ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের চলমান অভিযান এখনো শেষ হয়নি। তবে তিনি দাবি করেন, এই অভিযানে ইতোমধ্যেই ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ অর্জন করেছে ইসরাইল। একটি মানচিত্র উপস্থাপন করে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব লাল রঙে দেখানো হয়, নেতানিয়াহু বলেন—ইরান একসময় ইসরাইলকে চাপে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। তার ভাষায়, ইসরাইলই বর্তমানে ইরানকে চাপে রেখেছে এবং প্রয়োজনে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিষয়টি তার দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে তিনি নানা গোপন অভিযানের অনুমোদন দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন। তবে তার অভিযোগ, বিশ্ব সেই সতর্কবার্তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। নেতানিয়াহুর দাবি, গত জুনে ইরানের ওপর হামলার মাধ্যমে ইসরাইল এক ধরনের ‘ভয়ভীতি’র বাধা ভেঙে দিয়েছে, যা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এবার সঠিক সময়ে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য তার কাছে পৌঁছেছিল, যা সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়েছে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি বিরাজ করলেও ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই সংকল্প ব্যক্ত করেন। নেতানিয়াহু লিখেছেন, "আমার নেতৃত্বে ইসরায়েল ইরানের সন্ত্রাসী শাসন এবং তাদের প্রক্সিদের (সহযোগী গোষ্ঠী) বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।" একই পোস্টে তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের তীব্র সমালোচনা করেন। এরদোয়ানকে ইরানের প্রতি নমনীয় হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করে নেতানিয়াহু বলেন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট ইরানের পক্ষ নিচ্ছেন এবং কুর্দি নাগরিকদের ওপর 'গণহত্যার' জন্য তিনিই দায়ী। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েল যে তাদের আগ্রাসী অবস্থান থেকে সরছে না, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একইসঙ্গে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক তিক্ততা এই বার্তার মাধ্যমে আরও প্রকট হয়ে উঠল।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরান আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করে আসছিলেন। তবে বারাক ওবামা সহ অন্য প্রেসিডেন্টরা এই যুদ্ধ এড়িয়ে চললেও, কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্পই নেতানিয়াহুর সেই বিতর্কিত পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ওবামা প্রশাসনের এই শীর্ষ কূটনীতিক জানান, নেতানিয়াহু ওবামা প্রশাসনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিলেন যাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। কেরির মতে, নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে একটি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা। জন কেরি বলেন, "আমি ও প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তির (JCPOA) বিষয়ে আলোচনা করছিলাম, তখন নেতানিয়াহু পর্দার আড়ালে ক্রমাগত যুদ্ধের কথা বলছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, ইরানকে থামানোর একমাত্র পথ হলো সামরিক হামলা।" কেরি আরও যোগ করেন, নেতানিয়াহু কেবল ওবামাকেই নয়, তার পূর্বসূরিদের কাছেও একই দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক উপদেষ্টাদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে তা মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করত। ফলে ওবামা প্রশাসন সামরিক হামলার বদলে কূটনৈতিক পথকেই বেছে নেয়। তবে চিত্রপট বদলে যায় ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ছিল ওবামা প্রশাসনের ঠিক বিপরীত। কেরি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নেতানিয়াহু তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পান। ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের সাথে সম্পাদিত ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আমলে কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার মতো বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ মূলত নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের প্ররোচনারই প্রতিফলন। জন কেরির এই বক্তব্য বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নেতানিয়াহুর এই "যুদ্ধংদেহী" নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা থেকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও বের হতে পারছে না। কেরির এই স্বীকারোক্তি আবারও প্রমাণ করল যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলি লবিং কতটা প্রভাবশালী।
লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে উদ্যোগ নিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার ঘোষিত লক্ষ্য দুটি—হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু জানান, লেবাননের পক্ষ থেকে বারবার আলোচনার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মন্ত্রিসভাকে দ্রুত সরাসরি সংলাপ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর–এ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে লেবাননে কার্যকর কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে লেবাননের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে বৃহত্তর আলোচনার পথ তৈরি করতে তারা সাময়িক যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির মতো একটি ‘প্রাথমিক ধাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এদিকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে যেতে পারেন, যেখানে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য আলী ফাইয়াদ সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের সরাসরি সংলাপ তাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, বর্তমান সংকটের সমাধানের জন্য প্রথমে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা জরুরি, এরপরই আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। লেবাননের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১,৭০০ জন নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাবিত আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও তা বাস্তবায়ন নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এবার বড় ধরনের নাটকীয় মোড়। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান নিন্দা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি চাপের মুখে অবশেষে নতি স্বীকার করল তেল আবিব। লেবাননের সঙ্গে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ সরাসরি আলোচনায় বসার জন্য নিজের মন্ত্রিসভাকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দীর্ঘদিনের চরম বৈরিতা কাটিয়ে এই দুই প্রতিবেশীর মুখোমুখি বসার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন গুঞ্জন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, লেবাননের পক্ষ থেকে বারবার আলোচনার অনুরোধ আসার প্রেক্ষিতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই আলোচনার প্রধান শর্ত হিসেবে থাকছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ। নেতানিয়াহুর মতে, বৈরুতকে নিরস্ত্রীকরণ করার বিষয়ে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সদিচ্ছাকে ইসরায়েল ইতিবাচকভাবে দেখছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণ এবং দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই আলোচনার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ওয়াশিংটনের চাপ। জানা গেছে, বুধবার এক ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় নেতানিয়াহুকে লেবাননে হামলার তীব্রতা কমিয়ে আনার নির্দেশ দেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতেই ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ। মার্কিন প্রশাসনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, সংঘাত নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল এখন থেকে ‘সহায়ক অংশীদার’ হিসেবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। যদিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের কার্যালয় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই দৌত্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে শান্তির এই বার্তা কতটুকু আলোর মুখ দেখে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের টানটান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু সংঘাত থামানোর উদ্যোগ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘প্রস্থান কৌশল’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে সম্ভাব্য ভয়াবহ হামলার ইঙ্গিত দিলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতায় রাজি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে এবার তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে তেহরান। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতায় সরাসরি অংশ না থাকায় কার্যত ‘দর্শক’ হয়ে পড়েছেন। যদিও তিনি শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ইসলামাবাদ-এ। তবে এই আলোচনায় ইসরায়েল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশ কাটিয়ে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে? এদিকে ইরান যুদ্ধের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি-এর ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে তেহরান এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির ফলে সাময়িকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা পেলেও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। উপসাগরীয় দেশগুলোও এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কায় তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করবে, আবার অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় নতুন সমীকরণ খুঁজবে। সব মিলিয়ে বর্তমান যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্রদের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট জয় পায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা লেগেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-এর নেতৃত্বে থাকা সরকারের ওপর। বছরের পর বছর ধরে ইরানকে প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাতে ইসরায়েল তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি বলে বিভিন্ন মহলে মত উঠে এসেছে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা Yair Lapid এই পরিস্থিতিকে দেশের ইতিহাসে এক বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময় ইসরায়েল কার্যত আলোচনার বাইরে ছিল এবং সরকার কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল স্বল্পমেয়াদি একটি সামরিক অভিযান। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই হিসাব ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কিংবা তাদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইসরায়েলের আরেক রাজনৈতিক নেতা Yair Golan এই যুদ্ধবিরতিকে ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সরকার যে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ইরানের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি থামাতে পারেনি, এমনকি তেহরানের সামরিক শক্তিও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং ইরান আক্রমণের মুখেও টিকে থেকে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটেন, যা ইসরায়েলের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিলেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, লেবানন সীমান্তে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গভীর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। সব মিলিয়ে, ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ চাপ—এই তিন দিক থেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ এক ক্রুকে উদ্ধারের অভিযানে ইসরায়েল সহায়তা করেছে বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সোমবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করেছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু বলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে কথা বলেছেন। শত্রুপক্ষের ভূখণ্ড থেকে নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধারের সাহসী সিদ্ধান্ত এবং সফল অভিযানের জন্য ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে এই অভিযানে ইসরায়েলের সহায়তার জন্য ট্রাম্প কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতরে ও বাইরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সহযোগিতা “নজিরবিহীন” পর্যায়ে পৌঁছেছে। একজন মার্কিন সেনাকে উদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পেরে ইসরায়েল গর্বিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গত শুক্রবার ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। ইরান দাবি করে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। ওই বিমানে থাকা দুই ক্রুর একজনকে দ্রুত উদ্ধার করা হলেও অন্যজন নিখোঁজ ছিলেন। পরে দুই দিনব্যাপী অনুসন্ধান শেষে একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে মার্কিন কমান্ডোরা তাকে উদ্ধার করে। তবে এই উদ্ধার অভিযানে ইসরায়েলের সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না—সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করে সরাসরি ইরান যুদ্ধের সম্মুখ সমরে পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টিভ ব্যানন এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তুলেছেন যে, যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে, তখন ইয়ার কেন মায়ামিতে ছুটি কাটাচ্ছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অবিলম্বে নেতানিয়াহুর ছেলেকে দেশটি থেকে বের করে দিয়ে তার গায়ে যুদ্ধের ইউনিফর্ম পরিয়ে প্রথম সারির যোদ্ধাদের সাথে পাঠানো উচিত। ব্যানন কেবল ইয়ার নেতানিয়াহুকেই নয়, বরং লন্ডনে অবস্থানরত আরবের মিত্র দেশগুলোর রাজপুত্রদেরও একই কায়দায় বিতাড়িত করে নিজ নিজ দেশের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধে পাঠানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। জানা গেছে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দুই ছেলে ইয়ার এবং আবনার কেউই ইসরায়েলের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা সম্পন্ন করেননি, যা নিয়ে খোদ ইসরায়েলের ভেতরেই বর্তমানে বেশ সমালোচনা ও তীব্র বিতর্ক রয়েছে। স্টিভ ব্যানন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অন্যতম প্রভাবশালী উপদেষ্টা ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি বিমান হামলায় এ পর্যন্ত এক হাজার তিনশরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বও রয়েছেন। ইরানের পক্ষ থেকে এর জবাবে ইসরায়েল, জর্ডান এবং ইরাকের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। ব্যাননের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে, অথচ ইসরায়েল সেই অভিযানে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিত্র দেশের নেতার ছেলের বিলাসী জীবন নিয়ে ব্যাননের এই কঠোর অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান এখনো ইসরায়েল-এর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা রাখে। তবে তিনি দাবি করেছেন, এই সক্ষমতা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি নয়। ধারণকৃত এক বার্তায় দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের শক্তিও আগের মতো নেই এবং তারা এখন আর ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে বিবেচিত নয়। তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাত ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে এই পরিস্থিতিতে অঞ্চলের কিছু দেশের সঙ্গে নতুন ধরনের মিত্রতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যদিও সম্ভাব্য এসব মিত্র দেশের নাম প্রকাশ করেননি, তবে শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য একদিকে যেমন ইরানের সামরিক সক্ষমতা স্বীকার করছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে—এমন বার্তা দেওয়ার কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট। সোমবার (৩০ মার্চ) বিলটি দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা পাঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন পায়। ইসরায়েলি দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিলটির পক্ষে ৬২ জন সংসদ সদস্য ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট পড়ে ৪৮টি এবং একজন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। আইনটির পক্ষে ভোট দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও। আইনটি পাস হওয়ায় ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ উন্মুক্ত হলো, যা ইতোমধ্যে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর দখলকৃত 'নিরাপদ অঞ্চল' বা বাফার জোনের পরিধি আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। লেবানন থেকে আন্তঃসীমান্ত হামলা প্রতিহত করার অজুহাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তেল আবিব। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নর্দান কমান্ড থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, "লেবানন সীমান্তে বিদ্যমান নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও প্রসারিত করার নির্দেশ দিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য হলো অনুপ্রবেশের হুমকি চূড়ান্তভাবে রুখে দেওয়া এবং সীমান্ত থেকে অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল হামলার ঝুঁকি কমিয়ে আনা।" সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের লিটানি নদীর দক্ষিণ দিকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লেবাননকে দ্বিখণ্ডিত করা লিটানি নদীর ওপর থাকা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেতুও গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, সেতু ও যাতায়াত পথগুলো ধ্বংস করার ফলে দক্ষিণ লেবাননের হাজার হাজার মানুষ জরুরি জীবন রক্ষাকারী রসদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। নির্বিচার হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ আর বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছে। একই বিবৃতিতে নেতানিয়াহু ইরান ও তার মিত্রদের ওপর 'প্রচণ্ড শক্তি' নিয়ে হামলার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি অভিযানে তেহরানের শাসনে ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কায় আগাম ভোট এড়াতে তৎপর হয়ে উঠেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাজেট পাস নিশ্চিত করতেও জোর দিচ্ছেন তিনি। রাজনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ সত্ত্বেও জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তায় তেমন উন্নতি হয়নি। বরং সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, পার্লামেন্ট নেসেট-এ তাঁর দল লিকুদের আসন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৯ মার্চ প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, লিকুদ পার্টির আসন ৩৪ থেকে কমে ২৮টিতে নেমে আসতে পারে। যদিও দলটি বৃহত্তম হিসেবে থাকতে পারে, তবে জোটগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে তাঁর জোট পেতে পারে মাত্র ৫১টি আসন। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে বাজেট পাস না হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক। এই প্রেক্ষাপটে আগাম নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখতে বিভিন্ন খাতে তহবিল বরাদ্দ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু—এমনটাই জানিয়েছেন তাঁর সরকারের কয়েকজন সদস্য। এর আগে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহুর জোট আগাম নির্বাচনের কথা বিবেচনা করেছিল। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এখন নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাইছেন তিনি। নেতানিয়াহু নিজেও সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন, সরকার তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করবে বলেই তিনি আশা করছেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক মিত্রদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রস্তাবিত বিশাল বাজেট পাসে সহযোগিতা চেয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দ্বৈত প্রভাব ফেলছে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে জনসমর্থন থাকলেও, ভোটের রাজনীতিতে এর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটি-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিদিয়ন রাহাতের মতে, দেশটির ভোটারদের মধ্যে প্রায় সমান বিভাজন রয়েছে। একাংশ ডানপন্থী জোটকে সমর্থন করলেও আরেক অংশ বিরোধীদের পক্ষে রয়েছে। মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা ভোটাররা এখনো নেতানিয়াহুর দিকে ঝুঁকছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এবং অনিশ্চিত ফলাফলের কারণে ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হচ্ছে, যা আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতকে ঘিরে বিশ্বনেতাদের সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেছেন, ইরান শুধু ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। রোববার দক্ষিণ ইসরায়েল-এর ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে নেতানিয়াহু এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। নেতানিয়াহুর ভাষায়, “ইরান পুরো বিশ্বকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, এখন সময় এসেছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নেতাদের এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার। যদিও ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ এই পথে এগোতে শুরু করেছে, তবে আরও শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরান-এর পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। প্রায় এক মাস ধরে চলা এই অভিযানের প্রেক্ষাপটেই নেতানিয়াহুর এই আহ্বান এসেছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আদর্শ মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন যে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছে। নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ইতোমধ্যে বহু বিশ্বনেতা ব্যক্তিগতভাবে এ অভিযানে সমর্থন জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, এটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) ইস্তান্বুলে দেওয়া এক ভাষণে এরদোয়ান দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর উসকানিতে শুরু হওয়া ইরান-কেন্দ্রিক হামলাগুলো এই অঞ্চলের অস্থিরতাকে আরও গভীর করেছে। তিনি ইসরায়েলি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, একটি ‘জায়নবাদী গণহত্যা নেটওয়ার্ক’ গাজায় ত্রাণ সহায়তা বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দস্যুপনা চালাচ্ছে। বর্তমানের এই কঠিন সময়ে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি জোর দেন। এরদোয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইরান যুদ্ধের দোহাই দিয়ে ইসরায়েল মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদ ইবাদতের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম তীরসহ অন্যান্য অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েল তাদের অবৈধ বসতি স্থাপন এবং সম্প্রসারণবাদী নীতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। লেবাননের পরিস্থিতি উল্লেখ করে তুর্কি প্রেসিডেন্ট জানান, গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্বজুড়ে চলমান রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণসহ নানা সংঘাতের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল তাদের আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শোক ও কষ্টের মধ্যে থাকা মুসলিম উম্মাহ, বিশেষ করে গাজাবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন এরদোয়ান। তিনি বিশ্বাস করেন, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব খুব শীঘ্রই এই কঠিন সময় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে ইসলামি বিশ্ব এক সংকটময় পথ অতিক্রম করছে, যা বিভিন্ন বাধা, ষড়যন্ত্র এবং ফাঁদে পরিপূর্ণ। এরদোয়ান আশ্বস্ত করেছেন যে, তুরস্ক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং সংলাপ ও কূটনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে তাদের ‘সর্বোত্তম সামর্থ্য’ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ে এরদোয়ান একটি ইতিবাচক খবর দিয়ে জানান, তুরস্কের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ঈদ উপলক্ষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সাময়িক শান্তি যেন স্থায়ী রূপ নেয়। তিনি দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে রক্তক্ষয় বন্ধ হওয়া এবং সাধারণ মানুষের শান্তিতে ঈদ পালন করতে পারার বিষয়টিকে স্বাগত জানান। তুরস্কের এই কূটনৈতিক সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন। এরদোয়ানের এই বক্তব্য বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাবশালী অবস্থানকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক বিমান হামলার ফলে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কার্যত হারিয়েছে। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইসরাইল এখন বিজয়ের পথে, আর ইরানের সামরিক কাঠামো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট অবকাঠামোও ধ্বংসের পথে। তিনি আরও জানান, ইরানের অস্ত্র উৎপাদন কারখানা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। তবে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়েছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি। এর আগে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত না রাখার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু এই বক্তব্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর জবাবে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনেও বাধা সৃষ্টি করছে তারা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাত এখন পর্যন্ত মূলত আকাশপথেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন সম্ভাব্য স্থল অভিযানের। যদিও তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সম্ভাবনা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের জনগণই ঠিক করবে কখন এবং কীভাবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে জড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব, বাইরের কারও প্রভাব নয়। সূত্র: রয়টার্স
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাতের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে রিউমার স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোজতবা খামেনি এমন কোনো পোস্ট করেননি এবং খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত পোস্টটি মোজতবা খামেনির নামে খোলা একটি ‘প্যারোডি’ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়েছে। অ্যাকাউন্টটির ইউজারনেম ‘MrKhameneiSpoof’, যেখানে ‘Spoof’ শব্দটি দিয়ে এটি যে একটি ব্যঙ্গাত্মক বা অনুকরণধর্মী অ্যাকাউন্ট, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া অ্যাকাউন্টের বায়োতে এটিকে ‘কমেন্ট্রি অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সম্প্রতি এর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। মোজতবা খামেনির প্রকৃত অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে এমন কোনো বার্তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও নেতানিয়াহুর মৃত্যু সংক্রান্ত কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি। মূলত একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মিথ্যা তথ্যটি প্রচার করা হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল একটি খবর—ইরানের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে সব জল্পনা আর গুজবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে এবার সশরীরে ক্যামেরার সামনে হাজির হলেন তিনি। হাতে কফির কাপ নিয়ে অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন, তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। সম্প্রতি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বিদ্রূপের সুরে বলেন, "আমি কফির জন্য মরতেও রাজি, আবার দেশের জন্যও মরতে রাজি।" গত শুক্রবার নেতানিয়াহুর একটি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। নেটিজেনদের একাংশ দাবি করেন, ভিডিওটির একটি বিশেষ মুহূর্তে নেতানিয়াহুর ডান হাতে ছয়টি আঙুল দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে যে, আসল নেতানিয়াহু আর বেঁচে নেই এবং এই ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। রবিবার সকালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও এবার খোদ নেতানিয়াহু নিজেই মুখ খুললেন। নতুন ভিডিও বার্তায় তিনি কেবল কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং ক্যামেরার সামনে নিজের দুই হাত নাড়িয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে গত ভিডিওটি নিয়ে ওঠা জল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও তাঁর এমন নাটকীয় উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বইছে উত্তপ্ত হাওয়া। এবার সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে খুঁজে বের করে হত্যার কঠোর শপথ নিয়েছে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে আসা এমন সরাসরি হুমকিতে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহুকে তারা তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেছে। বিবৃতিতে আইআরজিসি’র পক্ষ থেকে বলা হয়, "এই শিশু-হত্যাকারী অপরাধী যদি জীবিত থাকে, তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তাকে খুঁজে বের করে নির্মূল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো।" বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্য করে ইরানের এই হুঁশিয়ারি যুদ্ধের সংজ্ঞাকে আরও জটিল করে তুলবে। আল জাজিরার বরাতে জানা গেছে, গাজা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে তেহরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নেওয়া এই ‘প্রতিশোধের শপথ’ আদতে ইসরায়েলের অস্তিত্বের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তিনি বলেন, ইরান আর একই ইরান নেই। নেতানিয়াহু আরও জানান, বর্তমানে তাদের মূল লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি থেকে বাধা দেওয়া। তিনি বলেন, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের নিয়ন্ত্রণে মোজতবা খামেনি কার্যত তাদের ‘পুতুল’ হিসেবে কাজ করছেন। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু মোজতবা খামেনি ও হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমরা তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে মন্তব্য করতে পারি না। মোজতবা খামেনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইরানের সরকার পতনের প্রক্রিয়া সৃষ্টির সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে রয়েছে, তবে চূড়ান্ত পরিবর্তন ঘটাতে সাধারণ জনগণকে রাস্তায় নেমে আসতে হবে। এই অবস্থায় নেতানিয়াহুর মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। সূত্র: আলজাজিরা
দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ কতদিন চলবে তা তিনি এখনও নির্ধারণ করতে পারছেন না। বুধবার তিনি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং বৈঠকে এই তথ্য জানিয়েছেন। নেতানিয়াহু বৈঠকে বলেন, এখনো অনেক লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। আমাদের গতিশীলতা অসাধারণ এবং আমরা সময়ের চেয়ে এগিয়ে আছি। তবে যুদ্ধ কতদিন চলবে সেটি আমি আপনাদের বলতে পারব না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, আজ রাতের মধ্যে ইসরায়েলজুড়ে বিস্তৃত ও বড় হামলার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ বিপুল রকেট নিক্ষেপ করতে পারে। ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে একসঙ্গে প্রায় ১০০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে হিজবুল্লাহ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সামরিক মোকাবিলা দীর্ঘায়িত হতে পারে। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews