যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে আবারও সামরিক হামলা শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের আশপাশে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করবে। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সেনারা অতিরিক্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ প্রস্তুত থাকবে, যতক্ষণ না চুক্তির সব শর্ত কার্যকর হয়। তিনি ‘বাস্তব চুক্তি’ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। ট্রাম্প আরও বলেন, যদি কোনো কারণে এই চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা দেখা যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বড়, শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে। এদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই লেবাননে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইরান ইতোমধ্যে জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, পারমাণবিক ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী তারা এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। চুক্তি বাস্তবায়ন, লেবানন পরিস্থিতি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি—এই তিন ইস্যু এখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে বিশ্বনেতাদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে ইউনূস সেন্টারের মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই আহ্বান জানান। বিবৃতিতে ড. ইউনূস বলেন, চলমান সংঘাত বিশ্বকে আরও গভীর অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে, বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; উপেক্ষিত হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদা। এই সংকটকে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এটি পুরো মানবজাতির জন্য একটি গুরুতর নৈতিক চ্যালেঞ্জ। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, যার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। বিবৃতিতে বৈশ্বিক ঐক্য ও সহমর্মিতার ওপর জোর দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, “আমাদের যুদ্ধ নয়, শান্তিকে বেছে নিতে হবে; হামলা নয়, সংলাপকে বেছে নিতে হবে; বিভাজন নয়, ঐক্যকে বেছে নিতে হবে।” উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত ৩৯ দিন ধরে চলার পর বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালেন ড. ইউনূস।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সবশেষ শনি ও রবিবার দুই দিনে ১৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই বিমানবন্দর থেকে মোট ২৬৪টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল ফ্লাইট বাতিলের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মোট ৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার মধ্যে ৪টি অ্যারাইভাল ও ৩টি ডিপার্চার ফ্লাইট। যুদ্ধাবস্থার কারণে শিডিউল বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ৪টি (২টি অ্যারাইভাল ও ২টিক ডিপার্চার) ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে এয়ার আরাবিয়ার শারজাহ রুটের ৪টি এবং সালাম এয়ারের ওমান রুটের ৪টি ফ্লাইট বাতিলের তালিকায় রয়েছে। আকাশপথের ঝুঁকি ও পারস্য উপসাগরীয় উত্তেজনার কারণেই মূলত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফ্লাইট বিপর্যয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরা এবং ভিসার মেয়াদ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচলে এই অনিশ্চয়তা থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় সচল করা নিয়ে নতুন চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, আর সামান্য কিছু সময় পেলে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালি উন্মুক্ত করতে এবং সেখানকার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে। ট্রাম্পের এই বার্তার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হরমুজ প্রণালি সচল করতে সামরিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। জেলেনস্কি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল সচল করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইউক্রেন মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথ উন্মুক্ত করতে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি সচল করতে ড্রোন ইন্টারসেপ্টর (ড্রোন ধ্বংসকারী ব্যবস্থা), সামরিক কনভয় এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে, যা ইউক্রেন সরবরাহ করতে পারে। যদিও ইউরোপ ও ন্যাটোর সদস্যরা এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে জেলেনস্কির এই অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন মিত্রদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামরিক অভিযানের বাস্তবতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে এর মধ্যেই এএফপি-র তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের মালিকানাধীন ও মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘ক্রিবি’ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ইরান এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ রাখলেও ফরাসি জাহাজটির সফলভাবে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের আকাশসীমায় আরও একটি অত্যাধুনিক মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) দেশটির মধ্যাঞ্চলে এই ঘটনা ঘটেছে বলে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিমানটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এর পাইলটের পরিণতি সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ সংঘাতের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনো মার্কিন স্টিলথ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করল তেহরান। এর আগে গত ১৯ মার্চও একটি এফ-৩৫ বিমান ভূপাতিত করার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান, যদিও ওয়াশিংটন তখন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে শুক্রবারের এই চাঞ্চল্যকর দাবি নিয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করারও দাবি করেছিল ইরান। যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। দুই পক্ষের মধ্যে চলছে ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলা। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই সংঘাতের প্রলেপ এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে আফ্রিকার কোনো দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি না করলেও, বর্তমান সংকট নিরসনে নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কোর মতো দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে তেলের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সম্প্রতি নাইজেরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিয়াহ মো. মাইনুল কবির দেশটির পেট্রোলিয়াম প্রতিমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে এই প্রস্তাব পেশ করেন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে, তার বিকল্প খুঁজতেই এই তৎপরতা। বর্তমানে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধান সরবরাহকারী হলেও সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার কথা ভাবছে। আফ্রিকার ৯টি কূটনৈতিক মিশনে ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আলোচনার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও আফ্রিকার মিশনগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের জুম মিটিং হওয়ার কথা রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়া, লিবিয়া, অ্যাঙ্গোলা এবং আলজেরিয়া দৈনিক বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন করে। তবে এই অঞ্চলে ফ্রান্স, ইতালি ও চীনের মতো বড় বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য থাকায় সেখান থেকে তেল নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সম্প্রতি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির আলজেরিয়া সফরও প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় দেশগুলোও এখন আফ্রিকার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার মাঝেও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে কোনো জ্বালানি ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। তবে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরান-এর রাজধানী তেহরান এখন ভয়, অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসস্তূপের এক বাস্তবতার মুখোমুখি। সামরিক সাফল্যের দাবির বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বিমান হামলায় বেসামরিক এলাকাগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যদিও হামলাকারী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। তেহরানের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আহমদ রেজা জানান, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা তার চশমার দোকান এক হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ভাষায়, “বছরের পর বছর ধরে যা গড়ে তুলেছিলাম, সবকিছু এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।” তিনি বলেন, দোকানে থাকা আমদানিকৃত পণ্য সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে এবং এখন তিনি দেনার চাপে দিশেহারা। তার দাবি, দোকানের আশপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না, তবুও কেন এটি লক্ষ্যবস্তু হলো—সে প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। অন্যদিকে, তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলে একটি বিউটি পারলারে কর্মরত মিনা জানান, বিমান হামলার আগের রাত থেকেই আতঙ্কে কাটিয়েছেন তারা। পরদিন কর্মস্থলে গিয়ে দেখেন পুরো ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। “সব আয়না ভেঙে গেছে, যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন আমরা কেউই কাজ করার মতো অবস্থায় নেই,” বলেন তিনি। যুদ্ধের কারণে শুধু ব্যবসা নয়, ভেঙে পড়ছে তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বপ্নও। ২৯ বছর বয়সী নাগমেহ ও তার সহকর্মীরা মিলে একটি পোশাকের ব্র্যান্ড শুরু করেছিলেন। কিন্তু একটি বিস্ফোরণের আগুনে তাদের স্টুডিও ও পণ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। নাগমেহ বলেন, “আমরা নিজেদের জন্য নতুন কিছু গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন সবকিছুই শেষ।” একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন উত্তর তেহরানের এক রেস্তোরাঁ মালিকও। তার পারিবারিক ব্যবসা, যা কয়েক দশক ধরে চালু ছিল, এক হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বেসামরিক এলাকায় হামলার মাত্রা বাড়ছে। এতে মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ। অনেকেই বলছেন, এই সংঘাত এখন আর কৌশল বা রাজনীতির বিষয় নয়; বরং এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। তেহরানের বাসিন্দাদের কণ্ঠে এখন একটাই আকুতি—এই যুদ্ধের দ্রুত অবসান। তাদের ভাষায়, “আমরা এই যুদ্ধ চাইনি, কিন্তু তবুও আমাদের এর মধ্যেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে।”
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক আগ্রাসনের প্রভাব বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের ওপর পড়তে শুরু করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের ফলে চীনে পেট্রোল ও প্লাস্টিকের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বেইজিং এই সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে এক অস্বস্তিকর অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কাছে ইরান মূলত সস্তায় তেল পাওয়ার একটি উৎস। গত বছর ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই কিনেছে বেইজিং, যা তেহরানের আয়ের প্রধান উৎস হলেও চীনের মোট আমদানির মাত্র ১৩ শতাংশ। ফলে চীন কৌশলগতভাবে ইরানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যের তুলনায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য। এই অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যের কারণেই বেইজিং সরাসরি কোনো সামরিক পক্ষ না নিয়ে কেবল সংযম ও কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। তবে ইরান এই যুদ্ধে চীনের ‘বেইডু’ স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম এবং চীনা ড্রোন ও চিপ ব্যবহার করছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করেছে। চীন এই সংঘাতের দ্রুত অবসান চাইলেও সরাসরি তেহরানের নিন্দা জানানো থেকে বিরত রয়েছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মতে, যুদ্ধের ফলে তেলের উচ্চমূল্য এবং ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ। চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়, তবে তারা কোনোভাবেই একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান বা দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা সমর্থন করছে না। সূত্র: এনডিটিভি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলমান সংঘাত বন্ধে একটি সমঝোতার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে তা নির্ভর করছে ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি ইরানকে ‘দক্ষ আলোচক, কিন্তু দুর্বল যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বৃহস্পতিবার দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত ধ্বংস করছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীকেও কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশার চেয়েও এগিয়ে রয়েছে। ট্রাম্পের মতে, যেখানে ধারণা করা হয়েছিল ইরান কয়েক সপ্তাহ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, সেখানে বাস্তবে তারা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইরানের সামনে এখনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে, তবে সেই সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্পের এ বক্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। সূত্র: আল–জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামার ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় সামরিক অভিযান শুরু করতে তারা প্রস্তুত। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হুতির এক নেতা বলেন, তাদের সামরিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ রয়েছে এবং সব ধরনের বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং প্রতিদিন শত্রুপক্ষকে চাপে রাখছে। হুতির ওই নেতা আরও জানান, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কখন সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো উপযুক্ত হবে, সে বিষয়ে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, হুতি গোষ্ঠী সরাসরি সংঘাতে জড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট খুলে যেতে পারে। বিশেষ করে ইয়েমেনের উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। এই প্রণালি দিয়ে সুয়েজ খালমুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও উত্তেজনা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময় এই জলপথে ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে হুতি গোষ্ঠী, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের জবাবে সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) মধ্যরাত থেকে সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে প্রায় ৩০টি ড্রোন এবং একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে এই আক্রমণ চালানো হয়। রিয়াদের জন্য এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির মোট তেল ও জ্বালানি মজুদের ৭০ শতাংশই এখানে অবস্থিত। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে তেহরান। গত কয়েকদিন ধরে কেবল পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশই নয়, বরং লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী ইয়ানবুতেও ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিকল্পিত আক্রমণ কেবল সৌদি আরব বা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতির কারণে রিয়াদসহ আঞ্চলিক রাজধানীগুলোর সঙ্গে তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের আরও চরম অবনতি ঘটছে। ইরানের এই কঠোর রণকৌশল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সূত্র: আল জাজিরা
ইরান থেকে ছোড়া সস্তা ড্রোন মোকাবিলায় অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে—যা সামরিকভাবে কার্যকর হলেও অর্থনৈতিকভাবে হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান সংঘাতে ড্রোন প্রতিরোধে ব্যয়বহুল এই কৌশল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, নিচু দিয়ে ধীরগতিতে উড়ে আসা ইরানি ড্রোন ধ্বংস করতে যুদ্ধবিমান এখন প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক Center for Security and Emerging Technology-এর গবেষক লরেন কান এ প্রসঙ্গে বলেন, এই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের ব্যবহৃত Shahed-136 ড্রোনের প্রতিটির দাম মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। বিপরীতে একটি F-16 Fighting Falcon যুদ্ধবিমান আকাশে এক ঘণ্টা ওড়াতেই খরচ হয় ২৫ হাজার ডলারের বেশি। শুধু তাই নয়, এসব ড্রোন ভূপাতিত করতে যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, তার খরচ আরও বেশি। যেমন, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য AIM-9X Sidewinder ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির দাম প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ডলার। আর AIM-120 AMRAAM ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ লাখ ডলারেরও বেশি। ফলে তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহারের এই সমীকরণকে অনেকেই ‘মশা মারতে কামান দাগানো’র সঙ্গে তুলনা করছেন। Center for Strategic and International Studies-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ব্যয়বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। একই মত দিয়েছেন Center for Naval Analyses-এর গবেষক স্যামুয়েল বেন্ডেট। তার মতে, সস্তা হুমকি মোকাবিলায় তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প ব্যবস্থাই বেশি কার্যকর। বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধবিমান থেকে ভারী গুলি ব্যবহার করে ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় সস্তা। তবে এতে ঝুঁকিও রয়েছে—কারণ লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি যেতে হয় এবং জনবহুল এলাকায় ব্যবহারে বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা থাকে। এদিকে, ইসরায়েল তাদের Iron Dome প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি লেজারভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে, যেখানে প্রতি ড্রোন ধ্বংসে খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সংযুক্ত আরব আমিরাতও এ ধরনের প্রযুক্তি কেনার কথা ভাবছে। পরিস্থিতির জটিলতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইরানের ব্যাপক ড্রোন হামলা। গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দেশটি তিন হাজারের বেশি ড্রোন ছুড়েছে বলে জানা গেছে। যদিও অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে, তবুও কিছু ড্রোন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্যয় নয়—এই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিমানবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি করছে। Stimson Center-এর গবেষক কেলি গ্রিকো মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধবিমান সর্বোচ্চ সক্ষমতায় ব্যবহার করলে রক্ষণাবেক্ষণের চাপ বাড়বে এবং কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইউক্রেনের তৈরি প্রায় ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে বলেও জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু ড্রোন ঠেকানোর ওপর নয়, বরং ইরানের ড্রোন উৎক্ষেপণ সক্ষমতা কত দ্রুত কমানো যায়, তার ওপর। দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রতিরোধ নয়—হুমকির উৎস নিয়ন্ত্রণই হবে মূল কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা সাময়িক স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই দেশটির বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ব্যাপক হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, তারা তেহরানের বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘বিস্তৃত হামলা’ চালাচ্ছে। তবে হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার অভিযোগ করেন, ইরান জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। মার্কিন বাহিনীর দাবি, তারা কুম প্রদেশে ড্রোন ও বিমানযন্ত্রাংশ তৈরির একটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে, যা ‘অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, খোররামাবাদে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় এক শিশু নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাবরিজে পৃথক হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বান্দার আব্বাস, ইসফাহান, কারাজ ও আহভাজসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আহভাজে একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, সংঘাতে ৮০ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে এবং উত্তরাঞ্চলে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে। সেখানে হিজবুল্লাহর সম্পৃক্ততার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ চলছে। তবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে আইআরজিসি জানিয়েছে, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, উপসাগরীয় উপকূল বা দ্বীপে হামলা হলে সমুদ্রপথে মাইন পেতে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলে ইরানি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের চেয়েও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আবুধাবির আল-ধাফরা ঘাঁটির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। বাহরাইন ও কুয়েতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা রিয়াদের দিকে আসা একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি পরিস্থিতিকে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের চেয়েও অধিক ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফতিহ বিরল। সোমবার (২৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এক বিশাল ও অভূতপূর্ব হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ফতিহ বিরল এই পরিস্থিতিকে দুটি বড় তেল সংকট এবং একটি গ্যাস সংকটের সম্মিলিত ও জটিল রূপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আইইএ প্রধান জানান, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে ওই অঞ্চলের অন্তত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ‘ভয়াবহভাবে’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংকট নিরসনে কোনো একক দেশ নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইইএ ইতিমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের জরুরি তেলের মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে সদস্য দেশগুলো বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে রেকর্ড ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিল। ফতিহ বিরল আরও যোগ করেন, বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন হলে আইইএ আরও মজুত তেল বাজারে ছাড়তে প্রস্তুত রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের নিয়মিত সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। যদি বর্তমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্বের কোনো দেশই এর নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে ‘সমগ্র মানব পরিবারের জন্য কলঙ্ক’ হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন পোপ চতুর্দশ লিও। রোববার ভ্যাটিকান সিটি-র সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে সাপ্তাহিক অ্যাঞ্জেলাস প্রার্থনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। পোপ বলেন, চলমান যুদ্ধে নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু ও দুর্ভোগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। “এত মানুষের কষ্ট এবং এই সংঘাতের শিকার নিরপরাধদের দুর্দশার মুখে আমরা নীরব থাকতে পারি না। তাদের যন্ত্রণা পুরো মানবজাতিরই যন্ত্রণা,”—যোগ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই ধর্মীয় নেতা জানান, মধ্যপ্রাচ্যসহ সহিংসতায় বিপর্যস্ত অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতি তিনি গভীর হতাশার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি আরও বলেন, আমি আবারও জোর দিয়ে আহ্বান জানাচ্ছি—আমরা যেন প্রার্থনায় অবিচল থাকি, যাতে শত্রুতা বন্ধ হয় এবং শান্তির পথ উন্মুক্ত হয়। পোপ লিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সংঘাত নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান, যাতে দ্রুত সহিংসতা বন্ধ হয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তৃতীয় সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক রূপ নেয়। ইরানের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায় ইসরায়েল, জবাবে তেহরান ও মধ্যপ্রাচ্যের চার দেশে সাতটি জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা করে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পুনরায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের জ্বালানি স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ চলবে। সৌদি আরব ও কাতারও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান ইরানের হামলাকে ‘মারাত্মক উসকানিমূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেছেন। একইভাবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। ইসরায়েলি হামলার পর গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন স্থানে আহত হয়েছে অন্তত ১৭৭ জন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় হাইফার তেল শোধনাগার, তেল আবিবের বহুতল ভবন এবং আমিরাতের হাবশান ও বাব তেলক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে। আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইন হামলা প্রতিহত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাউথ পার্স ও কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র বিশ্ব জ্বালানি চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হামলার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। বিশ্লেষক হামিদ রেজা আজিজি বলেছেন, “ইরান শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত স্থাপনা লক্ষ্য করছে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব বহু বছর ধরে পড়বে।” মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ কাতারের রাস লাফান স্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরে আসতে অনেক সময় লাগতে পারে। ফলে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, “যুদ্ধ এখনই বন্ধ করার উপযুক্ত সময়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের উচিত এই সংঘাত থামানো।”
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের সঙ্গে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রায় তিন সপ্তাহ পরও ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখেছে। জিজ্ঞাসা করা হলে কেইন বলেন, “ইরান অনেক অস্ত্র নিয়ে এই যুদ্ধে নেমেছিল, তাই যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক এবং দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। আমরা তাদের লক্ষ্য শনাক্ত করছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আঘাত হানছি। তবে ইরানের কিছু সামরিক সক্ষমতা এখনও রয়েছে।” তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের লক্ষ্য অর্জনে এগোচ্ছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে ৫ হাজার পাউন্ড (২,২৭০ কেজি) ওজনের পেনিট্রেটিভ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা কংক্রিট ভেদ করে কার্যকরী হয়। জেনারেল কেইন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্বদিকে ইরানি আকাশসীমায় প্রবেশ করে ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করছে। এছাড়া এ-১০ ওয়ার্থগ বিমান ও এএইচ–৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার দক্ষিণ ইরানজুড়ে অভিযানে অংশ নিচ্ছে, বিশেষত হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত আক্রমণকারী নৌযানগুলোকে লক্ষ্য করে। ইরাকেও ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আঘাত চালানো হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তবে সংঘাত কখন শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করতে চায় না। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং নিশ্চিত করা যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাত হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করেছে এবং সেনারা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও তাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করছেন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে পাল্টা আক্রমণ হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে ইরান। এসব হামলা ঠেকাতে গিয়ে ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্মকর্তারা। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের লাগাতার হামলার কারণে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার খবর অস্বীকার করেছে ইসরায়েল সরকার। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তাদের হামলার ৫৪তম ধাপ পরিচালিত হয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের ঘটনাও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর ইরানের সঙ্গে সংঘাতে বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করার কারণে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগে থেকেই কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল। বর্তমান সংঘাতে ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার বলেছেন, ইন্টারসেপ্টরের মজুত ‘বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে এসেছে’—এমন দাবি সঠিক নয়। উত্তর ইসরায়েলের একটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এর উত্তর হলো—না।” এদিকে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ ব্যবহার করছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এতে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু হলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর মজুত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ‘অসীম’ পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্রের মজুত রয়েছে। যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ১৫০টির বেশি ‘থাড’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল, যা সে সময়কার মজুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। এছাড়া বর্তমান সংঘাতের শুরুতে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার মূল্যের ‘প্যাট্রিয়ট’ ইন্টারসেপ্টরও ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল সরকার সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য প্রায় ৮২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের একটি জরুরি বাজেট অনুমোদন করেছে। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এই অর্থ নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংগ্রহ ও জরুরি সামরিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলমান যুদ্ধ ‘শিগগিরই’ শেষ হবে এবং ইরানে আঘাত করার মতো মূল লক্ষ্যগুলো ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমি যখনই চাইব, এটি শেষ হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতা মেলানো নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। তিনি গত বুধবার বলেন, এই যুদ্ধ কোনো সময়সীমা ছাড়াই চলতে পারে। রয়টার্স এবং দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাৎজ জানিয়েছেন, যতদিন প্রয়োজন এবং ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ অভিযানের সমস্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতে থাকবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে এই বিবৃতি মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। সূত্র: বিবিসি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ করতে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এই কমিটি কাজ করবে। এ বিষয়ে সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটি বিশ্ব পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবে। একই সঙ্গে এসব সংঘাতের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি ও বাজার ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ করা হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও প্রণয়ন করবে কমিটি। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং খাদ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। কমিটি গঠনের দিনই বিকেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পরপরই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটি বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আজকের প্রধান সংবাদগুলোতে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা, ওমরাহ যাত্রীদের দুর্ভোগ এবং দেশের রাজনৈতিক প্রস্তুতির নানা দিক। নিচে আজকের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার প্রধান সংবাদ তুলে ধরা হলো- ‘তেল-গ্যাস নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে জাহাজ’ — আজকের পত্রিকা খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আসা জ্বালানিবাহী ১০টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে সাতটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করেছে। বাকি তিনটির একটি আজ সোমবার এবং দুটি আগামী বুধবার ও শনিবার বন্দরে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব জাহাজে মোট সাড়ে চার লাখ টন এলপিজি, এলএনজি ও জ্বালানি তেল রয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে যুদ্ধ শুরুর আগেই রওনা হয়েছিল। ফলে সেগুলো কোনো বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। বর্তমানে জাহাজগুলো ধাপে ধাপে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাচ্ছে এবং সেখান থেকে পণ্য খালাসের কার্যক্রম চলছে। বন্দর সূত্র জানায়, ১০টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটিতে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তিনটিতে রয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। এই আটটি জাহাজে মোট সাড়ে তিন লাখ টন এলএনজি ও এলপিজি রয়েছে। বাকি দুটি জাহাজে প্রায় এক লাখ টন জ্বালানি তেল রয়েছে। 'পেট্রল-অকটেনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদন' — কালের কণ্ঠ খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধকে ঘিরে দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিবেচনায় সরকার তেল ব্যবহারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু রেখেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ায় সাময়িক চাপ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রল উৎপাদন করা হয়। পরে আমদানি করা অকটেন বুস্টারের সঙ্গে মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন, যেখানে দেশের পেট্রল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা আট থেকে সাড়ে আট লাখ টন। ‘TECH-FACILITATED VIOLENCE: Women survivors forced to navigate a flawed system’ — দ্য ডেইলি স্টার খবরে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে এবং অনেক ভুক্তভোগী ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থার কারণে ন্যায়বিচার পেতে বাধার মুখে পড়ছেন। প্রতিবেদনে বাগেরহাটের এক নারী উদ্যোক্তার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি একটি দর্জির দোকান পরিচালনা করতেন। এক ব্যক্তি গোপনে তার ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ করে পরে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করেন। এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ঘটনা বাড়লেও পর্যাপ্ত সাইবার আদালত ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ‘ENERGY AUSTERITY: Univs, English schools to go on Eid holiday today’ — নিউ এইজ খবরে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে এনে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় আজ সোমবার (৯ মার্চ) থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতেও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলা মিডিয়াম ও ইংলিশ মিডিয়ামসহ সব ধরনের কোচিং সেন্টারের কার্যক্রমও এই সময়ে বন্ধ থাকবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে পবিত্র রমজান উপলক্ষে আগামী ৯ মার্চ থেকে ঈদুল ফিতরের জন্য একাডেমিক ক্যালেন্ডারে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। 'স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জামায়াত, নজর ১২ সিটিতে' — প্রথম আলো খবরে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নজর দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এই নির্বাচনকে ‘দ্বিতীয় লড়াই’ হিসেবে দেখছে। এ লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। এ জন্য দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ পহেলা মার্চ নির্বাচন ভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ঈদুল ফিতরের পর থেকে সারা বছর ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের এমন পরিকল্পনা সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীও প্রস্তুতি শুরু করেছে। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নিয়ে বাড়তি নজর রয়েছে বলে জানা গেছে। জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ‘দ্বিতীয় লড়াই’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ‘মক্কা-মদিনায় আটকা ৩৫০০ বাংলাদেশি’— সমকাল খবরে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশনে দেখা হয় দুই বাংলাদেশি মুতামির (ওমরাহ পালনকারী) সঙ্গে। একজন রাজশাহীর মো. আজাদ, অন্যজন মুন্সীগঞ্জের রিয়াজুল হায়দার। দুজনেরই দেশে ফেরার কথা ছিল শনিবার। কিন্তু এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় তারা দেশে ফিরতে পারেননি। এখন তাদের হাতে টাকা নেই, দেশে ফেরার টিকিটও নেই। থাকা-খাওয়া নিয়েও সংকটে পড়েছেন। নতুন করে টিকিট কাটতে এজেন্সি মালিক ৫০–৬০ হাজার টাকা দাবি করছেন। এ বিষয়ে সাহায্য পেতে তারা হজ মিশনে যান এবং মিশনপ্রধান কনসাল কামরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের সমস্যা ও অভিযোগ শুনে হজ কর্মকর্তা ট্রাভেল এজেন্সি মালিক মাজেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন এবং দরিদ্র মুতামিরদের কিছু টাকা ভর্তুকি দিতে অনুরোধ করেন। মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এয়ারলাইন্স হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ করতে আসা সাড়ে তিন হাজারের বেশি যাত্রী আটকা পড়েছেন। তাদের কেউ মক্কায়, কেউ মদিনায় অবস্থান করছেন। অনেক মুতামিরের টিকিট বাতিল হয়েছে এবং ট্রাভেল এজেন্সিগুলো নতুন করে টিকিট কাটতে বলছে। ‘পাল্টা আঘাত চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান’ — নয়াদিগন্ত খবরে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত সামরিক অভিযানের নবম দিনে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। শনিবার রাতে প্রথমবারের মতো দেশটির তেল সংরক্ষণাগার ও পরিশোধনাগারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও সামনে এসেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান পাল্টা হিসেবে ইসরাইলের পাশাপাশি কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক বলে দাবি করেছে তেহরান। ‘এভিয়েশন-শ্রম বাজার, যুদ্ধের জেরে বিপর্যস্ত’ — মানবজমিন খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। একই সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে শ্রমবাজার। যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩২০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে হাজার হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইন্স, হোটেল-মোটেলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমিকেরা। ‘চার বছরে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের’ — বণিক বার্তা খবরে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত কয়েক বছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এর ফলে বেসরকারি খাতের ওপর চাপ বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এই মুনাফার একটি বড় অংশ এসেছে সুদ আয় এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে। অর্জিত মুনাফা থেকে সরকারি কোষাগারে প্রায় ৫১ হাজার ৫১২ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews