দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে যে কৌশলটি সবচেয়ে ভয়ংকর ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিল তা হলো জাপানের আত্মঘাতী বিমান হামলা, যা ইতিহাসে ‘কামিকাজে’ নামে পরিচিত। চাকাবিহীন বা স্থায়ী ল্যান্ডিং গিয়ারযুক্ত হালকা যুদ্ধবিমান নিয়ে আত্মঘাতী পাইলটরা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর, বিমানবাহী রণতরী ও সামরিক স্থাপনায় আছড়ে পড়তেন।
এই প্রতিবেদনকে কামিকাজে কৌশলের জন্ম, প্রযুক্তি, রণকৌশল ও আশপাশের সমুদ্রে সংঘটিত ভয়াবহ হামলা, ইউএসএস ডরসি ও ইউএসএস বাঙ্কার হিলের অভিজ্ঞতা, পাইলটদের মানসিকতা, মিত্রবাহিনীর প্রতিরোধ, এবং যুদ্ধোত্তর ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের আলোকে পুরো ঘটনাপ্রবাহকে বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে।
আত্মঘাতী বিমান হামলার ধারণা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধে জাপান যখন আকাশ ও সমুদ্রে আধিপত্য হারাতে শুরু করে, তখনই জন্ম নেয় আত্মঘাতী িবমান হামলার মতো এক দুর্ধর্ষ ধারণা। ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে ফিলিপাইনে প্রথম বড় আকারে এই কৌশল প্রয়োগ হয়। প্রচলিত বোমাবর্ষণ বা ডগফাইটে সাফল্য কমে যাওয়ায় জাপানি সামরিক নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয় যুদ্ধবিমানকেই বানানো হবে অস্ত্র, আর পাইলট হবেন আত্মোৎসর্গকারী যোদ্ধা। লক্ষ্য একটাই- শত্রুপক্ষের জাহাজে সরাসরি আঘাত করে সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন।
এই আত্মঘাতী বিমানের বড় অংশ ছিল পুরোনো বা দ্বিতীয় সারির উড়োজাহাজ। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোতে স্থায়ী চাকা বা স্প্যাটেড আন্ডারকারেজ থাকত, যা দেখতে ছিল ভারী ও ধীরগতির। তবুও কামিকাজে অভিযানে এগুলো কার্যকর হয়ে ওঠে, কারণ পাইলটদের ফেরার কোনো পরিকল্পনাই থাকত না। বিমানের মাঝখানে বসানো হতো বড় আকারের ২৫০ কেজির বোমা, যা আঘাতের মুহূর্তে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাত।
অনেক কামিকাজে আত্মঘাতী বিমানের চাকা ছিল, তবে কিছু বিশেষ মডেলে তা ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হতো, কিন্তু ওকা নামক রকেট-চালিত আত্মঘাতী বিমানে চাকা থাকতো না। এসব যুদ্ধবিমানগুলোকে বড় ধরনের কার্গো বিমান থেকে ছেড়ে দেয়া হতো এবং যেসব বিমানে চাকা থাকতো কিছু ক্ষেত্রে ওজনের ভার কমানোর জন্য টেকঅফের পর সেগুলো থেকে চাকা খুলে ফেলা হতো।

যেহেতু এসব মিশনের লক্ষ্যই ছিল আত্মহুতি, তাই ফেরার বা ল্যান্ড করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। আর এই বিবেচনায় ডিজাইনে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছিল বিমানগুলোতে।
মার্কিন জাহাজে হামলা
১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে জাপানের ওকিনাওয়ার উপকূলে মিত্রবাহিনীর নৌবহর এই হামলার সবচেয়ে তীব্র অভিজ্ঞতা লাভ করে। ইউএসএস ডরসি (ডিএমএস-১), একটি পুরোনো উইকস-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার-মাইনসুইপার ২৭ মার্চ ভোরে কামিকাজের আক্রমণের মুখে পড়ে। জাহাজটি তখন কেরামা রেট্টো দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাইন পরিষ্কার অভিযানে নিয়োজিত ছিল। শত্রু বিমানের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সাধারণ সতর্কতা জারি হলেও রক্ষা হয়নি। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে আসে আত্মঘাতী হামলা।
ডরসির নাবিকেরা প্রথমে দূরে অন্য জাহাজে আক্রমণ হতে দেখেন। এরপর তিনটি শত্রু বিমান তাদের দিকে এগিয়ে আসে। দুইটি পাশ কাটিয়ে গেলেও তৃতীয়টি পেছন দিক থেকে ঘুরে এসে আত্মঘাতী ডাইভ দেয়। জাহাজের সব অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়। ৪০ মিমি বোফর্স ও ২০ মিমি অরলিকন কামান আঘাত হানে বিমানে, আগুন ধরে যায়, এমনকি একটি অংশ ছিটকেও পড়ে। কিন্তু কামিকাজে অভিযানের নির্মম সত্য হলো- এত কিছুর পরও পাইলট তার লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।
ভোর ৬টা ২০ মিনিটে সেই জ্বলন্ত বিমানটি ডরসির ডেকের পাশে আছড়ে পড়ে। বিস্ফোরণে জাহাজের গায়ে ফাটল ধরে, চিমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ডেকের বিভিন্ন সরঞ্জাম ধ্বংস হয়। আটজন নাবিক সমুদ্রে ছিটকে পড়েন, এর মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তিনজন নিখোঁজ থাকেন। আরও দুজন গুরুতর আহত হন, যাদের একজন পরে মারা যান। এর পরেও আশ্চর্যজনকভাবে ডরসি দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে আবার কাজে ফিরে যায়।
একই সময়, একই অঞ্চলে আরও কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ কামিকাজে হামলার শিকার হয়। ইউএসএস নেভাডা, বিলক্সি, ও’ব্রায়েন, ফরম্যান সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকাংশ জাহাজ তাদের আক্রমণকারীকে ‘ভ্যাল’ বলে শনাক্ত করে। ভ্যাল ছিল আইচি ডি৩এ ডাইভ বোম্বারের মিত্রবাহিনী প্রদত্ত কোডনাম, যা পার্ল হারবার থেকে শুরু করে বহু অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধোত্তর গবেষণা ও জাপানি নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই দিন আকাশে ভ্যাল ছিল না। বরং আক্রমণ চালিয়েছিল মিতসুবিশি কি-৫১, মিত্রবাহিনীর কোডনাম ‘সোনিয়া’। দেখতে ভ্যাল ও ‘নেট’ ফাইটারের সঙ্গে মিল থাকায় যুদ্ধের উত্তাপে মার্কিন নাবিকেরা ভুল শনাক্ত করেছিলেন। সোনিয়া ছিল জাপানি সেনাবাহিনীর (আইজেএএএফ) একটি দুই আসনের ক্লোজ-সাপোর্ট বিমান, যা পরে ব্যাপকভাবে কামিকাজে ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়।
এই সোনিয়া বিমানগুলো পরিচালনা করেছিল বিশেষ কামিকাজে ইউনিট বুকোকু-তাই ও সেকিশিন-তাই। ওকিনাওয়ার নাকা এয়ারফিল্ড থেকে উড্ডয়ন করা ১১টি সোনিয়া ২৭ মার্চ ভোরে মার্কিন নৌবহরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জাহাজগুলোর রিপোর্টে যতগুলো বিমান দেখা গিয়েছিল, জাপানি রেকর্ডের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়।
এই ভুল শনাক্তকরণের রহস্য আরও স্পষ্ট হয় ২০২০ সালে, যখন ইউএসএস ডরসিতে আছড়ে পড়া বিমানের কিছু ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করা হয়। প্রপেলারের অংশ, স্পিনার ও একটি ডাটা প্লেট থেকে জানা যায়, বিমানে ছিল ‘হাক্স স্টার্টার’ সংযোগ, যা জাপানি সেনাবাহিনীর বিমানে সাধারণ ছিল। ডাটা প্লেটে নোঙরের বদলে তারকা চিহ্ন থাকাও প্রমাণ করে এটি নৌবাহিনীর ভ্যাল নয়, বরং সেনাবাহিনীর সোনিয়া।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা
ওকিনাওয়ার যুদ্ধকালে সবচেয়ে ভয়াবহ কামিকাজে আঘাতগুলোর একটি আসে ইউএসএস বাঙ্কার হিলের ওপর। ১৯৪৫ সালের ১১ মে সকালে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেই জাপানের কিকুসুই স্পেশাল অ্যাটাক স্কোয়াড্রন মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোকে লক্ষ্য করে। ‘জিকে’ বা জিরো ফাইটার নিয়ে পাইলটরা মেঘের আড়াল ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যায়।

বাঙ্কার হিলে আক্রমণের মুহূর্তে ডেকে অবতরণ করছিল মার্কিন ফাইটারগুলো। রাডার বৃষ্টির কারণে ঠিকমতো কাজ করছিল না। হঠাৎ করেই এক কামিকাজে ডেকে গুলি চালায়, তারপর বোমাসহ আছড়ে পড়ে। অল্প সময়ের ব্যবধানে আরেকটি বিমান একইভাবে আঘাত হানে। ডেকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, বিস্ফোরণে ধ্বংস হয় রেডি রুম, হ্যাঙ্গার ডেক।
এই আক্রমণে ৩৯৬ জন নিহত ও ২৬৪ জন আহত হন। একটি মাত্র হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এত বড় প্রাণহানি ছিল ইতিহাসে অন্যতম রেকর্ড। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায়ও বাঙ্কার হিল ডুবে যায়নি। ইঞ্জিনরুমের নাবিকেরা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও জাহাজ সচল রাখেন, যা শেষ পর্যন্ত রণতরীটিকে রক্ষা করে।
জাপানি আত্মঘাতী পাইলটদের অসীম সাহস
কামিকাজে পাইলটদের মানসিকতা ছিল জটিল ও বহুমাত্রিক। অনেকেই ছিলেন তরুণ, সদ্য প্রশিক্ষণ শেষ করা। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় সীমিত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে। আদর্শ, দেশপ্রেম, সামাজিক চাপ ও সামরিক নির্দেশ সব মিলিয়ে তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।
মার্কিন সেনাদের কাছে এই কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ভিনগ্রহী। ওকিনাওয়ার কাদেনা এয়ারফিল্ডে থাকা তরুণ মেরিন পাইলটদের কাছে আত্মঘাতী আক্রমণের ধারণাই ছিল অবিশ্বাস্য। তবু বাস্তবতায় প্রতিদিনই তারা এমন শত্রুর মুখোমুখি হচ্ছিল, যার কাছে বেঁচে ফেরা কোনো লক্ষ্য নয়।
এই প্রেক্ষাপটেই ইতিহাসবিদরা বলেন, যদি জাপান আত্মসমর্পণ না করত এবং পারমাণবিক বোমা ব্যবহার না হতো, তবে ‘অপারেশন ডাউনফল’ নামে মিত্রবাহিনীর মূল ভূখণ্ডে আক্রমণের সম্ভাবনাও থাকতো, আর তা হতো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভিযান। কামিকাজে কৌশল সেখানে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।

যুদ্ধ শেষে পার্ল হারবার, ইউএসএস মিসৌরি, সাবমেরিন বোফিশসহ বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো কামিকাজে ইতিহাসকে জীবন্ত করে রেখেছে। সব মিলিয়ে, চাকাবিহীন বা স্থায়ী আন্ডারকারেজযুক্ত কামিকাজে বিমান শুধু সামরিক অস্ত্র ছিল নয়, তা ছিল এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা,আত্মোৎসর্গের মানসিকতা ও ভয়াবহ ধ্বংস এই সবকিছু মিলিয়ে কামিকাজে হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি।
এই ইতিহাস শুধু যুদ্ধজয়ের বা পরাজয়ের গল্প নয়, এটি মানুষের সিদ্ধান্ত, আদর্শ, ভুল ও আত্মত্যাগের জটিল দলিল। ওকিনাওয়া থেকে বাঙ্কার হিল প্রতিটি আঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের চরম মুহূর্তে মানুষ কতটা দূর যেতে পারে, এবং তার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে। হয়তো এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই বিশ্বের কাছে অজানা সেই পারমাণবিক অস্ত্রকে জাপানে প্রথমবারের মতো ব্যবহারের মাধ্যমে সামনে আনতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।
জাপানের সবচেয়ে বড় অভিযান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের শিল্প ও সামরিক শক্তি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আমদানিকৃত তেলের ওপর। জাপান তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ আমদানি করত যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু চীন ও ফরাসি ইন্দোচীনে আগ্রাসনের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪১ সালের জুলাইয়ে জাপানের ওপর পূর্ণ তেল নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে জাপানের হাতে থাকা তেল মজুত ছিল সর্বোচ্চ ১৮–২৪ মাসের জন্য। অর্থাৎ যুদ্ধ না করলেও জাপানের সামরিক ও অর্থনীতি অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে জাপান হাওয়াইয়ের ওয়াহু দ্বীপে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে অতর্কিত হামলা চালায় জাপান। দুই ঘণ্টার এই অভিযানে অংশ নেয় দেশটির ৩৫৩টি যুদ্ধবিমান। হামলায় ৫টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও ১৬টি, ধ্বংস হয় ১৮৮টি যুদ্ধবিমান। এতে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ১২০০ জন আহত হন।
হামলার শুরুতে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণভাবে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও সকাল ১০টার মধ্যে সীমিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জাপানি বাহিনী ফিরে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ২৯টি জাপানি বিমান ও ৫টি ছোট সাবমেরিন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। নিহত হয় ৬৪ জন জাপানি সেনা। পার্ল হারবার হামলার পরদিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট কংগ্রেসে ভাষণ দিয়ে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানান। একজন ছাড়া সবাই যুদ্ধের পক্ষে ভোট দেন এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি ফার্সি নতুন বছর 'নওরোজ' এবং পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি লিখিত বার্তা প্রদান করেছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই বার্তায় তিনি আধ্যাত্মিকতার বসন্ত এবং প্রকৃতির বসন্তের মিলনক্ষণকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একইসাথে তিনি বিশ্বের সকল মুসলিম উম্মাহকেও ঈদের শুভেচ্ছা জানান। মোজতবা খামেনি তার বার্তায় নতুন সৌর বছরকে "জাতীয় ঐক্য ও নিরাপত্তার নিরিখে প্রতিরোধ অর্থনীতির বছর" হিসেবে ঘোষণা করেছেন। জানুয়ারি মাসে দেশজুড়ে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে একটি ‘চাপিয়ে দেওয়া অভ্যুত্থান’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূলত অর্থনৈতিক সমস্যার সুযোগ নিয়েই এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সরকার পক্ষ থেকে মোজতবা খামেনিকে নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রকাশ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি। এই অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তার শারীরিক অবস্থা ও আঘাতের মাত্রা এবং ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে যে, মোজতবা খামেনি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানি জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্যই শত্রু পক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করবে। খামেনির দাবি, একই সঙ্গে রোজা রাখা ও ‘সংগ্রাম’ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইরানিরা যে অদম্য মনোবল দেখিয়েছে, তার ফলে প্রতিপক্ষরা এরই মধ্যে দুর্বল হতে শুরু করেছে। আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে খামেনি অভিযোগ করেন, বহিরাগত শত্রুরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি। এছাড়া, প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান সংকট নিরসনে ইরান মধ্যস্থতা করতে এবং সংলাপ সহজতর করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সরাসরি শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে খামেনি বলেন, সমষ্টিগত শক্তি ও জনগণের সংহতিই এই শক্তিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ করে দেবে। তার মতে, ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ সংহতিই আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ ও বাহ্যিক চাপ মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এবং এটিই শেষ পর্যন্ত শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত করবে।
ইরানে সামরিক আগ্রাসন চালাতে গিয়ে প্রথম ২০ দিনেই প্রায় ৬৪০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে ইসরাইল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭৭ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকার সমান। ইসরাইলি দৈনিক পত্রিকা 'হারেতজ'-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২১.৮৬৭ টাকা ধরে এই হিসাব পাওয়া গেছে। তথ্যমতে, এই যুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩২ কোটি ডলার বা ১০০ কোটি শেকেল ব্যয় করছে ইসরাইল। দেশটির সরকার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের বাজেট বরাদ্দ করলেও বর্তমান ব্যয়ের হার সেই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে সেনাবাহিনী অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যেই ইন্টারসেপ্টর মিসাইলসহ জরুরি সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটার জন্য রোববার ৮২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ বাজেট অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইল সরকার। এদিকে সংঘাতের আর্থিক বোঝা কেবল ইসরাইলের ওপরই নয়, বড় ধরনের ব্যয়ের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট জানিয়েছেন, অভিযান শুরুর পর থেকে ওয়াশিংটন এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় করেছে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে কংগ্রেসের কাছে ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি একটি সম্পূরক অর্থায়ন প্যাকেজ অনুমোদনের অনুরোধ জানিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীয়সহ প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত কেবল প্রাণহানিই নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।