ছিদ্দিকুর রহমান
বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করছে। নীল সমুদ্র, সবুজ পাহাড়, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী ভ্রমণ ব্যয়ের কারণে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশের এই পর্যটন নগরীকে ঘিরে। তবে কক্সবাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়লেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এখনও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নীতিগত সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক প্রচারণার ঘাটতি এবং পর্যটকবান্ধব সেবার অভাব বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এর ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের অন্যান্য জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতগুলোর তুলনায় এর বিস্তৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একে অনন্য করেছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ বর্তমানে বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। একদিকে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে পাহাড়ি বনাঞ্চল—এই সড়ককে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মনোরম উপকূলীয় পথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, ছেঁড়াদ্বীপ, ইনানী সৈকত, হিমছড়ি, মহেশখালী এবং টেকনাফের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ, আধুনিক রেল যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের হোটেল প্রতিষ্ঠার ফলে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে প্রবেশের প্রথম বাধা হচ্ছে ভিসা ব্যবস্থা। অনেক দেশের নাগরিককে আগাম ভিসা সংগ্রহ করতে হয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।
পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু এবং ভিসা অন অ্যারাইভালের সুযোগ সম্প্রসারণ করলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ নিয়ে বিশ্বব্যাপী কার্যকর প্রচারণা প্রায় নেই বললেই চলে। মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা ভারতের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও বাংলাদেশের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ফলে বিশ্বের অনেক পর্যটক এখনও বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বড় একটি অংশ নগদ অর্থ বহনের পরিবর্তে কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পর্যটন এলাকায় আন্তর্জাতিক কার্ড গ্রহণের সুবিধা এখনও সীমিত।
হোটেল ছাড়া অনেক রেস্টুরেন্ট, পরিবহন সেবা ও স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ না থাকায় বিদেশি পর্যটকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বহুভাষিক ট্যুর গাইডের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল। ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, জাপানি, চীনা বা স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ গাইডের অভাব বিদেশি পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে সীমিত করে।
এছাড়া পর্যটনসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, মূল্য নিয়ে বিভ্রান্তি এবং অপ্রফেশনাল আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
বিদেশি পর্যটকদের একটি বড় অংশ ঢাকা হয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। রাজধানীর দীর্ঘ যানজট, বিমানবন্দরের চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বিদেশি পর্যটক, বিশেষ করে নারী পর্যটকদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত কৌতূহলী দৃষ্টি, অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি তোলা কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাবের অভিযোগ পাওয়া যায়।
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় জনগণের মধ্যে পর্যটন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পর্যটকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোতে সন্ধ্যার পরও পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ সীমিত।
ফলে দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে।
এ জন্য প্রয়োজন,
সহজ ও দ্রুত ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু করা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণা বৃদ্ধি।
পর্যটন এলাকাগুলোতে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত করা।
বহুভাষিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড তৈরি করা।
পর্যটক নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়ন।
বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা।
পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর আরও উন্নয়ন।
বিশ্ব পর্যটন শিল্পে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র, পাহাড়, বনভূমি, সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তার সমন্বয়ে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী পর্যটন গন্তব্য হওয়ার সব উপাদান ধারণ করে। কক্সবাজার ইতোমধ্যে সেই সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে নয়, বরং আধুনিক নীতি, আন্তর্জাতিক মানের সেবা, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং কার্যকর বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
নিউইয়র্ক সিটির অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মানচিত্রে দ্রুত শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন বাংলাদেশিরা। এক দশকে শহরটিতে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর ফলে নিউইয়র্কের সপ্তম বৃহত্তম অভিবাসী জনগোষ্ঠীতে উঠে এসেছেন বাংলাদেশিরা। শুধু তাই নয়, ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশিরাই এখন শহরের সবচেয়ে বড় দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী জনগোষ্ঠী। নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব সিটি প্ল্যানিংয়ের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ‘দ্য নিউয়েস্ট নিউ ইয়র্কার্স ২০২৬’ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। শহরের অভিবাসী জনগোষ্ঠী নিয়ে এটিই নিউইয়র্ক সিটির সর্বশেষ বিস্তৃত সরকারি প্রতিবেদন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৭৯৩। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৬ হাজার। অর্থাৎ এক দশকে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। একই সময়ে তালিকায় নবম অবস্থান থেকে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালে প্রকাশিত হলেও দেশভিত্তিক বিস্তারিত জনসংখ্যার হিসাব মূলত ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে এবং সংশ্লিষ্ট সেনসাস তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই ১ লাখ ১০ হাজার ৭৯৩ জনকে ২০২৬ সালের সরাসরি জনসংখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের আরও সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরো। সেই হিসাবে ২০২৪ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে মোট বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ লাখ ৮ হাজার। ফলে শহরের সামগ্রিক অভিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো নিউইয়র্কের জনমিতি, অর্থনীতি ও কর্মশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশিদের উত্থান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির মধ্যে। সিটি প্ল্যানিংয়ের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা যেখানে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৮০০, সেখানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার ২০০। নিউইয়র্ক সিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে শহরে আসা নতুন অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম বড় উৎস দেশ। নতুনভাবে লফুল পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা গ্রিন কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাদেশি অভিবাসনের ক্ষেত্রে পরিবারভিত্তিক ইমিগ্রেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকে বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্ক সিটিতে লফুল পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হিসেবে আসা ৬০ হাজারের বেশি মানুষের বড় অংশই পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতে গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। মার্কিন নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশিদের বসবাসের প্রধান কেন্দ্র কুইন্স হলেও কমিউনিটির বিস্তার এখন নিউইয়র্কের অন্যান্য বরোতেও দৃশ্যমান। জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, এলমহার্স্ট