- প্রচ্ছদ
- Topic
ইরান
ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে ফেব্রুয়ারিতে চালানো সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দায় থাকার ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ পেয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান মিশন। মিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই প্রতিবেদনে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের মিশন বলেছে, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক জনগণের ওপর পরিচালিত হয়েছে এবং এর মধ্যে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কঠোর বিধিনিষেধের মতো ঘটনা রয়েছে। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক তৎপরতা এবং একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে তেহরানের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, সেখানে হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী ছিল বলে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট ভিত্তি তারা পেয়েছেন। ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। জাতিসংঘের মিশনের মতে, বিদ্যালয়টি স্পষ্টভাবে একটি বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল। তদন্তকারীরা এমন কোনো প্রমাণ পাননি যে হামলার সময় ভবনটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে বিদ্যালয়টি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের একটি নৌঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী ওই এলাকায় একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কমান্ডারের উপস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু হামলার আগে সেই তথ্য যথাযথভাবে হালনাগাদ বা যাচাই করা হয়নি। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা মনে করেন, লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিদ্যালয়টি সামরিক স্থাপনা কি না তা নিশ্চিত না করে হামলা চালানো এবং বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত লাগার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অভিযান পরিচালনা করা সাধারণ অবহেলার চেয়ে গুরুতর বিষয়। জাতিসংঘের মিশনের মতে, এর ফলে বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং হামলাটি নির্বিচার আক্রমণের বৈশিষ্ট্য বহন করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় এমন হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মিনাবের ওই হামলার দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো চূড়ান্ত নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে দাবি করেছিলেন, মেয়েদের স্কুলটি ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে কেউ হামলা চালায়নি। অন্যদিকে রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তদন্তে মিনাবের হামলায় মার্কিন বাহিনীর জড়িত থাকার সম্ভাবনা উঠে এসেছিল। পেন্টাগন পরে তদন্তের পরিধি বাড়ালেও এর পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করেনি। মিনাবের হামলার পাশাপাশি লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে হামলাও তদন্ত করেছে জাতিসংঘের মিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হন। তদন্তকারীরা এই হামলাকেও নির্বিচার হামলা হিসেবে উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তবে লামের্দের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড মার্চে জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দিনে মার্কিন বাহিনী লামের্দ শহরে কোনো হামলা চালায়নি। জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনের পরও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। মিশনের তদন্ত অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক ও পরিকল্পিত দমন-পীড়ন চালায়। এর মধ্যে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের তথ্য পাওয়া গেছে। মিশন এসব কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়তে পারে বলে জানিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে নিহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরানি সরকারের সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৩৮ জন নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, তারা এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি এবং প্রকৃত নিহত ও আহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার ইরানি কর্তৃপক্ষের দমননীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই সময়ের দমন-পীড়নকে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির সবচেয়ে বড় দমন অভিযানের অন্যতম হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে তেহরান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এবং বিক্ষোভের জন্য বিদেশি শক্তি ও নির্বাসিত সরকারবিরোধীদের দায়ী করে আসছে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান যুদ্ধের সময় বেসামরিক স্থাপনায় হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিবেদনে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন পর্যালোচনা করায় সংঘাতের দুই দিকের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিও সামনে এসেছে। সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস
রাশিয়া ও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কঠোর করতে এবার নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার জ্বালানি তেল আমদানির জেরে ভারত, চীনসহ ১০টি দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি বিল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়াগত ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিলটির ওপর চূড়ান্ত ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের এই আলোচিত বিলটি মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ২১৪-২১১ ভোটে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব পাস হয়। এর আগে গত মাসে মার্কিন সিনেটেও ৮৬-১১ ভোটে বিলটি বিপুল সমর্থন পেয়েছিল। প্রস্তাবিত এই আইনে রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব ও জ্বালানি খাতের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব ‘ছায়া বহর’ বা গোপন জাহাজ নেটওয়ার্ক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল পরিবহনে সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিলটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এমন ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবেন। সম্ভাব্য এই শুল্কের আওতায় থাকা ১০টি দেশ হলো ভারত, চীন, তুরস্ক, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অপরিশোধিত তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনা করছে মস্কো। আর তাই রাশিয়ার আয়ের প্রধান এই উৎসটি বন্ধ করতে জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে বিলটির বিরোধিতা করে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা গ্রেগরি মিকস অভিযোগ করেছেন, এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে তা দ্রুতই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে।
বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। সম্প্রতি ইয়েমেন ও সৌদি আরবে তাদের একের পর এক হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েই এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। গত সপ্তাহে হুতিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'বাব আল-মান্দেব' প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবের বিশাল 'ইস্ট-ওয়েস্ট' তেল পাইপলাইনে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবেও তাদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যার ফলে পাইপলাইনটির কার্যক্রম কয়েক সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ সৌদি আরবের এই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে; গত মঙ্গলবার প্রতি ব্যারেল তেলের দাম লাফিয়ে ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে। জানা যায়, ২০২২ সাল থেকে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে একটি দুর্বল যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সমর্থিত হুতি-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোও এই শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু গত ডিসেম্বরে এই মিত্রদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএই-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর জন্য আসা অস্ত্রের ওপর সৌদি বাহিনী বোমা হামলা চালালে আবুধাবি এই সংঘাত থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ায়, যার ফলে হুতি-বিরোধী জোট ভেঙে পড়ে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব জোটের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়, কারণ ইউএই-সমর্থিত বাহিনীর হাতেই ছিল বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত 'পেরিম দ্বীপ'-এর নিয়ন্ত্রণ। ফলে