- প্রচ্ছদ
- Topic
মানবাধিকার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে নবীকে অবমাননার অভিযোগে ইরানে নাজমেহ আমিনি নামে ২৩ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড এবং সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে তাঁকে ১২ বছর, ছয় মাস ও এক দিনের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত নয়, ইরানের সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস এবং হেঙ্গাও অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আমিনি হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলায় রায় দেওয়া হয়। এর একটিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নবীকে অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য মামলায় জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণার অভিযোগে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম খোরাসানও তাঁর মামলার খবর প্রকাশ করেছে। তবে বিতর্কিত পোস্টটির সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ জানুয়ারি মাশহাদের একটি বাণিজ্যিক এলাকা থেকে আমিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর ভাকিলাবাদ কারাগারে নেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথমে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। পরে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ পরিবর্তন করে নবীকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। ইরানের আইনে এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কারাগার থেকে পাঠানো বলে পরিচিত একটি অডিও বার্তায় আমিনি নিজের মামলার পুনর্বিবেচনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৮ সেপ্টেম্বরের তারিখ উল্লেখ করে দেওয়া ওই বার্তায় তিনি আইনজীবী, আইনি বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তাঁর মামলার নথি পর্যালোচনার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্য যেন কারাগারের নথিতে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং তাঁর হয়ে অন্যরা যেন কথা বলেন। অডিও বার্তাটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের কারণে একজন তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের রায় অনলাইন বক্তব্যের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সংগঠনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রায় বাতিলের দাবিতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ইরানে মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক হেবা মোরায়েফের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিন্নমত দমনে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার মানবাধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। ইরানের দণ্ডবিধিতে নবী মুহাম্মদকে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে দেশটির আইনে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বক্তব্যের উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানসিক অবস্থার বিষয়ও বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতে আমিনির পক্ষ থেকে বক্তব্যটি অনিচ্ছাকৃত ছিল বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিচারক সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার সম্পূর্ণ নথি প্রকাশ্যে না থাকায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সব দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। আমিনির মামলাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানাচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো বলেছে, বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার, আইনজীবীর সহায়তা এবং নির্যাতনমুক্ত আটক নিশ্চিত করা জরুরি। বিক্ষোভ দমনের সময় বহু মানুষ নিহত ও আটক হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের হিসাব এক নয়। ইরানের কর্তৃপক্ষ আমিনির মামলার বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ্যে জানায়নি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চ আদালতে তাঁর আপিলের ফল কী হয় এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশিত হয় কি না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো রায় পুনর্বিবেচনা এবং তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। সূত্র: ইরান হিউম্যান রাইটস, হেঙ্গাও অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস, দ্য গার্ডিয়ান।
২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক বিচারক নাভি পিলাই। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং যু দ্ধাপরাধ ও গণ হ ত্যার বিচার নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিলাই জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ইসরায়েলের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছেন তিনি। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অসাধারণ সাহসিকতা এবং সততার পরিচয় দিয়েছেন নাভি পিলাই। বিশেষ করে যু দ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণ হ ত্যার বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে যু দ্ধ ও সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালত এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সহিং সতা ছাড়াই বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরতেই পিলাইয়ের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ইসরায়েলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছিলেন পিলাই। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর অবস্থান ইসরায়েল এবং দেশটির সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছিল। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের শতাধিক সদস্য পিলাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যক্রমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের মধ্যেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষার পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রাখেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েলসংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন পিলাই। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০২৫ সালে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণ হ ত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে ইসরায়েল ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের এই অনুসন্ধান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্ম নেওয়া নাভি পিলাইয়ের পেশাগত জীবন শুরু হয় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সময় তিনি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। ১৯৬৭ সালে ডারবানে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন পিলাই। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৮ সালে ডক্টর অব জুরিডিক্যাল সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর রুয়ান্ডার গণ হ ত্যার বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেখানে যৌন সহিং সতা ও ধ র্ষ ণকে গণ হ ত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন পিলাই। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণ হ ত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলায়ও তিনি অ্যাডহক বিচারক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক ভূমিকার বিষয়টি এবারের নোবেল পুরস্কারের সিদ্ধান্তে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নোবেল কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। যু দ্ধাপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং নি র্যা তনের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে নাভি পিলাইয়ের হাতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর কয়েক দশকের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবারের পুরস্কারকে দেখছে নোবেল কমিটি।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট বিচারক ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল কমিটি বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা আবারও পূরণ হলো না। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্য অধিকারকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই থেকে শুরু করে সমসাময়িক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিচারিক কার্যক্রমে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন—পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতা রয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার ব্যাখ্যায় কমিটি বলেছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থা প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন ও ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরতেই পিল্লাইকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কমিটির বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শক্তি যখন ন্যায়ের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তখন স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতের অহিংস সমাধানের ভিত্তি বলেও উল্লেখ করেছে কমিটি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানবাধিকার সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। নোবেল কমিটির মতে, পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনে একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং আইনের মাধ্যমে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি এই পুরস্কারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আইন ও মানবাধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শক্তিশালী করার বার্তা দিতে চায় কমিটি। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ভাটনে ফ্রিডনেস বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও এর প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের ভিত্তি। এই পুরস্কারের মাধ্যমে পিল্লাই এবং তাঁর মতো আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার প্রচেষ্টা ঘিরে আলোচনা ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার আগে ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় ছিল। তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজের কূটনৈতিক ভূমিকা ও সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টাকে পুরস্কারের যোগ্য বলে তুলে ধরেছেন। নোবেল কমিটির ওপরও তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের পরিবর্তে পিল্লাইকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যেই পাকিস্তান আবারও ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার কথা জানায়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। শরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ দুই দেশকে সংঘাতের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল। তাঁর দাবি, সেই যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে এটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য; নোবেল কমিটির পুরস্কার ঘোষণার কারণ হিসেবে এই দাবিকে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকর্মী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। দেশটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি প্রতীকীভাবে নিজের পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পরিবর্তন করা যায় না। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে ন্যায়বিচারের বার্তা এবারের পুরস্কার এমন এক সময়ে দেওয়া হলো, যখন বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা চলছে। এদিকে সুদানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অর্থায়ন কমে যাওয়ার পর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা নেটওয়ার্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব উদ্যোগও এবারের পুরস্কারের সম্ভাব্য দাবিদারদের আলোচনায় ছিল। নোবেল শান্তি পুরস্কার চলতি সপ্তাহে ঘোষিত পঞ্চম পুরস্কার। এর আগে সাহিত্য, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পিল্লাইয়ের এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানানোর পর এবার ১ লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন আইনজীবী ও শরণার্থী অধিকারকর্মী নিয়াদোল নিয়ুন। নিজের জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে তিনি অনলাইনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন। গোফান্ডমিতে প্রকাশিত আবেদনে নিয়ুন জানিয়েছেন, প্রায় দুই বছর ধরে তিনি নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে দীর্ঘ সময় আয় বন্ধ থাকায় তার মর্টগেজের বকেয়া, গৃহস্থালি বিল এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ জমে গেছে। এমনকি বর্তমানে গাড়ির ইন্স্যুরেন্সের ব্যয় বহন করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। একই সময়ে একটি পেশাগত বিষয় নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছেন তিনি, যার বিস্তারিত আপাতত প্রকাশ করতে চান না। এই প্রক্রিয়া তার ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি করেছে বলেও জানিয়েছেন নিয়ুন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংগ্রহ করা ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে ৫০ হাজার ডলার মর্টগেজের বকেয়া, জমে থাকা গৃহস্থালি বিল, ইউটিলিটি এবং গাড়ির ইন্স্যুরেন্সসহ জরুরি ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হবে। বাকি ১ লাখ ডলার ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার খরচে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব খরচের পর অর্থ অবশিষ্ট থাকলে চলমান পেশাগত পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার আইনি ব্যয়ে তা ব্যবহার করা হবে বলে তহবিল সংগ্রহের পাতায় জানানো হয়েছে। নিয়ুনের এই তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে মূলত তার সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার সিদ্ধান্তের কারণে। চলতি বছরের শুরুতে তিনি জানিয়েছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করছেন। একই সঙ্গে ২০২২ সালে মানবাধিকার ও শরণার্থী নারীদের জন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া মেডেল ফেরত দেওয়ার উদ্যোগও নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তিনি জানান, পদক থেকে তার পদত্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে এবং নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাগজপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে। ১৯৮৭ সালে ইথিওপিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া নিয়ুনের পরিবার দ্বিতীয় সুদানি গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়েছিল। শৈশবের একটি বড় সময় তিনি কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে কাটান। ২০০৫ সালে ১৮ বছর বয়সে শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসিত হন। পরে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে আইন বিষয়ে জুরিস ডক্টর সম্পন্ন করেন। ধীরে ধীরে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় মানবাধিকার, শরণার্থী অধিকার, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ইস্যুতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ুন প্রকাশ্যে দ্বিধা ও হতাশার কথা বলেছেন। সেপ্টেম্বরে এবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি অস্ট্রেলিয়াকে ভালোবাসেন, কিন্তু দেশটিকে আর নিজের ঘর বলে অনুভব করছেন না। এসব বক্তব্যের পাশাপাশি ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি ও ওয়ার্কসেফ ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে নিজের পূর্ববর্তী পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তিনি। প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো নিয়ুনের নিজস্ব দাবি এবং সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান রয়েছে। তাই অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, তার প্রকাশ্য বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে দায়িত্ব পালনকালে নিয়ুন ওয়ার্কসেফ ভিক্টোরিয়ার অর্থায়নে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে একটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব ঘটনার পর ২০২৫ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এসব অভিজ্ঞতার প্রভাব নিজের জীবন ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সিদ্ধান্তের ওপর পড়েছে বলে তিনি একাধিকবার দাবি করেছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে এটিও বলেছেন যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পুরো অস্ট্রেলিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করে না এবং দেশটির মানুষ ও সুযোগের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা রয়েছে। নিয়ুনের নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি এখনো সম্পন্ন হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণভাবে কেউ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে চাইলে তাকে অন্য একটি দেশের নাগরিক হতে হয় অথবা আবেদন অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হয়। নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট নবায়ন, বিদেশ থেকে ভিসা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় ফেরা এবং বিদেশে অস্ট্রেলিয়ার কনস্যুলার সহায়তার মতো সুবিধা আর পান না। অন্যদিকে, তহবিল সংগ্রহের আবেদনে নিয়ুন বলেছেন, তার লক্ষ্য এখন কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে পাওয়া এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় থেকে নিজের পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ দেওয়া। যারা আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারবেন না, তাদেরও তহবিল সংগ্রহের তথ্য শেয়ার করে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তার পক্ষে কাউকে যোগাযোগ বা মুখোমুখি না করতে এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যেন সম্মানজনক ও তার প্রকাশ্যে দেওয়া তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেই অনুরোধও করেছেন নিয়ুন।
লুইজিয়ানার একটি অভিবাসী আটক কেন্দ্র (ডিটেনশন সেন্টার) থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অবশেষে নিজের দুই সন্তানের কাছে ফিরেছেন গুয়াতেমালা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রার্থী এক মা। গত ১৯ মে সকালে সন্তানদের নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে নিজ বাসা থেকে তাঁকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর এক প্রতিবেশীর বাসায় সন্তানদের সঙ্গে তাঁর পুনর্মিলন ঘটে। তবে এই দীর্ঘ বিচ্ছেদে ওই মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে, ফলে তিনি আর তাঁর সন্তানদের স্তন্যপান করাতে পারছেন না। প্রতিশোধের ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নারী জানিয়েছেন, তাঁর দুই বছর বয়সী বড় মেয়েটির ডাউন সিনড্রোম রয়েছে এবং সে ভেবেছিল তার মা তাকে চিরতরে ছেড়ে চলে গেছে। অন্যদিকে, এক বছর বয়সী ছোট শিশুটি মাকে দেখেই চিনতে পেরেছিল বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সন্তানদের কাছে ফিরে আসার এই আবেগঘন মুহূর্তটি ওই মায়ের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তিনি বলেন, "আমার মনে হচ্ছিল আমি স্বপ্ন দেখছি। আমার মন আচ্ছন্ন হয়ে ছিল, কিন্তু যখনই আমি তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম এবং আদর করছিলাম, তখনও মনে হচ্ছিল এটা সত্যি নয়।" গত ১৪ আগস্ট বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের হস্তক্ষেপে সাউথ লুইজিয়ানা আইসিই প্রসেসিং সেন্টার থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে তাঁর সঙ্গী এখনো ওকলাহোমার একটি ইমিগ্রেশন বন্দিশালায় আটক রয়েছেন। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের (ডিএইচএস) ইনস্পেক্টর জেনারেলের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ, অন্তঃসত্ত্বা, সদ্য মা হওয়া এবং স্তন্যদানকারী নারীদের আটক না করার বিষয়ে আইসিই-এর নিজস্ব যে নীতিমালা রয়েছে, সংস্থাটি তা চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে যে, কেবল জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের নারীদের আটক করা যাবে না। ওই নারীর কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও কেবল তাঁর সঙ্গীর বিরুদ্ধে থাকা পরোয়ানা তামিল করতে গিয়ে তাঁকেও আটক করা হয়। টেনেসি ইমিগ্র্যান্ট অ্যান্ড রিফিউজি রাইটস কোয়ালিশন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, কেনেডি হিউম্যান রাইটস সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি প্রথম সারির সংগঠন এই অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছে। দেশজুড়ে অভিবাসী ও প্রজনন অধিকার কর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, আইসিই নিয়মিতভাবেই তাদের এই নীতিমালা লঙ্ঘন করছে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে এই নিয়ম বাতিল করা হলেও ২০২১ সালে বাইডেন প্রশাসন তা পুনরায় বহাল করে, যা বর্তমানেও কার্যকর রয়েছে। ডিএইচএস-এর এক মুখপাত্র এই অভিযোগের সরাসরি উত্তর না দিয়ে পূর্বের দেওয়া একটি বিবৃতিই পুনরায় পাঠিয়েছেন, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে স্তন্যদানকারী বা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের আটকের ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং আটককৃতদের যথাযথ চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়। তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই পরিবারের ওপর যে অমানবিক ও বেআইনি আঘাত হানা হয়েছে, তার মানসিক ক্ষত তাদের বছরের পর বছর বয়ে বেড়াতে হবে। সন্তানদের কাছে ফিরে স্বস্তি পেলেও বর্তমানে চরম আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন ওই মা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আটক থাকায় এবং নিজে গাড়ি চালাতে না পারায় তাঁর বড় মেয়ের চিকিৎসা ও থেরাপি ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে এক বন্ধুর ওপর নির্ভরশীল এই নারী বলেন, "আমার মনে হচ্ছে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেকে ফাঁদে আটকে পড়া অনুভব করছি এবং কোনো আলোর দেখা পাচ্ছি না।" তবুও ঈশ্বরের ওপর ভরসা রেখে তিনি বলেন, "আমরা সন্তানদের একটি সুন্দর জীবন দেওয়ার আশায় কঠোর পরিশ্রম করতে এই দেশে এসেছিলাম, নিজেদের দেশে যে কষ্ট পেয়েছি তার চেয়ে আরও বেশি কষ্ট ভোগ করার জন্য নয়।"
ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব না পরে গান গাওয়ার অভিযোগে গায়িকা পারাস্তো আহমাদির ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা বহাল রেখেছে দেশটির একটি আপিল আদালত। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, উচ্চ আদালত কোনো শুনানি ছাড়াই আপিল খারিজ করে আগের সাজা বহাল রাখে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে হাতাকাটা পোশাক পরে গান গাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। ২৯ বছর বয়সী পারাস্তো আহমাদি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি সংগীতানুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করেন। অনুষ্ঠানে তিনি মাথায় হিজাব পরেননি এবং হাতাকাটা পোশাক পরেছিলেন। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখো মানুষ তা দেখেন। এরপর ইরানের বিচার বিভাগ তার বিরুদ্ধে দেশটির আইন ও সাংস্কৃতিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেয়। দেশটিতে নারীদের প্রকাশ্যে গান পরিবেশনের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে এবং তাদের হিজাব ও শালীন পোশাক পরার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চলতি বছরের জুনে কোম শহরের একটি ফৌজদারি আদালত আহমাদি ও তার ব্যান্ড এবং অনুষ্ঠান নির্মাণ দলের আরও আট সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালতের অভিযোগ ছিল, তারা প্রকাশ্যে অশালীন ও অনৈতিক উপাদান প্রচারের মাধ্যমে ‘জনসাধারণের শালীনতায় আঘাত’ করেছেন। মামলায় আহমাদিসহ সংশ্লিষ্টদের ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের দুই বছরের জন্য দৃশ্যশ্রাব্য কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আহমাদির আইনজীবীরা আপিল করে বলেন, ওই সংগীতানুষ্ঠান আয়োজন করাই কোনো অপরাধ ছিল না। তাদের একজন বিবিসিকে জানান, একই অভিযোগে জরিমানা বা তুলনামূলক কম শাস্তির সুযোগ থাকলেও নিম্ন আদালত কঠোরতম শাস্তিগুলোর একটি দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আপিল আদালতের শুনানি করার সুযোগ থাকলেও আদালত কোনো শুনানি করেনি এবং আগের রায় বহাল রেখেছে। আইনজীবীদের ধারণা, ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করাই এই রায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। প্রাথমিক রায়ের খবর প্রকাশের পর ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নির্বাসিত ইরানি গায়িকা গুগুশ ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহমাদির প্রতি সমর্থন জানিয়ে নারীদের নিজেদের জীবন ও পোশাক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার কথা বলেন। সংগীতশিল্পী হোসেইন আলিজাদেহও আহমাদির পরিবর্তে নিজে ৭০ বেত্রাঘাতের শাস্তি নিতে প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেছিলেন। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই সাজার সমালোচনা করে বেত্রাঘাতকে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরানে নারীদের পোশাকসংক্রান্ত বিধিনিষেধের বিষয়টি নতুন নয়। দেশটির আইনে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো নারী ও কিশোরীদের চুল হিজাব দিয়ে ঢেকে রাখতে এবং শরীরের গঠন আড়াল করে এমন ঢিলেঢালা পোশাক পরতে বলা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশটির অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব না পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হিজাব ঠিকভাবে না পরার অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশের আটক করা ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি তরুণী আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০২২ সালের ওই বিক্ষোভে অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব খুলে ফেলেন বা মাথার কাপড় বাতাসে উড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে শত শত মানুষ নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। এরপরও ইরানের বিভিন্ন শহরে অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব না পরেই চলাফেরা করছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার, সতর্কবার্তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে। হিজাবসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে এর আগেও বেত্রাঘাতের সাজা কার্যকর হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কুর্দি-ইরানি অধিকারকর্মী রোয়া হেশমতিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিজাব ছাড়া একটি ছবি প্রকাশের ঘটনায় ‘জননৈতিকতা লঙ্ঘনের’ অভিযোগে ৭৪ বার বেত্রাঘাত করা হয় বলে কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেংগাও জানিয়েছিল। হেশমতি পরে জানান, তেহরানের একটি প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এক নারী কর্মকর্তা জোর করে তার মাথায় স্কার্ফ পরিয়ে দেন এবং পরে একজন পুরুষ কর্মকর্তা তাকে বেত্রাঘাত করেন। পারাস্তো আহমাদির মামলাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরানে নারীদের পোশাক ও প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ইরানের রক্ষণশীল রাজনীতিক ও এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সদস্য গোলামালি হাদ্দাদ-আদেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হিজাববিষয়ক বিধিনিষেধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ আপাতত আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছে না। তবে দেশটির প্রচলিত আইন ও বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। আহমাদির বিরুদ্ধে রায়ের ফলে ইরানে নারী শিল্পীদের প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। তার আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আপিল আদালতে কোনো শুনানি না করেই আগের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। এখন ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা কার্যকর হবে কি না এবং মামলাটির বিরুদ্ধে আরও কোনো আইনি পদক্ষেপের সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে নজর রয়েছে। সূত্র: বিবিসি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে একই পরিবারের বাবা ও তিন ছেলেকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার প্রায় ৪০ দিন পরও তাদের খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। পুলিশের দাবি, চারজনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের পর বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পরিবার বলছে, তারা ভারতীয় নাগরিক। সংবাদমাধ্যম স্ক্রলও বিএসএফ সত্যিই তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে কি না স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। নিখোঁজ চারজন হলেন মুর্শিদাবাদের সুতি থানা এলাকার বালিয়াঘাটি গ্রামের ৬০ বছর বয়সী দাবলু শেখ এবং তার তিন ছেলে—২৯ বছর বয়সী কায়েম শেখ, ২০ বছর বয়সী রাজাউল শেখ ও ১৬ বছর বয়সী আসমাউল শেখ। দাবলুর স্ত্রী জাহানারা বিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অথবা ১৪ আগস্ট সাদা পোশাকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের বাড়িতে এসে প্রথমে তার স্বামীকে নিয়ে যান। পরে তিন ছেলেকেও আটক করা হয়। এরপর থেকে স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটার তালিকার তথ্য। স্ক্রল জানিয়েছে, দাবলু শেখ এবং তার ছেলে কায়েম শেখ পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার পরও তালিকাভুক্ত ছিলেন এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। স্ক্রল তাদের নাম ভোটার তালিকায় স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে। আরও পুরোনো নথিতে দাবলুর বাবা শেখ সামজানির নাম ১৯৬৬ ও ১৯৯৫ সালে সুতি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার হিসেবে পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ বা মাসুমের দাবি, চারজনের কাছে আধার কার্ড, রেশন কার্ডসহ ভারতে বসবাসের বিভিন্ন নথিও রয়েছে। সংগঠনটি পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিবকে চিঠি দিয়ে তাদের আটক, ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং কথিতভাবে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মাসুম বলছে, পরিবারের দীর্ঘদিনের ভারতে বসবাস ও ভোটার তালিকার তথ্য থাকার পরও তাদের বিদেশি ঘোষণার আগে স্বচ্ছ ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে সুতি থানার ইনস্পেক্টর-ইন-চার্জ অভিজিৎ বসু মল্লিক স্ক্রলকে বলেছেন, চারজনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফরেনার্স আইনের অধীনে মামলার প্রয়োজন ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনার আওতায় তাদের আটক করে জঙ্গিপুরের হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল। পরিবার পুলিশের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। জাহানারা বিবি বলেন, পুলিশ তাদের কাছে বাংলাদেশের কোনো কাগজপত্র আছে কি না জানতে চেয়েছিল। পরিবারের দাবি, তাদের বাংলাদেশের কোনো নথি নেই এবং তারা কখনো বাংলাদেশেও যাননি। তবে ভোটার কার্ড, আধার বা রেশন কার্ড থাকা একাই কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে না; এই চারজনের নাগরিকত্বের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। মুর্শিদাবাদে একই ধরনের আরও অভিযোগ দাবলু শেখের পরিবারের ঘটনাটি সামনে আসার আগেও মুর্শিদাবাদে একই ধরনের বেশ কয়েকটি আটক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্ক্রলের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, জুন থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ অন্তত ১০ মুসলিম পুরুষ ও দুই শিশুকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করেছিল। দাবলু ও তার তিন ছেলের ঘটনা যুক্ত হলে এমন আটকের সংখ্যা ১৬-তে পৌঁছায়। কয়েকটি পরিবারের অভিযোগ, গভীর রাতে বা বাড়ি থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা তাদের স্বজনদের নিয়ে গেছেন এবং নাগরিকত্বের পক্ষে নথি উপস্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়নি। এর আগের ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্তত চারজন বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় যাচাই পেরিয়েছিলেন বলে স্ক্রলের অনুসন্ধানে উঠে আসে। কয়েকজন সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। আবার অন্তত একটি ঘটনায় বিএসএফ এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা গ্রহণ না করে পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ নথির বরাতে জানানো হয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে কলকাতা হাইকোর্টও এ ধরনের আটকের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টও সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর মুর্শিদাবাদের ৩৯ বছর বয়সী সাহিদুল শেখকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার আরেক ঘটনায় পুলিশকে হলফনামা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে বলেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। কেন তাকে আটক করা হয়েছিল এবং ৮ আগস্ট আটকের পর রাজ্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছেও প্রতিবেদন চাওয়া হয়। স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই শুনানিতে আদালত মানবাধিকারের প্রশ্নও তোলে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিদেশি সন্দেহ করার ভিত্তি কী এবং নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আগের একটি রায়ের প্রসঙ্গও আইনজীবীরা তুলেছেন। ২০২৪ সালের রহিম আলী মামলার রায়ে আদালত বলেছিল, কাউকে বিদেশি বলে অভিযোগ করার ভিত্তি যে তথ্য বা উপাদান, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানাতে হবে—যাতে তিনি অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ পান। সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ নিয়েও বিতর্ক শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ও সীমান্তের দিকে পাঠানোর অভিযোগ এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জুনে অভিযোগ করেছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কিছু বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি একাধিক ‘পুশ-ইন’ চেষ্টা ঠেকানোর কথা জানিয়েছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানকে আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা সন্দেহভাজন অনথিভুক্ত অভিবাসীদের পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। পশ্চিমবঙ্গে চলতি বছরের মে মাসে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কথিত অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন এবং শনাক্তকরণ ও বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে স্ক্রল জানিয়েছে। দাবলু শেখ ও তার তিন ছেলের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাদের বর্তমান অবস্থান। পুলিশ বলছে, তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বিএসএফের কাছ থেকে সেই দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং পরিবার বলছে, প্রায় ৪০ দিন ধরে তারা জানেই না চারজন কোথায় আছেন। জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপারের কাছেও মন্তব্য চেয়েছে স্ক্রল; সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত জবাব পাওয়া যায়নি।
ফিলিস্তিনি নারী বন্দি দানা জুদেহ ১৪ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের ডেমন কারাগারে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। নাবলুস গভর্নরেটের ইরাক আল তাইয়েহ এলাকার ৩৫ বছর বয়সী এই নারীকে গর্ভবতী অবস্থায় আ টক করা হয়েছিল এবং পরে ছয় মাসের প্রশাসনিক আ টকাদেশে রাখা হয়। তার পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ডেমন কারাগারে দানা জুদেহ সন্তান জন্ম দেন। ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তাকে আ টকের সময় তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাকে প্রশাসনিক আ টকাদেশের আওতায় রাখা হয়, যার মাধ্যমে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আ টক রাখা সম্ভব। জুদেহর প্রশাসনিক আ টকাদেশের মেয়াদ ছিল ছয় মাস। ফিলিস্তিনি কমিশন অব ডিটেনিজ অ্যান্ড এক্স-ডিটেনিজ অ্যাফেয়ার্স জানিয়েছে, তার আ টকাদেশ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। প্রসবের পর তাকে ও নবজাতককে চিকিৎসার জন্য রামাল্লার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। জুদেহর পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গর্ভাবস্থায় তার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়নি। তারা তার গর্ভাবস্থায় আ টক রাখা এবং কারাগারের ভেতরে সন্তান প্রসবের পরিস্থিতির জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও কারা প্রশাসনকে দায়ী করেছে। তাদের দাবি, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি জুনে জানিয়েছিল, ডেমন কারাগারে জুদেহসহ তিনজন গর্ভবতী ফিলিস্তিনি নারী আ টক ছিলেন। তখন সংগঠনটি বলেছিল, গর্ভবতী বন্দিদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খাবার ও মানসিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সময়ে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিল। প্রশাসনিক আ টক ফিলিস্তিনি বন্দিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্কিত ব্যবস্থা। এতে অভিযোগ বা পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাউকে আ টক রাখা যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে সেই আ টকাদেশ নবায়নও করা হয়। জুদেহর ঘটনাটি গর্ভবতী বন্দিদের চিকিৎসা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমন কারাগারে আ টক নারীদের মধ্যে মা ও গর্ভবতী নারীও রয়েছেন। বন্দিদের চিকিৎসা, খাবার, পরিবার-সাক্ষাৎ এবং কারাগারের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো নিয়মিত অভিযোগ করে আসছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোই ফিলিস্তিনি পক্ষের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। দানা জুদেহর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায় পর্যন্ত তিনি আ টক ছিলেন এবং সন্তান জন্মের পর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার নবজাতক কন্যার জন্ম কারাগারের ভেতরে হওয়ায় বন্দি নারীদের জন্য গর্ভকালীন চিকিৎসা ও প্রসবকালীন নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও সামনে এসেছে।
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলে বন্দিদের নি র্যাতনের দায়ে দেশটির এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফেডারেল আদালত সামির উসমান আলশেখকে এই সাজা দেন। আলশেখ ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার কুখ্যাত আদরা কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন। চলতি বছরের মার্চে একটি জুরি তাকে নি র্যাতনের ষড়যন্ত্রের এক অভিযোগ এবং নি র্যাতনের তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালতে প্রমাণ হয়, কারাগারে থাকা কয়েকজন বন্দিকে নি র্যাতনের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এতে সরাসরি অংশও নিয়েছিলেন। মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করতে আলশেখ কিছু বন্দিকে আদরা কারাগারের একটি বিশেষ অংশে পাঠাতেন। সেখানে তাদের ছোট ছোট একাকী কক্ষে আটকে রাখা হতো এবং বিভিন্নভাবে নি র্যাতন করা হতো। দুই সপ্তাহের বিচার চলাকালে তিনজন ভুক্তভোগী আদালতে তাদের ওপর চালানো নি র্যাতনের বর্ণনা দেন। তারা জানান, তাদের দীর্ঘ সময় ধরে ছাদের পাইপের সঙ্গে ঝুলিয়ে মারধর করা হতো। এছাড়া শরীর ভাঁজ করে ফেলার মতো একটি যন্ত্র ব্যবহার করেও নি র্যাতন করা হয়েছিল বলে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া হয়। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রসিকিউটররা আদালতে বলেন, আলশেখ জানতেন তার কর্মকাণ্ড বেআইনি ও ভুল ছিল। তারপরও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বন্দিদের ওপর নি র্যাতনের নির্দেশ দেন এবং তাতে অংশ নেন বলে প্রসিকিউটরদের দাবি। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির কারাগারগুলোতে ব্যাপক নি র্যাতন ও বেআইনি আটকের অভিযোগ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, হাজার হাজার মানুষকে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের না জানিয়েই আটক রাখা হয়েছিল। আলশেখ ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং পরে নাগরিকত্বের আবেদন করেন। তবে মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, তিনি নিজের অতীত সম্পর্কে অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নি র্যাতনের মামলার পাশাপাশি মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, প্রতারণার মাধ্যমে গ্রিন কার্ড নেওয়া এবং মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। প্রসিকিউটররা আলশেখের জন্য কমপক্ষে ৮০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছিলেন। অন্যদিকে তার আইনজীবীরা পাঁচ বছরের সাজা চেয়ে যুক্তি দেন, আলশেখের বয়স ৭৪ বছর এবং তার গুরুতর শারীরিক ও জ্ঞানগত সমস্যা রয়েছে। তারা আরও জানান, সিরিয়ায় ফেরত পাঠানো হলে তিনি সেখানে নতুন সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত ছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযানে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের একটি বড় অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে এরপরও দেশটিতে বিভিন্ন সময় সহিংসতা ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে ফেব্রুয়ারিতে চালানো সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দায় থাকার ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ পেয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান মিশন। মিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই প্রতিবেদনে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের মিশন বলেছে, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক জনগণের ওপর পরিচালিত হয়েছে এবং এর মধ্যে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কঠোর বিধিনিষেধের মতো ঘটনা রয়েছে। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক তৎপরতা এবং একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে তেহরানের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, সেখানে হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী ছিল বলে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট ভিত্তি তারা পেয়েছেন। ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। জাতিসংঘের মিশনের মতে, বিদ্যালয়টি স্পষ্টভাবে একটি বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল। তদন্তকারীরা এমন কোনো প্রমাণ পাননি যে হামলার সময় ভবনটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে বিদ্যালয়টি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের একটি নৌঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী ওই এলাকায় একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কমান্ডারের উপস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু হামলার আগে সেই তথ্য যথাযথভাবে হালনাগাদ বা যাচাই করা হয়নি। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা মনে করেন, লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিদ্যালয়টি সামরিক স্থাপনা কি না তা নিশ্চিত না করে হামলা চালানো এবং বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত লাগার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অভিযান পরিচালনা করা সাধারণ অবহেলার চেয়ে গুরুতর বিষয়। জাতিসংঘের মিশনের মতে, এর ফলে বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং হামলাটি নির্বিচার আক্রমণের বৈশিষ্ট্য বহন করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় এমন হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মিনাবের ওই হামলার দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো চূড়ান্ত নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে দাবি করেছিলেন, মেয়েদের স্কুলটি ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে কেউ হামলা চালায়নি। অন্যদিকে রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তদন্তে মিনাবের হামলায় মার্কিন বাহিনীর জড়িত থাকার সম্ভাবনা উঠে এসেছিল। পেন্টাগন পরে তদন্তের পরিধি বাড়ালেও এর পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করেনি। মিনাবের হামলার পাশাপাশি লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে হামলাও তদন্ত করেছে জাতিসংঘের মিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হন। তদন্তকারীরা এই হামলাকেও নির্বিচার হামলা হিসেবে উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তবে লামের্দের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মার্চে জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দিনে মার্কিন বাহিনী লামের্দ শহরে কোনো হামলা চালায়নি। জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনের পরও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। মিশনের তদন্ত অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক ও পরিকল্পিত দমন-পীড়ন চালায়। এর মধ্যে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের তথ্য পাওয়া গেছে। মিশন এসব কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়তে পারে বলে জানিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে নিহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরানি সরকারের সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৩৮ জন নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, তারা এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি এবং প্রকৃত নিহত ও আহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার ইরানি কর্তৃপক্ষের দমননীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই সময়ের দমন-পীড়নকে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির সবচেয়ে বড় দমন অভিযানের অন্যতম হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে তেহরান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং বিক্ষোভের জন্য বিদেশি শক্তি ও নির্বাসিত সরকারবিরোধীদের দায়ী করে আসছে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান যুদ্ধের সময় বেসামরিক স্থাপনায় হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিবেদনে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন পর্যালোচনা করায় সংঘাতের দুই দিকের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিও সামনে এসেছে। সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস
তুরস্কে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায় ও অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যে নতুন করে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলের প্রধান আদালতের বাইরে সমাবেশ করতে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের আটক করা হয়। এর একদিন আগে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী, সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল। মঙ্গলবারের সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা আগের অভিযানে আটক হওয়া অধিকারকর্মীদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছিলেন। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেন। কয়েকজন বিক্ষোভকারী ‘এলজিবিটিকিউ হওয়া অপরাধ নয়’ লেখা একটি ব্যানারও প্রদর্শন করেন। এরপর পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। তুরস্কের সরকারের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক অভিযানকে ‘আমার পরিবার নিরাপদ’ নামে একটি কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষা করা। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায় ও তাদের সংগঠনগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হয়েছে। গত সপ্তাহে তুরস্কের বিভিন্ন প্রদেশে এলজিবিটিকিউ সংগঠনের কার্যালয়, সমকামীদের জন্য পরিচালিত বার এবং অধিকারকর্মীদের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কিছু সংগঠন ও গণমাধ্যমের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবেও প্রবেশাধিকার সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে। তুরস্কের বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘আমার পরিবার নিরাপদ’ অভিযানের আওতায় ১৫টি প্রদেশে ১৬২ ব্যক্তি, নয়টি সংগঠন এবং ১৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আইনি কার্যক্রম চলছে। ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা, ইজমির, আইদিন ও মেরসিনের প্রধান কৌঁসুলিদের কার্যালয়ের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে। তুরস্ক সরকার এসব কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে যৌন ব্যবসায় সহায়তা, অশ্লীল উপকরণ তৈরি বা বিতরণ এবং শিশুদের এ ধরনের উপকরণের সংস্পর্শে আনার অভিযোগও রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এলজিবিটিকিউ সংগঠনগুলোর বিদেশি ও সরকারি উৎস থেকে পাওয়া অর্থায়ন নিয়েও তদন্তের কথা বলা হয়েছে। তবে এই অভিযানের পর ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও’ফ্লাহার্টি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি এলজিবিটিকিউ নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করে গ্রেপ্তার, অভিযান এবং ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব বন্ধের প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানান। ও’ফ্লাহার্টি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে অধিকার নিয়ে কাজ করা বা বৈষম্যহীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া নিজে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির পরিচয়, সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বা বৈধ অর্থায়ন পাওয়ার কারণে নয়, বরং স্বীকৃত অপরাধের বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত ও আটক হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, আটক ব্যক্তিদের আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ, বিচারিক পর্যালোচনা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেকোনো বিধিনিষেধ আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। তুরস্কে সমলিঙ্গের সম্পর্ক নিজে অপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ নয়। তবে দেশটিতে এলজিবিটিকিউ অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক রয়েছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান অতীতে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়কে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং জনসংখ্যা ও পারিবারিক মূল্যবোধের আলোচনায় এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক অভিযানের পর অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু এখন আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের কর্মকাণ্ডে নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কি না। ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে। মঙ্গলবারের বিক্ষোভ ও আটকের ঘটনায় তুরস্কে এলজিবিটিকিউ অধিকার, মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চলমান তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। সূত্র: বিবিসি, ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয়, এএফপি।
ইরানে ৩২ বছর বয়সী ব্লগার মারজিয়ে ‘সেভদা’ এব্রাহিমি শামসাবাদিকে মৃ ত্যু দ ণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠন ও ইরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে অপমান, জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী প্রচার, শত্রু রাষ্ট্রের হয়ে গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড এবং সামরিক স্থাপনার ছবি তুলে বিদেশি ফারসি গণমাধ্যমে পাঠানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। মারজিয়েকে বন্দর আব্বাস রেভল্যুশনারি কোর্টের একটি শাখা ‘করাপশন অন আর্থ’ বা ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি’—ইরানের আইনে মৃ ত্যু দ ণ্ডযোগ্য একটি অভিযোগ—এ দোষী সাব্যস্ত করে মৃ ত্যু দ ণ্ড দিয়েছে বলে হেংগাও ও এইচআরএএনএ জানিয়েছে। আদালত তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সরকারি ও জনসেবামূলক কাজে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশও দিয়েছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার আইনজীবীকে ২৩ আগস্ট মৃ ত্যু দ ণ্ডের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মামলার অন্যতম অভিযোগ হলো, মারজিয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানের ছবি তুলেছিলেন এবং সেটি ইরানের বাইরে থাকা একটি ফারসি ভাষার গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ এটিকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই মামলায় তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতাকে অপমান এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার গ্রে প্তারের আগে দেওয়া একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট। ২৩ ফেব্রুয়ারির ওই পোস্টে প্রায় ১০ হাজার অনুসারীর উদ্দেশে তিনি লিখেছিলেন, একদিন যদি তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তাহলে যেন মনে রাখা হয়—তিনি নিজের বিশ্বাসের পথ বেছে নিয়েছিলেন। পোস্টটিতে একটি সাদা কবুতর ও লাল গোলাপের ছবিও ছিল। পরে তার মৃ ত্যু দ ণ্ডের খবর প্রকাশ হলে পোস্টটি নতুন করে আলোচনায় আসে। মারজিয়েকে ২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে বা এপ্রিল মাসে আ ট ক করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। হেংগাও ও এইচআরএএনএ বলছে, যুদ্ধসংক্রান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে তাকে এপ্রিল মাসে আ ট ক করা হয়; অন্যদিকে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তিনি মার্চ থেকেই বন্দি ছিলেন। তাকে বন্দর আব্বাস কারাগারে রাখা হয় এবং প্রায় ২০ দিন একাকী বন্দিত্বে থাকার অভিযোগও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, মারজিয়ের শারীরিক অবস্থাও উদ্বেগজনক। হেংগাও ও এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তিনি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা এমএস, সোরিয়াসিস, নার্কোলেপসি এবং গুরুতর পেটের সমস্যায় ভুগছেন। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কারাগারে চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তার ঘটনাটি ইরানে রাজনৈতিক ও বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট মামলায় মৃ ত্যু দ ণ্ড ব্যবহারের ব্যাপক বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৯ জনের মৃ ত্যু দ ণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে। সংগঠনটি বলছে, আরও অনেকে মৃ ত্যু দ ণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মারজিয়ে দেশটিতে মৃ ত্যু দ ণ্ডের মুখে থাকা অন্তত আট নারীর একজন। এসব মামলার মধ্যে কয়েকটি জানুয়ারির বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মারজিয়ের মামলাটি মূলত যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। সোর্স: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
সুইডেনে মুসলিমদের সমঅধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দেশটির রাজনৈতিক দল ভিজন পার্টি। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দলটি বলেছে, মুসলিমদের শুধু অভিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁরা সুইডিশ সমাজের নাগরিক, পেশাজীবী, অভিভাবক ও ভোটার এবং তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের অধিকারও অন্য নাগরিকদের মতোই সুরক্ষিত হওয়া উচিত। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভিজন পার্টি সংখ্যালঘু অধিকার, বৈষম্যবিরোধী নীতি, মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পরিবারনীতি এবং সমতার বিষয়গুলোকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ করেছে। নির্বাচনের আগে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, এবারের নির্বাচন সুইডেনের গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দলটির অভিযোগ, সুইডেনের রাজনৈতিক আলোচনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলাম, মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং উগ্রবাদকে অনেক সময় একই আলোচনার মধ্যে আনা হচ্ছে। ভিজন পার্টির মতে, সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলা করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনকারী মুসলিমদের অধিকার রক্ষা করা দুটি আলাদা বিষয়। তাদের আশঙ্কা, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আড়ালে সাধারণ মুসলিম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এদিকে সুইডেনের রাজনীতিতে অভিবাসন ও ইসলাম নিয়ে বিতর্ক নির্বাচনের আগে আরও জোরালো হয়েছে। দেশটির ডানপন্থি সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দলের শীর্ষ নেতা রিচার্ড জোমশফ সাম্প্রতিক সময়ে ইসলাম নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। আগস্টে সুইডিশ সংবাদমাধ্যম এসভিটি জানিয়েছিল, জোমশফ এক সাক্ষাৎকারে সুইডিশ মুসলিমদের ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর এই বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনও সমালোচনা করেন এবং বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা সুইডেনের মৌলিক মূল্যবোধ। জোমশফ অবশ্য নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। এসভিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ইসলামকে সুইডেনের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন এবং নির্বাচনের আগে ইসলাম নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ভবিষ্যৎ সরকারে এমন একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন, যেখানে ইসলাম ও তথাকথিত ‘ইসলামায়ন’ বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হবে। এই রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই ভিজন পার্টি জানিয়েছে, তারা সুইডেনে মুসলিমদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি তুলেছে। দলটির দাবি, তারা জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থার অধীন তিনজন বিশেষ প্রতিবেদকের কাছে ২১ পৃষ্ঠার একটি নথি জমা দিয়েছে। সেখানে সুইডেনে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে ৮৮টি তথ্যসূত্র ও নথিভিত্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দলটি জানিয়েছে। ভিজন পার্টির ভাষ্য, তারা সুইডেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম নিষিদ্ধ করার অভিযোগ করছে না। বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা, বৈষম্য ও সংখ্যালঘু অধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকদের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। দলটির দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকেরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে সুইডিশ সরকারের কাছে উদ্বেগ জানাতে পারেন। তবে সুইডেনে ইসলাম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যে শুধু ভিজন পার্টির অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। রিচার্ড জোমশফের বক্তব্য নিয়ে দেশটির অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকেও সমালোচনা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসন বলেছেন, রাজনৈতিক ইসলাম ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা সুইডেনের মৌলিক অধিকার। জোমশফের বক্তব্যের পক্ষে তাঁর দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের নেতা জিমি অকেরসনও অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচনী বিতর্কে জোমশফের বক্তব্য রাখার অধিকার রয়েছে। তবে বক্তব্যটি কোন প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। এর আগে ইসলাম নিয়ে জোমশফের বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে সুইডেনে বিতর্ক হয়েছে। ২০২৩ সালে ইসলামকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে তাঁর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের পর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। ২০২৪ সালেও ইসলামবিরোধী ব্যঙ্গচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়। ভিজন পার্টি বলেছে, মুসলিমদের জন্য তারা কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি করছে না। তাদের দাবি মূলত সংবিধান ও আইনে স্বীকৃত সমঅধিকার বাস্তবায়ন। দলটির মতে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্যের শিকার না হন এবং মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিরাপদ পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দলটি ধর্মীয় বৈষম্য ও ঘৃণাভিত্তিক অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার এবং ধর্মীয় পোশাক, উপাসনা কিংবা মুসলিমদের পরিচালিত সংগঠনের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিধিনিষেধ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ভিজন পার্টির তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় সংসদে আসন পাওয়ার লক্ষ্যও জানিয়েছে দলটি। তাদের বক্তব্য, মুসলিমদের নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা সুইডেনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করবে। সুইডেনের ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে অভিবাসন, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচয় ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে মুসলিমদের অধিকার নিয়ে ভিজন পার্টির অবস্থান এবং জোমশফের ইসলামবিষয়ক বক্তব্য দেশটির নির্বাচনী বিতর্কে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, এসভিটি নিউজ
উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানবতার অস্তিত্বের জন্যই বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক। এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এখনই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় শক্তিশালী নিশ্চয়তা দরকার। সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া এক বিস্তৃত বক্তব্যে টুর্ক এ সতর্কতা জানান। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব শুরুর আগে দেওয়া এই বক্তব্যে তিনি এআই কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকি কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। টুর্ক বলেন, উন্নত এআই মানবতার জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ মহলে যে উদ্বেগ রয়েছে, তিনি সেটি ভাগ করে নেন। এআইয়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কঠোর নিশ্চয়তা তৈরির জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, শক্তিশালী এআই ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, বিভিন্ন সেবা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ব্যাহত হতে পারে। টুর্কের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে এআই ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রশ্ন। তিনি সতর্ক করে বলেন, অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে এআই প্রযুক্তির ওপর অত্যন্ত বড় ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন যাচাই এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা একই গতিতে এগোচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় টুর্ক এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে জড়িত দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে এআই তৈরি ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কিছু স্পষ্ট সীমারেখা বা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ঐকমত্য তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা স্বাধীনভাবে যাচাই এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেন। এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে টুর্কের উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও রয়েছে। তিনি জুলাইয়ে আলোচিত তথাকথিত ‘হাগিং ফেস’ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেন। ওই ঘটনায় এআই এজেন্টের একটি দল একটি উন্মুক্ত সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মের সার্ভারে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করেছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। টুর্কের দপ্তরের মতে, এ ধরনের ঘটনা উন্নত এআইয়ের সক্ষমতা এবং বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে ব্যবধান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নয়, এআইয়ের সামাজিক ও মানবাধিকারগত প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন। কর্মসংস্থান, গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি এবং পরিবেশের ওপর এআইয়ের প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এআইয়ের উন্নয়ন যেন মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। টুর্ক আগামী দিনগুলোতে এআই কোম্পানিগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকা ঝুঁকিগুলো কমাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন বলেও জানান। এআই নিয়ে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের দাবি অবশ্য নতুন নয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা উন্নত এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতিমালা তৈরির ওপর জোর দিয়ে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও উচ্চঝুঁকির এআই ব্যবস্থার জন্য কঠোর নিয়ম চালু করেছে। ভলকার টুর্কের এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন এআই প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি এর অপব্যবহার, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এদিকে মানবাধিকার পরিষদে দেওয়া একই বক্তব্যে টুর্ক যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন হেফাজতে চলতি বছর প্রায় ২৩ জনের মৃত্যুর বিষয়েও জবাবদিহির আহ্বান জানান। ইউক্রেনে রাশিয়ার কথিত স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ব্যবহারের প্রতিবেদন নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে দ্রুত নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানান। এসব প্রতিবেদনের কিছু বিষয়ে রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। সূত্র: রয়টার্স
তালেবানের হাতে নির্যাতনের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে বহিষ্কার থেকে আইনি সুরক্ষা পাওয়া এক আফগান নাগরিককেও আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওই আফগান তরুণের বয়স ২০-এর কোঠায়। তার আইনজীবী আলমা ডেভিড জানিয়েছেন, তালেবানের কাছ থেকে তার পরিবারের সদস্যদের পাওয়া হুমকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত তাকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে তার এক ভাই আফগান ন্যাশনাল আর্মিতে কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। আরেক ভাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাইলট ছিলেন, যিনি পরে তালেবানের হাতে নিহত হন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ওই আফগান নাগরিককে শুধু ‘খলিল’ নামে শনাক্ত করেছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবা ও বোনও মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফার্স্টের কর্মকর্তা সাভি আরভেরি জানিয়েছেন, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নির্বাসন ফ্লাইট মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ে পৌঁছেছে। ওই ফ্লাইটে ১২ জন আফগান ও আটজন ইরানিসহ নেপাল ও নিকারাগুয়ার কয়েকজন নাগরিক ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় নির্বাসন ফ্লাইট। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অংশ হিসেবে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে এমন অনেক মানুষকে নিজ দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ ভ্রমণ সতর্কতায় মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে কোনো কারণেই ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে অস্থিরতা, অপরাধ, অপহরণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজায় পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর শুরু করা ফৌজদারি তদন্তে আস্থা নেই তার মা ওয়েসাম হামাদার। তার আশঙ্কা, এই তদন্ত প্রকৃত সত্য উদঘাটনের বদলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা হয়ে উঠতে পারে। এ সপ্তাহে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হিন্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালানোর ঘটনায় সামরিক পুলিশের মাধ্যমে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করা হবে। এর আগে ওই এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা উপস্থিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিল আইডিএফ। শুক্রবার এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিন্দের মা ওয়েসাম হামাদা বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ, সরকার কিংবা দেশটির বিচারব্যবস্থার ওপর তার কোনো আস্থা নেই। তিনি এমন কোনো তদন্ত চান না, যার উদ্দেশ্য হবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দায় এড়িয়ে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। হামাদা বলেন, তার দাবি করা তদন্ত কোনো ‘বন্ধ সামরিক তদন্ত’ হওয়া উচিত নয়। তিনি চান স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং যারা দায়ী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক। তার ভাষায়, হিন্দ শুধু একটি সংবাদঘটনা নয়, সে তার সন্তান। হিন্দ রাজাবের হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। গাজা সিটিতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি গাড়িতে ছিল পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ। গাড়িটিতে থাকা অন্য কয়েকজন স্বজন নিহত হওয়ার পরও হিন্দ কিছু সময় জীবিত ছিল। পরে সে জরুরি সেবাকর্মীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে সাহায্যের জন্য আকুতি জানায়। সেই ফোনালাপের রেকর্ডিং পরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দকে উদ্ধারের জন্য ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যাওয়ার পর উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ১২ দিন পর হিন্দ, তার পরিবারের সদস্য এবং তাকে উদ্ধারে যাওয়া দুই প্যারামেডিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রথমে ওই এলাকায় তাদের কোনো সেনা উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুসন্ধান ও প্রমাণে ঘটনাস্থলের আশপাশে ইসরায়েলি সামরিক যান ও সেনাদের অবস্থানের বিষয়ে তথ্য সামনে আসে। চলতি সপ্তাহে আইডিএফ প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যে তাদের সেনারা হিন্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল। আইডিএফের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্সের চলাচল সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কথিত ব্যর্থতার বিষয়টি পর্যালোচনার পর ফৌজদারি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্তটি সামরিক পুলিশ পরিচালনা করবে। এই তদন্তকে হিন্দের পরিবারের পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মীরাও যথেষ্ট মনে করছেন না। তাদের প্রশ্ন, দুই বছরেরও বেশি সময় পর ইসরায়েলি বাহিনী কেন নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে তদন্ত শুরু করল এবং এই তদন্ত আদৌ স্বাধীনভাবে দায় নির্ধারণ করতে পারবে কি না। হিন্দের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহির দাবি উঠেছে। তার মৃত্যুর আগে জরুরি সেবাকর্মীদের কাছে করা ফোনকলের রেকর্ডিং ঘটনাটিকে গাজা যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত করে। ঘটনাটি নিয়ে পরে নির্মিত ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’ চলচ্চিত্রটিও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক মনোযোগ পায় এবং অস্কারের মনোনয়ন লাভ করে। আইডিএফ একই সময়ে গাজায় আরও একটি বহুল আলোচিত ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে রাফাহ এলাকায় ১৫ ফিলিস্তিনি প্যারামেডিক নিহত হওয়ার ঘটনাটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তবে গাজায় ত্রাণকর্মীদের নিহত হওয়ার আরও কয়েকটি ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে। হিন্দের মায়ের দাবি, তার পরিবারের জন্য শুধু একটি অভ্যন্তরীণ সামরিক তদন্ত যথেষ্ট নয়। তিনি এমন একটি প্রক্রিয়া চান, যেখানে তদন্তকারীরা স্বাধীনভাবে প্রমাণ পর্যালোচনা করবেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন আইডিএফের সামরিক পুলিশের তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং এর ভিত্তিতে কোনো সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হিন্দের পরিবার অবশ্য শুরু থেকেই বলে আসছে, তারা শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, ঘটনার পূর্ণ সত্য ও দায়ীদের জবাবদিহি দেখতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল লেবানন। দেশটির পার্লামেন্ট মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে তার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আইন অনুমোদন করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ বিলোপের স্বীকৃতি পেল লেবানন। মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে এ-সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার পর স্পিকারের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বর্তমানে যেসব আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। আইনে কঠোর শ্রমসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এখন বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। এরই মধ্যে তার সরকার বিলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননে কার্যত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ছিল না। সর্বশেষ ২০০৪ সালে সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও আদালত বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে আসছিল। এমনকি এই সপ্তাহের শুরুতেও একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। নতুন আইনের ফলে সেই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো। এর আগে হত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। নতুন আইনের অধীনে এসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক হেবা মরায়েফ বলেন, লেবাননের এই সিদ্ধান্ত দেশটির মানবাধিকার অগ্রযাত্রায় একটি বড় মাইলফলক। দুই দশকের বেশি সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ার যে বাস্তবতা ছিল, নতুন আইন সেটিকে স্থায়ী আইনি সুরক্ষায় পরিণত করেছে এবং জীবন রক্ষার অধিকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, লেবাননের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবে পার্লামেন্টে বিলটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়নি। হিজবুল্লাহর সংসদীয় জোট এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। যদিও পার্লামেন্টের বিবৃতিতে ভোটের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পাশাপাশি লেবাননের পার্লামেন্ট কারাগারের অতিরিক্ত বন্দি সংকট মোকাবিলায় সাধারণ ক্ষমা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও বিবেচনা করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দিতে পূর্ণ। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, লেবাননের কারাগারে থাকা প্রায় ৮০ শতাংশ বন্দির বিচার তখনও শেষ হয়নি। বিশ্বজুড়ে বহু দেশ ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করলেও মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশে এখনো এই শাস্তি বহাল রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, ইরান ও মিসরে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে লেবাননের এই সিদ্ধান্তকে অঞ্চলটির বিচারব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস) কর্মকর্তাদের জন্য বিদ্যুৎ শক দিতে সক্ষম বিশেষ ধরনের গ্লাভস কিনতে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের (ডিএইচএস) প্রকাশিত একটি ক্রয়সংক্রান্ত নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রকাশের পরই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডিএইচএসের নোটিশ অনুযায়ী, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে আইসের কর্মকর্তা ও এজেন্টদের ব্যবহারের জন্য হাজার হাজার 'গ্লোভ (Generated Low Output Voltage Emitter)' কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো তৈরি করে কেন্টাকির লেক্সিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কমপ্লায়েন্ট টেকনোলজিস এলএলসি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই গ্লাভস সাধারণ টহল গ্লাভসের মতোই ব্যবহার করা যায়। তবে প্রয়োজনে একটি সুইচ চাপলে এটি বিদ্যুৎ শক দেওয়ার মোডে চলে যায়। কারও খোলা ত্বকে স্পর্শ করালে এটি তীব্র ব্যথার অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং সাধারণত তিন সেকেন্ডেরও কম সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এতে পোড়া দাগ, ক্ষত বা স্থায়ী চিহ্ন পড়ে না। কমপ্লায়েন্ট টেকনোলজিস এ প্রযুক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তুলনামূলক কম দৃশ্যমান এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে সহায়ক একটি পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কারাগারেও এ ধরনের গ্লাভস ব্যবহারের নজির রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য প্রিভেনশন অব ইন-কাস্টডি ডেথসের সভাপতি জন পিটার্স, যিনি এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, বিদ্যুৎ শকের অনুভূতি অনেকটা মৌমাছির হুল ফোটানোর মতো তীব্র ও তাৎক্ষণিক। তার মতে, কেউ প্রতিরোধ করলে কর্মকর্তাদের জন্য এটি কার্যকর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক সরঞ্জাম হতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিষয়ক কঠোর নীতি বাস্তবায়নের সময় আইসের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ আগেই উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ শক দেওয়ার নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ আরও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) পুলিশিং প্রকল্পের উপপরিচালক জেন রলনিক বোরকেটা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগে এ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তার গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তার ভাষায়, "গত এক বছরে আইস দেখিয়েছে যে তারা খুব দ্রুত বলপ্রয়োগে যায়। এখন একটি বোতাম চাপলেই তারা বিদ্যুৎ শক ব্যবহার করতে পারবে, যা হয়তো অন্য কেউ দেখতেও পারবে না। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।" অন্যদিকে জন পিটার্সের ধারণা, আইসের এই ক্রয়াদেশ সম্ভবত কোম্পানিটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্ডার হতে যাচ্ছে। তার মতে, গাড়ি, বাড়ি বা আটককেন্দ্রে সহযোগিতা না করা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্মকর্তারা এ গ্লাভস ব্যবহার করতে পারেন। তবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিজেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে। তাদের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এটি কোনোভাবেই শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। শুধু মৌখিকভাবে প্রতিবাদ বা অসহযোগিতা করছেন, এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধেও এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। এছাড়া শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এ গ্লাভস ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে কমপ্লায়েন্ট টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেফ নিকলাস ই-মেইলে জানান, এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে অপারগ। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আইসিইর হেফাজতে থাকা এক ক্যানসারজয়ী অভিবাসীকে চিকিৎসাজনিত জটিলতায় তিনবার হাসপাতালে নিতে হয়েছে। আদালতের নথি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত রেকর্ডে উঠে এসেছে, হেফাজতে থাকার সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা নিয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন তিনি। বিষয়টি নতুন করে আইসিই হেফাজতে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি একজন রোমানিয়ান নাগরিক। ২০২৫ সালে জরুরি ট্রিপল বাইপাস অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন ১৬টি ওষুধ সেবনের প্রয়োজন ছিল। পরে তাকে আইসিই হেফাজতে নেওয়া হলে আদালতের নথিতে অভিযোগ করা হয়, কিছু সময় তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি এবং বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তার চিকিৎসা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এর ফলে বুকে ব্যথা নিয়ে তাকে তিন দফা হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। আদালতে দাখিল করা নথিতে আরও বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তির আইনজীবীরা মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেওয়ার আবেদন করেছেন। তাদের দাবি, গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে আটক রেখে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দেওয়া তার শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিকে আইসিই বরাবরের মতোই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটির দাবি, তাদের হেফাজতে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। এ ঘটনা এমন এক সময় সামনে এলো, যখন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও কেএফএফ হেলথ নিউজের যৌথ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অভিবাসন আটককেন্দ্রে চিকিৎসা অবহেলার শত শত অভিযোগের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আদালতের নথিতে বহু আটক ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়া এবং চিকিৎসায় বিলম্বের অভিযোগ করেছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইসিই হেফাজতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আটককেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সুবিধা ও নজরদারি জোরদারের দাবি জানালেও আইসিই বলছে, তাদের স্বাস্থ্যসেবা জাতীয় মানদণ্ড অনুসারেই পরিচালিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানিভেলের এক অভিবাসী কাঠমিস্ত্রিকে তার তিন বছর বয়সী শিশুকন্যার সামনেই চরম নিষ্ঠুরতায় মারধর এবং পরবর্তীতে জোরপূর্বক মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে মার্কিন অভিবাসন ও কাস্টমস প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস)-এর বিরুদ্ধে। এই অমানবিক আচরণের শিকার উলিসেস পেনা লোপেজ ও তার পরিবার মার্কিন ফেডারেল সরকার এবং দুটি বেসরকারি কারা কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছেন। সান জোসের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা এই মামলাটি স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে সানিভেলে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়িতে বসে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন লোপেজ। ঠিক তখনই আচমকা মুখে মাস্ক পরা এবং বিশেষ রণসজ্জায় সজ্জিত একদল আইস (ICE) এজেন্ট তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন কর্মকর্তা লাঠি দিয়ে লোপেজের গাড়ির কাচে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকেন। লোপেজ গাড়ি থেকে নেমে আসামাত্রই কর্মকর্তারা তাকে জাপটে ধরেন। লোপেজের স্ত্রী আবি পেনা, যিনি একজন মার্কিন নাগরিক, সিঁড়ির ওপর থেকে বাধা পেয়ে পুরো ঘটনাটি দেখছিলেন। অন্যদিকে, তাদের তিন বছরের শিশু সন্তান জানলা দিয়ে বাবার ওপর এই নৃশংস নির্যাতন প্রত্যক্ষ করে ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, এক কর্মকর্তা লোপেজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ধরেন এবং বাকিরা তাকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তাকে টেনে তুলে গাড়ির সঙ্গে চেপে ধরে বুক, পাঁজর ও ঘাড়ে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকেন। লোপেজ ইংরেজি ভালো না বোঝায় কর্মকর্তারা তাকে ইংরেজিতে গালিগালাজ ও চিৎকার করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় লোপেজ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং খিঁচুনি শুরু হয়। চিকিৎসাগতভাবে তিনি এর আগে একটি ‘মিনি স্ট্রোক’-এর ভুক্তভোগী ছিলেন। কিন্তু গাড়ি থেকে নামানোর সময় হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় তাকে ৪ ফুট উঁচু ভ্যান থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। মাটিতে পড়া অবস্থায় আইস এজেন্টরা তাকে লাথি ও ঘুষি মারতে থাকেন। এমনকি এক কর্মকর্তা তার গলা চেপে ধরে পুরো শরীরের ভর দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেন, যার ফলে লোপেজ দুইবার জ্ঞান হারান। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্যারামেডিকস ডেকে তাকে মাউন্টেন ভিউয়ের এল ক্যামিনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর লোপেজকে বেকার্সফিল্ডের কাছে অবস্থিত ‘গোল্ডেন স্টেট এনেক্স’ এবং পরবর্তীতে ‘ক্যালিফোর্নিয়া সিটি’ নামের দুটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। এগুলো পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জিইও গ্রুপ ও কোরসিভিক। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও লোপেজকে সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, বরং তীব্র শীতের মধ্যে সারারাত লাইট জ্বালিয়ে রেখে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। মাসের পর মাস তার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও হৃদরোগের জন্য নির্ধারিত খাবার বন্ধ রাখা হয়। অবশেষে গত বছরের অক্টোবরে তাকে মেক্সিকোতে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা হয়। এদিকে মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) এই মামলার দাবিগুলো অস্বীকার করেছে। তাদের একজন মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ৩১ বছর বয়সী লোপেজ একজন চিহ্নিত অপরাধী, যিনি ২০১৩ সালে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার অপরাধে সাজা হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সর্বদা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বনিম্ন বল প্রয়োগ করে থাকে বলে দাবি করেন তিনি। তবে লোপেজের আইনজীবী এলেনা হজেস বলেন, অতীতে কারও কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকলেই তাকে এভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার করার অধিকার আইস কর্মকর্তাদের নেই। আইস মূলত নিজেদের নির্মম নির্যাতন ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার দায় এড়াতেই এখন লোপেজের অতীতের অপরাধের প্রসঙ্গ সামনে আনছে। বর্তমানে মেক্সিকোতে থাকা লোপেজ শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, নির্যাতনের কারণে তিনি ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। এদিকে সানিভেলে থাকা তার স্ত্রী তীব্র মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভুগছেন। আর তাদের তিন বছরের কন্যাসন্তানটি এখনো মাঝরাতে আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। কদিন আগেই তাকে ঘরের কোণে বাবার ছবি জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা গেছে। লোপেজের পরিবার এই অন্যায়ের বিচার এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে স্বাধীনতা দিবসের (৪ জুলাই) শোভাযাত্রার সময় শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী হিসেবে পরিচিত প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট নামের একটি সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে একই মেট্রো ট্রেনে যাত্রা করতে গিয়ে আতঙ্কের মুহূর্ত পার করেছেন এশীয় বংশোদ্ভূত এক মার্কিন নাগরিক। ঘটনাটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির নাম রসওয়েল এনসিনা। স্বাধীনতা দিবসে তিনি মেরিল্যান্ডে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মুখোশ পরা প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টের সদস্যরা তার মেট্রো ট্রেনে ওঠেন। পরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা গেটি ইমেজেস-এর তোলা কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, একা বসে থাকা এনসিনাকে ঘিরে রয়েছেন মুখোশধারী কয়েকজন সদস্য। এনবিসি ওয়াশিংটনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এনসিনা বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রস্তুত থাকে না। এমন মুহূর্তে শরীর শক্ত হয়ে আসে, আর মনে প্রশ্ন জাগে, আসলে কী ঘটছে।” তিনি জানান, পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কারও সঙ্গে চোখাচোখি করেননি। নিজেকে নিরাপদ রাখাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। তবে এই অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস থেকে সাহস নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এনসিনা বলেন, “আমি প্রথম ব্যক্তি নই, যিনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। রুবি ব্রিজেসসহ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অসংখ্য আফ্রিকান-আমেরিকান শিশু, কিশোর ও শিক্ষার্থী আরও কঠিন সময় পার করেছেন। তখন বুঝতে পারি, তাদের মতো সাহসই আমাকে ধরে রাখতে হবে।” এটি এনসিনার জীবনের প্রথম বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতাও নয়। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে একই মেট্রোতে যাত্রার সময় একদল কিশোর তার এবং আরেক এশীয় বংশোদ্ভূত যাত্রীর ওপর কফি ছুড়ে মারে। কিন্তু একই ট্রেনের অন্য অ-এশীয় যাত্রীদের তারা কিছুই করেনি। সে সময়ও তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন। এনসিনার ভাষায়, “পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও মনে হচ্ছে যেন একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশে এখনো বিভাজন রয়ে গেছে।” এদিকে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম অন এক্সট্রিমিজম-এর গবেষক লুক বাউমগার্টনার এনবিসি ওয়াশিংটনকে বলেন, প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টের মতো সংগঠনগুলো মূলত জনসম্মুখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চায়। তার ভাষায়, “তাদের মূল বার্তা হলো, আমেরিকা শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য। প্রচার পাওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য এবং অধিকাংশ উগ্রপন্থী সংগঠন এ ধরনের কৌশলই অনুসরণ করে।” উল্লেখ্য, অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ (ADL) প্যাট্রিয়ট ফ্রন্টকে একটি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংগঠনটি বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে মিছিল ও জনসমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে। সবকিছুর পরও মানবতার প্রতি নিজের বিশ্বাস হারাতে চান না এনসিনা। তিনি বলেন, “আমাদের আশা ধরে রাখতে হবে। এমন সময়গুলোতে আশাই সবচেয়ে বড় ভরসা। আমি এখনো বিশ্বাস করি, অধিকাংশ মানুষ মূলত ভালো।”
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।