ড. মাহরুফ চৌধুরী | ২৫ মার্চ ২০২৬ । যুক্তরাজ্য
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রেঅভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এই অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮)‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনিদেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।
এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়।স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরোনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গেজার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অপরকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি।
সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তাপুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে।
এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কারপ্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তাঁর ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবেযেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। Email: mahruf@ymail.com
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
ড. মাহরুফ চৌধুরী | ২৫ মার্চ ২০২৬ । যুক্তরাজ্য ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রেঅভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এই অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮)‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনিদেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়।স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরোনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গেজার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অপরকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তাপুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কারপ্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তাঁর ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবেযেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। * লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। Email: mahruf@ymail.com
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতি এবং ধর্মান্ধতা কোনোভাবেই একুশের মূল আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা আমাদের বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেখানে ধর্ম কিংবা জাতিগত বিভেদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধীসহ সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার হরণ করেন, তারা আসলে একুশের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। এই ধরনের বৈষম্যমূলক মানসিকতাকে আধুনিক বাংলাদেশে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে। টিআইবি প্রধান এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যেখানে একুশের মূলমন্ত্র অর্থাৎ সাম্য, সামাজিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। তার মতে, একুশের প্রকৃত চেতনা ধারণ করতে হলে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাই হবে ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্মান। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক গণভোট নিয়ে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আব্দুন নূর তুষারের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। তুষার দাবি করেছিলেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটের সংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪১ লাখের এক বিশাল ফারাক রয়েছে। তবে এই তথ্যকে পুরোপুরি ‘ভুয়া’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) প্রেস উইংয়ের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই বিভ্রান্তি নিরসন করা হয়। ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার রাতে, যখন আব্দুন নূর তুষার তাঁর ব্যক্তিগত প্রোফাইলে দাবি করেন— গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ মিলিয়ে মোট ৩ কোটি ২৫ লাখ ভোট পড়েছে, অথচ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাকি চার কোটি ৪১ লাখ ভোট কোথায় গেল?” তাঁর এই পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং জনমনে সন্দেহের দানা বাঁধে। তবে প্রেস উইং সরাসরি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, গণভোটে প্রকৃতপক্ষে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি ভোট কাস্ট হয়েছে। এর মধ্যে ভোট প্রদানের পদ্ধতিগত ভুলের কারণে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আব্দুন নূর তুষারের দেওয়া পরিসংখ্যানটি সম্পূর্ণ ভুল এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি অপচেষ্টা মাত্র। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এ ধরণের স্পর্শকাতর বিষয়ে সঠিক তথ্য যাচাই না করে কোনো কিছু শেয়ার না করার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং গুজব রুখতেই প্রেস উইং এই তাৎক্ষণিক ব্যাখা প্রদান করে।