বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শের গণতান্ত্রিক চর্চা: একাল-সেকাল

মৃদুল রহমান

কবি প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ক্লিনটন, মিসিসিপি; যুক্তরাষ্ট্র

আগস্ট ১৬, ২০২৬ ৯:৫৩

ভূমিকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জাতীয়তাবাদ’ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়; এটি রাষ্ট্র, জাতিসত্তা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক ধারণা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ যেমন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক ধারাকে ধারণ করেছে, তেমনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি—‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে কেন্দ্র করে একটি পৃথক রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক ধারার বিকাশ ঘটিয়েছে।

 

১৯৭৫ সালের একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, পরবর্তী সামরিক শাসন, ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠা, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯১ সালের সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন, ২০০৭-০৮-এর রাজনৈতিক সংকট, ২০১৪ ও ২০১৮-এর বিতর্কিত নির্বাচন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি একাধিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে।

 

আজকের প্রশ্ন তাই শুধু বিএনপি কী বলছে, তা নয়; বরং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ঘোষিত আদর্শ কতটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আচরণে রূপান্তরিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কতটা হতে পারে—সেই প্রশ্নই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা ও মৌলিক নীতিতে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে কার্যকর অংশগ্রহণ এবং মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। 

 

অতএব, কোনো রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিকতা বিচার করতে হলে শুধু তার নির্বাচনী বিজয় নয়; বিরোধী মতের প্রতি আচরণ, দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার সক্ষমতা—এসবকেও বিবেচনায় আনতে হয়।

 


১. বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক আবির্ভাব

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বিএনপির নিজস্ব ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দর্শনকে রাজনৈতিক পরিচয় ও দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণায় জাতীয় ঐক্য, বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং আধিপত্যবিরোধী রাষ্ট্রচিন্তার কথা উল্লেখ ছিল। 

 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক জাতিসত্তাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রভিত্তিক পরিচয়, ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র্যকে অধিক গুরুত্ব দেয়।

 

এই দুই ধারণাকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের জটিল বাস্তবতাকে সংকুচিত করা হয়। বরং বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয়তাবাদের দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে—একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক, অন্যটি রাষ্ট্র ও ভূখণ্ডকেন্দ্রিক।

 

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের শক্তি এখানেই যে, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তা ও সার্বভৌমত্বকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করে। কিন্তু এর চ্যালেঞ্জও এখানেই—রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যেন কোনোভাবেই নাগরিকের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক কিংবা জাতিগত বৈচিত্র্যকে সংকুচিত না করে।

 

২. একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯৭৫ একটি বড় বিভাজনরেখা। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এই সময়কাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

 

বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে এই সময়ের বিরুদ্ধেই তাদের প্রতিষ্ঠাকে ব্যাখ্যা করা হয়। দলটি দাবি করে যে, একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক প্রয়োজন থেকেই বিএনপির জন্ম। 

 

তবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে এটিও মনে রাখতে হবে যে, বিএনপির জন্ম ও প্রাথমিক বিকাশ সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে ঘটেছিল। ফলে দলটির গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতাকে দেখতে হয়—একদিকে বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিসর সৃষ্টি ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সংগঠিত করার ভূমিকা; অন্যদিকে সামরিক শাসন থেকে রাজনৈতিক দলীয় কাঠামোয় রূপান্তরের জটিলতা।

 

অর্থাৎ, বিএনপির গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকারকে একমাত্রিকভাবে ‘সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক’ কিংবা ‘সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক’—কোনো এক বাক্যে বিচার করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না।

 

৩. আশির দশক: বিরোধী রাজনীতির উত্থান

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের ভূমিকা ছিল। বিএনপি একসময় সরকারে থেকেছে, আবার পরবর্তী সময়ে বিরোধী দল হিসেবেও রাজপথে আন্দোলন করেছে। এই পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—গণতন্ত্র শুধু ক্ষমতায় থাকার অধিকার নয়; ক্ষমতার বাইরে থাকার অধিকারও।

 

১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথ খুলে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সংসদীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে।

 

এ সময় বিএনপি সরকার গঠন করে এবং পরবর্তীতে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বিএনপির গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ছিল ক্ষমতার কাঠামোকে জনগণের নির্বাচিত সংসদের সঙ্গে পুনঃসংযুক্ত করার একটি পদক্ষেপ।

 

৪. নব্বই-পরবর্তী গণতন্ত্র: আদর্শ বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা

১৯৯১ থেকে ২০০৬—এই সময়কে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে; সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলও সক্রিয় ছিল।

 

কিন্তু একই সঙ্গে এই সময়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংসদ বর্জন, হরতাল, অবরোধ, সংঘাত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলীয় নেতৃত্ব এবং পরস্পরকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা শক্তিশালী হয়।এখানেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়।

 

নির্বাচন ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা গণতান্ত্রিক ছিল? সংসদ ছিল, কিন্তু সংসদ কতটা কার্যকর ছিল?
বিরোধী দল ছিল, কিন্তু বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা কতটা ছিল?

বিএনপির ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নগুলো প্রযোজ্য। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোটের বাক্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের নাম নয়। গণতন্ত্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে বিজয়ী পক্ষ পরাজিত পক্ষের অস্তিত্ব ও মতপ্রকাশের অধিকারকে স্বীকার করবে এবং পরাজিত পক্ষও নির্বাচনী ফলাফলকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ করবে।

 

৫. ২০০১-২০০৬ : বিএনপির শাসন ও বিতর্ক

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসে। এই সময়ে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

 

একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এখানেই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কতা দরকার। কোনো দলের সমর্থকের কাছে তার সরকারের সাফল্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, ইতিহাসের বিচারে সেই সময়কার ব্যর্থতা ও বিতর্কও সমানভাবে নথিভুক্ত হওয়া উচিত।

 

একইভাবে বিএনপির বিরোধীদের উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগকে অবিতর্কিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও সঠিক নয়। বরং তথ্য, আদালতের নথি, নির্বাচন-পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন গবেষণা এবং সমকালীন সংবাদ-প্রতিবেদন মিলিয়ে বিচার করা প্রয়োজন। গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখনই, যখন ক্ষমতাসীন দল নিজের বিরুদ্ধেও সমালোচনা সহ্য করতে পারে।

 

৬. তত্ত্বাবধায়ক সরকার: গণতান্ত্রিক আস্থার সংকট

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটি অনন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এর পেছনে মূল যুক্তি ছিল—ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে রাজনৈতিক আস্থা সংকট তৈরি হয়; তাই নির্বাচনের সময় একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন।

 

বিএনপি একসময় এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে, আবার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে। বিএনপির বর্তমান ঘোষিত সংস্কার প্রস্তাবেও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের কথা রয়েছে। 

 

এই অবস্থান পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় শিক্ষা দেয়—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান অনেক সময় ক্ষমতায় থাকা ও বিরোধী দলে থাকার অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের জন্য প্রতিষ্ঠানকে দলীয় সুবিধার ঊর্ধ্বে রাখা অপরিহার্য।

 

৭. ২০০৭-০৮ : জরুরি শাসন ও গণতন্ত্রের স্থবিরতা

২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা উন্মোচিত করে। জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ সময়ের নির্বাচনী অনিশ্চয়তা প্রমাণ করে যে, কেবল রাজনৈতিক দল থাকলেই একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে যায় না।

 

প্রয়োজন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, পেশাদার প্রশাসন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক ভারসাম্য।

 

এই অভিজ্ঞতা বিএনপিসহ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের জন্য একটি শিক্ষা—গণতান্ত্রিক শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না; প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে অরাজনৈতিক শক্তি রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশের সুযোগ পায়।

 

৮. ২০১৪ ও ২০১৮ : নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট

২০১৪ সালের নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ, নির্বাচনকালীন পরিবেশ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

 

বিএনপি এসব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে এসেছে। এর ফলে দলটি রাজপথে আন্দোলন করেছে, নির্বাচন বর্জন করেছে বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

 

কিন্তু এখানেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি জটিল প্রশ্ন রয়েছে। একটি দল যদি নির্বাচনব্যবস্থাকে অনির্ভরযোগ্য মনে করে, তাহলে তার প্রথম দায়িত্ব কী—নির্বাচন বর্জন, নাকি নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পথ তৈরি করা?

 

উত্তরটি সহজ নয়। তবে ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষই একই নিয়মকে গ্রহণযোগ্য মনে করবে।

 

৯. ২০২৪ : রাজনৈতিক ভূমিকম্প ও নতুন বাস্তবতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। 

 

এখানেই বিএনপির সামনে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ দীর্ঘদিন বিরোধী দল হিসেবে যে দল গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলেছে, রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সেই মূল্যবোধ বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন তার নিজের ওপর।

 

বিরোধী দলে গণতন্ত্র চাওয়া সহজ; ক্ষমতায় থেকে গণতন্ত্র রক্ষা করাই কঠিন। এই পার্থক্যটিই বিএনপির ‘একাল’-কে ‘সেকাল’ থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।

 

১০. ২০২৬ : বিএনপির সামনে নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর দলটি এখন আর কেবল আন্দোলনরত রাজনৈতিক শক্তি নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব তার হাতে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে একই সঙ্গে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক পুনর্মিলন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো জটিল বিষয় সামলাতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন-সংক্রান্ত রাজনৈতিক উত্তেজনাও বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। 

 

এ পরিস্থিতিতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে যদি কার্যকর রাজনৈতিক দর্শনে রূপ দিতে হয়, তাহলে তার প্রথম শর্ত হবে—জাতীয়তাবাদকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে নাগরিক ঐক্যের দর্শনে পরিণত করা।

 

জাতীয়তাবাদ মানে কেবল বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা নয়; জাতীয়তাবাদ মানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা। জাতীয়তাবাদ মানে শুধু সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব নয়; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং ভোটের অধিকারও।

 

১১. বিএনপির সংস্কার প্রস্তাব: ঘোষিত আদর্শের নতুন পাঠ

বিএনপি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য, উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়ানোর মতো প্রস্তাব রয়েছে।

এগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।

 

বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সংসদীয় জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা রয়েছে—সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধীরে ধীরে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনে রূপ নেয়।

 

তাই ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্নটি শুধু ‘কে প্রধানমন্ত্রী’ নয়; বরং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা কোথায়? একইভাবে প্রশ্ন হলো—দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্য কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবেন?

 

বিএনপির প্রস্তাবিত সংস্কার আলোচনায় এই বিষয়গুলো এসেছে—এটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে প্রস্তাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

 

১২. দলীয় গণতন্ত্র: সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা।

বিএনপিও এই প্রশ্নের বাইরে নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য যেমন প্রতিষ্ঠান দরকার, তেমনি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের জন্যও প্রতিষ্ঠান দরকার। দলের নেতৃত্বে মতবৈচিত্র্য, নিয়মিত কাউন্সিল, নেতৃত্ব নির্বাচনের স্বচ্ছতা, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে একটি দল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।

 

বিএনপির সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে—দলের অভ্যন্তরে এমন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মডেল হতে পারে।

দলীয় আনুগত্য ও ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে নীতি, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

১৩. প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণ: গণতন্ত্রের আয়না

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আপনি আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন। যে দল ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধীদের কথা বলার সুযোগ দেয় না, কিন্তু বিরোধী দলে গেলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দাবি করে—তার গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দ্বৈততার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০২৬ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপির সামনে তাই একটি বিরল সুযোগ—প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক পুনর্মিলনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

 

বিএনপি নিজস্ব সংস্কার প্রস্তাবেই ‘জাতীয় পুনর্মিলন কমিশন’-এর কথা বলেছে এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরেছে। এই ঘোষণার বাস্তব পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে—প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা এবং দলীয় কর্মীদের আচরণে।

 

১৪. জাতীয়তাবাদ বনাম জাতীয়তাবাদী উগ্রতা

জাতীয়তাবাদ একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক শক্তি হতে পারে, যদি তা নাগরিক ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যখন অন্য মত, অন্য ধর্ম, অন্য জাতিগোষ্ঠী বা অন্য রাজনৈতিক দলকে ‘অজাতীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে, তখন সেটি গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ থাকে না; তা পরিণত হয় রাজনৈতিক বর্জনের অস্ত্রে।

 

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যে বিএনপি ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়কে দল, মত, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। 

এই ধারণাকে বাস্তব রাজনৈতিক আচরণে রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি নাগরিক জাতীয়তাবাদে পরিণত হতে পারে।

 

১৫. গণমাধ্যম ও ভিন্নমতের স্বাধীনতা

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো ভিন্নমত। বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক বয়ানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা সহ্য করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রশংসা করার অধিকার যেমন গণতান্ত্রিক, সরকারের সমালোচনা করার অধিকারও তেমনই গণতান্ত্রিক।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা আর রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ করা—এই দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট আইনগত পার্থক্য থাকা জরুরি।

 

১৬. সেকাল থেকে একাল: কী পরিবর্তন হলো?

সেকালের বিএনপি ছিল মূলত একটি বিরোধী-ক্ষমতায়-ফেরা রাজনৈতিক শক্তি। একাল-এর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।

সেকালে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন ছিল—কীভাবে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা যায়।

 

এখন প্রশ্ন—ক্ষমতায় থেকে কীভাবে গণতন্ত্রকে নিজের দলের জন্যও সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক করা যায়।

এই পরিবর্তন মৌলিক। বিএনপি এখন চাইলে তিনটি ঐতিহাসিক কাজ করতে পারে—

প্রথমত, নির্বাচনকে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসন ও রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।

 

১৭. সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।

 

বিএনপি যদি সত্যিই একটি নতুন গণতান্ত্রিক অধ্যায় সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে এই ঐতিহাসিক ধারাটি ভাঙতে হবে। কারণ একটি দলের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া সাময়িকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।

 

বর্তমান রাজনৈতিক পর্যায়ে বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য সামরিক বাহিনীকে পেশাদার ও রাজনীতির বাইরে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

 

১৮. ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কেউ চিরকাল ক্ষমতায় থাকে না।

এক সময়ের শাসক এক সময় বিরোধী হয়। এক সময়ের বিরোধী এক সময় সরকার হয়। ক্ষমতার এই পরিবর্তনই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। তাই বিএনপির জন্যও ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—

 

আজ যারা ক্ষমতার বাইরে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করা মানে ভবিষ্যতে নিজের রাজনৈতিক অধিকারও সুরক্ষিত করা।

একইভাবে আজ যে প্রতিষ্ঠান বিএনপিকে সুবিধা দিচ্ছে, আগামীকাল সেই প্রতিষ্ঠান অন্য দলের অধীনেও কাজ করবে।

সুতরাং প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি বা দল নয়, রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী করতে হবে।

 

উপসংহার : বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আগামী অধ্যায়

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ‘সেকাল’ ছিল সংগ্রাম, সংঘাত, ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক শাসন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির ইতিহাস।

 

‘একাল’ হলো তার চেয়েও কঠিন বাস্তবতা—রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব। বিএনপি যদি তার ঘোষিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক দর্শনে পরিণত করতে চায়, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে জাতীয়তাবাদ মানে কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি নাগরিকের মর্যাদা, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মানের সমষ্টি।

 

বিএনপির নিজস্ব ভাষ্যেও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রকে দলের মূল নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই শেষ কথা।

 

২০২৬ সালের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য তাই শুধু নির্বাচনী বিজয় নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে দলটিকে প্রমাণ করতে হবে—ক্ষমতায় থেকেও তারা বিরোধী মতের অধিকার রক্ষা করতে পারে; সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করে না; প্রশাসনকে দলীয় কর্মী বাহিনীতে পরিণত করে না; নির্বাচনকে নিজেদের জয়ের যন্ত্র নয়, জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের মাধ্যম হিসেবে দেখে; এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে দল ও ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রাখতে পারে।

 

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোনো একটি দলের হাতে এককভাবে নির্ধারিত নয়। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি—সবারই গণতান্ত্রিক আচরণের পরীক্ষা দিতে হবে।

 

তবে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটির দায়িত্ব অবশ্যই বেশি। আজ বিএনপির সামনে তাই ইতিহাসের এক অনন্য সুযোগ—সেকালের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি অতিক্রম করে একালের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের নির্মাতা হওয়া।

 

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টি কোনো দলের একচেটিয়া রাজনৈতিক সম্পদ না হয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদার পরিচয়ে পরিণত হবে।

 

গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হবে, যখন সরকার জানবে—জনগণ তাকে ক্ষমতা দিয়েছে, মালিকানা নয়। আর রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে জাতীয় হবে, যখন দল বদলাবে, সরকার বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে—কিন্তু রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন অটুট থাকবে।

 

এই জায়গাতেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ‘সেকাল’-এর সঙ্গে ‘একাল’-এর সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ ইতিহাস বারবার দেয় না।

0 Comments

জনপ্রিয় সংবাদ
বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনার পর তরুণীর মৃত্যু, এক বছরের সাজায় ক্যালিফোর্নিয়ার আইন পরিবর্তনের দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন।   মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।   তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।”   ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে।   প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন।   ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন।   প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল।   মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি।   রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডে বড় পরিবর্তন, পরিবারভিত্তিক ভিসা আবেদনকারীদের জন্য সুখবর

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।   নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে।   এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে।   ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে।   অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।   যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন।   বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর।   যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।

মার্কিন ভিসা আপডেট ২০২৬! বাংলাদেশিদের জন্য কোন ভিসা বন্ধ, কোনটা চালু?

২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো।   প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে।   এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে।   অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে।   স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।   সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।   সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধন

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে।   এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।   নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি।   উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।”   বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে।   এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।   শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়।   উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন।   বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।   এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।

পাঁচ সন্তানকে এতিম করে মাকে কুপিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তারের সময়ও হাসছিল ঘাতক দুই বোন

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে।   আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার   পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।   পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে।   সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন।   ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে |   এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

Top week

ছোট ভাইকে বুকে জড়িয়ে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছিল শিশুকন্যা, পরে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

জঙ্গলে ফেলে যাওয়া দুই ভাইবোনকে উদ্ধার, ছোট ভাইকে বাঁচাতে সারা রাত বুকে আগলে রাখল বোন

মোহাম্মদ ইব্রাহিম আগস্ট ১০, ২০২৬ ১৪:০