ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে সাম্প্রতিক হামলাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের মধ্যে তথ্যের চরম বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলা সম্পর্কে তার প্রশাসনের ‘অজ্ঞতার’ কথা দাবি করলেও রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পূর্ণ সামরিক ও গোয়েন্দা সমন্বয়ের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলের এই আকস্মিক অভিযানের বিষয়ে ওয়াশিংটন আগে থেকে কিছুই জানত না। ট্রাম্পের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েল এই পদক্ষেপ নিয়েছে, যার সাথে কাতারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে ট্রাম্প একই সাথে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "ইরান যদি পুনরায় কাতারকে লক্ষ্যবস্তু করার মতো ‘বোকামি’ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সহায়তা ছাড়াই সাউথ পার্সে এমন বিধ্বংসী হামলা চালাবে যা তেহরান আগে কখনো দেখেনি।" তিনি স্পষ্ট করেন যে, যদিও তিনি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চান না, তবে কাতারের এলএনজি (LNG) অবকাঠামো রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে পিছুপা হবেন না। পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথও ট্রাম্পের সুরেই কথা বলেছেন। কিন্তু রয়টার্সের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এই কৌশলগত অস্বীকারে তারা মোটেও বিস্মিত নন। ইতিপূর্বেও জ্বালানি ডিপোতে হামলার সময় একইভাবে দায় এড়িয়েছিল মার্কিন প্রশাসন, যা মূলত কূটনৈতিক কৌশলের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত এই সাউথ পার্স ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন। এই অঞ্চলে যেকোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ বিপর্যয় এবং এলএনজি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানির নিহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে চীন এ ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। বেইজিং ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলেও, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেহরানের হামলাকেও সমালোচনা করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান সংঘাতের পর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার পর লারিজানি নিহত হওয়া সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল ইরানি নেতা ছিলেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোতে সবসময় শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করেছি। ইরানি রাষ্ট্রনেতাদের হত্যা এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অগ্রহণযোগ্য।” তিনি আরও বলেন, “চীন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানাচ্ছে।” বেইজিং এই সংঘাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত চীনের বিশেষ দূত ঝাই জুন এই মাসে অঞ্চলটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। লিন জানান, ঝাই বৈঠকে জোর দিয়ে বলেছেন, “অসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা উচিত নয় এবং নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া উচিত নয়।” চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে, বেইজিং ইরান, লেবানন, জর্ডান ও ইরাককে মানবিক সহায়তা প্রদান করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। বেইজিংয়ের এই অনীহার ফলে ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। সংবাদ সংস্থা এপি (Associated Press) এবং বোস্টন হেরাল্ডের তথ্যমতে, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। এই সংকটের সমাধানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনসহ অন্তত সাতটি দেশকে তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বেইজিং এই সামরিক জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উল্টো সব পক্ষকে সামরিক তৎপরতা বন্ধ এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতির ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তা উদ্বেগের। আমরা সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাই।” তবে ট্রাম্পের সামরিক জোট বা যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে চীন কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাথে যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে হোয়াইট হাউস এখন বেশ চাপের মুখে। বিশেষ করে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন, চীন তাদের তেলের ৯০ শতাংশই এই পথ দিয়ে আমদানি করে, তাই এই পথ সচল রাখার দায়িত্ব চীনেরও। এমনকি চীনের সহায়তা না পেলে তিনি আগামী ৩১ মার্চ নির্ধারিত বেইজিং সফর স্থগিত করার হুমকিও দিয়েছিলেন। তাজা খবরে জানা গেছে, ওয়াশিংটন এবং বেইজিং উভয় পক্ষই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় সফরটি পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে একমত হতে পারে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'দ্য এশিয়া গ্রুপ'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট ফেটারলি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যখন সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, তখন কমান্ড-ইন-চীফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফর করা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কঠিন। অন্যদিকে, চীনও হয়তো কিছুটা সময় নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো বুঝতে চাইছে।” উল্লেখ্য, ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন এই সরাসরি সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ থাকায় এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি জ্বালানি সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের মেঘ এখন আছড়ে পড়ছে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক টেবিলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা দুই পরাশক্তির সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন যখন এই বৈঠককে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে, তখন বেইজিংয়ের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে চরম বিরক্তি ও সতর্কবার্তা। ঘটনার সূত্রপাত হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ পাহারা দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের দেওয়া এক আহ্বানকে কেন্দ্র করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীনসহ অন্যান্য দেশকেও এই অভিযানে শরিক হওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু বেইজিং এই প্রস্তাবে সায় না দেওয়ায় খোদ ট্রাম্পই বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। যদিও সোমবার সুর নরম করে তিনি বলেছেন, 'আমি যেতে চাই, কিন্তু দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আটকা পড়েছি। শি-র সঙ্গে আমার সম্পর্ক চমৎকার।' তবে ট্রাম্পের এই 'চমৎকার সম্পর্কের' দাবিকে পাত্তা দিচ্ছেন না চীনা কর্মকর্তারা। বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারার নামে মার্কিন রণতরীর সঙ্গী হওয়াকে চীন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সাফ জানিয়েছেন, বেইজিং সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের এই আহ্বান রীতিমতো উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র 'গ্লোবাল টাইমস' প্রশ্ন তুলেছে, এটি কি দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, নাকি আমেরিকার অসমাপ্ত যুদ্ধের ঝুঁকি অন্যের ঘাড়ে চাপানোর ফন্দি? এমনকি কোনো কোনো প্রভাবশালী চীনা ব্লগার রসিকতা করে বলছেন, ট্রাম্পের উচিত তার জাহাজ পাহারার জন্য ইরানি নৌবাহিনীকেই দাওয়াত দেওয়া। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য নিজের জাহাজ ও কর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলা বা ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক চটানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে তাদের লক্ষ্য কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা; চীনের জ্বালানি তেলের জাহাজ চলাচলে তারা কোনো বাধা দেবে না। সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডিং লং মনে করেন, ট্রাম্প সফর করুন বা না করুন, চীন কোনোভাবেই এই যুদ্ধে জড়াতে রণতরী পাঠাবে না। কারণ এটি হবে মার্কিন নেতৃত্বের কাছে সরাসরি নতিস্বীকার। তবে এই টানাপোড়েন চীনের জন্য উভয়সংকট তৈরি করেছে। বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ায় বেইজিংয়ের ধীরগতির অর্থনীতি চাঙ্গা করার পরিকল্পনা বা তাইওয়ান ইস্যুতে মার্কিন চাপ কমানোর আলোচনা থমকে যেতে পারে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় চীনের অন্তত ৯টি পণ্যবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের বিশেষজ্ঞ ইউন সান মনে করেন, বেইজিং হয়তো পর্দার আড়াল থেকে মধ্যস্থতার চেষ্টা করবে। কারণ প্রণালিটি খুলে দিলে চীনের বাণিজ্য যেমন সচল হবে, তেমনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরকষাকষিতেও সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে ট্রাম্পের জন্যও এই বৈঠক অত্যন্ত জরুরি, কারণ যুদ্ধের ময়দানে সফল চুক্তির কৃতিত্ব নিতে তিনিও এখন মরিয়া।
দক্ষিণ চীন সাগরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীন। দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এবার তাদের বিশাল উভচর রণতরী ‘টাইপ ০৭৫’ থেকে অত্যাধুনিক মনুষ্যবিহীন হেলিকপ্টার বা ড্রোন পরিচালনা শুরু করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বিতর্কিত জলসীমায় চীনের নৌ-অভিযানের সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দিতে পারে। সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি (CCTV)-তে প্রচারিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, চীনের বিশাল যুদ্ধজাহাজ ‘হুবেই’ (টাইপ ০৭৫)-এর ডেকে একটি হালকা ওজনের স্বয়ংচালিত হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্লেষকরা একে ‘এআর-২০০০’ (AR-2000) মডেলের ড্রোন হিসেবে শনাক্ত করেছেন। প্রায় ২ টন ওজনের এই ড্রোনটি ২০২৪ সালের একটি এয়ার শো-তে প্রথম জনসমক্ষে আনা হয়েছিল। কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? ১. বড় জাহাজে ছোট ড্রোনের শক্তি: টাইপ ০৭৫ রণতরীটি প্রায় ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টন ওজনের বিশাল একটি জাহাজ, যা মূলত ৩০টিরও বেশি হেলিকপ্টার এবং কয়েকশ সৈন্য বহন করতে সক্ষম। এর ডেকে এখন মানুষবাহী বড় হেলিকপ্টারের পাশাপাশি এই ড্রোন মোতায়েন করায় জাহাজটির কার্যক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। ছোট আকৃতির হওয়ায় একসাথে অনেকগুলো ড্রোন এখান থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারবে। ২. ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে কার্যকর: অবসরপ্রাপ্ত পিএলএ কর্নেল ইউ গাং-এর মতে, এই ড্রোনগুলো দিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক গোয়েন্দা নজরদারি এবং সরাসরি হামলা চালানো সম্ভব। এতে পাইলটের প্রাণের ঝুঁকি না থাকায় যেকোনো প্রতিকূল আবহাওয়া বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এগুলো বারবার ব্যবহার করা যাবে। ৩. সাবমেরিন ধ্বংসের সক্ষমতা: সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই ড্রোনগুলো টর্পেডো, ক্ষেপণাস্ত্র এবং গভীর সমুদ্রের বোমা (depth charges) বহন করতে সক্ষম। ফলে এটি শুধু আকাশ থেকে নজরদারি নয়, বরং সমুদ্রের নিচে থাকা শত্রু সাবমেরিন ধ্বংস করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বেগ দক্ষিণ চীন সাগরে তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনের সাথে চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে। বিশেষ করে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ডের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ড্রোনের উপস্থিতি ম্যানিলা ও ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষক সং ঝংপিং জানিয়েছেন, মানুষবাহী হেলিকপ্টার অনেক সময় খারাপ আবহাওয়ায় কাজ করতে পারে না, কিন্তু এই ড্রোনগুলো প্রায় সব ধরণের সামুদ্রিক পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা চীন বর্তমানে ‘টাইপ ০৭৬’ নামের আরও একটি নতুন উভচর জাহাজ তৈরি করছে, যা মূলত একটি ‘ড্রোন ক্যারিয়ার’ হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু বড় রণতরী নয়, ভবিষ্যতে ডেস্ট্রয়ার এবং ছোট যুদ্ধজাহাজেও এই ড্রোন মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে বেইজিংয়ের। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরের মতো উত্তপ্ত অঞ্চলে চীনের এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং এই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চলমান লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার একটি বড় কৌশল।
সম্ভাব্য বেইজিং সফরের আগে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে চীনের প্রতি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বেইজিং যদি প্রণালিটি পুনরায় চালু করতে সহায়তা না করে, তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হতে পারে। সোমবার (১৬ মার্চ) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, চীন–মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। তবে ন্যাটো বা চীনের ওপর ট্রাম্পের চাপ প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে লিন জিয়ান বলেন, বর্তমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এর আগে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বেইজিং যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে সহযোগিতা না করে, তাহলে তাঁর সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠক স্থগিত হতে পারে। এমনকি এ অনুরোধ উপেক্ষা করা হলে তা চীনের মিত্র এবং ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ভবিষ্যতের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত চীন সফর করতে পারেন। তবে বেইজিং এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের তারিখ নিশ্চিত করেনি। এদিকে সম্ভাব্য এই সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে প্যারিসে দুই দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য ট্রাম্প–শি বৈঠকে বাণিজ্য ইস্যুই প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে।
তেহরানে মেহরাবাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ব্যবহৃত একটি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে চালানো এই হামলার বিষয়ে আইডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশ করেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ধ্বংস হওয়া বিমানটি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের কাজে ব্যবহার করতেন। আইডিএফ জানায়, ওই বিমানটি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো। তাদের অভিযোগ, এই বিমান ব্যবহার করেই ইরান বিভিন্ন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ পরিচালনা করত। ইসরায়েলের দাবি, বিমানটি ধ্বংস হওয়ার ফলে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রচেষ্টা এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা মনে করছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলাকে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির ব্যবহৃত বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল সরাসরি ইরানের নেতৃত্বের প্রতীকী সক্ষমতাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তবে এ ঘটনার বিষয়ে এখনো ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ হামলার পর তেহরান কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাখছে বিশ্ব।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্যারিসে দুই দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মার্কিন নতুন বাণিজ্য তদন্তের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চীন। সোমবার (১৬ মার্চ) বেইজিং ওয়াশিংটনকে তাদের ‘ভুল বাণিজ্যনীতি’ সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, একতরফা পদক্ষেপের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমেই বিরোধ নিষ্পত্তি করা উচিত। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ এই তদন্তকে ‘রাজনৈতিক ছলনা’ এবং ‘অত্যন্ত একতরফা ও বৈষম্যমূলক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন তদন্তের মূল লক্ষ্যসমূহ ওয়াশিংটন সম্প্রতি দুটি বড় ধরনের বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে, যা চীন-মার্কিন বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে: বাধ্যতামূলক শ্রম ও মানবাধিকার: চীনসহ ৬০টি অর্থনীতির ওপর এই তদন্ত চালানো হচ্ছে। মূলত চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের ওপর জোরপূর্বক শ্রম খাটানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বেইজিং এই অভিযোগকে ‘মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত শিল্প ক্ষমতা: চীনসহ ১৬টি বাণিজ্যিক অংশীদারকে লক্ষ্য করে এই তদন্ত করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, চীনের অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য সফর ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের কিছু ব্যাপক শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল করার পর, এই নতুন তদন্তগুলো ওয়াশিংটনকে নতুন করে শুল্ক আরোপের আইনি সুযোগ করে দিতে পারে। এদিকে, ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা থাকলেও বেইজিং এখনও তা নিশ্চিত করেনি। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে এই শীর্ষ বৈঠকটি পিছিয়েও যেতে পারে। চীনের দাবি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা প্যারিসের বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের উদ্বেগ ও অভিযোগ উত্থাপন করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ‘বাণিজ্য বাধা’ তৈরির চেষ্টা করছে। তারা ওয়াশিংটনকে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার অনুরোধ জানিয়েছে যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব না পড়ে। উভয় দেশের কর্মকর্তাদের এই আলোচনা বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব আর অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই বাণিজ্যিক স্নায়ুযুদ্ধ—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই দুই দেশ ইরানের কৌশলগত অংশীদার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সহযোগিতা চলছে। তবে সামরিক সহায়তার নির্দিষ্ট বিবরণ তিনি প্রকাশ করেননি। একই সাক্ষাৎকারে আরাঘচি অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, দুবাই ও রাস আল-খাইমাহর মতো জনবহুল এলাকা থেকে এসব রকেট হামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যা তিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির সরকার এক বিবৃতিতে আরাঘচির বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করে জানায়, তারা সন্ত্রাসী আগ্রাসনের মুখে আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। একই সঙ্গে আমিরাত কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানায়। হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপাতত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে এমন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে ইতোমধ্যেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। উল্লেখ্য, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আরাঘচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, তাহলে পারস্য উপসাগরজুড়ে জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে। বিশেষ করে যেসব স্থাপনায় মার্কিন কোম্পানির মালিকানা বা অংশীদারত্ব রয়েছে, সেগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের অভিযোগ—ইরানের হামলায় বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এ বিষয়েও তিনি নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যে দাবি করেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন—সে দাবিও আরাঘচি নাকচ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি সুস্থ আছেন এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ড্রোন হামলা শনাক্ত করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাডার প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে চীন। নতুন এই এআই অ্যালগরিদম রাডারকে যেকোনো চলমান লক্ষ্যবস্তুকে বিভিন্ন দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করা, গতিশীল তথ্য সংগ্রহ এবং এমনকি বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া ড্রোন শনাক্ত করতেও সক্ষম করে তুলবে। বুধবার (১১ মার্চ) চীনের শীর্ষ বিমান প্রতিরক্ষা রাডার বিশেষজ্ঞ শু জিন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বার্ষিক রাজনৈতিক অধিবেশন ‘টু সেশনস’-এ শু জিন জানান, পরীক্ষায় দেখা গেছে নতুন এই এআই প্রযুক্তি রাডারের লক্ষ্য শনাক্ত করার ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছে। বিশেষ করে নিচু উচ্চতায় উড়তে থাকা বিপুল সংখ্যক ড্রোন শনাক্ত করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। শু জিন বর্তমানে চীনের বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান 'চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন' (সিইটিসি)-এর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধে দুই পক্ষই বিপুল সংখ্যক স্বল্পমূল্যের আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করছে। একসাথে অনেক ড্রোন যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে বা দায়িত্ব ভাগ করে নেয়, তখন প্রচলিত রাডার ব্যবস্থার ওপর তা বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে বিপুল সংখ্যক ড্রোনকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ায় এআই-চালিত রাডার এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শু জিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আত্মঘাতী ড্রোন আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় চীন তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নিম্ন-উচ্চতার আগাম সতর্কতা রাডার প্রযুক্তিতে এআই অ্যালগরিদমকে চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রণক্ষেত্রে কে বাঁচবে আর কে মরবে—এমন চূড়ান্ত ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনোভাবেই এআই-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে এ বিষয়ে চীনের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সময় অবশ্যই ‘হিউম্যান প্রাইমাসি’ বা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, প্রাণঘাতী কোনো হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ন্ত্রণ সর্বদাই মানুষের হাতে থাকা জরুরি। চীন মনে করে, যুদ্ধের ময়দানে এআই-এর ওপর অতি-নির্ভরশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এআই যদি নিজে থেকেই জীবন ও মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তবে তা যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ এবং অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা এআই-এর ভুল বিশ্লেষণের ফলে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিবৃতিতে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলা হয়, এআই-চালিত অস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন এবং নৈতিকতার বিষয়টি মাথায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এআই-এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতায় আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশই এআই প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। তবে চীন এই প্রথমবারের মতো রণক্ষেত্রে এআই-এর ‘স্বায়ত্তশাসিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিল। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে ‘কিলার রোবট’ বা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক চলছে। চীনের এই সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা সেই বৈশ্বিক উদ্বেগেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) লড়াইয়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেল চীন। দেশটির বিজ্ঞানীরা এমন একটি যুগান্তকারী 'ডাবল-ফোটন' বা দ্বি-ফোটন ডিভাইস তৈরি করেছেন, যা কোয়ান্টাম কণার কার্যক্ষমতার প্রচলিত সব সীমা বা 'এফিসিয়েন্সি সিলিং' ভেঙে দিয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের (SCMP) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উদ্ভাবনটি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক এবং সুপার-ফাস্ট ডেটা প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। প্রথাগত কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে কণার (ফোটন) কার্যক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর বাড়ানো সম্ভব হতো না। চীনা গবেষক দল, বিশেষ করে সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা, একটি ন্যানো-স্কেল 'ফোটন ফ্যাক্টরি' তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট বা কণার মধ্যকার রহস্যময় সংযোগের হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আগে ছিল মাত্র ০.১ শতাংশের নিচে। কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? ১. সুপারফাস্ট কম্পিউটিং: এই প্রযুক্তির ফলে কোয়ান্টাম চিপগুলো বর্তমানের এনভিডিয়া (NVIDIA) জিপিইউ-এর চেয়েও হাজার গুণ দ্রুত কাজ করতে সক্ষম হবে। ২. নিরাপদ যোগাযোগ: কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্টের স্থায়িত্ব বাড়ার ফলে হ্যাকিং-মুক্ত বিশ্বব্যাপী কোয়ান্টাম ইন্টারনেট গড়ার পথ প্রশস্ত হলো। ৩. শিল্পে বিপ্লব: মহাকাশ গবেষণা, বায়ো-মেডিসিন এবং আর্থিক খাতের জটিল হিসাব-নিকাশ এখন কয়েক মুহূর্তেই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। গবেষক দলের প্রধানদের মতে, তারা লিথিয়াম নিওবেট (Lithium Niobate) নামক একটি বিশেষ পাতলা স্তরের ওপর এই মাইক্রোচিপ তৈরি করেছেন। এটি সাধারণ সিলিকন চিপের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। বিজ্ঞানীরা এটিকে 'আর্টিফিশিয়াল অ্যাটম' বা কৃত্রিম পরমাণু কাঠামোর এক অনন্য প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন, যা বিশ্বজুড়ে কোয়ান্টাম রেসে চীনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই সাফল্য শুধুমাত্র গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইতিমধ্যে বাস্তব ডেটা সেন্টারে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা প্রসেসিংয়ের সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি, ওয়াশিংটনের একপাক্ষিক চাপ এবং নিষেধাজ্ঞার নীতি এই অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংকট নিরসনে এবং শান্তি বজায় রাখতে এবার সরাসরি মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে শি জিনপিং প্রশাসন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এক বিবৃতিতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান, তেহরানের ওপর যেকোনো ধরনের নতুন সামরিক বা রাজনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াং ই সতর্ক করেছেন যে, বলপ্রয়োগ বা উস্কানিমূলক পদক্ষেপ কখনোই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না; বরং আন্তর্জাতিক আইন মেনে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হবে। চীনের মূল প্রস্তাব ও অবস্থান: সংলাপের আহ্বান: পরমাণু চুক্তির (JCPOA) কাঠামোতে ফিরে এসে সব পক্ষকে নিয়ে বহুপাক্ষিক আলোচনার দাবি জানিয়েছে চীন। উস্কানি বন্ধের হুঁশিয়ারি: নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে সামরিক মহড়া বা অর্থনৈতিক অবরোধ যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে বেইজিং মনে করে। মধ্যস্থতার ভূমিকা: সৌদি-ইরান সম্পর্কের বরফ গলাতে সফল হওয়া চীন এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেও দূতিয়ালির ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই শক্ত অবস্থান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি রক্ষা নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থেই চীন এই সংঘাত এড়াতে মরিয়া। তবে হোয়াইট হাউস চীনের এই প্রস্তাবকে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এখনো সরাসরি চীনের ওপর বড় ধাক্কা হয়ে না পড়লেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে অনুভব করতে শুরু করেছে বেইজিং। আপাতত চীনের হাতে কয়েক মাসের তেলের মজুত রয়েছে। প্রয়োজন হলে তারা প্রতিবেশী রাশিয়া থেকে জ্বালানি সহায়তাও নিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংঘাত তাদের অর্থনীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে চীনা নীতিনির্ধারকেরা গভীরভাবে ভাবছেন। বেইজিংয়ে এই সপ্তাহে কমিউনিস্ট পার্টির হাজারো প্রতিনিধি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। সেখানে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ধরে চলা আবাসন খাতের সংকট এবং স্থানীয় সরকারের বিপুল ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম চীন সরকারিভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়েছে। যদিও প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। চীন আশা করেছিল রপ্তানি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া যাবে, কিন্তু গত এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য দ্বন্দ্ব সেই পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চল দিয়ে চীনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং বিপুল জ্বালানি সরবরাহ আসে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, চীনের উদ্বেগ তত বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা শুধু ওই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং আফ্রিকার মতো অন্যান্য অঞ্চলের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ কমে গেলে আফ্রিকার অনেক দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত চীনের বৈদেশিক বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ইরানকে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখেন। দুই দেশের সম্পর্ক অবশ্যই দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালে শি জিনপিং তেহরান সফর করার পর সম্পর্ক আরও জোরদার হয়। পরে ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে চীন ইরানে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এর বিনিময়ে ইরান থেকে নিয়মিত তেল সরবরাহ পাওয়ার কথা বলা হয়। তবে বাস্তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের খুব অল্প অংশই কার্যকর হয়েছে। তবুও ইরান থেকে চীনে তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের মোট তেল আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইরান থেকে আসে। অনেক সময় সেই তেল অন্য দেশের নাম ব্যবহার করে বাজারে পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা নজরদারি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও চীনের সহযোগিতা থাকার অভিযোগ পশ্চিমা দেশগুলো করেছে। যদিও বেইজিং এসব অভিযোগ বেশিরভাগই অস্বীকার করেছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চীন ও ইরানের সম্পর্ক আদর্শগত বন্ধুত্বের ওপর নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ এটি মূলত একটি লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধ অনেক সময় চীনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে, কিন্তু এই সম্পর্ককে গভীর বা স্থায়ী মিত্রতা বলা কঠিন। চীন সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সামরিক জোট গঠন বা মিত্র দেশের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার নীতি অনুসরণ করে না। বরং তারা সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে বেইজিং যে উদ্বিগ্ন, তা স্পষ্ট। চীন ইতোমধ্যে হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, কোনো সার্বভৌম দেশের ওপর হামলা এবং সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী। তবুও বাস্তবতা হলো, ভেনেজুয়েলা কিংবা ইরানের মতো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে—এসব দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক থাকলেও তাদের সরাসরি রক্ষা করার মতো সামরিক সক্ষমতা এখনো সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে বেইজিং কেবল পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থেকেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেক এগিয়ে, বিশেষ করে বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতার ক্ষেত্রে। এই পরিস্থিতিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেকে একজন স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, চীন পশ্চিমা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে তারা কূটনৈতিক আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী। এদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে ওমান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে একজন বিশেষ দূত পাঠানোর কথাও জানিয়েছে বেইজিং। সব মিলিয়ে চীন পরিস্থিতি খুব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর সামনে রয়েছে। তাই চীন একদিকে সমালোচনা করলেও সরাসরি ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে কঠোর মন্তব্য থেকে বিরত আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর হলে চীন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ কৌশল—বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে—ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কতটা জনপ্রিয় বা অজনপ্রিয় হচ্ছে, সেটিও চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চীনা বংশোদ্ভূত কানাডীয় অধ্যাপক শুইচিন জিয়াংয়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে পূর্বাভাস দিয়েছেন। ভিডিওটি ২০২৪ সালের মে মাসে ধারণ করা হয়েছিল। জিয়াং বেইজিংয়ে দর্শন ও ইতিহাস পড়ান এবং ইয়েল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার ইউটিউব চ্যানেল ‘প্রেডিকটিভ হিস্ট্রি’-তে তিনি বিভিন্ন বৈশ্বিক ঘটনার বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। চ্যানেলটির অনুসারী সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি। ওই ভিডিওতে তিনি তিনটি পূর্বাভাস দেন—ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফিরবেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করবেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হবে। ভিডিওতে জিয়াং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ইরান আক্রমণকে ঐতিহাসিক সিসিলি অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, দীর্ঘ সরবরাহ পথ এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ যেকোনো সামরিক অভিযানের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে কঠিন করে তুলতে পারে। এরই মধ্যে তার প্রথম দুটি পূর্বাভাস বাস্তবে ঘটেছে বলে দাবি করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী। ফলে অনেকে তাকে ‘চীনের নস্ট্রাডামাস’ বলেও অভিহিত করছেন। জিয়াং সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের সম্ভাব্য দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের সঙ্গে সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তার মতে, ভূরাজনৈতিক চাপ ও জটিল ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সামরিকভাবে প্রাথমিক সাফল্য এলেও তা শেষ পর্যন্ত কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সামরিক বাহিনীকে আরও আধুনিক করার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের জন্য প্রতিরক্ষা বাজেট ৭ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে চীন। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন বৃদ্ধি হলেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় এই হার এখনও বেশি। বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টের বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দেশের যুদ্ধ প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা হবে এবং উন্নত সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। তার উপস্থাপিত কর্মপরিকল্পনা প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব উদ্যোগ চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থ রক্ষায় কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডের দায়িত্বে রয়েছেন। সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি তৈরির কাজ চলছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীন দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেমস চার বলেন, চীনের সামরিক বাজেট সাধারণত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয়। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও জোরদার করেছে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক শীর্ষ জেনারেলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। চীনের শীর্ষ সামরিক সংস্থা সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জাং ইয়োশিয়াকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এর আগে গত বছর আরেক জ্যেষ্ঠ জেনারেল হে ওয়িডংকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাইওয়ানভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইয়েন টি সাং বলেন, দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযান দেখাচ্ছে যে বেইজিং সামরিক ব্যয়ের ওপর আরও কঠোর নজরদারি রাখতে চায়। চীন সরকার আবারও জোর দিয়ে বলেছে যে শাসক দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর পূর্ণ নেতৃত্ব বজায় রাখবে। এদিকে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তাইওয়ান। তাইপের মূলভূমি বিষয়ক কাউন্সিলের মুখপাত্র লিয়াং ইয়েনচেহ বলেন, দুর্বল অর্থনীতি ও কম ভোক্তা ব্যয়ের মধ্যেও চীন সামরিক খাতে বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করছে, যা তাইওয়ানের জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করতে পারে। জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেন, চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনের সামরিক ব্যয় দ্রুতগতিতে বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়ার মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশই ছিল চীনের। যেখানে ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই হার ছিল গড়ে ৩৭ শতাংশ। চীনের ঘোষিত প্রতিরক্ষা বাজেট বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৯১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলারের সমান। অন্যদিকে গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটে স্বাক্ষর করেন।
ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বেইজিং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও চীন নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলেও চীন সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে ইরানকে সামরিকভাবে সহায়তা করার ঝুঁকি নেবে না। বেইজিং থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, এই জলপথ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা পারস্য উপ-সাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। চীনের বিশাল কৌশলগত তেল মজুত দেশটিকে স্বল্পমেয়াদী সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেইজিং এ সময়ে অন্যান্য কূটনৈতিক বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে পারছে। ৩১ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন ইরানকে সামরিক মিত্র হিসেবে নয়, কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কও চীনের সরাসরি সামরিক সহায়তা থেকে বিরত রাখছে। সম্প্রতি চীনের মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে চীন মধ্যস্থতা করেছে। ইরানকে চীন ও মস্কো নেতৃত্বাধীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের পূর্ণ সদস্য করা হয়। চীনের বিশাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে। কেপলার বিশ্লেষকের মতে, চীনের নিজস্ব তেল উৎপাদন দেশীয় চাহিদার মাত্র ৩০% মেটাতে সক্ষম। বাকি প্রয়োজনীয় তেল আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ২০২৫ সালে চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের ৫৭% মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে, যার মধ্যে ১৪ লাখ ব্যারেল এসেছে ইরান থেকে। চীনের কাছে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা সমুদ্রপথে ১১৫ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মজুত চীনের জন্য নিরাপত্তার বড় হাতিয়ার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর চীন কড়া নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, “সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা।” তবে চীনের সীমাবদ্ধতা মূলত তেল নিরাপত্তা ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর অনিচ্ছার কারণে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী থেকে তেলের সরবরাহ রক্ষা চীনের প্রধান স্বার্থ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে যেমন সমর্থন দেখিয়েছিল চীন, ইরানের ক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনা কম। তেলের বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার তেল চীন ও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হবে।
চীন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েল-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে এ আহ্বান জানান বলে মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আলোচনায় ওয়াং ই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যু সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে বেইজিংয়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছিল এবং এতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তবে সামরিক হামলার কারণে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। চীন সংঘাত আরও বিস্তৃত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরোধিতা করে বেইজিং। তাদের মতে, শক্তি প্রয়োগ কখনোই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেয় না; বরং নতুন সংকট তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর প্রভাব ফেলে। চলমান সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানিনির্ভর চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক ফোঁটা তেলও যেতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ‘অবৈধ’ অভিযানের ফলেই গত শনিবার হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ করা হয় বলে দাবি করেছে ইরান। এর পর থেকেই বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে চীন। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে, উত্তেজনা বৃদ্ধি এড়াতে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও বড় প্রভাব পড়া প্রতিরোধ করতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চীন তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। চীন ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা, যার বড় অংশই এই রুট ব্যবহার করে পরিবাহিত হয়।
ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর মৃত্যুর পর বিশ্বরাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। তেহরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেন চীন এই সংকটে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে একটি 'পরিমিত' বা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (SCMP)। চীনা প্রতিক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি: হামলার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে জানিয়েছেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতার ওপর হামলা এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা বেইজিং কখনোই সমর্থন করে না। তবে বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন, চীন নিন্দা জানালেও ইরানের হয়ে সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং বেইজিং বারবার যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে। কেন এই সতর্কতা? বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে কাজ করছে তিনটি প্রধান কারণ: ১. জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা: মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন তার মোট চাহিদার প্রায় ৪৪ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ইরান চীনের বড় জ্বালানি সরবরাহকারী হলেও বেইজিংয়ের বিনিয়োগ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতেও প্রচুর। ইরানের হয়ে লড়তে গিয়ে এই দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা চীনের জন্য অর্থনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে। ২. আমেরিকার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা যে কঠোর সামরিক অবস্থান নিয়েছে, তার মোকাবিলা করার চেয়ে চীন বর্তমানে নিজস্ব অর্থনীতি সামলাতেই বেশি আগ্রহী। ট্রাম্পের 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তনের কৌশলে চীন উদ্বিগ্ন হলেও, সরাসরি আমেরিকার মুখোমুখি হওয়া তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় নেই। ৩. কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা: রেনমিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কুই শৌজুন মনে করেন, ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া চীনের পররাষ্ট্র নীতির পরিপন্থী। বেইজিং বরং জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়ার সাথে মিলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পছন্দ করে। ভবিষ্যৎ শঙ্কা: বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই হামলা যদি একটি প্রথাগত যুদ্ধের রূপ নেয় এবং পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা চীনের টালমাটাল অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। উপসংহার: চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়ে বা নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাই আপাতত 'ধীরে চলো' নীতি গ্রহণ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বেইজিং।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে চীন। একই সঙ্গে তেহরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন জানিয়েছে বেইজিং। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম China Central Television (সিসিটিভি) ও বার্তা সংস্থা Xinhua News Agency–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই টেলিফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি–এর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি ইরান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থান তুলে ধরেন। ওয়াং ই বলেন, চীন–ইরান সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ। ইরানের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় চীন দৃঢ় সমর্থন জানায়। পাশাপাশি ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, উত্তেজনা বাড়তে থাকলে তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তাই সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস