ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের চলমান অভিযান এখনো শেষ হয়নি। তবে তিনি দাবি করেন, এই অভিযানে ইতোমধ্যেই ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ অর্জন করেছে ইসরাইল। একটি মানচিত্র উপস্থাপন করে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব লাল রঙে দেখানো হয়, নেতানিয়াহু বলেন—ইরান একসময় ইসরাইলকে চাপে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। তার ভাষায়, ইসরাইলই বর্তমানে ইরানকে চাপে রেখেছে এবং প্রয়োজনে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিষয়টি তার দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে তিনি নানা গোপন অভিযানের অনুমোদন দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন। তবে তার অভিযোগ, বিশ্ব সেই সতর্কবার্তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। নেতানিয়াহুর দাবি, গত জুনে ইরানের ওপর হামলার মাধ্যমে ইসরাইল এক ধরনের ‘ভয়ভীতি’র বাধা ভেঙে দিয়েছে, যা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এবার সঠিক সময়ে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য তার কাছে পৌঁছেছিল, যা সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এখন ইসলামাবাদে চলমান আলোচনার অন্যতম জটিল ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থান কী—তা এখনও স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক মাইক হান্না এমনই মন্তব্য করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই, মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই পথ দিয়ে যে তেল পরিবহন হয়, তা ওয়াশিংটনের প্রয়োজন নেই। বরং অন্যান্য দেশই এই রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক এবং ইরানের সঙ্গে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করুক। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন। এবার তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এমনকি এই পথ চালু না থাকলে কোনো ধরনের আলোচনা এগোবে না বলেও জানান। এই দুই ধরনের অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান হরমুজ প্রণালিকে তাদের কৌশলগত সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তাই সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় না করে তারা এই প্রভাবশালী হাতিয়ার ছাড়বে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ আলোচনায় এই ইস্যুতে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সূত্র – আল জাজিরা
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বৈঠক শুরুর আগে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থার সংকট থাকলেও তারা আলোচনায় অংশ নিচ্ছে সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল-এর সঙ্গে এক ফোনালাপে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও কূটনৈতিক আচরণে হতাশার কারণে এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তবুও ইরান নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানে থেকে আলোচনায় অংশ নেবে বলে জানান তিনি। এদিকে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও সতর্কতা প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিজেদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়, তাহলে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে। সূত্র: আল জাজিরা
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রায় ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা। সংঘাতের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল বা পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে পরিস্থিতি জটিল হতে থাকলে ইরান তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। তারা সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের বদলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার দিকে নজর দেয়। এই সংকীর্ণ জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এখান দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। ইরানের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়, কারণ তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বুঝতে পারে, এই গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রচলিত যুদ্ধের তুলনায় বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব। ফলে জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলে ওয়াশিংটনকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করা হয়। অবশেষে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় এই প্রণালির নিরাপত্তা ও পুনরায় চালু রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়। যদিও অতীতে ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার, বাস্তবে কখনো পুরোপুরি তা করা হয়নি—এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালেও না। বর্তমানে ইরানের ভেতরে এই প্রণালি ভবিষ্যতে কীভাবে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটির পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাবও দিয়েছে। এমনকি প্রতি তিন ব্যারেল তেলের জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের প্রস্তাবও উঠেছে। যুদ্ধবিরতির পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিজয়ের একটি বর্ণনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, দেশটি বিদেশি চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। Fars News Agency জানিয়েছে, ইরানের পরিকল্পনায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই বিজয়ের চিত্রের আড়ালে বাস্তবতা বেশ জটিল। সংঘাতে ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে, যার ফলে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শান্তি আলোচনার আগে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান দাবি ছিল। এদিকে ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। পরে হোয়াইট হাউস জানায়, এই ধরনের বক্তব্যকে তারা গুরুত্বসহকারে দেখছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ খাতিবজাদেহ বলেন, প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে পরিস্থিতি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান এই প্রণালিতে শুল্ক আরোপ বা নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলকে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখে—তাই এ ধরনের পদক্ষেপকে তারা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি জলপথ নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। সূত্র: BBC Bangla
শাহবাজ শরিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনা শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গর্বের মুহূর্ত। এই তথ্য জানিয়েছে ডন। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি জানান, এই সংকটময় সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে দুই দেশই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে আসতে রাজি হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাকিস্তান অত্যন্ত সতর্কতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে, যা যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছে। এ সময় উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার-এর নেতৃত্বাধীন দলের প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান) আসিম মুনির-এর অবদানও তুলে ধরেন, যিনি উত্তেজনা কমাতে এবং পক্ষগুলোকে আলোচনায় বসাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শাহবাজ শরিফ এই আলোচনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, যদিও আপাতত যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না এবং দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল শনিবার ইসলামাবাদে বৈঠকে বসছে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে সেরেনা হোটেল-এ। এরই মধ্যে ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ-এর নেতৃত্বে দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি।
লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান সামনে এসেছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাৎজ বলেন, লেবাননের সঙ্গে চলমান সংঘাত বন্ধ হবে না এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। তাঁর এই মন্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন একই বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এর আগে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি ‘যত দ্রুত সম্ভব’ লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামরিক অবস্থান নিয়ে সরকারের ভেতরেই বিভক্তির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর চাপের মুখেই নেতানিয়াহু লেবাননের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তুতি, অন্যদিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা—এতে করে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা প্রশমনের বদলে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের টানটান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু সংঘাত থামানোর উদ্যোগ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘প্রস্থান কৌশল’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে সম্ভাব্য ভয়াবহ হামলার ইঙ্গিত দিলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতায় রাজি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে এবার তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে তেহরান। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতায় সরাসরি অংশ না থাকায় কার্যত ‘দর্শক’ হয়ে পড়েছেন। যদিও তিনি শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ইসলামাবাদ-এ। তবে এই আলোচনায় ইসরায়েল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশ কাটিয়ে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে? এদিকে ইরান যুদ্ধের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি-এর ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে তেহরান এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির ফলে সাময়িকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা পেলেও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। উপসাগরীয় দেশগুলোও এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কায় তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করবে, আবার অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় নতুন সমীকরণ খুঁজবে। সব মিলিয়ে বর্তমান যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্রদের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট জয় পায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা লেগেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-এর নেতৃত্বে থাকা সরকারের ওপর। বছরের পর বছর ধরে ইরানকে প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাতে ইসরায়েল তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি বলে বিভিন্ন মহলে মত উঠে এসেছে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা Yair Lapid এই পরিস্থিতিকে দেশের ইতিহাসে এক বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময় ইসরায়েল কার্যত আলোচনার বাইরে ছিল এবং সরকার কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল স্বল্পমেয়াদি একটি সামরিক অভিযান। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই হিসাব ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কিংবা তাদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইসরায়েলের আরেক রাজনৈতিক নেতা Yair Golan এই যুদ্ধবিরতিকে ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সরকার যে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ইরানের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি থামাতে পারেনি, এমনকি তেহরানের সামরিক শক্তিও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং ইরান আক্রমণের মুখেও টিকে থেকে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটেন, যা ইসরায়েলের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, লেবানন সীমান্তে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গভীর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। সব মিলিয়ে, ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ চাপ—এই তিন দিক থেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানে চারটি প্রধান শর্তের রূপরেখা ঘোষণা করেছে ইরান। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি রুশ সংবাদ সংস্থা ‘তাস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরানের এই অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। রাষ্ট্রদূত জানান, গঠনমূলক যেকোনো উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানালেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা নির্ভর করছে এই শর্তগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর। ইরানের ঘোষিত চারটি শর্ত হলো: ১. দেশটিতে সব ধরনের সামরিক আগ্রাসন সম্পূর্ণ এবং চূড়ান্তভাবে বন্ধ করতে হবে। ২. ভবিষ্যতে যেন পুনরায় যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বস্তুনিষ্ঠ গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। ৩. যুদ্ধের ফলে হওয়া সব ধরনের বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৪. সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার ও নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, বর্তমান ইরানি নেতৃত্ব যুদ্ধবিরতির অনুরোধ নিয়ে ওয়াশিংটনের দ্বারস্থ হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত এবং নৌ-চলাচল নিরাপদ হলে যুক্তরাষ্ট্র এই অনুরোধ বিবেচনা করতে পারে। তবে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। দুই পক্ষের এমন অনড় অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান-এর প্রশংসা করেছেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায়। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় পেজেশকিয়ান বলেন, আগ্রাসী ইহুদিবাদী ইসরায়েলের নিন্দা জানানোর ক্ষেত্রে আমার প্রিয় ভাই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের দৃঢ় অবস্থান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তুর্কি ভাষায় শেয়ার করা ওই বার্তায় পেজেশকিয়ান ইরানের প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য এরদোয়ান এবং তুরস্কের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, আক্রমণকারী জায়নবাদী ইসরায়েলের নিন্দা জানানোর ক্ষেত্রে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের অনড় অবস্থান প্রশংসার দাবি রাখে। ভ্রাতৃপ্রতিম তুর্কি জাতি দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম বিশ্বের সাথে সংহতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমরা এই সম্মানজনক পথে চলা অব্যাহত রাখব। ইরান-তুরস্কের এই সংহতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অবস্থাকে আরও প্রভাবিত করতে পারে। উভয় দেশের নেতা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে একাত্মতার বার্তা প্রদান করেছেন।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক শান্তি আলোচনার প্রস্তাবে তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জনসমক্ষে ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখার কথা বলছেন, তবে পর্দার আড়ালে সম্ভাব্য চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক মহলে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে কতটা ‘আপস’ করবেন, সেটিই এখন ইসরায়েলের প্রধান ভয়ের কারণ। ইসরায়েলের মূল দুশ্চিন্তা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে। বর্তমানে তেহরানের হাতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে—সেটি কি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) কাছে যাবে নাকি কোনো তৃতীয় দেশের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। এছাড়া ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা নিয়েও সন্দিহান ইসরায়েল। তাদের আশঙ্কা, ১৫ দফার এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে ইরান পুনরায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ পেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। নিদা ইব্রাহিমের মতে, ইসরায়েল এখন চাইছে যেকোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও কিছু বড় ধরনের আঘাত হানতে। এর মাধ্যমে তারা আলোচনার টেবিলে তেহরানকে আরও দুর্বল অবস্থায় দেখতে চায়। তবে ট্রাম্পের মাসব্যাপী সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কার্যকর হলে ইসরায়েলের সেই সামরিক পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে, বন্ধুর পাঠানো শান্তি প্রস্তাব এখন তেল আবিবের জন্য ‘উভয় সংকট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর হঠাৎ ‘হামলা-বিরতি’ ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি ইরানকে আরও পাঁচ দিন সময় দেওয়ার ঘোষণা দেন, যা বিশ্লেষকদের মতে কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। শুরুর দিকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত না করলে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়, যখন ইরান পাল্টা হুমকি দেয়—মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘পানি অস্ত্র’ বা পানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার হুমকিই ট্রাম্প প্রশাসনকে কিছুটা সতর্ক করে তোলে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল পানির জন্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল সমুদ্রের পানি পরিশোধনাগারের ওপর। এসব স্থাপনায় হামলা হলে শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও জ্বালানি শিল্প বিপর্যস্ত হতে পারে। ইতিহাস বলছে, পানিকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ সংঘাতের আশঙ্কা বহুদিন ধরেই আলোচিত। বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট Ismail Serageldin একসময় সতর্ক করে বলেছিলেন, “এই শতাব্দী তেল নিয়ে যুদ্ধ করলেও পরবর্তী শতাব্দীতে যুদ্ধ হবে পানিকে কেন্দ্র করে।” একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব Boutros Boutros-Ghali-ও। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই আশঙ্কাই যেন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর পানির চাহিদার বড় অংশই মেটানো হয় সমুদ্রের পানি পরিশোধনের মাধ্যমে। ফলে এসব স্থাপনা ধ্বংস হলে তাৎক্ষণিকভাবে পানীয় জলের সংকট তৈরি হবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভেঙে দিতে পারে। চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে পানি শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগও উঠেছে। এতে করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে এবং যুদ্ধের ক্ষেত্র কেবল সামরিক নয়, বরং অবকাঠামোগত ও মানবিক সংকটের দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানের এই কৌশলগত হুমকি ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং তাকে অন্তত সাময়িকভাবে ‘পিছিয়ে’ আসতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলেও দেখছেন, যেখানে সময় নিয়ে নতুন পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ইরানের ‘পানি অস্ত্র’ হুমকি কি সত্যিই ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে, নাকি এটি কেবল বড় কোনো কৌশলগত চালের অংশ? উত্তর যাই হোক, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে, যেখানে পানি এখন সম্ভাব্য ‘নতুন অস্ত্র’ হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চার দেশ—তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তান—প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে বৈঠক করেছে। সৌদি রাজধানী রিয়াদ-এ একটি সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দেশগুলোর সক্ষমতা একীভূত করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্রগুলোর মতে, এ উদ্যোগের লক্ষ্য কোনো সামরিক জোট গঠন নয়; বরং প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতে সমন্বিত সহযোগিতা গড়ে তোলা। তুরস্ক গত বছর থেকেই এ ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে এবং এতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। বৈঠক শেষে হাকান ফিদান বলেন, “অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলো কীভাবে নিজেদের শক্তি একত্র করে সমস্যার সমাধান করতে পারে, তা আমরা পর্যালোচনা করছি।” তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানে নিজেদের উদ্যোগেই এগিয়ে আসা জরুরি, নতুবা বাইরের শক্তি তাদের স্বার্থ অনুযায়ী সমাধান চাপিয়ে দিতে পারে। আলোচনায় ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলার বিষয়ও উঠে আসে। যৌথ বিবৃতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার সমালোচনা করা হলেও, ইসরায়েলের ভূমিকা সীমিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো নির্দিষ্ট ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, পাকিস্তানের কৌশলগত সক্ষমতা, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং মিসরের সামরিক উপস্থিতি—এই চার দেশের সমন্বয় ভবিষ্যতে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানি জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্যই শত্রু পক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করবে। খামেনির দাবি, একই সঙ্গে রোজা রাখা ও ‘সংগ্রাম’ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইরানিরা যে অদম্য মনোবল দেখিয়েছে, তার ফলে প্রতিপক্ষরা এরই মধ্যে দুর্বল হতে শুরু করেছে। আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে খামেনি অভিযোগ করেন, বহিরাগত শত্রুরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি। এছাড়া, প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান সংকট নিরসনে ইরান মধ্যস্থতা করতে এবং সংলাপ সহজতর করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সরাসরি শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে খামেনি বলেন, সমষ্টিগত শক্তি ও জনগণের সংহতিই এই শক্তিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ করে দেবে। তার মতে, ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ সংহতিই আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ ও বাহ্যিক চাপ মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এবং এটিই শেষ পর্যন্ত শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত করবে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ৯ মার্চ এক বিবৃতির মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে মন্ত্রণালয়টি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অভ্যন্তর ও বিদেশে কর্মরত সব কূটনীতিকদের উদ্দেশে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করে বলা হয়, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্য থেকে যারা দায়িত্বশীল তাদের আনুগত্য কর।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতার প্রতি এবং গত ১১ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের বর্বর আগ্রাসনের সময় ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত আক্রমণে শহীদ হওয়া সাহসী সেনানায়ক ও স্বদেশবাসীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনিকে ইসলামি বিপ্লবের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে যোগ্যভাবে নির্বাচিত হওয়ায় তাকে এবং ইরানি জাতিকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, সংবিধানের নীতিমালা অনুযায়ী এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বর্তমান সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসনের মুখোমুখি, তখন বিশেষজ্ঞ পরিষদে জনগণের প্রতিনিধিদের সুস্পষ্ট রায়ে সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচন এবং এই সিদ্ধান্তের প্রতি ইরানি জাতির সমর্থন দেশটির ঐক্য, স্বাধীনতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করবে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দেশ-বিদেশে কর্মরত সব কূটনীতিক ইসলামি বিপ্লবের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করছে এবং ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকার পুনর্নবায়ন করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্বাচনের ঘটনা “বড় ভুল” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি মনে করি মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন করে তারা বড় ভুল করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি এই পদে স্থলাভিষিক্ত হন। ট্রাম্প আগেও তাকে “হালকা ওজনের” ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং বলেন, তার প্রশাসনের নতুন নেতৃত্বের ওপর কোনো আস্থা নেই। নেতৃত্ব নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া এই পদে কেউ দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারবে না। এছাড়া ইরানের তেল সম্পদ জব্দের সম্ভাব্য বিষয়েও তিনি সরাসরি কিছু বলেননি, তবে ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। ট্রাম্প মন্তব্য করেন, “তেল সম্পদ জব্দ করার বিষয়ে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব, তবে আমি এটি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছি না।” ইরানের পক্ষ থেকে এই মন্তব্যকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ইরানের জনগণ এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের এখতিয়ার। ওয়াশিংটনের কোনো হুমকিতে তেহরান তাদের নীতি পরিবর্তন করবে না বলেও তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন চাপের মুখে ফেলবে।
আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন সুপ্রিম লিডারের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে Iran। দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–এর বরাতে জানা গেছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা Fars News Agency জানিয়েছে যে, সুপ্রিম লিডার নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা Assembly of Experts (Iran) বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। সংস্থাটির সদস্য হোসেন মোজাফারি বলেন, ঐশ্বরিক সহায়তা নিয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়ের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ জানানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা Ali Khamenei যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কথিত যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আন্তর্জাতিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে খামেনির ছেলে Mojtaba Khamenei–এর নাম আলোচনায় এসেছে। তবে ইরান কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।
ইরানে কুর্দি যোদ্ধারা হামলা চালালে তা সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন Donald Trump। তিনি বলেছেন, কুর্দিরা যদি ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তিনি তাদের সমর্থন দিতে প্রস্তুত। এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কুর্দিদের এমন পরিকল্পনা “অসাধারণ উদ্যোগ” হতে পারে। তবে সামরিকভাবে তাদের সহযোগিতা দেওয়া হবে কি না—সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু জানাননি। বার্তা সংস্থা Reuters–কে ট্রাম্প বলেন, কুর্দি যোদ্ধারা হামলা চালালে তারা জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই অভিযান পরিচালনা করবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের সম্ভাব্য স্থল হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা দেবে কি না, সে বিষয়টি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয় যে কুর্দি যোদ্ধারা Iran–এর ভেতরে হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান সরকার পরবর্তীতে এ তথ্য অস্বীকার করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ ধরনের বক্তব্য অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে United States ও ইরানের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনও বাড়তে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নানা মত সামনে আসছে। কেউ কেউ মনে করছেন, খামেনি সচেতনভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন যাতে তাঁর মৃত্যু শিয়া সমাজে প্রতিরোধ ও শহিদত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানি–আমেরিকান শিক্ষাবিদ হুশাং আমিরাহমাদি বলেন, খামেনি সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছিলেন। তাঁর মতে, খামেনি এমন অবস্থানে থাকতে চেয়েছিলেন, যাতে মৃত্যুর পর তিনি ইরানের ইতিহাসে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকেন। আমিরাহমাদি আরও বলেন, খামেনি চাইলে অধিক নিরাপদ স্থানে থাকতে পারতেন। তবে তিনি খোলা কমপ্লেক্সে অবস্থান করতেন, যা তাঁর সিদ্ধান্তের অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকের মতে, খামেনির মৃত্যু তাঁকে শহিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বার্তা বহন করতে পারে। অন্যদিকে সাবেক মার্কিন নৌ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক স্কট রিটার ভিন্ন মত দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইরানে হামলার প্রথম দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে শুরু করে। ইউটিউবে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ জর্জ গ্যালাওয়ের সঙ্গে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিটার বলেন, খামেনির মৃত্যুর ঘটনা ইরানের জনগণের মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থন আরও বাড়াতে পারে। তাঁর মতে, যুদ্ধের ফল নির্ধারণে এই সামাজিক ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রিটার আরও বলেন, ট্রাম্প প্রকাশ্যে খামেনিকে নজরদারিতে রাখার কথা বলেছিলেন এবং হত্যার হুমকির বিষয়েও মন্তব্য করেছিলেন। তবে তিনি শিয়া ধর্মীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাব বুঝতে পারেননি বলে মত দেন এই বিশ্লেষক। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিয়া মুসলিম সমাজে তাঁর অবস্থান প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়েছে ভারত। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দিল্লিতে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি শোক বইতে স্বাক্ষর করেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপকে দিল্লির অবস্থানে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার নিন্দা করেনি ভারত এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার জন্য বিরোধী দলের জোরালো দাবির মুখেও নীরবতা বজায় রেখেছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা পশ্চিম এশিয়াকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিক্রম মিসরি ইরানের দূতাবাসে গিয়ে শোক বইতে স্বাক্ষর করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের বিরোধের সমাধানে ভারত সবসময় সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে। এদিকে, ভারতের বিরোধী দলগুলো ইরানের সঙ্গে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে হামলার বিরোধিতা করার দাবি জানিয়েছিল। এক সময় ভারত তার তেলের প্রায় ১৩ শতাংশ ইরান থেকে আমদানি করত এবং দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ছিল। তবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে এসে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর সেই বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র–এর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরান-এর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেবে না। তার মতে, এই অভিযান ইরাক-এ পরিচালিত সামরিক অভিযানের মতো দীর্ঘ সময় চলবে না। সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন-এ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর নির্দেশনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশল বাস্তবায়ন করবে। হেগসেথ জানান, অপারেশন এপিক ফিউরি এক রাতের মধ্যে শেষ হবে না। ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র এবং ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে, তবে কোনো তাড়াহুড়া করে সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ইরানের ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন সেনা মোতায়েন নেই। ভবিষ্যতে এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ না করলেও তাৎক্ষণিক পরিকল্পনার কথা তিনি উল্লেখ করেননি। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ইরানের জনগণ এই পরিস্থিতিকে একটি “অবিশ্বাস্য সুযোগ” হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। ট্রাম্পের আগের মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এখনই তোমাদের সময়”—এই বার্তাটি ইরানের জনগণের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews