নব্বইয়ের দশকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মাত্র কয়েকটি টেবিল নিয়ে যে বাংলা বইমেলার সূচনা হয়েছিল, তা আজ প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৫ বছরের এই দীর্ঘ পথচলা কেবল বই বিক্রির ইতিহাস নয়, বরং প্রবাসের মাটিতে বাঙালির ভাষা ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক অনন্য সংগ্রাম। চলুন জেনে নিই এই ঐতিহাসিক যাত্রার পেছনের অজানা গল্প। প্রবাসের মাটিতে বাঙালির অস্তিত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতির এক গভীর ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা। সুদীর্ঘ ৩৫ বছরের এই পথচলা নিছক কোনো বার্ষিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভিন্ন এক বাস্তবতায় যেখানে ভাষা ও পরিচয়ের সংকট প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, সেখানে এই মেলা প্রবাসীদের আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের এক সৃজনশীল প্রয়াস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আয়োজনের পরতে পরতে মিশে আছে বহু মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমের এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। সময়ের পরিক্রমায় এই মেলা কেবল বই বিক্রির স্থান থেকে রূপ নিয়েছে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের অনন্য এক কেন্দ্রে। এখানে যেমন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সঙ্গে পাঠকের এক নিবিড় সংযোগও তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য এটি একধরনের ‘সাংস্কৃতিক ঘর’ তৈরি করেছে। এর সুবাদে মেলাটি এখন প্রবাসী বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও সৃজনশীল ধারাবাহিকতার এক অনন্য দলিল হিসেবে কাজ করছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সেসময় নিউইয়র্কে ‘মুক্তধারা’র কার্যক্রমকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আয়োজকদের মতে, প্রকৃত অর্থে বইমেলার জন্ম হয় ১৯৯২ সালে। সাত তরুণের অদম্য উদ্যম নিয়ে সে বছর বইমেলার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। এই উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন বিশ্বজিত সাহা, হারুন আলী, আবদুর রহিম বাদশা, ছাখাওয়াত আলী, সজল পাল, শামীম হোসেন এবং দিলদার হোসেন দিলু। ১৯৯২ সালে ব্রুকলিনের একটি পাবলিক স্কুল এবং কুইন্সের একটি ছোট্ট চার্চে টেবিলের ওপর বই সাজিয়ে প্রথম মেলার আয়োজন করা হয়। প্রবাসজীবনের নানা সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলা ভাষাকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক স্বদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাই ছিল এর মূল চালিকাশক্তি। প্রথম দিকের সেই ক্ষুদ্র আয়োজন ধীরে ধীরে নিউইয়র্কের বাঙালি সমাজে এক বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ নেয়। শুরুর দিকে তারিক মাহবুবের একটি প্রতিষ্ঠান এবং বিএটিএস মেলায় স্টল দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। পরবর্তীকালে বইমেলাটি মূলত কুইন্সকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং অ্যাস্টোরিয়া, উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসের মতো এলাকায় গত তিন দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। ২০২৩ সাল থেকে মেলাটির স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার (জেপিএসি)। সবুজে ঘেরা পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক এই পরিবেশ অনেকের কাছেই ঢাকার বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের আবহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের প্রেক্ষাপটটি প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। সেসময় প্রবাসে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন বা ভাষা-সাংস্কৃতিক চেতনা প্রকাশের মতো কোনো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম ছিল না। সেই শূন্যতা থেকেই আয়োজকরা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে একটি অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। সেটি কেবল একটি প্রতীকী নির্মাণ ছিল না, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে দৃশ্যমান করে তোলার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। ওই বছরই ‘মুক্তধারা নিউইয়র্ক’ এবং ‘বাঙালি চেতনা মঞ্চ’ যৌথভাবে বইমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা করে। প্রথমদিকে এই উদ্যোগ ছিল নিখাদ আবেগ ও ভাষা-ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। কিন্তু আয়োজকরা দ্রুতই উপলব্ধি করেন, কেবল আবেগ দিয়ে এমন বৃহৎ উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। এটিকে টেকসই করতে প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সেই লক্ষ্যেই বইমেলাকে একটি নিয়মিত আয়োজনে পরিণত করার পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় সাহিত্য আলোচনা, সেমিনার ও কবিতা পাঠের মতো বহুমাত্রিক কার্যক্রম। ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশকরা সরাসরি অংশগ্রহণ শুরু করলে এই মেলা বৈশ্বিক রূপ পেতে শুরু করে। ২০০৬ সালে ‘মুক্তধারা নিউইয়র্ক’ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন’-এ রূপ নেয়। এই রূপান্তর প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। উদ্যোক্তারা কেবল মেলার আয়োজন করেই থেমে থাকেননি। প্রবাসে বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে বাংলা বই পৌঁছে দেওয়ার অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের মধ্যে প্রায় ২৬টি লাইব্রেরিতে বাংলা বই সরবরাহ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে বইমেলায় একটি নতুন সাংগঠনিক ধারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। রোটেশনাল নেতৃত্ব, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রবীণ-নবীনের সেতুবন্ধনের মাধ্যমে এটিকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। হাসান ফেরদৌস, ড. নূরুন নবী, রোকেয়া হায়দারসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে এর নেতৃত্বের ভার সামলেছেন। মেলার উদ্বোধকদের তালিকাতেও রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রায় পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছেন শহীদ কাদরী, হুমায়ূন আহমেদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বাংলা সাহিত্যের দিকপালরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সেলিনা হোসেন, পবিত্র সরকার, ফরিদুর রেজা সাগর, মুহম্মদ নূরুল হুদা, শাহাদুজ্জামান এবং ২০২৬ সালে ইমদাদুল হক মিলনের মতো বিশিষ্টদের অংশগ্রহণ এই মেলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারির সময়ও এই মেলার পথচলা থেমে থাকেনি। পৃথিবীর সবকিছু স্থবির হয়ে পড়লেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সেবার ১০ দিনব্যাপী এক ভার্চ্যুয়াল বইমেলার আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালে ৩২তম আসরের মাধ্যমে মেলাটি আবারও সশরীরে আয়োজনের ধারায় ফেরে। ২০২৪ সালের ৩৩তম মেলাটি ‘যত বই, তত প্রাণ’ স্লোগানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করে। সেবার প্রায় ৪০টি প্রকাশনা সংস্থা ও শতাধিক লেখক এতে অংশ নেন। ২০২৫ সালের ৩৪তম আসরটি ছিল আরও বহুমাত্রিক। ইতিহাস, সাহিত্য ও চিত্রকলার সমন্বয়ে মেলাটি সেবার একটি পূর্ণাঙ্গ উৎসবে পরিণত হয়। ২৫টির বেশি প্রকাশনা সংস্থা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি অতিথির সমাগম ঘটে এই আসরে। সাদাত হোসাইনের উদ্বোধনে ওই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন ফিলিস টেইলর। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে রেহমান সোবহান, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, রওনক জাহান ও সিতারা বেগমের মতো বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বইমেলা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ভাষা ও একুশের চেতনা, যা নতুন প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এটি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য-বাজার। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এটি বাংলা সাহিত্যের এক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। তৃতীয়ত, এটি প্রবাসীদের জন্য একটি উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর বা পাবলিক স্পেস। এখানে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য ও সমকালীন পরিচয়ের নানা জটিল প্রশ্ন নিয়ে প্রতিনিয়ত মুক্ত আলোচনা হয়। বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই বইমেলা প্রমাণ করেছে যে, এটি কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়। এটি একটি ভাষার টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ঐতিহ্যের ধারাবাহিক হস্তান্তর। ১৯৯২ সালের সেই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ আন্তর্জাতিক বাংলা সংস্কৃতির এক সুপ্রতিষ্ঠিত মঞ্চ। ২০২৬ সালের আসন্ন ৩৫তম আসর এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার আরও একটি পরিণত ও শক্তিশালী ধাপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলেই প্রত্যাশা প্রবাসী বাঙালিদের।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।