ও ব্রায়ারউডসহ কুইন্সের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি ব্রঙ্কসেও বাংলাদেশিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সিটি প্ল্যানিংয়ের ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের হিসাবে ব্রঙ্কসে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৫০০, যা ওই বরোর পঞ্চম বৃহত্তম বিদেশে জন্ম নেওয়া জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশি কমিউনিটির বৃদ্ধির আরেকটি দিক হলো নতুন প্রজন্ম। নিউইয়র্ক সিটির বিদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের হিসাবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে ১ লাখ ১০ হাজারের হিসাবটি নিউইয়র্কে বসবাসকারী পুরো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নয়। দ্বিতীয় ও পরবর্তী প্রজন্ম যোগ করলে কমিউনিটির প্রকৃত আকার আরও বড়। জাতীয় পর্যায়েও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে শুধু বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে এই জনগোষ্ঠী বেড়েছে প্রায় ৫৬৯ শতাংশ। ওই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন অভিবাসী এবং প্রায় ৭৫ হাজার যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া। তবে পিউর এই হিসাব শুধু যারা নিজেদের এককভাবে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে, ফলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর হিসাব পদ্ধতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক সরকারি প্রতিবেদন বলছে, শহরের অভিবাসী মানচিত্রের পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশিদের বৃদ্ধি এখন স্পষ্ট। এক দশকে ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর তালিকায় সপ্তম অবস্থানে উঠে আসা এবং দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে শীর্ষে পৌঁছানো নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরই প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরতলিতে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য ঈদুল আজহা উদযাপনে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। দুই বছর আগে আমিনাহ নাইট নামে এক উদ্যোক্তা ইনডোর ওয়াটার পার্কে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ঈদ উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। শুরুতে তিনি একটি স্থানীয় মসজিদের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করতে চাইলেও মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল, ঈদ উপলক্ষে সাঁতারভিত্তিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ধর্মীয় উদযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করেছিলেন। তবে সেই সিদ্ধান্তে থেমে না থেকে আমিনাহ নাইট নিজ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেন। এতে মুসলিম পরিবার, শিশু-কিশোর এবং তরুণদের ব্যাপক সাড়া মেলে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে একত্রিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আয়োজকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা মুসলিম শিশু ও তরুণদের জন্য এমন সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজন সম্প্রদায়ের বন্ধন আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অংশগ্রহণকারীরা জানান, ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখেই আধুনিক পরিবেশে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে এই উদ্যোগ স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রতি বছর আরও বেশি পরিবার এতে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আয়োজকদের আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের পারিবারিক অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়বে।
ফুটবল, সাম্বা, আমাজনের বিস্তীর্ণ অরণ্য এবং মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকতের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশটির পরিচিতি সাধারণত এসব বিষয় ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এই পরিচিত চিত্রের আড়ালে দেশটিতে নীরবে বিস্তার লাভ করছে ইসলাম, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষক ও ধর্মীয় পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই লাতিন আমেরিকান দেশে মুসলিম সম্প্রদায় এখন আর কেবল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অভিবাসনের পাশাপাশি স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের মধ্যেও ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, যা দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্রাজিলের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা আইবিজিই এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ১৫ লাখের মধ্যে রয়েছে। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যাগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়, ইসলামিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় ১৫ লাখ সক্রিয় মুসলিম বসবাস করছেন। এটি দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ। গবেষকদের মতে, সরকারি আদমশুমারিতে ধর্ম পরিবর্তনের তথ্য অনেক সময় দ্রুত হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ব্রাজিলে মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ১৫১টি সক্রিয় মসজিদ রয়েছে। এর পাশাপাশি শতাধিক নামাজকেন্দ্র এবং ইসলামিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাও পাওলো, পারানা, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, কুরিতিবা এবং ফোজ দো ইগুয়াসু অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা এবং মসজিদের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলে ইসলামের প্রসারের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো অভিবাসন। গত শতাব্দীতে সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে বিপুল সংখ্যক আরব মুসলিম ব্রাজিলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মুসলিম অভিবাসীরা সেখানে আসেন। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের ইসলাম গ্রহণের প্রবণতাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কারণে অনেক ব্রাজিলীয় ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছেন। ফেডারেশন অব মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনস ইন ব্রাজিলের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটিতে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি স্থানীয় ব্রাজিলীয় ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে সংগঠনটির দাবি। ব্রাজিলের ইসলামি ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো সাও পাওলোর মেসকিতা ব্রাজিল। ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদকে শুধু ব্রাজিল নয়, সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম এবং সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশটিতে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া ফোজ দো ইগুয়াসু শহরের ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদও মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা। ১৯৮৩ সালে নির্মিত এই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী এবং বিশাল মিনার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পারানা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী কুরিতিবায় অবস্থিত ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব মসজিদ এবং রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ইসলামিক সেন্টারও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের প্রায় সব মুসলিমই নগরাঞ্চলে বসবাস করেন। সাও পাওলো, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, ফোজ দো ইগুয়াসু, কুরিতিবা এবং বেলো হরিজন্তে শহরগুলো মুসলিম জনসংখ্যার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও ব্রাজিলের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। দেশটির বিশাল হালাল খাদ্যশিল্প শুধু স্থানীয় মুসলিমদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রাজিলে ইসলাম এখন আর শুধুমাত্র অভিবাসীদের ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় না। স্থানীয় সমাজে মুসলিমদের অংশগ্রহণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। ফুটবলপ্রেমী এই লাতিন আমেরিকান দেশে মুসলিমরা এখন একটি ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে ব্রাজিলে ইসলামের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।