- প্রচ্ছদ
- Topic
হুথি
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষের ধারণা, স্বচ্ছন্দে অবসরজীবন কাটাতে প্রায় ১২ লাখ ডলার সঞ্চয় থাকা দরকার। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত শ্রোডার্সের এক জরিপেও এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে অবসরের পর এই অর্থ কতদিন চলবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আপনি যুক্তরাষ্ট্রের কোন রাজ্যে বসবাস করছেন তার ওপর। ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান মানিলায়ন ১২ লাখ ডলার অবসর সঞ্চয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি কত বছর চলতে পারবেন, তার একটি হিসাব করেছে। এতে দুটি পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে—একটি ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রতি মাসে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধা পাবেন, অন্য ক্ষেত্রে পাবেন না। হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে কম খরচের রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ওকলাহোমা। সেখানে ৬৭ বছর বয়সে অবসর নিলে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধাসহ ১২ লাখ ডলারের সঞ্চয় প্রায় ৪৪ দশমিক ৬ বছর চলতে পারে। অর্থাৎ সঞ্চয় শেষ হতে পারে ১১১ বছর বয়সের কাছাকাছি গিয়ে। সোশ্যাল সিকিউরিটি না থাকলেও এই অর্থ সেখানে প্রায় ২৩ দশমিক ৪ বছর চলার হিসাব করা হয়েছে। এরপর রয়েছে আলাবামা, মিসিসিপি, কানসাস ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া। এসব রাজ্যে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধাসহ ১২ লাখ ডলার যথাক্রমে প্রায় ৪৩ দশমিক ১, ৪২, ৪০ দশমিক ৮ ও ৪০ দশমিক ৫ বছর চলতে পারে। ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, মিসৌরি, টেনেসি ও আরকানসাসেও একই অর্থ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় চলার হিসাব পাওয়া গেছে। টেনেসিতে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধাসহ প্রায় ৩৯ দশমিক ৭ বছর এবং সুবিধা ছাড়া প্রায় ২২ বছর চলতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল রাজ্যগুলোতে একই পরিমাণ অর্থ অনেক দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মানিলায়নের বিশ্লেষণে হাওয়াইকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবস্থানগুলোর একটি হিসেবে পাওয়া গেছে। সেখানে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধা থাকলেও ১২ লাখ ডলারের সঞ্চয় প্রায় ১৩ বছর চলার হিসাব করা হয়েছে। হাওয়াইয়ের পর ম্যাসাচুসেটস, ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, আলাস্কা ও নিউইয়র্কেও অবসরের নির্দিষ্ট বাজেট তুলনামূলক দ্রুত শেষ হওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। তবে ১২ লাখ ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছানোও অনেক আমেরিকানের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। শ্রোডার্সের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, অবসরের বয়সে পৌঁছানোর আগে তারা সাত অঙ্কের সঞ্চয় করতে পারবেন। সোশ্যাল সিকিউরিটি নিয়েও অনিশ্চয়তা এদিকে সোশ্যাল সিকিউরিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনা চলছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ২০৩২ সালের দিকে কর্মসূচিটির তহবিল সংকটে পড়তে পারে এবং সংস্কার না হলে সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আইনপ্রণেতারা আলোচনা করছেন। সিনেটর ডিক ডারবিন ও বিল ক্যাসিডি এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছেন, যার লক্ষ্য হলো সোশ্যাল সিকিউরিটির অবসর তহবিলকে অন্তত ৫০ বছর আর্থিকভাবে টেকসই রাখার জন্য নতুন আইন প্রণয়নের পথ তৈরি করা। ক্যাসিডি ও সিনেটর টিম কেইন-এর আরেকটি প্রস্তাবে ৭৫ বছরের জন্য শেয়ারবাজারসহ তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক অর্থ ট্রেজারি বিভাগের অতিরিক্ত ঋণের মাধ্যমে জোগানের কথা রয়েছে। অন্যদিকে, সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও বার্নি মোরেনো সোশ্যাল সিকিউরিটির বেতনভিত্তিক করের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। বর্তমানে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ ডলার আয় পর্যন্ত এই কর প্রযোজ্য। তাদের যুক্তি, উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর করের আওতা বাড়ালে সোশ্যাল সিকিউরিটির অর্থসংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থ পাওয়া যেতে পারে। তবে রক্ষণশীল কয়েকটি সংগঠন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি, কর বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে মজুরি ও কর্মসংস্থানে।
ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখায় হুথি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর স্বাভাবিক জীবন অনেকটাই থেমে গেছে। দোকানপাট বন্ধ, স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই এবং নিরাপত্তার আশঙ্কায় বহু পরিবার ঘর থেকে বের হচ্ছে না। গত সপ্তাহে হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শহরের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে মোখা ছেড়ে পালিয়েছে। অনেকেই দক্ষিণের সরকারি নিয়ন্ত্রিত শহর এডেনের দিকে যাচ্ছেন। তবে অর্থের সংকটে বহু পরিবার শহরেই আটকে আছে। এডেনে যাওয়ার বাসভাড়াও বেড়ে যাওয়ায় তাদের জন্য শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। মোখার বাসিন্দা মাহমুদ জানান, তিনি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কাজে যেতে পারেননি। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না। আগে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকা দোকানগুলো এখন অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শহরে বিদ্যুৎ থাকলেও রাত ৮টার দিকে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। শিক্ষা কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। স্থানীয় এক শিক্ষক জানান, মোখায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। শিশুদের ওপর হুথিদের প্রভাব বিস্তার বা নিয়োগের আশঙ্কাও কিছু পরিবারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয় বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন। মোখা ছেড়ে পালানো মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হাজার হাজার মানুষ দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে দেশটিতে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মোখার গুরুত্ব শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়। লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত শহরটি বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি। এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হয়। ফলে মোখা ও আশপাশের এলাকায় হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মোখায় এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপত্তাহীনতা, চলাচলে বাধা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্থবিরতা। শহর ছেড়ে পালানোর সামর্থ্য যাদের নেই, তাদের অনেকেই ঘরেই অবস্থান করছেন। একই সময়ে ইয়েমেনের অন্যান্য এলাকায়ও সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি বাড়তে থাকায় দেশটির দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। Source: আরব নিউজ, রয়টার্স
সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ১৭ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত প্রস্তাবটির আনুমানিক মূল্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পরই এর পরবর্তী ধাপ এগোবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় এই অনুমোদনের মাধ্যমে সৌদি আরবকে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে জানানো হয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তিতে ৪৮টি এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি এফ১৩৫ ইঞ্জিন, যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহ সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, প্রস্তাবিত বিক্রিটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় মিত্র সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর সঙ্গে দেশটির সামরিক সমন্বয় জোরদারের বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে। এফ-৩৫ বিক্রির ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে লড়াই আবারও তীব্র হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর হুথিরা দাবি করে, তারা ইয়েমেনের মারিব গভর্নরেটে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তাদের দাবি, স্থানীয়ভাবে তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বিমানটি নামানো হয়েছে। তবে সৌদি সরকার এ দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণেও ঘটনাটিকে এখনো যাচাইসাপেক্ষ বলা হয়েছে। হুথিদের এই দাবির মধ্যেই সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংঘাতে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে এবং দেশটি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরসহ কয়েকটি দেশের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার চেষ্টা করছে। একই সময়ে হুথিদের হামলায় সৌদি ভূখণ্ডে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। তবে নতুন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দ্রুত সৌদি আরবের বর্তমান সংঘাতে ব্যবহৃত হবে, এমন কোনো তথ্য নেই। চুক্তি কংগ্রেসে অনুমোদিত হলেও বিমান সরবরাহ শুরু হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি বেইজিংয়ের হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকতে পারে। হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তি এ কারণেই প্রস্তাবিত বিক্রির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ চীনের নাগালের মধ্যে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করা উচিত নয়। ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও এই চুক্তিকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই একমাত্র দেশ, যারা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে। সৌদি আরবকে একই যুদ্ধবিমান দেওয়ার সম্ভাবনা দেশটির দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, প্রস্তাবিত বিক্রির ফলে অঞ্চলটির সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন হবে না। এফ-৩৫ নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। সম্ভাব্য চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরব হবে প্রথম আরব দেশ, যারা এফ-৩৫ পরিচালনা করবে। এরই মধ্যে সৌদি আরব আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। তুরস্ক ও পাকিস্তান অবশ্য জানিয়েছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং এর লক্ষ্য যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা। এফ-৩৫ কর্মসূচি নিয়ে এর আগে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও বড় পরিবর্তন হয়েছিল। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এফ-৩৫ প্রযুক্তির সমন্বয় হলে সংবেদনশীল সামরিক তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির ক্ষেত্রে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা। কংগ্রেসে প্রস্তাবটি কীভাবে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই সম্ভাব্য অস্ত্রচুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না। সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য।
মধ্যপ্রাচ্যে একসঙ্গে বাড়ছে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ। সৌদি আরবে হুথিদের হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইরানে বাড়ানো হয়েছে বেশি পেট্রোল ব্যবহারকারীদের জ্বালানির দাম। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট। ইয়েমেনের হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকির দাবি, হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন। আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরান শহরের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর সৌদির কিছু জ্বালানি স্থাপনার কার্যক্রমও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে হামলার ধরন ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবিগুলোই এখন পর্যন্ত প্রধান তথ্যসূত্র। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এরই মধ্যে তেল রপ্তানি ও বাণিজ্যের জন্য বিকল্প পাইপলাইন, বন্দর ও পরিবহনপথ জোরদার করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পাইপলাইন তৈরি করলেও হরমুজ প্রণালির পুরো বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়। কারণ বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহনের সক্ষমতা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কেপলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যা মে মাসের পর সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বেশি পেট্রোল ব্যবহারকারীদের জন্য জ্বালানির দাম দ্বিগুণ করেছে ইরান। নতুন নিয়মে মাসে ১১০ লিটারের বেশি পেট্রল ব্যবহার করলে প্রতি লিটারে ১ লাখ রিয়াল দিতে হবে। আগের দাম ছিল ৫০ হাজার রিয়াল। ইরানের রাষ্ট্রীয় তেল বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান জানিয়েছেন, নতুন দাম প্রায় ১৫ শতাংশ গ্রাহকের ওপর প্রভাব ফেলবে। আগস্টে দেশটিতে দৈনিক পেট্রোল ব্যবহার রেকর্ড ১৪ কোটি ৫০ লাখ লিটারে পৌঁছেছিল, যেখানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১২ কোটি ২০ লাখ লিটার। ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। ইরানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতিও প্রায় ৬৭ শতাংশে রয়েছে। ফলে নতুন করে পেট্রোলের দাম বাড়ায় খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির বাসিন্দারা। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তিন দিনের ইসরায়েলি হামলায় ২৭ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও চিকিৎসাকর্মীও রয়েছেন। কাফর রুম্মানে একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় ১২ জন নিহত ও ১০ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও চার নারী ছিলেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য জানিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলছে, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহর বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন হামলার পর ইসরায়েল পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক টিকে থাকাকে দেশের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট। সোমবার রোশ হাইনের এক সমাবেশে আইজেনকোট বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর প্রায় তিন বছর ধরে নেতানিয়াহু জবাবদিহি এড়িয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। আইজেনকোটের নতুন দল ইয়াশার সাম্প্রতিক জনমত জরিপে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর জরিপে দলটি ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ২৩টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যেখানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পেতে পারে ২০টি। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের কাছাকাছি নেই। সৌদি আরবে হুথি হামলা, লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়ছে। একই সময়ে ইরানের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশটির অর্থনৈতিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দমন করা সৌদি আরবের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ইরানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম দেফা প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি এই সতর্কবার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হুথিদের ওপর সৌদি আরবের হামলা যত বাড়বে, তাদের ভূখণ্ডে পাল্টা আঘাতের মাত্রাও তত ভয়াবহ হবে। হুথিদের বিকল্প নাম ‘আনসারুল্লাহ’ উল্লেখ করে আইআরজিসির এই মুখপাত্র বলেন, সৌদি আরব ইয়েমেন ও আনসারুল্লাহকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কুর্দিস্তান ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি সৌদি আরব যত বেশি আগ্রাসন চালিয়েছে, তার ওপর পাল্টা হামলার পরিমাণও ঠিক ততটাই বেড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে বৃহত্তর সংঘাতের সূচনা হয়, গত মাসে ইয়েমেন সেই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান একটি ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতে পাল্টাপাল্টি হামলার পর হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে আক্রমণ জোরদার করে এবং লোহিত সাগরে সৌদির বন্দরগুলো অবরোধের চেষ্টা চালায়। ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি ইরানি বিমান অবতরণের পর এই উত্তেজনা আরও চরমে পৌঁছায়। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চললেও, ২০২২ সালে শুরু হওয়া সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুথিদের যুদ্ধবিরতি সাম্প্রতিক এই সংঘাতের জেরে পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এদিকে, চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের এক মন্ত্রী ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, হুথিরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে ভূমি দখলের ছক কষছে। আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল রুটে হুথিদের এই পদক্ষেপ বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করতে পারে। ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর একাধিক সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, হুথিরা তাদের বর্তমান নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আরও দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একটি দেশের অর্থনীতি গড়ে উঠতে লাগে বছরের পর বছর পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সেই অর্জনকে খুব অল্প সময়েই ধ্বংস করে দিতে পারে। ইয়েমেন তার অন্যতম কঠিন উদাহরণ। ২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীদের রাজধানী সানা দখল এবং পরের বছর পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির অর্থনীতি ও উন্নয়নব্যবস্থা গভীর সংকটে পড়ে আছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইয়েমেনের অর্থনীতি ৫০ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে এবং মাথাপিছু জিডিপি অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা সানা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি আঞ্চলিক জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক অভিযান শুরু করলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়। সংঘাতের প্রভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদন, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং সরকারি সেবাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০১৫ সালেই ইয়েমেনের জিডিপি প্রায় ২৮ শতাংশ কমে যায় এবং বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকে যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হারিয়েছে। সংঘাত বাজার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, ধ্বংস করেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং বাড়িয়েছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য। বর্তমানে ইয়েমেনের অর্থনীতি কার্যত বিভক্ত। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান, মুদ্রা ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। তেল রপ্তানি বন্ধ থাকা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি আরও ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে এবং ২০২৬ সালেও আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের হিসাবে, ইয়েমেনে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। খাদ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সংকটে পড়তে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে ভেঙে পড়েছে মৌলিক সেবাও। জাতিসংঘের হিসাবে, ইয়েমেনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র প্রায় ৫৯ শতাংশ পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। দেশটি খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহব্যবস্থার যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করে। ইয়েমেনের এই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হলেও অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ হবে না। ইউএনডিপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের মানব উন্নয়ন বহু বছর পিছিয়ে গেছে এবং শান্তি ফিরে এলেও যুদ্ধের আগের উন্নয়নস্তরে ফিরতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু যুদ্ধ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ব্যাংকিং ও মুদ্রাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা, তেল ও অন্যান্য রপ্তানি পুনরায় চালু করা, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং মানুষের কর্মসংস্থান ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের মতে, স্থায়ী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শান্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কার্যকর সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা জরুরি।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের হুমকি আরও জোরালো করল গোষ্ঠীটি। ফলে ইরানের যুদ্ধ ঘিরে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে নতুন করে সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হুথিদের দাবি, তারা ‘এনসেলিয়া’ ও ‘লায়লা’ নামের দুটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, ‘এনসেলিয়া’ জাহাজে হামলার পর এর সামনের অংশে আগুন ধরে যায়। তবে ‘লায়লা’ জাহাজে হামলার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ‘এনসেলিয়া’ জাহাজটি সৌদি আরবের জিজান বন্দরের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে বিপদসংকেত পাঠিয়েছিল। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাব আল-মান্দাব প্রণালি এড়িয়ে চলাচলের পথ পরিবর্তন করেছে। মঙ্গলবার সৌদি তেল নিয়ে চীন ও ভারতের দিকে যাওয়া তিনটি ট্যাংকারও গতিপথ ঘুরিয়ে নেয়। বুধবার আরও পাঁচটি ট্যাংকার লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এড়িয়ে যায়। বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। এর আগে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের তেল পরিবহনে লোহিত সাগরের পথও যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে টানা ১২তম রাতের মতো সামরিক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা জর্ডান, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি সংরক্ষণকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার জবাবে দেশটির অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। পাল্টা ইরানের সামরিক কমান্ডও হুমকি দিয়েছে, তাদের অবকাঠামোতে হামলা হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, সৌদি আরবগামী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। গোষ্ঠীটির ভাষ্য, তাদের ঘোষিত সামুদ্রিক অবরোধ অমান্য করে সৌদি বন্দরের দিকে যাওয়ায় ‘এনসেলিয়া’ (Encelia) ও ‘লায়লা’ (Layla) নামের ট্যাংকার দুটিকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি এক বিবৃতিতে জানান, অভিযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তার দাবি, হামলায় দুটি ট্যাংকারেই আগুন ধরে যায় এবং অভিযান সফল হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। হুথিরা আরও দাবি করেছে, হামলার পাশাপাশি অন্তত ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের গন্তব্য পরিবর্তন করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এই দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সৌদি আরবের আল-শুকাইক উপকূল থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে জাহাজে আগুন লাগে এবং নাবিকরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। সংস্থাটি জানায়, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। নৌ-নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাতপ্রাপ্ত জাহাজটি সৌদি পতাকাবাহী এনসেলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় ট্যাংকার লায়লা-তে হামলার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জাহাজ দুটির ক্ষয়ক্ষতি, নাবিকদের অবস্থা কিংবা সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এর কয়েক দিন আগেই হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার কথা জানায়। তাদের অভিযোগ, ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখা এবং হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ওপর বিধিনিষেধ বজায় রাখার জবাব হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট তখন সতর্ক করে বলেছিল, এ ধরনের হুমকির জবাব তারা "কঠোরভাবে" দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ। এ অঞ্চলে নতুন করে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সূত্র: রয়টার্স, ইউকেএমটিও।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইয়েমেনের ভূখণ্ড থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় তাত্ক্ষণিক কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হুথি গ্রুপ তাদের সংযুক্ত মিডিয়া আল মাসিরাহ-এর মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানায়, তারা গুরুত্বপূর্ণ ইসরায়েলি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই অভিযানে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় ছিল। হুথিরা দাবি করেছে, তাদের উদ্দেশ্য সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী যুদ্ধের ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপ ধাপে ধাপে করা হচ্ছে। বর্তমান স্তরে থেমে থাকবেন না, ভবিষ্যতের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।” আল জাজিরা সূত্রে জানা গেছে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বিষয়টি নজরদারিতে রাখছেন।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজে পুনরায় বড় ধরনের হামলা শুরু করতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইয়েমেন জলসীমা এড়িয়ে চলার জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা। শনিবার ইসরায়েল অভিমুখে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে এই বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট জানিয়েছেন, উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা এখন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি যেকোনো সময় অবরুদ্ধ হওয়ার উচ্চঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেভাল ফোর্স ‘অ্যাসপাইডস’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মালিকানাধীন অথবা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর জন্য ইয়েমেন উপকূল এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতা আছে এমন জাহাজের ক্ষেত্রে হুমকির মাত্রা এখন ‘সর্বোচ্চ’। অন্যদিকে, অন্যান্য সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষেত্রে এই হুমকির মাত্রা ‘মাঝারি’ পর্যায়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে লোহিত সাগরে ইসরায়েলগামী ও পশ্চিমা জাহাজে একের পর এক হামলা চালিয়ে আসছে হুথি বিদ্রোহীরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটটি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকা এড়িয়ে চলতে নাবিক ও জাহাজ কোম্পানিগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইসরায়েল লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই গত ২০ বছরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের বৃহত্তম সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, শনিবার হুথি বিদ্রোহীরা ইসরায়েল অভিমুখে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তারা প্রথম দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সরাসরি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে নিজেদের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দিয়েছিল। হুথিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইসরায়েলের ‘স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা’ লক্ষ্য করে একঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তবে ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, উভয় ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝপথে বাধা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এই নতুন সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার মুখে নজিরবিহীন সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, শনিবার ৩,৫০০ মেরিন সেনা ও নৌ-সদস্য নিয়ে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ (USS Tripoli) এই অঞ্চলে পৌঁছেছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে জানানো হয়, এটি গত ২০ বছরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ। এই নতুন মেরিন সেনারা আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সাথে যুক্ত হবে। জানা গেছে, ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সেনারা মূলত জাপানে অবস্থান করছিল। তাইওয়ান প্রণালীর কাছাকাছি মহড়া চলাকালীন প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তাদের জরুরিভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই যুদ্ধজাহাজে মেরিন সেনাদের পাশাপাশি রয়েছে অত্যাধুনিক পরিবহন বিমান, স্ট্রাইক ফাইটার জেট এবং উভচর হামলার সরঞ্জাম। এছাড়া, ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে ‘ইউএসএস বক্সার’ এবং আরও দুটি যুদ্ধজাহাজকে এই অঞ্চলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুথিদের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-পন্থী হুথি বিদ্রোহীরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের হামলার মাত্রা বাড়ায়, তবে হুথিরাও এই লড়াইয়ে অংশ নেবে বলে সিএনএন-কে জানিয়েছেন গোষ্ঠীটির একজন দ্বায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এর আগে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল হুথিরা। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল তারা শুরুতেই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, তবে গোষ্ঠীটি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। হুথি সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের আন্ডারসেক্রেটারি মোহাম্মদ মনসুর সিএনএন-কে পাঠানো এক বার্তায় বলেন, 'আনসারুল্লাহর (হুথিদের সাংগঠনিক নাম) নেতৃত্বে ইয়েমেন ইরানকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। এটি আমাদের ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।' তিনি আরও জানান যে, যুদ্ধে নামার সময়টি নির্ভর করছে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর মূল্যায়ন এবং তেহরান ও মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার ওপর। মনসুর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্ররা যদি ইরানের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়াতে চায়, তবে ইয়েমেন তাদের আগেই পাল্টা পদক্ষেপ নেবে।' তিনি আরও জানান, লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ 'বাব এল-মান্দেব' প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া তাদের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প। এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেই নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই সংঘাতের ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ হাজার মানুষ। 'ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ' (আইএফআরসি)-এর মারিয়া মার্টিনেজ এই হতাহতের তথ্য জানিয়েছেন। মার্টিনেজ বলেন, চলমান সংঘাত ক্রমশ বাড়তে থাকার এই কঠিন পরিস্থিতিতেও একমাত্র দেশব্যাপী মানবিক সংস্থা হিসেবে পুরো ইরান জুড়ে ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে 'ইরানি রেড ক্রিসেন্ট'।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকটের মধ্যে হুথি আন্দোলন নতুন করে লোহিত সাগরে হামলার হুমকি দিয়েছে। এক হুথি নেতা জানান, তারা সম্পূর্ণ সামরিকভাবে প্রস্তুত এবং ‘উপযুক্ত সময়ে’ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে আক্রমণ চালাতে পারে। ২০২৩-২৪ সালে গাজা যুদ্ধের সময় হুথিদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। বর্তমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা আবারও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। হুথিদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে ইয়েমেন উপকূলের বাব-আল-মান্দাব প্রণালী। এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা আরব উপদ্বীপকে আফ্রিকা থেকে পৃথক করেছে। প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। পারস্য উপসাগর থেকে সুয়েজ খাল বা সুমেড পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য এটি মূল পথ। বিশ্ববাণিজ্যের বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সংকীর্ণতম অংশে মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া হওয়ায় এটি সামরিক হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হুথি নেতা বলেছেন, “আমরা সব বিকল্প নিয়ে পুরোপুরি সামরিকভাবে প্রস্তুত আছি।” তবে চূড়ান্ত সময় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, হুথিরা ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের জন্য সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে তেহরান বাব-আল-মান্দাবে নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর তারা হামলা বন্ধ করে। ইয়েমেনের সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল-এর শীর্ষ নেতা বলেছেন, “যখন তারা দেখবে ইরানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই তারা নড়েচড়ে বসবে।” বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ থাকা অবস্থায় লোহিত সাগরের এই প্রণালীতে হামলা বিশ্ব অর্থনীতি ও তেল বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।