হরমুজ প্রণালি এখন ইসলামাবাদে চলমান আলোচনার অন্যতম জটিল ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থান কী—তা এখনও স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক মাইক হান্না এমনই মন্তব্য করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই, মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই পথ দিয়ে যে তেল পরিবহন হয়, তা ওয়াশিংটনের প্রয়োজন নেই। বরং অন্যান্য দেশই এই রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক এবং ইরানের সঙ্গে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করুক। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন। এবার তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এমনকি এই পথ চালু না থাকলে কোনো ধরনের আলোচনা এগোবে না বলেও জানান। এই দুই ধরনের অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান হরমুজ প্রণালিকে তাদের কৌশলগত সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তাই সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় না করে তারা এই প্রভাবশালী হাতিয়ার ছাড়বে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ আলোচনায় এই ইস্যুতে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সূত্র – আল জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে ইরান। দেশটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী নীতি’ বন্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলা থামলেই কেবল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আবার খুলে দেওয়া হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ এক সাক্ষাৎকারে জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে তিনি কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, একদিকে চাপ প্রয়োগ করা আর অন্যদিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি প্রত্যাশা—দুটি একসঙ্গে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে ওয়াশিংটনকে ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। খতিবজাদেহ আরও বলেন, ইরান আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করবে। তবে সেটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে তাদের নীতি পরিবর্তন করে কিনা তার ওপর। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং হরমুজ প্রণালি এ ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো গোপন চুক্তি নেই এবং বিদ্যমান সব চুক্তিই ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। রোববার (৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের লুকোচুরি করা হচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে তেল আমদানির জন্য ওয়াশিংটনের অনুমতি নিতে হয়—এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিকভাবে প্রযোজ্য। যদি কখনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে হতে পারে, কোনো বিশেষ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির কারণে নয়। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত নেই বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। আজকের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক, বিশেষ করে জ্বালানি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানান ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, কৌশলগত ও নিরাপত্তা জনিত কারণে কিছু বিষয় প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সরকার বর্তমানে জ্বালানি আমদানির জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস থেকেই তেল সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র—সবগুলো বিকল্প উৎসই সরকারের জন্য খোলা রয়েছে। দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে যেখান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবিলম্বে ইরান যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার (৩০ মার্চ) কায়রোতে আয়োজিত 'ইজিপ্ট এনার্জি শো-২০২৬' সম্মেলনে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল ট্রাম্পই পারেন উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংঘাত বন্ধ করতে। সিসি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া মোটেও অতিরঞ্জিত কিছু নয়। সিসি বলেন, "আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলছি—দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ এই যুদ্ধ থামাতে পারবে না।" তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, জ্বালানি অবকাঠামো ও শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহ ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির 'দ্বৈত ধাক্কা' লাগবে। ধনী দেশগুলো এই ধাক্কা সামলাতে পারলেও মধ্যম আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সম্মেলনে সিসি আরও মনে করিয়ে দেন যে, গত নভেম্বরে শার্ম আল-শেখে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের একক ভূমিকা ছিল। এছাড়া জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন। সূত্র: রয়টার্স ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
দীর্ঘ ছয় বছর বিরতির পর ইরান থেকে আবারও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি শুরু করেছে ভারত। তেহরানের তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের পর এই প্রথম ভারত বড় ধরনের কোনো জ্বালানি চালান কিনল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান থেকে জ্বালানি কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল নয়াদিল্লি। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেই জট খুলতে শুরু করেছে। সূত্রমতে, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি ট্যাঙ্কার 'অরোরা' বর্তমানে এলপিজি বহন করে ভারতের পশ্চিম উপকূলের ম্যাঙ্গালোর বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এটি বন্দরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই আমদানিকৃত জ্বালানি ভারতের তিনটি প্রধান রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা—ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (IOC), ভারত পেট্রোলিয়াম (BPCL) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম (HPCL)-এর মধ্যে বণ্টন করা হবে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম ও সরবরাহ সংকটের কারণে ভারত সরকার বিকল্প উৎসের খোঁজ করছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস তা স্বাগত জানিয়েছেন। কালাস বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে অবকাঠামোতে হামলা আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারত এবং যুদ্ধকে আরও উসকে দিত।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পদক্ষেপ পরিস্থিতি শিথিল করার দিকে সহায়ক হবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অবদান রাখবে। সূত্র: আল-জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, জাপানের জাহাজসহ অন্যান্য নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তেহরান। জাপানের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা প্রণালিটি বন্ধ করিনি, এটি উন্মুক্ত রয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়; বরং সংঘাতের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী অবসান চায়। আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না করলেও যেসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় জড়িত, তাদের জাহাজের ওপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচলে সহায়তার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে তেহরান। তিনি আরও জানান, জাপানের মতো দেশগুলো যদি ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে, তাহলে তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব। উল্লেখ্য, জাপানের অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর অধিকাংশ পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের এ অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে, যদিও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অস্থির। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়। বিশেষ করে কাতার ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে হামলার ঘটনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ইতোমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ চাপের মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এবং ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র-এ হামলার ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের একটি বড় অংশ ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি স্থাপনা বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ কোটি ঘনফুট। বাকি ঘাটতি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়, যার বড় অংশই আসে কাতার থেকে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেল ছাড়াও এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য উৎস থেকেও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পট মার্কেট থেকে কেনা সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এদিকে শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আপাতত মজুত জ্বালানি ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা শুরু করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যেই তাদের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে তেহরানের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং এই বিষয়ে আলোচনার জন্য ইরানের দরজা সবসময় খোলা। আরাগচি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোন কোন জাহাজ যাতায়াত করবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইরানের সামরিক বাহিনী। সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে বিশেষ নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, গত শনিবার ভারতে গমনাগমনকারী দুটি তেলের ট্যাংকার এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি নিরাপদে অতিক্রম করেছে। তবে কৌশলগত কারণে তিনি যোগাযোগকারী অন্যান্য দেশগুলোর নাম প্রকাশ করেননি। চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে না। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদী আত্মরক্ষার জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আন্তর্জাতিক শক্তির সহযোগিতা চাইছেন, অন্যদিকে ইরান সরাসরি দেশগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার (১৪ মার্চ) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন। শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো—যারা ইরানের এই কৃত্রিম বাধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে এই পথটি উন্মুক্ত রাখতে নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান এই প্রণালি বন্ধের যে চেষ্টা করছে তা প্রতিহত করতে সম্মিলিত শক্তির প্রয়োজন। এর আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র খুব শীঘ্রই এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করা সব তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় পারাপারের ব্যবস্থা করবে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকাংশে ধ্বংস করা হলেও ছোট ড্রোন বা মাইনের মাধ্যমে তারা এখনও নৌপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। তাই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নৌ-উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে কোন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস থেকে এখনও কোনো চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের ড্রোন হামলার পর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকারী দেশ কাতার তাদের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি অস্থিরতার পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত সোমবার কাতারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এর মধ্যে একটি আঘাত হানে মেসাইদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানির ট্যাংকে এবং অন্যটি কাতার এনার্জির রাস লাফফানে। উল্লেখ্য, রাস লাফফান বিশ্বের বৃহত্তম তরল গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র, যেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলএনজি রপ্তানি করা হয়। হামলায় কোনো হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও নিরাপত্তার স্বার্থে কাতার এনার্জি সাময়িকভাবে উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায়। বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। রয়টার্সের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালীর দুই প্রান্তে বর্তমানে প্রায় ৭০০টি জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যার মধ্যে অন্তত ১৫০টি গ্যাসবাহী জাহাজ। ইতিমধ্যে এই পথে গ্যাস সরবরাহ ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশ ও বিশ্ববাজারে প্রভাব বিশ্বের মোট গ্যাস রপ্তানির ২০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। আকস্মিক উৎপাদন বন্ধ ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, কাতার থেকে নিয়মিত এলএনজি আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মাকসিম সোনিন বলেন, কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধ হওয়া বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে। তবে পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং মূল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে এলএনজি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার পর কাতার বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews