মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী ছয় মাসে সামরিক জান্তা সরকারের হামলায় ৭০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে অন্তত ৭০২ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে। জাতিসংঘ বলছে, প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে আয়োজিত সাম্প্রতিক নির্বাচন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং অনেকেই একে প্রহসন হিসেবে দেখছেন। এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরে সহিংসতা ও দমন-পীড়ন আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জান্তা বাহিনীর নির্বিচার বিমান হামলা বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব হামলায় ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে, প্রাণহানি ঘটছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সাগাইং অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সামরিক অভিযানে অন্তত ১৯১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত অক্টোবর মাসে সাগাইংয়ের চাউং-উ এলাকায় একটি বিদ্যালয়ের সামনে চলমান এক উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে বিমান হামলা চালানো হয়। এতে চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত হন। একইভাবে ডিসেম্বর মাসে তাবায়িন এলাকায় একটি চা দোকানে ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় চালানো হামলায় প্রাণ হারান আরও ১৯ জন। এছাড়া রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি-এর পক্ষ থেকে জোরপূর্বক সদস্য সংগ্রহের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, মিয়ানমারের মানুষ একদিকে নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণের সংকট আরও গভীর হয়েছে। পাঁচ বছর আগে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চি-কে আটক করে ক্ষমতা দখল করে সামরিক জান্তা। এরপর থেকে দেশটিতে জরুরি আইন জারি, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে দমন অভিযান জোরদার করা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে অভ্যুত্থানের প্রধান সেনা কর্মকর্তা মিন অং হ্লাইং নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। তার সমর্থিতদের নিয়ে গঠিত নতুন সংসদে জান্তা-সমর্থিত দল ইউএসডিপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের চলমান সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: বিবিসি
আমেরিকার ডেস্ক: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মোহনা এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে ৭ বাংলাদেশি জেলে এবং দুটি ইঞ্জিনচালিত মাছ ধরার বোট আটক করে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। সোমবার (১৫ জুন) সকালে এ ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব পাড়া ঘাট থেকে দুটি বোট নিয়ে মাছ ধরতে সমুদ্রে যান জেলেরা। মাছ শিকার শেষে ফেরার পথে অনিচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশ করলে আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলে এবং জেলেদের বোটসহ আটক করে নিয়ে যায়। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী জানান, কোস্ট গার্ডের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর প্রশাসন জেলেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। প্রাথমিকভাবে ৭ জন জেলে আটকের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিজিবি, কোস্ট গার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। শাহপরীরদ্বীপ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান জানান, সীমান্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহপরীরদ্বীপ বিওপি এলাকা থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায়, মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া সংলগ্ন জলসীমায় এ ঘটনা ঘটে। আটক জেলেরা হলেন— ফয়সাল (২৬), জলিল (১৬), আজম (১২), হেলাল (১১), লালয়া (১৯), সৈয়দ আলম (২১) ও ফয়সাল (২২)। তারা সবাই শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা। আটক হওয়া দুটি মাছ ধরার বোটের মালিক স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাজ্জাক। এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকার জেলেদের অভিযোগ, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের সীমান্ত অঞ্চলে মাছ ধরতে গিয়ে তারা প্রায়ই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বাধা, হয়রানি ও আটকের মুখে পড়েন। তারা আটক জেলেদের দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন। ঘটনার পর শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আটক জেলেদের স্বজনরা তাদের দ্রুত মুক্তি ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের দ্বৈত নাগরিকত্বধারী এক শীর্ষস্থানীয় মার্কিন গবেষককে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে চীন। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (১২ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবর নিশ্চিত করেছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম মিন জিন, যিনি মিয়ানমারের রাজনীতি ও সংঘাত বিষয়ক স্বনামধন্য থিঙ্ক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি মিয়ানমার’ (আইএসপি-এম)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসি বার্কলে)-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন পিএইচডি গবেষক। যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের দ্বৈত নাগরিকত্বধারী এক শীর্ষস্থানীয় মার্কিন গবেষককে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে চীন। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (১২ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবর নিশ্চিত করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, মিন জিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতে ‘বাধ্যতামূলক আইনি ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়েছে এবং গুয়াংঝু-তে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলকে এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ জুন মিয়ানমার সীমান্তবর্তী চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহর থেকে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হন মিন জিন। তার গবেষণা সংস্থা ‘আইএসপি-এম’ মূলত ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে কাজ করে আসছে। কৈশোরে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়া মিন জিন দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডে বসবাস করেছেন। সামরিক জান্তা এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিরোধী গোষ্ঠী— উভয় পক্ষের প্রতিই তার কলাম ও গবেষণায় সমান সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চীন একটি আইন শাসিত দেশ এবং সেখানে অবস্থানরত যেকোনো বিদেশিকে অবশ্যই দেশের আইন মেনে চলতে হবে; আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিন জিনের এই গ্রেপ্তার এমন এক সংবেদনশীল সময়ে ঘটল, যখন আগামী ১৫ থেকে ১৯ জুন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান ও প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং-এর চীন সফরের কথা রয়েছে। এছাড়া, গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পর যখন দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ ও কূটনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই ঘটনা নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করল। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা এই গ্রেপ্তারের বিষয়ে অবগত এবং যথাযথ কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে মাদক বা আর্থিক অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন নাগরিক চীনে বন্দি রয়েছেন, যাদের অনেকের আটকাদেশকে ওয়াশিংটন ‘অন্যায়’ বলে দাবি করে আসছে।
মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তদন্তে এক থাই নারীকে আটক করেছে পুলিশ। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বরাতে জানা যায়, ইয়াঙ্গুনে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কর্মরত ওই অজ্ঞাত পরিচয়ের কূটনীতিককে দুই সপ্তাহ আগে সাকুরা রেসিডেন্স অ্যান্ড হোটেল থেকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয় কূটনৈতিক মহলের কয়েকজন ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলটি দূতাবাসের কাছাকাছি অবস্থিত এবং এটি বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি আবাসিক হোটেল। তারা আরও জানান, ঘটনাটিকে সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় থাই নাগরিক এক নারীকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আটক নারীকে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত নিহত মার্কিন কূটনীতিক এবং আটক নারীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গনে দায়িত্ব পালনরত এক মার্কিন কূটনীতিকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দেশটির রাজধানী নয়পিদো ও ইয়াঙ্গনের কূটনৈতিক মহলে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এপিকে নিশ্চিত করেছে যে ইয়াঙ্গনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে কর্মরত ওই কূটনীতিক প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মৃত অবস্থায় পাওয়া যান। তবে নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে এখন পর্যন্ত তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়াঙ্গনের সাকুরা রেসিডেন্স অ্যান্ড হোটেল নামের একটি আবাসিক হোটেল থেকে ওই কূটনীতিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হোটেলটি বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের কাছে বেশ পরিচিত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। ঘটনার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিয়ানমারে কর্মরত কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের তিন সদস্য এপিকে জানিয়েছেন, তদন্তের অংশ হিসেবে একজন থাই নারীকে আটক করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মৃত্যুর ঘটনাটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখছেন না এবং সম্ভাব্য অপরাধমূলক ঘটনার দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আটক নারীর জন্য কনস্যুলার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তবে ওই নারীর পরিচয় বা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও এখন পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। কর্মকর্তারা বলেছেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তদন্ত চলমান থাকায় তারা অতিরিক্ত মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে বিদেশি মিশনগুলোর কার্যক্রমও বাড়তি সতর্কতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে বর্তমান ঘটনায় রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, নাকি এটি ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা হোটেলের নিরাপত্তা ফুটেজ, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করছেন। মার্কিন কূটনীতিকের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ গঠন বা মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করেনি।
আগস্ট ২০১৭-মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আগুন জ্বলছিল। গ্রাম পুড়ছিল, মানুষ পালাচ্ছিল। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। সেই সময় বিশ্ব বিবেক নড়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্ষোভ জানিয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরব হয়েছিল। জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকার প্রধান ঘটনাটিকে বলেছিলেন, “জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ।” নয় বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শরণার্থী শিবিরগুলোতে এখনও বাস করছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের অনেকেই জানেন না কবে ফিরতে পারবেন নিজ দেশে। আদৌ কোনোদিন ফিরতে পারবেন কি না, সেটিও অনিশ্চিত। এরই মধ্যে কমছে খাদ্য সহায়তা, কমছে স্বাস্থ্যসেবা এবং কমছে আন্তর্জাতিক মনোযোগ। একই সঙ্গে বাড়ছে হতাশা। মঙ্গলবার জেনেভায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবার বালোচ সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা তীব্র চাপে রয়েছে। সেই চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর। চলতি বছরের জন্য বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা মিলে ৭১ কোটি ডলারের একটি মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এই লক্ষ্যমাত্রাই গত বছরের তুলনায় কম নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরও প্রয়োজনীয় অর্থের বড় একটি অংশ এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। মানবিক সহায়তা কর্মীরা বলছেন, সংকটের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি এখন চলছে। একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বরং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। রাখাইনে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে লাখো রোহিঙ্গা এমন এক অবস্থায় বাস করছে, যেখানে অতীত হারিয়ে গেছে, বর্তমান অনিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে এরই মধ্যে বেড়ে উঠছে একটি নতুন প্রজন্ম, যাদের জন্মই হয়েছে শরণার্থী হিসেবে। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় পাঁচ লাখ তরুণ-তরুণী কার্যত কর্মহীন অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের জন্য নেই বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ কিংবা স্বীকৃত উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা। একটি পুরো প্রজন্ম দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে বেড়ে উঠছে। জীবনযাত্রার অবস্থাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কয়েক বছর আগে খাদ্য সহায়তা কমে এমন পর্যায়ে নেমে এসেছিল যে একজন শরণার্থীর মাসিক খাদ্য বরাদ্দ দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৮ ডলার। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কিছুটা উন্নতি এলেও অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। চলতি বছরের শুরুতে একটি অগ্নিকাণ্ডে শত শত আশ্রয়কেন্দ্র পুড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষ আবারও গৃহহীন হয়ে পড়ে। আশ্রয়, খাদ্য এবং নিরাপত্তাহীনতার এই পরিস্থিতি থেকে অনেক রোহিঙ্গা বেছে নিচ্ছেন আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ, সমুদ্রযাত্রা। বাংলাদেশের উপকূল থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে তারা যাত্রা করেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডের উদ্দেশে। এই যাত্রার অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করে মানবপাচারকারী চক্র। ভাঙাচোরা নৌকা, অনিশ্চিত গন্তব্য এবং উত্তাল সাগরের মধ্যে শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযাত্রা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল রোহিঙ্গাদের সামুদ্রিক যাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মানুষ সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজন আর ফিরে আসেননি। মৃত বা নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ৯০০ জন। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবার বালোচ বলেন, “আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগর দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাজার হাজার মরিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য একটি চিহ্নহীন গণকবরে পরিণত হয়েছে।” গত এক দশকে এই সামুদ্রিক পথে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ। তবুও যাত্রা থামছে না। কারণ শিবিরে থাকা অনেকের কাছেই অনিশ্চিত সমুদ্র স্থবির জীবনের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। চলতি বছরও সেই চিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রে যাত্রা করেছেন। মার্চের শেষ দিকে টেকনাফ উপকূল থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা আন্দামান সাগরে ডুবে গেলে প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ হন। জীবিত উদ্ধার করা যায় মাত্র কয়েকজনকে। এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় শিকার নারী ও শিশুরা। অনেকেই পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার হন। অনেকে দিনের পর দিন খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ভাসতে থাকেন। অনেকের যাত্রার শেষ গন্তব্য হয়ে ওঠে অচিহ্নিত সমুদ্রতল। অন্যদিকে মিয়ানমারে ফেরার পথ এখনও কার্যত বন্ধ। রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই এবং সম্মানের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার পরিবেশও গড়ে ওঠেনি। জাতিসংঘ বলছে, পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বও শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশ গত নয় বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে ১২ লাখ মানুষের দায়িত্ব বহন করা সহজ কাজ নয়। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে থাকলে সেই দায়ভার বহন করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। নয় বছর আগে যারা আগুন, গুলি এবং মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তারা এখনও অপেক্ষা করছে। তাদের অনেক সন্তান জন্ম নিয়েছে শিবিরে, বড় হচ্ছে শিবিরে। তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বাংলাদেশেরও নয়। তাদের পরিচয় অনিশ্চয়তার মধ্যেই আটকে রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট তাই মানবিক সহায়তার প্রশ্নের পাশাপাশি মানবতারও একটি বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় বিশ্ব এখনও একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়নি, এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ কোথায়?
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেওয়ার সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে বিপুল প্রশংসিত হলেও, প্রায় এক দশক পর এসে এই সংকটটি বাংলাদেশের জন্য এক জটিল মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশই শিশু ও কিশোর। একই সময়ে রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আরও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করায় আগে থেকেই চাপে থাকা শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এখন আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের তীব্র ঘাটতি। ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক দাতাদের মনোযোগ এবং তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনায় (JRP) আগের বছরের তুলনায় বাজেট অনেকটাই কাটছাঁট করা হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে কেবল জীবন রক্ষাকারী মৌলিক সেবাগুলো কোনোমতে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ নেওয়া অসম্ভব। এই তহবিল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তায়; রেশন কমে যাওয়ায় ক্যাম্পের শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর পাশাপাশি অর্থ সংকটে বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ক্যাম্প এলাকায় একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলোর এই চরম অনিশ্চয়তা ও অভাবকে পুঁজি করে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। ক্যাম্পভিত্তিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক চোরাচালানি ও মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এখন শিবিরের নিত্যদিনের ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় শিবিরের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী সহজেই এসব অপরাধী চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে। একদিকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জীবন ও ভবিষ্যতের তাগিদে অনেক রোহিঙ্গা মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বঙ্গোপসাগর বা আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করছে, যা প্রায়শই ট্রাজিক নৌকাডুবি ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের এই বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব কেবল ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্থানীয় শ্রমবাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের কারণ হচ্ছে। এর ওপর পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পগুলোর কারণে ওই অঞ্চলের বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও ভূগর্ভস্থ পানির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গত ৯ বছরেও কার্যত আলোর মুখ দেখেনি। অল্প কিছু রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করা হলেও তা মোট জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ফলে এটি এখন আর কেবল একটি সাময়িক শরণার্থী সমস্যা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মিয়ানমারের ভেতরে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে বিশ্বের বৃহত্তম এই শরণার্থী সংকট আগামীতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক রাজনৈতিক নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং। শুক্রবার দেশটির সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এই নির্বাচনের মাধ্যমে মূলত ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা দখলকারী এই সেনাপ্রধানের কর্তৃত্বই রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও সুসংহত হলো। রাজধানী নেপিডোয় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে ৫৬৬ সদস্যের মধ্যে ৪২৯ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ৬৯ বছর বয়সী মিন অং হ্লাইং। উল্লেখ্য, গত সোমবারই তিনি সেনাপ্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সামরিক-প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী, কোনো চাকুরীরত সরকারি কর্মকর্তা বা সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না—আর সেই আইনি বাধা দূর করতেই তার এই পদত্যাগ। এই নির্বাচনে জান্তা প্রধানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক জেনারেল নিও সও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া কায়িন স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য নান নি নি আয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেয়েছেন। নির্বাচনটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। জান্তা সরকার আয়োজিত গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর মদদপুষ্ট ইউএসডিপি (USDP) দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। পার্লামেন্টের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসনই এখন জান্তা সমর্থিত ও অনির্বাচিত সামরিক প্রতিনিধিদের দখলে। ফলে বিরোধী দল এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি 'প্রহসন' হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চি এবং তার সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনো বন্দি রয়েছেন। সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে (NLD) আগেই বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জান্তা। আগামী সপ্তাহেই নতুন প্রেসিডেন্ট তার মন্ত্রিসভা গঠন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে এবং ১০ এপ্রিলের মধ্যে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করবেন।
মিয়ানমারের রক্তাক্ত ইতিহাসের পাতায় এক নতুন কিন্তু অনুমিত অধ্যায় যুক্ত হলো। ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি যে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছিলেন জেনারেল মিন অং লাইং, পাঁচ বছর পর সেই তিনিই এবার দেশটির 'বেসামরিক' রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। তবে সেনাবাহিনীর উর্দি ছেড়ে রাষ্ট্রপতির স্যুট পরলেও, দেশটির শাসন ব্যবস্থায় সামরিক একনায়কতন্ত্রের সুতীব্র নিয়ন্ত্রণ বিন্দুমাত্র কমছে না। পূর্বনির্ধারিত এক ‘নির্বাচন’ ও ক্ষমতার পালাবদল আজ মিয়ানমারের নবনির্বাচিত সংসদ মিন অং লাইং-কে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বেছে নেবে। যদিও একে নির্বাচন না বলে 'অভিষেক' বলাই শ্রেয়। কারণ, সংসদের ২৫ শতাংশ আসন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত ছিল এবং বাকি আসনগুলোর সিংহভাগ জিতেছে সামরিক মদদপুষ্ট দল ইউএসডিপি। মিন অং লাইং ইতিমধ্যেই সেনাপ্রধানের পদ ছেড়েছেন, আর সেই পদে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও কঠোরপন্থী হিসেবে পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন উ। অভ্যুত্থানের পর এক বছরের মধ্যে গণতন্ত্রে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই জেনারেল। কিন্তু সেই এক বছর পার হতে সময় লাগল পাঁচ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মিয়ানমার পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসস্তূপে। দেশজুড়ে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লক্ষাধিক। জান্তা বাহিনীর ‘পোড়ামাটি’ নীতিতে ধ্বংস হয়েছে স্কুল, হাসপাতাল ও জনপদ। তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট কিয়াও উইনের মতো অসংখ্য মানুষ জেল-জুলুম ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হলেও মিন অং লাইং নিজেকে নিরাপদ রাখতে গঠন করেছেন একটি শক্তিশালী 'পরামর্শদাতা পরিষদ'। এই পরিষদের হাতেই থাকবে সামরিক ও বেসামরিক সব বিষয়ের চূড়ান্ত ক্ষমতা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ক্ষমতার রূপান্তর, কোনো পরিবর্তন নয়। প্রতিরোধ বাহিনীগুলো এখনো দেশের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যার ফলে গৃহযুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। মিয়ানমারের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি আর তীব্র জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ইয়াঙ্গুনের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সবার কণ্ঠেই একই সুর: এই নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। কারাবন্দী নেত্রী অং সান সু চির মুক্তি এবং প্রকৃত সংলাপ ছাড়া মিয়ানমারের শান্তি ফেরানো অসম্ভব বলেই মনে করছেন বোদ্ধারা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা ও তার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, পারামাট্টা নদীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪৭ বছর বয়সী মওলিক ধান্ধুকিয়া এবং তার ছয় বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সিডনির কনকর্ড এলাকার কাছে একটি নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী কন্যা। কিছু সময় পর নদীতে জরুরি পরিস্থিতির খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। আরও পড়ুন...টেক্সাসে স্বামীর গুলিতে স্ত্রী নিহত, পরে পুলিশের গুলিতে স্বামী নিহত; দুই শিশুকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের কিছু আগে মওলিক ধান্ধুকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিশুটির সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুকন্যার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার তদন্তে সহায়তার জন্য আশপাশের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার রাউস হিলের ক্যাসেলব্রুক ক্রেমেটোরিয়ামে বাবা ও মেয়ের যৌথ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। শোকবার্তায় লেখা হয়েছে, “দুই কোমল ও সদয় আত্মা, যারা চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।” তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে কয়েক দফা নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। একবার তার স্ত্রী প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়াও তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। আরও পড়ুন...টেক্সাসে বিস্ফোরণের আগুনে পুড়েও বাড়ি ও নাতি-নাতনিদের বাঁচালেন এক সাহসী দাদা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে জিমে ব্যায়াম করার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাতের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগা শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তার জীবনের অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমআরআই পরীক্ষায় তার মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশে স্নায়ুর ওপর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মওলিক ধান্ধুকিয়া পেশাগত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি সাউথ ইস্টার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্টে অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এই ঘটনার পর পরিবারটির জন্য সহায়তা তহবিলও গঠন করেছেন স্বজন ও পারিবারিক বন্ধুরা। তহবিল সংগ্রহের আহ্বানে বলা হয়েছে, প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়া একসঙ্গে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ▶️ ট্রাম্পের লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের তহবিলের অর্থ শেষকৃত্যের ব্যয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নিকট আত্মীয়দের যাতায়াত ও আবাসন খাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস্টিন ম্যাকডোনাল্ড ঘটনাটিকে “পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। আমরা সব দিক থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং কোনো সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা হবে না।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে শেষকৃত্যের খবর আরও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে। স্বজন ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।