বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান–এর শপথ গ্রহণকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। নিরঙ্কুশ নির্বাচনী জয়ের পর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের শুভেচ্ছা বার্তা দুই দেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে অভিনন্দন জানানোয় বিষয়টি কূটনৈতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে। খবর প্রকাশ করেছে দ্য ডন।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠন করে দলটি নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের অভিনন্দন বার্তা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা তৈরির কূটনৈতিক ইঙ্গিতও বহন করছে।
জয়ের পরপরই অভিনন্দনের ঢল
শপথের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং নির্বাচনে বিএনপির ‘নির্ণায়ক বিজয়’-এর প্রশংসা করেন। প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের বার্তায় বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি কামনা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
পৃথক বার্তায় শাহবাজ শরিফ বলেন, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে সহযোগিতা বাড়াতে এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে তিনি তার ‘ভাই’ তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা ব্যক্তিগত উষ্ণতা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা—দুটিকেই সামনে এনেছে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিলেন, যখন দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাত পুনরুদ্ধার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর উত্তরসূরি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–র সন্তান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘদিনের।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট অস্থিরতায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন—এই তিনটি বিষয় নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের এই ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’-এর সাক্ষী হতে পেরে পাকিস্তান সম্মানিত। নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য শুভকামনাও জানান তিনি।
ঢাকা সফরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস–এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি, সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পায়।
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বার্তাগুলোতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, একাডেমিক বিনিময়, যুব উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সহযোগিতা শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ভারত থেকেও তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে, যা নতুন সরকারের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানের উষ্ণ বার্তা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা—এই সমীকরণই নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বড় পরীক্ষা হতে পারে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, শাহবাজ শরিফের ‘ভাই’ সম্বোধন শুধু সৌজন্যমূলক শব্দ নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও কৌশলগত যোগাযোগের ইঙ্গিত বহন করে। এখন দেখার বিষয়—এই কূটনৈতিক উষ্ণতা বাস্তবে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় কতটা প্রতিফলিত হয়।