্ধারের সময় তার পুরো শরীর কাদা ও মাটিতে ঢেকে ছিল এবং তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও আতঙ্কিত অবস্থায় ছিলেন। উদ্ধারের পর গুনাকেশারি প্রথমে নিজের নামও বলতে পারছিলেন না। পরে এক স্বজন তাকে শনাক্ত করেন। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং বন্যার ধাক্কায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুর ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয়। ২৬ আগস্ট রাশুয়ার ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার পর নেপালের রাশুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিংসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পরপরই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে বহু মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। একই সঙ্গে সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে। ৯৪ বছর বয়সে প্রায় এক দিন কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থেকেও গুনাকেশারির জীবিত উদ্ধার হওয়ার ঘটনা এই ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে বিরল এক বেঁচে ফেরার ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক বন্যার মধ্যে নিহত এক নারীর মরদেহ থেকে স্বর্ণালংকার খুলে নেওয়ার অভিযোগে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি ঘিরে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৬ আগস্ট নেপালে আকস্মিক বন্যার পর বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মৃত বন্যাকবলিত নারীদের মরদেহের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। ভিডিওটির সঙ্গে থাকা পোস্টে দাবি করা হয়, নিহতদের শরীরে থাকা স্বর্ণের কানের দুল ও নাকের অলংকার খুলে নেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দুর্যোগের মধ্যে যখন স্বজনরা নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের খুঁজছেন এবং উদ্ধারকাজ চলছে, তখন মৃতদেহ থেকেও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির প্রতিটি দৃশ্যের স্থান, সময় এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ভিডিওতে দেখা ঘটনাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ভিডিওটি কোথায় ধারণ করা হয়েছে, কারা এতে জড়িত এবং সত্যিই নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ থেকে স্বর্ণালংকার সরানো হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নেপালে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন এলাকায় মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করা এবং পরিবারের কাছে যথাযথ মর্যাদায় হস্তান্তর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি মৃতদের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো ব্যক্তির মরদেহ থেকে মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকলে, সেটি প্রমাণিত হওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে। এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই দুর্যোগের মধ্যেও মানবিকতা ও মৃতদের প্রতি সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। পুলিশি তদন্ত শেষ হলে ভাইরাল ভিডিওটির প্রকৃত ঘটনা এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ১৩ বছরের এক ব্রিটিশ কিশোরীসহ যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় নেপালে অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চীনেও অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ। নেপালের রাসুয়া অঞ্চলে পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও পানি নদীতে নেমে আসার পর মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে নদীর আশপাশের বসতি, সড়ক, ধাতব সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক বাড়িঘর ও যানবাহন কাদা ও পানির নিচে চাপা পড়ে গেছে। উদ্ধারকর্মীরা এখনো দুর্গত এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছেন। ৪০ জনের বেশি মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে দুর্গম এলাকা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকের ভাষায়, যেদিকে তাকানো যাচ্ছে, সেদিকেই ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর পাশে থাকা অনেক বসতি পুরোপুরি ভেসে গেছে। তার নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের পাশাপাশি তিব্বতের দিকেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনা কর্মকর্তারা বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত আছড়ে পড়ার আগে মানুষজন দ্রুত নিরাপদ স্থানে পালানোর চেষ্টা করছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়ও উঠে এসেছে ভয়াবহতার চিত্র। ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল জানান, হঠাৎ করে বিশাল কাদার স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে আসে। পানি ও কাদা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ার পর তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্রোতে তার স্ত্রী ভেসে যান। কয়েক ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারে করে তাকে উদ্ধার করা হলেও স্ত্রী এখনো নিখোঁজ। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিমবাহ থেকে তুষার ও বরফ ধসে পড়ার কারণে এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। পাহাড়ি এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পানি নেমে এসে নদীর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এদিকে নেপাল থেকে নেমে আসা পানির কারণে ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিহারে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও প্রায় ৭ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটকরাও রয়েছেন। একটি পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৪ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নেপাল ও তিব্বতের এই অঞ্চলটি মাউন্ট কৈলাসে তীর্থযাত্রার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সেখানে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রী জড়ো হন। এবারের দুর্যোগে মাউন্ট কৈলাসগামী ১৩৩ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রীও আটকা পড়েছেন বলে জানানো হয়েছে। দুর্যোগের পর নেপাল ও আশপাশের এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি দুর্গত মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে।
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকও রয়েছেন। নেপালের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বন্যার পানির সঙ্গে কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও সীমান্ত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুধবার স্থানীয় সময় সকালে ভোতে কোশি নদীর আশপাশে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। নেপাল পুলিশের হিসাবে এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সময়ে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, দেশটিতে ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ৪৭ জন যুক্তরাষ্ট্রের, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ার, ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের এবং ২৪ জন কানাডার নাগরিক। নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়েও রয়েছে। নিখোঁজদের বড় একটি অংশ তিব্বতের পবিত্র কৈলাস-মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন। নেপালের পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ১৩৩। এছাড়া স্থানীয় পর্যটক, তীর্থযাত্রী, গাইড ও নিরাপত্তাকর্মীরাও নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। তবে নেপাল ও চীনের নিখোঁজের হিসাবের মধ্যে একই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। প্রাথমিকভাবে এই দুর্যোগের পেছনে ভূমিকম্পের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রকৃতপক্ষে হিমবাহের বরফ ও পাথরের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার পর সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত থেকেই এই বন্যা তৈরি হয়েছে। উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের হিমবাহ ধসের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। বন্যার প্রবল স্রোতে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্ত এলাকার সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে। বহু বাড়িঘর কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আটকে পড়া মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাবার, তাঁবু ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে আবহাওয়া ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান আরও এগোলে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। নদীর তীরবর্তী নেপালের কয়েকটি জেলার বাসিন্দাদের ভোতে কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ে বিভিন্ন সড়ক মুহূর্তের মধ্যে পানিতে তলিয়ে যায়। কুইন্স ও ব্রুকলিনের কয়েকটি এলাকায় রাস্তাগুলো কার্যত নদীর মতো হয়ে পড়ে, যানবাহন আটকে যায় এবং জনজীবনে ব্যাপক ভোগান্তি দেখা দেয়। লং আইল্যান্ডে কোথাও কোথাও প্রায় ৩ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কুইন্সে বন্যার পানির কারণে লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ের দুই দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ব্রুকলিনের বুশউইকসহ কয়েকটি এলাকায় অতিরিক্ত পানিতে স্টর্ম ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে। কিছু স্থানে পানির উচ্চতা এতটাই বেড়ে যায় যে চালকদের গাড়ির ছাদে উঠে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। নিউইয়র্ক সিটি ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট আগেই সতর্ক করেছিল, শক্তিশালী বজ্রঝড়ে অল্প সময়ে প্রতি ঘণ্টায় ১ থেকে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার জন্য শহর ও আশপাশের এলাকাকে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যার মাঝারি ঝুঁকিতে রাখা হয়েছিল। পরে নগর কর্তৃপক্ষ ফ্ল্যাশ ফ্লাড ওয়ার্নিং জারি হওয়ার কথা জানায়। বন্যার কারণে নিউইয়র্কের বিভিন্ন সড়কে যানজট ও বন্ধের পাশাপাশি সাবওয়ে সার্ভিসেও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে। নিউইয়র্ক সিটির সরকারি জরুরি সতর্কতায় একাধিক এমটিএ ট্রেনে দেরি ও সার্ভিস পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। জ্যাকি রবিনসন পার্কওয়েতেও বন্যার পানির কারণে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। শুধু নিউইয়র্ক সিটিই নয়, নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির আরও কয়েকটি এলাকায়ও প্রবল বৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। নিউ জার্সির জার্সি সিটিতে বন্যার পানিতে আটকে পড়া ৬৯ জনকে জরুরি উদ্ধারকারী দল ইনফ্ল্যাটেবল রাফট ব্যবহার করে উদ্ধার করে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। লং আইল্যান্ডের আটলান্টিক বিচ এলাকায় ঝড়ে একটি সম্ভাব্য টর্নেডোর আঘাতে সান অ্যান্ড সার্ফ বিচ ক্লাবের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নাসাউ কাউন্টি পরে ওই এলাকায় স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে। তবে প্রাথমিকভাবে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি এবং গুরুতর আহতের ঘটনাও জানানো হয়নি। ঝড়ের আগেই নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের বিশেষ করে বেসমেন্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারীদের সতর্ক থাকতে বলেছিল। নগর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্যার পানি দ্রুত বাড়তে পারে এবং পানির নিচে রাস্তার গর্ত, ধ্বংসাবশেষ বা বৈদ্যুতিক ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই পানিতে ডুবে থাকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানো, হাঁটা বা সাইকেল চালানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি নিউইয়র্কে হঠাৎ ভারী বৃষ্টির সময় নগর বন্যার ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। শহরের সরকারি তথ্যমতে, ভারী বৃষ্টির সময় স্বল্প সময়ের মধ্যেই নিচু এলাকা, দুর্বল ড্রেনেজের রাস্তা ও আন্ডারপাসে পানি জমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে গত কয়েকদিন ধরে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ ঝড় ও আকস্মিক বন্যায় অন্তত ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গত ১১ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে রাজ্যটিতে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে জেনিংস কাউন্টির চার বছর বয়সী এক শিশু রয়েছে, যার বাড়ির ওপর ঝড়ের সময় গাছ ভেঙে পড়েছিল। এছাড়া ডেলাওয়্যার কাউন্টিতে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ এবং ৫৮ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে রাজ্যের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ইন্ডিয়ানাপোলিসসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে, যা গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক বলে জানিয়েছেন শহরের মেয়র জো হগসেট। পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজ্যের গভর্নর মাইক ব্রন ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই দুর্যোগ ও ঐতিহাসিক বন্যার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট কেন্দ্রীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। এদিকে শনিবার পর্যন্ত রাজ্যের প্রায় দেড় লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিলেন এবং উদ্ধারকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় বহু পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। ইন্ডিয়ানাপোলিস ফায়ার ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টায় তারা অর্ধশত পানি থেকে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে, যেখানে ৯১ জন বাসিন্দা এবং ৪৫টি পোষা প্রাণীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। নোবলসভিল শহরের মেয়র ক্রিস জেনসেন জানিয়েছেন, সেখানে হোয়াইট নদীর পানি ১১৩ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে ২৪ দশমিক ৬ ফুটে পৌঁছেছে, যা ১৯১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। আবহাওয়া পূর্বাভাসে ইন্ডিয়ানাপোলিস, ওহাইওর কলম্বাস এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার চার্লসটনসহ বেশ কিছু এলাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও ভারী বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের সতর্কতা জারি থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক জোনাথন হুইথাম জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি অন্তত আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে, এরপরই পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী লাখো মানুষের গ্রীষ্মের সপ্তাহান্তের পরিকল্পনা আবারও ভেস্তে যেতে বসেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই ছুটির দিনে ঘরের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে একটি বড় ধরনের ঝড়ো আবহাওয়া বিরাজ করছে, যার প্রভাবে সপ্তাহান্তের শুরুতেই ফ্লোরিডা এবং ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যে প্রচুর ক্রান্তীয় জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা প্রবেশ করেছে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে তীব্র বজ্রঝড়ের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সাধারণ গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ভারী বর্ষণ ঘটাতে সক্ষম। আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় সাউথ ক্যারোলিনার চার্লসটন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় সপ্তাহান্তের শুরুতে চার মাত্রার স্কেলে ২ নম্বর আকস্মিক বন্যার সতর্কতা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড রিস্ক) জারি করা হয়েছে। এছাড়া ফ্লোরিডার মিয়ামি থেকে নর্থ ক্যারোলিনার উইলমিংটন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ১ নম্বর সতর্কতা বহাল রয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শনিবার বিকেল নাগাদ ধীর গতির ঝড় তৈরি হলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় দুই থেকে তিন ইঞ্চির বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে শনিবার সুদূর উত্তর ফ্লোরিডা, দক্ষিণ-পূর্ব জর্জিয়া এবং ক্যারোলিনা অঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও রবিবার পর্যন্ত মধ্য ফ্লোরিডা থেকে শুরু করে জর্জিয়া ও সাউথ ক্যারোলিনার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সামগ্রিকভাবে এক থেকে দুই ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে চলমান ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জনে পৌঁছেছে। রাজ্যের ২৫টি জেলায় এখনো ১১ লাখের বেশি মানুষ বন্যার প্রভাবে দুর্ভোগে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানিতে ব্রহ্মপুত্রসহ রাজ্যের একাধিক নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে হাজার হাজার গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি। আসাম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (এএসডিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য শতাধিক ত্রাণ শিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে হাজারো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। দুর্গম এলাকায় নৌকায় করে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বন্যার প্রভাব পড়েছে ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানেও। প্রতিবছরের মতো এবারও উদ্যানের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বন্যপ্রাণী নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এ কারণে জাতীয় সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণসহ বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আসামে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র ও এর উপনদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় ধরনের বন্যা দেখা দেয়। তবে চলতি বছরের বন্যাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন কর্মকর্তারা। আবহাওয়া বিভাগ আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় মুষলধারে বৃষ্টির পর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে সেতু, বন্ধ হয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালাতে শত শত ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েন করেছেন অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর প্যাট্রিক মরিসি। মঙ্গলবার রাতে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ৫৫টি কাউন্টিতেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন গভর্নর। বুধবারও কয়েকজন বাসিন্দার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভাব্য প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও যাচাই ছাড়া কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়েছে গভর্নরের দপ্তর। প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের উদ্ধারকারী দল অন্তত ৮৫টি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে। ন্যাশনাল গার্ড ও অঙ্গরাজ্য পুলিশের ১৯টি হেলিকপ্টার সরাসরি উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে অথবা জরুরি প্রয়োজনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের জন্য তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে একশর বেশি বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যাকবলিত অনেক এলাকায় পানি ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে উদ্ধারকারীরা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, কোনো কোনো এলাকায় সাত ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। গভর্নর মরিসির ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি স্থানে মাত্র ৩৭ মিনিটে সাড়ে চার ইঞ্চি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আগে থেকেই মাটি পানিতে পরিপূর্ণ থাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী, খাল ও নিচু এলাকায় জমে যায়। লুইস ও আপশার কাউন্টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে। ওয়েস্টনের একটি বিপণিবিতানের পার্কিংয়ে রাখা গাড়ি পানিতে ডুবে যায় এবং কাদামিশ্রিত পানি ভবনের অনেক ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়ে। কাছের একটি হোটেলের নিচতলাও প্লাবিত হয়। বাকহ্যানন শহরের মেয়র রবি স্কিনার ক্ষয়ক্ষতিকে হৃদয়বিদারক বলে বর্ণনা করেছেন। দুর্গতদের সহায়তার জন্য ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ওয়েসলিয়ান কলেজে ত্রাণসামগ্রী গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বন্যার কারণে ইন্টারস্টেট ৭৯, ইউএস রুট ৪৮ এবং বহু স্থানীয় সড়কের বিভিন্ন অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফায়েটভিল শহরে বৃষ্টির কারণে তৈরি একটি গর্তে একটি গাড়ি তলিয়ে যায়। প্লাবিত সড়কে আটকা পড়া বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে জরুরি বিভাগ। মঙ্গলবারের ঝড়ের সময় ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কয়েকটি এলাকায় টর্নেডোর আশঙ্কাও দেখা দেয়। সেন্ট মেরিস ও বেলমন্ট এলাকায় সম্ভাব্য টর্নেডোর কারণে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বুধবার বৃষ্টি কমে এলেও নদী ও খালের আশপাশের নিচু এলাকাগুলোতে বন্যা সতর্কতা বহাল ছিল। বাকহ্যাননের কাছে স্যান্ড রান নামের একটি খালের পানি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এর আগে ১৯৮৫ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় ওই খালের পানির সর্বোচ্চ উচ্চতার রেকর্ড হয়েছিল। সেই দুর্যোগে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াজুড়ে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গভর্নর মরিসি জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে। দুর্গত জনপদগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহে ব্যাপক সহায়তার প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।