মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জাপান। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি সহায়তায় ১০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। বুধবার এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলো পারস্পরিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি অঞ্চলের সংকট অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। জাপান সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে সহায়তা করা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও অবরোধের কারণে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অর্থায়ন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের প্রায় এক বছরের অপরিশোধিত তেল আমদানির সমপরিমাণ ব্যয় মেটাতে সক্ষম। এ তহবিল বিভিন্ন উৎস থেকে আসবে, যার মধ্যে রয়েছে জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। বাংলাদেশসহ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতারা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে জাপান সরকার আশ্বস্ত করেছে, এই সহায়তা কর্মসূচির ফলে তাদের নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। দেশটির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহারের প্রস্তুতিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এশিয়ার জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে জাপানের এই সহায়তা উদ্যোগ আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন অবরোধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের বিপরীতে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আর এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনকে আলোচনায় ফেরাতে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নির্দেশে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের লক্ষ্য ছিল দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলা। তবে আরব কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিচালিত হয়। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালি-তে হামলার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে, যার ফলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায় এবং তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব প্রণালীতেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এদিকে ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীদের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান তাদের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গাজা যুদ্ধের সময় হুতিরা এই পথে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ওয়াশিংটন। তবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন সামরিক উত্তেজনার বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের মতে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় আগামী সপ্তাহগুলোতে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিসচিব ক্রিস রাইট। ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ‘সেমাফোর ওয়ার্ল্ড ইকোনমি’ সম্মেলনে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকবে এবং তা আরও বাড়তে পারে। তার মতে, খুব শিগগিরই—সম্ভবত আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই—তেলের দাম শিখরে পৌঁছাতে পারে। ক্রিস রাইট আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটলে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে দাম ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। তবে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত হরমুজ প্রণালির নৌ-অবরোধে সমর্থন দেবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, চাপের মুখে পড়ে ব্রিটেন ইরানের সঙ্গে কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াবে না। স্টারমার জোর দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং এটি উন্মুক্ত রাখা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অপরিহার্য। তিনি জানান, এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই অবস্থান বজায় রাখবে। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জার্মানি বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ ঘোষণা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে আগামী দুই মাসের জন্য পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর কর কমানো হবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ১৭ ইউরো সেন্ট কর কমানো হবে। অন্যদিকে চীনও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের হামলায় একাধিক শহরে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল আদালতে একটি আবেদন করেছে, যাতে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি সংক্রান্ত নথি প্রকাশে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বাধ্য করা যায়। জাপানও এই সংকট নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দেশটির মন্ত্রিসভার মুখ্য সচিব মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি টোকিও। বরং তারা সংঘাত প্রশমন ও নৌ চলাচলের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান–সংকটের ৪৫তম দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ক্রমেই মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন অবরোধের ঘোষণা তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশগুলো উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছে।
