ইরানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, একনিষ্ঠ বন্ধু ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে মস্কো তেহরানের পাশে রয়েছে। শনিবার ইরানের নওরোজ বা ফারসি নববর্ষ উপলক্ষে পাঠানো এক শুভেচ্ছা বার্তায় এই মন্তব্য করেন তিনি বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। বার্তায় পুতিন ইরানের জনগণের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে বলেন, বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি তারা সম্মানের সঙ্গে অতিক্রম করবে বলে তিনি আশা করেন। ক্রেমলিনের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও চাপ সৃষ্টি করেছে। এ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে পুতিন এটিকে ‘নৃশংস’ বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি শর্ত দিয়েছিল রাশিয়া। তবে এ প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ক্রেমলিন। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধিতে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। যদিও রাশিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে—সে অবস্থানেই রয়েছে মস্কো। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকলেও এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধারা নেই।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান মোদি। পোস্টে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে নৌপথ উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। মোদি আরও বলেন, ইরানে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন তিনি। বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ফোনালাপকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান—এমনটাই জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের আকাশসীমায় তাদের বিমানবাহিনীর একটি অভিযান চলাকালে এই ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়। তবে ঠিক কখন এ ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম টেলিগ্রাম-এ প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ক্রু সদস্যরা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। এতে কোনো বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে তেহরান দাবি করেছে, তারা তেল আবিব-এর কাছে অবস্থিত বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় জ্বালানি ট্যাংক ও একটি রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, এ হামলায় ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং কিছু সেনা সদস্যকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যৌথভাবে এই হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, তেল আবিবের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা, যেখানে যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সরবরাহের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ যোগ হতে যাচ্ছে। সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে মজুত থাকা প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল এখন খালাস ও বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রপথে নোঙর করে থাকা জাহাজে বিপুল পরিমাণ এই তেল সংরক্ষিত রয়েছে। যদিও পরামর্শক সংস্থা এনার্জি আসপেক্টস ১৯ মার্চ তাদের প্রাক্কলনে এ পরিমাণ ১৩ থেকে ১৪ কোটি ব্যারেল বলে উল্লেখ করেছিল। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এক মাসের জন্য এই তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির পথ খুলে গেছে। এর ফলে ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এ তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। বিশ্বের জ্বালানি চাহিদায় এশিয়ার দেশগুলো বড় ভূমিকা রাখে, যেখানে তাদের মোট তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় অঞ্চলের অনেক শোধনাগার উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানি তেলের সরবরাহ বাজারে নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তথ্যসূত্র: রয়টার্স
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে উভচর যুদ্ধজাহাজ ও অতিরিক্ত কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করতে যাচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তা, বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে শুক্রবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী। কর্মকর্তারা জানান, ইরানে সরাসরি সেনা পাঠানোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অভিযানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই অঞ্চলে নতুন সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের উভচর নৌবহর ‘ইউএসএস বক্সার’ ও সঙ্গে থাকা মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। এই সময় খবরটি প্রকাশ্যে আসে যখন মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অভিযান জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, “আমি কোথাও কোনো সেনা পাঠাচ্ছি না। তবে পাঠালে, তা আমি সাংবাদিকদের জানাব না।” সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সেনাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব এখনও স্পষ্ট নয়। একজন কর্মকর্তা জানান, তারা পূর্বনির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে রওনা হয়েছেন। এই মোতায়েন মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে থাকা ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়াবে দুইটি, যেখানে সাধারণত প্রতিটি ইউনিটে আড়াই হাজার সেনা থাকেন, যারা জাহাজ থেকে বিমান হামলা চালানো বা স্থলভাগে অভিযানে সক্ষম। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের উপকূলে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা ও খারগ দ্বীপে মার্কিন উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। খারগ দ্বীপ থেকে ইরানের মোট রপ্তানি তেলের ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সেনা পাঠানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ সাধারণ মার্কিন জনগণের মধ্যে সমর্থন খুবই কম। চলমান রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প ইরানে স্থলযুদ্ধের নির্দেশ দিতে পারেন, কিন্তু কেবল ৭ শতাংশই এ ধরনের সিদ্ধান্ত সমর্থন করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, কাতারের রাস লাফান জ্বালানি কমপ্লেক্সে হামলায় দেশটির সামরিক সামর্থ্যের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ভবিষ্যতে যদি ইরানি স্থাপনার ওপর পুনরায় হামলা হয়, সংযম আর বজায় রাখা হবে না। আরাঘচি সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ প্রকাশিত পোস্টে বলেন, ‘সংযত থাকার একমাত্র কারণ ছিল আন্তর্জাতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান ও অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখানো।’ তিনি আরও যোগ করেন, যুদ্ধের ইতি টানতে হলে ইরানের বেসামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও সমাধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মাঝেও ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করছে। আরাঘচির হুঁশিয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বর্তমান সংঘাত ‘ভয়াবহ উত্তেজনা’ তৈরি করেছে, তবে যুদ্ধের সূচনা করেছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার দোহার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেন। আল থানি বলেন, ইরান প্রতিশোধ নিতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছে। তবে শত্রুতা অবিলম্বে বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা ছাড়া বিকল্প নেই। সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদানও ইরানের হামলাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলই যুদ্ধের সূচনাকারী। তবে ইরানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে যাতে আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি না পায়। উল্লেখ্য, সংবাদ সম্মেলনের ঠিক আগে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার সতর্ক সংকেত হিসাবে সাইরেন বাজে ওঠে। তবুও পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনটি সম্পন্ন হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত যখন চরমে, ঠিক তখনই এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন কংগ্রেসের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে নিজেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত ও জর্ডানের কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে হোয়াইট হাউজ। বৃহস্পতিবার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে এক ‘জরুরি অবস্থা’ বিরাজ করছে। আর এই বিশেষ পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের বাধ্যতামূলক পর্যালোচনার নিয়মটি বাতিল করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অস্ত্র চুক্তির বিস্তারিত: সংযুক্ত আরব আমিরাত: আমিরাতের জন্য প্রায় ৮.৪০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত মাঝারি পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল (AMRAAM), এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের গোলাবারুদ এবং শত্রু ড্রোন মোকাবিলায় সক্ষম অত্যাধুনিক ‘ইন্টিগ্রেটেড ডিফিট সিস্টেম’। এছাড়াও থাকছে দূরপাল্লার রাডার ব্যবস্থা যা থাড (THAAD) মিসাইল ডিফেন্সের সাথে যুক্ত করা হবে। কুয়েত: আকাশপথে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে কুয়েতের কাছে ৮ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সেন্সর রাডার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জর্ডান: জর্ডানের জন্য ৭০.৫ মিলিয়ন ডলারের ‘এয়ারক্রাফট ও মিউনিশন সাপোর্ট’ নিশ্চিত করা হয়েছে, যার আওতায় যুদ্ধবিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা প্রদান করা হবে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ক্রমাগত ড্রোন ও মিসাইল হামলার মুখে নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে মিত্র দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই অস্ত্রের দাবি জানিয়ে আসছিল। উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতেই ইসরায়েলের কাছেও কংগ্রেসকে এড়িয়ে ১২ হাজার বোমা বিক্রির অনুরূপ একটি জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইডেন প্রশাসনের সময় থমকে যাওয়া এই বিশাল অস্ত্র চুক্তিগুলো দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের পূর্ণ সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিল। তবে এই সরঞ্জামগুলো কবে নাগাদ পৌঁছাবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি আধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং ২ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন সামরিক সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিনস জানান, বিমানটি ইরানের আকাশসীমার ওপর একটি যুদ্ধ মিশনে ছিল। আঘাতের পর বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট সুস্থ আছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার জন্য তদন্ত চলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের ওপর প্রথম আঘাত হিসেবে গণ্য হতে পারে। উল্লেখ্য, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে, যখন মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে তাদের সাফল্যের দাবি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পেট হেগসেথ বৃহস্পতিবার জানান, “ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।” বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই ধরনের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে, কারণ উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া উভয়পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের মাত্রা বাড়ায়।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রধান এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা। তিনি আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখার আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সারসহ কৃষি উপকরণের সরবরাহ কমে গেছে, যা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” বিশ্বের মোট নাইট্রোজেন সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে করা হয়। তিনি জানান, “সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন এবং এমন ফসল চাষে মনোযোগ দেবেন যা কম সারেই ফলন দেয়।” ওকোনজো-ইওয়েলা আরও জোর দিয়ে বলেন, “বিশ্বব্যাপী খাদ্য বাণিজ্যের পথগুলো উন্মুক্ত ও স্থিতিশীল রাখা জরুরি, যাতে খাদ্যের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় অঞ্চলগুলোতে তা পৌঁছাতে পারে।”
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান মঙ্গলবার আবুধাবিতে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই নেতা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘর্ষের আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমিরাতের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াম জানিয়েছে, বৈঠকে নেতারা এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা অবিলম্বে বন্ধ করার গুরুত্বের উপর জোর দেন এবং কূটনীতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট আল-সিসি ইরানের সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষা করার পদক্ষেপগুলোর প্রতি মিসরের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি যুদ্ধে দেশটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমিরাত ৩৩৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ভূপাতিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছাড়িয়ে জ্বালানি স্থাপনাগুলোও এখন হামলার শিকার হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—যদি সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে কি পাকিস্তান তাদের পারমাণবিক সহায়তা দেবে? সংঘাত শুরুর পর থেকে ইসরায়েল তেহরানের তেল ডিপো ও সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। জবাবে ইরান কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব ও বাহরাইনের জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে রিয়াদ। রিয়াদ–এ আয়োজিত এক বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং যৌথ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোটের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে ইসলামাবাদের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে। এক সৌদি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান আল-আনসারি বলেন, “প্রয়োজনে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করতে পারে, যা কার্যত একটি ‘পারমাণবিক ছাতা’র মতো কাজ করতে পারে।” গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, কোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে—যা অনেকটা ন্যাটো–এর অনুচ্ছেদ ৫–এর মতো। তবে বাস্তবে পাকিস্তান সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত এবং সম্পূর্ণ পরিস্থিতিনির্ভর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, এমন পদক্ষেপ আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭০ জন স্কুলশিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ববিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই হামলা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ছিল সুপরিকল্পিত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত এই ধ্বংসযজ্ঞের দায় মার্কিন প্রশাসন অস্বীকার করলেও খোদ ওয়াশিংটনেই এখন অস্থিরতা তুঙ্গে। ক্যাপিটল হিলের জনমত জরিপ বলছে, ৭৪ শতাংশ মার্কিনি এই যুদ্ধের বিপক্ষে, যার মধ্যে ৫২ শতাংশ রিপাবলিকানও রয়েছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্থলসেনা মোতায়েন নিয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছেন। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, আরক শহরে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নবজাতকসহ অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক নিহতের খবর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। যুদ্ধের মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের ডিরেক্টর জো কেন্টের পদত্যাগ ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেন্ট সরাসরি জানিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি ছিল না; বরং ইসরায়েলের স্বার্থেই এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে মার্কিন উপস্থিতি উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। এদিকে, হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দার দ্বারপ্রান্তে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের এই সংঘাত ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। জাতিসংঘ সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযানে এ পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে জার্মানির অবস্থান স্পষ্ট করলেন চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ। বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি জানান, যতক্ষণ না এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বা 'অস্ত্রের গর্জন' থামছে, ততক্ষণ জার্মানি সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপে জড়াবে না। চ্যান্সেলর মের্জ সাংবাদিকদের বলেন, "শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই কেবল আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করতে পারি। যুদ্ধ চলাকালীন জার্মানি কোনো পদক্ষেপ নেবে না।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভবিষ্যতে জার্মানি যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা অবশ্যই ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতেই করা হবে। সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখা এবং নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জার্মানির সক্ষমতা রয়েছে স্বীকার করেও মের্জ জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট বা আইনগত বৈধতা ছাড়া জার্মানি সেখানে কোনো সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার পর জার্মানির পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা এলো। ট্রাম্পের দাবি ছিল, যেহেতু মিত্র দেশগুলো এই পথ দিয়ে তেল আমদানি করে, তাই এর নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। তবে চ্যান্সেলর মের্জের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, চাপের মুখে নয় বরং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি এবং শান্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জার্মানি তার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে যুদ্ধের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করল ইরান। ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন হামলায় সহায়তা করার অভিযোগে সরাসরি জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে তেহরান। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি সম্প্রতি মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেসের কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন। ইরানের গণমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই চিঠিতে আমিরাতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। ইরানের দাবি, তাদের ভূখণ্ডে সামরিক আগ্রাসন চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। রাষ্ট্রদূত ইরাভানি চিঠিতে উল্লেখ করেন, এই হামলাগুলো নিছক কোনো ঘটনা নয় বরং এগুলো ‘আন্তর্জাতিকভাবে অন্যায় কাজ’ এবং এর দায়ভার সম্পূর্ণভাবে আমিরাতকেই বহন করতে হবে। ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তারা কেবল অবকাঠামোগত বা ‘বস্তুগত’ ক্ষয়ক্ষতিই নয়, বরং এই হামলার ফলে সৃষ্ট ‘নৈতিক ক্ষতি’র জন্যও যথাযথ প্রতিদান চায়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে ফাটল ধরাতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর টোল ও কর আদায়ের পরিকল্পনা করছে ইরান। দেশটির সংসদ সদস্য সোমায়ে রাফিই সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তেহরানের ওয়ালিআসর স্কোয়ারে আয়োজিত এক জনসমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় তিনি জানান, বর্তমানে ইরানের আইনপ্রণেতারা এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা নিয়ে গুরুত্বের সাথে কাজ করছেন। মূলত 'জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার' লক্ষ্যেই তেহরান তার এই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায়। শত্রুপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাফিই বলেন, "আমরা আমাদের শত্রুদের আগের সেই আয়েশি দিনগুলো কেড়ে নিয়েছি। তারা এখন এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না।" তিনি আরও যোগ করেন যে, চলমান উত্তেজনার অবসান ইরানের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমেই হবে এবং এরপর থেকে এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত শত্রুপক্ষর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। বিশ্বের জ্বালানি তেলের সিংহভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় ইরানের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইরান বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশেষ বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইরানের বর্তমান সামরিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতাই অঞ্চলটিতে চলমান যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে ইরান তার ‘প্রক্সি’ বা ছায়াবাহিনীগুলোর মাধ্যমে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে আধিপত্য বজায় রাখত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের সেই কৌশলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং অন্যদিকে ইজরায়েলি ও পশ্চিমা গোয়েন্দা তৎপরতায় দেশটির সামরিক কমান্ড কাঠামো বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় ইরান এখন সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষমতা হারিয়েছে। মূল পয়েন্টসমূহ: ১. প্রক্সি বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল: হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলো ইজরায়েলের ধারাবাহিক অভিযানে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিএনএন-এর মতে, ইরান তার এই মিত্রদের রক্ষা করতে বা পাল্টা বড় কোনো আঘাত হানতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা যুদ্ধের ময়দানে এক ধরনের অচলাবস্থা বা ‘ডেডলক’ তৈরি করেছে। ২. অর্থনৈতিক সংকট ও জনরোষ: দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রাস্ফীতির ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সরকারের বড় একটি অংশ মনে করছে, দেশের বাইরের সংঘাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা তেহরানের আর নেই। এই দোদুল্যমান অবস্থা সংঘাত অবসানে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ইরানকে বাধা দিচ্ছে। ৩. কৌশলগত বিভ্রান্তি: বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এখন এমন এক অবস্থানে যেখানে তারা না পারছে যুদ্ধ জয় করতে, না পারছে সম্মানজনকভাবে পিছু হটতে। তেহরানের এই ‘দুর্বলতা’ এবং সিদ্ধান্তহীনতা যুদ্ধকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কারণ কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না। ৪. ইজরায়েলের অবস্থান: ইজরায়েল ইরানের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে লেবানন এবং সিরিয়ায় তাদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা জোরদার করেছে। ইরান সরাসরি কোনো জবাব দিতে না পারায় সংঘাতের মাত্রা দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরান যদি দ্রুত তাদের কৌশল পরিবর্তন না করে অথবা বিশ্বশক্তিগুলো যদি তেহরানকে একটি নিরাপদ প্রস্থানের পথ (Exit ramp) না দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। ইরানের এই ভঙ্গুর দশা স্থিতিশীলতার পরিবর্তে উল্টো অস্থিতিশীলতাকেই উসকে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। গত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। এই ঘটনার পর পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের বিশেষ বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) এই হামলা পরিচালনা করে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, তেহরানের ওপর থেকে রিয়াদ তাদের শেষ আস্থাটুকুও হারিয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সৌদি আরব নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে। হামলার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েত, কাতার এবং আরব আমিরাতের বেশ কিছু তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা যায়নি। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কিছু আক্রমণ প্রতিহত করলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। পাল্টা হামলার শিকার ইরান: এদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দাবি করেছেন যে, ইসরায়েল ইরানের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র 'সাউথ পার্স'-এ ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র বা কাতারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না; ইসরায়েল এককভাবেই এই আক্রমণ পরিচালনা করেছে। তবে এই বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: সংঘাতের এমন ভয়াবহ বিস্তার দেখে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের কথা ভাবছে বাইডেন প্রশাসন। মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, চলমান অভিযানে ইরানের শাসনব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হলেও তারা এখনো এই অঞ্চলে মার্কিন এবং মিত্রদের স্বার্থে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। মানবিক বিপর্যয় ও উদ্বেগ: এই সংঘাতের তিন সপ্তাহ পার হতে চললেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো প্রথমবারের মতো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে তিন ফিলিস্তিনি নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালী এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত কোনো যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় না পৌঁছালে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তেহরানে একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর উদ্ধারকর্মীরা যখন ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এক মাকে টেনে বের করছিলেন, তখন ব্যথায় কাতর সেই মায়ের কণ্ঠে ছিল কেবল একটিই প্রশ্ন— "আমার সন্তান কি বেঁচে আছে?" ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশিত একটি হৃদয়বিদারক ভিডিওতে ফুটে উঠেছে সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। ভিডিওতে দেখা যায়, ধুলোবালি আর ভাঙা ইটের স্তূপের নিচে আটকে পড়া এক নারীর হাত শক্ত করে ধরে আছেন একজন উদ্ধারকর্মী। তিনি মমতার সাথে অভয় দিয়ে বলছেন, "আমরা আপনাকে বের করে আনছি। একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন।" কিন্তু নিজের প্রাণের চেয়েও ওই মায়ের ব্যাকুলতা ছিল তার সন্তানের জন্য। বারবার তিনি জানতে চাইছিলেন তার কলিজার টুকরোটির খবর। উদ্ধারকর্মীরা তাকে আশ্বস্ত করে জানান, তার সন্তানকে আগেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। ভবনের কোণার একটি ঘর থেকে পরিবারের সবাইকে নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের অন্ধকার কাটিয়ে আলোর মুখ দেখেন সেই মা।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌপথের স্থিতিশীলতা রক্ষায় একজোট হয়েছে অঞ্চলের প্রভাবশালী ১২টি রাষ্ট্র। বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক জরুরি বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে অবিলম্বে সব ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে দেশগুলো। কাতার, আজারবাইজান, বাহরাইন, মিশর, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। বিবৃতিতে তেহরানকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় ইরানকে অবশ্যই উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে। বিবৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর। মন্ত্রীরা ইরানকে সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত করা বা সমুদ্রপথে নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই জলপথগুলোতে কোনো ধরনের অস্থিরতা কাম্য নয় বলে তারা একমত হন। একই বৈঠকে মন্ত্রীরা লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তারা লেবাননের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদের এই বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে বড় দেশগুলো একযোগে ইরানকে সংযত হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সন্নিকটে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে জোরালো ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরাকি নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, অন্তত দুটি ড্রোন এই অভিযানে অংশ নেয়। গত কয়েক দিনে ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ)-এর বিভিন্ন অবস্থানে প্রাণঘাতী হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, পিএমএফ জোটের মধ্যে এমন কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যাদের সাথে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। এই ড্রোন হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে অঞ্চলটিতে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস