গত ১ মার্চ কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে ইরানের একটি ড্রোন হামলায় মার্কিন রিজার্ভ বাহিনীর ৬ সদস্য নিহত এবং ২০ জনের বেশি আহত হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এটিকে প্রথম বড় ধরনের মার্কিন সামরিক প্রাণহানি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই হামলাকে ঘিরে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও ঘটনাস্থলে থাকা সেনাদের বক্তব্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি স্থাপনায় ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে, যা উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু আহত সেনাদের ভাষ্য ভিন্ন। তারা জানিয়েছেন, হামলার আগে সতর্ক সংকেত দেওয়া হলেও পরে ‘অল ক্লিয়ার’ ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণার কিছু সময় পরই ড্রোনটি সরাসরি আঘাত হানে। তাদের দাবি, যে স্থাপনাটিকে সুরক্ষিত বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেটি ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং তারা যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন না। একজন সেনা সদস্যের বর্ণনায়, বিস্ফোরণের মুহূর্তটি ছিল ভয়াবহ—চারপাশ কেঁপে ওঠে, ধোঁয়া ও ধুলায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা। হামলার পর উদ্ধার তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আহত সেনাদের অভিযোগ, দ্রুত সহায়তা না পেয়ে তারা নিজেরাই প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে বাধ্য হন এবং পরে বেসামরিক যানবাহনে করে হাসপাতালে যেতে হয়। এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সেনাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলার সময় কার্যকর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল কিনা, তা স্পষ্ট নয়—কারণ কোনো সতর্ক সংকেত শোনা যায়নি। সব মিলিয়ে, এই ঘটনার পর মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কেন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সেনাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া রাখা হয়েছিল, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে। সূত্র: এনডিটিভি
পিট হেগসেথ ও ড্যান ড্রিসকল-এর মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে পেন্টাগনে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণের পর এই বিরোধ আরও প্রকাশ্যে এসেছে। সূত্রগুলো জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য ড্রিসকলকে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। কিছু কর্মকর্তার দাবি, হেগসেথ আশঙ্কা করছেন ড্রিসকল তার অবস্থানকে ছাপিয়ে যেতে পারেন। তবে পেন্টাগন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, হেগসেথ সব বাহিনীর নেতৃত্বের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছেন। তবুও অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, হেগসেথের দল মনে করে ড্রিসকল পেন্টাগনের ভেতরে তার এবং প্রেসিডেন্টের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। সম্প্রতি হেগসেথ একাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন, যাদের মধ্যে ড্রিসকলের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এতে প্রতিরক্ষা মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরান নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি। অন্যদিকে, ড্রিসকল দুই দলের মধ্যেই ইতিবাচক মূল্যায়ন পাচ্ছেন বলে জানা গেছে এবং তাকে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় নেতার ওপরই আস্থা রাখছেন এবং তাদের নেতৃত্বে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে। বর্তমানে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ এই ক্ষমতার লড়াই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যদিও উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ বা পেন্টাগনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কর্মসূচি ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ আবার আলোচনায় এসেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তি লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং হামলার গতি বাড়াতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে ছোট একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া এই প্রোগ্রাম এখন একটি বড় এআই-নির্ভর সিস্টেমে পরিণত হয়েছে। এটি যুদ্ধ পরিচালনার পুরো প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করার মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে সক্ষম। প্রজেক্ট ম্যাভেন কী? প্রজেক্ট ম্যাভেন হলো পেন্টাগনের প্রধান এআই উদ্যোগ। শুরুতে এটি সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে আসা ড্রোন ফুটেজ বিশ্লেষণে সাহায্য করতো। বিশ্লেষকদের বিপুল পরিমাণ ছবি ও ভিডিও এক ফ্রেম করে দেখার কাজ সহজ করতে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাভেন বড় হয়ে এখন শুধু ছবি বিশ্লেষণ নয়, পুরো যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনায় সহায়তা করে। যুদ্ধের ভাষায় ‘কিল চেইন’ অর্থাৎ লক্ষ্য শনাক্তকরণ থেকে আঘাত পর্যন্ত দ্রুত কাজ করতে সক্ষম এই সিস্টেম। কীভাবে কাজ করে? ম্যাভেনকে অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের ‘এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল’ ও ‘ককপিট’-এর সংমিশ্রণ বলা যায়। এটি বিভিন্ন উৎস থেকে সেন্সর ডেটা, গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট ছবি ও সেনা মোতায়েনের তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর এগুলো একত্র করে পুরো পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি করে। ফলে কমান্ডাররা দ্রুত বোঝতে পারেন কোথায় শত্রু চলাচল করছে এবং কোথায় আঘাত হানা সম্ভব। ম্যাভেন বিভিন্ন আক্রমণের বিকল্পও প্রস্তাব করে, এবং চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তির কারণে ব্যবহার আরও সহজ হয়েছে। বর্তমানে এই ব্যবস্থার একটি অংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালান্টিরের ক্লাউড মডেলের মাধ্যমে চলছে। তবে এর ব্যবহার নিয়ে পেন্টাগনের সঙ্গে কিছু মতবিরোধ আছে। গুগলের বিরোধ শুরুর দিকে গুগল প্রজেক্টে যুক্ত ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে তিন হাজারের বেশি কর্মী নৈতিক কারণে বিরোধ জানিয়েছিলেন। তাদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণ অতিক্রম করছে। পরে গুগল চুক্তি নবায়ন করেনি এবং অস্ত্র ব্যবস্থায় কাজ না করার নীতি ঘোষণা করে। প্যালান্টিরের ভূমিকা ২০২৪ সালে প্যালান্টির গুগলের জায়গা নেয় এবং ম্যাভেনের প্রধান প্রযুক্তি অংশীদার হয়। কোম্পানির এআই সিস্টেম ‘কিল চেইন’-কে ঘণ্টা থেকে সেকেন্ডে নামিয়ে আঘাতের গতি বাড়াতে সক্ষম। কার্যকারিতা ম্যাভেনের সঠিক কার্যকারিতা নিয়ে সরাসরি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার ধরণ থেকে ধারণা করা যায়, এটি লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও আঘাতের গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। গবেষণা অনুযায়ী, কিছু অপারেশনে প্রতিদিন ৩০০–৫০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। ইরানের দাবি, এক হামলায় ৭–১২ বছর বয়সী ১৬৮ শিশু নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে তোলপাড় শুরু হয়েছে খোদ ওয়াশিংটনে। অভিজ্ঞ জেনারেলদের একের পর এক বরখাস্তের পেছনে ইরান নিয়ে হেগসেথের 'অবাস্তব' পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন দেশটির শীর্ষ রাজনীতিকরা। মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটির সদস্য সিনেটর ক্রিস মারফি এক বিস্ফোরক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পেন্টাগনের অভিজ্ঞ জেনারেলরা সম্ভবত হেগসেথকে সতর্ক করেছিলেন যে— ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ পরিকল্পনা একেবারেই 'অকার্যকর' এবং 'বিপজ্জনক'। আর এই সত্য বলার কারণেই এখন কোপের মুখে পড়তে হচ্ছে ঝানু সামরিক কর্মকর্তাদের। মারফির মতে, হেগসেথ এমন এক যুদ্ধের স্বপ্ন দেখছেন যার বাস্তব ভিত্তি নেই। অভিজ্ঞ জেনারেলরা যখনই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরছেন, তখনই তাদের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক বিশাল ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। একদিকে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে পেন্টাগনের অন্দরে চলছে এই 'শুদ্ধি অভিযান'। সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এভাবে অভিজ্ঞ নেতৃত্বহীন হয়ে পড়লে মার্কিন বাহিনী এক অনিশ্চিত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগে বড় ধরনের রদবদল ও অস্থিরতা নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে নাটকীয়ভাবে অপসারণের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আরও দুজন প্রভাবশালী শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ। পেন্টাগনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের শিকার হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন— জেনারেল ডেভিড এম. হোডনি এবং মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিন জুনিয়র। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে শীর্ষ সারির কর্মকর্তাদের এভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় মার্কিন সামরিক প্রশাসনের অন্দরে তীব্র উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। তদন্ত ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, জেনারেল হোডনি অতি সম্প্রতি গত অক্টোবর মাসে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ড’-এর নেতৃত্বে ছিলেন। বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যৎ রণকৌশল নির্ধারণে এই চার-তারকা পদের ভূমিকা অপরিসীম। অন্যদিকে, মেজর জেনারেল গ্রিন সেনাবাহিনীর ‘টপ চ্যাপলিন’ বা প্রধান যাজক হিসেবে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকগুলো তদারকি করতেন। উল্লেখ্য, এর আগে বরখাস্ত হওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মনোনীত করেছিলেন। সাধারণত চার বছর মেয়াদী এই পদ থেকে মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান মার্কিন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ আমলাতন্ত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার নাকি কোনো গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ— ঠিক কী কারণে এই ‘ক্লিনআপ ড্রাইভ’ বা গণ-বরখাস্তের ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের ক্ষমতাধর মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। পেন্টাগন এখন পর্যন্ত এই কঠোর পদক্ষেপের পেছনে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেনি, যা জনমনে এবং সামরিক বাহিনীতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির এক বিধ্বংসী হ্যান্ড গ্রেনেড নিজেদের অস্ত্রাগারে যুক্ত করল মার্কিন সেনাবাহিনী। প্লাস্টিক বডির এই এম-১১১ গ্রেনেডটি মূলত প্রচণ্ড বায়ুচাপ বা শক ওয়েভের মাধ্যমে শত্রুকে মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম। প্রথাগত গ্রেনেডগুলোর মতো এটি লোহার টুকরো বা স্প্লিন্টার ছড়িয়ে শত্রু মারে না। এর পরিবর্তে এটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে এমন এক বায়বীয় তরঙ্গ তৈরি করে, যা মানুষের ফুসফুস ও কানের পর্দা মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দেয়। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর মার্কিন সামরিক বাহিনী এই প্রাণঘাতী অস্ত্রটি সরাসরি যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে ১৯৬৮ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সর্বশেষ নতুন প্রযুক্তির গ্রেনেড ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর বা ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের দমনে এই গ্রেনেডটি হবে মার্কিন সৈন্যদের প্রধান অস্ত্র। এর প্লাস্টিক বডি বিস্ফোরণের সময় বাষ্পীভূত হয়ে যায়, ফলে আশেপাশের দেয়াল বা সাধারণ মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি কমে। আগের এম-৬৭ গ্রেনেডগুলো বিস্ফোরণের পর চারদিকে লোহার টুকরো ছড়িয়ে দিত, যা অনেক সময় দেয়াল ভেদ করে নিজেদের সৈন্য বা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির কারণ হতো। নতুন এই গ্রেনেড সেই ঝুঁকি দূর করে কেবল নির্দিষ্ট কক্ষের শত্রুদের ধ্বংস করবে। মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই গ্রেনেডের শক ওয়েভ দেয়াল বা আসবাবপত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রুকেও রেহাই দেবে না। প্রচণ্ড চাপের এই ঢেউ মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে তাৎক্ষণিক মৃত্যু নিশ্চিত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রচণ্ড বায়ুচাপ মানুষের কানের পর্দা, ফুসফুস, চোখ এবং পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম। এমনকি বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঢেউ মানুষের মস্তিস্কে আঘাত করে অঙ্গহানি পর্যন্ত ঘটাতে পারে বলে জানানো হয়েছে। নিউ জার্সির পিকাতিনি আর্সেনালে তৈরি এই অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রটি মূলত ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি করা হয়েছে। শহর অঞ্চলে ঘরবাড়ি দখলের লড়াইয়ে এটি সৈন্যদের জন্য এক নতুন গেম চেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। পুরনো এম-৩এ২ গ্রেনেডটি সত্তরের দশকে বাতিল করা হয়েছিল কারণ সেটিতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অ্যাসবেস্টস ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই শূন্যতা পূরণে দীর্ঘ সময় পর এই নিরাপদ কিন্তু শক্তিশালী প্লাস্টিক গ্রেনেডটি অন্তর্ভুক্ত করা হলো। তবে সেনাবাহিনী স্পষ্ট করেছে যে, পুরনো এম-৬৭ ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেডগুলো এখনই পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। খোলা ময়দানে শত্রুর ওপর মারণাঘাত হানতে সেগুলো আগের মতোই ব্যবহার করা হবে, আর ঘর পরিষ্কারের অভিযানে ব্যবহৃত হবে নতুন এম-১১১। নতুন এই গ্রেনেডে অত্যন্ত শক্তিশালী আরডিএক্স বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে, যা ছোট আকৃতির হলেও বিশাল ধ্বংসক্ষমতা সম্পন্ন। হাতের তালুর সমান এই সিলিন্ডার আকৃতির অস্ত্রটি সহজেই বহনযোগ্য এবং ব্যবহার করাও অনেক বেশি নিরাপদ ও নির্ভুল। মার্কিন মেরিন কোরও একই ধরনের প্রযুক্তি সম্পন্ন এম-২১ গ্রেনেড সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা নরওয়ের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে। আধুনিক যুদ্ধের কৌশল বদলে যাওয়ার সাথে সাথে অস্ত্রের ধরণও যে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, এটি তারই একটি প্রমাণ। পেন্টাগন মনে করছে, এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন যুদ্ধের ময়দানে লক্ষ্যভেদ নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ও ঘরের ভেতরে যুদ্ধের সময় নিজেদের সৈন্যদের জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিখ্যাত ‘পাইনঅ্যাপল’ গ্রেনেড থেকে শুরু করে আজকের এই প্লাস্টিক গ্রেনেড পর্যন্ত দীর্ঘ বিবর্তন ঘটেছে। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রা মার্কিন সামরিক শক্তিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ভবিষ্যতে এই গ্রেনেডটি কেবল মার্কিনিদের নয়, বরং নেটো জোটভুক্ত মিত্র দেশগুলোর অস্ত্রাগারেও জায়গা করে নিতে পারে। একুশ শতকের আধুনিক যুদ্ধে এ ধরনের স্মার্ট মারণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা এখন সবচাইতে বেশি বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সামরিক মহল।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াতে এবার সরাসরি স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, পেন্টাগন ইতিমধ্যে ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ স্থল অভিযানের একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসন বা দখলদারিত্বের বদলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ এবং বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি বলে হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই স্থল অভিযান হবে যুদ্ধের এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়। বিশেষ করে ইরানের কৌশলগত তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এই হামলা চালানো হতে পারে। পেন্টাগনের এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো নৌ-চলাচলে হুমকি সৃষ্টিকারী ইরানের সক্ষমতাগুলো ধ্বংস করা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরণের স্থল অভিযানে মার্কিন সেনারা ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং গেরিলা প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন যে, কমান্ডারের পছন্দমতো বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি রাখা পেন্টাগনের নিয়মিত কাজ। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি এবং তার প্রশাসন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়াতে চায়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে ইতিমধ্যে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০-এর বেশি আহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই স্থল অভিযানের ঘোষণা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের এক বিতর্কিত পদক্ষেপে তোলপাড় শুরু হয়েছে পেন্টাগনসহ পুরো ওয়াশিংটনে। অত্যন্ত যোগ্য হিসেবে বিবেচিত চারজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতি তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়েছেন তিনি, যাদের মধ্যে দুইজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং দুইজন নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। বর্তমানে ওয়ান-স্টার জেনারেল হিসেবে কর্মরত এই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে দেওয়ার বিষয়টিকে হেগসেথের ‘উওক কালচার’ বা অতি-উদারপন্থী প্রভাবমুক্ত সামরিক বাহিনী গড়ার লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। পিট হেগসেথ দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন সেনাবাহিনীতে প্রচলিত ডাইভারসিটি, ইক্যুইটি এবং ইনক্লুশন (DEI) নীতির কড়া সমালোচনা করে আসছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি এই কর্মকর্তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে সেনাসচিব ড্যান ড্রিসকলকে চাপ দিয়েছিলেন। তবে ড্রিসকল এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানান, ওই কর্মকর্তারা কয়েক দশকের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার এবং যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সেনাসচিবের আপত্তি তোয়াক্কা না করেই হেগসেথ ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে তাদের নাম সরিয়ে দেন। হেগসেথের এই সিদ্ধান্তে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক আদর্শ এবং গায়ের রঙ বা লিঙ্গকে ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাহিনীর মনোবলে আঘাত হানতে পারে। বর্তমানে সংশোধিত এই তালিকাটি হোয়াইট হাউসে পাঠানো হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সিনেটে পেশ করা হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই মেয়াদে প্রতিরক্ষা বিভাগের নেতৃত্বে আসা হেগসেথের এমন একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইরানে ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক অভিযান চালানোর প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এখন অস্ত্র উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর থেকে ইরানের পাল্টা জবাবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় দেশটিকে এই পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোলাবারুদের উৎপাদন বাড়াবে। পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন জোরদার করা হবে। এছাড়া উচ্চ উচ্চতায় উড়তে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত ‘টার্মিনাল হাই আল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড)’ ব্যবস্থার লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ যন্ত্রের উৎপাদনও বাড়ানো হবে। পেন্টাগন আরও জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রতিরক্ষা শিল্পকে ‘যুদ্ধকালীন উৎপাদন’ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। এর পাশাপাশি নেভিগেশন সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম উৎপাদনও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে
ইরানের ওপর সামরিক হামলার সিদ্ধান্তের পেছনে কার মস্তিষ্ক কাজ করেছে, তা নিয়ে এবার মুখ খুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার টেনাসির মেমফিসে আয়োজিত এক বৈঠকে ট্রাম্প সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথই প্রথম ব্যক্তি যিনি তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পেন্টাগন প্রধানকে পাশে বসিয়েই ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার সময় হেগসেথই প্রথম আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান গত ৪৭ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদে মদত দিচ্ছে এবং বর্তমানে তারা পারমাণবিক অস্ত্রের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এমতাবস্থায় পেন্টাগন প্রধানের পরামর্শ ছিল, এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। তবে ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে তেহরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের 'চমৎকার' আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ইরানি গণমাধ্যম এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। একই সাথে হোয়াইট হাউসের অন্দরেও এই যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি স্পষ্ট। জানা গেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই অভিযানের বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং রুপার্ট মারডক ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের সঙ্গে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রায় তিন সপ্তাহ পরও ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখেছে। জিজ্ঞাসা করা হলে কেইন বলেন, “ইরান অনেক অস্ত্র নিয়ে এই যুদ্ধে নেমেছিল, তাই যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক এবং দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। আমরা তাদের লক্ষ্য শনাক্ত করছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আঘাত হানছি। তবে ইরানের কিছু সামরিক সক্ষমতা এখনও রয়েছে।” তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের লক্ষ্য অর্জনে এগোচ্ছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে ৫ হাজার পাউন্ড (২,২৭০ কেজি) ওজনের পেনিট্রেটিভ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা কংক্রিট ভেদ করে কার্যকরী হয়। জেনারেল কেইন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্বদিকে ইরানি আকাশসীমায় প্রবেশ করে ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করছে। এছাড়া এ-১০ ওয়ার্থগ বিমান ও এএইচ–৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার দক্ষিণ ইরানজুড়ে অভিযানে অংশ নিচ্ছে, বিশেষত হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত আক্রমণকারী নৌযানগুলোকে লক্ষ্য করে। ইরাকেও ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আঘাত চালানো হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তবে সংঘাত কখন শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করতে চায় না। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং নিশ্চিত করা যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাত হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করেছে এবং সেনারা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও তাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হোয়াইট হাউসের কাছে প্রস্তাব করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত তহবিল অনুমোদন করার। প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে। প্রস্তাবিত এই তহবিল বর্তমান বিমান হামলার খরচের পরিমাণও ছাড়িয়ে গেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। গত তিন সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ফলে গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় নতুন সংগ্রহের জন্য এই বড় অঙ্কের তহবিল চাওয়া হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এখনও নির্ধারণ করেনি, কংগ্রেসে কতটুকু অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হবে। কিছু কর্মকর্তা পেন্টাগনের প্রস্তাব পাস হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রস্তাবিত তহবিল নিয়ে কংগ্রেসে রাজনৈতিক লড়াই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুদ্ধে জনসমর্থন সীমিত এবং ডেমোক্র্যাটরা এর কঠোর সমালোচনা করছেন। রিপাবলিকানরা অতিরিক্ত অর্থায়নের পক্ষে থাকলেও সিনেটের ৬০ ভোটের সীমাবদ্ধতার কারণে স্পষ্ট আইনগত পথ এখনও দৃশ্যমান নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অনুমোদিত ১৮৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়ও তিনি সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের খরচ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে; কর্মকর্তাদের মতে, প্রথম সপ্তাহেই খরচ ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পেন্টাগনের ডেপুটি ডিফেন্স সেক্রেটারি স্টিভেন ফেইনবার্গ নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই প্রচেষ্টার। মূল লক্ষ্য হলো গোলাবারুদ ঘাটতি মেটানো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শ্রমিক ও উপকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন বাড়ানো সময়সাপেক্ষ হবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শুরুতেই সামরিক ব্যয়ের এক অভাবনীয় চিত্র সামনে এসেছে। পেন্টাগন কর্তৃক কংগ্রেসকে দেওয়া একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুদ্ধের মাত্র প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেছে। বিপুল পরিমাণ এই ব্যয় ক্যাপিটল হিলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে দূরপাল্লার প্রিসিশন-গাইডেড মিউনিশন বা লক্ষ্যভেদী উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ যেভাবে দ্রুতগতিতে তাদের উন্নত অস্ত্রভাণ্ডার শেষ করছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আরিজোনা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক সিনেটর মার্ক কেলি জানিয়েছেন, ইরান তাদের বিশাল ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল ভাণ্ডার থেকে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই হামলা প্রতিহত করতে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীকে প্রচুর পরিমাণে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম (Air Defense Munitions) ব্যয় করতে হচ্ছে। সিনেটর কেলি আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই যুদ্ধের প্রতিদিনের ব্যয় ঠিক কত, সে বিষয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্রিফিং নেওয়া হবে। এদিকে কংগ্রেসের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, এই ব্যয় সামাল দিতে এবং অস্ত্রের মজুদ পুনরায় গড়ে তুলতে বাইডেন প্রশাসন খুব শীঘ্রই কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানাতে পারে। একজন সংসদীয় সহযোগী একে "পরবর্তী বড় লড়াই" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত নিয়ে নিজ দেশের জনগণের তীব্র চাপের মুখে পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বিশেষ করে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক বা 'বেস' ভোটারদের পক্ষ থেকেই যুদ্ধ বন্ধের দাবি জোরালো হচ্ছে। যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মার্কিনিদের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করায় এই অসন্তোষ এখন জনরোষে রূপ নিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই যুদ্ধের সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরান আইইডি (IED) তৈরি করে মার্কিন সেনাদের আহত করেছে, তাই এই পদক্ষেপ জরুরি। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ব্যাখ্যা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না। মার্কিন নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো এই সংঘাত আর কতদিন চলবে? গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত সাতটি দেশে বোমাবর্ষণ করলেও সাধারণ মার্কিনিদের তার সরাসরি মাসুল দিতে হয়নি। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সামনেই চাষাবাদের মৌসুম, অথচ এই যুদ্ধকবলিত অঞ্চল থেকে সার আমদানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পেন্টাগন এখন মরিয়া হয়ে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, এই সংঘাত ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু আমেরিকানরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই সামরিক অভিযান সমর্থন করছে না। নিজের জনসমর্থন ধরে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজছে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, এর মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থার পেছনে। তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত উন্নত ইন্টারসেপ্টর এবং বিভিন্ন ধরনের মিউনিশনেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। কংগ্রেসে আলোচনার সময় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, অভিযান চালিয়ে যেতে হলে আরও অর্থের প্রয়োজন হবে এবং ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে হবে। মার্কিন বাহিনী এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, নৌযান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা ধ্বংস হওয়ায় ইরানের পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা কমে গেছে বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনের তুলনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ৯০ শতাংশ কমেছে এবং ড্রোন হামলা কমেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, এখনও ইরানের হাতে শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে এবং দেশটির প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অক্ষত আছে, যা ভবিষ্যতে সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ আরও ১০ দিন স্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে পেন্টাগন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের চতুর্থ দিনে পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এ সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে অবহিত করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে শুধু অস্ত্রের ঘাটতিই নয়, ফুরিয়ে যাওয়া গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে এবং এই মজুত দিয়েই দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালানো সম্ভব। পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি দেখা দিতে পারে। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইল ও ইউক্রেনকে বিপুল সামরিক সহায়তা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত বছর ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের থাড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবহার করেছিল। বর্তমান সংঘাতে ইরান যেভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে, তা মোকাবিলায় যে পরিমাণ ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন, তার উৎপাদন হার খুবই কম। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরান মাসে প্রায় ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র মাসে মাত্র ৬ থেকে ৭টি ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন করতে সক্ষম। যুদ্ধের আর্থিক চাপ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী, একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার ব্যয় হয়। অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার খরচ করেছে। পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের পরিচালক কেন্ট স্মেটার্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুযায়ী যুদ্ধ যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় ২১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। গত এক বছরে কেবল ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অভিযানে ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, জেডিএএম কিট—যার মাধ্যমে সাধারণ বোমাকে স্মার্ট বোমায় রূপান্তর করা হয়—এবং নৌবাহিনী থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টরের মজুতও কমে আসছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সামরিক অভিযানকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত রাশিয়া বা চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি তীব্র সংঘাতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের মতো দেশগুলোর পক্ষ থেকে দীর্ঘস্থায়ী ও তুলনামূলক কম খরচের রকেট বা ড্রোন হামলা মোকাবিলা করা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ থাকা একটি ইরানি ইউনিটের নেতাকে মার্কিন সামরিক বাহিনী হত্যা করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বুধবার পেন্টাগনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য জানান। পিট হেগসেথ বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করা সেই ইউনিটের নেতাকে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই এর জবাব দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নিহত ব্যক্তি একটি ইরানি ইউনিটের প্রধান ছিলেন, যারা ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই ব্যক্তির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। খবরে বলা হয়েছে, এই অভিযানটি মূল সামরিক লক্ষ্য না হলেও পরে তাকে লক্ষ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে তাকে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ অভিযোগ করেছিল যে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নির্দেশে ট্রাম্পকে হত্যার একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে তেহরান শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যে এই ঘোষণা দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজকে টর্পেডো ছুড়ে ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে একটি মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো নিক্ষেপ করা হলে সেটি মাঝসমুদ্রেই তলিয়ে যায়। এ ঘটনায় যুদ্ধজাহাজে থাকা অন্তত ৮৭ জন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কী ঘটেছিল? পেন্টাগনের তথ্যানুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে ভারত মহাসাগরে টহলরত একটি মার্কিন ফাস্ট-অ্যাটাক সাবমেরিন থেকে মাত্র একটি ‘Mk-48’ টর্পেডো নিক্ষেপ করা হয়। নিখুঁত নিশানায় টর্পেডোটি ইরানি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ (IRIS Dena)-কে আঘাত করে। জাহাজটি মওজ-শ্রেণির (Moudge-class) একটি ফ্রিগেট ছিল, যা বঙ্গোপসাগরে এক নৌ-মহড়া শেষে নিজ গন্তব্যে ফিরছিল। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের অদূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই ঘটনাটি ঘটে। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ জানিয়েছেন, হামলার সময় জাহাজটিতে ১৮০ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে এবং মরদেহ উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পেন্টাগনের বক্তব্য প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই অভিযানকে ‘নিস্তব্ধ মৃত্যু’ (Quiet Death) হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “১৯৪৫ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন সাবমেরিন শত্রুপক্ষের জাহাজকে টর্পেডো দিয়ে ধ্বংস করল। এটি আমেরিকার বৈশ্বিক সক্ষমতার এক বিশাল নিদর্শন।” জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী এ পর্যন্ত ইরানের ২,০০০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং ইরানের প্রায় ২০টি নৌযান ধ্বংস করেছে। তার দাবি, এই অভিযানের ফলে ওই অঞ্চলে ইরানের নৌ-শক্তি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গত আট দশকে মার্কিন সাবমেরিন বহুবার মোতায়েন হলেও সরাসরি টর্পেডো ব্যবহার করে শত্রুজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি। নিরাপত্তা জনিত কারণে সংশ্লিষ্ট সাবমেরিনটির নাম প্রকাশ করেনি পেন্টাগন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তজনা এবং ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পেন্টাগন জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ওই অঞ্চলে তাদের অভিযান আরও জোরদার করা হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানে আঘাত হানা একটি ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে রহস্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের গেরাশ অঞ্চলে অনুভূত ৪.৩ মাত্রার এই কম্পনটি কি কেবলই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি তেহরানের কোনো গোপন পারমাণবিক পরীক্ষার ফল—তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো বিষয়টির ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে পেন্টাগন ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ভূমিকম্প নাকি পারমাণবিক পরীক্ষা? স্থানীয় সময় অনুযায়ী, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় গেরাশ এলাকায় এই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে এটি একটি সাধারণ ভূকম্পন এবং এতে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন এক তত্ত্ব ডালপালা মেলছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে এই ঘটনাকে অনেকেই তেহরানের ‘গোপন শক্তি প্রদর্শন’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞদের মত ও রহস্যের সূত্রপাত: ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালা অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ। ফলে ৪.৩ মাত্রার এই কম্পন স্বাভাবিক টেকটোনিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে। তবে সন্দেহ বাড়ছে অন্য একটি কারণে। ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় অত্যন্ত গোপনীয় ‘টোনোপাহ টেস্ট রেঞ্জ’ (Area 51-এর নিকটবর্তী) এলাকায় শতাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের স্পর্শকাতর এলাকায় কাছাকাছি সময়ে এই ভূকম্পন পারমাণবিক পরীক্ষার জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: ওয়াশিংটন এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান কোনোভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে কি না, তা যাচাই করতে স্যাটেলাইট ইমেজ এবং সিসমিক ডেটা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপট: উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া ও লেবাননে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দফায় দফায় হামলার পর তেহরান বারবার প্রতিশোধের হুমকি দিয়ে আসছিল। এর মাঝেই ফাত্তাহ হাইপারসনিক মিসাইল প্রদর্শন এবং এখন এই রহস্যময় ভূমিকম্প মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই পারমাণবিক বিস্ফোরণের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেয়নি, তবে গেরাশের এই কম্পন যে সাধারণ ভূমিকম্পের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে—সেই আশঙ্কায় কাঁপছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews