জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন তালিকা—গেজেট, লাল মুক্তিবার্তা এবং ভারতীয় তালিকা—থেকে মোট ৬ হাজার ৪৭৬ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। বুধবার (১৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন-এর এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে তিনি এই তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। মন্ত্রী জানান, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিশ্চিত করতে যাচাই-বাছাই একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেসব অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অতীতে অনেকেই ভুল বা ভুয়া তথ্য দিয়ে ভারতের তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বর্তমানে এসব তথ্য পুনরায় যাচাই করে অমুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত অমুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত মোট ৮৪২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত শেষে ৪৮১ জনের নাম বাতিলের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর জামুকার একটি উপকমিটি তদন্ত ও শুনানি পরিচালনা করে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হলে তার সনদসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের যেকোনো স্থান থেকে অভিযোগ আসুক না কেন, একই প্রক্রিয়ায় তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার ওপর হামলা চালিয়ে তার হাত ও পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন জিস্ট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত মুক্তিযোদ্ধার নাম অহিদুজ্জামান নাইম (৭২)। তিনি উপজেলার বালুয়াকান্দী ইউনিয়নের বালুয়াকান্দী গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত আব্দুর রাজ্জাক মাস্টারের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, জমির মাপজোখ সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে স্থানীয় নাসিমুল ও মনির হোসেনের সঙ্গে অহিদুজ্জামান নাইমের সালিশ চলছিল। একপর্যায়ে তিনি একা মহাসড়কের পাশে গেলে গজারিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক ও দনিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি তুহিন প্রধানের নেতৃত্বে ১০–১২ জনের একটি দল তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তাঁকে রড দিয়ে পিটিয়ে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, তুহিনের বাবা খোকন প্রধানের সঙ্গে আগেও জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। পরে স্থানীয়রা আহত মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্ধার করে গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। চিকিৎসক শারমীন সুলতানা জানিয়েছেন, আহতের অবস্থা গুরুতর ও সংকটাপন্ন হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তার একটি হাত ও একটি পা ভেঙে গেছে এবং মাথার পেছনে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। আহত মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সালিশ থেকে বের হওয়ার পর তুহিন ও তার সহযোগীরা আমাকে ঘিরে ফেলেছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে। অভিযুক্ত তুহিন প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসান আলী জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ৭৬ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওয়াহিদুজ্জামান নাঈমুলকে পিটিয়ে গুরুতর আঘাত করার অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা তুহিন প্রধান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ঘটনা ঘটেছে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার বালুয়াকান্দি বাসস্ট্যান্ডের কাছে। স্থানীয়রা জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তুহিন প্রধানসহ প্রায় ১০-১২ জন সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ওপর হামলা চালায়। তারা তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে ফেলে দেয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহত মুক্তিযোদ্ধার একটি হাত ও একটি পা ভেঙে গেছে এবং মাথার পেছনে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। গজারিয়া থানার ওসি মো. হাসান আলী জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। অভিযোগ দায়ের হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়দের মতে, তুহিন প্রধান পূর্বে ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক এবং কলেজ শাখার সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারের পরিবর্তনের পর তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায় ভারত। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়স্বাল। শুক্রবার দিল্লিতে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লি গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকারকে পাঠানো হয়েছিল এবং সে সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে একটি শুভেচ্ছা বার্তাও দেওয়া হয়। জয়স্বাল জানান, ওই বার্তায় দুই দেশের সম্পর্ককে ভবিষ্যতে কীভাবে আরও গভীর ও বিস্তৃত করা যায়, সে বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে সময় হলে তা জানানো হবে। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। জয়স্বাল বলেন, সে সময় সংঘটিত নৃশংসতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবগত এবং এই গণহত্যার বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে ভারত সমর্থন করে। তিনি আরও বলেন, সেই সময়ে লাখো নিরীহ মানুষকে হত্যার পাশাপাশি নারীদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয় এবং অসংখ্য মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সারা দেশে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হামলার পর ২৬ মার্চের প্রভাতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দিবসটি উপলক্ষে দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পৃথক বাণীতে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, “স্বাধীনতা জাতি হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।” তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেন, স্বাধীনতা দিবস আমাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করে। তিনি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। দিবসটি উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোপধ্বনির মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ-এ পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিদেশি কূটনীতিকরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। জেলা ও উপজেলায় বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আজ ২৫ মার্চ, জাতীয় Bangladesh Genocide 1971 দিবস। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘Operation Searchlight’ নামে নৃশংস অভিযান চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই কালরাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মধ্যরাতে Rajarbaug Police Lines, University of Dhaka-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ সদস্য, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ হত্যার শিকার হন। এই বর্বরতা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দেয় এবং শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি Mohammed Shahabuddin ও প্রধানমন্ত্রী Tarique Rahman। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, ২৫ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও নৃশংস অধ্যায়। তিনি শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তরুণ প্রজন্মকে এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, সেই রাতের গণহত্যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেন, ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ ছিল সুপরিকল্পিত এবং এটি ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। তিনি উল্লেখ করেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়েই সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের পথ উন্মুক্ত হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার মূল্য তুলে ধরতে এই দিবসের তাৎপর্য জানা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আজ সারা দেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোচনা সভা ও স্মৃতিচারণা, ডিজিটাল ডিসপ্লেতে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া University of Dhaka-এ মোমবাতি প্রজ্বালন, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও আলোচনাসহ বিশেষ কর্মসূচি পালিত হবে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সেই ভয়াল রাতের শহীদদের।
আগামীকাল ‘গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি ন্যায়ভিত্তিক, উন্নত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত এই বাণীতে তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দিনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নৃশংস ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই রাতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে—বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে—শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। তিনি আরও বলেন, ২৫ মার্চের এই হত্যাযজ্ঞ ছিল একটি সুপরিকল্পিত অভিযান। কেন এই হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি, তা এখনো ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয়। তবে সেই রাতেই চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তীতে দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে গণহত্যা দিবসের ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদদের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা দিতে হবে। বাণীর শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী মহান আল্লাহর কাছে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং দিবসটি উপলক্ষে গৃহীত সব কর্মসূচির সফলতা প্রত্যাশা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-এর কংগ্রেসে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা ও কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান শুক্রবার এ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী মিলিশিয়াদের পরিচালিত নৃশংসতা—বিশেষ করে অপারেশন সার্চলাইট—গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান বলেন, “১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ঘটনাগুলো ছিল পরিকল্পিত সহিংসতার ধারাবাহিকতা, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যার মধ্যে পড়ে।” প্রস্তাবনায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো, বাঙালি হিন্দুদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নির্যাতনের স্বীকৃতি এবং কোনো জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর সামষ্টিক দায় চাপানোর বিরোধিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের এই গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেয়নি। প্রস্তাবকারীদের মতে, এ স্বীকৃতি নৈতিক ও নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর—পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। কিন্তু সেই ঈদ ছিল না উৎসবের, ছিল আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদ এসেছিল এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে। মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, ধরপাকড় ও দখলদারিত্বের মধ্যে মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে চলছিল প্রতিরোধ যুদ্ধ। এমন দমবন্ধ পরিস্থিতিতেই আসে ঈদ। যেখানে রমজান এলেই চট্টগ্রাম নিউমার্কেট ও রেয়াজুদ্দিন বাজারে মানুষের ভিড় লেগে থাকত, সেখানে একাত্তরে ছিল নিস্তব্ধতা। নতুন কাপড় কেনা তো দূরের কথা, অনেকেই ন্যূনতম আয়োজনেই ঈদ পার করেছেন। প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে—ঈদের দিনটিতে আনন্দের চেয়ে ভয়ই ছিল বেশি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় গুলিবর্ষণ, লুটপাট ও গণহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ত প্রতিনিয়ত। তবুও মানুষের মনে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল–এর পরিবারও সেই বাস্তবতার বাইরে ছিল না। তাঁর ছেলে আবুল মোমেন স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ভয়, আশঙ্কা আর আশাবাদের মধ্যেই ঈদ এসেছিল। ঘরে ভালো খাবার হলেও কোনো উৎসব ছিল না।” মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক মাহফুজুর রহমান জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ঈদ উদ্যাপনের কোনো পরিবেশই ছিল না। বরং নিরাপত্তার কারণে অনেককে বাড়ি না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি পরাধীন দেশে ঈদে উৎসব বর্জনের আহ্বান জানিয়ে প্রচারপত্রও বিতরণ করা হয়েছিল। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যা শহরটিকে পরিণত করেছিল মৃত্যুপুরীতে। বন্দর, হালিশহর, লালখান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হয় বড় বড় হত্যাকাণ্ড। অনেক জায়গায় নালা ও ম্যানহোল থেকেও উদ্ধার করা হয় লাশ। ঈদের দিনও ছিল না নিরাপদ। পটিয়ার মনসা গ্রামে এক মায়ের কান্না আজও স্মৃতিতে জাগ্রত—যুদ্ধের কারণে মেয়েকে দেখতে না পারার বেদনা তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল। আবার কোথাও বাবাকে হারানো সন্তানের কান্না ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছিল। ইতিহাস গবেষক মুহাম্মদ শামসুল হক তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, “ঈদের দিন নতুন কাপড় ছিল না, ছিল শুধু দুধের সেমাই আর ভয়ের মধ্যে কাটানো কিছু সময়।” সেদিনের ঈদ ছিল না কোলাকুলি বা আনন্দের—ছিল নীরবতা, আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তবুও মানুষের অন্তরে ছিল একটিই বিশ্বাস—স্বাধীনতা আসবে, অন্ধকার কেটে যাবে। আজকের স্বাধীন দেশে আনন্দমুখর ঈদ উদ্যাপনের পেছনে তাই লুকিয়ে আছে সেই ত্যাগ, বেদনা আর সংগ্রামের ইতিহাস।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, দেশ বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক পথে পদার্পণ করেছে এবং সশস্ত্র বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের দেখানো আদর্শ ও পথ অনুসরণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে চায়। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ঢাকা সেনানিবাসে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে আয়োজিত এক বিশেষ ইফতার ও দোয়া মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন। গত ১৮ মাসের বিশেষ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিগত দেড় বছরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সেনাপ্রধান বলেন, এই সময়টি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর দায়িত্ববোধ নিয়ে সবসময় জনগণের পাশে থেকে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সচেষ্ট ছিল। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, দেশ এখন একটি গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করেছে এবং এই অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। অনুষ্ঠানে একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর সেনারা সমবেত হয়ে তাদের স্মৃতিচারণা করেন। সেনাপ্রধান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাদের ত্যাগ ও বীরত্বগাথা সেনাবাহিনীকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। ইফতার মাহফিলে উপস্থিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনীর সময়োপযোগী ভূমিকার প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি এবং শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিপুল সংখ্যক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।