রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ আলোচনা শুরু করতে চাইলে চীন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে বেইজিং। শুক্রবার (২৬ জুন) চীনের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট—দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াই একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। এই লক্ষ্যেই সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে চায়। মাহদী আমিন আরও জানান, চীন আশ্বাস দিয়েছে—বাংলাদেশ যখন প্রয়োজন মনে করবে এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেবে, তখন তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। অতীতেও বাংলাদেশের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কিছু উদ্যোগ সফল হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। বৈঠকের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট এখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। পররাষ্ট্র বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির বলেন, অতীতে সরকারের দুর্বলতা ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতার কারণে সংকটটি জটিল আকার ধারণ করেছে। তবে বর্তমান সরকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধানের পথে এগোতে চায়। তিনি আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে বাংলাদেশ নিজ উদ্যোগে আলোচনা শুরু করতে চায় এবং এ ক্ষেত্রে চীনকে পাশে নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার জেরে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ীভাবে সফল হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তায় একটি কার্যকর সমাধান খোঁজার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় নতুন অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে অংশীদারত্ব নবায়ন করে অতিরিক্ত ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, নতুন এই অর্থায়নের মাধ্যমে কক্সবাজারে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য জরুরি সহায়তা, সুরক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন মানবিক সেবা অব্যাহত রাখা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীরও সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, নতুন তহবিলের আওতায় শুধু শরণার্থীরাই নয়, কক্সবাজারের প্রায় ৭০ হাজার স্থানীয় বাসিন্দাও উপকৃত হবেন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতেও এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে। নতুন অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যয় করা হবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে। এর আওতায় শরণার্থী শিবিরগুলোতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি ব্যবহারের ফলে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের প্রয়োজন কমে যায়। এতে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাসের পাশাপাশি বন উজাড়ও কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ধোঁয়াজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমে আসে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ফলে শুধু খাদ্য, আশ্রয় বা জরুরি সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার সুযোগ তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেন।” অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন এই দীর্ঘ মানবিক সংকটের সময়ে সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।” উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবির কক্সবাজারে অবস্থান করছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ২০২৫-২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি) অনুযায়ী, চলতি বছরে শরণার্থীদের জরুরি চাহিদা পূরণে প্রায় ৭১ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত পুরো অর্থের সংস্থান হয়নি। এ অবস্থায় ইউএনএইচসিআর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি ও ধারাবাহিক অর্থায়ন অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অত্যন্ত আগ্রহী বলে জানিয়েছেন জার্মানির ফেডারেল ফরেন অফিসের (এফএফও) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মহাপরিচালক ফ্রাঙ্ক হার্টম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি কঠিন রাজনৈতিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গেছে এবং এর মাধ্যমে দেশটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন সরকার পেয়েছে। জার্মানি এখন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে এবং বিভিন্ন খাতে অংশীদারিত্ব বাড়াতে কাজ করতে চায়। মঙ্গলবার (১৬ জুন) জার্মান দূতাবাসের পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফ্রাঙ্ক হার্টম্যান এবং এফএফওর দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান স্টিফেন কোখ গত ৯ থেকে ১১ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তারা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজের উপস্থিতিতে এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব ড. মু. নজরুল ইসলাম এবং মহাপরিচালক (পশ্চিম ইউরোপ ও ইইউ) মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে উভয় পক্ষই দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় বন্ধন আরও দৃঢ় করতে এবং বাংলাদেশ-ইইউ সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ব্যাপারে তাদের জোরালো আগ্রহের কথা তুলে ধরে। আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষভাবে স্থান পায়। হার্টম্যান বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জার্মানি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সমর্থন বজায় রাখার আহ্বান জানান। জার্মান প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর করা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাট ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানি বাড়াতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমুখী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। হার্টম্যান স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণের আগে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বের ওপর জোর দেন এবং তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ সফরকালে জার্মান কর্মকর্তারা তৈরি পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং টেকসই উন্নয়নমূলক উদ্যোগসমূহ সরাসরি দেখার জন্য কাশিমপুরে ডিবিএল গ্রুপের টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানাও পরিদর্শন করেন।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেওয়ার সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে বিপুল প্রশংসিত হলেও, প্রায় এক দশক পর এসে এই সংকটটি বাংলাদেশের জন্য এক জটিল মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশই শিশু ও কিশোর। একই সময়ে রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আরও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করায় আগে থেকেই চাপে থাকা শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এখন আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের তীব্র ঘাটতি। ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক দাতাদের মনোযোগ এবং তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনায় (JRP) আগের বছরের তুলনায় বাজেট অনেকটাই কাটছাঁট করা হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে কেবল জীবন রক্ষাকারী মৌলিক সেবাগুলো কোনোমতে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ নেওয়া অসম্ভব। এই তহবিল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তায়; রেশন কমে যাওয়ায় ক্যাম্পের শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর পাশাপাশি অর্থ সংকটে বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ক্যাম্প এলাকায় একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলোর এই চরম অনিশ্চয়তা ও অভাবকে পুঁজি করে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। ক্যাম্পভিত্তিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক চোরাচালানি ও মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এখন শিবিরের নিত্যদিনের ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় শিবিরের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী সহজেই এসব অপরাধী চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে। একদিকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জীবন ও ভবিষ্যতের তাগিদে অনেক রোহিঙ্গা মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বঙ্গোপসাগর বা আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করছে, যা প্রায়শই ট্রাজিক নৌকাডুবি ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের এই বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব কেবল ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্থানীয় শ্রমবাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের কারণ হচ্ছে। এর ওপর পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পগুলোর কারণে ওই অঞ্চলের বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও ভূগর্ভস্থ পানির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গত ৯ বছরেও কার্যত আলোর মুখ দেখেনি। অল্প কিছু রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করা হলেও তা মোট জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ফলে এটি এখন আর কেবল একটি সাময়িক শরণার্থী সমস্যা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মিয়ানমারের ভেতরে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা না গেলে বিশ্বের বৃহত্তম এই শরণার্থী সংকট আগামীতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে আড়াই শতাধিক যাত্রীবাহী একটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, গত ৯ এপ্রিল বিকেলে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’। পরে তাঁদের কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ ‘মনসুর আলী’র কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধার ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ও তিনজন রোহিঙ্গা। তাঁদের মধ্যে আটজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া এক রোহিঙ্গা যুবক জানান, তাঁকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কক্সবাজারের কুতুপালং এলাকা থেকে অপহরণ করে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি সমুদ্রে একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়, যেখানে প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা বাংলাদেশি। তিনি দাবি করেন, ট্রলারে নারী ও শিশুসহ অনেক যাত্রী ছিলেন। আন্দামান সাগরের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাচারকারীরা যাত্রীদের সংকীর্ণ কুঠুরিতে গাদাগাদি করে রাখলে শ্বাসরোধে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যু হয়। পরে প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। আরেক উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি জানান, তিনি পানির ট্যাংক আঁকড়ে ধরে দুই দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার পর উদ্ধার হন। এ ঘটনায় কোস্ট গার্ড বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তানজিনা সুলতানা’ নামের ট্রলারটি অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে সন্দেহভাজন মানব পাচারকারী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিনজনকে ভুক্তভোগী হিসেবে আদালতের নির্দেশে পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজ যাত্রীদের সঠিক সংখ্যা ও তাঁদের পরিণতি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্ধার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ায় ঘটনাটি তদন্তে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা ও তার বাবার মৃত্যুকে ঘিরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, পারামাট্টা নদীতে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৪৭ বছর বয়সী মওলিক ধান্ধুকিয়া এবং তার ছয় বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সিডনির কনকর্ড এলাকার কাছে একটি নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী কন্যা। কিছু সময় পর নদীতে জরুরি পরিস্থিতির খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। আরও পড়ুন...টেক্সাসে স্বামীর গুলিতে স্ত্রী নিহত, পরে পুলিশের গুলিতে স্বামী নিহত; দুই শিশুকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের কিছু আগে মওলিক ধান্ধুকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে শিশুটির সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুকন্যার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনার তদন্তে সহায়তার জন্য আশপাশের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার রাউস হিলের ক্যাসেলব্রুক ক্রেমেটোরিয়ামে বাবা ও মেয়ের যৌথ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। শোকবার্তায় লেখা হয়েছে, “দুই কোমল ও সদয় আত্মা, যারা চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।” তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার আগে কয়েক দফা নৌকা ভাড়া করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। একবার তার স্ত্রী প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়াও তার সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। আরও পড়ুন...টেক্সাসে বিস্ফোরণের আগুনে পুড়েও বাড়ি ও নাতি-নাতনিদের বাঁচালেন এক সাহসী দাদা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছিলেন মওলিক ধান্ধুকিয়া। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে জিমে ব্যায়াম করার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাতের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগা শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তার জীবনের অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমআরআই পরীক্ষায় তার মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশে স্নায়ুর ওপর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মওলিক ধান্ধুকিয়া পেশাগত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করতেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি সাউথ ইস্টার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্টে অ্যাপ্লিকেশন সাপোর্ট বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এই ঘটনার পর পরিবারটির জন্য সহায়তা তহবিলও গঠন করেছেন স্বজন ও পারিবারিক বন্ধুরা। তহবিল সংগ্রহের আহ্বানে বলা হয়েছে, প্রীতিবেন ধান্ধুকিয়া একসঙ্গে তার স্বামী ও একমাত্র কন্যাকে হারিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তাকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ▶️ ট্রাম্পের লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের তহবিলের অর্থ শেষকৃত্যের ব্যয়, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নিকট আত্মীয়দের যাতায়াত ও আবাসন খাতে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস্টিন ম্যাকডোনাল্ড ঘটনাটিকে “পরিবার ও সমাজের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। আমরা সব দিক থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি এবং কোনো সম্ভাবনাই উপেক্ষা করা হবে না।” পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে পারিবারিক সহিংসতার কোনো উপাদান ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে শেষকৃত্যের খবর আরও আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে। স্বজন ও পরিচিতজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।