- প্রচ্ছদ
- Topic
মূল্যস্ফীতি
শীতের ছুটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ। তবে বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় সেই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁদের বড় একটি অংশ। ওয়ালেটহাবের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, মূল্যস্ফীতির কারণে এ শীতে তাঁদের ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। জরিপে অংশ নেওয়া এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ জানিয়েছেন, শীতের ছুটিতে ভ্রমণের খরচ তাঁদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করে। ছুটির মৌসুম সামনে রেখে জ্বালানি, বিমানভাড়া ও হোটেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভ্রমণের বাজেট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে মাসিক মূল্যবৃদ্ধি ছিল ০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। এ সময় জ্বালানির দাম এক মাসে ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি। এর প্রভাব পড়ছে গাড়িতে ভ্রমণের খরচ থেকে শুরু করে বিমানভাড়া ও অন্যান্য পর্যটনসেবার ব্যয়েও। বিমানভাড়ার ক্ষেত্রেও খরচ বাড়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে বিমানভাড়া ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে হোটেলের দাম মাসিক হিসাবে ২ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে শীতের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া কিংবা অন্য শহরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের যাতায়াত, থাকা ও খাবারের খরচ একসঙ্গে সামলাতে হয়, তাঁদের বাজেটের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, শীতের ছুটিতে ভ্রমণের জন্য ঋণ নেওয়াও সার্থক হতে পারে। তবে ভ্রমণের খরচ মেটাতে ঋণ নেওয়ার পরিণতি সবার জন্য এক রকম নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৩০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময়ও তাঁদের গত শীতের ভ্রমণসংক্রান্ত ঋণ বাকি থাকবে। চলতি বছর ভ্রমণে কতটা ব্যয় করবেন, সে বিষয়ে ৪৫ শতাংশ বলেছেন, গত বছরের মতোই খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। অন্যদিকে, ৩৩ শতাংশ মনে করছেন, এবার তাঁদের ব্যয় আরও বাড়বে। বাড়তি খরচ সামাল দিতে বিভিন্ন আর্থিক কৌশলের কথাও জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। প্রায় ৩৪ শতাংশ বলেছেন, সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে তাঁরা নতুন ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার কথা ভাবছেন। অন্যদিকে, ৫৭ শতাংশ ছুটির ভ্রমণের ব্যয় কমাতে ক্রেডিট কার্ডে জমা হওয়া পুরস্কার বা সুবিধা ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন। তবে ভ্রমণের পরিকল্পনা ও বুকিংয়ের পুরো দায়িত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ছেড়ে দিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম। জরিপে মাত্র ৩৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনা ও বুকিং করাতে রাজি। ওয়ালেটহাবের জরিপের ফলাফল বলছে, শীতের ছুটিতে ভ্রমণের আগ্রহ থাকলেও খরচ নিয়ে উদ্বেগ অনেকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী, ভ্রমণের আগে যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য খরচের হিসাব করা এবং বিভিন্ন বিকল্পের দাম তুলনা করা বাজেট নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মতামত পুরো মার্কিন জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন কি না, তা মূল্যায়নের জন্য জরিপের নমুনা ও পদ্ধতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সূত্র: ওয়ালেটহাব, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি গড়ে বাড়েনি। অর্থাৎ, কর্মীদের বেতন বাড়লেও নিত্যপণ্য ও অন্যান্য সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সেই বৃদ্ধি তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আগের তুলনায় বেশি বেতন পেয়েও অনেক মার্কিনির ক্রয়ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) সর্বশেষ তথ্য থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে পণ্য ও সেবার দামও বেড়েছে প্রায় একই হারে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির বড় অংশই মূল্যবৃদ্ধির কারণে কার্যত হারিয়ে গেছে। মজুরি বাড়লেও সেই অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় বেশি পণ্য বা সেবা কেনার সুযোগ তৈরি হয়নি। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর গড় ঘণ্টাপ্রতি প্রকৃত মজুরি কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। ওই মাসে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে, ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মীদের আয় সামান্য বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে বেশি বেড়েছে। বার্ষিক হিসাবেও একই চাপ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকৃত ঘণ্টাপ্রতি মজুরি কমেছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে ৩ শতাংশ, কিন্তু ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। উৎপাদন ও তদারকির দায়িত্বে নেই—এমন কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রকৃত ঘণ্টাপ্রতি মজুরি এক বছরে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। গত ছয় মাস ধরে মূল্যস্ফীতি গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোকে দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার আয়ের বড় অংশ খাবার, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে, তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক এক মাসে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। পেট্রলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়ি চালানোর খরচ নয়, পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অর্থনীতি, নিত্যপণ্যের দাম ও পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক মার্কিনি মনে করছেন, তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ এখনো কমেনি। চলতি বছরের শুরুতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়টিও মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। হোয়াইট হাউস অবশ্য অর্থনীতির চিত্রকে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে আগ্রাসী অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর দাবি, এসব পদক্ষেপ বাইডেন প্রশাসনের সময়কার মূল্যস্ফীতির সংকটের প্রভাব কমিয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে, মজুরি বৃদ্ধি করেছে এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। যেসব শিল্প ও কাজ একসময় দেশের বাইরে চলে গিয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান তৈরির দাবি করেছে প্রশাসন। তবে প্রকৃত মজুরির হিসাব সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। শুধু বেতন কতটা বেড়েছে, তা দেখলেই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। সেই আয়ে আগের তুলনায় কতটা পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করতে হয়। মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির ব্যবধান না থাকলে আয় বাড়ার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত গড় মজুরি বৃদ্ধির প্রায় পুরোটা মূল্যবৃদ্ধিতে সমন্বিত হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান আরও দেখাচ্ছে, সাম্প্রতিক মাসে প্রকৃত মজুরি কমেছে। ফলে অর্থনীতি নিয়ে সরকারের ইতিবাচক বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগও সামনে থাকছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভোটারদের মনোভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে মুদি পণ্য, গাড়ির জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে পরিবারের ব্যয় আরও বাড়ছে। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) বুধবার, ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভোক্তা মূল্য বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ডব্লিউইএসএইচের তথ্য ও উপাত্তবিষয়ক দল এ পরিস্থিতিতে একটি ইন্টার্যাকটিভ অনলাইন টুল তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা মুদি পণ্য, গাড়ির জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিশুদের দিবাযত্নকেন্দ্র বা প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার খরচ এবং পোষা প্রাণীর খাবার, এই পাঁচটি খাতে তাঁদের মাসিক ব্যয় কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, তা হিসাব করে দেখতে পারবেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এসব খাতের মূল্য পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। তবে এটি ব্যক্তিগত কেনাকাটার রসিদভিত্তিক হিসাব নয়, বরং ভোক্তা মূল্যসূচকের ওপর নির্ভরশীল একটি আনুমানিক হিসাব। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের গাড়ির জ্বালানির ভোক্তা মূল্যসূচক প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের মূল্যসূচক বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি মার্কিন পরিবারগুলোর ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়ি চালানোর খরচই বাড়ে না, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন বাজেটের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও চাপে পড়ার আশঙ্কা থাকে। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও দাম বৃদ্ধির চিত্র একরকম নয়। ডব্লিউইএসএইচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ঘরে রান্নার জন্য কেনা খাবারের মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে কিছু পণ্যের দাম সামগ্রিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে কাঁচা গরুর কিমার মূল্যসূচক ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে সব পণ্যের মূল্য পরিবর্তন বোঝা যায় না। কোনো কোনো পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে পারে, আবার অন্য কিছু পণ্যের দাম কমতেও পারে। বিএলএসের সরকারি তথ্যেও জ্বালানির দামের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পেট্রোলের মূল্যসূচক এক মাসে ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক মাসিক হিসাবে বেড়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে আগস্টে বৃদ্ধি ছিল ০ দশমিক ৪ শতাংশ। গত ১২ মাসে জ্বালানি খাতের মূল্যসূচক বেড়েছে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে, খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যসূচক সেপ্টেম্বরে আগের মাসের তুলনায় অপরিবর্তিত ছিল। ঘরে ব্যবহারের জন্য কেনা খাবারের মূল্যসূচক সামান্য কমলেও রেস্তোরাঁয় খাবারের ব্যয় বেড়েছে। ডব্লিউইএসএইচের তৈরি অনলাইন টুলটি মূলত ভোক্তা মূল্যসূচকের পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত মাসিক বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে বোঝার সুযোগ দেয়। ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট খাতে তাঁদের মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে আগের সময়ের তুলনায় সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিবর্তন দেখতে পারেন। তবে প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, কেনাকাটার ধরন, বসবাসের এলাকা এবং বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণের ওপর। তাই টুলে পাওয়া হিসাবকে প্রত্যেক পরিবারের প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির চূড়ান্ত পরিমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, আগের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে এখন তুলনামূলক কম পণ্য বা সেবা কেনা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের তুলনায় খাদ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও শিশুদের দেখাশোনার খরচের অংশ বেশি, তাদের বাজেটে চাপ বেশি অনুভূত হতে পারে। মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও প্রতিটি পরিবারের ব্যয় একই হারে বাড়বে, এমন নয়। কোন খাতে কতটা ব্যয় হয়, তার ওপরই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পার্থক্য নির্ভর করে। সূত্র: ডব্লিউইএসএইচ, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৭ সালে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন সিনিয়র সিটিজেনস লিগ। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে দেশটির অবসরভোগী ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগীদের মাসিক অর্থের পরিমাণ বাড়বে। বর্তমানে একজন গড় সুবিধাভোগী মাসে ১ হাজার ৯৪০ ডলার ৮ সেন্ট পান। সম্ভাব্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে এই অর্থ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৭ ডলার ৯৮ সেন্ট হতে পারে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ২০২৭ সালের জন্য ভাতা বৃদ্ধির প্রকৃত হার নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসন সাধারণত প্রতিবছর অক্টোবর মাসে পরবর্তী বছরের জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয় বা কোলা (সিওএলএ) ঘোষণা করে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে গেলে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে এই সমন্বয় করা হয়। অবসরভাতা ছাড়াও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় থাকা অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীরা এই পরিবর্তনের সুবিধা পেতে পারেন। ২০২৭ সালের ভাতা বৃদ্ধির হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চলতি বছরের মূল্যস্ফীতির তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, শহরাঞ্চলের মজুরিভোগী ও কেরানি কর্মীদের ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই-ডব্লিউ জুলাই মাসে আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছিল। আগস্টে এই বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। সেপ্টেম্বরের তথ্য প্রকাশিত হলে পরবর্তী বছরের ভাতা সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তিন মাসের হিসাব সম্পূর্ণ হবে। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার বার্ষিক সমন্বয় নির্ধারণে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হিসাবের পরিবর্তে বিশেষভাবে সিপিআই-ডব্লিউ ব্যবহার করা হয়। চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের এই সূচকের পরিবর্তন বিবেচনা করে পরবর্তী বছরের জন্য সমন্বয়ের হার নির্ধারণ করা হয়। ফলে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য ২০২৭ সালের সম্ভাব্য ভাতা বৃদ্ধির হার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। সিনিয়র সিটিজেনস লিগ আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর ২০২৭ সালে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, এই হারে বৃদ্ধি হলে বর্তমানে গড়ে মাসে ১ হাজার ৯৪০ ডলার ৮ সেন্ট পাওয়া একজন সুবিধাভোগীর মাসিক অর্থ বেড়ে ২ হাজার ৭ ডলার ৯৮ সেন্ট হতে পারে। অর্থাৎ, মাসে প্রায় ৬৭ ডলার ৯০ সেন্ট বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ আলাদা হতে পারে। প্রত্যেক সুবিধাভোগীর বর্তমান ভাতার পরিমাণ অনুযায়ী বৃদ্ধির অঙ্কও ভিন্ন হবে। ২০২৬ সালের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ভাতায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই তুলনায় ২০২৭ সালের জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে তা হবে আগের বছরের তুলনায় বেশি। তবে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং সরকারি ঘোষণা প্রকাশের আগে এই হার নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা যুক্তরাষ্ট্রের বহু অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিয়মিত আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে যাঁরা অবসরকালীন জীবনযাপনের জন্য এই অর্থের ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের কাছে বার্ষিক বৃদ্ধির হার গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খরচ বাড়লে মাসিক ভাতার প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখাই বার্ষিক সমন্বয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে ভাতা বাড়লেই সব সুবিধাভোগীর আর্থিক চাপ একইভাবে কমবে, এমন নয়। কারও চিকিৎসা ব্যয় বেশি হতে পারে, আবার কারও বাসাভাড়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে। তাই ঘোষিত বৃদ্ধির হার এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ের পরিবর্তন এক বিষয় নয়। নতুন সমন্বয়ের হার ঘোষণা করা হলে সুবিধাভোগীরা সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের অনলাইন অ্যাকাউন্টে নিজেদের ব্যক্তিগত ভাতা বৃদ্ধির তথ্য দেখতে পারবেন। আগের বছরের ব্যবস্থায় অনলাইনে ব্যক্তিগত নোটিশ দেখার পাশাপাশি ডিসেম্বর মাসে ডাকযোগেও নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। ২০২৭ সালের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত সুবিধার সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন জানতে সরকারি ঘোষণা ও সংশ্লিষ্ট নোটিশের দিকে নজর রাখতে হবে। সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস অবসরভোগীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। এই বৃদ্ধি কার্যকর হলে গড় সুবিধাভোগীর মাসিক অর্থ ২ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির হিসাব এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও উচ্চ ঋণের চাপ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং বাড়ি কেনার খরচ বাড়তে থাকায় অর্থনীতি নিয়ে ভোক্তাদের আস্থা কমছে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্টোবরের প্রাথমিক জরিপে দেশটির ভোক্তা আস্থার সূচক সেপ্টেম্বরের ৪৮ দশমিক ১ থেকে কমে ৪৬ দশমিক ৩-এ নেমেছে। এটি টানা তৃতীয় মাসের পতন এবং চলতি বছরের মে মাসে দেখা রেকর্ড সর্বনিম্ন অবস্থানের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের মূল্যায়নও আরও খারাপ হয়েছে। জরিপে বর্তমান পরিস্থিতি-সংক্রান্ত সূচক সেপ্টেম্বরের ৫০ দশমিক ৯ থেকে কমে ৪৪ দশমিক ৭-এ দাঁড়িয়েছে, যা জরিপের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার এবং শেয়ারবাজারে যাঁদের বিনিয়োগ কম, তাঁদের মধ্যে হতাশা বেশি দেখা গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই চাপের মধ্যে বাড়ি কেনাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজ বা গৃহঋণের সুদের হার ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুদের হার বেশি থাকলে বাড়ির দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ঋণের মাসিক কিস্তি বেড়ে যায়। ফলে প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহী ব্যক্তি এবং সীমিত বাজেটের পরিবারগুলোর জন্য নিজের বাড়ির মালিক হওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের তাই শুধু বাড়ির দাম দেখলেই চলে না। ঋণের সুদের হার, ডাউন পেমেন্ট, মাসিক কিস্তি, বাড়ির কর, বিমা এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও হিসাব করতে হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এসব ব্যয় পরিবারের বাজেটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মর্টগেজের সুদের হার ঋণের ধরন, মেয়াদ, ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট স্কোর এবং অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও মানুষের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। জরিপে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, যেসব পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, সেগুলোর কেনাকাটা তাঁরা কমাবেন। প্রায় ১৬ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা এসব পণ্য কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারেন। এমন মনোভাবের কারণে পরিবারগুলো অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, জ্বালানি ও চিকিৎসার মতো জরুরি খরচকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের আরেকটি জরিপেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতির হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে মানুষের প্রত্যাশা ছিল। ২০২৩ সালের মে মাসের পর এটি সর্বোচ্চ। আগের মাসে এই প্রত্যাশা ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা খাবার, পেট্রল, বাসাভাড়া, চিকিৎসা এবং কলেজে পড়াশোনার খরচ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এসব খাতে ব্যয় বাড়লে পরিবারগুলোর হাতে অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য অর্থ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি ঋণের কিস্তি ও ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া থাকলে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থনৈতিক আস্থা কমে যাওয়ার প্রভাব সব পরিবারের ওপর সমান নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয় তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। বিপরীতে, মধ্যম ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বাজেটের চাপ বেশি অনুভব করছে। ফলে একই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একেকটি পরিবারের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের ঋণের সুদের হার ও মাসিক কিস্তির পাশাপাশি অন্যান্য আবাসন ব্যয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ঋণদাতাদের কাছ থেকে একাধিক প্রস্তাব তুলনা করা এবং ঋণের শর্ত ভালোভাবে বুঝে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হতে পারে। দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে মাসিক বাজেট তৈরি, বিভিন্ন দোকানে পণ্যের দাম তুলনা এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানোর মতো পদক্ষেপ কাজে আসতে পারে। তবে ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবারের আয়, সঞ্চয়, ঋণ ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনা করা জরুরি। সামগ্রিকভাবে, ভোক্তা আস্থার পতন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং উচ্চ আবাসন ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর আর্থিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। আগামী মাসগুলোতে এসব চাপ কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, ঋণের সুদের হার এবং পরিবারের আয়-ব্যয়ের পরিস্থিতির ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটারদের কাছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, খাবার থেকে শুরু করে বাড়ি কেনার খরচ, দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাপ অনুভব করছেন অনেক আমেরিকান। ফলে আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ভোটারদের বড় বিবেচনা হয়ে উঠেছে কে কীভাবে জীবনযাত্রার খরচ সামলানোর পরিকল্পনা দিচ্ছেন। রয়টার্স ও ইপসসের আগস্টের এক জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উঠে আসতে দেখা যায়। ৯৫১ জন নিবন্ধিত ভোটারের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে ৩৬ শতাংশ মনে করেন, জীবনযাত্রার খরচ সামলাতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পরিকল্পনা তুলনামূলক ভালো। রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা রেখেছেন ২৮ শতাংশ। তবে ৩৭ শতাংশ ভোটার কোনো দলকেই এগিয়ে রাখেননি অথবা নিশ্চিত কোনো মত দেননি। এই উদ্বেগের পেছনে বড় কারণ মূল্যস্ফীতি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স আগের মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। একই সময়ে খাবারের দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এনার্জির দাম ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে জ্বালানি। আগস্টে শুধু এক মাসেই গ্যাসোলিনের দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। আর এক বছর আগের তুলনায় গ্যাসোলিনের মূল্যসূচক বেড়েছে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে যেসব অঙ্গরাজ্যে দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে পাম্পের বাড়তি খরচ সরাসরি পারিবারিক বাজেটে প্রভাব ফেলছে। মিশিগানের ৩১ বছর বয়সী ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস্ট ও হাইস্কুল ফুটবল কোচ জ্যাক ওয়েনের অভিজ্ঞতাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মিশিগানের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে দুই থেকে চার ঘণ্টা গাড়ি চালানো অস্বাভাবিক নয়। তাই গ্যাসের দাম তাঁর মতো ভোটারদের কাছে শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিদিনের খরচের বিষয়। প্রার্থীরা গ্যাসের দাম কমানোর বিষয়ে কী পরিকল্পনা দিচ্ছেন, সেটিও তাঁর ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুতের বিল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে দ্রুত বাড়তে থাকা এআই ডেটা সেন্টার ভবিষ্যতে সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুতের খরচে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখন রাজনৈতিক আলোচনাতেও জায়গা পাচ্ছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রার্থীরা বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত খরচ এবং সাধারণ গ্রাহকদের ওপর সম্ভাব্য চাপ কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। আবাসন খাতেও স্বস্তি নেই। বাড়ির দাম ও মর্টগেজ রেটের চাপ নতুন ক্রেতাদের জন্য বাড়ি কেনা আরও কঠিন করে তুলেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থা প্রায় সাড়ে ১২ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এর পেছনে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, ব্যয়বহুল মর্টগেজ এবং চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে দুই প্রধান প্রার্থীও আবাসনের খরচ নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা সামনে এনেছেন। রিপাবলিকান মাইক রজার্স ডাউন পেমেন্ট সহায়তা, বাড়ি কেনার খরচ কমানো এবং নতুন বাড়ি নির্মাণে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলছেন। ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদ স্থানীয় বিধিনিষেধ সহজ করে বাড়ি নির্মাণ বাড়ানো, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে রেন্ট নির্ধারণে বিধিনিষেধ এবং ডাউন পেমেন্ট সহায়তা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। ট্যারিফও নির্বাচনী অর্থনীতির আলোচনায় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আরোপিত বিভিন্ন ট্যারিফ আমদানিনির্ভর ব্যবসার খরচে প্রভাব ফেলেছে। মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স কানাডার ওপর কিছু ট্যারিফের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর যুক্তি, সীমান্তের দুই পাশের বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক খাবার ও বাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে খরচ বাড়াতে পারে। তাঁর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রয় জ্যাকসনও ট্যারিফের বিরোধিতা করছেন। তবে অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশে ছিল। কিন্তু চাকরি থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ রয়ে গেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিয়োগের গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির একটি অংশ খেয়ে ফেলছে। ফলে অর্থনীতির সামগ্রিক সূচক এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে অর্থনীতি শুধু কর্মসংস্থান বা শেয়ারবাজারের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। গ্যাস স্টেশনে কত ডলার দিতে হচ্ছে, মাস শেষে বিদ্যুতের বিল কত আসছে, গ্রোসারির খরচ কতটা বেড়েছে এবং একটি বাড়ি কেনা কতটা নাগালের মধ্যে আছে, এসব দৈনন্দিন হিসাবই অনেক ভোটারের কাছে অর্থনীতির বাস্তব চেহারা। আগামী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেটের ৩৫টি আসন ভোটের মুখোমুখি হচ্ছে। তাই জীবনযাত্রার খরচ কমানো এবং অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা দুই দলের প্রচারেই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন দল বা প্রার্থীকে বেছে নেবেন, তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়ার মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার গত এক বছরে তাদের সব বিল সময়মতো পরিশোধ করতে পারেনি। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে মাত্র ৬৮ শতাংশ মার্কিন পরিবার জানিয়েছে তারা গত ১২ মাসে সব বিল সময়মতো পরিশোধ করতে পেরেছে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৭১ শতাংশ। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল হেলথ নেটওয়ার্কের ‘ফাইন্যান্সিয়াল হেলথ পালস ২০২৬ ইউএস ট্রেন্ডস রিপোর্টে’ এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে ২০২৬ সালের বসন্তের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারের আর্থিক অবস্থায় সামগ্রিকভাবে অবনতি হয়েছে। একই সময়ে সঞ্চয় করা, নিয়মিত বিল পরিশোধ এবং ঋণের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি পরিবার সমস্যায় পড়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, গত ১২ মাসে সব বিল সময়মতো পরিশোধ করতে পেরেছে এমন পরিবারের হার ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার অন্তত কোনো না কোনো সময়ে সময়মতো সব বিল পরিশোধ করতে পারেনি। আর্থিক সক্ষমতার আরও কয়েকটি সূচকেও অবনতির চিত্র পাওয়া গেছে। গত এক বছরে আয়ের চেয়ে কম খরচ করেছে এমন পরিবারের হার ৪৯ শতাংশ থেকে কমে ৪৭ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে নিজেদের সামলানোর অযোগ্য ঋণের মাত্রা রয়েছে বলে জানিয়েছে এমন পরিবারের হার ২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে। আর আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়েছে। আয়ের স্তরভেদে পরিস্থিতির পার্থক্য আরও স্পষ্ট। ফাইন্যান্সিয়াল হেলথ নেটওয়ার্কের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে গত এক বছরে আয়ের চেয়ে কম খরচ করতে পেরেছে এমন পরিবারের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ৩১ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে সব বিল সময়মতো পরিশোধ করতে পেরেছে এমন নিম্ন আয়ের পরিবারের হার ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৯ শতাংশে নেমেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, খাদ্য, বাসস্থান, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি এবং যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে পারব বলে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী মাত্র ১০টির মধ্যে প্রায় ৬টি পরিবার। যেসব পরিবার খাদ্য, ইউটিলিটি বা বাসস্থানের খরচ বহনের সক্ষমতা নিয়ে একেবারেই আত্মবিশ্বাসী নয়, তাদের প্রায় ১০টির মধ্যে ৭টি আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে পড়ে। গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৩ লাখ পরিবার, অর্থাৎ দেশের প্রায় ২৩ শতাংশ পরিবার, তাদের আর্থিক সক্ষমতার একটি স্তর থেকে অন্য স্তরে চলে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ পরিবার আর্থিক অবস্থার নিম্ন স্তরে নেমে গেছে, বিপরীতে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ পরিবার উন্নতি করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপও পুরোপুরি কমেনি। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬-এ ভোক্তা মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ০.৪ শতাংশ বেড়েছে এবং এক বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ৩.৪ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যের দাম বছরে ২.৭ শতাংশ এবং বাসস্থানের ব্যয় ৩ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে জ্বালানি খাতে। এক বছরে জ্বালানি সূচক ১৬.৩ শতাংশ এবং গ্যাসোলিনের দাম ২৭.৪ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি ব্যয়ের এই বৃদ্ধি পরিবারের অন্যান্য খরচেও চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবার সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের সম্পর্ক থাকায় এর প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষভাবে পরিবারের বাজেটে পড়তে পারে। তবে ফাইন্যান্সিয়াল হেলথ নেটওয়ার্কের জরিপ বিল পরিশোধে সমস্যার নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নির্ধারণ করেনি। ভোক্তাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি চিত্র পাওয়া গেছে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেপ্টেম্বরের জরিপে। প্রাথমিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে ভোক্তা আস্থার সূচক ৪৭.৮-এ নেমে এসেছে, যা আগস্টে ছিল ৫১.৭। এক বছরের ব্যবধানে সূচকটি ১৩.২ শতাংশ কমেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সূচকও এক বছরে ১৫.৭ শতাংশ কমেছে। অর্থনীতিতে সুদের হারও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী কমিটি ফেডারেল ফান্ডস রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩.৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছে। ফেড জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি এখনো কিছুটা উঁচু এবং এই পদক্ষেপ তাদের ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যে ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ। তবে সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব পরিবারভেদে ভিন্ন হতে পারে। ঋণের সুদ, নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ এবং কিছু ধরনের ভোক্তা ঋণের মাসিক পরিশোধে এর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে সঞ্চয়কারীরা কিছু ক্ষেত্রে বেশি সুদ পাওয়ার সুবিধাও পেতে পারেন। ফলে সামগ্রিকভাবে সুদের হার বৃদ্ধিকে পরিবারের আর্থিক সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফাইন্যান্সিয়াল হেলথ নেটওয়ার্কের প্রতিবেদনের সামগ্রিক চিত্রে বরং দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পরিবার একই সময়ে কয়েকটি চাপের মুখে রয়েছে। প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো, সঞ্চয় করা এবং ঋণ সামলানোর সক্ষমতা একসঙ্গে দুর্বল হলে মাসের শেষে হাতে নগদ অর্থের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তখন পরিবারগুলোকে খাদ্য, বাসস্থান, ইউটিলিটি বা অন্যান্য জরুরি খরচকে অগ্রাধিকার দিতে হয় এবং কিছু বিল পিছিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই চাপ নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান। গবেষণায় তাদের সময়মতো বিল পরিশোধ এবং আয়ের চেয়ে কম খরচ করার সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পতন পাওয়া গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি পরিবারের দৈনন্দিন আর্থিক সক্ষমতাও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে, নতুন গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারের আর্থিক অবস্থায় একটি সতর্কতামূলক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব বিল সময়মতো দিতে না পারা পরিবারের হার বেড়েছে, সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমেছে এবং ঋণের চাপ বেড়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এবং কমে যাওয়া ভোক্তা আস্থাও দেখাচ্ছে যে অনেক পরিবারের জন্য মাসিক বাজেট সামলানো আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল হেলথ নেটওয়ার্ক, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়
তিন বছর পর আবারও নীতিগত সুদহার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে বুধবার সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৩ সালের পর এটিই ফেডের প্রথম সুদহার বৃদ্ধি। ফেডের সিদ্ধান্তটি এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম এবং আমদানি ব্যয় নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাব। এসব বিষয় মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে উঁচু পর্যায়ে রাখার ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে ফেডের কর্মকর্তারা মনে করছেন। ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের ভিত্তি এখনো শক্তিশালী। তবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি পুরোপুরি কমে যায়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু জ্বালানি বা আমদানি ব্যয়ের সাময়িক প্রভাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ বিস্তৃত হচ্ছে। ফেডের সর্বশেষ পূর্বাভাসে আরও সুদহার বৃদ্ধির ইঙ্গিতও রয়েছে। ১৮ জন নীতিনির্ধারকের মধ্যে ১৬ জনই চলতি বছর অন্তত আরও এক দফা সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন। একই সঙ্গে ২০২৭ সালে সুদহার স্থিতিশীল রাখার এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে কমানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ সরকারি তথ্যও ফেডের সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক এক বছরের ব্যবধানে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আগস্টে মাসিক ভিত্তিতেও ভোক্তা মূল্যসূচক ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্য জুলাইয়ের তুলনায় ০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। তবে জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি। আগস্টে জ্বালানির দাম মাসিক ভিত্তিতে ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। পেট্রলের দামও এক বছরে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। ফেডের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে তৈরি জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। ইরানকে ঘিরে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়েছে। এর একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি দামের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি মূল্যও বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফেডের সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনায় এসেছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মার্কিন ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সুদহার কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। বুধবার ফেড সুদহার বাড়ানোর পর তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রে অনেক কম সুদহার থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে ফেডের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের নীতিগত অবস্থানের পার্থক্যও এখন আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঋণের ব্যয় কমানোর জন্য কম সুদহার চান। অন্যদিকে ফেডের বর্তমান নেতৃত্বের প্রধান উদ্বেগ মূল্যস্ফীতিকে আবারও নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্থিতি নিশ্চিত করা। সুদহার বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং অন্যান্য ঋণের সুদে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বেশি সুদহার মানুষের ব্যয় কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে অতিরিক্ত সময় ধরে সুদহার উঁচু থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তবে বর্তমানে মার্কিন অর্থনীতির কিছু সূচক তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। আগস্টে দেশটির খুচরা বিক্রি ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এই তথ্য থেকে অর্থনীতিতে ভোক্তাদের ব্যয়ের সক্ষমতা এখনো শক্তিশালী থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফেডের নতুন পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ধীরে কমে ২০২৯ সালের দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় ফিরতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডকে আরও দীর্ঘ সময় কঠোর নীতি ধরে রাখতে হতে পারে। ফেডের এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। মার্কিন সুদহার বাড়লে সাধারণত ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি সুদের কারণে মার্কিন সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পুঁজিপ্রবাহ, বিনিময় হার এবং ঋণের খরচেও প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, তিন বছর পর ফেডের সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠার বিষয়টি সামনে এনেছে। চলতি বছর আরও একবার সুদহার বাড়ানো হয় কি না এবং জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের চাপ আগামী মাসগুলোতে কতটা স্থায়ী হয়, তার ওপর ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে। সূত্র: রয়টার্স, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউএস ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের খরচ ইতোমধ্যে ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত ১ আগস্ট পর্যন্ত এই ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে নিরপেক্ষ কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সংঘাতের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে প্রতি মাসে আরও ৩ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি খরচ হতে পারে। সিবিওর হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতিতেও পড়ছে। ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি থাকতে পারে। এর অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন কমে যাওয়া এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন। প্রতিনিধি পরিষদের বাজেট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ব্রেন্ডন বয়েলের অনুরোধে এই মূল্যায়ন তৈরি করেছে সিবিও। তাদের হিসাব এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের কাছাকাছি। সিবিও বলেছে, ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে যুদ্ধে ধ্বংস বা হারিয়ে যাওয়া অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পুনরায় কেনার পেছনে। তবে নিহত বা আহত মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সম্পর্কিত খরচ এবং ভবিষ্যতে সাবেক সেনাসদস্যদের চিকিৎসা ও প্রতিবন্ধী ভাতার মতো দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় এই হিসাবের মধ্যে রাখা হয়নি। সিবিওর প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন ইরান সংঘাতের আর্থিক প্রভাব ও মূল্যস্ফীতি যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতটি এখন সপ্তম মাসে পড়েছে এবং দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো নিশ্চিত লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর আগে জুনে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে ৮৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল চেয়েছিল। এর মধ্যে ৪২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সরাসরি ইরান সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সিবিও মনে করছে। এই অঙ্ক সিবিওর হিসাব করা প্রতিরক্ষা ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। তবে এই হিসাব নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিভাগ সিবিওর তথ্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ফলে বাজেট অফিসকে সরকারি তথ্যভান্ডার ও প্রকাশ্য প্রতিবেদনসহ অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। সিবিও জানিয়েছে, এ কারণে তাদের হিসাবের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। এদিকে পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জামের মজুতে “কৌশলগত ঘাটতি” তৈরি হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয় ইতোমধ্যে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সংঘাতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের মজুত কমে যাওয়ায় সেগুলো পুনরায় পূরণ করতেও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ব্যবহৃত মজুত পুনর্গঠনে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে, উৎপাদন বাড়ানো হলেও। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সিবিওর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবের মধ্যে যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপন, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম, সামরিক উড্ডয়ন, জ্বালানি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সিবিও বলছে, সংঘাতের তীব্রতা যদি মে ও জুনের মতো তুলনামূলক কম থাকে, তাহলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। আর জুলাইয়ের মতো সংঘাতের মাত্রা বেড়ে গেলে মাসিক ব্যয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এই ব্যয়ের বড় অংশই গেছে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সিবিওর হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহৃত গোলাবারুদ প্রতিস্থাপনে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী গোলাবারুদের অংশ প্রায় ১৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার এবং স্থলভিত্তিক হামলায় ব্যবহৃত ক্রুজ ক্ষেপণাস্তরের অংশ প্রায় ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। সামরিক মজুত নিয়ে প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী গোলাবারুদের ঘাটতি। সিবিওর হিসাবে, ২০২৫ সালের জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্যাট্রিয়ট, থাড, এসএম-৩ ও এসএম-৬সহ নির্দিষ্ট ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মোট মজুতের প্রায় অর্ধেক থেকে দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ব্যবহার করে থাকতে পারে। এসব অস্ত্রের প্রকৃত মজুতের সংখ্যা প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রকাশ না করায় সিবিও সরকারি তথ্য ও প্রকাশ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই হিসাব করেছে। সিবিও বলছে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। উৎপাদনের গতি বাড়ানো হলেও এই সময় কমানো কঠিন হতে পারে। এর ফলে কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগের তুলনায় কমসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্র মজুত থাকবে। বড় ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থাকা কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে নতুন সংঘাত তৈরি হলে এই ঘাটতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সিবিওর হিসাবে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন কমে যাওয়া এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পেট্রল, ডিজেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে পড়ছে। জ্বালানি পরিবহন ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধি অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামেও পরোক্ষ চাপ তৈরি করছে। সিবিওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের মূল্যসূচক বা পিসিইভিত্তিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে করা পূর্বাভাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতিও একই সময় পূর্বাভাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। মূল্যস্ফীতির এই চাপ সুদের হারেও প্রভাব ফেলতে পারে। সিবিওর হিসাবে, মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে ২০২৬ সালে তিন মাস মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বিলের সুদের হার ফেব্রুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে এই ব্যবধান শূন্য দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্টের নিচে নেমে আসতে পারে। তবে সিবিও সতর্ক করেছে যে তাদের হিসাবের মধ্যে যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের সম্ভাব্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের সম্ভাব্য ব্যয় এই হিসাবের বাইরে রয়েছে। কূটনৈতিক কার্যক্রম ও বিদেশি সহায়তার অতিরিক্ত ব্যয়েরও নির্দিষ্ট হিসাব দিতে পারেনি সংস্থাটি। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আরেকটি সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছে সিবিও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ তাদের তথ্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। ফলে সিবিওকে সরকারি বিভিন্ন তথ্যভান্ডার ও প্রকাশ্য প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এ কারণে সামরিক ব্যয়ের হিসাবের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। সিবিওর এই প্রতিবেদন প্রকাশের এক দিন আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের একটি পৃথক প্রতিবেদনে যুদ্ধের ব্যয় ও সামরিক মজুত নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে ২৯ জুন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বিভাগ ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যয় প্রায় ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোলাবারুদের মজুতে কৌশলগত ঘাটতির কথাও বলা হয়। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ যুদ্ধের কারণে দেশটির সামরিক সক্ষমতা গুরুতরভাবে কমে গেছে এমন দাবির সঙ্গে একমত নয়। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সময় ও স্থানে হামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ব্যয় নিয়ে কংগ্রেসে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে। জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। নতুন সিবিওর হিসাব সেই সংখ্যার কাছাকাছি। সিবিওর প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, জ্বালানির দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা জোরদার হয়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত অব্যাহত থাকলে সামরিক ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি ব্যবহৃত উচ্চমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনও দীর্ঘমেয়াদি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে। সূত্র: কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (CBO), রয়টার্স।
২০২৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে অবসরপ্রাপ্তদের সংগঠন এএআরপি (AARP) ধারণা করছে, আগামী বছর সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয় বা কস্ট-অফ-লিভিং অ্যাডজাস্টমেন্ট (COLA) প্রায় ৩.৬ শতাংশ হতে পারে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর অক্টোবর মাসে ২০২৭ সালের প্রকৃত COLA নির্ধারণ করা হবে। নতুন হার কার্যকর হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে। আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর এএআরপির পূর্বাভাস আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BLS) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে শহরাঞ্চলের মজুরি ও কেরানি কর্মীদের জন্য ভোক্তা মূল্যসূচক বা CPI-W গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৫ শতাংশ বেড়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার বার্ষিক COLA নির্ধারণে এই সূচকই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের CPI-W-এর গড়ের সঙ্গে আগের বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের গড় তুলনা করে COLA নির্ধারণ করা হয়। ফলে আগস্টের তথ্য হাতে এলেও সেপ্টেম্বরের হিসাব ছাড়া ২০২৭ সালের চূড়ান্ত হার বলা সম্ভব নয়। সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পরই চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যাবে। ভাতা কত বাড়তে পারে ৩.৬ শতাংশ COLA কার্যকর হলে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় থাকা অনেক সুবিধাভোগীর মাসিক ভাতা বাড়বে। সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের জুলাই ২০২৬-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের গড় মাসিক সুবিধা ছিল ২,০৮৫.৯৮ ডলার। ৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি হলে এই পরিমাণে মাসে প্রায় ৭৫ ডলার যোগ হতে পারে। অর্থাৎ গড় ভাতা প্রায় ২,১৬১ ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে। এএআরপির বিশ্লেষণে অন্যান্য সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রেও বাড়তি অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। জুলাইয়ের গড় হিসাবে, স্বামী বা স্ত্রী হারানো সুবিধাভোগীদের মাসিক ভাতা প্রায় ১,৯৩৩ ডলার হলে ৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধিতে তা প্রায় ৭০ ডলার বাড়তে পারে। প্রতিবন্ধী কর্মীদের গড় সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ১,৬৩৫ ডলারের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে মাসে প্রায় ৫৯ ডলার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে প্রকৃত বৃদ্ধির পরিমাণ আলাদা হবে। কারও বর্তমান ভাতার পরিমাণ, কর, মেডিকেয়ার প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য কর্তন থাকলে ব্যাংক হিসাবে পৌঁছানো অর্থের পরিমাণ অনুমানের চেয়ে কম হতে পারে। কেন বাড়ছে COLA সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার COLA মূলত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুবিধাভোগীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দেওয়া হয়। খাদ্য, জ্বালানি, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রয়োজনীয় খাতে দাম বাড়লে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল অবসরপ্রাপ্তদের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে। এএআরপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছরে পণ্যের ওপর শুল্ক এবং জ্বালানি দামের বাড়তি চাপ মূল্যস্ফীতিকে উঁচু রাখতে ভূমিকা রাখছে। ন্যাশনাল একাডেমি অব সোশ্যাল ইন্স্যুরেন্সের বিশিষ্ট ভিজিটিং ফেলো ইন্দিভার দত্ত-গুপ্তা এএআরপিকে বলেন, বয়স্ক আমেরিকানরা বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ বেশি অনুভব করছেন, কারণ নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের এসব খরচ সামঞ্জস্য করার সুযোগ তুলনামূলক কম। সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় কত বেশি ২০২৬ সালে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার COLA ছিল ২.৮ শতাংশ। ২০২৭ সালে যদি ৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি চূড়ান্ত হয়, তাহলে সেটি ২০২৬ সালের তুলনায় ০.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হবে। একই সঙ্গে এটি ২০২৩ সালের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি হতে পারে। ২০২৩ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ৮.৭ শতাংশ বেড়েছিল। এর পরের বছরগুলোতে বৃদ্ধি তুলনামূলক কম ছিল। ২০২৪ সালে COLA ছিল ৩.২ শতাংশ, ২০২৫ সালে ২.৫ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ২.৮ শতাংশ। ফলে ৩.৬ শতাংশের পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের তুলনায় সুবিধাভোগীরা তুলনামূলক বড় সমন্বয় পাবেন। তবে বেশি COLA মানেই যে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমে যাবে, তা নয়। মূল্যস্ফীতি যদি সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার বৃদ্ধির কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা খুব বেশি বাড়বে না। অতীতেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে, যখন COLA বৃদ্ধির পরও খাদ্য, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবার দ্রুত বাড়তে থাকা খরচ সুবিধাভোগীদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। কবে চূড়ান্ত হবে ২০২৭ সালের COLA এখনো পূর্বাভাসের পর্যায়ে রয়েছে। সেপ্টেম্বরের CPI-W তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসন চূড়ান্ত হিসাব করবে। বর্তমানে সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য ১৪ অক্টোবর প্রকাশ হওয়ার কথা এবং এর পরই ২০২৭ সালের COLA আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হবে। নতুন সমন্বয় কার্যকর হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারির সুবিধা প্রদানের সঙ্গে। অর্থাৎ বর্তমানে ৩.৬ শতাংশকে সম্ভাব্য হার হিসেবে দেখা হলেও সেটিকে চূড়ান্ত ধরে বাজেট বা ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা করা ঠিক হবে না। সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্যের ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগীরা কতটা বাড়তি অর্থ পাবেন। সূত্র: এএআরপি, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো।
