সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ অঞ্চলে প্রতিরক্ষা বাহিনীর গুলি করে নামানো একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে একজন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত ব্যক্তির পরিচয় এখনও নিশ্চিত হয়নি। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি মানববিহীন উড়োজাহন (ড্রোন) সনাক্ত করে তা ভূপাতিত করেছে। তবে ধ্বংসাবশেষ এল-রিফা’আ এলাকার একটি খামারে পড়ে ঘটনাস্থলে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরুরি সেবা দল ও নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর শনিবার (২৮ মার্চ) ভোরে একটি শিল্পাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। খবর এএফপি থেকে পাওয়া গেছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রতিহত করতে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরান হামলা জোরদার করছে। আবুধাবি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর জানায়, খলিফা ইকোনমিক জোনস এলাকায় দুটি অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। এছাড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। তবে তার ধ্বংসাবশেষ ভূপাতিত হয়ে আগুনের সূত্রপাত করেছে।
ইরান থেকে ইসরায়েল-এর দিকে পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, এমন তথ্য দিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। আইডিএফ জানিয়েছে, তারা এই হুমকি প্রতিহত করার জন্য কাজ করছে এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়েছে। এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা রবিবার ইরান থেকে ছোড়া চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৫টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। সামাজিক মাধ্যমে তারা আরও জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোট ৩৪৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৭৭৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তেলবাজারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান মঙ্গলবার আবুধাবিতে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই নেতা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘর্ষের আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমিরাতের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াম জানিয়েছে, বৈঠকে নেতারা এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা অবিলম্বে বন্ধ করার গুরুত্বের উপর জোর দেন এবং কূটনীতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট আল-সিসি ইরানের সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষা করার পদক্ষেপগুলোর প্রতি মিসরের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি যুদ্ধে দেশটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমিরাত ৩৩৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ভূপাতিত করেছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে ভারত। এই সময়ে দেশটি বিশ্বের প্রায় সব প্রভাবশালী জোট ও সংস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। কোয়াডের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে, ব্রিকসের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে এবং আইটুইউটুর মাধ্যমে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, ভারতের কৌশল ছিল জাতীয় স্বার্থে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, তবে কারো সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ না হওয়া। এই ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতিই দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান নির্ধারণ করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা প্রতিবেশী দেশ থেকে শুরু করে পরাশক্তিগুলোকে লক্ষ্য করে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে—প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাস দমন এবং দেশের জন্য তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এই তিন ক্ষেত্রেই নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সরবরাহে। এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লির জন্য পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ইতোমধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এর ফলে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে দুটি ভারতীয় গ্যাসবাহী ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, এখনো ভারতের ২২টি জাহাজ ওই অঞ্চলের জলসীমায় আটকা রয়েছে। এই জাহাজগুলো শুধু মোদির আহ্বানেই মুক্ত হবে না। ভারতের কাছে জব্দ ইরানের তিনটি জাহাজ ফেরত দেওয়া বা তেহরানে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানোর বিনিময়ে জাহাজগুলো মুক্ত করা যেতে পারে। তেহরানের আস্থা অর্জন করতে হলে ভারতের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের নাজুকতা মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কমার কারণে ভারতকে কিছু রাশিয়ান তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে নয়াদিল্লি যদি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ছাড় বজায় থাকবে কি না, তা অনিশ্চিত।
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে, যেখানে জ্বালানি স্থাপনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরান কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে, গত ১৮ মার্চ ইরানের বুশেহর অঞ্চলের উপকূলবর্তী আসালুয়েহ এলাকায় অবস্থিত সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র এবং উত্তরাঞ্চলের বন্দর আনজালিতে নৌবাহিনীর একটি স্থাপনায় হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়, যেখানে ইরান ও কাতার যৌথভাবে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই হামলার পর তেহরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে কাতার সতর্ক করে জানায়, জ্বালানি খাতে আঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কিছু তেল ও গ্যাস স্থাপনার আশপাশে অবস্থানরত মানুষদের এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানায়। এরপর রাতেই বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কাতারের রাস লাফফান শিল্পাঞ্চল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির হাবশান গ্যাসক্ষেত্র ও বাব তেলক্ষেত্র এবং সৌদি আরবের দুটি তেল শোধনাগারের কথা বলা হয়েছে। কাতার জানায়, হামলার ফলে রাস লাফফান এলাকায় আগুন লাগে এবং কিছু অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়, যদিও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের একটি গ্যাসক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, ইরান মূলত মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্য করলেও বাস্তবে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ঘটনার সময় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিভিন্ন আরব ও ইসলামিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে ছিলেন, যেখানে চলমান সংকট ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। হামলার পর কাতার এটিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে এবং দেশে অবস্থানরত ইরানি সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির জেনারেল অথরিটি অব ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স এবার খোলা মাঠে ঈদের জামাত আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতির বাইরে। গালফ নিউজের বরাতে জানা গেছে, এ বছর কোনো ঈদগাহ বা উন্মুক্ত স্থানে জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। পুরো দেশজুড়ে শুধুমাত্র মসজিদের ভেতরেই ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে। সাধারণত আমিরাতে খোলা জায়গায় ঈদের জামাতের আয়োজন হয়ে থাকে এবং বিপুল সংখ্যক মুসল্লি সেখানে অংশ নেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এই আয়োজন সীমিত করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নামাজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাই সবাইকে নিজ নিজ এলাকার মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া দেশের সব মসজিদে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মুসল্লিদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ফুজাইরাহের কাছাকাছি একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার ভোরে এ হামলার কথা নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন (ইউকেএমটিও)। ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত ফুজাইরাহ বন্দর থেকে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করা অবস্থায় ট্যাঙ্কারটি হামলার শিকার হয় বলে জানানো হয়েছে। ইউকেএমটিওর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাহাজটিতে কোনো বিস্ফোরক বস্তু আঘাত হেনেছে। তবে সেটি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র নাকি অন্য কোনো ধরনের অস্ত্র ছিল—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হামলার ফলে জাহাজটির বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি এবং কোনো হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত ফুজাইরাহ সমুদ্রবন্দর সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রপ্তানি এই বন্দর দিয়েই বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত শুরুর পর থেকে বন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
ইরানের ওপর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পর তার জবাবে তেহরান সরাসরি ইসরাইলি ভূখণ্ডে আঘাত হানার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সংঘাতের ১৬তম দিনে রোববার (১৫ মার্চ) সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ব্যাপক হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে। ইরানের হামলার আশঙ্কায় বাহরাইনে সাইরেন বেজে ওঠে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা দিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেয়। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আকাশে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১০টি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। এছাড়া রোববার তারা ৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্তত ৩৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ইরান পুনরায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নৈশকালীন হামলা শুরু করার পর এই ঘটনা ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে পৃথক পোস্টে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস অবস্থিত আল-খারজ এলাকায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। অধিকাংশ ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে, যেখানে বড় বড় তেল শোধনাগার রয়েছে। এছাড়া কিছু ড্রোন রিয়াদ অঞ্চলেও ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নৈশকালীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। দিনের বেলা কয়েক ঘণ্টা শান্ত থাকার পর প্রতি সন্ধ্যায় আবার হামলা চালানোর একটি নির্দিষ্ট ধরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই সহিংসতার প্রভাব সৌদি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার ভোরে বাহরাইনের রাজধানী মানামার আকাশে বিস্ফোরণের আলো দেখা যায়। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের অভিযান শুরুর পর থেকে তারা ১২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এসব হামলায় বাহরাইনে ২ জন এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও ২৪ জন নিহত হয়েছেন। কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ডের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাদান ফাদেল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী পাঁচটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাতে ড্রোন হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সেখানে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির মোকাবিলা করছে। শনিবার তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। দুবাই মিডিয়া অফিস জানায়, মেরিনা ও আল-সুফুহ এলাকায় শোনা শব্দগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফল প্রতিরোধের ফল ছিল। ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি প্রধান বন্দর খালি করার আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিবেশী দেশের অ-মার্কিন বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশটি ২৯৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১ হাজার ৬০০টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত সেখানে ছয়জন নিহত হয়েছেন। সূত্র: আরব নিউজ ও টাইমস অব ইসরাইল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। শনিবার (১৪ মার্চ) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর, আবুধাবির খলিফা বন্দর এবং ফুজাইরাহ বন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে দ্রুত সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব বেসামরিক স্থাপনার ভেতরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ও তাদের গোপন অবস্থান শনাক্ত করা গেছে। এই কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো এখন থেকে ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচিত হবে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এসব স্থানে ভয়াবহ হামলা চালানো হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি কার্যক্রমের পাল্টা জবাব দিতেই ইরান এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরাসরি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা এড়াতে আগাম এই সতর্কতা দেওয়া হলেও, গুরুত্বপূর্ণ এসব বাণিজ্যিক বন্দরে হামলার হুমকি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ক্রিক হারবার এলাকার একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। তবে দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবনের সব বাসিন্দা নিরাপদ আছেন এবং কেউ আহত হননি। দুবাই সরকারের গণসংযোগ দপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানায়, দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ভবনের সব বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনটি কোথা থেকে এসেছে বা কে এটি পরিচালনা করেছে—সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। এদিকে এর আগে বুধবার ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একযোগে প্রায় ১০০টি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের দিকে ছোড়া হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে উত্তেজনা বাড়ার পর এটিকে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই হামলার কারণে হাইফা শহরসহ গ্যালিলি ও গোলান হাইটসের বিস্তীর্ণ এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে যান। আইডিএফ জানিয়েছে, লেবাননের কয়েকটি কৌশলগত স্থান থেকে এসব রকেট নিক্ষেপ করা হয়। যদিও ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক রকেট প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও হামলার তীব্রতায় পুরো অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দুই সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। সোমবার দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালনকালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে সশস্ত্র বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হন। তবে দুর্ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে বা নিহত সেনাদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ‘অযাচিতভাবে’ লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে দেশটি। জাতিসংঘে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত জামাল আল মুশারখ বলেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের অবস্থান আগেও স্পষ্ট ছিল এবং এখনও একই রয়েছে। জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হামলায় অংশ নেবে না এবং এ ধরনের সংঘাতে জড়ানোরও কোনো পরিকল্পনা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার ও শনিবার ইরান সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায়। সৌদি আরবের আল-খার্জে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়, তবে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। শায়বাহ তেলক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে আসা ছয়টি ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির ওপর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। শুক্রবার কাতারে ইরান থেকে ১০টি ড্রোন ছোড়া হয়, যার মধ্যে নয়টি ধ্বংস করা হয়েছে, একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবতরণ করতে সক্ষম হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে ব্যালিস্টিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করেছে। আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে আইআরজিসি নৌবাহিনী ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং মার্কিন উপগ্রহ যোগাযোগ কেন্দ্র, রাডার ও সতর্কতা সিস্টেমে আঘাত করা হয়েছে। এই ঘটনায় কিছু ফ্লাইট স্থগিত ও আংশিকভাবে পুনরায় চালু করা হয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। উত্তেজনাপূর্ণ এই হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও ধীরে ধীরে কিছু রুটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে হয় বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে, যদিও কিছু ফ্লাইট সচল ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলোর হিসাবে দেখা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ওমানের উদ্দেশে ১টি এবং সৌদি আরবের উদ্দেশে ৫টি বিমান ঢাকা ছেড়ে যায়। ১ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৪টি এবং সৌদির উদ্দেশে ১৬টি, ২ মার্চ ওমানে ৫টি ও সৌদির উদ্দেশে ১৩টি বিমান উড্ডয়ন করে। ৩ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৭টি ও সৌদির উদ্দেশে ১৫টি বিমান ঢাকা ছাড়ে। ৪ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৮টি, সৌদির উদ্দেশে ২১টি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশে ৬টি বিমান পরিচালিত হয়। ৫ মার্চ ওমানগামী ১০টি, সৌদি আরবের উদ্দেশে ২২টি এবং আরব আমিরাতের উদ্দেশে ২টি বিমান উড্ডয়ন করে। ৬ মার্চ ওমানের উদ্দেশে ৬টি, সৌদির উদ্দেশে ১৫টি এবং আরব আমিরাতের উদ্দেশে ১৩টি বিমান ঢাকা ছাড়ে। সবশেষ শনিবার (৭ মার্চ) ওমানের উদ্দেশে ৬টি, সৌদির উদ্দেশে ১৮টি এবং আরব আমিরাতের উদ্দেশে ১৭টি বিমান ঢাকা ছেড়েছে বা ছাড়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর অনেক ফ্লাইট বাতিল হলেও এই সময়ের মধ্যে ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী মোট ২১৪টি ফ্লাইট ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও ধীরে ধীরে কিছু রুটে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে। যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী খলাফ আহমদ আল হাবতুর। তিনি অভিযোগ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন এক যুদ্ধে টেনে আনা হয়েছে, যার ঝুঁকি তারা নিজেরা চায়নি। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করল এবং এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকি আদৌ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না। খোলা এক চিঠিতে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে আল হাবতুর প্রশ্ন তোলেন, তাদের অঞ্চলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষমতা তাকে কে দিয়েছে। তিনি জানতে চান, এই সিদ্ধান্ত কি একান্তই ট্রাম্পের, নাকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার সরকারের চাপের ফল। চিঠিতে তিনি বলেন, এই সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। সম্ভাব্য নৈরাজ্য ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার মতে, এই উত্তেজনার প্রথম শিকার হবে অঞ্চলটির দেশগুলো। আল হাবতুর আরও অভিযোগ করেন, ট্রাম্প উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এবং আরব দেশগুলোকে এমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন, যা তারা কখনও চায়নি। তবে তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব সামরিক শক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম। চিঠির শেষাংশে তিনি আবারও প্রশ্ন তোলেন—তাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অনুমতি ট্রাম্পকে কে দিয়েছে। তবে এই চিঠির বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউস কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারও চিঠিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়নি। এদিকে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এই চিঠিকে তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানের রাজধানীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইসরাইলের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক অভাবনীয় প্রতিরক্ষা লড়াইয়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে গত চার দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর আছড়ে পড়া কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ইরান থেকে ধেয়ে আসা মোট ১৭২টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৭৫৫টি ড্রোন মাঝআকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরানি বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল আরব আমিরাতের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো। ইরান থেকে মোট ১৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলেও তার মধ্যে ১৭২টিই নিখুঁতভাবে ধ্বংস করেছে আমিরাতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাকি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে ১৩টি সাগরে পতিত হয়েছে এবং মাত্র একটি আমিরাতের ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে আকাশপথে চালানো হয়েছে বিশাল ড্রোন হামলা। মোট ৮১২টি ইরানি ড্রোনের মধ্যে ৭৫৫টিই আকাশেই ধ্বংস করা হয়। তবে বাকি ড্রোনগুলো কিছু স্থাপনায় আঘাত হানলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনের এই ভয়াবহ হামলায় আমিরাতে ৩ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে আমিরাত সরকার।
যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ‘নির্বিচার ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। দেশগুলো এই হামলাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের এই ‘অযৌক্তিক হামলা’ একাধিক দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এতে যেমন বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সরাসরি পরিপন্থী। সাতটি দেশ জোর দিয়ে জানায়, তেহরানের এই পদক্ষেপগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ সৃষ্টি করেছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের উসকানিমূলক কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরি বলেও তারা উল্লেখ করে। বিবৃতির শেষাংশে দেশগুলো তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে জানায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা এবং যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে তাদের ‘আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার’ রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানি হামলায় সালেহ আহমদ নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। রবিবার (১ মার্চ) দেশটির কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি। স্থানীয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নিহত সালেহ আহমদ ইরানের আজমান প্রদেশে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা গ্রামে। শনিবার সন্ধ্যায় তিনি ইফতার শেষে জরুরি খাদ্য পানীয় সরবরাহের কাজে বের হন। হঠাৎ আকাশে আগুনের মতো উজ্জ্বল একটি বস্তু দেখা দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশ কেঁপে ওঠে। ঘটনার স্থলে গিয়ে দেখা যায়, তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। পরবর্তীতে সিভিল ডিফেন্স ও পুলিশ তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠান। রবিবার সকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। নিহত সালেহ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে কাজ করছিলেন এবং দেশে তার মা, স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। পরিবারে তিনি একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। সালেহ আহমেদের চাচাতো ভাই মাহবুব আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, ভাইয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের মিসাইল হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি এবং একজন নেপালি, জানিয়েছে গালফ নিউজ। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরান থেকে মোট ১৬৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, দুটি ক্রুজ মিসাইল এবং ৫৪১টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের সকাল পর্যন্ত অন্তত ২০টি মিসাইল ছোড়া হয়েছে, যার মধ্যে আটটি সমুদ্রে পড়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুটি ক্রুজ মিসাইল এবং ৩১১টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে, তবে ২১টি ড্রোন বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। ১৬৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইলের মধ্যে ১৫২টি মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে এবং বাকি ১৩টি সমুদ্রে পড়েছে। তাদের দাবি, কোনো মিসাইল সরাসরি আমিরাতে আঘাত হেনেনি। হামলায় মোট তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছে, তবে কতজন তা প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews