নেতাজি সুভাষ ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণময় ব্যক্তিত্ব। দেশের বাইরে গিয়ে বিদেশি শক্তির সাহায্যে সেনাবাহিনী গড়ে তুলে তিনি সরাসরি ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়ণ আন্দোলনে যে সকল মহান ব্যক্তি ইতিহাসে হয়ে আছেন।
নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু প্রথমবার ঢাকায় আসার পর সাধনা ঔষধালয় পরিদর্শন শেষে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষচন্দ্র বসু, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ওআচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। (ছবিতে ডান দিক থেকে)
'নেতাজী।তিন অক্ষরের এই পদবীটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মসনদ কাঁপানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিৎস উইলিয়াম হল থেকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে তিনি হয়েছিলেন চতুর্থ অথচ ইংরেজ প্রশাসনের চাকরি করবেন না বলে নিয়োগপত্র পাওয়ার পরই পদত্যাগ করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। ফিরে আসেন ভারতে।যোগ দেন স্বাধীনতার সংগ্রামে।
বড়ভাই শরৎ চন্দ্র বসুকে চিঠিতে লিখেছিলেন,'বহু কষ্ট এবং আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়েই শুধু একটি জাতিকে আমরা নির্মাণ করতে পারি। ভারত পুনরায় স্বাধীন হইবেই হইবে।এবং স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের খুব বেশি বিলম্বও নাই।
সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল পূর্ব বঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে বুকেও।সেই সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজারবিপ্লবী। অকাতরে বিলিয়েছেন নিজের প্রাণ, বুকের তাজা রক্ত।ভারতবর্ষের সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন সেসব বিপ্লবী। সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম পেয়েছিল এক নবচেতনা।কিন্তু এই লেখার প্রসঙ্গ নেতাজীর আদর্শ বা স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে নয় বরং সুভাষচন্দ্র বসুর ঢাকা সফর নিয়ে।আজ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি রইল শ্রদ্ধা।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ঢাকায় এসেছিলেন একাধিকবার। ঢাকায় প্রথম নেতাজীর আগমন ঘটে ১৯২৪সালে।এর আগের বছর তিনি সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি এবং একই সঙ্গে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সফরে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। তাকে ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠওপরবর্তীতে ফরওয়ার্ড ব্লকের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য আশরাফউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। ১৯২৪সালে সেই সফরে তিনি সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষের আমন্ত্রণে পরিদর্শন করেছিলেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাধনা ঔষধালয়। সাধনা ঔষধালয় পরিদর্শন শেষে সুভাসচন্দ্র বসু লিখেছিলেন, 'আমি ঢাকার সাধনা ঔষধালয় পরিদর্শন করিয়াছি।এবং তাহাদের ঔষধ সুসংরক্ষণ, প্রস্তুত প্রণালীও সৌষ্ঠবযুক্ত, কার্যসম্পাদন- ব্যবস্থা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। সাধনার প্রস্তুত ঔষধাবলীর শাস্ত্রীয়তাও অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণরুপে নিঃসন্দেহ হইয়াছি।অধ্যক্ষ মহাশয়ের জনহৈতিষণার মনোভাবও বিশেষ প্রশংসার যোগ্য।এই প্রতিষ্ঠানের কর্মপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করিলে আয়ুর্বেদকেই সমর্থন করা হইবে।
সত্যাসত্যই আয়ুর্বেদানুসারী বলিয়া সাধনার প্রস্তুত ঔষধাবলীর ব্যবহারের দ্বারা যে কেবল রোগ আরোগ্যের পক্ষে বাঞ্চিত লাভই হইবে তাহা নয়ম পরন্থু ঔষধগুলিরএই প্রকার ফলপ্রসুশক্তি আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসকগনের জনপ্রিয়তাকেও বহুল পরিমাণে বর্ধিত করিবে। ঢাকারএই সর্বপ্রধান ঔষধালয়ের কর্তৃপক্ষ যেরূপ নিস্ঠাওসফলতার সহিত আয়ুর্বেদের সেবা করিতেছেন তাহাতে আমি তাহাদিগকে অভিনন্দিত না করিয়া পারিলাম না।'
শক্তি ঔষধালয়ে সংবর্ধনায় সুভাষচন্দ্র বসু।
দ্বিতীয়বার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ঢাকায় আসেন ১৯২৭সালে ঢাকায় কংগ্রেস সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের ছাত্ররা তাকে হলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। হলের ডাইনিংয়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তখন ঢাকায় ছিল তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। সেই উত্তেজনা নিরসনে সুভাষচন্দ্র বসু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। মুসলিম হলের সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের ছাত্ররাই। সেই সভায় সুভাষচন্দ্র বসুকে অভ্যর্থনা দিয়েছিলেনএএফ এম আবদুল হক,আলী নূর, ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারী সহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা। তারাই মূলত ছিলেন সেই সভার উদ্যোক্তা। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সেই সভার পূর্ণ বক্তব্য কোথাও পাওয়া যায় না। তবে পাওয়া যায় সেই সভা সম্পর্কে হল সংসদের রিপোর্ট।যেখানে লেখা ছিল 'Mr. Bose in a very fine way exhorted us all to sink our infallibility for the good of the country.'
ঢাকায় সুভাষচন্দ্র বসুর তৃতীয়বার আগমন ঘটে ১৯২৮সালের জানুয়ারিতে। তখন নারায়ণগঞ্জ ছিল ঢাকা জেলার একটি মহকুমা। নারায়ণগঞ্জের একটি সমাবেশে যোগ দিতে সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন। আর এর পিছন আরেকটি বড় কারণ ছিল সুভাসচন্দ্র বসুর একান্ত সহযোগী ছিলেন শান্তিময় গঙ্গোপাধ্যায়। শান্তিময় ছিলেন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তামাকপট্টি মহল্লার সন্তান। স্কুলে ছাত্রনেতা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিল তার। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্য হয়েছিলেন। নেতাজীর সিক্রেট সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে পেশোয়ারওকাবুল থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নতুন পর্যায়ে সংগঠিত করেছিলেন শান্তিময় গঙ্গোপাধ্যায়। শান্তিময় গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এক সমাবেশে বক্তব্য ওদিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। সমাবেশের দিনটি ছিল২১ জানুয়ারি।
ঢাকার রাজপথে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু চতুর্থবার ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৩১সালের৭ নভেম্ব।১৯৩১ সালের অক্টোবরে ঢাকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটও কালেক্টর এলজি ডুর্নোকে গুলি করে হত্যা করে সরোজ গুহও রমেণ ভৌমিক নামে দুই বিপ্লবী পালিয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ কোনভাবেই তাদের সন্ধান করে বের করতে পারল না।আর তাই ব্রিটিশ পুলিশের সমস্ত রাগ আর আক্রোশ গিয়ে পড়ল ঢাকাবাসীর ওপর।
বিপ্লবীদের ধরতে প্রথমে যেমন ব্যাপক অভিযান চালাল তেমনি অভিযানের নামে ঢাকাবাসীর উপর চালাল নির্মম নির্যাতন।সেই নির্যাতন থেকে রেহাই পেলেন না আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। সেই নির্যাতন খবর পৌঁছায় সুভাষচন্দ্র বসুর কানেও।এসময় নেতাজী সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি ঢাকায় আসবেন। ইংরেজ প্রশাসন তার আসার খবর জানতে পেরে প্রথমে হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু সেই সতর্কতার টিকিটিও আমলে নিলেন না নেতাজী।তিনি কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে স্টিমারযোগে রওয়ানা দিলেন ৭নভেম্বর।তারা আসার খবরে সারা ঢাকা জেলায় সাড়া পড়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার জনতা জড়ো হলো নারায়ণগঞ্জ স্টিমারঘাটে। সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য হাজারো উৎসাহী জনতা আসেন নারায়ণগঞ্জে। কিন্তু ইংরেজ প্রশাসন নেতাজীর ঢাকা জেলায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। নারায়ণগঞ্জে স্টিমারেই নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু এই খবর জানতে পারেন।এর পরও তিনি স্টিমার থেকে নামেন।এরপর ব্রিটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়।
৮নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা সেদিন শিরোনাম করে 'সুভাষচন্দ্র বসু গ্রেপ্তার,সংবাদের বিবরণে লেখা হয়েছিল,শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসুকে নারাণগঞ্জে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে।এবং একখানা স্টিমারযোগে নেতাজিকে চাঁদপুরে পুলিশ নিয়ে যায়।'
নারায়ণগঞ্জের আজকের যে ঐতিহ্যবাহী 'বোস কেবিন' তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসুর নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকার সেই সফর।১৯২১ সালে নৃপেন চন্দ্র (ভুলুবাবু নামে তিনি ছিলেন পরিচিত)নামের এক লোক নারায়ণগঞ্জ শহরের ধারে ফলপট্টি এলাকায় একটি চালাঘরে গড়ে তুলেছিলেন একটি চায়ের দোকান।এই নৃপেনের মূল বাড়ি নারায়ণগঞ্জে নয় বরং বিক্রমপুরে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু যখন নারায়ণগঞ্জে স্টিমার থেকে নামলেন তাকে ইংরেজ পুলিশ গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। নৃপেণ বসু জানতেন নেতাজীর চা প্রীতির কথা। তিনি দুই কেটলি চা বানিয়ে নিয়ে যান থানায়।সেই চা পান করে দারুণ প্রশংসা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। পরবর্তীতে যতবারই ঢাকায় এসেছিলেন ততবারই নারায়ণগঞ্জে নেমে তিনি ভুলুবাবুর সেই দোকানে গেছেন। সেই দোকান আজ বোস কেবিন'।
সেদিন সুভাষচন্দ্র বসুকে পুলিশ থানায় নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে চাঁদপুরে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু অনড় সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকা পৌঁছাবেনই। চাঁদপুরে কিছু সময় আটকে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।এরপর চাঁদপুর থেকে রাতের ট্রেনে আখাউড়া এবং ভৈরব হয়ে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ঢাকা শহর বলতে তখন আজকের পুরান ঢাকা। ফুলবাড়িয়া স্টেশন ছিল ঢাকার মূল স্টেশন।কিন্তু এর আগেই তেজগাঁও বিমানবন্দরে ফের সুভাসচন্দ্র বসুকে গ্রেপ্তার করে ইংরেজ প্রশাসন।
আনন্দবাজার পত্রিকায়১২ নভেম্বর১৯৩১ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল 'ঢাকা হইতে ৪ মাইল দূরবর্তী তেজগাঁও রেল স্টেশনে অদ্য শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসু গ্রেপ্তার হইয়াছেন।মি. ডুর্নোর উপর আক্রমণের পর ঢাকায় পুলিসী জুলুম সম্পর্কে তদন্তের জন্য গঠিত বেসরকারী তদন্ত কমিটির কাজে যোগদানের জন্য তিনি ঢাকা প্রবেশের চেষ্টা করাতেই তাঁহাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মহাকুমা হাকিম শ্রীযুক্ত সুভাষবাবুকে ফিরিয়া যাইতে বলেন।
কিন্তু তিনি তাহাতে অসম্মত হন। তাঁহাকে তখন শর্তবদ্ধভাবে জামীন দিতে চাওয়া হয়,এবং জেলা ত্যাগ করিয়া পুনরায় মামলার শুনানীর দিন আসিতে বলা হয়। সুভাষবাবু এই শর্তে জামীন লইতে সম্মত হন না,তখন তাঁহাকে মোটর যোগে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠাইয়া দেওয়া হয়।, পরবর্তীতে কোর্টের মাধ্যমে জামিন পেয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে সেই সফরে সুভাষচন্দ্র বসু গিয়েছিলেন বাড়ি বাড়ি।পুলিশি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করেছিলেন তিনি। সেই সফরে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ,এবং জামালপুরে সফর করেছিলেন তিনি।
১৯৩৬সালে ঢাকা পৌরসভার লক্ষ্মীবাজার এবং বাংলাবাজার সড়কের নামকরণ করা হয় সুভাষ বোস অ্যাভিনিউ।
পঞ্চমবার ঢাকায় সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন ১৯৩৯সালে। এটিই ছিল নেতাজীর সর্বশেষ সফর। আগের বছর শেষ দিকে কংগ্রেসের নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়েও মহাত্মা গান্ধীও জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেই ১৯৩৯সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় আসেন সুভাষচন্দ্র বসু। তখন আজকের নারায়ণগঞ্জের টানবাজার পার্কটি ছিল বিশাল ময়দান। এখানেই সংবর্ধনা দেয়া হয় নেতাজীকে। সুসজ্জিত ঘোড়ারগাড়িতে উঠিয়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়েছিল। টমটমের পিছনে ছিল উৎসাহী জনতাও নেতাকর্মীদের শোভাযাত্রা। নারায়ণগঞ্জ মহকুমা সফর শেষে ঢাকা শহরে এসেছিলেন নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু।
সেই সফরে ঢাকার শক্তি ঔষধালয়ও পরিদর্শন করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। শক্তি ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মথুরামোহন চক্রবর্তী মূলত মথুর বাবু নামে পরিচিত ছিলেন। শক্তি ঔষধালয়ে নেতাজীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।
শক্তি ঔষধালয়ে তার সংবর্ধনাও পরিদর্শনের চিত্র পাওয়া যায় প্রখ্যাত সাংবাদিকওবিপ্লবী নির্মল সেনের লেখা আত্মজীবনীতে। সেখানে নির্মল সেন লিখেছিলেন, 'আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন। বইও লিখতেন। হঠাৎ বই লেখার জন্যে তিনি ১৯৩৯সালে ঢাকায় আসেন। আমিও ঢাকায় এলাম। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে।শোনা যাচ্ছিল যুদ্ধ নিয়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে মহাত্মা গান্ধীও জওহরলাল নেহেরুর মতৈক্য হচ্ছে না।এসময় সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েও সভাপতির পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র বসু ঢাকায় আসেন। আমাদের বাসা ছিল তৎকালীন দয়াগঞ্জ রোডে। ১৩নম্বর বাড়িতে আমরা থাকতাম। একদিন দেখলাম সুভাষচন্দ্র বসুর মিছিল যাচ্ছে। তিনি যাচ্ছিলেন শক্তি ঔষধালয় দেখতে। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে তিনি মিছিল করে গেলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান নানা সমালোচনার জবাব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি চুক্তিটিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রেখে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়েছেন। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের চুক্তিটি পড়ার সময় ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য দেশের সম্পাদিত অনুরূপ চুক্তিগুলো পাশে নিয়ে তুলনা করলে এর প্রকৃত গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বোঝা সহজ হবে। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। চুক্তির শর্তে থাকা বাধ্যবাধকতা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যেকোনো চুক্তি নিয়ে মুক্ত আলোচনা হওয়া ভালো। বাংলাদেশ চুক্তিতে ১৩১টি ক্ষেত্রে ‘শ্যাল’ (বাধ্যতামূলক শব্দ) ব্যবহার করলেও ইন্দোনেশিয়া একই ধরণের চুক্তিতে ২৩১টি ক্ষেত্রে ‘শ্যাল’ বলেছে। ফলে এটি কোনো একক ঘটনা নয়। একই দিনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সকালের দিকে ব্রেন্ডান লিঞ্চের সাথে বৈঠক শেষে এই চুক্তি নিয়ে কথা বলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতির মাধ্যমে তৈরি হয়। বর্তমান সরকার এই চুক্তির সূচনাকারী না হলেও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যা চাইলেই ব্যক্তিগত চুক্তির মতো বাতিল করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, সরকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সবসময় দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী প্রমাণিত হয়, তবে তা সংশোধনের সুযোগ খোদ চুক্তির ভেতরেই রয়েছে। চুক্তির ভেতরে এই ‘সেলফ কারেক্টিং এলিমেন্ট’ বা সংশোধন করার বিধান থাকায় এটি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধ করেছে এবং নতুন করে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া হয়নি। শনিবার অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন। সভাটি আয়োজন করে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সভায় জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফট খাতে সরকারের ঋণ ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা ২২ এপ্রিল কমে ১১ হাজার ১০৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান দাবি করেন, মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ‘হাইপাওয়ার মানি’ হিসেবে ঋণ নিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এই দাবি নাকচ করে বলেন, এমন তথ্য সঠিক নয়। তার মতে, দেশের ক্রেডিট রেটিং কমে যাওয়ায় বরোয়িং কস্ট বেড়েছে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বাস্তব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান জানান, গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের কোনো ট্রেজারি বিল বা বন্ড ক্রয় করেনি। তিনি আরও বলেন, ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফটের মাধ্যমে সরকারের ঋণ মার্চে ২৭ হাজার ৬০১ কোটি টাকা থাকলেও তা পরে অর্ধেকেরও বেশি কমে এসেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের ব্যাংক হিসেবে কাজ করে এবং এখানে মূল বিষয় হলো মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, টাকা ছাপানো বা নষ্ট করার মতো কোনো বিষয় নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিশুদের জন্য হামের টিকা বিদেশ থেকে আনা হয়নি বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার সংসদের অধিবেশনে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামে আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটাতে দেশের সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু সেই সময়ের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কয়েক বছর ধরে শিশুদের জন্য হামের টিকা আমদানি করা হয়নি, যা বর্তমান সমস্যার অন্যতম কারণ। তারেক রহমান জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে এবং দ্রুত হামের টিকা সরবরাহ করেছে। এর ফলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হবে। হাম শনাক্তে ব্যবহৃত টেস্ট কিটের কিছু ঘাটতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ সমস্যা সমাধানে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কিট দেশে পৌঁছেছে এবং আরও কিছু কিট বিমানবন্দরের কাস্টমসে রয়েছে, যা দ্রুত ছাড় করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।