যুক্তরাষ্ট্রে আগস্ট মাসে ভোক্তাপণ্যের দাম জুলাইয়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই মাসিক হিসাবে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। ফলে গ্যাস, জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, জুলাইয়ে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। আগস্টে সেই বৃদ্ধির হার বেড়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। তবে বার্ষিক হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার জুলাইয়ের মতো আগস্টেও ৩ দশমিক ৪ শতাংশ রয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, আর আগস্ট মাসে আগের মাসের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি আরও দ্রুত হয়েছে। আগস্টে মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণগুলোর একটি ছিল গ্যাসোলিন। এক মাসে গ্যাসোলিনের দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, আগস্টে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্য বৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এসেছে গ্যাসোলিনের দাম বাড়ার কারণে। একই সময়ে সামগ্রিক জ্বালানি খাতের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ। গ্যাসোলিনের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ি চালানোর খরচেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় জ্বালানি ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামেও পড়তে পারে। ফলে প্রতিদিনের যাতায়াত থেকে শুরু করে বাজার-সদাই ও পারিবারিক ব্যয় পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি খরচের চাপ অনুভব করতে পারেন ভোক্তারা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এই মূল্যবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি পরিবারের মাসিক বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয় বাসাভাড়া বা মর্টগেজ, গাড়ি, গ্যাসোলিন, খাবার, হেলথ কেয়ার, ইন্স্যুরেন্স ও সন্তানদের শিক্ষা খাতে। এসব খাতে ব্যয় বাড়লে আয় একই থাকলেও পরিবারের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য মাসিক খরচ সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতির সব খাতে একই হারে দাম বাড়েনি। খাদ্যের দাম আগস্টে মাসিক হিসাবে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতি বা কোর সিপিআই আগস্টে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কোর মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফেড সুদের হার বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর আগামী বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা জোরালো হয়েছে। সুদের হার বাড়লে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ঋণের খরচেও পড়তে পারে। মর্টগেজ, গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যবসায়িক ঋণের সুদ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে সুদের হার কমানো হলে ঋণের খরচ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে ফেডের সিদ্ধান্ত শুধু ওয়াল স্ট্রিট বা বড় অর্থনীতির জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সাধারণ পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের আয় ও মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য। পণ্য ও সেবার দাম যদি আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তাহলে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয় না। এর ফলে পরিবারগুলোকে অনেক সময় খরচের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে হয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হয় এবং মাসিক সঞ্চয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হয়। এখন নজর থাকবে ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী বৈঠকের দিকে। আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্যের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, মজুরি, ভোক্তা ব্যয় এবং অর্থনীতির অন্যান্য সূচক বিবেচনা করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। তবে নতুন পরিসংখ্যান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চাপের বিষয় হয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় ২০২৭ সালে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধাভোগীদের মাসিক ভাতা বাড়তে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ায় আগামী বছর ভাতা কতটা বাড়বে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এসএসএ) নিয়ম অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে সুবিধাভোগীদের ভাতাতেও সমন্বয় করা হয়। এই বার্ষিক সমন্বয়কে বলা হয় কস্ট-অব-লিভিং অ্যাডজাস্টমেন্ট বা সিওএলএ। প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণ করে এসএসএ পরবর্তী বছরে ভাতা কতটা বাড়বে, তা নির্ধারণ করে। ২০২৬ সালে সোশ্যাল সিকিউরিটি ভাতা ২ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। এতে গড় অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর মাসিক ভাতা প্রায় ২ হাজার ১৫ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭২ ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৭ সালে কত বাড়তে পারে? ২০২৭ সালের সিওএলএ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এসএসএ আগামী অক্টোবর মাসে এ বিষয়ে ঘোষণা দেবে। তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিভিন্ন পূর্বাভাসে আগামী বছর ভাতা ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। সিওএলএ নির্ধারণ করা হয় কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স ফর আরবান ওয়েজ আর্নার্স অ্যান্ড ক্লেরিক্যাল ওয়ার্কার্স (সিপিআই-ডব্লিউ)-এর তথ্যের ভিত্তিতে। আগের বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের সঙ্গে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের মূল্যসূচকের পরিবর্তন হিসাব করে এই সমন্বয় নির্ধারণ করা হয়। তবে চূড়ান্ত হিসাবের জন্য সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে সাধারণত নতুন হারে অর্থ পাওয়া শুরু হয় পরবর্তী বছরের জানুয়ারি থেকে। মূল্যস্ফীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ? মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে একই পরিমাণ সোশ্যাল সিকিউরিটি ভাতা দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে প্রতি বছর সিওএলএ নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ভাতা বাড়লে সুবিধাভোগীদের মাসিক আয় কিছুটা বাড়বে। তবে খাদ্য, জ্বালানি ও বাসস্থানের মতো খাতে ব্যয়ও বাড়তে থাকায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়বে, সেটিই বড় প্রশ্ন। এসএসআই সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রেও কি বাড়বে? সাধারণত সাপ্লিমেন্টাল সিকিউরিটি ইনকাম (এসএসআই) সুবিধাভোগীরাও একই সিওএলএ সমন্বয়ের আওতায় থাকেন। তবে সোশ্যাল সিকিউরিটি ও এসএসআই আলাদা কর্মসূচি এবং এগুলোর অর্থায়ন ও যোগ্যতার নিয়মও ভিন্ন। ২০২৬ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ সোশ্যাল সিকিউরিটি বা এসএসআই সুবিধা, অথবা দুটিই পান। ফলে ২০২৭ সালের সিওএলএ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের মাসিক আয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। নোট: ২০২৭ সালের চূড়ান্ত বৃদ্ধির হার এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এসএসএ অক্টোবর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন হার জানাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগেই শিক্ষা উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা। খাতা-কলম থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। এ বছর শিশুদের স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ উপকরণের একটি প্যাকেজ কিনতেই অভিভাবকদের খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ১৭৫ মার্কিন ডলার। গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভ এবং দ্য সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের একটি বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব স্যান ডিয়েগো জানিয়েছে, ২১টি অত্যাবশ্যকীয় শিক্ষা উপকরণের একটি গড় প্যাকেজের বর্তমান বাজারমূল্য ১৭৩ দশমিক ৪৫ ডলার। গত বছরের তুলনায় এই দাম প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। খাতার দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ, নোটবুক পেপারের দাম ২০ শতাংশ এবং ইনডেক্স কার্ডের দাম ২২ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া শিশুদের লাঞ্চ বক্সের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ এবং হোয়াইটবোর্ডের মার্কার ও গ্লু-স্টিকের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি সাধারণ পেন্সিল, রঙিন পেন্সিল, ক্রেয়ন ও বাইন্ডার কিনতে অভিভাবকদের এখন ৫ থেকে ৭ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল এবং দৈনন্দিন খরচের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণের এই বাড়তি দাম সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য, বিশেষ করে যাদের একাধিক সন্তান রয়েছে, তাদের জন্য এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার্বিক মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি খরচের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্যান ডিয়েগোর বাসিন্দা এবং পাঁচ সন্তানের জনক মার্ক ডেভিস সংবাদমাধ্যম এনবিসি ৭-কে তাঁর হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, "বেতন ছাড়া আর সবকিছুরই দাম বাড়ছে। আমাকে পরিবারের সবার জন্য গ্যাস, বাসা ভাড়া, বিভিন্ন বিল এবং খাবারের খরচ জোগাতে হয়। প্রতিদিনের জীবনযাপনই এখন একটি বড় সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তবু আমাদের টিকে থাকতে হবে।" গত সোমবার থেকে স্যান ডিয়েগো ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর আগে গত শনিবার এনক্যান্টো এলাকায় একটি 'ব্যাক-টু-স্কুল' সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে মার্ক ডেভিসের মতো অনেক অভিভাবকই ভিড় করেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট সিনেটর আকিলাহ ওয়েবার পিয়ারসনের উদ্যোগে এই ইভেন্টটি আয়োজিত হয়। তিনি জানান, বাজেট কমানোর কারণে আগামীতে অনেক সুবিধাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাই সাধারণ মানুষের জানা উচিত যে বিকল্প সহায়তার জন্য তারা কোথায় যোগাযোগ করতে পারেন। স্যান ডিয়েগো কাউন্টিতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যের খরচ জোগাড় করাও আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ তাদের 'ক্যালফ্রেশ' খাদ্য সহায়তা সুবিধা হারাতে পারেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাউন্টি কর্তৃপক্ষ 'সেফটি নেট ব্রিজ' নামের একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। এর আওতায় শনিবার চুলা ভিস্তা এলাকায় পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। চার সন্তানের বাবা হোসে মিরান্ডা জানান, তাদের পরিবারকে বেশ কয়েকটি সহায়তা কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। সংসারের খরচ মেটাতে তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনকেই কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, "আমরা দুজনই ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করি। বিভিন্ন সহায়তা পাওয়ার জন্য আমরা ২-১-১ নম্বরে কল করে খোঁজ নিই এবং মাঝেমধ্যেই এ ধরনের সাহায্য প্রদানকারী ইভেন্টগুলোতে আসি।" কাউন্টি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শরৎকাল পর্যন্ত বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবং খাদ্য সহায়তা দিতে তারা আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উল্লেখ্য, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট (এলএইউএসডি) ও এবিসি ইউনিফায়েডসহ প্রধান শহুরে এলাকাগুলোতে গত ১২ আগস্ট, সোমবার থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে।
জুলাই মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে, তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো আগামী সেপ্টেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে। বর্তমানে সার্টিফিকেট অফ ডিপোজিট (সিডি) অ্যাকাউন্টগুলোতে সুদের হার প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি। তাই সুদের হার বেশি থাকা অবস্থায় এই সুবিধা লুফে নিতে কিছু অর্থ সিডিতে স্থানান্তর করা একটি বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। সাধারণ অ্যাকাউন্টে ১৫ হাজার ডলার ফেলে রাখার চেয়ে ১ বছর মেয়াদি একটি সিডি অ্যাকাউন্ট বেশি লাভজনক হতে পারে। বর্তমানে প্রথাগত সেভিংস অ্যাকাউন্টগুলোতে গড়ে মাত্র ০.৩৮ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়, যেখানে সিডি অ্যাকাউন্টে সুদের হার প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, এখনই সিডিতে টাকা স্থানান্তর না করলে মূলত সঞ্চয়কারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ১ বছর মেয়াদি সিডির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের জন্য টাকা আটকে রাখার কোনো ঝুঁকি থাকে না। বর্তমানে ১ বছর মেয়াদি সিডিতে সর্বোচ্চ সুদের হার ৪.১০ শতাংশ থেকে ৪.১৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। অনলাইনে ভালোভাবে যাচাই করলে সঞ্চয়কারীরা এর চেয়েও বেশি সুদের হার পেতে পারেন। ৪.১০ শতাংশ সুদে ১৫ হাজার ডলার বিনিয়োগ করলে মেয়াদ শেষে নিশ্চিত লাভ হবে ৬১৫ ডলার। সুদের হার ৪.১৫ শতাংশ হলে লাভ দাঁড়াবে ৬২২.৫০ ডলারে এবং ৪.১৭ শতাংশ সুদের ক্ষেত্রে মুনাফা হবে ৬২৫.৫০ ডলার। বর্তমানের এই উচ্চ সুদের হারে একটি ১ বছর মেয়াদি সিডি অ্যাকাউন্ট খুললে সঞ্চয়কারীরা অনায়াসেই ৬১৫ থেকে ৬২৫ ডলার পর্যন্ত নিশ্চিত লাভ পেতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে টাকা তুলে নিলে ব্যাংকভেদে বড় অঙ্কের জরিমানা গুণতে হতে পারে। সেই জরিমানা আপনার অর্জিত মুনাফাকে একেবারে শূন্য করে দিতে পারে। তাই সিডির মেয়াদ পূর্ণ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হলেই কেবল এতে বিনিয়োগ করা উচিত। ১ বছর মেয়াদি এই সিডি অ্যাকাউন্ট খোলা সত্যিই লাভজনক কি না, তা নির্ভর করছে সঞ্চয়কারীর আর্থিক লক্ষ্যের ওপর। যারা খুব বেশি দিনের জন্য টাকা আটকে না রেখে নিশ্চিত একটি ভালো মুনাফা চাইছেন, তাদের জন্য এটি দারুণ সুযোগ। কারণ সিডির মেয়াদ সাধারণত ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে ১ বছর মেয়াদি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা বেশ সহজ। তবে মনে রাখতে হবে যে, সিডি অ্যাকাউন্টের সুদের হার সবসময় নির্দিষ্ট থাকে। ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়লে সিডিতে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। কেউ যদি মনে করেন চলতি বছরের শেষের দিকে সুদের হার আরও বাড়বে, তবে হাই-ইল্ড সেভিংস বা মানি মার্কেট অ্যাকাউন্ট তার জন্য বেশি উপযুক্ত হতে পারে। কারণ এই অ্যাকাউন্টগুলোর সুদের হার পরিবর্তনশীল এবং বাজারের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সঞ্চয়কারীরা চাইলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের মূলধন এই তিন ধরনের অ্যাকাউন্টের মধ্যে ভাগ করেও সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খাতের চরম মূল্যস্ফীতি কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ি কেনার স্বপ্ন এখনো অনেকটাই অধরা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'রেডফিন'-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে একটি মধ্যম মানের বাড়ি কিনে আয়ের ৩০ শতাংশের মধ্যে মাসিক বন্ধকী কিস্তি বা মর্টগেজ সীমাবদ্ধ রাখতে হলে একটি পরিবারের বার্ষিক আয় হতে হবে অন্তত ১ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ ডলার। গত বছরের রেকর্ড ১ লাখ ১০ হাজার ৩৮২ ডলারের তুলনায় এই প্রয়োজনীয় আয়ের অঙ্ক সামান্য ০.৫ শতাংশ কমলেও এটি এখনো ছয় অঙ্কের ঘরেই রয়ে গেছে, যা মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের বর্তমান বার্ষিক আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিবারের গড় বার্ষিক আয় বর্তমানে ৮৭ হাজার ৫৯৯ ডলার। আয় আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বাড়লেও বাড়ি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আয়ের চেয়ে তা এখনো প্রায় ২২ হাজার ১৯৭ ডলার কম। বর্তমানে সাধারণ একটি পরিবারকে মধ্যম দামের একটি বাড়ি কিনতে গেলে তাদের মোট বার্ষিক আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশই খরচ করতে হয় মর্টগেজ বাবদ। রেডফিনের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ইংকি শু জানান, বাড়ি কেনার জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের পরিমাণের অবনতি ঘটা বন্ধ হলেও তা গড় আমেরিকানদের সাধ্যের মধ্যে আসেনি। তবে ইতিবাচক দিক হলো, গত দু’বছরের তুলনায় এই আয়ের ঘাটতি কিছুটা কমেছে এবং প্রথমবার বাড়ি কিনতে চাওয়া মানুষদের জন্য পরিস্থিতি সামান্য সহজ হয়েছে। বর্তমানে একটি প্রাথমিক পর্যায়ের (এন্ট্রি-লেভেল) বাড়ি কিনতে বছরে অন্তত ৭০ হাজার ৬৯৩ ডলার আয় প্রয়োজন, যা গত বছরের চেয়ে ১.৫ শতাংশ কম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজারে থাকা মোট বাড়ির প্রায় ৩৪.২ শতাংশকে সাশ্রয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা এক বছর আগে ছিল ৩০.৫ শতাংশ। সিয়াটল এবং সান হোসের মতো প্রধান প্রধান মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে বাড়ি কেনার আর্থিক সামর্থ্য কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে সার্বিক দেশের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র তিনটি বড় শহর—সেন্ট লুইস, ইন্ডিয়ানাপোলিস এবং পিটসবার্গে সাধারণ পরিবারের অর্জিত আয় দিয়ে একটি মধ্যম মানের বাড়ি কেনা সম্ভব হচ্ছে। বাকি প্রায় সব প্রধান শহর ও মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মজীবী পরিবারগুলোর জন্য নিজস্ব বাড়ি কেনা এখনো একটি বড় ধরনের আর্থিক সংকট হিসেবে বজায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শ্লথ হয়ে পড়েছে। সদ্য প্রকাশিত একটি সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখিতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জুন মাসে শেষ হওয়া দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি বার্ষিক ১.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগের প্রান্তিকের ২.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশ ধীর। এই প্রবৃদ্ধির হার অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও কম। তবে, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসের ০.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বর্তমান পরিসংখ্যানটি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে যে ঐতিহাসিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই অর্থনীতিতে। এএএ (AAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় মূল্য ৪.৫৬ ডলারের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল; যদিও গত মাসে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তির পর তা কিছুটা কমে আসে। এছাড়া, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। এতসব প্রতিকূলতা ও ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও, দেশটির শ্রমবাজার ও কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে। জেপি মর্গান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মার্কিন জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে এআই খাতের ব্যয়ের কারণে, যা সাধারণ ভোক্তাদের অবদানকেও ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং শক্তিশালী শ্রমবাজারের কারণে সুদের হার বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে, জিডিপি তথ্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে ফেডারেল রিজার্ভ তাদের সুদের হার ৩.৫% থেকে ৩.৭৫% এর ঘরেই অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ওপর উচ্চমূল্যের চাপ কমাতে তারা যেকোনো মূল্যে বাজারে দামের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।
নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান কেনাকাটার কেন্দ্র। এখানকার দক্ষিণ এশীয় গ্রোসারি দোকানগুলোতে প্রতিদিন হাজারো প্রবাসী পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার হয়। তবে গত এক বছরে খাদ্যপণ্য ও কাঁচাবাজারের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ অর্থে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারছেন বলে জানাচ্ছেন অনেক ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যুরো অফ ল্যাবর স্ট্যাটিসটিক্স ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক-নিউয়ার্ক-জার্সি সিটি অঞ্চলে গত এক বছরে ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) বেড়েছে। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও অনেক পরিবারের জন্য চাপের কারণ হয়ে রয়েছে। জ্যাকসন হাইটসের বিভিন্ন বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় গ্রোসারি দোকানে চাল, ডাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, তেল, পেঁয়াজ, আলু, টমেটো ও অন্যান্য সবজির দাম দোকানভেদে কিছুটা ভিন্ন হলেও অধিকাংশ পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় বেশি। ফলে মাসিক বাজারের বাজেটও বেড়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রায় ১০০ ডলারের বাজেটে একটি পরিবারের জন্য ১০ পাউন্ড চাল, এক গ্যালন দুধ, এক ডজন ডিম, কয়েক পাউন্ড মুরগির মাংস, কিছু ডাল, সীমিত পরিমাণ সবজি, ফল এবং প্রয়োজনীয় কিছু মসলা কেনা সম্ভব। তবে এক বছর আগে একই অর্থে আরও বেশি পরিমাণ পণ্য কেনা যেত বলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। নিয়মিত বাজার পর্যালোচনা করেন তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে বাজারদর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। বরং দাম বৃদ্ধির গতি কমলেও পণ্যের মূল্য সাধারণত উচ্চ অবস্থানেই থেকে যায়। এ কারণে ভোক্তারা এখনও উচ্চ বাজারদরের প্রভাব অনুভব করছেন। এপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফুড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি হারিগ বলেন, খুচরা বিক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ দামে কেনা পণ্যের মজুত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেন না। ফলে পাইকারি বাজারে পরিবর্তন এলেও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগে। একই প্রতিবেদনে নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি ও সম্পদ অর্থনীতির অধ্যাপক মাইক ওয়ালডেন বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কমলেও ভোক্তারা সাধারণত আগের দামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাম একটি নতুন উচ্চ স্তরে স্থিতিশীল হয়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়, পরিবহন খরচ, শ্রম ব্যয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্যপণ্যের দাম এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে। ফলে জ্যাকসন হাইটসের অনেক প্রবাসী পরিবার এখন বাজার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় প্যাকেটে পণ্য কেনা, বিভিন্ন দোকানের মূল্য তুলনা করা এবং সাপ্তাহিক ছাড়ের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তবুও অনেক পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউইয়র্কের এক বাংলাদেশি প্রবাসী আমেরিকা বাংলাকে বলেন, “এক বছর আগেও ৮০ ডলার দিয়ে মোটামুটি এক সপ্তাহের কাঁচাবাজার হয়ে যেত। এখন একই ধরনের কাঁচাবাজার করতে প্রায় ১৫০ ডলার লেগে যায়। তবে শুধু কাঁচাবাজার নয়, পরিবারের অন্যান্য নিয়মিত খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে আমার চার সদস্যের পরিবারের মাসিক ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই বেড়েছে। সংসারের বাজেট সামলানো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, আগামী কয়েক মাসেও খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা ওঠানামা করলেও দ্রুত আগের স্তরে নেমে আসার সম্ভাবনা কম। তাই নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ অন্যান্য অভিবাসী পরিবারকে উচ্চ বাজারদরের বাস্তবতার মধ্যেই তাদের মাসিক বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে।
গত সাত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্যের দাম ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় মূল্যস্ফীতির ঘটনা। অদূর ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বা স্বস্তির কোনো সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না। করোনা মহামারির সময় মাত্রাতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির কারণে দামের যে বিশাল উল্লম্ফন শুরু হয়েছিল, তা আজও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে প্রতি পাউন্ড গরুর মাংসের দাম ৬.৮২ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৭৯ শতাংশ বেশি। লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া বাজারের এটি একটি অন্যতম বড় প্রমাণ। কিংসভিউ ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট ফার্মের অংশীদার স্কট ডি. মার্টিনের মতে, বছরের পর বছর ধরে দাম এমন চড়া থাকার অর্থ হলো এটি এখন আমেরিকান ক্রেতাদের জন্য নতুন স্বাভাবিক বা 'নিউ নরমাল' পরিস্থিতি। তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির হার তার সর্বোচ্চ চূড়া থেকে কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের দাম ক্রেতাদের আগের পরিচিত জায়গায় ফিরে আসেনি। সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন, শ্রমিক সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যপণ্যের দাম স্থায়ীভাবে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমেরিকান অ্যাকশন ফোরামের প্রেসিডেন্ট ডগলাস হোল্টজ-একিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রে গবাদিপশুর রোগবালাই, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী রূপ নিয়েছে। বিএলএস-এর পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছিল মাত্র ৬.৪ শতাংশ। কিন্তু মহামারির পর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তা একলাফে প্রায় ২১ শতাংশ বাড়ে এবং এরপর থেকে খরচ আরও প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। লাগামহীন এই দামের কারণে মার্কিনিদের কেনাকাটার অভ্যাসে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। মার্টিন জানান, মানুষ এখন তুলনামূলক সস্তা বা প্রাইভেট ব্র্যান্ড কিনছেন, বিভিন্ন দোকানে দাম যাচাই করছেন এবং ছাড় পেলে একসঙ্গে বেশি পণ্য কিনে রাখছেন। দৈনন্দিন খরচের সবচেয়ে বড় অংশটি বাজারে যায় বলে বর্তমানে উচ্চ আয়ের ক্রেতারাও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি হিসেবি হয়ে উঠেছেন। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সহসাই এই সংকট থেকে সাধারণ মানুষের স্বস্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, নতুন করে আরোপিত শুল্ক এবং পরিবহন ও জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বমুখী চাপের সঙ্গে লড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইকোনমিক রিসার্চ সার্ভিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটিতে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম আরও ৩.১ শতাংশ এবং আগামী বছর আরও ৩.১ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কয়েক ডজন বাণিজ্য অংশীদারের পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক কার্যকর করায় পোশাক, ইলেকট্রনিকস, খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও গাড়িসহ অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভোক্তাদের খরচ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকেরা। নতুন ব্যবস্থায় ৬০টি দেশের আমদানি পণ্যের ওপর সাধারণভাবে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য ঠেকানোর যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, বিদেশি রপ্তানিকারকেরা নয়, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ক্রেতাদেরই এই বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে পোশাক ও বস্ত্রপণ্যে। যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া বিপুল পরিমাণ জামাকাপড়, জুতা ও কাপড়জাত পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। যেসব উৎপাদনকারী দেশ নতুন শুল্কের আওতায় পড়েছে, সেসব দেশ থেকে পণ্য আনার খরচ বাড়লে খুচরা বিক্রেতারা দাম বাড়াতে পারেন। ইলেকট্রনিকস খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি তৈরিতে ব্যবহৃত পণ্য ও যন্ত্রাংশের বড় অংশ চীন, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একাধিক ধাপে শুল্ক যুক্ত হলে নতুন ডিভাইস কেনা কিংবা পুরোনো যন্ত্র মেরামতের খরচও বাড়তে পারে। খাদ্য ও পানীয়ের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ব্রাজিল থেকে আমদানি করা কফি এবং কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়ের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি, সার এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও কৃষিপণ্য নতুন শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে না। বাড়িঘর নির্মাণ ও সংস্কারের ব্যয়ও আরও বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত কাঠ, ধাতব সামগ্রী, আসবাব, বৈদ্যুতিক উপকরণ এবং অন্যান্য নির্মাণপণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশ থেকে আসে। এসব পণ্যের দাম বাড়লে নতুন বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি রান্নাঘর, বাথরুম কিংবা পুরোনো বাড়ি সংস্কারের খরচও বাড়তে পারে। গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের বাজারেও বাড়তি চাপের আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্প কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। একটি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সীমান্ত পেরিয়ে একাধিকবার যাতায়াত করতে পারে। প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হলে নতুন ও ব্যবহৃত গাড়ির দাম, যন্ত্রাংশ এবং মেরামতের খরচেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এর পাশাপাশি কানাডার নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর আলাদাভাবে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় দেশটি থেকে আসা পণ্যের দাম বাড়লে মার্কিন বাজারের বেশ কয়েকটি খাতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন শুল্ক বিদেশি দেশগুলোকে জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে শক্তিশালী করবে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠন ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়তে সময় লাগে; এর আগেই আমদানিকারকেরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। তবে শুল্ক কার্যকর হওয়া মানেই সব পণ্যের দাম তাৎক্ষণিকভাবে একই মাত্রায় বেড়ে যাবে, এমন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বাড়তি খরচের কতটা নিজে বহন করবে, কতটা ক্রেতার ওপর চাপাবে এবং বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে কি না, তার ওপর প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি নির্ভর করবে। এরপরও এমন সময়ে নতুন শুল্ক কার্যকর হলো, যখন খাবার, জ্বালানি ও আবাসন ব্যয় নিয়ে আগে থেকেই চাপে রয়েছে বহু মার্কিন পরিবার।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি আমেরিকাজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ হু হু করে বাড়ছে। এর মধ্যেই চলতি গ্রীষ্মকালে ঘর ঠান্ডা রাখার তথা এয়ার কন্ডিশনার (এসি) চালানোর খরচ আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা। মে মাসে দেশটিতে বাৎসরিক মূল্যস্ফীতির হার গত তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসিস্ট্যান্স ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত আমেরিকায় বিদ্যুৎ বিল গড়ে ১০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭৯২ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরের পক্ষ থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার পূর্বাভাস দেওয়ায় এবার এসি ব্যবহারের পরিমাণ অনেক বাড়বে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের দামও, যা মধ্য ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে চরম আর্থিক সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে আমেরিকায় গ্রীষ্মকালে ঘর ঠান্ডা রাখার খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দিন দিন বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই এখন সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করছেন। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, শীতকালে তীব্র ঠাণ্ডায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার বিষয়ে মার্কিন রাজ্যগুলোতে আইনি সুরক্ষা থাকলেও, গ্রীষ্মকালের তীব্র গরমে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়ার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষার অভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১৯টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়াতে গ্রীষ্মকালে লাইন কাটার বিরুদ্ধে আংশিক আইনি সুরক্ষা রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ দিন দিন আরও তীব্র ও ঘন ঘন হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এই দুর্বল নিয়মের কারণে তীব্র গরমে এসি ছাড়া বাস করা অনেকের জন্য জীবন-মৃত্যুর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, গরমে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এই নিয়ম অবিলম্বে পরিবর্তন করা উচিত। চলমান এই অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক মার্কিন তরুণ তাদের স্বাধীনভাবে থাকার স্বপ্ন বাদ দিয়ে খরচ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আবার বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। তীব্র মূল্যস্ফীতির কারণে নাগরিকদের বেতন বা মজুরি এখন আর খরচের সাথে কুলাতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষ এখন দুপুরের খাবার কেনার টাকা বাঁচিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবেন, নাকি তীব্র গরমে এসি ছাড়াই দিন কাটাবেন—এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জানালার পর্দা ব্যবহার করা, ঘরে না থাকলে থার্মোস্ট্যাটের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রাখা, এসির এয়ার ভেন্টগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং দরজা-জানালার ফাঁকফোকর ভালোভাবে বন্ধ রাখা। তবে এই সাধারণ উপায়েও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ বিলের চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে সাধারণ নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।