ভবিষ্যতের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ১৯তম আন্তর্জাতিক অটোমোবাইল প্রদর্শনীতে (অটো চায়না ২০২৬) চমক দেখালো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এক্সপেং (XPENG)। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) প্রতিষ্ঠানটি তাদের পূর্ণাঙ্গ ‘ফিজিক্যাল এআই’ (Physical AI) ইকোসিস্টেম প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে নতুন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়েছে। এবারের প্রদর্শনীতে এক্সপেং তাদের শক্তিশালী প্রোডাক্ট লাইনআপের মধ্যে নতুন মডেলের ইলেকট্রিক গাড়ি GX, MONA M03, পরবর্তী প্রজন্মের P7 এবং X9 হাইলাইট করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ কেড়েছে প্রতিষ্ঠানটির অত্যাধুনিক হিউম্যানয়েড রোবট ‘IRON’ এবং উড়ন্ত গাড়ি বা ফ্লাইং কার ‘ল্যান্ড এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার’। এক্সপেং-এর চেয়ারম্যান ও সিইও হে শিয়াওপেং বলেন, “গত ১২ বছরের যাত্রায় আমরা এখন এক নতুন ধাপে পৌঁছেছি। স্মার্ট ইভি থেকে ফ্লাইং কার, এআই চিপ থেকে হিউম্যানয়েড রোবট—আমরা আমাদের ফিজিক্যাল এআই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য কেবল যাতায়াত সহজ করা নয়, বরং প্রযুক্তিকে মানুষের জীবনের আরও গভীরে পৌঁছে দেওয়া।” প্রদর্শনীতে এক্সপেং তাদের নতুন ‘VLA 2.0’ ইন্টেলিজেন্ট ড্রাইভিং সিস্টেমের রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গ্রাহকদের গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তে এই এআই প্রযুক্তি প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রথম রোবোট্যাক্সি (Robotaxi) প্রোটোটাইপ 'GX' উন্মোচন করেছে, যা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় বা L4 অটোনোমাস ড্রাইভিং সক্ষম। এতে রয়েছে শক্তিশালী ‘টুরিং’ এআই চিপ, যা ৩০০০ TOPS কম্পিউটিং পাওয়ার প্রদান করে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাজারে এক্সপেং-এর সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ৯৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি এআই চালিত স্মার্ট মোবিলিটি বা যাতায়াত ব্যবস্থায় বিশ্বসেরা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবার আরও তুঙ্গে। ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি এবং গুগলের জেমিনাই-কে সরাসরি টেক্কা দিতে চীনভিত্তিক স্টার্টআপ ‘ডিপসিক’ বাজারে এনেছে তাদের লেটেস্ট মডেল ‘ডিপসিক-ভি৪’। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল, ২০২৬) এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় কোম্পানিটি এই নতুন মডেলের প্রিভিউ সংস্করণ উন্মোচন করেছে। মার্কিন মডেলের চেয়েও সস্তা:ডিপসিক-ভি৪ এর সবচেয়ে বড় চমক হলো এর অবিশ্বাস্য কম দাম। কোম্পানিটির দাবি, তাদের এই মডেলটি ব্যবহার করতে খরচ হবে ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিকের মডেলগুলোর তুলনায় কয়েক গুণ কম। যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের শক্তিশালী মডেলগুলোর এপিআই (API) ব্যবহারের জন্য উচ্চমূল্য রাখে, সেখানে ডিপসিক অত্যন্ত সস্তায় একই মানের বা তার চেয়েও উন্নত সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কারিগরি সক্ষমতা: ডিপসিকের নতুন এই মডেলে রয়েছে ‘ভি৪-প্রো’ (V4-Pro) এবং ‘ভি৪-ফ্ল্যাশ’ (V4-Flash) নামক দুটি সংস্করণ। এর মধ্যে প্রো সংস্করণটিতে ১.৬ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার রয়েছে, যা একে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এআই মডেলে পরিণত করেছে। এটি গণিত এবং কোডিংয়ের ক্ষেত্রে ওপেন-সোর্স মডেলগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং বিশ্বজ্ঞানের ক্ষেত্রে জেমিনাই ৩.১-প্রো-র ঠিক পরেই এর অবস্থান। ১ মিলিয়ন টোকেন উইন্ডো: গবেষকদের মতে, ডিপসিক-ভি৪ এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ১ মিলিয়ন টোকেন সমৃদ্ধ কন্টেক্সট উইন্ডো। এর মানে হলো, এই এআই একবারে কয়েক হাজার পৃষ্ঠার বই বা বিশালাকার কোডবেস বিশ্লেষণ করতে পারবে কোনো তথ্য না হারিয়েই। হুয়াওয়ে চিপের প্রভাব: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এনভিডিয়া (Nvidia) চিপের সংকট থাকলেও, ডিপসিক তাদের এই মডেলটিকে চীনের তৈরি হুয়াওয়ে অ্যাসেন্ড (Huawei Ascend) চিপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, হার্ডওয়্যার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চীন এআই প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং সামরিক শক্তিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে এবার ‘সুপার পাউডার’ প্রযুক্তিতে বড় ধরনের সাফল্য দেখালো চীন। সম্প্রতি চীনের গুয়াংডং প্রদেশে বিশ্বের বৃহত্তম 'প্লাজমা মিল' (Plasma Mill) সুবিধা উন্মোচন করা হয়েছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা এবং উন্নত প্রযুক্তি খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, যেমন— রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম স্টিলথ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী হাইপারসনিক মিসাইল তৈরির মূল ভিত্তি হলো মাইক্রন-স্কেলের এই বিশেষ সুপার পাউডার। এতদিন এই পাউডার উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা থাকলেও চীনের নতুন এই প্লাজমা মিলটি আগের পদ্ধতির চেয়ে ১০ গুণ বেশি দক্ষ। দেখতে সাধারণ ড্রামের মতো মনে হলেও এই প্লাজমা মিলগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধাতব অংশকে আণুবীক্ষণিক কণায় রূপান্তর করে। যেমন— স্টিলথ বিমানের গায়ে যে বিশেষ আবরণ (Radar-absorbing coating) থাকে, তা তৈরি হয় ম্যাগনেটিক আয়রন ফ্লেক বা লোহার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা থেকে। এছাড়া জেট ইঞ্জিনের টারবাইন ব্লেড তৈরির জন্য এই উন্নত পাউডার অপরিহার্য, যা উচ্চ তাপে সংকুচিত করে নিখুঁত আকার দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের যে আধিপত্য ছিল, চীনের এই নতুন শিল্প-বিপ্লব তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে। এখন থেকে চীন অনেক বড় পরিসরে এবং অনেক দ্রুত এই জটিল উপকরণগুলো উৎপাদন করতে পারবে। চীনের এই নতুন উদ্ভাবন শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং মহাকাশ গবেষণা এবং উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স খাতেও দেশটিকে বিশ্বসেরা হওয়ার দৌড়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল।
বর্তমান উত্তাল বিশ্ব রাজনীতিতে জ্বালানি তেলের বাজার যখন টালমাটাল, তখন চীন এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং লোহিত সাগরের অস্থিরতার ফলে বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী এবং সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে, তখন বেইজিং তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুফল ভোগ করছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে দেশটি গড়ে তুলেছে এক অজেয় ‘জ্বালানি দুর্গ’। সিএনএন-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক এই চরম সংকটের সময়েও চীন অনেকটা স্বস্তিতে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে তাদের তিনটি প্রধান কৌশল: ১. নবায়নযোগ্য শক্তির বিপ্লব: চীন বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু শক্তি এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের শিল্প খাতের একটি বড় অংশ এখন আমদানিকৃত তেলের বদলে নিজস্ব ক্লিন এনার্জির ওপর নির্ভরশীল। ২. বিশাল মজুত ব্যবস্থা: জ্বালানি নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে চীন বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত করে রেখেছে। এই মজুত দিয়ে তারা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় মোকাবিলা করতে সক্ষম। ৩. বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার: চীনের রাস্তায় এখন পেট্রোল-ডিজেলের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) জয়জয়কার। ফলে সাধারণ পরিবহনের ক্ষেত্রে তাদের তেলের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির গবেষক এরিকা ডাউনস বলেন, "চীন এই সংকটের সময় পেছন ফিরে তাকিয়ে বলতে পারে যে, তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল।" যখন এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো জ্বালানি আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন চীনের এই স্বনির্ভরতা বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। বেইজিং প্রমাণ করছে যে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।
সমুদ্রসীমায় নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এক অভিনব এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে চীন। চীনা গবেষকরা সাধারণ ফটোগ্রাফিক পেপার বা ছবির কাগজে তৈরি এক বিশেষ ধরনের ৫জি অ্যান্টেনা তৈরি করেছেন, যা দেশটির যুদ্ধজাহাজগুলোতে বড় আকারের নেটওয়ার্ক আপগ্রেডের পথ প্রশস্ত করছে। দক্ষিণ চীন মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। লিয়াওনিং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ইয়াং ওয়েনডংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথাগত অ্যান্টেনার তুলনায় এই কাগজের অ্যান্টেনা তৈরিতে খরচ কমবে প্রায় ৯৫ শতাংশ। বর্তমানে যুদ্ধজাহাজগুলোতে উচ্চগতির ৫জি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল। কিন্তু এই নতুন 'পেপার অ্যান্টেনা' প্রযুক্তি সেই চিত্র বদলে দিতে পারে। কিভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি? গবেষকরা ০.৩ মিলিমিটারের চেয়েও পাতলা সাধারণ গ্লসি ফটো পেপারকে সাবস্ট্রেট হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর ওপর তামার কালির (Copper Ink) প্রলেপ দিয়ে একটি কন্ডাক্টিভ লেয়ার বা পরিবাহী স্তর তৈরি করা হয়েছে। এই অ্যান্টেনাগুলো অত্যন্ত নমনীয় এবং ওজনে হালকা। এটি ৫জি মিলিমিটার-ওয়েভ কমিউনিকেশনের জন্য উপযুক্ত এবং যুদ্ধজাহাজের মতো জটিল পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে সক্ষম। পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী: প্রথাগত মাইক্রোওয়েভ সাবস্ট্রেটগুলো যেমন দামী, তেমনি সেগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু কাগজের তৈরি এই অ্যান্টেনাগুলো পচনশীল বা বায়োডিগ্রেডেবল। গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় 'লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি' বা প্রান্তিক সংযোগ নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের যুদ্ধজাহাজে আধুনিক ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করছে। সেখানে চীনের এই 'লো-কস্ট' বা সস্তা মডেলটি বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রের মাঝখানে যুদ্ধজাহাজ থেকে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ, রিয়েল-টাইম ডেটা ট্রান্সমিশন এবং কমান্ড অপারেশন আরও দ্রুত ও নির্ভুল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও আশার আলো দেখাচ্ছে চীন। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটি ক্যানসার মোকাবিলায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছে। সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিছুয়ান ক্যানসার হাসপাতালে আয়োজিত ক্যানসার সচেতনতা সপ্তাহের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই চিত্র উঠে আসে। চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের প্রধান লেই হাইছাও জানান, ক্যানসারকে ভয় না পেয়ে প্রতিরোধের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অন্তত ৪০ শতাংশ ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে সুস্থ জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার (স্ক্রিনিং) ওপর জোর দেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে চীনে নারীদের জন্য বিনামূল্যে জরায়ু ও স্তন ক্যানসার পরীক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর আওতায় এ পর্যন্ত ৩০ কোটির বেশি জরায়ু ক্যানসার এবং ২০ কোটির বেশি স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ফলে দেশটিতে ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে ক্যানসার রোগীদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ছিল ৪০.৫ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৪৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চীন সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৪৬.৬ শতাংশে উন্নীত করা। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হলে অস্ত্রোপচারের পর ফিরে আসার ঝুঁকি কমেছে এবং কোলোরেক্টাল ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বাস্তবে এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে চীনের বিজ্ঞানীরা, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার এবং সক্ষমতাকে আমূল বদলে দিতে পারে। সমুদ্রের বিশাল রণতরী বা ‘এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার’ নয়, বরং এবার তারা তৈরি করেছে ‘ল্যান্ড এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার’ বা স্থলচর যুদ্ধজাহাজ। এর সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—এই যানটি উড়ন্ত ড্রোনকে কোনো তার ছাড়াই মাঝ-আকাশে চার্জ করতে সক্ষম! সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের (SCMP) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা বিজ্ঞানীরা এমন এক শক্তিশালী ‘মাইক্রোওয়েভ বিম’ বা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ তৈরি করেছেন, যা দিয়ে মাটিতে থাকা যান থেকে আকাশে উড়তে থাকা ড্রোনে বিদ্যুৎ পাঠানো যাবে। ফলে ড্রোনগুলোকে চার্জ দেওয়ার জন্য আর নিচে নামতে হবে না। তারা দীর্ঘ সময় বা প্রয়োজনে অনির্দিষ্টকাল ধরে আকাশে উড়তে পারবে। কিভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি? সাধারণত ড্রোনগুলোর ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে সেগুলোকে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু চীনের এই নতুন সিস্টেমে স্থলভাগের বিশেষ ট্রাক বা বাহন থেকে উচ্চশক্তির মাইক্রোওয়েভ রশ্মি ড্রোনের দিকে নিক্ষেপ করা হয়। ড্রোনে থাকা বিশেষ রিসিভার সেই রশ্মিকে পুনরায় বিদ্যুতে রূপান্তর করে ব্যাটারি চার্জ করে নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ড্রোনের স্থায়িত্বই বাড়াবে না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদী হামলায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর আগে ড্রোনের পাল্লা সীমিত থাকলেও, এই প্রযুক্তির ফলে ড্রোনগুলো শত শত মাইল দূরে থেকেও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারবে। চীনের এই উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে সামরিক বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান যুগের ‘ড্রোন ওয়ারফেয়ার’ বা ড্রোন যুদ্ধের কৌশল এই এক উদ্ভাবনের ফলে পুরোপুরি বদলে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির দৌড়ে এবার রক্ত-মাংসের মানুষকে পেছনে ফেলে দিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র। চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক হাফ-ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় বিশ্বরেকর্ড ভেঙে ইতিহাস গড়েছে একটি ‘হিউম্যানয়েড’ বা মানবসদৃশ রোবট। মানুষের গড়া বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও দ্রুততম সময়ে ২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে এই চীনা উদ্ভাবন। রোববার বেইজিং ইকোনমিক-টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এরিয়াতে (বেইজিং ই-টাউন) আয়োজিত এই বিশেষ দৌড় প্রতিযোগিতায় চিনা স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অনার’ (Honor)-এর তৈরি একটি রোবট চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ২১ কিলোমিটার বা ১৩ মাইলের এই পথ পাড়ি দিতে রোবটটি সময় নিয়েছে মাত্র ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড। বর্তমানে হাফ-ম্যারাথনে মানুষের দ্রুততম সময়ের বিশ্বরেকর্ডটি উগান্ডার অ্যাথলেট জ্যাকব কিপ্লিমোর দখলে। ২০২১ সালে লিসবনে তিনি ৫৭ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে এই দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। বেইজিংয়ের এই রোবটটি কিপ্লিমোর চেয়েও প্রায় ৭ মিনিট কম সময়ে দৌড় শেষ করে প্রযুক্তির অভাবনীয় সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজকরা জানান, অংশ নেওয়া রোবটগুলোর মধ্যে ৪০ শতাংশ সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিতভাবে (Autonomously) পথ খুঁজে দৌড়েছে, বাকিগুলো রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। তবে বিজয়ী রোবটটি নিজস্ব নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করেই এই সাফল্য পেয়েছে। অবশ্য পুরো প্রতিযোগিতাটি নিখুঁত ছিল না। দৌড় শুরুর লাইনেই একটি রোবট আছড়ে পড়ে এবং অন্য একটি রোবট বেরিয়ারে ধাক্কা খায়। তা সত্ত্বেও গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উদ্দীপনা। উপস্থিত দর্শক সান ঝিগ্যাং বলেন, "গত বছরের তুলনায় এবার রোবটদের বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। রোবট মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে এটা আগে কখনো কল্পনাও করিনি।" উল্লেখ্য, চীন বর্তমানে রোবটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ২০২৬-২০৩০ সালের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় হিউম্যানয়েড রোবট উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বেইজিং। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অমডিয়া’র মতে, বর্তমানে চীনের এজিবট (AGIBOT) ও ইউনিট্রির (Unitree) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারে হাজার হাজার হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করছে, যা এই খাতে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সমুদ্রের তলদেশে গবেষণা বা জটিল উদ্ধারকাজে ডুবুরিদের জন্য সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো অক্সিজেন। সেই সংকট কাটাতে এবার যুগান্তকারী এক রোবোটিক ডাইভিং স্যুট উদ্ভাবন করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। দাবি করা হচ্ছে, এই ‘রোবো-ডাইভিং স্যুট’ ব্যবহার করলে একজন ডুবুরি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম অক্সিজেন খরচ করে দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে অবস্থান করতে পারবেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই বিশেষ স্যুটটিতে যুক্ত করা হয়েছে উন্নত মানের অ্যালগরিদম যা ডুবুরির প্রতিটি নড়াচড়া বা মুভমেন্টকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে পারে। ফলে ডুবুরিকে সাতার কাটতে বা হাত-পা নাড়াতে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয় না, যা তার শরীরে অক্সিজেনের চাহিদা কমিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি শুধু অক্সিজেন সাশ্রয়ই করবে না, বরং গভীর সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমিয়ে আনবে। পানির নিচে ভারী কোনো যান্ত্রিক কাজ বা উদ্ধার তৎপরতার সময় এই রোবোটিক স্যুট ডুবুরিকে ‘শ্যাডো’ বা ছায়ার মতো সহায়তা করবে। বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও ভবিষ্যতে সমুদ্র সম্পদ আহরণ এবং সামরিক ক্ষেত্রে এটি বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অস্ত্র সরবরাহ না করতে সতর্ক করেছিলেন বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এ বিষয়ে চীনের কাছ থেকে ইতিবাচক আশ্বাসও পেয়েছেন। বুধবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে চীন অস্ত্র দিচ্ছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর তিনি সরাসরি শি জিনপিংকে চিঠি পাঠান। জবাবে চীনা প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, বেইজিং ইরানকে কোনো ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করছে না। তবে এই পত্রবিনিময়ের সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেননি ট্রাম্প। এর আগে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, যেসব দেশ ইরানকে অস্ত্র দেবে, তাদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। সাক্ষাৎকারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার সিদ্ধান্তে চীন সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ শুধু চীনের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের স্বার্থেই নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তাঁর মতে, ইরান বা ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে আসন্ন বৈঠকে কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি বলেন, চীনের জ্বালানির প্রয়োজন বেশি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই নির্ভরতায় নেই। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, শিগগিরই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে। সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে এই ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল নিচ্ছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং নৌ অবরোধের প্রেক্ষাপটে এই বার্তাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে চীন এখন এক নজিরবিহীন ‘হিলিয়াম সংকটের’ মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকরা একে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ‘হিলিয়াম শক’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। এরই মধ্যে চীনে এই গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে এবং সরবরাহ তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে চীনের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এমআরআই-এর মতো জীবন রক্ষাকারী মেডিকেল ইমেজিং ব্যবস্থার ওপরও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। চিপ উৎপাদন ব্যাহত হলে ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে অটোমোবাইল শিল্প—সব ক্ষেত্রেই স্থবিরতা নেমে আসতে পারে, যা চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। জ্বালানি খাতে চীন অনেকটা স্বনির্ভরতা অর্জন করলেও হিলিয়াম গ্যাসের ক্ষেত্রে দেশটি এখনো আমদানিনির্ভর। ফলে চলমান যুদ্ধ চীনের এই দুর্বল জায়গাতে বড় আঘাত হেনেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের ঘোষণার পর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশ্বের মোট হিলিয়াম চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ এবং চীনের হিলিয়াম চাহিদার ৫৪ শতাংশই মেটায় কাতার। কিন্তু কাতারে হিলিয়াম উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। সাংহাই-ভিত্তিক সাপ্লাই চেইন কনসালটেন্সি ‘টাইডালওয়েভ সলিউশনস’-এর সিনিয়র পার্টনার ক্যামেরন জনসন বলেন, "কাতার সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী হিলিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক সরবরাহকারী সরাসরি জানাচ্ছেন যে তাদের কাছে বিক্রির মতো কোনো পণ্য নেই। এখন ১০ লক্ষ ডলার দিলেও হিলিয়াম পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।" বর্তমানে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে হিলিয়ামের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা দেশটির প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতের জন্য এক অশনিসংকেত।
দীর্ঘ কয়েক বছরের বৈরী সম্পর্কের পর চীনের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা শিথিল হতে শুরু করেছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নানা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়ছে বলে জানিয়েছে শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার। বুধবার (১৫ এপ্রিল, ২০২৬) সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক চীনের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। গত বছরের তুলনায় এই হার ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৩ সালের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ। জরিপ অনুযায়ী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্ব রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর মার্কিনিদের আস্থা বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকদের মধ্যে চীনের প্রতি এই নমনীয় ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, চীনকে ‘শত্রু’ হিসেবে দেখার প্রবণতাও আগের চেয়ে কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে ৩৩ শতাংশ মার্কিনি চীনকে শত্রু মনে করতেন, বর্তমানে তা ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে অর্ধেকেরও বেশি (৬০ শতাংশ) আমেরিকান এখনো চীনকে একটি শক্তিশালী ‘প্রতিযোগী’ হিসেবেই দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে চীনা সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং প্রযুক্তি (যা 'Chinamaxxing' হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে) তরুণ মার্কিনিদের আকর্ষণ করছে। এছাড়া আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও অনেকে বিকল্প শক্তি হিসেবে চীনের উত্থানকে ইতিবাচকভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে এখনো চীনের প্রতি কঠোর মনোভাব বজায় রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ এখনো মনে করে যে, চীন আমেরিকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধের কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে চীন—এমন প্রেক্ষাপটে এগিয়ে এসেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে মস্কো সহায়তা দিতে প্রস্তুত। বুধবার (১৫ এপ্রিল) বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, রাশিয়ার কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে এবং যারা পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা করতে চায়, তাদের পাশে দাঁড়াতে দেশটি প্রস্তুত। লাভরভ আরও উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও রাশিয়া-চীন সম্পর্ক দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। এদিকে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধের কারণে চীনের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ, চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের তেলের বড় ক্রেতা। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেইজিংকে ইরানি তেল কেনার সুযোগ দেওয়া হবে না। এই অবস্থায় রাশিয়ার এমন প্রস্তাবকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন কৌশলগত সমীকরণের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র: আল-জাজিরা
বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে নিজেদের এক নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে চীন। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলো যখন ওয়াশিংটনের নীতি নিয়ে ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বেইজিং নিজেকে ‘বিকল্প এবং নির্ভরযোগ্য’ অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র জন্য চলতি সপ্তাহটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত ব্যস্ত সময়। আজ সকালে বেইজিংয়ে আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন শি জিনপিং। এছাড়া চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভিয়েতনামের শীর্ষ নেতা তো লামের আজ রাতেই চীনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে, কূটনৈতিক তৎপরতায় পিছিয়ে নেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-ও। তিনি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। এর একদিন আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গেও ফোনালাপ করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আবহে তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও চীন সরাসরি কোনো সামরিক বা হার্ড-লাইন ভূমিকা পালন না করায় অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং তেলের প্রধান ক্রেতা। তবে চীন এই মুহূর্তে সরাসরি দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে বরং সংযম ও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেইজিং অত্যন্ত কৌশলে এই সময়টিকে কাজে লাগাচ্ছে। যেসব দেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে বা ওয়াশিংটনের অস্থির পররাষ্ট্রনীতিতে বীতশ্রদ্ধ, চীন তাদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের নীতিকে অনেক দেশই এখন অনিশ্চিত বলে মনে করে। এর ঠিক বিপরীতে চীন নিজেকে একটি ‘ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য, স্থিতিশীল এবং আস্থাশীল’ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরছে। বেইজিংয়ের এই ‘শান্ত ও স্থিতিশীল’ ইমেজ বর্তমানে অনেক রাষ্ট্রের কাছেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতিকে ‘খুবই ভঙ্গুর’ বলে মন্তব্য করেছে চীন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আগ্রহও প্রকাশ করেছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার-এর সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে এ মন্তব্য করেন বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। আলোচনায় ওয়াং ই বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কঠোর প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি বা যুদ্ধবিরতি নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে। চীন জানিয়েছে, সংঘাত নিরসনে পাকিস্তান যদি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তা স্বাগত জানাবে বেইজিং। পাশাপাশি নিজ উদ্যোগেও পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রয়োজনীয় অবদান রাখতে প্রস্তুত রয়েছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে চীনের এই অবস্থান কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী ও গোপন ‘বি-২ স্পিরিট’ স্টিলথ বা অদৃশ্য বোমারু বিমানের গতিবিধি শনাক্ত করার দাবি করেছে একটি চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি বিষয়ক স্টার্টআপ। ‘জিংআন টেকনোলজি’ নামক হাংঝু-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব এআই সিস্টেম ‘জিংকি’-এর মাধ্যমে তারা কেবল এই বিমানের অবস্থানই নয়, বরং পাইলটদের কণ্ঠস্বর এবং রেডিও যোগাযোগও সফলভাবে ইন্টারসেপ্ট বা আটকাতে সক্ষম হয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বি-২ বোমারু বিমান বিশ্বের অন্যতম উন্নত যুদ্ধবিমান যা রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে পারদর্শী। কিন্তু চীনা এই কোম্পানিটির দাবি যদি সত্যি হয়, তবে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক গোপনীয়তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা শত কোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে রিয়েল-টাইমে এই ট্র্যাকিং সম্পন্ন করেছে। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তবে এই ঘটনাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারির নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করতে চীন প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন এক গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সিএনএন জানিয়েছে, খুব শিগগিরই এই সামরিক সরঞ্জাম ইরানের হাতে পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সম্ভাব্য এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আকাশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি আনতে পারে। এদিকে, এই তথ্য সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অস্ত্র সরবরাহের এই সম্ভাবনা চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, চীন এ অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না এবং বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষেই কাজ করছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিই দেখার বিষয়।
তাইওয়ান প্রণালীতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে চীনের আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্যে তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং-এর (KMT) শীর্ষ নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মা ইং-জেউ-এর সঙ্গে এক বিরল ও ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং। বুধবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কোনো বর্তমান বা সাবেক তাইওয়ানি নেতার সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠক করলেন সি জিনপিং। এই বৈঠককে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের কাছে একটি বিশেষ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বেইজিং মূলত এটি বোঝাতে চাইছে যে, তাইওয়ানের বর্তমান ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির (DPP) বিপরীতে যারা বেইজিংয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়, তাদের জন্য আলোচনার পথ সবসময় খোলা। বৈঠকে সি জিনপিং বলেন, "বহিরাগত কোনো শক্তি আমাদের পুনর্মিলনের এই ঐতিহাসিক ধারাকে রুখতে পারবে না। আমরা সবাই একই জাতি এবং একই পরিবারের সদস্য।" তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, তাইওয়ান ও চীনের মধ্যকার মতপার্থক্য মেটানোর জন্য আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মা ইং-জেউ শান্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, "যদি দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা হবে পুরো চীনা জাতির জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি।" তিনি ১৯৯২ সালের 'এক চীন' নীতির (1992 Consensus) প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা কমিয়ে আনার আহ্বান জানান। বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাই চিং-তে শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সি এবং মা-এর এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চীন লাই চিং-তে-কে একজন 'বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী' হিসেবে গণ্য করে। এমতাবস্থায় বিরোধী নেতার সঙ্গে সি জিনপিংয়ের এই হৃদ্যতা তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধের পর থেকেই চীন ও তাইওয়ান আলাদাভাবে শাসিত হয়ে আসছে। তবে চীন সবসময়ই তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এটি দখল করার হুমকি দিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে চাঁদের বুক থেকে সংগৃহীত মাটি। চীনের চ্যাং'ই-৫ এবং চ্যাং'ই-৬ মিশনের মাধ্যমে আনা চন্দ্ররেণু বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা একাধিক নাইট্রোজেনযুক্ত জৈব যৌগের সন্ধান পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক গবেষক দলের এই আবিষ্কার সৌরজগতে জৈব পদার্থের বিবর্তন এবং পৃথিবীতে প্রাণের উৎস সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আদি সৌরজগতে গ্রহাণু এবং ধূমকেতুগুলো ছিল মূলত মহাজাগতিক বার্তাবাহক। এগুলোই বিভিন্ন গ্রহে কার্বন, নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেনের মতো প্রাণের জন্য অপরিহার্য উপাদান পৌঁছে দিত। পৃথিবীর সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে এই আদি রেকর্ডগুলো মুছে গেলেও চাঁদের শান্ত পরিবেশে এই উপাদানগুলো কোটি কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, চাঁদের মাটিতে থাকা এই জৈব উপাদানগুলো মূলত তিনটি অবস্থায় পাওয়া যায় এবং এগুলোতে অ্যামাইড ফাংশনাল গ্রুপের উপস্থিতি রয়েছে, যা জটিল রাসায়নিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, মহাকাশ থেকে আসা জৈব পদার্থগুলো কেবল চাঁদে জমা হয়নি, বরং সেখানে সৌর বিকিরণ ও উল্কাপাতজনিত প্রভাবে নতুন রূপে বিবর্তিত হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্বে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিয়েছে চীনা রোবোটিক্স স্টার্টআপ 'ইউনিট্রি' (Unitree)। প্রতিষ্ঠানটি তাদের সর্বাধুনিক হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে 'জি১' (G1) মডেলের রোবটটি এখন বৈশ্বিক বাজারে উন্মুক্ত করেছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, বিশালাকার এই রোবটটি এখন ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার সাইট থেকেও সরাসরি কেনা যাচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির এই রোবটটির দাম রাখা হয়েছে মাত্র ১৬,০০০ ডলার (প্রায় ১৯ লাখ টাকা), যা এই ধরনের রোবটের বাজারে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সর্বনিম্ন। ইউনিট্রি জি১ রোবটটি উচ্চতায় প্রায় ৪ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং এটি অত্যন্ত নমনীয়ভাবে চলাফেরা করতে সক্ষম। এটি কেবল হাঁটতে বা দৌড়াতেই পারে না, বরং মানুষের মতো হাত ব্যবহার করে বিভিন্ন সূক্ষ্ম কাজ যেমন—জিনিসপত্র ধরা, রান্নায় সাহায্য করা বা ভারী কিছু বহন করতেও পারদর্শী। এমনকি এটি কোনো বাধা পেলে বা পড়ে গেলে নিজে থেকেই ভারসাম্য রক্ষা করে উঠে দাঁড়াতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত এই রোবটটি মূলত সাধারণ ব্যবহারকারী এবং গবেষকদের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে। আলিবাবার মতো প্ল্যাটফর্মে এটি পাওয়া যাওয়ার অর্থ হলো, এখন থেকে উন্নত রোবট প্রযুক্তি কেবল বড় ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসছে।
বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ মোকাবিলায় নতুন রণকৌশল নিয়েছে ইরান ও চীন। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ ব্যবহার করে এবার ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এর প্রচলন শুরু করেছে দেশ দুটি। আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধাবস্থার মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন টালমাটাল, ঠিক তখনই তেহরান ও বেইজিং এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ট্রানজিট ফি হিসেবে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান গ্রহণ করছে ইরান। অন্তত দুটি বড় জাহাজ ইতোমধ্যে ইউয়ানে তাদের ফি পরিশোধ করেছে বলে লয়েড’স লিস্ট (Lloyd’s List) নিশ্চিত করেছে। কেন এই পদক্ষেপ? বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও চীন উভয়েই দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটনের ‘ডলার ডিপ্লোমেসি’ বা ডলারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার রাজনীতির শিকার। বিশ্ব তেলের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই যেকোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই আধিপত্য খর্ব করতেই তেহরান ও বেইজিং এখন ‘পেট্রো-ইউয়ান’ (Petroyuan) ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আল-জাজিরাকে বলেন, "ইরান একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে আঙুল দিয়ে নিজেদের শক্তি দেখাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউয়ানকে বেছে নিয়েছে। চীনও চাইছে তাদের মুদ্রাকে বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সিতে রূপান্তর করতে।" সুবিধা ভোগ করছে দুই পক্ষই চীনের জন্য এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশটি ইরানের তেলের ৮০ শতাংশেরই ক্রেতা। ইউয়ানে লেনদেন করলে উভয় দেশই মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সহজে ও কম খরচে বাণিজ্য করতে পারছে। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের আওতায় এই সহযোগিতা আরও জোরালো হয়েছে। ডলারের ভবিষ্যৎ কী? যদিও ইউয়ান দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে, তবে মার্কিন ডলারের জায়গা দখল করা এখনো বেশ কঠিন। বর্তমানে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ শতাংশই ডলারে রাখা হয়, যেখানে ইউয়ানের অবস্থান মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া চীনের কঠোর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ইউয়ান এখনো ডলারের মতো অবাধে বিনিময়যোগ্য নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একদিনে সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে ডলারের ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে। কিলে ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বুলেন্ট গোকায় বলেন, বেইজিং একটি 'মাল্টিপোলার' বা বহুমুখী আর্থিক বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে, যেখানে একক কোনো মুদ্রার খবরদারি থাকবে না। ইরান বুধবার ঘোষণা করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় তারা হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ যাতায়াতের গ্যারান্টি দেবে। তবে এই সময়ের মধ্যেও ইউয়ানে লেনদেন অব্যাহত থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।