বিটিভির বিতর্কমঞ্চ থেকে হার্ভার্ড: বাংলাদেশের রেবেকা শাফির বিস্ময়কর সাফল্যযাত্রা
নুরুল্লাহ সাঈদ । আমেরিকা বাংলা
বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিতর্কমঞ্চে কিশোরী বয়সে যুক্তি ও বাগ্মিতার পরিচয় দেওয়া রেবেকা শাফি আজ যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক গবেষণাজগতের একজন পরিচিত গবেষক। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই গবেষক ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নিয়ে গবেষণার মধ্য দিয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরে তিনি গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত করে মানুষের মস্তিষ্কের গঠন, স্নায়ুবিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের দিকে এগিয়ে যান। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর এই পথচলা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চা, অধ্যবসায় ও নতুন বিষয় অনুসন্ধানের এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
রেবেকার গল্পের শুরু বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরা বক্তার স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। কৈশোরে বিতর্কের মঞ্চে তাঁর বক্তব্য ও উপস্থাপনা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বহু বছর পর সেই সময়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। অনেকেই জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, একসময় টেলিভিশনের পর্দায় দেখা সেই কিশোরী এখন কোথায়, কী করছেন। তবে তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক শুধু সেই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সাফল্য নয়, বরং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিজ্ঞান গবেষণায় যুক্ত হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা।
রেবেকার নিজের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, তিনি বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ও-লেভেল ও এ-লেভেল পরীক্ষাও একই সময়ে সম্পন্ন করেন। দুটি শিক্ষাব্যবস্থার পড়াশোনা সামলানোর এই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবনকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে। তবে তাঁর সাফল্যের পেছনে শুধু একাধিক শিক্ষাক্রম সম্পন্ন করার বিষয়টিই নয়, বরং দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আগ্রহ এবং কঠিন বিষয় শেখার মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উচ্চশিক্ষার জন্য রেবেকা পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর গন্তব্য ছিল ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, যা বিশ্বজুড়ে ক্যালটেক নামে পরিচিত। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এই পর্যায়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে মহাবিশ্বের জটিলতম বিষয়গুলোর একটি কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণায় কাজে আসে। ক্যালটেক থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি আরও উচ্চতর গবেষণার জন্য বোস্টনে যান।
রেবেকার পরবর্তী গন্তব্য ছিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন পরিমাপ। কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন এক অঞ্চল, যার মহাকর্ষ এত প্রবল যে নির্দিষ্ট সীমার ভেতর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। এর ভর, ঘূর্ণন এবং আশপাশের পদার্থের আচরণ সম্পর্কে ধারণা পেতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেন। রেবেকার গবেষণাও এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অংশ ছিল। হার্ভার্ডের গবেষণা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল ‘মেজারিং ব্ল্যাক হোল স্পিন’। ২০০৯ সালে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নিয়ে গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে মহাবিশ্বের এই রহস্যময় বস্তুগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন আশপাশের পদার্থের গতিবিধি এবং সেখান থেকে নির্গত বিকিরণের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষকেরা কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে ঘূর্ণায়মান উত্তপ্ত পদার্থ থেকে নির্গত এক্স-রে বিশ্লেষণ করে এর ঘূর্ণন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। রেবেকা শাফির পিএইচডি গবেষণায় এ ধরনের পরিমাপের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করা হয়। তাঁর গবেষণার সঙ্গে হার্ভার্ডের অধ্যাপক রমেশ নারায়ণ ও জেফ্রি ম্যাকক্লিনটকের নাম যুক্ত ছিল।
হার্ভার্ডে তাঁর গবেষণার স্বীকৃতিও আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর থিওরি অ্যান্ড কম্পিউটেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে তাত্ত্বিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে সেরা পিএইচডি অভিসন্দর্ভের জন্য প্রদত্ত এরিক আর. কেটো পুরস্কার যৌথভাবে পান রেবেকা শাফি ও ম্যাট ম্যাককুইন। রেবেকার অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন পরিমাপ। এই স্বীকৃতি তাঁর গবেষণাকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি একটি গবেষণাক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের দিকে এগিয়ে যান।
পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জনের পর রেবেকা গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন স্নায়ুবিজ্ঞান। পরে তিনি মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ শুরু করেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মস্তিষ্কবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পর তিনি ব্রড ইনস্টিটিউট অব এমআইটি অ্যান্ড হার্ভার্ডে জিনতত্ত্বভিত্তিক গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর এই পরিবর্তন দেখায়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আগ্রহ একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। পদার্থবিজ্ঞানে অর্জিত গাণিতিক বিশ্লেষণ, জটিল তথ্য ব্যাখ্যা এবং বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহারের দক্ষতা অন্য গবেষণাক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
বর্তমানে রেবেকা শাফি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সেকশন অন ডেভেলপমেন্টাল নিউরোজিনোমিকসে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার মূল আগ্রহের মধ্যে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক বোঝা। মানুষের মস্তিষ্কের গঠন কেন ব্যক্তি ভেদে আলাদা হয়, জিনগত বৈচিত্র্য এসব পার্থক্যের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত এবং নির্দিষ্ট কিছু স্নায়বিক ও মানসিক রোগের ঝুঁকির পেছনে কী ধরনের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। রেবেকার কাজও এই বিস্তৃত গবেষণাক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’ সাময়িকীর একটি গবেষণাপত্রে সহলেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন রেবেকা শাফি। গবেষণাটিতে মানুষের মস্তিষ্কের গঠনসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যের জিনগত ভিত্তি এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে এসব জিনগত সম্পর্কের সম্ভাব্য পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়। এ ধরনের গবেষণায় বৃহৎ জিনগত তথ্যভান্ডার, মস্তিষ্কের চিত্র এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়। গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে নতুন অনুসন্ধানের পথ তৈরি করতে পারে, যদিও কোনো একটি গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
রেবেকার জীবনযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি গবেষণার বিষয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। কৃষ্ণগহ্বরের মতো মহাজাগতিক বস্তু থেকে মানুষের মস্তিষ্কের জিনগত বৈশিষ্ট্য, এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে বিষয়গত পার্থক্য অনেক। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই জটিল তথ্য বিশ্লেষণ, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অজানা বিষয় সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর কর্মজীবন দেখায়, একজন গবেষক নতুন বিষয় শেখার মাধ্যমে নিজের জ্ঞানের পরিসর বাড়াতে পারেন এবং পূর্বের অভিজ্ঞতাকে নতুন ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারেন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য রেবেকা শাফির গল্পের গুরুত্ব এখানেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণায় যুক্ত হতে হলে কেবল একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, মৌলিক বিষয়ের ওপর দক্ষতা, গবেষণার সুযোগ এবং কঠিন সমস্যার সমাধানে ধৈর্য ধরে কাজ করার মানসিকতা। একই সঙ্গে তাঁর যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। কেউ পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে শুরু করে পরবর্তী সময়ে জীববিজ্ঞান বা স্নায়ুবিজ্ঞানে কাজ করতে পারেন। জ্ঞানচর্চার এই আন্তবিষয়ক পথ আধুনিক বিজ্ঞানে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিটিভির বিতর্কমঞ্চ থেকে ক্যালটেক, হার্ভার্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পর্যায়ের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত রেবেকা শাফির পথচলা তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্ত হওয়ার বাস্তব উদাহরণ। তাঁর অর্জনকে অতিরঞ্জিত না করেও বলা যায়, পদার্থবিজ্ঞান থেকে স্নায়ুবিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বে বিস্তৃত এই গবেষণাযাত্রা তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। যে কিশোরী একসময় বিতর্কের মঞ্চে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন, তিনি পরবর্তী জীবনে বিজ্ঞানের জটিল প্রশ্ন নিয়ে কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর এই যাত্রার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলো, জানার আগ্রহকে ধরে রেখে নতুন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকা এবং শেখার জন্য নিজের দিগন্তকে বারবার প্রসারিত করা।
© America Bangla | All Rights Reserved. আমেরিকা বাংলার পূর্বানুমতি ছাড়া এই প্রতিবেদনের লেখা, ছবি, গ্রাফিক্স বা অন্যান্য মৌলিক কনটেন্ট সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কপি বা পুনঃপ্রকাশ করা নিষিদ্ধ। অনুমোদিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমেরিকা বাংলা কে স্পষ্টভাবে সোর্স হিসেবে উল্লেখ করতে হবে।
বিষয়
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
আমেরিকা
View moreযুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে গত জানুয়ারিতে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত ৩৭ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক অ্যালেক্স প্রেত্তির মৃত্যুর তদন্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দাবি করেছেন তাঁর বাবা-মা। তাঁদের অভিযোগ, ছেলের মৃত্যুর তদন্ত সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না দিয়ে এবং ফেডারেল ভিকটিমস রাইটস আইনের অধীনে পরিবারের অধিকার ক্ষুণ্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাঁদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করছে। মাইকেল ও সুসান প্রেত্তি ২৭ অক্টোবর মিনিয়াপোলিসে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁদের ছেলে অ্যালেক্স পেশায় একজন নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের নার্স ছিলেন। ২৪ জানুয়ারি অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও ফেডারেল অভিবাসন অভিযান ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে তিনি গুলিতে নিহত হন। ঘটনার প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। পরিবারের আইনজীবী স্টিভ শ্লাইখার জানান, অ্যালেক্সের মৃত্যুর তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে এবং কী ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবার স্পষ্ট তথ্য চায়। তাঁদের অভিযোগ, বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাচ্ছে না এবং তদন্তের পূর্ণ নথি রাজ্য পর্যায়ের তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। চলতি বছরের জুলাইয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চকে পাঠানো এক চিঠিতে পরিবারের আইনজীবী অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগের কাছ থেকে তাঁরা তদন্তের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো হালনাগাদ তথ্য পাননি। চিঠিতে সরকারের আচরণকে নিষ্ঠুর ও বেআইনি বলে বর্ণনা করা হয়। পরিবারটির বক্তব্য, তদন্তের বিষয়ে যোগাযোগের অভাব তাঁদের শোক ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। ফেডারেল ভিকটিমস রাইটস আইনে অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, অ্যালেক্স প্রেত্তির মৃত্যুর তদন্তে প্রমাণ প্রকাশের দাবি পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত মার্কিন নাগরিক অ্যালেক্স প্রেত্তির মৃত্যুর প্রায় নয় মাস পরও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা-মা। তাঁদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাঁদের অধিকার লঙ্ঘন করছে এবং তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখছে। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ২৭ অক্টোবর মিনিয়াপোলিসে প্রকাশ্যে দাবি জানান মাইকেল ও সুসান প্রেত্তি। ৩৭ বছর বয়সী অ্যালেক্স প্রেত্তি ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স বিভাগের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের নার্স হিসেবে কাজ করতেন। গত ২৪ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানের মধ্যে তিনি গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ঘটনাটি ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। পরিবারের আইনজীবী স্টিভ শ্লাইখারের মাধ্যমে জুলাই মাসে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, অ্যালেক্সের মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে বিচার বিভাগের কাছ থেকে পরিবার উল্লেখযোগ্য কোনো হালনাগাদ তথ্য পায়নি। চিঠিতে সরকারের আচরণকে অগ্রহণযোগ্য ও বেআইনি বলে অভিযোগ করা হয়। মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে অ্যালেক্সের বাবা-মা বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর থেকে তাঁরা সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পাননি। তাঁদের অভিযোগ, বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা তাঁদের উপেক্ষা করেছেন, বিভ্রান্ত করেছেন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে তাঁদের আড়াল করছেন। অ্যালেক্সের মা সুসান প্রেত্তি অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে নিয়ে প্রশাসনের প্রাথমিক বক্তব্য তাঁর স্মৃতিকে কলঙ্কিত করেছে। ঘটনার পর তৎকালীন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম তাঁকে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে গুলির আগে অ্যালেক্সের হাতে মোবাইল ফোন দেখা গেছে। গুলির ঠিক আগের মুহূর্তে তাঁকে অস্ত্র প্রদর্শন বা কর্মকর্তাদের আক্রমণ করতে দেখা গেছে, এমন কোনো ভিডিও প্রকাশিত হয়নি। তদন্তের তথ্য নিয়ে ফেডারেল ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরোধ চলছে। অ্যালেক্স প্রেত্তি ও রেনে গুডের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ পাওয়ার জন্য মিনেসোটার কর্মকর্তারা মার্চ মাসে ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। রাজ্য কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, স্বাধীন তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য তাদের হাতে নেই। তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন এবং গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদের রেকর্ডিংসহ আরও কিছু উপাদান চেয়েছেন। ফেডারেল প্রসিকিউটররা প্রমাণ ভাগাভাগি বন্ধ করে দেওয়ার পর তদন্তে সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, ফেডারেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে রাজ্য কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার সীমিত। অ্যালেক্সের বাবা-মা জানিয়েছেন, ছেলের মৃত্যুর খবর তাঁরা প্রথম জানতে পারেন একজন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাংবাদিকের কাছ থেকে। তাঁদের অভিযোগ, ঘটনার দিন ফেডারেল সরকারের কেউ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। অথচ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমে তাঁদের ছেলেকে নিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, তাঁরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। তাঁরা চান, তদন্তের সব প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ করা হোক, রাজ্য তদন্তকারীদের প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেওয়া হোক এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ভিকটিমস রাইটস আইন অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু অধিকার নিশ্চিত করে। এর মধ্যে রয়েছে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ পাওয়ার অধিকার, মামলার প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানার সুযোগ এবং বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কিছু অধিকার। তবে অ্যালেক্সের পরিবারের অভিযোগের আইনি পরিণতি কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, অ্যালেক্স প্রেত্তির মৃত্যুর তদন্ত চলমান। তবে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে বিভাগটির বিস্তারিত জবাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তদন্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ এবং দায় নির্ধারণের দাবিতে পরিবারটি তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
বাঙালি পরিচয় নিয়ে নিউ ইয়র্কে ব্যতিক্রমী আয়োজন, ‘আপনাকে বাঙালি মনে হয় না’
নির্বাচনে হারের পর ব্রাজিল ছাড়লেন ফ্লাভিও বলসোনারো, পরিবার নিয়ে পৌঁছালেন মায়ামিতে
হঠাৎ জ্বালানি তেলের ব্যয়ে ৩ বছরের বিশ্বভ্রমণ স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুস জাহাজ! অনিশ্চয়তায় ২০৩ যাত্রী
নুরুল্লাহ সাঈদ । আমেরিকা বাংলা বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিতর্কমঞ্চে কিশোরী বয়সে যুক্তি ও বাগ্মিতার পরিচয় দেওয়া রেবেকা শাফি আজ যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক গবেষণাজগতের একজন পরিচিত গবেষক। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই গবেষক ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নিয়ে গবেষণার মধ্য দিয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরে তিনি গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত করে মানুষের মস্তিষ্কের গঠন, স্নায়ুবিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের দিকে এগিয়ে যান। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর এই পথচলা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চা, অধ্যবসায় ও নতুন বিষয় অনুসন্ধানের এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। রেবেকার গল্পের শুরু বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরা বক্তার স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। কৈশোরে বিতর্কের মঞ্চে তাঁর বক্তব্য ও উপস্থাপনা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বহু বছর পর সেই সময়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। অনেকেই জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, একসময় টেলিভিশনের পর্দায় দেখা সেই কিশোরী এখন কোথায়, কী করছেন। তবে তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক শুধু সেই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সাফল্য নয়, বরং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিজ্ঞান গবেষণায় যুক্ত হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা। রেবেকার নিজের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, তিনি বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ও-লেভেল ও এ-লেভেল পরীক্ষাও একই সময়ে সম্পন্ন করেন। দুটি শিক্ষাব্যবস্থার পড়াশোনা সামলানোর এই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবনকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে। তবে তাঁর সাফল্যের পেছনে শুধু একাধিক শিক্ষাক্রম সম্পন্ন করার বিষয়টিই নয়, বরং দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আগ্রহ এবং কঠিন বিষয় শেখার মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য রেবেকা পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর গন্তব্য ছিল ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, যা বিশ্বজুড়ে ক্যালটেক নামে পরিচিত। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এই পর্যায়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে মহাবিশ্বের জটিলতম বিষয়গুলোর একটি কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণায় কাজে আসে। ক্যালটেক থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি আরও উচ্চতর গবেষণার জন্য বোস্টনে যান। রেবেকার পরবর্তী গন্তব্য ছিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন পরিমাপ। কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন এক অঞ্চল, যার মহাকর্ষ এত প্রবল যে নির্দিষ্ট সীমার ভেতর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। এর ভর, ঘূর্ণন এবং আশপাশের পদার্থের আচরণ সম্পর্কে ধারণা পেতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেন। রেবেকার গবেষণাও এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অংশ ছিল। হার্ভার্ডের গবেষণা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল ‘মেজারিং ব্ল্যাক হোল স্পিন’। ২০০৯ সালে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নিয়ে গবেষণা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে মহাবিশ্বের এই রহস্যময় বস্তুগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন আশপাশের পদার্থের গতিবিধি এবং সেখান থেকে নির্গত বিকিরণের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষকেরা কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে ঘূর্ণায়মান উত্তপ্ত পদার্থ থেকে নির্গত এক্স-রে বিশ্লেষণ করে এর ঘূর্ণন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। রেবেকা শাফির পিএইচডি গবেষণায় এ ধরনের পরিমাপের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করা হয়। তাঁর গবেষণার সঙ্গে হার্ভার্ডের অধ্যাপক রমেশ নারায়ণ ও জেফ্রি ম্যাকক্লিনটকের নাম যুক্ত ছিল। হার্ভার্ডে তাঁর গবেষণার স্বীকৃতিও আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর থিওরি অ্যান্ড কম্পিউটেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে তাত্ত্বিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে সেরা পিএইচডি অভিসন্দর্ভের জন্য প্রদত্ত এরিক আর. কেটো পুরস্কার যৌথভাবে পান রেবেকা শাফি ও ম্যাট ম্যাককুইন। রেবেকার অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন পরিমাপ। এই স্বীকৃতি তাঁর গবেষণাকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি একটি গবেষণাক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের দিকে এগিয়ে যান। পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জনের পর রেবেকা গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন স্নায়ুবিজ্ঞান। পরে তিনি মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ শুরু করেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মস্তিষ্কবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পর তিনি ব্রড ইনস্টিটিউট অব এমআইটি অ্যান্ড হার্ভার্ডে জিনতত্ত্বভিত্তিক গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর এই পরিবর্তন দেখায়, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আগ্রহ একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। পদার্থবিজ্ঞানে অর্জিত গাণিতিক বিশ্লেষণ, জটিল তথ্য ব্যাখ্যা এবং বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহারের দক্ষতা অন্য গবেষণাক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। বর্তমানে রেবেকা শাফি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সেকশন অন ডেভেলপমেন্টাল নিউরোজিনোমিকসে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার মূল আগ্রহের মধ্যে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক বোঝা। মানুষের মস্তিষ্কের গঠন কেন ব্যক্তি ভেদে আলাদা হয়, জিনগত বৈচিত্র্য এসব পার্থক্যের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত এবং নির্দিষ্ট কিছু স্নায়বিক ও মানসিক রোগের ঝুঁকির পেছনে কী ধরনের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। রেবেকার কাজও এই বিস্তৃত গবেষণাক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’ সাময়িকীর একটি গবেষণাপত্রে সহলেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন রেবেকা শাফি। গবেষণাটিতে মানুষের মস্তিষ্কের গঠনসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যের জিনগত ভিত্তি এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে এসব জিনগত সম্পর্কের সম্ভাব্য পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়। এ ধরনের গবেষণায় বৃহৎ জিনগত তথ্যভান্ডার, মস্তিষ্কের চিত্র এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়। গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে নতুন অনুসন্ধানের পথ তৈরি করতে পারে, যদিও কোনো একটি গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। রেবেকার জীবনযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি গবেষণার বিষয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। কৃষ্ণগহ্বরের মতো মহাজাগতিক বস্তু থেকে মানুষের মস্তিষ্কের জিনগত বৈশিষ্ট্য, এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে বিষয়গত পার্থক্য অনেক। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই জটিল তথ্য বিশ্লেষণ, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অজানা বিষয় সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর কর্মজীবন দেখায়, একজন গবেষক নতুন বিষয় শেখার মাধ্যমে নিজের জ্ঞানের পরিসর বাড়াতে পারেন এবং পূর্বের অভিজ্ঞতাকে নতুন ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারেন। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য রেবেকা শাফির গল্পের গুরুত্ব এখানেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণায় যুক্ত হতে হলে কেবল একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, মৌলিক বিষয়ের ওপর দক্ষতা, গবেষণার সুযোগ এবং কঠিন সমস্যার সমাধানে ধৈর্য ধরে কাজ করার মানসিকতা। একই সঙ্গে তাঁর যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। কেউ পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে শুরু করে পরবর্তী সময়ে জীববিজ্ঞান বা স্নায়ুবিজ্ঞানে কাজ করতে পারেন। জ্ঞানচর্চার এই আন্তবিষয়ক পথ আধুনিক বিজ্ঞানে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিটিভির বিতর্কমঞ্চ থেকে ক্যালটেক, হার্ভার্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পর্যায়ের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত রেবেকা শাফির পথচলা তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্ত হওয়ার বাস্তব উদাহরণ। তাঁর অর্জনকে অতিরঞ্জিত না করেও বলা যায়, পদার্থবিজ্ঞান থেকে স্নায়ুবিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বে বিস্তৃত এই গবেষণাযাত্রা তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। যে কিশোরী একসময় বিতর্কের মঞ্চে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন, তিনি পরবর্তী জীবনে বিজ্ঞানের জটিল প্রশ্ন নিয়ে কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর এই যাত্রার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলো, জানার আগ্রহকে ধরে রেখে নতুন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকা এবং শেখার জন্য নিজের দিগন্তকে বারবার প্রসারিত করা।
ঢাকা থেকে মহাবিশ্বের গভীরে: বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা লামিয়া মওলার জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসাধারণ অগ্রযাত্রা
অভিবাসন অভিযান ঘিরে উদ্বেগ, ক্যালিফোর্নিয়ায় জরুরি সহায়তা ও সুরক্ষা চাইছে সংগঠনগুলো
যুক্তরাষ্ট্রে ঘড়ির কাঁটা বদলের সময় ঘনিয়ে আসছে, আইন পাসে সিনেটকে ফের তাগিদ দিলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বলে এত দিন বিশ্বাস করতেন নিউইয়র্কের সিরাকিউজ এলাকার ৬৬ বছর বয়সী মারভা কুক। ছোটবেলায় দত্তক নেওয়া হওয়ায় নিজের জন্মপরিচয় সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল না। সম্প্রতি জৈবিক মাকে খুঁজতে গিয়ে জার্মানিতে জন্মের সনদ খুঁজে পান তিনি। এরপর জানা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। এবার ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। তবে কুকের দাবি, তিনি এত দিন নিজেকে মার্কিন নাগরিক বলেই মনে করতেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগে দেশজুড়ে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ জোরদার করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় কুকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। ফেডারেল কৌঁসুলিদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে গ্রিন কার্ডধারী হওয়া সত্ত্বেও কুক সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কুকের সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এ ছাড়া ফেডারেল আইনের আওতায় তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অধিকারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। আইন অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। চলতি মাসের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলার সময় কুক নিজের শৈশব ও জন্মপরিচয় নিয়ে বিস্তারিত জানান বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোটবেলায় দত্তক নেওয়ার পর থেকেই তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু নিজের জৈবিক মাকে খুঁজতে গিয়ে জার্মানিতে জন্মের সনদ পাওয়ার পর তাঁর সেই ধারণা বদলে যায়। গত শুক্রবার ফোনে কথা বলার সময় কুক মামলার বিস্তারিত, নিজের ভোট দেওয়ার ইতিহাস কিংবা অতীতে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা নিয়ে আলোচনা করতে চাননি। তবে আদালতে হাজিরার অভিজ্ঞতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। বুধবার স্বেচ্ছায় কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে নেওয়া হয়। এ অভিজ্ঞতাকে কঠিন সময় হিসেবে বর্ণনা করেন কুক। তিনি বলেন, মানুষের প্রতি সদয় থাকা, অন্যের সেবা করা এবং নিজের সঙ্গে যেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন, অন্যদের সঙ্গেও তেমন আচরণ করাই তাঁর বিশ্বাস। আদালতে হাজিরার সময় তাঁর পাশে দাঁড়াতে কমিউনিটির বেশ কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সমর্থন ও প্রার্থনার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। কুক বলেন, এই সমর্থন তাঁকে কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করবে এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর তাঁর গভীর আস্থা রয়েছে। কুকের আইনজীবী পল টাকও মামলার বিস্তারিত নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, আপাতত নতুন কোনো শুনানির তারিখ বা আদালতে নথি জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা নেই। কুকের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো অভিবাসনসংক্রান্ত কার্যক্রমও চলমান নেই। পরিস্থিতি বদলালে সহায়তার জন্য তাঁর একজন অভিবাসন আইনজীবী রয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। নিউইয়র্কের উত্তরাঞ্চলে মামলাটি পরিচালনাকারী ফেডারেল কৌঁসুলি জন এ সারকোন তৃতীয় কুকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপকে রাজ্যে ভোট জালিয়াতির ব্যাপকতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার করেছে প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক পোস্টে বলা হয়, অ-মার্কিন নাগরিকদের অবৈধ ভোটের কারণে মার্কিন নাগরিকদের ভোটের মূল্য ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া হবে না। তবে অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার প্রকৃত ব্যাপকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন তদন্তে এমন ঘটনা বিরল বলে উঠে এসেছে এবং এ ধরনের ভোট নির্বাচনের ফল বদলে দিয়েছে—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় এর আগে কয়েক ডজন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভোট দেওয়া বা ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে মিনেসোটায় গত তিনটি নির্বাচনে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে প্রশাসনের তৎপরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, কুকের পরিচিতজনেরা তাঁকে সিরাকিউজ এলাকার একজন সম্মানিত ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কয়েক দশক ধরে তিনি ওই এলাকায় বসবাস করছেন। সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী বাস্কেটবল দলের হয়ে খেলার সময়ও তিনি পরিচিতি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া বিভাগ নিশ্চিত করেছে, ১৯৭৯-৮০ মৌসুমে তিনি দলের সর্বোচ্চ পয়েন্ট সংগ্রাহক ছিলেন। প্রতি ম্যাচে তাঁর গড় পয়েন্ট ছিল ১৫। এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি বল ছিনিয়ে নেওয়ার রেকর্ডও তাঁর রয়েছে। অল সেইন্টস উপাসনালয়ের যাজক ফ্রেড ডেলি জানান, কুক দীর্ঘদিন ধরে সেখানে সক্রিয় এবং বসন্তের ইস্টার উৎসবে খরগোশের পোশাক পরে শিশুদের আনন্দ দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, কুককে ঘিরে কমিউনিটির মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে। প্রায় ২০ বছর ধরে কুককে চেনেন ডেল অ্যাভার্স। তাঁর ভাষায়, কুক সব সময় অন্যের সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন, কিন্তু কখনো প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। ওয়াইএমসিএর একটি কমিউনিটি স্কুল কর্মসূচির পরিচালক হিসেবে তিনি স্বল্প আয়ের পরিবারের শিশু ও তরুণদের সহায়তা করেন। কুকের বিরুদ্ধে মামলায় এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, কুকের কাজের মধ্যে প্রতারণা বা অসৎ উদ্দেশ্য ছিল—এমন ধারণা তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। মামলার চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কুকের ঘটনা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভোটার যোগ্যতা ও নাগরিকত্বের আইনি শর্ত নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মার্কিন নাগরিক বলে বিশ্বাস করা একজন মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়সংকটকেও সামনে এনেছে।
চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা, আমেরিকায় স্বাস্থ্যবিমার যোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি
১ নভেম্বর নিউইয়র্ক সিটি ম্যারাথন, সেন্ট্রাল পার্কে দর্শকদের জন্য ৩৫০ বিনামূল্যের টিকিট