গত সপ্তাহান্তে হুতিদের আকস্মিক হামলায় দ্বীপটি এবং ইয়েমেন উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর পতন ঘটে। এখন ২০ মাইল চওড়া এই প্রণালী দিয়ে পার হতে যাওয়া যেকোনো সৌদি জাহাজের জন্যই হুতিরা বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে এই জলপথটিই সৌদির প্রধান রপ্তানি রুটে পরিণত হয়েছিল। এখন সৌদির সামনে কেবল সুয়েজ খালের পথ খোলা আছে, যা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর যাত্রায় আরও কয়েক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে দেবে। মিত্রদের এই বিভাজনের কারণে হুতিদের মোকাবিলার পুরো চাপ এখন সৌদি আরবের ওপর এসে পড়েছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে রিয়াদের ধীরগতির প্রতিক্রিয়া ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, ইরানের দিক থেকে চাপের মুখে থাকা সৌদি আরব হুতিদের হামলার বিরুদ্ধে ইয়েমেন থেকে আসা বিমান হামলার অনুরোধে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন সামরিক সহায়তার জন্য গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন করে কোনো হামলায় জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। লোহিত সাগরের প্রধান বন্দর থেকে গত মাসে সৌদির তেল রপ্তানি প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়ার পর, এবার তাদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আরও বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৭৪৫ মাইল দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর, ইয়ানবু বন্দরে এখন সৌদির কাছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের রপ্তানিযোগ্য তেল মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবায় নিজেদের অভাবনীয় সক্ষমতার এক নতুন চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে ইরান। দেশটির মেডিকেল কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ রাইসজাদেহ জানিয়েছেন, সফল টিকাদান কর্মসূচির দিক থেকে ইরান বর্তমানে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের আধুনিক চিকিৎসাতেও দেশটির অবস্থান এখন বিশ্বে তৃতীয়। ইয়ং জার্নালিস্টস ক্লাবের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে ইরানের স্বাস্থ্য খাতের এই চমকপ্রদ সাফল্যের তথ্য প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্য খাতে ইরানের এই অভাবনীয় অগ্রগতির পেছনের অন্যতম কারণ হলো তাদের শক্তিশালী চিকিৎসক কাঠামো। মোহাম্মদ রাইসজাদেহ জানান, বর্তমানে দেশটিতে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি চিকিৎসক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে জনসংখ্যার অনুপাতে ইরানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের গড় সংখ্যা যেখানে ১৬ জন, সেখানে প্রাপ্যতার দিক থেকে বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও বেশ এগিয়ে রয়েছে দেশটি। টিকাদান ও বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার পাশাপাশি অন্যান্য জটিল অস্ত্রোপচারেও বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে ইরান। দেশটির মেডিকেল কাউন্সিলের প্রধান দাবি করেন, লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও তারা বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ককলিয়ার ইমপ্লান্ট বা শ্রবণযন্ত্র প্রতিস্থাপন, হৃদ্যন্ত্রের জটিল অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল সার্জারির ক্ষেত্রেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর কাতারে জায়গা করে নিয়েছে ইরান। রাইসজাদেহের মতে, চিকিৎসা খাতের এই ধারাবাহিক অর্জনগুলো মূলত ইরানের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, দক্ষ চিকিৎসক ও শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থারই এক অনন্য প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ইরানে যুদ্ধ পরিচালনার অভিযোগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি। মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এই বিস্ময়কর ঘোষণা দেন তিনি। ম্যাসির অভিযোগ, হেগসেথ ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ বা যুদ্ধক্ষমতা আইনটি লঙ্ঘন করেছেন। ওই আইনে স্পষ্ট বলা আছে—৯০ দিনের বেশি সময় ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। প্রস্তাব উত্থাপনকালে ম্যাসি দাবি করেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে পিট হেগসেথ বেআইনি নির্দেশ দিয়েছেন, যা সংবিধান ও আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি এবং তাকে এই পদে বহাল রাখা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের জন্য হুমকিস্বরূপ। চলতি সপ্তাহের শেষদিকে এই প্রস্তাবের ওপর হাউজে ভোটাভুটির দাবি জানিয়েছেন ম্যাসি, যদিও রিপাবলিকানরা চাইলে ভোটের মাধ্যমে এটি বাতিল করে দিতে পারে। গত মে মাসে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীর কাছে প্রাইমারি নির্বাচনে হেরে যান ৫৫ বছর বয়সী ম্যাসি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র সাত সপ্তাহ আগে বিদায়ী এই কংগ্রেসম্যান নতুন করে যুদ্ধক্ষমতা বিতর্কের জন্ম দিলেন। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে এর আগে হাউজ ও সিনেট উভয় কক্ষই একটি প্রস্তাব পাস করেছিল। তবে হোয়াইট হাউজের দাবি, প্রাথমিক পর্যায়ের লড়াইয়ের পরই সংঘাতের অবসান হয়েছে, যার ফলে কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত ৯০ দিনের সময়সীমা নতুন করে গণনা শুরু হয়েছে। এর মাঝেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনচেতা রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত থমাস ম্যাসি এর আগেও হোয়াইট হাউজের সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করেছেন; বিশেষ করে আলোচিত জেফরি এপস্টেইনের সরকারি নথি প্রকাশে বাধ্য করার ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা ছিল। এদিকে, যুদ্ধের বৈধতা সংক্রান্ত ম্যাসির অভিযোগ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও পিট হেগসেথের কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ পেন্টাগন। পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলে উইলসন এক বিবৃতিতে জানান, হেগসেথের নেতৃত্বে বাহিনীতে মেধা ও মান ফিরে এসেছে, অস্ত্রাগার আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর প্রতিটি শাখায় নিয়োগ ও সদস্যদের মনোবল বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও হেগসেথের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা বিভাগ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে বলেও দাবি করেছে পেন্টাগন।
ইরানে ৩২ বছর বয়সী ব্লগার মারজিয়ে ‘সেভদা’ এব্রাহিমি শামসাবাদিকে মৃ ত্যু দ ণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠন ও ইরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে অপমান, জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী প্রচার, শত্রু রাষ্ট্রের হয়ে গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড এবং সামরিক স্থাপনার ছবি তুলে বিদেশি ফারসি গণমাধ্যমে পাঠানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। মারজিয়েকে বন্দর আব্বাস রেভল্যুশনারি কোর্টের একটি শাখা ‘করাপশন অন আর্থ’ বা ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি’—ইরানের আইনে মৃ ত্যু দ ণ্ডযোগ্য একটি অভিযোগ—এ দোষী সাব্যস্ত করে মৃ ত্যু দ ণ্ড দিয়েছে বলে হেংগাও ও এইচআরএএনএ জানিয়েছে। আদালত তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সরকারি ও জনসেবামূলক কাজে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশও দিয়েছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার আইনজীবীকে ২৩ আগস্ট মৃ ত্যু দ ণ্ডের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মামলার অন্যতম অভিযোগ হলো, মারজিয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানের ছবি তুলেছিলেন এবং সেটি ইরানের বাইরে থাকা একটি ফারসি ভাষার গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ এটিকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই মামলায় তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতাকে অপমান এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার গ্রে প্তারের আগে দেওয়া একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট। ২৩ ফেব্রুয়ারির ওই পোস্টে প্রায় ১০ হাজার অনুসারীর উদ্দেশে তিনি লিখেছিলেন, একদিন যদি তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তাহলে যেন মনে রাখা হয়—তিনি নিজের বিশ্বাসের পথ বেছে নিয়েছিলেন। পোস্টটিতে একটি সাদা কবুতর ও লাল গোলাপের ছবিও ছিল। পরে তার মৃ ত্যু দ ণ্ডের খবর প্রকাশ হলে পোস্টটি নতুন করে আলোচনায় আসে। মারজিয়েকে ২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে বা এপ্রিল মাসে আ ট ক করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। হেংগাও ও এইচআরএএনএ বলছে, যুদ্ধসংক্রান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে তাকে এপ্রিল মাসে আ ট ক করা হয়; অন্যদিকে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তিনি মার্চ থেকেই বন্দি ছিলেন। তাকে বন্দর আব্বাস কারাগারে রাখা হয় এবং প্রায় ২০ দিন একাকী বন্দিত্বে থাকার অভিযোগও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, মারজিয়ের শারীরিক অবস্থাও উদ্বেগজনক। হেংগাও ও এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তিনি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা এমএস, সোরিয়াসিস, নার্কোলেপসি এবং গুরুতর পেটের সমস্যায় ভুগছেন। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কারাগারে চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তার ঘটনাটি ইরানে রাজনৈতিক ও বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট মামলায় মৃ ত্যু দ ণ্ড ব্যবহারের ব্যাপক বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৯ জনের মৃ ত্যু দ ণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে। সংগঠনটি বলছে, আরও অনেকে মৃ ত্যু দ ণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মারজিয়ে দেশটিতে মৃ ত্যু দ ণ্ডের মুখে থাকা অন্তত আট নারীর একজন। এসব মামলার মধ্যে কয়েকটি জানুয়ারির বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মারজিয়ের মামলাটি মূলত যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। সোর্স: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর প্রায় দুই দিন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা। ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে পরিচিত ওই কর্নেল প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসে তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাসুট নিয়ে আকাশ থেকে দ্রুত নিচে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এর নতুন মৌসুমের প্রথম পর্বে সাংবাদিক নোরাহ ও’ডনেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ওই কর্মকর্তা। এপ্রিল মাসে ইরানের ওপর অভিযান চলাকালে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর তিনি ইরানের মাটিতে আটকা পড়েছিলেন। ওই যুদ্ধবিমানে দুই সদস্যের একটি দল ছিল। ‘ব্রাভো’ ছিলেন অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, আর তাঁর সঙ্গে থাকা পাইলটকে মিশনের সাংকেতিক নামে ‘আলফা’ বলা হয়। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর দুজনই জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে আসেন। পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ব্রাভো একা পড়ে যান ইরানের পাহাড়ি এলাকায়। ব্রাভোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমান থেকে বের হওয়ার পরই তিনি বুঝতে পারেন তাঁর প্যারাসুটে সমস্যা হয়েছে। একপর্যায়ে ওপরে তাকিয়ে তিনি প্যারাসুট দেখতে পাননি। সেই মুহূর্তটিকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, তখন তাঁর পতনের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৭০ থেকে ১০০ মাইল পর্যন্ত ছিল বলে তাঁর ধারণা। তবে কত দ্রুত নিচে নামছেন, সেটি নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ ছিল না। বরং প্যারাসুটের যেসব অংশ ছড়িয়ে বা আটকে গিয়েছিল, সেগুলো টেনে বের করে যতটা সম্ভব প্যারাসুটটি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবতরণ করেন ব্রাভো। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রায় দুই দিন একাই সেখানে টিকে থাকতে হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, এই সময় তিনি ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়া এড়িয়ে চলেন এবং তাঁর সামরিক প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করে থাকেন। ব্রাভো তাঁর পাইলট ও সহকর্মী ‘আলফা’র প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বিমান থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আলফা তাঁদের দুজনের জীবন রক্ষা করেছিলেন। এর আগে সিবিএস জানিয়েছিল, ব্রাভোকে উদ্ধারের অভিযানটি ছিল মার্কিন সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ও জটিল উদ্ধার অভিযান। দুই সদস্যের বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর পাইলট দ্রুত উদ্ধার হলেও ব্রাভোকে খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। পরে তাঁকে ইরান থেকে বের করে আনতে ব্যাপক সামরিক তৎপরতা চালানো হয়। ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিমানটি ইরানের একটি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। দুর্গম ভূখণ্ডে অবস্থান করার কারণে ব্রাভোর সন্ধান ও উদ্ধার আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ‘৬০ মিনিটস’-এর ওই পর্বে শুধু ব্রাভোর অভিজ্ঞতাই তুলে ধরা হয়নি। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গেও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। উদ্ধার অভিযান পরিচালনা ও এর পেছনের সামরিক তৎপরতা নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন। ব্রাভোর প্রকাশ্যে আসা এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এপ্রিলের ওই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রথমবারের মতো তাঁর নিজের মুখে সামনে এলো। যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর আহত অবস্থায় শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় দুই দিন টিকে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর হাতে উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের অন্যতম আলোচিত উদ্ধার কাহিনি হিসেবে সামনে এসেছে। সূত্র: সিবিএস নিউজ, নিউইয়র্ক পোস্ট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধ সপ্তম মাসে পা দিতেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশ্যে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এবার ইরানের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘাটতির কথা অস্বীকার করলেও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অস্ত্র উৎপাদন শিল্পকে জরুরি ভিত্তিতে 'যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে' কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের তথ্যমতে, গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মার্কিন যৌথ বাহিনী ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যা মজুত তলানিতে নামার অন্যতম প্রধান কারণ। অস্ত্রগুলোর আকাশছোঁয়া নির্মাণ ব্যয় ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। লকহিড মার্টিনের তৈরি প্রতিটি 'প্যাট্রিয়ট' ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। বর্তমানে তারা বছরে ৭৫০টি প্যাট্রিয়ট তৈরি করলেও, ইরানের সাথে যুদ্ধে ইতোমধ্যেই প্রায় ১,৫০০টি প্যাট্রিয়ট ব্যবহার করা হয়েছে এবং সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ফুরিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে লকহিড মার্টিন ৫৯ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় বছরে ২,০০০টি প্যাট্রিয়ট তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে ৫শ’ থেকে ১ হাজার সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং এল৩হ্যারিস (L3Harris)-এর মতো কোম্পানির রকেট মোটর তৈরির ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে পেন্টাগন এখন বিকল্প কৌশল হাতে নিয়েছে। ব্যয়বহুল অস্ত্রের বদলে কোঅ্যাসপায়ার (CoAspire)-এর মতো স্টার্টআপ থেকে তারা ১০ হাজার স্বল্প মূল্যের ক্রুজ মিসাইল কেনার পরিকল্পনা করছে, যার প্রতিটির দাম মাত্র কয়েক লাখ ডলার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর মার্ক ক্যানসিয়ান সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় অস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে নিতে এক থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। তাঁর মতে, ইরানের সাথে বর্তমান যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার মতো অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলেও, চীনের মতো পরাশক্তির সাথে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে সদস্য দেশগুলোর নেতারা বৈঠকে বসেছেন। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সম্মেলনটি ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জোটটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কণ্ঠ আরও শক্তিশালী করা এবং বিশ্বব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী বা মাল্টিপোলার করার লক্ষ্য সামনে রাখছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজনে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন। সম্প্রসারিত ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা এখন ১১ এবং জোটটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে প্রতিনিধিত্ব করে। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধই সম্মেলনের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ জোটটির ভেতরের মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িত থাকায় এবং চীন, ভারত ও অন্যান্য সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকায় আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলোতে ব্রিকসের জন্য অভিন্ন অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে একটি যৌথ অবস্থান তৈরি করা জোটটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে মতপার্থক্যের মধ্যেও ব্রিকস নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। জোটটির অন্যতম লক্ষ্য হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বাড়ানো এবং পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে আরও বিকল্প তৈরি করা। সম্মেলনে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহযোগিতার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও ব্রিকসের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে নয়াদিল্লির চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। ফলে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে না দেখে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ জোটটির বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ালেও একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও বাড়িয়েছে। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলো একই প্ল্যাটফর্মে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তারপরও ব্রিকস নেতারা গ্লোবাল সাউথের জন্য আরও শক্তিশালী ভূমিকা এবং একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। সম্মেলনের শেষ দিনে তাই মূল প্রশ্ন হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামলে ব্রিকস কতটা কার্যকরভাবে ঐক্যের বার্তা দিতে পারে এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও কতটা বাড়াতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা
মুসলিম ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের কোনো সমস্যা নেই। তেহরান শুধু নিজেদের আন্তর্জাতিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান চায়। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের পার্শ্ববর্তী এক বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আলোচনার সময় এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। বৈঠকে দুই নেতা আঞ্চলিক পরিস্থিতি, ইরান-মালয়েশিয়া সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান চায় বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, “আমেরিকা চায়, আমরা যারা বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ, তারা যেন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হই।” তিনি বলেন, ইরানের মূল দাবি হলো দেশটির আন্তর্জাতিক অধিকারকে সম্মান করা। পেজেশকিয়ান আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। তার দাবি, এ অঞ্চলের স্বাধীন দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক হামলার প্রসঙ্গ তুলে পেজেশকিয়ান বলেন, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এতে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শিশু ও বিজ্ঞানীরাও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে কিছু ভ্রাতৃপ্রতিম ও মুসলিম দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষা ছাড়া ইরানের সামনে আর কোনো পথ ছিল না। প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে থাকা হামলাকারীদের সামরিক স্থাপনাগুলোকে ইরান সেই কারণেই লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যুদ্ধ বা সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে চায় না। তিনি বলেন, তেহরান তার অধিকারকে সম্মান করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়। “আমরা কখনো আত্মসমর্পণ করব না”, বলেন পেজেশকিয়ান। ইরান তার জনগণের অধিকার ও দেশের স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বাইরের ‘আঞ্চলিক পুলিশ’ বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন নেই। তার মতে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অঞ্চলটির প্রধান দেশগুলোরই হওয়া উচিত। তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন। পেজেশকিয়ানের মতে, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ কমবে এবং আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারবে। বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই এ বিষয়ে মালয়েশিয়া নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি দেশটির সম্মান রয়েছে। আনোয়ার ইব্রাহিম ইরানের জনগণের প্রতিরোধ ও দেশটির সরকারের অবস্থানের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ইরান ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে এবারের আলোচনায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্মেলনের নেতারা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন। ইরান ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক এই বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। সূত্র: তাসনিম নিউজ, আনাদোলু এজেন্সি।
ইরানের বহুল আলোচিত শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আদলে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে লুকাস নামের একটি চালকবিহীন আকাশযান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি দাবি করেছেন, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি অনুসরণ করেই যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যবস্থা তৈরি করেছে। শনিবার ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খোররামাবাদে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় দেশের ড্রোন সক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মুসাভি। এ সময় তিনি দাবি করেন, শাহেদ শ্রেণির ড্রোনগুলো ইরানের তরুণ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ফল। এসব ড্রোনের কিছু যুদ্ধ পরিচালনার জন্য এবং কিছু নজরদারি ও গোয়েন্দা কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মুসাভির দাবি অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন বহর এখন দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, শাহেদ-১৩৬-এর সক্ষমতা দেখে যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের একটি ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নেয় এবং সেটির নাম দেওয়া হয় লুকাস। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিষয়টি ইরানের কর্মকর্তার বক্তব্যের মতো করে উপস্থাপন করা হয়নি। মার্কিন সামরিক তথ্য অনুযায়ী, লুকাসের পূর্ণ নাম ‘লো-কস্ট আনক্রুড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম’ বা এলইউসিএএস। অ্যারিজোনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রওয়ার্কস এটি তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহেদ-১৩৬ থেকে পাওয়া প্রযুক্তি ও নকশা বিশ্লেষণ করে লুকাস তৈরি করা হয়েছে। লুকাস মূলত একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন। অর্থাৎ এটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য পাঠানো হয় এবং প্রচলিত অর্থে ফিরে এসে পুনরায় ব্যবহারের জন্য তৈরি নয়। কম খরচে দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ চালানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, লুকাসের কার্যকর পাল্লা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর প্রতি ইউনিটের খরচও প্রচলিত অনেক দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিভিন্ন মার্কিন সূত্রে এর খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার থেকে ৫৫ হাজার ডলারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মতোই লুকাসের নকশায় রয়েছে দীর্ঘপাল্লার উড়ান এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর জোর। এই ধরনের ড্রোনের বড় সুবিধা হলো, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার না করেও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালানো সম্ভব। ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে ড্রোনটির সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়। রাশিয়া পরে শাহেদ-১৩৬-ভিত্তিক জেরান-২ নামে নিজস্ব সংস্করণও তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমূল্যের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন তৈরিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের আগস্টে মার্কিন বিমানবাহিনী শাহেদ-১৩৬-এর মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি চালকবিহীন আকাশযান তৈরির জন্য শিল্পখাতের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করে। পরে স্পেকট্রওয়ার্কসের তৈরি এ ধরনের ড্রোনকে সামরিক ব্যবহারের জন্য লুকাস কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে লুকাস ড্রোনের একটি ইউনিট মোতায়েনের কথা প্রকাশ্যে জানায়। ‘টাস্ক ফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক’ নামে একটি মার্কিন ইউনিটের অধীনে এগুলো পরিচালনার কথা জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে লুকাস প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। লুকাসের ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধে কম খরচের ড্রোনের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করা এখন সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। ইরানের আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রধান মুসাভি তার বক্তব্যে ইরানের ড্রোন সক্ষমতাকে দেশটির প্রতিরক্ষা শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-১’-এর কথাও উল্লেখ করেন। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের ওই অভিযানে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস তৈরি ইরানের শাহেদ-১৩৬-এর সরাসরি ‘হুবহু কপি’ কি না, তা নিয়ে প্রযুক্তিগতভাবে কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, লুকাস শাহেদ-১৩৬-এর নকশা ও প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার করা হলেও এর আকার, ওজন, পেলোড এবং কিছু প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য আলাদা। ফলে ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নকল করতে বাধ্য’ হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, সেটিকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত। তবে লুকাস যে শাহেদ-১৩৬-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, সেটি মার্কিন সামরিক তথ্য এবং একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সূত্র: তাসনিম নিউজ, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড, ফ্লাইটগ্লোবাল ও ইউরোনিউজ।
জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে গত জুলাইয়ে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে চীনা উৎস থেকে পাওয়া উচ্চমানের উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করেছিল ইরান। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল শনিবার এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটির উচ্চ রেজল্যুশনের উপগ্রহচিত্র সংগ্রহ করেছিল। ঘাঁটিটি দেশটির আজরাক এলাকায় অবস্থিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, আম্মান থেকে ঘাঁটিটির দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানকে এসব ছবি সরবরাহকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম তারা প্রকাশ করেননি। একই সঙ্গে চীনের সরকার সরাসরি এই কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল এমন অভিযোগও তোলা হয়নি। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বিষয়টি চীনা প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরেছেন। চীনের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে এ বিষয়ে প্রমাণ চাওয়া হয়েছে বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৭ জুলাই মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় প্রথমে দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। আরও একজন সেনা নিখোঁজ ছিলেন এবং চারজন আহত হন। পরে নিখোঁজ ওই সেনার অবস্থাও মৃত হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। ফলে ওই হামলায় মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনে। মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় বারবার ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ঘাঁটিটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক সম্পদ মোতায়েন রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘাঁটিটি এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। উপগ্রহচিত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হামলায় লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা বাড়ছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা উৎস থেকে পাওয়া চিত্র ইরানকে ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সেখানে থাকা সামরিক সম্পদের অবস্থান সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা দিতে পারে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে চীনা প্রযুক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে এর আগেও ওয়াশিংটন উদ্বেগ জানিয়েছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সংগ্রহে সহায়তার অভিযোগে চীন ও হংকংভিত্তিক বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের মে মাসের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় উপগ্রহচিত্র সরবরাহের এই নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে ইরানের হামলায় চীনা উৎসের উপগ্রহচিত্র ব্যবহারের খবরটি মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হলেও, এতে চীন সরকার সরাসরি জড়িত ছিল এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। ঘটনাটি বরং ইরানের সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে বেসরকারি বা চীনা বাণিজ্যিক উপগ্রহতথ্যের সম্ভাব্য ব্যবহার এবং এ ধরনের সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আল জাজিরা
ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোকা দখল করেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী। বৃহস্পতিবারের এই অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে মোকা বন্দর। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে থাকা এই প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। ফলে এলাকাটিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। মোকা দখলের পর হুতি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছে এবং কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও এগিয়েছে বলে ইয়েমেনের সরকারি সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি ধুবাব এলাকার দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরব তেল পরিবহনে লোহিত সাগরের পথকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। সেই পথও যদি হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বা হামলার ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে। সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে তেলের বাজারে দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৮ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। সরবরাহপথ নিয়ে নতুন উদ্বেগের কারণে চলতি সপ্তাহে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এদিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুইবার ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার অনুরোধ করেন। তবে ট্রাম্প সরাসরি হামলার নির্দেশ দেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা ও টার্গেটিং সহায়তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সিএনএনের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, সৌদি বাহিনীকে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য ও ভৌগোলিক টার্গেটিং সহায়তা দিতে সৌদি আরবে শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা রয়েছেন। তবে তারা সরাসরি হামলা, সৌদি যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সরবরাহ বা অন্যান্য সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছেন না বলে জানানো হয়েছে। একই সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ হওয়া নিয়ে নতুন করে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু করার জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই। বরং আবার একই পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে জানান। ট্রাম্প আরও বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হবে। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ ট্রাম্পের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ পর্যন্তও চলতে পারে। ইয়েমেনের পরিস্থিতিও ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ২০২২ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুতিদের সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মোকা দখলের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে শহর ছেড়ে দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের কর্মকর্তারাও ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। হুতিদের লোহিত সাগর উপকূলে অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে একদিকে ইয়েমেনে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব প্রণালি ঘিরে সংকট বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে একাধিক মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে সরাসরি তথ্য থাকা সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, হামলায় প্রায় আটটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট যুদ্ধবিমানেও গুরুতর ক্ষতি হয়েছে এবং সেটির একটি ডানা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানগুলো পরে আবার কার্যক্রমে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোরের মধ্যে জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে এই হামলা চালানো হয়। আল আজরাক এলাকার কাছে অবস্থিত ঘাঁটিটি জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিবিএস নিউজ জানায়, হামলার সময় ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজগুলোর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সরাসরি বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তারা প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দেন। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানগুলোর ক্ষয়ক্ষতিকে তুলনামূলকভাবে সামান্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় আটটি এফ-১৫ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেগুলোকে আবার পরিষেবায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। অন্যদিকে এ-১০ থান্ডারবোল্ট যুদ্ধবিমানটির ক্ষতি ছিল বেশি। সিবিএসের সূত্র অনুযায়ী, ওই যুদ্ধবিমানটিতে আঘাত লাগে এবং পরে সেটির একটি ডানা অনুপস্থিত অবস্থায় পাওয়া যায়। রয়টার্সও সিবিএসের তথ্যের ভিত্তিতে একই ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে। হামলার সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ৩০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্ডানে থাকা মার্কিন বাহিনী ওই হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। একই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জর্ডানে চালানো এই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা একাধিক সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি জর্ডানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। এই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর কথা জানায়। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের একটি মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ওই ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্য করা হয়। চারটি ট্যাংকারে ওমান উপসাগরে এবং একটি ট্যাংকারে পারস্য উপসাগরের খার্গ দ্বীপের কাছে হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওই হামলার পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জর্ডানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশটির দিকে ছোড়া ২০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। জর্ডানের পক্ষ থেকে ওই হামলায় কোনো হতাহতের খবর জানানো হয়নি। হামলার পর জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে থাকা সামরিক সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ও এ-১০ যুদ্ধবিমানে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সামনে আসায় ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। তবে সিবিএসের প্রতিবেদনে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানগুলোকে পুনরায় কার্যক্রমে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও এ-১০ যুদ্ধবিমানটির পরবর্তী ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। এই হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার নতুন একটি পর্যায় হিসেবে সামনে এসেছে। এর আগে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এবার সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং এর পর ইরানের পাল্টা হামলার কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে একাধিক যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশ পেল। সিবিএস নিউজ ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, হামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মধ্যে রয়েছে একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানের ডানা বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং প্রায় আটটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের সামান্য ক্ষতি। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ইরানে জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ২০ বছর বয়সী যমজ দুই বোন তারানেহ রাহিমি ও রোমিনা রাহিমিকে কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, চার মাস নিখোঁজ থাকার পর তাদের মায়ের সঙ্গে দেখা হলে মেয়েদের চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে তিনি প্রথমে তাদের চিনতেই পারেননি। পরে তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড এবং রোমিনাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ইরানের ইসফাহানে জানুয়ারির বিক্ষোভকে ঘিরে ১৬ জনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় দুই বোনকেও আসামি করা হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর মুখোশধারী নিরাপত্তা সদস্যরা তাদের আলাদা অভিযানে আটক করে নিয়ে যায়। এরপর প্রায় চার মাস তাদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। মে মাসে ইসফাহানের দৌলতাবাদ কারাগারে মেয়েদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান তাদের মা মারজিয়েহ নুরমোহাম্মাদি। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের চাচাতো ভাই মাসুদ নুরমোহাম্মাদির দাবি, তখন দুই বোনের শরীরে মারধরের চিহ্ন ছিল, মুখ ফুলে গিয়েছিল এবং চুলের বড় অংশ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতেরও অভিযোগ করেছেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, তারানেহকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করতে তার যমজ বোন রোমিনাকে যৌন নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, চাপের মুখে তারানেহ এমন একটি স্বীকারোক্তিতে সই করেন, যা পরে মামলায় ব্যবহার করা হয়। আইনজীবীদের বরাত দিয়ে পরিবার আরও বলেছে, স্বীকারোক্তিগুলো নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। তারানেহের আগে পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছিল এবং সেখানে ধাতব প্লেট ও স্ক্রু লাগানো ছিল বলে জানিয়েছেন তাদের চাচাতো ভাই। কারাগারে নির্যাতনের পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। এমনকি কারাগারের একজন চিকিৎসক তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। দুই বোনের বিরুদ্ধে ‘মোহরাবেহ’ বা ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। ইসফাহানের বিক্ষোভের সময় একটি জুতার দোকানের কাছে মলোটভ ককটেল তৈরির অভিযোগও করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের সময় দুজনের মৃত্যুর জন্যও আসামিদের দায়ী করার অভিযোগ তুলেছে, যদিও তাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়নি। পরিবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, দুই বোনের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। তাদের আইনজীবীরা মামলার নথি পর্যালোচনা করে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে করা আইনজীবীদের অভিযোগও এখনো ইসফাহানের আদালতে এগোয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে বিক্ষোভকারীদের আটক, নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করেছিল, বিক্ষোভে আটক অনেক মানুষ নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং অন্যায্য বিচারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তারানেহ ও রোমিনার পরিবার এখন তাদের সাজা বাতিল ও পুনর্বিচারের দাবি জানাচ্ছে। মামলাটি ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া, জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি মার্কিন চালকবিহীন ডুবোজাহাজ জব্দ করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ দাবি প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ওই ডুবোযানটি এক দিনেরও বেশি সময় আগে ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়েছিল এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা শ্রেণিবদ্ধ সরঞ্জাম ছিল না। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আইআরজিসির নৌবাহিনীর এক বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি আধুনিক চালকবিহীন ডুবোজাহাজ আটক করেছে। ইরানের দাবি, ডুবোযানটিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডুবোযানটি ‘ডাইভ-এলডি’ মডেলের একটি স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান। এটি ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল তৈরি করেছে। প্রায় ৫ দশমিক ৮ মিটার দীর্ঘ এই যানটি মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সমুদ্রের নিচে বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারে। অ্যান্ডুরিলের তথ্য অনুযায়ী, ডাইভ-এলডি সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি, সমুদ্রের নিচে মাইন শনাক্ত ও অপসারণে সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং কেবল ও পাইপলাইনের মতো পানির নিচের অবকাঠামো পরিদর্শনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি একবার ঘাঁটি থেকে বের হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত কার্যক্রম চালাতে সক্ষম এবং প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরতায় নামার জন্য নকশা করা হয়েছে। তবে ইরানের ‘জব্দ’ করার দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগনের বক্তব্য ভিন্ন। পেন্টাগনের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, একটি ডুবো ড্রোন এক দিনেরও বেশি সময় আগে ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়েছিল। সেটি আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি পুরোনো একটি মডেল ছিল এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। একই সঙ্গে এতে শ্রেণিবদ্ধ সোনার বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। তবে পেন্টাগনের বক্তব্যে ডুবোযানটি কীভাবে ইরানের হাতে পৌঁছেছে বা ইরান সেটি জব্দ করেছে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা হয়নি। রয়টার্সও ঘটনাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। অ্যান্ডুরিলের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করত। সাম্প্রতিক সংঘাত ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে, আগের দিন যা ছিল আটটি। হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু জ্বালানি পরিবহনের জন্য নয়। পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এটি। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। মার্কিন সামরিক বাহিনী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চালকবিহীন নৌযান ও ডুবোযানের ব্যবহার বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে সমুদ্রের বিশাল এলাকায় নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা। এসব প্রযুক্তি প্রচলিত সামরিক সরঞ্জামের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে। ডাইভ-এলডি সেই নতুন প্রজন্মের স্বয়ংক্রিয় ডুবোযানগুলোর একটি। অ্যান্ডুরিলের তথ্য অনুযায়ী, এটি দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ২০২৪ সালে মার্কিন সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্সস্কুপ জানিয়েছিল, প্রতিটি ডাইভ-এলডির মূল্য প্রায় ২৫ লাখ ডলার। ইরানের হাতে এমন একটি মার্কিন ডুবোযান চলে যাওয়ার দাবি সত্য হলে ঘটনাটি সামরিক প্রযুক্তির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কারণ একটি স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান কী ধরনের সেন্সর, যোগাযোগব্যবস্থা ও নেভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তা প্রতিপক্ষের হাতে গেলে সেগুলো বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান ঘটনায় ইরান আসলে কী ধরনের ডুবোযান জব্দ করেছে এবং সেটির ভেতরের প্রযুক্তি কতটা অক্ষত রয়েছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব হরমুজ প্রণালির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। মঙ্গলবার সৌদি আরবের কয়েকটি শহরে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জাহাজ ও তেল পরিবহনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপও হয়েছে। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ডুবোযান নিয়ে ইরানের দাবি কেবল একটি সামরিক সরঞ্জাম আটকের ঘটনা নয়, বরং দুই দেশের চলমান সংঘাতে পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তারও একটি উদাহরণ। তবে ডুবোযানটির প্রকৃত অবস্থা এবং এটি কীভাবে ইরানের হাতে এসেছে, সে বিষয়ে পেন্টাগন ও ইরানের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ‘জব্দ’ করার দাবিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। সূত্র: রয়টার্স
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ সংঘাতে একাধিক ফ্রন্ট একসঙ্গে সক্রিয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, তেহরান হিজবুল্লাহ, হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের সমন্বয় করে একই সময়ে ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরির কৌশল নিয়ে কাজ করছে। জেরুজালেম পোস্টের ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের লক্ষ্য হলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সময় যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল, ভবিষ্যতে তা এড়ানো। ওই হামলায় হামাস আকস্মিকভাবে ইসরায়েলে আক্রমণ চালালেও একই সময়ে ইরানপন্থি অন্যান্য গোষ্ঠী বড় পরিসরে আলাদা ফ্রন্ট খুলতে পারেনি। নতুন পরিকল্পনায় শুরু থেকেই একাধিক ফ্রন্টকে একই অভিযানের অংশ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ইসরায়েলি মূল্যায়নে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করছেন। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে সংঘাত শুরু হলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর কার্যক্রম যেন বিচ্ছিন্নভাবে না চলে, বরং সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। ইসরায়েলি সামরিক মূল্যায়নে এরই মধ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আবারও সমন্বয় বাড়ার কথা বলা হয়েছে। আগস্টে জেরুজালেম পোস্টের আরেক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর মূল্যায়নের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ইরানের সহায়তায় হামাস ও হিজবুল্লাহ নিজেদের কার্যক্রমের সমন্বয় বাড়াচ্ছে। নতুন কৌশলের পেছনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। হামাসের ওই হামলার পর হিজবুল্লাহ লেবানন সীমান্ত থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করলেও শুরুতেই হামাসের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়নি। ইসরায়েলি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ও হিজবুল্লাহ হামাসের ওই অভিযানের সব বিস্তারিত তথ্য বা সঠিক সময় সম্পর্কে আগে থেকে অবহিত ছিল না। এবার তেহরান সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে আগাম সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানপন্থি এই নেটওয়ার্কে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় একযোগে তাদের সক্রিয় করা হলে ইসরায়েলের ওপর একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি হতে পারে বলে ইসরায়েলি বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তনও ইরানের কৌশলে প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পর ইরাক ও ইয়েমেনভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণ ও সামরিক সমন্বয় জোরদারের বিষয়ও রয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনো নির্দিষ্ট হামলার সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এই সম্ভাব্য সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে ইরানের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে বিষয়টি মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটি কৌশলগত এলাকায় হিজবুল্লাহর টানেল নেটওয়ার্ক থেকে যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়ার দাবি করে। হিজবুল্লাহ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি। বিশ্লেষকদের কাছে তাই ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর খবরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ হামাস, হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী একই সময়ে সক্রিয় হলে সংঘাত শুধু ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে ইরান সত্যিই এমন একটি সমন্বিত হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, কিংবা এ ধরনের কোনো অভিযান বাস্তবে কবে বা কীভাবে হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট
যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো ইরানে তৈরি নতুন একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করার দাবি করেছে তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ী বলেছেন, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আগে মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজের ওপর ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয় এবং এর পর জাহাজটি সরে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের এই নির্দিষ্ট দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজায়ী বলেন, প্রথমবারের মতো একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে ইরানের তৈরি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছিল এবং জাহাজটি এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তিনি অবশ্য কোন জাহাজকে লক্ষ্য করা হয়েছিল বা ঠিক কোথায় এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে, তা জানাননি। ইরানের এই দাবির পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এর আগে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই দুটি যুদ্ধজাহাজ হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি। সেন্টকম আরও জানিয়েছে, ইরানের হামলার পর তারা তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ অচল করে দিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে রেজায়ীর নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। রেজায়ী একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান শিগগিরই প্রণালির বাইরে একটি নতুন ‘নিষিদ্ধ বা সীমিত’ নৌ চলাচল অঞ্চল ঘোষণা করবে। ওই এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে। এতে বিমা পাওয়া ও পরবর্তী সময়ে সমুদ্রপথে চলাচলের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনে এই জলপথ ব্যবহৃত হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রবাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে এমন একটি খসড়া প্রস্তাব তুলেছে, যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর পথ তৈরি হতে পারে। প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও তথ্য দিতে এবং আইএইএ পরিদর্শকদের পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চাপ দেওয়া। আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, ইরান এখনো সংস্থাটিকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ও পারমাণবিক উপাদানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। তাঁর মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর পূর্ণ নজরদারি পুনরায় চালু করা জরুরি। তবে তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেখানে আইএইএর পরিদর্শন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর দাবি, পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক চাপ তৈরির জন্য আইএইএর পারমাণবিক ইস্যুকে ব্যবহার করছে। বাঘাই আরও সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব পাস হলে তেহরান প্রয়োজনীয় পালটা পদক্ষেপ নেবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর তৈরি পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে পরিদর্শন পুনরায় চালুর দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, ইরানের তেল রপ্তানি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনও অনেক দূরে। সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জাহাজকেন্দ্রিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে ইরানের দাবি অনুযায়ী নতুন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রটি কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত করেছে কি না, কিংবা কোনো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের এই নির্দিষ্ট দাবি স্বীকার করেনি। ফলে ঘটনাটি আপাতত ইরানের পক্ষ থেকে করা একটি সামরিক দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই দেশটির মানচিত্রকে নিজের মুখের আদলে পরিবর্তন করা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ছবিটি প্রকাশ নিজের মুখের আদলে ইরানের মানচিত্র পোস্ট করলেন ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই দেশটির মানচিত্রকে নিজের মুখের আদলে পরিবর্তন করে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ছবিটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। ছবিতে ইরানের প্রচলিত মানচিত্রের সঙ্গে পরিবর্তিত একটি মানচিত্র পাশাপাশি দেখানো হয়েছে। ছবিটির ‘বিফোর’ অংশে ইরানের স্বাভাবিক মানচিত্র দেখা যায়। আর ‘আফটার’ অংশে দেশটির সীমানা এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে সেটি ট্রাম্পের মুখমণ্ডল ও চুলের পাশের অবয়বের মতো দেখায়। তবে ছবিটি প্রকাশের সঙ্গে এর উদ্দেশ্য বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি ট্রাম্প। ফলে কেন তিনি এমন একটি ছবি প্রকাশ করেছেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক মানচিত্র নয় এবং এর মাধ্যমে ইরানের সীমান্ত পরিবর্তন বা নতুন কোনো ভৌগোলিক দাবির ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পরিবর্তিত ছবি প্রকাশ করেছেন। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প একই সময়ে আরও কয়েকটি পোস্ট করেন। এসব পোস্টে ইরান ও চলমান সংঘাত নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। ট্রাম্পের এমন প্রতীকী ছবি প্রকাশের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কেড়েছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা চলার সময়ে দেশটির মানচিত্রকে নিজের মুখের আদলে উপস্থাপন করায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ছবিটির প্রকৃত উদ্দেশ্য বা এর মাধ্যমে ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।করেন তিনি। এতে ‘বিফোর’ আগের অংশে ইরানের প্রচলিত মানচিত্র দেখানো হলেও ‘আফটার’ তথা পরের অংশে দেশটির সীমানা পরিবর্তন করে ট্রাম্পের মুখ ও চুলের পাশের অবয়বের মতো করে দেখানো হয়েছে। তবে ছবিটির সঙ্গে এর উদ্দেশ্য বা অর্থ সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেননি ট্রাম্প। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক নতুন মানচিত্র বা ইরানের সীমান্ত পরিবর্তনের ঘোষণা নয়; বরং ট্রাম্পের পোস্ট করা পরিবর্তিত একটি ছবি। একই সময়ে ইরানকে ঘিরে আরও কয়েকটি পোস্টও করেন তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে নিহত এক মার্কিন সেনা কর্মকর্তার পরিবারকে যুদ্ধকালীন কিছু আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে মার্কিন এয়ার ফোর্স। পরে জানানো হয়, ওই পরিবারের প্রাপ্য সুবিধাগুলো আসলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি মার্কিন বিমানবাহিনীর মেজর অ্যালেক্স ক্লিনারের পরিবারকে ঘিরে। ৩৩ বছর বয়সী ক্লিনার মার্চে পশ্চিম ইরাকে একটি KC-135 জ্বালানি সরবরাহকারী সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ছয় সদস্যের একজন। বিমানটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে সহায়তা করছিল। ক্লিনারের স্ত্রী লিবি ক্লিনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না হওয়ায় পরিবারটি কিছু যুদ্ধকালীন সুবিধার জন্য যোগ্য নয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ঘটনাটি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। এরপর এয়ার ফোর্স লিবি ক্লিনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার স্বামীর বেতন ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা করে। এয়ার ফোর্স জানায়, ক্লিনারের প্রাপ্য সব কমব্যাট থিয়েটার সুবিধা তার বকেয়া বেতনসহ আগেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল হ্যাজার্ড পে এবং কমব্যাট জোন ট্যাক্স সুবিধা। তবে এসব সুবিধা কীভাবে বেতন বিবরণীতে দেখানো হয়েছিল, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। মার্কিন সামরিক ব্যবস্থায় তথাকথিত কমব্যাট পে পেতে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা সবসময় প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন এবং শত্রুতামূলক হামলার মতো পরিস্থিতির ওপর এসব সুবিধা নির্ভর করতে পারে। ইরান সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স সম্প্রতি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি যুদ্ধ বলতে চান না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সংঘাতটিকে ‘মিলিটারি কনফ্লিক্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ৭৯০ জন আহত হয়েছেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লিবি ক্লিনারের জন্য তার স্বামীর মৃত্যুর পর একটি গোফান্ডমি তহবিলও খোলা হয়েছিল। সেখানে ১৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। লিবি বলেন, শোকাহত সামরিক পরিবারগুলোকে যেন সরকারি সুবিধা পেতে জটিল সামরিক পরিভাষা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বুঝতে না হয়, সেটিই তার মূল উদ্দেশ্য। তিনি চান, তার অভিজ্ঞতার পর অন্য পরিবারগুলো যেন শুরু থেকেই নিজেদের প্রাপ্য সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পায়।
ইরানের দুটি মার্কিন নৌযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবারের এই হামলার কথা জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি। সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা অভিযান চালায়। মার্কিন একটি বিমানবাহী রণতরী ও গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার হামলা এড়িয়ে যায়। হামলায় তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করা হয়। এর মধ্যে একটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে এবং আরেকটি জাস্কের কাছে অচল করে দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় জাহাজটি ওমান উপসাগরে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টকম। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, জাহাজগুলো ইরানের আইআরজিসি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে ব্যবহৃত একটি ‘শ্যাডো অয়েল নেটওয়ার্কের’ অংশ। তবে এই অভিযোগের বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, দুটি মার্কিন নৌযানে হামলা চালালে ইরানকে আরও বড় অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, প্রয়োজন হলে ইরানের তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে আরও অভিযান চালানো হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন হামলা ও নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক নৌযানকে আরও কঠোরভাবে লক্ষ্যবস্তু করবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরও দাবি করেছে, তারা তিনটি জাহাজ ও তিনটি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে এই পাল্টা হামলার দাবি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে সামরিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।