ইরান–সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়। সংস্থাটির মতে, চলমান এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘ত্রিমুখী ধাক্কা’র মুখে ফেলেছে—যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, খাদ্য সংকট এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংকট বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিনের উন্নয়নমূলক অগ্রগতিকে উল্টে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব হবে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। সংস্থাটির প্রশাসক এবং বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু বলেন, এ ধরনের সংঘাত উন্নয়নকে বহু বছর পেছনে ঠেলে দেয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এমনকি যদি এখনই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়, তবুও এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজে পড়ে গেছে এবং এর প্রভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে। তেহরানে সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সার উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। কৃষি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সারের ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের কারণে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নতুন করে খাদ্য সংকট ডেকে আনতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে পারে। ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যুদ্ধবিরতি এই সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়; দারিদ্র্য মোকাবিলায় বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় গত এক দশকে অতি দারিদ্র্য হ্রাসে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড স্পষ্ট করে জানায়, এই পদক্ষেপ মূলত ইরান গামী ও সেখান থেকে আসা জাহাজের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে এবং নির্দিষ্ট সময় থেকে এটি চালু হবে। ট্রাম্প আরও সতর্ক করে বলেন, ইরানকে অর্থ দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করবে, সেগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকলেও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তার ভাষায়, অবৈধভাবে অর্থ প্রদান করে নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব হবে না। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন অবরোধ কার্যত সামরিক পদক্ষেপের শামিল এবং এটি টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল নৌ-সামরিক শক্তি প্রয়োজন। সাবেক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা ডানা স্ট্রল মনে করেন, দ্রুত ফল পেতে চাইলেও এমন অভিযান এককভাবে পরিচালনা করা কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এদিকে সাবেক নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল গ্যারি রাফহেড সতর্ক করেছেন, অবরোধ শুরু হলে ইরান প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপসাগরীয় এলাকায় জাহাজে হামলা বা মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে। তার মতে, এমন পদক্ষেপের জবাব ইরান কোনো না কোনোভাবে দেবে। এরই মধ্যে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, প্রণালির কাছে কোনো সামরিক উপস্থিতিকে তারা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখবে এবং কঠোর জবাব দেবে। অন্যদিকে, ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম কিছু সময়ের জন্য বেশি থাকতে পারে। ইতোমধ্যে এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান যদি আরও উত্তেজনা বাড়ায়, তাহলে এই পদক্ষেপ কীভাবে জ্বালানির দাম কমাতে সহায়ক হবে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের সমাধান সামরিক পদক্ষেপে নয়, বরং কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সম্ভব। সূত্র– রয়টার্স
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জলযানের ওপর নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও পরবর্তীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই অবরোধ কেবল ইরানগামী জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে। সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) থেকে এই অবরোধ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। নৌ অবরোধ কী আন্তর্জাতিক সামরিক নীতিমালা অনুযায়ী, নৌ অবরোধ হলো যুদ্ধকালীন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে শত্রু রাষ্ট্রের বন্দর, উপকূল বা আকাশপথে প্রবেশ ও প্রস্থান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে শত্রু ও নিরপেক্ষ—উভয় পক্ষের যানবাহনই বাধার মুখে পড়তে পারে। বাস্তব প্রয়োগ ও কৌশল ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে দ্রুত কার্যকর করার কথা বললেও বাস্তবে এটি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে। সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের আরব সাগর ও ওমান উপসাগরীয় বন্দরের দিকে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোই মূলত নজরদারিতে থাকবে।একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ন্যাটোসহ মিত্র দেশগুলোও এই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পারে। তবে যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করলেও সরাসরি অবরোধে অংশ নেবে না। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অবরোধের ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগে প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এশিয়ার শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা ও ডলারের চাহিদা বাড়ছে, যা উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি এই অবরোধ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইরান সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও সমুদ্রপথে মাইন পেতে বা ড্রোন হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি জটিল করতে পারে। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিকে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছে বিমা কোম্পানিগুলো, যার ফলে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে প্রশ্ন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া বিতর্কিত এবং অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই অবরোধের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। চীন ও ভারত বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্যও চাপে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ একটি উচ্চ ঝুঁকির কৌশল, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
হরমজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের দীর্ঘসূত্রতা সহসাই কাটছে না। পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও জাহাজ মালিক এবং বিমাকারীরা এখনও এই রুটে চলাচলের ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছেন না। গ্লোবাল মার্কেট অ্যানালিস্ট লালে আকোনার জানান, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ওপর ভরসা করে খালি জাহাজগুলো পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে চাইছে না। বর্তমানে প্রায় ৪০০ তেলের ট্যাঙ্কার উপসাগরের ভেতরে আটকা পড়ে আছে, বিপরীতে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে মাত্র ১০০টি জাহাজ। শিপিং বিশেষজ্ঞদের মতে, আজ এই জলপথ খুলে দিলেও বাজার স্বাভাবিক হতে আগামী জুলাই মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। কেবল জ্বালানি তেল নয়, বিশ্বের ৩০ শতাংশ সারের সরবরাহ এবং বিপুল পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। গত ছয় সপ্তাহের সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেলের উৎপাদনও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ মজুত করার জায়গা নেই। নতুন জাহাজ না আসা পর্যন্ত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না, যা বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্য এবং সংকটের স্থায়িত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন অপসারণে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী কাজ শুরু করেছে—এমন দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তবে এই তথ্য দ্রুতই নাকচ করেছে ইরান। শনিবার সেন্টকম জানায়, তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ—ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই. পিটারসন ও ইউএসএস মাইকেল মারফি—হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আরব উপসাগরে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে মাইন অপসারণসহ বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। মার্কিন পক্ষের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ রুট তৈরি করা হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই পদক্ষেপ অঞ্চলটির পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে এবং শিগগিরই নিরাপদ পথ বাণিজ্যিক খাতের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে ইরান এই দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, মার্কিন জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেছে—এমন কোনো তথ্য সঠিক নয়। তার মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যেকোনো জাহাজের চলাচল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই ঘটে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রণালিতে কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি দেখা গেলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই মার্কিন জাহাজ ওই পথে চলাচল করে থাকে, তবে তা ইরানের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছিল। সেখানে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিকে দুই দেশের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি সংলাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর শুরু হওয়া এই আলোচনায়ও বেশ কিছু ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং আঞ্চলিক সামরিক অভিযান—এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। ইরানি সূত্রগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নটিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালি আংশিক খোলার ইঙ্গিত দিলেও, মাইন থাকার অজুহাতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই দাবি মানতে নারাজ তেহরান।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রায় ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা। সংঘাতের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল বা পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে পরিস্থিতি জটিল হতে থাকলে ইরান তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। তারা সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের বদলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার দিকে নজর দেয়। এই সংকীর্ণ জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এখান দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। ইরানের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়, কারণ তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বুঝতে পারে, এই গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রচলিত যুদ্ধের তুলনায় বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব। ফলে জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলে ওয়াশিংটনকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করা হয়। অবশেষে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় এই প্রণালির নিরাপত্তা ও পুনরায় চালু রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়। যদিও অতীতে ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার, বাস্তবে কখনো পুরোপুরি তা করা হয়নি—এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালেও না। বর্তমানে ইরানের ভেতরে এই প্রণালি ভবিষ্যতে কীভাবে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটির পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাবও দিয়েছে। এমনকি প্রতি তিন ব্যারেল তেলের জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের প্রস্তাবও উঠেছে। যুদ্ধবিরতির পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিজয়ের একটি বর্ণনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, দেশটি বিদেশি চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। Fars News Agency জানিয়েছে, ইরানের পরিকল্পনায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই বিজয়ের চিত্রের আড়ালে বাস্তবতা বেশ জটিল। সংঘাতে ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে, যার ফলে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শান্তি আলোচনার আগে হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান দাবি ছিল। এদিকে ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। পরে হোয়াইট হাউস জানায়, এই ধরনের বক্তব্যকে তারা গুরুত্বসহকারে দেখছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ খাতিবজাদেহ বলেন, প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে পরিস্থিতি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান এই প্রণালিতে শুল্ক আরোপ বা নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলকে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখে—তাই এ ধরনের পদক্ষেপকে তারা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি জলপথ নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। সূত্র: BBC Bangla
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ৪০ দিনের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সত্য সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। বিবিসির ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স সংবাদদাতা জিয়ার গোলের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সংঘাতের শুরুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সামরিক স্থাপনা ও নেতাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়, তখন তেহরান তাদের রণকৌশল বদলে ফেলে। তারা প্রচলিত যুদ্ধের বদলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করে। উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের সিংহভাগ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন যে, এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়া সম্ভব। গত কয়েক সপ্তাহে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। মূলত এই চাপের মুখেই ওয়াশিংটন নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচলিত সামরিক শক্তির চেয়েও এই জলপথ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ইরানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি-তে জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সংঘাত বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও শিপ ট্র্যাকিং তথ্যে দেখা গেছে, এই জলপথ দিয়ে খুব সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। এতে করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট কমার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাজার বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, সংঘাতের আগে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু বুধবার (৮ এপ্রিল) মাত্র পাঁচটি এবং বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সাতটি জাহাজ চলাচল করেছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগর এলাকায় প্রায় ৬০০টির বেশি জাহাজ, যার মধ্যে অন্তত ৩২৫টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার, আটকে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং উচ্চ বিমা খরচের কারণে জাহাজ মালিকরা এখনো এই পথ ব্যবহারে অনাগ্রহী। বিশেষ করে সমুদ্রপথে মাইন থাকার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, ইরান নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি মানছে না। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি লেবাননে চলমান হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করার দায়িত্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। এই অচলাবস্থার প্রভাব ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় তেলের দাম সাময়িকভাবে কমলেও, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক)-এর প্রধান সুলতান আহমেদ আল জাবের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি কার্যত এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি এবং এটি রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল এক ভয়াবহ সতর্কবাণী উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, চলমান ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট তেল ও গ্যাস সংকট ১৯৭৩, ১৯৭৯ এবং ২০২২ সালের সম্মিলিত সংকটের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী রূপ নিয়েছে। ফরাসি সংবাদপত্র ল্য ফিগারোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা ইতিহাসের সবথেকে গুরুতর সংকট। আইইএ প্রধানের মতে, এই সংকটে সবথেকে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। তেলের আকাশচুম্বী দামের কারণে এসব দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির হার দ্রুত ত্বরান্বিত হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোসহ জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও এই অর্থনৈতিক ধাক্কার বাইরে থাকবে না বলে তিনি সতর্ক করেন। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা আসার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া চরম হুঁশিয়ারির পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ট্রাম্প তার বার্তায় উল্লেখ করেন, ইরান যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তিতে না আসে তবে আজ রাতেই একটি আস্ত সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.৭ শতাংশ বেড়ে ১১০.৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং নিউ ইয়র্ক লাইট ক্রুডের দাম ২.৫ শতাংশ বেড়ে ১১৫.১৭ ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা এখন বিশ্ববাসীর প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আইইএ প্রধানের এই বিরল সতর্কতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
বিমানে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের (জেট ফুয়েল) মূল্য আবারও বৃদ্ধি করেছে সরকার। এপ্রিল মাসের জন্য অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার তেলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন এই দর ঘোষণা করেছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটের জন্যও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১.৩২১৬ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের প্রভাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই এই মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসে একধাপে জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি লিটার তেলের দাম ছিল ১১২ টাকা ৪১ পয়সা, যা মার্চ মাসে একলাফে ২০২ টাকা ২৯ পয়সায় পৌঁছায়। এপ্রিল মাসে আবারও দাম বাড়ায় গত দুই মাসের ব্যবধানে বিমানের জ্বালানি খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির এই ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির ফলে আকাশপথে যাতায়াতের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জেট ফুয়েলের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে বিমান সংস্থাগুলো টিকে থাকার স্বার্থে টিকিটের দাম পুনরায় বাড়াতে বাধ্য হবে, যা পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রাখার ঘোষণা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই জাপানি শিপিং কোম্পানি মিৎসুই ওএসকে লাইনসের একটি এলপিজি ট্যাঙ্কার নিরাপদে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অতিক্রম করেছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) কোম্পানিটির এক মুখপাত্র এএফপিকে জানিয়েছেন, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ‘গ্রিন আশা’ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশের পথে রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহনের এই প্রধান রুটটি নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে। মিৎসুই ওএসকে লাইনসের মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, ‘গ্রিন আশা’র ক্রু সদস্য এবং জাহাজে থাকা পণ্য উভয়ই সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। এটি ছিল জাপান-সংশ্লিষ্ট তৃতীয় জাহাজ, যা উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতেও সফলভাবে প্রণালি পার হতে সক্ষম হলো। এর আগে গত শনিবার ভারত সরকার জানিয়েছিল যে, মিৎসুইয়ের মালিকানাধীন অপর একটি এলপিজি ট্যাঙ্কার ‘গ্রিন সানভি’ নিরাপদে এই পথ অতিক্রম করেছে। এছাড়া ১ মার্চের পর প্রথম এলএনজি ট্যাঙ্কার হিসেবে মিৎসুইয়ের ‘সোহার এলএনজি’ এই প্রণালি পার হওয়ার রেকর্ড গড়ে। শিপিং সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যে অল্পসংখ্যক জাহাজ এই সংকীর্ণ নৌপথ ব্যবহার করছে, তারা ইরানের অনুমোদিত একটি বিশেষ পথ ব্যবহার করছে যা লারাক দ্বীপের কাছ দিয়ে গেছে। এই পথটি আন্তর্জাতিক মহলে ‘তেহরান টোল বুথ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালির এই বিকল্প ও নিয়ন্ত্রিত রুটটি বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও মার্কিন হুমকির মুখে ইরান এই পথে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে, তবুও জাপানি ও ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলোর এই নিরাপদ পারাপার আন্তর্জাতিক শিপিং বাণিজ্যের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। সূত্র: এএফপি ও লয়েডস লিস্ট
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সরবরাহ সংকটের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে নাইজেরিয়া থেকে ৬৮ হাজার ৬৪৮ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে একটি কার্গো জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাল্টার পতাকাবাহী ‘কুল ভয়েজার’ নামের এই জাহাজটি গত রবিবার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মহেশখালীর ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) নোঙর করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার থেকে আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘মেরিনট্রাফিক’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ নাইজেরিয়ার বনি বন্দর থেকে রওনা দিয়ে প্রায় ২৪ দিন পর জাহাজটি মহেশখালী উপকূলে পৌঁছায়। সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল থেকে এই এলএনজি খালাসের কাজ শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। আরপিজিসিএল-এর উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির জানান, নাইজেরিয়া থেকে আমদানি করা এই এলএনজির দাম মধ্যপ্রাচ্যের দরের কাছাকাছি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, চলতি এপ্রিল মাসে এটি এলএনজির দ্বিতীয় চালান। এর আগে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৭০ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আরেকটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানির উৎস পরিবর্তন ও বহুমুখীকরণ এখন সরকারের অন্যতম কৌশল। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে আটটি জাহাজে করে প্রায় ছয় লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে বাংলাদেশ। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস চাহিদা মেটাতে এবং শিল্প-কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে চলতি এপ্রিল মাসে আরও আট থেকে নয়টি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাতার সংকটের প্রভাবে জ্বালানি খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের এই বিকল্প সরবরাহ তা কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সোমবার জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের নবম দিনে ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী জানান, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে খাদ্য ও জ্বালানি—দুই খাতেই স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অনিয়ম দূরীকরণ, ঋণ আদায় জোরদার এবং আমানতকারীদের সুরক্ষায় সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। ‘জিটুপি’ পদ্ধতির মাধ্যমে এই অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো হবে। এছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা এবং সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেখানে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক উন্নয়নশীল দেশ ক্রমশ চীন-নির্ভরতার দিকে ঝুঁকছে। ব্লুমবার্গ-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হতে পারে। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে চীনা ঋণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই ধারণা কিছুটা পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরান-কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পাকিস্তান-এর উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে জ্বালানি সংকটে পড়া দেশটি এবার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে চীন থেকে আমদানি করা সস্তা সৌর প্যানেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারকে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির বিপুলসংখ্যক পরিবার এখন সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে, যা জ্বালানি সংকটের ধাক্কা কিছুটা কমিয়েছে। একইভাবে নেপাল-এ সস্তা বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে। এসব ক্ষেত্রেই চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। তবে এই নির্ভরতা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয় বলেও সতর্ক করা হয়েছে। চীন তার সরবরাহ শৃঙ্খল বিশেষ করে বিরল খনিজ ও প্রযুক্তি খাতে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য থেকে কৌশলগতভাবে সরে যান বা হরমুজ প্রণালি-সংকট সমাধানে সক্রিয় না হন, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে তারা কি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ভরসা রাখবে, নাকি চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দিকে আরও ঝুঁকবে? বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু আঞ্চলিক নয়; বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘ সাত বছর পর ইরান থেকে ভারতের তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হলেও শেষ মুহূর্তে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ভারতীয় উপকূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও প্রায় ছয় লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ‘পিং শুন’ হঠাৎ গতিপথ বদলে চীনের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। শিপ ট্র্যাকিং ডেটা এবং বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত ট্যাংকারটির গন্তব্য গুজরাটের ভাদিনার বন্দর থাকলেও বর্তমানে এটি চীনের শানডং প্রদেশের ডংইং বন্দরের দিকে যাচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ রাখলেও, ২১ মার্চ বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। এই সুযোগেই দীর্ঘ বিরতির পর প্রথম ইরানি তেলের চালান ভারতে পৌঁছানোর কথা ছিল। গুজরাটের এত কাছে এসে ট্যাংকারটির ফিরে যাওয়া আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি শুরু থেকেই এটি চীনের জন্য নির্ধারিত থাকত, তবে এর রুট সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। বাণিজ্যিক সূত্র এবং বিশেষজ্ঞরা এই আকস্মিক দিক পরিবর্তনের পেছনে মূলত ‘পেমেন্ট’ বা অর্থপ্রদান সংক্রান্ত জটিলতাকে দায়ী করছেন। কেপলারের রিফাইনিং ম্যানেজার সুমিত রিতোলিয়া জানান, ইরান বর্তমানে ৩০-৬০ দিনের ক্রেডিট সুবিধার পরিবর্তে অগ্রিম বা দ্রুত অর্থ পরিশোধের শর্ত দিচ্ছে। এছাড়া ইরান আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ‘সুইফট’ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কথা ভেবে ভারতীয় ব্যাংকগুলো এই লেনদেনে জড়াতে এখনো দ্বিধাবোধ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু বর্তমানে মার্কিন প্রশাসন ইরানি তেলের ওপর ছাড় দিয়েছে, তাই এই গতিপথ পরিবর্তন কোনো লুকোচুরি নয় বরং বাণিজ্যিক সমঝোতা না হওয়ারই ইঙ্গিত। তবে পেমেন্ট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হলে কার্গোটি আবারও ভারতের দিকে ফিরে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিল যে, লজিস্টিক সুবিধার চেয়েও বর্তমানে বাণিজ্যিক শর্ত ও জটিল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইরানি তেল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সারা দেশে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান ও শপিংমল বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত আপাতত বহাল থাকছে। শনিবার (৪ এপ্রিল) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ সাশ্রয় অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ায় এই সময়সীমা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। বৈঠক শেষে মন্ত্রী জাতীয় স্বার্থে ব্যবসায়ীদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি সংকট একটি জাতীয় সমস্যা এবং এটি মোকাবিলায় শপিংমল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করা বাধ্যতামূলক। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে অফিস এবং বাজার বন্ধের যে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, তা কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। দোকান ও শপিংমল মালিক সমিতির নেতারা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশনা তারা মেনে নেবেন। তবে ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই এই সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের কাছে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এরই অংশ হিসেবে সন্ধ্যা ৬টার পর সব ধরনের শপিংমল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিয়ম অপরিবর্তিত থাকবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আকাশচুম্বী দামের কারণে বিভিন্ন দেশে যানবাহন ও কলকারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ কমাতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের পর এবার পাঞ্জাব প্রদেশেও গণপরিবহন সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কথা জানান। তিনি জনগণকে এই সুযোগ-সুবিধার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি আরও সুবিধাজনক, সাশ্রয়ী এবং টেকসই ভ্রমণের পথ প্রশস্ত করবে। মূলত জ্বালানির দাম বাড়ায় যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পরিবহন খরচ তুঙ্গে, তখন নাগরিকদের স্বস্তি দিতেই এই বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। মরিয়ম নওয়াজের এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজধানী ইসলামাবাদের গণপরিবহন পরিচালনার সমস্ত খরচ এখন থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বহন করবে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরূপ উদ্যোগ অনুসরণ করেই পাঞ্জাব প্রদেশ তাদের নিজস্ব এলাকায় বিনামূল্যে পরিবহন সেবা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপটি একা নয়; এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া এবং তাসমানিয়া রাজ্যও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। দেশগুলো জনগণকে ব্যক্তিগত গাড়ি পরিহার করে জ্বালানি সাশ্রয়ে উৎসাহিত করতে গণপরিবহনের ভাড়া মওকুফ করার ঘোষণা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন পাকিস্তানের এই মানবিক ও কৌশলগত পদক্ষেপটি বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews