বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়, মাঠের বাইরের নানা গল্পও। খেলোয়াড় ও সমর্থকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সৌভাগ্যের প্রতীক কিংবা অদ্ভুত অভ্যাস প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে। এবারের বিশ্বকাপেও তেমনই এক ব্যতিক্রমী কারণে সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছেন স্পেনের ডিফেন্ডার Marc Cucurella। স্প্যানিশ এই লেফট-ব্যাক জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসে তিনি নিজের লাগেজে স্ত্রীর একটি পায়জামা সঙ্গে করে এনেছেন। তার বিশ্বাস, এই পায়জামাটি তার জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে Spain national football team-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কুকুরেয়া ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও একই পায়জামা সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেই টুর্নামেন্টে স্পেন শিরোপা জিতেছিল। এরপর থেকেই বিষয়টি তার কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুকুরেয়া বলেন, তিনি বিশ্বকাপে কয়েকটি ব্যক্তিগত জিনিস সঙ্গে এনেছেন, যেগুলো তাকে মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত করে। তার ভাষায়, “আমি কিছু বিশেষ জিনিস সঙ্গে এনেছি। আমার সন্তানরা আমাকে যে কয়েকটি চাবির রিং বানিয়ে দিয়েছে, সেগুলো রয়েছে। এছাড়া আমার স্ত্রীর একটি পায়জামাও এনেছি, যা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সময় আমাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। এবারও সেটি স্যুটকেসে রেখেছি, যদি আবারও সৌভাগ্য বয়ে আনে।” ফুটবল ইতিহাসে এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। বিশ্বের অনেক তারকা খেলোয়াড়ই গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে নিজেদের সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে নির্দিষ্ট পোশাক, তাবিজ, পারিবারিক উপহার কিংবা ব্যক্তিগত স্মারক সঙ্গে রাখেন। অনেকের কাছে এগুলো কুসংস্কার মনে হলেও খেলোয়াড়দের মতে, এসব বিষয় মানসিক স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে মানসিক প্রস্তুতি শারীরিক প্রস্তুতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনেক ফুটবলারই নিজের পরিচিত পরিবেশ বা প্রিয় স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত কিছু জিনিস কাছে রাখার চেষ্টা করেন। কুকুরেয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই। তিনি এটিকে কোনো রহস্যময় সৌভাগ্যের উপাদান হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সঙ্গে আবেগগত সংযোগ এবং আত্মবিশ্বাসের উৎস হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ ইউরোতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর এবার বিশ্বকাপেও স্পেনের অন্যতম ভরসার নাম কুকুরেয়া। এখন দেখার বিষয়, তার ‘সৌভাগ্যের সঙ্গী’ পায়জামা সত্যিই স্পেনকে আরেকটি বড় শিরোপার পথে এগিয়ে নিতে পারে কি না। বিশ্বকাপের মঞ্চে ট্রফি জয়ের লড়াই যেমন চলবে, তেমনি মাঠের বাইরের এমন মানবিক ও ব্যতিক্রমী গল্পও সমর্থকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল ব্রাজিলকে। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, তারকাবহুল স্কোয়াড এবং সমর্থকদের আস্থার কারণে দলটির প্রতি প্রত্যাশাও ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই সেই প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ করতে পারেনি সেলেসাওরা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। পিছিয়ে পড়ার পর ভিনিসিউস জুনিয়রের দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফিরলেও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিতে পারেনি ব্রাজিল। ম্যাচের শুরু থেকেই ছন্দহীন ছিল ব্রাজিল। মাঝমাঠে সমন্বয়ের অভাব, ভুল পাস এবং রক্ষণে অনিশ্চয়তা তাদের খেলায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিপরীতে মরক্কো ছিল অনেক বেশি গোছানো ও আত্মবিশ্বাসী। দ্রুত আক্রমণ, সঠিক পাসিং এবং সংগঠিত রক্ষণভাগের মাধ্যমে তারা বারবার ব্রাজিলকে চাপে ফেলে। বিশেষ করে মাঝমাঠে ব্রাহিম দিয়াসের উপস্থিতি মরক্কোর খেলায় বাড়তি গতি যোগ করে। বল নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের ২১তম মিনিটে সেই প্রচেষ্টারই ফল পায় উত্তর আফ্রিকার দলটি। দিয়াসের নিখুঁত থ্রু পাস ধরে ডি-বক্সের দিকে ছুটে যান ইসমায়েল সাইবারি। গোলরক্ষক আলিসন বেকার সামনে এগিয়ে এলেও তাকে পরাস্ত করতে ভুল করেননি মরক্কোর এই ফরোয়ার্ড। চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। গোল হজমের পর কিছুটা চাপে পড়ে ব্রাজিল। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো ব্রাজিল সমর্থকের মধ্যে তখন নেমে আসে হতাশা। তবে অভিজ্ঞ দল হিসেবে দ্রুতই ম্যাচে ফেরার পথ খুঁজে নেয় তারা। ৩২তম মিনিটে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সমতা ফেরান ভিনিসিউস জুনিয়র। বাঁ প্রান্ত দিয়ে মরক্কোর রক্ষণভাগে ঢুকে একজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দুর্দান্ত শটে গোল করেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল তার ৫০তম ম্যাচে করা স্মরণীয় গোলগুলোর একটি। এই গোলের পর ব্রাজিল কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে পারেনি। প্রথমার্ধের বাকি সময় এবং দ্বিতীয়ার্ধে উভয় দলই তুলনামূলক সতর্ক ফুটবল খেলেছে। ফলে গোলের সুযোগও কম তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের আক্রমণে প্রত্যাশিত ধার দেখা যায়নি। রাফিনিয়া, পাকেতা কিংবা ইগোর থিয়াগো কেউই প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে পারেননি। অন্যদিকে মরক্কোও নিজেদের লিড পুনরুদ্ধারের জন্য ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না। পরিসংখ্যানেও দুই দলের লড়াইয়ের প্রতিফলন দেখা যায়। মরক্কো ১৩টি শট নেয়, যার চারটি ছিল লক্ষ্যে। ব্রাজিলের আটটি শটের মধ্যে চারটি লক্ষ্যে ছিল। তবে দুই গোলের পর ম্যাচে বড় কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। ম্যাচে ব্রাজিলের কাসেমিরো ও রজার ইবানিয়েজ হলুদ কার্ড দেখেন। মাঝমাঠ ও রক্ষণে তাদের ওপর চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মরক্কোর বিপক্ষে এটি ছিল ব্রাজিলের দ্বিতীয় ম্যাচ। এর আগে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়ে ৩-০ গোলের জয় পেয়েছিল সেলেসাওরা। সেই ম্যাচে গোল করেছিলেন রোনালদো ও রিভালদো। প্রায় তিন দশক পর আবার দেখা হলেও এবার জয় তুলে নিতে পারেনি ব্রাজিল। ম্যাচ শেষে আলোচনার বড় একটি বিষয় হয়ে উঠেছে নেইমারের অনুপস্থিতি। চোটের কারণে মাঠে নামতে পারেননি ব্রাজিলের এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড। গ্যালারিতে বসে সতীর্থদের খেলা দেখেছেন তিনি। আক্রমণভাগে সৃজনশীলতার ঘাটতি এবং শেষ তৃতীয়াংশে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব দেখে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, নেইমারের অনুপস্থিতি ব্রাজিল স্পষ্টভাবে অনুভব করেছে। তবে বিশ্বকাপের পথ এখনও দীর্ঘ। গ্রুপ পর্বে সামনে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। আগামী ২০ জুন হাইতির বিপক্ষে মাঠে নামবে ব্রাজিল। সেই ম্যাচে নেইমার ফিরতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়েও অনেক দল শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছে। কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর একটি প্রশ্ন ইতোমধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে, ব্রাজিল কি এবার সত্যিই তাদের বহু প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ মিশন সফল করতে পারবে?
বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠতেই আবারও রঙিন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চল। বাড়ির ছাদ, অলিগলি, বাজার, সড়কের মোড় কিংবা খেলার মাঠ, সর্বত্রই চোখে পড়ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। যদিও এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোনো অংশগ্রহণ নেই, তবুও ফুটবল উন্মাদনায় বিশ্বের অন্যতম আলোচিত দেশ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম এবং বিশেষ করে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে বিশ্বকাপ শুরু হলেই ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবেগের অংশ হয়ে ওঠে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে দেখা গেছে বিশাল আকারের ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। কোথাও কোথাও তৈরি করা হয়েছে ফুটবল তারকাদের বিশাল কাটআউট। বাজারে বেড়েছে বিভিন্ন দেশের জার্সির চাহিদাও। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক Lionel Messi এবং ব্রাজিলের তারকা Neymar-এর জার্সি কিনতে ভিড় করছেন সমর্থকেরা। বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সম্পর্ক না থাকলেও কয়েক প্রজন্ম ধরে এই দুই দেশের ফুটবল দলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসাধারণ এক আবেগ। বিশ্বকাপের সময় বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়দের মধ্যেও দেখা যায় মজার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে কখনো কখনো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিও তৈরি করে। সম্প্রতি হবিগঞ্জে স্থানীয় একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েক ডজন মানুষ আহত হওয়ার খবর আলোচনায় আসে। আবার শরীয়তপুরে কিছু তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে না পারা ব্রাজিল শিরোপা না জেতা পর্যন্ত তারা বিয়ে করবেন না। এসব ঘটনা বাংলাদেশের ফুটবল আবেগের ব্যতিক্রমী দিকগুলোই তুলে ধরে। তবে শুধু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা নয়, মাঝে মাঝে অন্য দেশগুলোকেও ঘিরে তৈরি হয় আগ্রহ। সম্প্রতি এক প্রবীণ ফুটবলপ্রেমী নিজের জমির একটি অংশ বিক্রি করে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা তৈরি করে আলোচনায় আসেন। তার আশা, একদিন এই বিশাল পতাকা জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থান পাবে। এবারের বিশ্বকাপে ২৮ বছর পর জায়গা করে নেওয়া নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। ঢাকায় নরওয়ে দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিদের তাদের দলকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দেয়। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নরওয়ের দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে ফুটবলের আগমন ঘটে। পরে পূর্ব পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক পরিবর্তনের সময় তরুণদের কাছে ফুটবল হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার উৎস। ষাট ও সত্তরের দশকে ব্রাজিলের কিংবদন্তি Pelé বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার সাফল্য এবং ব্রাজিলের আধিপত্য অনেককে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করে। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনের প্রসার ঘটার পর আশির দশকে বিশ্বকাপ আরও বেশি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই আসরে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি Diego Maradona-র নৈপুণ্য ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্মরণীয় পারফরম্যান্স অসংখ্য দর্শকের হৃদয় জয় করে। অনেকের কাছে সেটি ছিল কেবল ফুটবল নয়, বরং ইতিহাস ও আবেগের এক প্রতীকী মুহূর্ত। ম্যারাডোনার অবসরের পর নতুন প্রজন্মের কাছে সেই আবেগের জায়গা দখল করেন লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় মুখ নেইমার। ফলে বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের একটি বড় অংশ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা বিশ্বকাপ এলেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে এই আবেগ কখনো কখনো বিপজ্জনক রূপও নিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগে ২০১৪ সালে পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। ২০১৮ সালেও ব্রাজিলের পতাকা লাগাতে গিয়ে এক কিশোর প্রাণ হারায়। বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল মানুষের আনন্দ, পরিচয় ও আবেগের জায়গা হলেও সেটি যেন সুস্থ প্রতিযোগিতা ও উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের একসঙ্গে খেলা উপভোগ করার মধ্যেই নিহিত। এবারের বিশ্বকাপ ৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। আর সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, ছাদ ও আড্ডায়ও চলবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিতর্ক, যা বিশ্বকাপের এক অনন্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে বহু বছর ধরেই।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপের বহুল প্রতীক্ষিত লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় কোনোটিই দেখেনি ফুটবলপ্রেমীরা। মরক্কোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ায় ব্রাজিল, তবে ম্যাচের বাকি সময় আর কোনো দলই ব্যবধান গড়তে না পারায় ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয় ম্যাচটি। ম্যাচের শুরুটা ছিল মরক্কোর দখলে। আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলে তারা প্রথম থেকেই ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ছয়বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে দেখা যায় কিছুটা অগোছালো ছন্দে। প্রথম কয়েক মিনিটে খেলার বেশিরভাগ সময়ই বল ছিল ব্রাজিলের অর্ধে। ষষ্ঠ মিনিটেই প্রথম সুযোগ তৈরি করে মরক্কো। নাইল এল আইনাউইয়ের শট শেষ মুহূর্তে বাধা দেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার গাব্রিয়েল। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে ব্রাজিল। ১২তম মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পান ইগোর থিয়াগো। তবে ভিনিসিউস জুনিয়রের দারুণ ক্রস থেকে পাওয়া হেডটি লক্ষ্যে রাখতে ব্যর্থ হন তিনি। সুযোগ নষ্টের মাশুল গুনতে হয় ব্রাজিলকে। ম্যাচের ২১তম মিনিটে দ্রুতগতির এক পাল্টা আক্রমণ থেকে এগিয়ে যায় মরক্কো। মাঝমাঠ থেকে ব্রাহিম দিয়াসের চমৎকার থ্রু বল ধরে দৌড়ে যান ইসমায়েল সাইবারি। গোলরক্ষক আলিসন ডি-বক্সের বাইরে চলে আসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিখুঁত চিপ শটে বল জালে পাঠান পিএসভি আইন্দহোভেনের এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচেই গোলের দেখা পান ২৫ বছর বয়সী সাইবারি। তার গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও অনেকটা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় মরক্কো। তবে বেশিক্ষণ পিছিয়ে থাকতে হয়নি ব্রাজিলকে। ৩২তম মিনিটে জাতীয় দলের হয়ে নিজের ৫০তম ম্যাচ খেলতে নামা ভিনিসিউস জুনিয়র অসাধারণ এক ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সমতায় ফেরান দলকে। ব্রুনো গিমারেসের পাস ধরে ডি-বক্সে ঢুকে একজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে জোরালো শটে গোল করেন রেয়াল মাদ্রিদ তারকা। জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল ভিনিসিউসের দশম গোল এবং বিশ্বকাপ মঞ্চে দ্বিতীয়। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাওয়া এই গোল ব্রাজিলকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। প্রথমার্ধের শেষদিকে আবারও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় ব্রাজিল। লুকাস পাকেতার দুর্দান্ত ভলি শট কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো। প্রথমার্ধে গোলের জন্য নেওয়া শটের সংখ্যায় স্পষ্ট এগিয়ে ছিল মরক্কো। তারা ১২টি শট নেয়, যেখানে ব্রাজিলের শট ছিল ছয়টি। তবে উভয় দলই লক্ষ্যে রাখতে পারে দুটি করে শট। বিরতির পর ম্যাচের চিত্র বদলানোর প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে দুই দলই অনেক বেশি সতর্ক ফুটবল খেলে। ফলে খেলার গতি কমে যায় এবং আক্রমণভাগে ধারও দেখা যায়নি তেমন। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল বেশি আক্রমণ করলেও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। বারবার ভুল পাস ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তহীনতায় নষ্ট হয়েছে সম্ভাবনাময় আক্রমণ। ৭৯তম মিনিটে ম্যাচের অন্যতম সেরা সুযোগটি পান রাফিনিয়া। ভিনিসিউসের পাস থেকে ডি-বক্সে ফাঁকা জায়গায় বল পেয়েও গোলরক্ষককে পরাস্ত করতে পারেননি বার্সেলোনা তারকা। তার দুর্বল শট সহজেই সামলে নেন বোনো। কিছুক্ষণ পর মরক্কোর ডিফেন্ডার ইসা দিওপের ভুল ব্যাকপাস থেকে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হলেও দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেন বোনো। যোগ করা সময়ের শেষদিকে নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয় ব্রাজিলের বক্সে। প্রতিপক্ষের একটি শট প্রথমে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি আলিসন। ফিরতি বলে শট নেন আইনাউই। তবে দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় আবারও বল আটকে দিয়ে সম্ভাব্য বিপদ থেকে দলকে রক্ষা করেন লিভারপুলের এই গোলরক্ষক। ম্যাচ শেষে দুই দলই একটি করে পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে জয় না পেলেও হার এড়ানোয় কিছুটা স্বস্তি পাবে ব্রাজিল। অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে মরক্কো। পরিসংখ্যানের একটি দিকও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ম্যাচের দুই গোলদাতা ইসমায়েল সাইবারি ও ভিনিসিউস জুনিয়র জাতীয় দলের হয়ে যেসব ম্যাচে গোল করেছেন, সেসব ম্যাচে তাদের দল কখনও হারেনি। নিউ জার্সির এই ম্যাচেও সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকল। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে আগামী শনিবার হাইতির মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। একই দিনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে মরক্কো। দুই দলের জন্যই পরের ম্যাচগুলো গ্রুপের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে মাঠে নেমেই শুরুতে ধাক্কা খায় ব্রাজিল। তবে পিছিয়ে পড়ার সেই প্রাথমিক ধাক্কা দারুণভাবে সামলে নিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত এক গোলে ১-১ সমতায় থেকে প্রথমার্ধের খেলা শেষ করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দলের অন্যতম সেরা তারকা নেইমারকে ছাড়া খেলতে নামা ব্রাজিল ম্যাচের শুরু থেকেই কিছুটা ছন্নছাড়া ছিল। অন্যদিকে, প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই দারুণ গোছানো ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আফ্রিকান পরাশক্তি মরক্কো। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই গোল করার দারুণ এক সুযোগ পেয়েছিল তারা। ডান প্রান্ত থেকে ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণে উঠে ব্রাজিলের ডি-বক্সে বল পেয়ে যান তরুণ মিডফিল্ডার বেনজামিন এল আইনুই। তার নেওয়া শট শেষ মুহূর্তে সেলেসাও ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস আটকে দিলে সে যাত্রায় রক্ষা পায় ব্রাজিল। পরবর্তীতে ব্রাজিলও ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একটি কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ইগর থিয়াগো দারুণ সুযোগ পেলেও বলের সঙ্গে সঠিক সংযোগ ঘটাতে ব্যর্থ হন। ব্রাজিল যখন কেবল গুছিয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ২১তম মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের দারুণ এক পাসে গোল করে মরক্কোকে এগিয়ে নেন ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারি। তবে এই লিড খুব বেশি সময় ধরে রাখতে পারেনি মরক্কো। গোল হজমের মাত্র ১১ মিনিট পরই ব্রাজিলকে জাদুকরী এক গোলে সমতায় ফেরান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ৩২তম মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় মরক্কোর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে বুলেট গতির এক শটে জাল কাঁপান তিনি। দৃষ্টিনন্দন এই গোলের মাধ্যমেই জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের ৫০তম গোলের অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করলেন ভিনিসিয়ুস। প্রথমার্ধের এই সমতা দ্বিতীয়ার্ধের লড়াইকে যে আরও বেশি রোমাঞ্চকর করে তুলবে, তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের কোনো সন্দেহ নেই।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারকে পুরোপুরি নিজেদের রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন হাজারো ব্রাজিল সমর্থক। ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত ‘সি’ গ্রুপের এই ম্যাচটিকে সামনে রেখে সবুজ-হলুদ জার্সি পরা সমর্থকদের বাঁধভাঙা উল্লাসে পুরো এলাকায় এক অভাবনীয় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নির্বিঘ্ন করতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকার কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় স্থানীয় পুলিশ। ম্যাচের আগের দিন থেকেই টাইমস স্কয়ারে জড়ো হতে থাকা এই সমর্থকদের ঢাক-ঢোল, গান আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্রটি। ব্রাজিলের অতীত গৌরবের পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি তুলে ধরে নানা গান ও স্লোগানে মেতে ওঠেন তারা। সেইসঙ্গে সমর্থকদের মেলে ধরা বিশাল আকৃতির জাতীয় পতাকায় পুরো চত্বর যেন সবুজ-হলুদের সমুদ্রে পরিণত হয়। পিছিয়ে ছিলেন না মরক্কোর সমর্থকেরাও; জাতীয় পতাকা হাতে তারাও নিজেদের সরব উপস্থিতি জানান দেন। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে প্রাণবন্ত স্লোগান বিনিময় ও খুনসুটি চললেও পুরো পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। গ্রুপ পর্বের হাইভোল্টেজ এই ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। তবে মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই বড় এক দুঃসংবাদ পেয়েছে ব্রাজিল শিবির। পায়ের পেশির চোটের কারণে দলের অন্যতম প্রধান তারকা নেইমারকে এই উদ্বোধনী ম্যাচে পাচ্ছে না সেলেসাওরা। দলটির প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি নিশ্চিত করেছেন যে মরক্কোর বিপক্ষে এই ফরোয়ার্ড মাঠে নামতে পারবেন না। অন্যদিকে, আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী এবং সবশেষ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোও বেশ আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় রয়েছে। ফলে নেইমারবিহীন ব্রাজিলের সঙ্গে মরক্কোর এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাবে বলে ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা। মাঠের খেলা শুরুর আগেই নিউইয়র্কে সমর্থকদের এই উৎসবমুখর উপস্থিতি প্রমাণ করছে, বিশ্বকাপের উত্তাপ এখন তুঙ্গে।
২০২৬ বিশ্বকাপের নিজেদের প্রথম ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা করেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ঘরের মাঠ লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে এই দুর্দান্ত জয়ের মূল নায়ক ফোলারিন বালোগান, যার জোড়া গোলে ভর করে বিশ্বমঞ্চে দাপুটে শুরু পেল মার্কিনরা। এই জোড়া গোলের মাধ্যমে ৯৬ বছরের পুরোনো এক আক্ষেপও ঘুচিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে এই প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনোড। এরপর প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বিশ্বকাপে আর কোনো মার্কিন ফুটবলার এক ম্যাচে একাধিক গোল করতে পারেননি, যে খরা অবশেষে কাটালেন ২৪ বছর বয়সী বালোগান। বালোগানের এই মার্কিন তারকা হয়ে ওঠার গল্প যেকোনো রোমাঞ্চকর সিনেমা বা উপন্যাসকেও হার মানাবে। ২০০১ সালে তার নাইজেরিয়ান মা ইংল্যান্ড থেকে নিউইয়র্কে ছুটি কাটাতে এসেছিলেন। ফেরার পথে গর্ভাবস্থার একেবারে শেষ পর্যায়ে থাকায় বিমান কর্তৃপক্ষ তাকে ফ্লাইটে উঠতে অস্বীকৃতি জানায়। বাধ্য হয়ে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনেই অবস্থান করতে হয় তাকে এবং সেখানেই জন্ম নেন বালোগান। জন্মসূত্রে তিনি লাভ করেন মার্কিন নাগরিকত্ব। জন্মের কয়েক মাস পর মা-বাবার সঙ্গে লন্ডনে ফিরে গেলেও, বিমান সংস্থার সেই অনড় সিদ্ধান্ত আর ভাগ্যের আশ্চর্য মোচড়ই তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। লন্ডনে বেড়ে ওঠার সময় আর্সেনালের যুব একাডেমিতে ফুটবলের হাতেখড়ি হয় বালোগানের। গানারদের মূল দলে নিয়মিত সুযোগ না পেয়ে ২০২২ সালে ফরাসি ক্লাব রেঁসে ধারে খেলতে যান এবং সেখানেই নিজের প্রতিভার জানান দেন তিনি। সেই মৌসুমে লিগ ওয়ানে ৩৯ ম্যাচে ২২ গোল করে লিওনেল মেসিকেও ছাড়িয়ে যান এই তরুণ। এরপর ২০২৩ সালে ৩০ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে তাকে দলে ভেড়ায় ফরাসি ক্লাব এএস মোনাকো। পারিবারিক সূত্রে নাইজেরিয়া, বেড়ে ওঠার সুবাদে ইংল্যান্ড এবং জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন দেশের হয়েই খেলার সুযোগ ছিল তার। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন ভক্তদের প্রবল উন্মাদনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া মহলের ভিআইপি আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে ২০২৩ সালের মে মাসে তিনি মার্কিন জার্সি গায়ে জড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তার সেই সিদ্ধান্ত কতটা সার্থক, তারই প্রমাণ দিয়েছেন বালোগান। তার প্রথম গোলটি আসে এক নজরকাড়া বাঁকানো শটে, আর দ্বিতীয়টিতে ফুটে ওঠে সতীর্থদের সঙ্গে তার চমৎকার বোঝাপড়া। ভিএআরের কারণে হ্যাটট্রিক বঞ্চিত হলেও ম্যাচটি ছিল সম্পূর্ণ তার। ম্যাচ শেষে এই ফরোয়ার্ড গণমাধ্যমকে জানান, পুরো বিষয়টি তার কাছে এখনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে এবং হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার পরই হয়তো তিনি এই চমৎকার মুহূর্তটি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবেন। এই জয়ের পর বালোগানের স্বপ্ন এখন আরও বড়। টুর্নামেন্ট জয়ের লক্ষ্যের পাশাপাশি ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল ও স্পেনের মতো ফেভারিট দলগুলোর বিপক্ষে বিশ্বমঞ্চে অঘটন ঘটাতে মুখিয়ে আছেন ভাগ্যের ফেরে 'আকস্মিক আমেরিকান' হয়ে ওঠা এই ফুটবল বিস্ময়।
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই সামাজিক মাধ্যম সরব হয়ে ওঠে নতুন এক বিতর্কে—“মৌসুমি ফ্যান বনাম আসল ফ্যান”। দলীয় সমর্থনের চিরন্তন দ্বন্দ্বের বাইরে এই অনলাইন লড়াই এখন চার বছর পরপর ফিরে আসা এক সাংস্কৃতিক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুক, এক্সসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় পোস্ট, স্ট্যাটাস ও মিমের ঝড়। কেউ প্রিয় দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা ফ্রান্সের জার্সি পরে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেন, কেউ আবার শুরু করেন ম্যাচ বিশ্লেষণ। চায়ের আড্ডা থেকে ফেসবুক টাইমলাইন—সব জায়গায় ফুটবলই হয়ে ওঠে প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই সময়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে “আসল ফ্যান” বনাম “মৌসুমি ফ্যান” বিতর্ক। আত্মস্বীকৃত “আসল ফ্যান”দের মতে, তারা সারা বছর ফুটবল অনুসরণ করেন ক্লাব ফুটবল, ট্রান্সফার, ট্যাকটিকস থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স পর্যন্ত সবকিছু তাদের নখদর্পণে থাকে। তাদের কাছে ফুটবল কেবল খেলা নয়, বরং বিশ্লেষণের একটি ক্ষেত্র। অন্যদিকে বিশ্বকাপ এলেই হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠা “মৌসুমি ফ্যান”দের নিয়ে রয়েছে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। অভিযোগ করা হয়, তারা বড় টুর্নামেন্ট ছাড়া সাধারণত ফুটবলে আগ্রহ দেখান না, কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই প্রিয় দল বেছে নিয়ে আবেগী সমর্থক হয়ে ওঠেন এবং ম্যাচ প্রেডিকশন থেকে শুরু করে তর্ক-বিতর্কে সক্রিয় থাকেন। এই দুই পক্ষের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে চলে পোস্ট-পাল্টাপোস্ট, মন্তব্য আর মিমের প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ ফুটবল বোঝার মানদণ্ড হিসেবে ট্যাকটিকস, ফরমেশন বা অফসাইড রুল নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা করেন, আবার কেউ প্রশ্ন তোলেন ফুটবল উপভোগ করতে কি সারাবছর খেলা দেখা বাধ্যতামূলক? ফেসবুকে এ নিয়ে রসিকতা ও ব্যঙ্গও কম নয়। কেউ কেউ “মৌসুমি ফ্যান শনাক্তের কৌশল” বা কাল্পনিক নিয়ম-কানুন তৈরি করে পোস্ট করেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়। এসব পোস্টের মাধ্যমে ফুটবল নিয়ে এক ধরনের অনলাইন সাংস্কৃতিক হাস্যরসও তৈরি হয়। তবে এই বিতর্কের বিপরীতে অনেকেই মনে করেন, “মৌসুমি ফ্যান” হওয়া কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। জীবনের ব্যস্ততা ও আগ্রহ ভিন্ন হওয়ায় সবাই সারাবছর ফুটবল অনুসরণ করতে পারেন না। বড় টুর্নামেন্টের সময় প্রিয় দলকে সমর্থন করাও এক ধরনের আবেগ ও আনন্দের অংশ। বিশ্বকাপের আসল আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই ভিন্ন ভিন্ন আগ্রহের মানুষ একসঙ্গে একই আবেগে যুক্ত হন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল হলে যেমন অভিজ্ঞ ফ্যান আবেগে ভেসে যান, তেমনি চার বছর পর খেলা দেখা দর্শকও একইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
টেলিভিশনের পর্দায় সাধারণ দর্শকেরা কেবল ৯০ মিনিটের মাঠের লড়াইটাই দেখতে পান। কখনো কখনো সম্প্রচারকদের সৌজন্যে ম্যাচ শুরুর আগের গা-গরমের দৃশ্যও চোখে পড়ে। কিন্তু ড্রেসিংরুমের সেই রহস্যময় দরজার ওপারে আসলে কী হয় কিংবা ম্যাচের ঠিক আগের মুহূর্তে ফুটবলাররা কেমন থাকেন, তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের কৌতুহলের শেষ নেই। আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হেক্সার মিশনে নামছে ব্রাজিল। আর এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ শুরুর আগে সেলেসাওদের ড্রেসিংরুমের ভেতরের না-বলা গল্পগুলো সামনে এনেছেন ব্রাজিল দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রধান সহকারী পল ক্লেমেন্ট। ‘দ্য অ্যাথলেটিক’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ম্যাচের আগে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ আসলে কেমন থাকে। পল ক্লেমেন্টের বর্ণনাতে, ম্যাচ শুরুর ঠিক আগের দৃশ্যটি দেখলে মনে হবে যেন কোনো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ফুটবল বিজ্ঞাপনের শুটিং চলছে। সেখানে ড্রেসিংরুমের কোথাও কোনো খেলোয়াড় বল শূন্যে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা বা ‘কিপ-আপ’ করছেন, কেউ কেউ হেডফোন কানে দিয়ে চুপচাপ গান শুনছেন, কেউ স্ট্রেচিং করছেন, কেউবা সারছেন শেষ মুহূর্তের ‘ট্রিটমেন্ট’। আবার কেউ কেউ কেবলই নিজের ভাবনায় মগ্ন থাকেন এবং এই সবকিছুর আবহ তৈরির জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডে সবসময় বাজতে থাকে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী কোনো সুর। ক্লেমেন্টের ভাষায়, সবচেয়ে জাদুকরি মুহূর্তটি আসে দল যখন মাঠের উদ্দেশ্যে ড্রেসিংরুম ছাড়ার প্রস্তুতি নেয়। ম্যাচের সময় যতই ঘনিয়ে আসে, ভেতরের চেনা পরিবেশটা পুরোপুরি বদলে যায়। গান বন্ধ হয়ে যায়, কমে আসে কোলাহল এবং পুরো দল তখন প্রার্থনার জন্য একসঙ্গে মিলিত হয়। ওয়ানডে বা টেস্টের মতো ফুটবলেও ম্যাচ শুরুর আগের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে বড় ভূমিকা রাখে। সহকারী কোচ বলেন, তখন অত্যন্ত ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক একটি পরিবেশ তৈরি হয়। ম্যাচের আগে এবং পরে ফুটবলাররা সবাই মিলে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেন। সাধারণত এই প্রার্থনার আগে দলের অধিনায়ক, কোনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, কোচ কিংবা ফেডারেশনের কেউ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এই সুন্দর ঐতিহ্যই খেলোয়াড়দের মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে এবং এটি দলের মধ্যে একতা ও সৌহার্দ্য তৈরি করে সবাইকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। ব্রাজিল দলের সহকারী কোচের মতে, এবারের সেলেসাওদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব। মার্কিনিওস, আলিসন, কাসেমিরো এবং দানিলোর মতো নামগুলোকে তিনি দলের মূল চালিকাশক্তি এবং মেরুদণ্ড হিসেবে মনে করেন। ক্লেমেন্টের ভাষায়, এই দলের যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, তা হলো সুদৃঢ় নেতৃত্ব। যেসব খেলোয়াড়ের ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলার অনেকদিনের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের প্রতি দলটিতে অগাধ সম্মান রয়েছে। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণে দলের ভেতরে একটি চমৎকার ‘চেইন অব কমান্ড’ বা শৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা বিভিন্ন প্রজন্মের ফুটবলারদের একসঙ্গে মিলেমিশে থাকতে সাহায্য করে। তরুণ খেলোয়াড়রা যাঁরা ব্রাজিলের হয়ে ৮০, ৯০ বা একশর বেশি ম্যাচ খেলেছেন, তাঁদের ভীষণ সমীহ করেন। ক্লেমেন্ট বিশ্বাস করেন, তারকাখচিত ড্রেসিংরুম সামলানোর ক্ষেত্রে প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জন্য একটা বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করবে। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড চেলসি, পিএসজি, বায়ার্ন মিউনিখ ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে বড় বড় সব মহাতারকাদের অবলীলায় সামলেছেন। এবারের ব্রাজিল দলেও অনেক তারকা ফুটবলার আছেন। তবে আনচেলত্তির জন্য তাঁদের সামলানো কঠিন হবে না। ক্লেমেন্টের ভাষায়, কার্লো কখনোই দ্বন্দ্বে জড়াতে চান না, তিনি মানুষের ভেতরের সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেন। ব্রাজিলের প্রায় আড়াই দশকের দীর্ঘ শিরোপাখরাটা হয়তো এই ইতালিয়ান কোচের হাত ধরেই কাটবে—মেটলাইফের ড্রেসিংরুমে এখন সেই প্রার্থনারই সুর।
বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে মরক্কো ফুটবল দল। ওয়ানডে বা টেস্টের মতো ফুটবলেও ইনজুরি বা চোট দল গঠনে বড় প্রভাব ফেলে। আর সেই ইনজুরির কারণেই এবার মরক্কোর মূল দল থেকে ছিটকে গেছেন দুই গুরুত্বপূর্ণ তারকা খেলোয়াড়। যার ফলে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই দলে দুটি বড় পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে মরক্কোকে। জানা গেছে, সম্প্রতি নরওয়ের বিরুদ্ধে খেলা একটি প্রীতি ম্যাচে হাঁটুর মারাত্মক ইনজুরিতে পড়েন রিয়াল বেটিসের তারকা ফরোয়ার্ড আবদে এজালজুলি। তিনি চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার পর তার পরিবর্তে জরুরি ভিত্তিতে মরক্কো দলে ডাক পেয়েছেন এ্যাঙ্গার্সের তরুণ ফুটবলার আমিনে সাবাই। অন্যদিকে, উরুর অস্ত্রোপচারের কারণে গত মার্চ মাসের পর থেকে আর কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ বা মাঠে নামতে পারেননি মার্সেইর অভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাক নায়েফ অগার্ড। দলের এই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডারকে নিয়ে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কোনো ধরনের বাড়তি ঝুঁকি নিতে চায়নি মরক্কোর টিম ম্যানেজমেন্ট। যে কারণে মূল টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই অগার্ডের পরিবর্তে দলে ডেকে নেওয়া হয়েছে মারওয়ানে সাদানেকে। দলের এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বা খেলোয়াড়দের চোটের বিষয়ে অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মরক্কোর টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে দলের অভিজ্ঞ অধিনায়ক ও পিএসজি তারকা আশরাফ হাকিমি ইনজুরি আক্রান্ত দুই সতীর্থের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন। পিএসজি তারকা হাকিমি তার ব্যক্তিগত পোস্টে লিখেছেন, ফুটবল খেলাটা অনেক সময় সত্যিই ভীষণ নিষ্ঠুর হতে পারে। প্রথম দিন থেকে তোমরা এই দলটিকে যা দিয়েছো, তার জন্য তোমাদের দুজনকে অনেক ধন্যবাদ। মাঠে আমরা সবাই তোমাদের জন্য লড়াই করব এবং জয় ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করব। আমরা তোমাদের দুজনকে অনেক ভালোবাসি। উল্লেখ্য, আগামী রোববার (১৪ জুন) ভোররাত চারটায় গ্রুপ-সি’র প্রথম হাইভোল্টেজ ম্যাচে নিউ জার্সিতে মুখোমুখি হবে মরক্কো ও ব্রাজিল। ২৪ বছরের ট্রফি খরা কাটিয়ে হেক্সা তথা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে নামা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মরক্কো এই নতুন দল নিয়ে কেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্বকাপে দীর্ঘ চব্বিশ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর অভিযানে শুরুতেই কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ব্রাজিল। মরক্কোর বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মাঠের লড়াইয়ে নামবে তারা। তবে এই কঠিন পরীক্ষার ম্যাচে দলের সবচেয়ে বড় তারকা ফুটবলার নেইমারকে পাচ্ছে না পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। খেলাটি বাংলাদেশ সময় আগামী রবিবার ভোর চারটায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পূর্ব নির্ধারিত এই ম্যাচের আগে ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তি সংবাদ সম্মেলনে নেইমারের না খেলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আসন্ন প্রথম ম্যাচে নেইমারকে পাওয়া নিয়ে অবশ্য আগে থেকেই বড় ধরণের শঙ্কা ছিল। ৩৪ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে পায়ের পেশির চোটে ভুগছেন। এই চোটের কারণে তিনি এখনও দলের সাথে পুরোপুরি অনুশীলনে ফিরতে পারেননি। কোচ আনচেলত্তি জানিয়েছেন, নেইমার আগামী সপ্তাহে দলের সাথে নতুন করে অনুশীলন শুরু করবেন। যার অর্থ দাঁড়ায়, আগামী ২০ জুন হাইতির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচেও তার মাঠে নামা নিয়ে বড় ধরণের অনিশ্চয়তা রয়েছে। ব্রাজিল আগামী ২৪ জুন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ করবে। সংবাদ সম্মেলনে কোচ আনচেলত্তি বলেন, নেইমার দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাকে দলে নেওয়ার কারণ কেবল তার টেকনিক্যাল দক্ষতা নয়, বরং তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য উদাহরণ তৈরি করার ক্ষমতাও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের পর থেকে ব্রাজিলের জাতীয় দলে আর মাঠে নামেননি নেইমার। তবে এবারের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে তার ওপর আস্থা রেখেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। তাকে দলে জায়গা দিতে গিয়ে চেলসির জোয়াও পেদ্রো এবং টটেনহ্যামের রিচার্লিসনের মতো তারকাদের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে বর্তমানে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের মালিক নেইমার। জাতীয় দলের হয়ে তিনি এ পর্যন্ত ১২৮টি ম্যাচ খেলে মোট ৭৯টি গোল করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ফুটবল কিংবদন্তি পেলের করা ৭৭ গোলের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছেন। সান্তোসের সাবেক এই ফরোয়ার্ডের সামনে এবার চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। এবার চোট কাটিয়ে তিনি কত দ্রুত মাঠে ফিরতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপার স্বাদ পাননি ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। টাইব্রেকারের নাটকীয়তায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপের আসর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সম্ভাব্য আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ফাইনাল। সেই সম্ভাবনার মধ্যেই আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছেন Kylian Mbappé। ফরাসি অধিনায়ক জানিয়েছেন, আবারও যদি বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে ফ্রান্স জয়ের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামবে। ইতালীয় সাংবাদিক Fabrizio Romanoর এক প্রশ্নের জবাবে এমবাপে বলেন, ফ্রান্স সবসময় জয়ের লক্ষ্য নিয়েই খেলে এবং দলটি এখনো সেই একই মানসিকতা ধরে রেখেছে। তার ভাষায়, তারা ক্ষুধার্ত, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং নতুন ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত। ফরাসি এই তারকা বলেন, "আমরা সবসময় যেমন থাকি, তেমনি জয়ের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও ক্ষুধার্ত থাকব।" শুধু ভালো ফল নয়, পুরো টুর্নামেন্ট জয়ের লক্ষ্য নিয়েই বিশ্বকাপে এসেছে ফ্রান্স। এমবাপের মতে, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং নতুন ইতিহাস লেখা। তিনি বলেন, "আমরা ইতিহাস গড়তে এসেছি। এখনও সেটা করতে পারিনি। আমরা এই বিশ্বকাপ জিততে চাই।" বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে এবারও টুর্নামেন্ট শুরু করেছে France national football team। অন্যদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন Argentina national football teamও শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। ফলে দুই দলের সম্ভাব্য আরেকটি ফাইনাল নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে এমবাপের হ্যাটট্রিকও শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে শিরোপা এনে দিতে পারেনি। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ৩-৩ গোলে সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে Lionel Messi এবং এমবাপের পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দ্বৈরথ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের বিশ্বকাপ লড়াইয়ের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ২০১৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ফ্রান্স ৪-৩ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিদায় করেছিল। সেই ম্যাচে তরুণ এমবাপের অসাধারণ পারফরম্যান্স বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। চার বছর পর কাতারের ফাইনালে সেই পরাজয়ের জবাব দেয় আর্জেন্টিনা। দুই তারকার মধ্যে বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা নিয়েও চলছে আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা। মেসির বিশ্বকাপ গোল বর্তমানে ১৩টি। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা Miroslav Kloseর ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙতে তার প্রয়োজন আরও চারটি গোল। অন্যদিকে মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেই এমবাপের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২-তে। রেকর্ড স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন আরও পাঁচ গোল। টুর্নামেন্টের নকআউট সূচি অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স নিজ নিজ গ্রুপ থেকে পরবর্তী পর্বে উঠতে পারলে তারা ভিন্ন অংশে অবস্থান করবে। ফলে শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ নেই। দুই দলের দেখা হতে পারে শুধুমাত্র ফাইনালে। সেই কারণে ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই এখন থেকেই আরেকটি আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ফাইনালের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। আর যদি সত্যিই সেই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে ২০২২ সালের ঐতিহাসিক ফাইনালের নতুন অধ্যায় দেখার সুযোগ পাবে বিশ্ব ফুটবল।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ মরক্কো, যারা চার বছর আগে বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। এবারও শক্তিশালী দল নিয়েই মাঠে নামছে উত্তর আফ্রিকার দেশটি। অন্যদিকে ম্যাচের আগে বড় ধাক্কা খেয়েছে ব্রাজিল। দলের অভিজ্ঞ তারকা Neymarকে ছাড়াই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে হচ্ছে সেলেসাওদের। ফলে আক্রমণভাগে দায়িত্ব আরও বেশি করে এসে পড়েছে Vinícius Júniorর কাঁধে। তবে মরক্কোর অধিনায়ক Achraf Hakimi জানিয়ে দিয়েছেন, ব্রাজিলিয়ান তারকাকে সামলাতে তিনি প্রস্তুত। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে হাকিমি বলেন, ভিনিসিয়ুসের সামর্থ্য সম্পর্কে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড় এবং ক্লাব ফুটবলে একাধিকবার তার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। মরক্কো অধিনায়কের ভাষায়, ভিনিসিয়ুস একজন অসাধারণ ফুটবলার, তবে তাকে ঠেকানোর প্রস্তুতি নিয়েই তারা মাঠে নামবেন। হাকিমি বলেন, "ভিনিসিয়ুস কী ধরনের খেলোয়াড়, সেটা আমরা সবাই জানি। তার বিরুদ্ধে আমি বেশ কয়েকবার খেলেছি। সে দুর্দান্ত একজন ফুটবলার। তবে আমি তার জন্য প্রস্তুত আছি। আশা করছি আমরা ভালো পারফরম্যান্স করতে পারব।" বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের বিপক্ষে খেলতে নামলেও নিজেদের আন্ডারডগ হিসেবে দেখতে রাজি নন মরক্কোর অধিনায়ক। ২০২২ বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়া মরক্কো এবারও নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখছে। হাকিমির মতে, বিশ্বকাপের মতো আসরে শুধু নাম বা অতীতের সাফল্য কোনো ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে না। মাঠের লড়াইয়ে দুই দলই সমান সুযোগ নিয়ে নামে এবং সেদিনের পারফরম্যান্সই পার্থক্য গড়ে দেয়। তিনি বলেন, "বিশ্বকাপে ফেভারিট বলে কিছু নেই। আমরা দুই দলের সামর্থ্যই জানি। এটি সমানে-সমানে একটি ম্যাচ হবে। আশা করি ভাগ্য আমাদের পক্ষে থাকবে এবং আমরা নিজেদের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারব।" এই ম্যাচের আরেকটি আকর্ষণ হতে যাচ্ছে হাকিমি ও ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত দ্বৈরথ। ক্লাব ফুটবলে তারা বহুবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন। Paris Saint-Germainর হয়ে হাকিমি এবং Real Madridর হয়ে ভিনিসিয়ুস ইউরোপের বড় মঞ্চে একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে শুরু করে ক্লাব বিশ্বকাপ, নানা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই দুই তারকার লড়াই দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্লাব নয়, জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। একদিকে ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান ভরসা ভিনিসিয়ুস, অন্যদিকে মরক্কোর রক্ষণভাগের নেতা হাকিমি। ফলে ম্যাচের ফল নির্ধারণে এই ব্যক্তিগত লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নেইমারের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুসের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে মরক্কোর রক্ষণভাগকে নেতৃত্ব দেওয়া হাকিমির জন্যও এটি হতে যাচ্ছে বড় পরীক্ষা। বিশ্বকাপের শুরুতেই তাই দুই তারকার এই দ্বৈরথ নিয়ে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মূল লড়াই শুরুর আগেই অপ্রত্যাশিত এক সমস্যায় পড়েছে ইংল্যান্ড ফুটবল দল। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে বিশ্বকাপ ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর জানা গেছে, দলের কিছু অনুশীলন সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনের পথে চুরি হয়ে গেছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ, আর ইতোমধ্যে দুইজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম ইএসপিএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডার পাম বিচ গার্ডেনসে বিশ্বকাপ-পূর্ব প্রস্তুতি ক্যাম্প শেষ করে বৃহস্পতিবার সেখান থেকে রওনা দেয় ইংল্যান্ড দল। খেলোয়াড়দের একদিনের বিশ্রাম দেওয়া হয় এবং শনিবার তারা কানসাস সিটিতে পৌঁছান, যেখানে বিশ্বকাপ চলাকালে তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে সোপে সকার ভিলেজ। দলের আগমনের আগেই ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের লজিস্টিক টিম নতুন ক্যাম্পের প্রস্তুতি নিতে কাজ শুরু করে। সরঞ্জামবাহী একটি ভ্যান থেকে মালামাল নামানোর সময় কর্মকর্তারা দেখতে পান, ট্রেনিং কিটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী সেখানে নেই। এরপরই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং দ্রুত স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। ইএসপিএনের সূত্র জানিয়েছে, ঠিক কী কী সরঞ্জাম চুরি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা হারিয়ে যাওয়া সামগ্রীর তালিকা তৈরির কাজ করছেন। পাশাপাশি চুরি হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে দলের অনুশীলন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় কানসাস সিটি, মিসৌরি পুলিশ বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে। এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, একটি ক্রীড়া দলের ব্যবহৃত গাড়ি থেকে সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাড়িটি কানসাস সিটিতে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, ভেতরে থাকা কিছু সামগ্রী অনুপস্থিত। পুলিশ আরও জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে দুইজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় তাদের পরিচয় বা সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কর্মকর্তারা ঘটনাটির পেছনে কোনো সংগঠিত চক্র জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে দলগুলোর সরঞ্জাম পরিবহন ও নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। খেলোয়াড়দের অনুশীলন কিট, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশ্লেষণমূলক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ একটি দলের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এমন ঘটনা বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংল্যান্ড শিবিরে কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঘটনাটি প্রস্তুতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলে তারা আশা করছেন। প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তদন্তে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এদিকে শনিবার বিকেলে কানসাস সিটিতে ইংল্যান্ড দলের একটি কমিউনিটি অনুশীলন সেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এল’-এ ইংল্যান্ড তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে আগামী বুধবার ডালাসে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে মাঠের বাইরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ইংল্যান্ড সমর্থকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি করলেও দলটির মূল লক্ষ্য এখন টুর্নামেন্টে সফল সূচনা করা। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চুরি হওয়া সরঞ্জাম এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে এবার দেখা গেল বাংলাদেশের এক অনন্য উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে আয়োজিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী আয়োজনে পারফর্ম করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ডিজে ও সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব। শুধু পারফরম্যান্সই নয়, নিজের পোশাকের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। শুক্রবার রাতে কানাডার টরন্টোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন সঞ্জয় দেব। কানাডা ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার মধ্যকার ম্যাচের আগে আয়োজিত বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় তিনি পারফর্ম করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী Nora Fatehi এবং Vegedream–এর সঙ্গে। তবে অনুষ্ঠানে তার পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তার বিশেষভাবে তৈরি জ্যাকেট। জ্যাকেটটির ডান হাতার অংশে সূচিকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকগুলো। সেখানে ছিল জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং সবুজ পটভূমিতে লাল বৃত্তসংবলিত বাংলাদেশের পতাকার নকশা। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে এমন উপস্থাপনাকে অনেকেই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও পরিচয় তুলে ধরার অভিনব উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। পারফরম্যান্স চলাকালে সঞ্জয় দেবকে বারবার নিজের জ্যাকেটের হাতার দিকে ইঙ্গিত করতে দেখা যায়, যাতে দর্শকরা বাংলাদেশের প্রতীকগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন। অনুষ্ঠানের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা গেছে। অনেকেই এটিকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রতিনিধিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্যবহারকারী সঞ্জয় দেবের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন এবং তার প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরগুলোর একটি। প্রতি আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কোটি কোটি দর্শক সরাসরি ও সম্প্রচারের মাধ্যমে উপভোগ করেন। সেই মঞ্চে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকগুলোর উপস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও বিশেষ উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঞ্জয় দেব ও নোরা ফাতেহি ছাড়াও পারফর্ম করেন বিশ্বখ্যাত কানাডিয়ান সংগীতশিল্পী Michael Bublé, Alanis Morissette এবং Alessia Cara। এছাড়া মঞ্চে গান পরিবেশন করেন Jessie Reyez এবং Elyanna। অনুষ্ঠানের শিল্পী তালিকায় আরও ছিলেন William Prince। বহুসাংস্কৃতিক কানাডার পরিচয় তুলে ধরতে আয়োজকেরা বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও পটভূমির শিল্পীদের একত্র করেছিলেন। সেই আয়োজনে বাংলাদেশি শিকড়ের একজন শিল্পীর অংশগ্রহণ এবং তার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতীকী উপস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এ ধরনের উপস্থিতি একটি দেশের সফট পাওয়ার বা সাংস্কৃতিক পরিচিতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো উচ্চপ্রচারিত আসরে বাংলাদেশের প্রতীকগুলো তুলে ধরা দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্বদর্শকের সামনে উপস্থাপনের একটি অনন্য উদাহরণ। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সেই মুহূর্ত এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ফুটবল বিশ্বকাপের আলোচিত মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা, শাপলা ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি তাদের জন্য গর্বের একটি মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
লস অ্যাঞ্জেলেস: ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল দুর্দান্ত এক জয়ে। ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের জোড়া গোলে ভর করে প্যারাগুয়েকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ‘ডি’ গ্রুপের ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য দেখিয়ে জয় তুলে নেয় মরিসিও পোচেত্তিনোর দল। এই জয়ের মাধ্যমে শুধু তিন পয়েন্টই অর্জন করেনি যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও একটি বিশেষ রেকর্ডের অংশ হয়ে গেছে দলটি। ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর এটিই বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় জয়গুলোর একটি। ম্যাচের নায়ক ছিলেন ২৪ বছর বয়সী ফোলারিন বালোগুন। জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপের এক ম্যাচে একাধিক গোল করা মাত্র দ্বিতীয় মার্কিন ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। এর আগে ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই বার্ট প্যাটেনডিউড এক ম্যাচে তিন গোল করেছিলেন। প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে জমজমাট পরিবেশে ম্যাচ শুরু হওয়ার পর প্রথম গোল পেতে যুক্তরাষ্ট্রকে অপেক্ষা করতে হয় মাত্র সাত মিনিট। আক্রমণের সূচনা করেন দলের অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ। দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে তিনি বল বাড়িয়ে দেন ওয়েস্টন ম্যাককেনির কাছে। ম্যাককেনির কাটব্যাক ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার দামিয়ান বোবাদিয়া। আত্মঘাতী সেই গোলেই এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। প্রথমার্ধে আরও কয়েকটি আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২৮ মিনিটে বালোগুনের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও মাত্র তিন মিনিট পর আর ভুল করেননি তিনি। পুলিসিচের নিখুঁত পাস থেকে শক্তিশালী শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন মোনাকো তারকা। এরপর ৪১ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করেন বালোগুন। মালিক টিলম্যানের বাড়ানো বল ধরে ডিফেন্ডার ওমার আলদেরেতেকে পেছনে ফেলে গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে পরাস্ত করে দারুণ এক ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান তিনি। প্রথমার্ধেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। তবে ম্যাচের ধারার বিপরীতে ৬৫ মিনিটে একটি গোল শোধ দেয় প্যারাগুয়ে। সাবেক ব্রাইটন ফরোয়ার্ড হুলিও এনসিসোর পাস থেকে ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার মাউরিসিও গোল করে ব্যবধান কমান। তবে প্যারাগুয়ের সেই প্রত্যাবর্তনের আশা বেশিক্ষণ টেকেনি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় জিওভানি রেইনা অসাধারণ এক গোল করে যুক্তরাষ্ট্রের জয়কে আরও উজ্জ্বল করে তোলেন। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে নেওয়া তার বাঁকানো শট সরাসরি জালে জড়িয়ে যায়। ম্যাচের শেষ কিকেই আসে দর্শনীয় এই গোল। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচকে ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী ক্যাটি পেরিসহ বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক তারকা অংশ নেন। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম ও হলিউড তারকা টম ক্রুজও। তবে মাঠের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বালোগুন। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে চলে যান এবং আর্সেনালের একাডেমিতে বেড়ে ওঠেন। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেললেও ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর্সেনালে সুযোগ সীমিত থাকায় মিডলসব্রো ও পরে ফ্রান্সের রেইমসে ধারে খেলতে যান বালোগুন। রেইমসের হয়ে ২০২২-২৩ মৌসুমে ২১ গোল করে আলোচনায় আসেন এবং পরে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডে ফরাসি ক্লাব মোনাকোতে যোগ দেন। সাম্প্রতিক মৌসুমেও দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন তিনি। ২০২৫-২৬ মৌসুমে মোনাকোর হয়ে ১৩ লিগ ম্যাচে ৯ গোল করেছেন। সেই ধারাবাহিকতাই বিশ্বকাপের মঞ্চেও ধরে রাখলেন এই ফরোয়ার্ড। ম্যাচ শেষে ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, বালোগুনের নেতৃত্বে আক্রমণভাগ যদি একই ছন্দে খেলতে পারে, তাহলে এবারের বিশ্বকাপে অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে এমন আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স স্বাগতিকদের জন্য বড় প্রাপ্তি। ১৯৯৪ সালের পর আবারও নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র। আয়োজক দেশ হিসেবে ভালো ফল করার চাপ থাকলেও প্রথম পরীক্ষায় সফলভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে পোচেত্তিনোর দল। এখন তাদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। আগামী ১৯ জুন গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে একই দিনে নিজেদের পরবর্তী ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে মাঠে নামবে প্যারাগুয়ে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে মেক্সিকো। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালে আয়োজক তিন শহরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ কনডম বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে । মেক্সিকোর তিনটি আয়োজক শহর হলো মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মনতেরে। এসব শহরে বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী ও পর্যটকের আগমনকে কেন্দ্র করেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মূল উদ্দেশ্য হলো মেগা ইভেন্টে ভিড়ের কারণে সম্ভাব্য যৌনবাহিত রোগ যেমন এইচআইভি, সিফিলিস ও গনোরিয়ার সংক্রমণ কমানো এবং অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর, পর্যটন এলাকা, বার, রেস্তোরাঁ এবং ফ্যান জোনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সচেতনতামূলক বুথ ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব স্থানে কনডমের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক লিফলেটও বিতরণ করা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, শুধু সামগ্রী বিতরণ নয়, সঠিক তথ্য ও সচেতনতা না থাকলে এই ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হয় না। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধিকে কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন দেশে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অলিম্পিকে অ্যাথলেটদের জন্য নির্দিষ্ট ভিলেজ থাকায় সেখানে এ ধরনের বিতরণ সহজ হয়। তবে বিশ্বকাপে আলাদা প্লেয়ার ভিলেজ না থাকায় মেক্সিকোর এই উদ্যোগ মূলত দর্শক ও পর্যটকদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হবে। এদিকে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলো থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগের ঘোষণা এখনো আসেনি।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচেই গ্যালারিতে হাজার হাজার আসন ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা টুর্নামেন্টের টিকিটের দাম নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় ‘এ’ গ্রুপের ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ২–১ গোলে চেক প্রজাতন্ত্রকে হারায়। তবে এস্তাদিও আকরন স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লাল আসন ফাঁকা দেখা যায়, যা দর্শক উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে টিকিটের “ডায়নামিক প্রাইসিং” বা পরিবর্তনশীল মূল্যনীতির পক্ষে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন। তবে মাঠে দর্শক উপস্থিতির এই চিত্র সেই নীতিকে ঘিরে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে কয়েকটির টিকিটের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। একই সময়ে ফিফার অফিশিয়াল রিসেল পোর্টালে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টিকিট অবিক্রীত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফিফা দাবি করেছিল, টিকিটের জন্য ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি বুকিং অনুরোধ এসেছে। তবে বাস্তবে উচ্চমূল্যের কারণে অনেক দর্শক মাঠে গিয়ে খেলা দেখা থেকে বিরত থাকছেন বলে অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে ফাইনালসহ কিছু ম্যাচের টিকিটের দাম কয়েক হাজার ডলারে পৌঁছেছে, যা সাধারণ দর্শকদের জন্য নাগালের বাইরে চলে গেছে বলে সমালোচকদের দাবি। এই প্রাইসিং নীতি নিয়ে অনলাইনে টিকিট ক্রয়ের সময় দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং চূড়ান্ত দামের অস্পষ্টতা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির রাজনীতিকরা আনুষ্ঠানিক তদন্তও শুরু করেছেন। তবে খালি আসন থাকা সত্ত্বেও ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের সমর্থকদের উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়ামের পরিবেশ প্রাণবন্ত ছিল। ম্যাচে লাদিস্লাভ ক্রেজসি চেক প্রজাতন্ত্রকে এগিয়ে নিলেও হোয়াং ইন-বমের সমতা ফেরানো গোল এবং ওহ হিয়ন-গিউয়ের জয়সূচক গোলে দক্ষিণ কোরিয়া জয় নিশ্চিত করে।
মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার আক্রন স্টেডিয়ামে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচে ২-১ গোলের ব্যবধানে জয় পেয়েছে কোরিয়ানরা। তবে বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে মাঠের ফুটবল রোমাঞ্চ ছাপিয়ে সবার চোখ আটকে গেছে স্টেডিয়ামের হাজার হাজার খালি আসনের দিকে। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরের জন্য নির্ধারিত ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে আক্রন স্টেডিয়াম দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম হওয়ার পরও ম্যাচের সময় গ্যালারির একটি বিশাল অংশ সম্পূর্ণ দর্শকশূন্য ছিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফিফা কর্তৃক টিকিটের আকাশচুম্বী ও অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের কারণেই মূলত সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা এই ম্যাচটি গ্যালারিতে বসে দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। মাঠের এই হতাশাজনক চিত্রের পেছনে মূল কারণ হিসেবে টিকিটের চড়া দামকেই দায়ী করছেন ফুটবল বোদ্ধারা। স্টেডিয়ামের নিচের স্তরের সাধারণ ক্যাটাগরির একেকটি টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০০ মার্কিন ডলার। এছাড়া সাইডলাইনের উপরের সারিগুলোর টিকিটের মূল্য ছিল ৪০০ ডলার এবং বিশেষ হসপিটালিটি সিটের দাম ছিল ৫ হাজার ডলারেরও বেশি, যা সাধারণ সমর্থকদের সাধ্যের বাইরে। অথচ এই ম্যাচ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আগেই দাবি করেছিলেন যে, আজ পর্যন্ত ৬০ লাখেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে এবং ফুটবল বিশ্বকাপের টিকিটের জন্য এবার বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব চাহিদা তৈরি হয়েছিল। বিশ্বকাপের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে মোট দর্শক সংখ্যা জানিয়েছে ৪৪ হাজার ৯৮৫ জন, যেখানে এই স্টেডিয়ামের মোট আসন ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ৬৬৪টি। কিন্তু মাঠের দৃশ্যমান ফাঁকা গ্যালারির সাথে ফিফার দেওয়া এই সংখ্যার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফিফার ঘোষিত এই দর্শক সংখ্যা কি কেবল বিক্রি হওয়া টিকিটের হিসাব নাকি স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে প্রবেশ করা আসল দর্শকের সংখ্যা—সেই বিষয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কোনো সদুত্তর বা স্পষ্ট জবাব দিতে পারেনি। টিকিট বিক্রির এই অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রের সমর্থক কম থাকার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল দলটির দেরিতে টিকিট পাওয়া। চেকিয়া গত মার্চ মাসে বেশ দেরিতে বিশ্বকাপের টিকিট হাতে পায় এবং তারা গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি পথ পাড়ি দেওয়া দলগুলোর একটি। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব ও যাতায়াত জটিলতার কারণে চেক সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই হাতে গোনা। তবে মাঠের গ্যালারি ফাঁকা থাকলেও ম্যাচের ভেতর ফুটবলের রোমাঞ্চের কোনো কমতি ছিল না। প্রথমার্ধে কোনো দল গোলের দেখা না পেলেও দ্বিতীয়ার্ধে এসেছে দুর্দান্ত ৩টি গোল, যেখানে শুরুতে গোল হজম করেও শেষ পর্যন্ত লড়াকু জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে দক্ষিণ কোরিয়া।
নিজেদের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করার মাত্র তিন দিন আগে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে এশিয়ান পরাশক্তি জাপান। পায়ের গুরুতর চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে না পারায় দল থেকে ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ও জাতীয় দলের অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো। তবে কেবল বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়াই নয়, একই সাথে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও চিরতরে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ফুটবলার। তার এই আকস্মিক বিদায়ের পর বিশ্বকাপ দলে তার পরিবর্তে জরুরি ভিত্তিতে সুযোগ পেয়েছেন জার্মান ক্লাব বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের ফরোয়ার্ড শুতো মাচিনো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় এন্দো বলেন, বিশ্বকাপে খেলতে না পারায় তিনি অত্যন্ত হতাশ। তবে তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন যে ভবিষ্যতে এমন এক সময় অবশ্যই আসবে যখন জাপান বিশ্বকাপ ট্রফি জিতবে। সেই বিশ্বাস ধরে রেখে আসন্ন উত্তর আমেরিকার এই টুর্নামেন্টেই যেন সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত আসে, সে জন্য দেশের সাধারণ মানুষকে দলের প্রতি সমর্থন ও শক্তি একত্রিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সাথে জাতীয় দল থেকে নিজের অবসরের সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি লেখেন, এখন থেকে তিনি আরেকজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে গ্যালারিতে বসে জাপান দলকে আজীবন সমর্থন করে যাবেন। এই মিডফিল্ডারের চোটের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের হয়ে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সময় পায়ে গুরুতর আঘাত পান এন্দো। ওই মারাত্মক চোটের কারণে ক্লাব ফুটবলে তার পুরো মৌসুমই শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে গত ৩১ মে টোকিওতে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে তিনি জাতীয় দলে ফিরলেও মাঠের লড়াইয়ে পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। ওই ম্যাচের প্রথমার্ধের পর তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং মেক্সিকোতে জাপানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্পেও তিনি চরম শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করেন। পরবর্তীতে গত সোমবার জাপান দল যখন তাদের বিশ্বকাপ ঘাঁটি আমেরিকার ন্যাশভিলে পৌঁছায়, তখন অনুশীলনে যোগ দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজেকে শতভাগ ফিট প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন এন্দো। তবে এই দীর্ঘ লড়াই নিয়ে তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সাবেক এই অধিনায়ক। কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে দলকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, যেখানে দাঁড়িয়ে এখন জাপান দল বিশ্বজয়ের লক্ষ্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে; আর এই অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করতে পারাটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়। ২০১৫ সালে জাপানের জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ওয়াতারু এন্দো দেশের জার্সিতে দীর্ঘ এক দশকে মোট ৭৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং চারটি গোল করেছেন। তিনি এর আগে ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে জাপানের অন্যতম মূল শক্তি হিসেবে মাঠে ছিলেন। বিশেষ করে কাতার বিশ্বকাপে পরাশক্তি জার্মানি ও স্পেনের বিপক্ষে জাপানের ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় জয়ের ম্যাচগুলোতে তিনি মাঝমাঠে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। উল্লেখ্য, এবারের বিশ্বকাপে শক্তিশালী গ্রুপ ‘এফ’-এ জাপানের মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস, তিউনিসিয়া ও সুইডেন।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নায়ক হওয়ার গল্পটা সব সময় সহজ হয় না। চোট, কষ্ট আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে জ্বলে উঠলেন হোয়াং ইন-বিওম, যখন তার দেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল তাকে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাহরাইনের বিপক্ষে সবশেষ গোল করার পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে আর কোনো গোল করতে পারেননি এই মিডফিল্ডার। কেবল গোলখরা নয়, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তার নামের পাশে কোনো অ্যাসিস্টও ছিল না। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কুয়েতের বিপক্ষে সেই শেষ অ্যাসিস্টের পর চোটের কারণে তার ক্যারিয়ারের ছন্দও রীতিমতো এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। গত এক বছরে কাফ ইনজুরি ও লিগামেন্ট স্ট্রেচিংয়ের মতো মারাত্মক চোটে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি ম্যাচ মিস করতে হয়েছিল হোয়াংকে। সেই দুঃসময় ও মানসিক ধকল পেরিয়ে যখন তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখলেন, প্রথম ম্যাচেই রাজকীয়ভাবে জ্বলে উঠলেন। চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার অধিনায়ক সন হিউং মিনের রাতটা বেশ বাজে কাটছিল এবং তিনি বেশ কিছু সহজ সুযোগ নষ্ট করছিলেন। অধিনায়কের সেসব ভুলের বড় খেসারত দিয়ে একপর্যায়ে ম্যাচে পিছিয়ে পড়েছিল এশিয়ান পরাশক্তি দক্ষিণ কোরিয়া। মাঠে দারুণ খেলেও হার যখন কোরিয়ানদের খুব কাছাকাছি মনে হচ্ছিল, তখনই দলের ত্রাণকর্তা হিসেবে সব আলো নিজের কেড়ে নেন হোয়াং। সতীর্থ লি কাং-ইনের নিখুঁত পাস থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। এরপর দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ে চেক গোলরক্ষককে সম্পূর্ণ ধোঁকা দিয়ে বল জড়ান জালে। এই দর্শনীয় গোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার দীর্ঘ আড়াই বছরের গোল খরা ঘুচে যায় এবং ম্যাচে ১-১ ব্যবধানে সমতা ফেরায় দক্ষিণ কোরিয়া। ম্যাচে সমতা এনেই ক্ষান্ত হননি হোয়াং। এর কিছুক্ষণ পরেই ডান পাশ থেকে চেক রক্ষণভাগ ভেঙে দারুণ এক কাটব্যাক বাড়ান তিনি। সেই নিখুঁত পাস থেকে দলের বদলি ফুটবলার ওহ হিউন গিউ গোল করে কোরিয়াকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। ম্যাচে কোরিয়ার পাওয়া দুটি গোলের একটি নিজে করেছেন এবং অন্যটি করিয়েছেন হোয়াং। ফলে চোটের দুঃসময়কে পেছনে ফেলে সবচেয়ে বড় মঞ্চে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়ের নায়ক বনে গেলেন হোয়াং ইন-বিওম।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।