ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে চলমান যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলো জটিল অবস্থার মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সাহায্যের আহ্বান করা হলেও, ইউরোপীয় নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেবেন না। জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি এবং আমরা কূটনৈতিক সমাধান চাই।” ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে, কিন্তু কোনো পরিবর্তন করা হবে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও বলেছেন, “আমার নেতৃত্বের লক্ষ্য হলো ব্রিটিশ স্বার্থ অটল রাখা। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার জন্য আমরা ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছি, কিন্তু যুদ্ধে জড়ানো হবে না।” ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কিও একইভাবে জানিয়েছেন, তাদের দেশের নৌবাহিনী হরমুজে কোনো সামরিক অভিযান চালাবে না। ইতালির একটি যুদ্ধজাহাজ যদিও ফ্রান্সের বিমানবাহী রণতরির সঙ্গে উপস্থিত, তবে কার্যক্রম কেবল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সীমিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় নেতারা একটি দ্বিমুখী সংকটে রয়েছেন। যদি তারা কোনো পদক্ষেপ না নেন, তবে জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া হলে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে পারে। ইউরোপীয় নেতাদের ওপর আরেকটি চাপ ট্রাম্পের অভিযোগের মাধ্যমে এসেছে যে, ন্যাটোর দেশগুলো প্রতিরক্ষার জন্য যথাযথ ব্যয় করছে না। রোববার ট্রাম্প বলেন, “কোনো দেশ আমাদের এই ছোট প্রচেষ্টায় সাহায্য করবে না, সেটা দেখাটা বেশ মজার হবে।” বর্তমানে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পর তেহরানে ধ্বংসস্থলে উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুদ্ধজাহাজ ও বিমান বাহিনী হরমুজ প্রণালির বাইরে নিরাপত্তা বজায় রাখতে সীমাবদ্ধ।
প্রবাদ আছে, "কেউ যখন আপনাকে বারবার তার আসল রূপ দেখায়, তখন সেটিই বিশ্বাস করা উচিত।" গত ১৪ মাস ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ঠিক সেটিই করে দেখাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তাদের আদর্শকে লক্ষ্যবস্তু করা, ক্রমাগত সমালোচনা আর শুল্ক বা হুমকির মাধ্যমে পুরনো মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এখন হোয়াইট হাউসের নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। এতদিন ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের রোষ এড়াতে তোষামোদি বা আলোচনার মাধ্যমে তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু ইরানের যুদ্ধ কি তবে সেই সমীকরণে পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে? পরিবর্তনটি শুরু হয়েছে ধীরে ধীরে। প্রথমে স্পেন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং তাদের ভূখণ্ডে থাকা ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। ব্রিটেনও শুরুতে একই ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এসেছে বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি আর কড়া সমালোচনা। কিন্তু গত কয়েক দিনে চিত্রপট আরও বদলে গেছে। ফ্রান্স, পোল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস একে একে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এমনকি ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও এবার সুর পাল্টেছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের এই সামরিক অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইউক্রেন যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লড়ছে, তখন রাশিয়ার ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার মার্কিন সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় দেশগুলো হতবাক। গত চার বছর ধরে যারা পুতিনের আগ্রাসন ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তাদের কাছে এটি এক প্রকার বিশ্বাসঘাতকতা। ইউরোপ অনুভব করছে যে, তারা এক অনির্ভরযোগ্য এবং তিক্ত সম্পর্কের মধ্যে আটকা পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ হয়তো এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুরোপুরি বিচ্ছেদ চাইছে না, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে তারা এখন ওয়াশিংটনের পরিবর্তে নিজেদের ঐক্যের ওপরই বেশি ভরসা রাখতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের 'টাফ লাভ' বা কঠোর নীতি কি তবে শেষ পর্যন্ত ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিল? সেই উত্তর হয়তো সময়ের কাছেই তোলা আছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে আদর্শিক ও কৌশলগত বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে ইউরোপের এই রক্ষণশীল শক্তিগুলো এখন দুই ভাগে বিভক্ত। ইউরোপের কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ, যাদের 'আটলান্টিসিস্ট' (Atlanticists) বলা হয়, তারা সরাসরি এই যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের পপুলিস্ট দল 'রিফর্ম ইউকে'-র প্রতিষ্ঠাতা নাইজেল ফারাজ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এই "অপরিহার্য যুদ্ধে" আমেরিকাকে পূর্ণ সমর্থন দেন। স্পেনের কট্টর ডানপন্থী দল 'ভক্স' (Vox)-ও এই যুদ্ধের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে, জার্মানির 'অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি' (AfD)-র মতো দলগুলো এই যুদ্ধের বিষয়ে বেশ সতর্ক। দলটির সহ-সভাপতি টিনো শ্রুপাল্লা সতর্ক করে বলেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন "যুদ্ধের প্রেসিডেন্ট" হয়ে উঠছেন। তাদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নতুন করে শরণার্থী স্রোত ইউরোপের দিকে ধাবিত হতে পারে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। যুক্তরাজ্যের কট্টরপন্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ দেখা গেছে। কট্টর ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত টমি রবিনসন যুদ্ধের পক্ষে উল্লাস প্রকাশ করলেও, 'ব্রিটেন ফার্স্ট' দলের নেতা পল গোল্ডিং বলেছেন, "এটি আমাদের লড়াই নয়, আমাদের যুদ্ধ নয়। আমাদের উচিত আগে ব্রিটেনকে প্রাধান্য দেওয়া।" রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজনের মূলে রয়েছে জাতীয়তাবাদ। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টিম বেল জানান, কট্টর ডানপন্থীরা অভিবাসন ইস্যুতে একমত হলেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাদের জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন। কেউ আমেরিকাকে কৌশলগত মিত্র মনে করে, আবার কেউ মনে করে বিদেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর। সুইডিশ গবেষক মরগান ফিনসিও বলেন, এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও এই দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা গিয়েছিল। এখন ইরান ইস্যু সেই ফাটলকে আরও প্রশস্ত করছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ভিন্নতাই এই দলগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের প্রতি এই সমর্থন বা বিরোধিতা আগামী নির্বাচনগুলোতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রিটেনে নাইজেল ফারাজের যুদ্ধংদেহী মনোভাব তার কট্টর সমর্থকদের খুশি করলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিফর্ম ইউকে-র মাত্র ২৮ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন। সামগ্রিকভাবে, ইরানের ওপর এই হামলা ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী ঐক্যের সীমাবদ্ধতাকেই আবারও বিশ্বদরবারে উন্মোচিত করেছে।
ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, ইউরোপেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। সোমবার সকালে ইইউ রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, আমরা এখন একটি আঞ্চলিক সংঘাতের মুখোমুখি, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল তৈরি করছে। ইউরোপের নাগরিকেরা দুই পক্ষের লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভন ডার লিয়েন আরও বলেন, ইরানের জনগণের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে রাখার অধিকার রয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, এই যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও সতর্ক করেছিলেন, এই যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এর অর্থনৈতিক প্রভাব তত গভীর হবে। ইউরোপীয় নেতারা বর্তমানে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে ইউরোপের সাধারণ মানুষ। স্পেন, ইতালি, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোতে পরিচালিত সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলের সিংহভাগ নাগরিক এই সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে এবং তারা তাদের সরকারকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত শুক্রবার প্রকাশিত এসব জরিপের ফলাফল ইউরোপীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ জনমতের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। দেশভিত্তিক জরিপের চিত্র: স্পেন: মাদ্রিদ-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান '৪০ডিবি' (40dB)-এর জরিপ অনুযায়ী, স্পেনের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার বিপক্ষে। প্রায় ৫৭ শতাংশ নাগরিক তাদের সরকারের সামরিক সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। এছাড়া ৫৩ শতাংশ স্প্যানিশ মনে করেন, এই যুদ্ধের জন্য স্পেনের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। ইতালি: রোম-ভিত্তিক সংস্থা 'ইউট্রেন্ড'-এর জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ ইতালীয় এই সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ (প্রায় ৪৮ শতাংশ) চায় তাদের সরকার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখুক। তবে কট্টর ডানপন্থীদের মধ্যে হামলার পক্ষে কিছুটা সমর্থন লক্ষ্য করা গেছে। জার্মানি: জার্মানির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম 'এআরডি' (ARD)-এর জরিপে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেখানে ৫৮ শতাংশ মানুষ এই হামলাকে 'অযৌক্তিক' বলে মনে করেন। গত ২০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি জার্মানদের আস্থা সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া মাত্র ১৭ শতাংশ জার্মান ইসরায়েলকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে মনে করেন। ৭৫ শতাংশ মানুষ আশঙ্কা করছেন যে এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাজ্য: লন্ডনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান 'ইউগভ' (YouGov)-এর জরিপ বলছে, হামলার পরপরই যুক্তরাজ্যের ৪৯ শতাংশ মানুষ এর বিরোধিতা করেছেন, যেখানে সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ২৮ শতাংশ। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (RAF) ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়েও অর্ধেকের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন। প্রেক্ষাপট: উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনীয়সহ এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং তেহরান অঞ্চলজুড়ে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোপের সাধারণ মানুষের এই বিরোধিতামূলক অবস্থান ইইউভুক্ত দেশগুলোর সরকারগুলোর ওপর নীতি নির্ধারণী চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আটলান্টিক-পারস্পরিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও বর্তমানে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর করছেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলের ট্রাম্পপন্থী এবং রক্ষণশীল নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে (Munich Security Conference) অংশগ্রহণের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও জার্মানি থেকে স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরি সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি তার স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভাতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন। সফরের মূল উদ্দেশ্য: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই সফরের মাধ্যমে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা এবং ন্যাটোর (NATO) প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোর বর্তমান সরকারগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক আদর্শিক মিল থাকায়, এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু: ১. নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা: ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে মার্কিন সহযোগিতা বৃদ্ধি। ২. জ্বালানি নিরাপত্তা: রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে মার্কিন এলএনজি (LNG) এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের প্রসার। ৩. রাজনৈতিক সংহতি: ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সমর্থন জানানো নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মিত্রতা আরও জোরালো করা। বিশ্লেষকদের মতে, মার্ক রুবিওর এই সফর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মূল ধারার দেশগুলোর তুলনায় পূর্ব ইউরোপের রক্ষণশীল দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিশেষ সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্লোভাক সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা করবেন। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের সঙ্গে রুবিওর আসন্ন বৈঠকটি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। ওরবান দীর্ঘদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ফলে বুদাপেস্টের এই বৈঠকে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্ব ইউরোপে রুবিওর এটিই প্রথম বড় ধরনের কোনো সফর, যা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। সূত্র: রয়টার্স।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অনলাইন কন্টেন্ট সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়েছে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটক (TikTok)। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাপটির ডিজাইন এবং কার্যক্রম নিয়ে ইউরোপীয় কমিশন কড়া পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যার ফলে টিকটকের বর্তমান রূপে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। টিকটকের অ্যালগরিদম কি আসলেই আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর? জেনে নিন এই আইনি লড়াইয়ের মূল কারণগুলো: ১. অনলাইন কন্টেন্ট নিয়ম লঙ্ঘন: ইউরোপীয় ইউনিয়ন টিকটকের বিরুদ্ধে তাদের 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' (DSA) লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। মূলত ক্ষতিকর কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগে এই চার্জ গঠন করা হয়েছে। ২. 'অ্যাডিক্টিভ ডিজাইন' বা আসক্তি তৈরির নকশা: তদন্তে দেখা গেছে, টিকটকের অ্যালগরিদম এবং ডিজাইন এমনভাবে তৈরি যা ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করে। এর ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে ইইউ মনে করছে। ৩. অ্যাপে পরিবর্তন আনার নির্দেশ: অভিযোগ প্রমাণিত হলে টিকটককে তাদের ইন্টারফেস এবং অ্যালগরিদমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যবহারকারীদের আসক্তি কমাতে এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ফিচার যুক্ত করতে বাধ্য হতে পারে তারা। ৪. বিশাল অঙ্কের জরিমানা: যদি টিকটক ইইউ-এর এই নিয়মগুলো মেনে চলতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের বিশ্বব্যাপী বার্ষিক আয়ের ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। ৫. টিকটকের প্রতিক্রিয়া: টিকটক অবশ্য দাবি করেছে যে তারা শিশুদের সুরক্ষা এবং আসক্তি কমাতে নিয়মিত কাজ করছে। তবে ইইউ-এর এই কঠোর অবস্থানে কোম্পানিটি এখন চাপে রয়েছে। সারসংক্ষেপ: ইউরোপে টিকটকের ভবিষ্যৎ এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইউরোপীয় কমিশন যে কড়া বার্তা দিয়েছে, তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে টিকটকের ফিচারে বড় ধরনের বদল দেখা যেতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন(ইইউ) ওভারতের মধ্যে একটি বৃহৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানুষ একে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলে অভিহিত করছে জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এ চুক্তি দুই অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন(ইইউ) ওভারতের মধ্যে একটি বৃহৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানুষ একে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলে অভিহিত করছে জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এচুক্তি দুই অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে। ভারতের গোয়ায় গতকাল ইন্ডিয়া এনার্জি উইক ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে (এফটিএ)দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে সহযোগিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। ইইউওভারতের মধ্যে হতে যাওয়া এফটিএ চুক্তি অবশ্য তৈরি পোশাকভিত্তিক রফতানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইইউর সঙ্গে এফটিএর মাধ্যমে বাংলাদেশও যদি প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অবধারিতভাবে ইউরোপে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের বাজার হারানোর আশঙ্কা করছেন এখাতের রফতানিকারকরা। তবে ২০২৯ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া পর্যন্ত ইইউ ওভারতের মধ্যে হতে যাওয়া এফটিএ চুক্তির তেমন কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না বলেও জানিয়েছেন তারা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন,ভারত ওইইউর চুক্তির প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ এর গুরুত্বপূর্ণ বা সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে। ওই চুক্তির মাধ্যমে ভারত পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারে। সুতা-কাপড়ে ভারতের স্থানীয় শিল্পসক্ষমতা অনেক বড়ও শক্তিশালী।ফলে দেশটি থেকে আমদানিতে পণ্যের উৎপত্তিস্থল বা রুলস অব অরিজিন-সংক্রান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত ভারত সহজেই উতরাতে পারবে। অন্যদিকে, এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরে ইইউতে বাংলাদেশ কী পাবে সেটা এখনো ঠিক হয়নি। গ্র্যাজুয়েশনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা নাও পেতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর ইইউতে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।তবে জিএসপি প্লাস পেলেও বাংলাদেশ পোশাক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। কারণ ওই সুবিধা পেতে ইইউর রুলস অব অরিজিন শর্তের যে সীমা,তার চেয়ে অনেক বেশি পোশাকপণ্য ওই অঞ্চলে রফতানি করে বাংলাদেশ। এসীমার বিষয়টি যদি অনুকূলে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে চরমভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। আর জিএসপি প্লাস সুবিধার মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সমতাসূচক অবস্থান তৈরি হবে।সমান অবস্থান হলেও ভারতের যেহেতু স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প অনেক শক্তিশালী, কাজেই সেখানে অনেক বেশি প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হবে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের আরএপিআইডিচেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইইউ-ভারত এফটিএ আলোচনা সম্পন্নের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে এখন দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এনগেজ হতে হবে।নিশ্চিত করতে হবে এলডিসির পর ইইউতে যেন বাংলাদেশও ভালো একটা ডিল পায়। না হলে বাংলাদেশ মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। আমি মনে করি, ভারত-ইইউ চুক্তি আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য তেমন কিছু নেই, আর ইউরোপে পোশাক পণ্যই সবচেয়ে বেশি রফতানি করে বাংলাদেশ। কাজেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আমাদের পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা অনেক বাড়বে। ওচুক্তির ফলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে আরো বলেন,হ্যাঁ। বিশেষ করে এখন জিএসপি পাওয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে শর্ত আছে, সেগুলো যদি একই রকম থাকে, তাহলে অবশ্যই আমাদের ওপর বড় মাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।ফলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বসতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে যে ইইউতে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পাবে এবং একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। জিএসপি প্লাসের ক্ষেত্রে রুলস অব অরিজিনে বাংলাদেশকে দুই স্তরের (ডাবল স্টেজ) শর্ত প্রতিপালন করতে হবে,এ বিষয়টিই দরকষাকষির মাধ্যমে এক স্তরের সুবিধায় আনতে হবে।’ গতকাল প্রকাশিত এফটিএ আলোচনা সম্পন্নবিষয়ক ইইউর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়,ইউরোপীয় ইউনিয়নওভারত আজ একটি ঐতিহাসিক, উচ্চাভিলাষী এবং বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির(এফটিএ) আলোচনা সম্পন্ন করেছে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় এফটিএ। এ চুক্তি এমন এক সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয়ও চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরো গভীর করবে, যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাওবৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক উন্মুক্ততাও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যের প্রতি উভয় পক্ষের যৌথ অঙ্গীকারকে তুলে ধরছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ‘আজ ইইউও ভারত ইতিহাস সৃষ্টি করল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই গণতন্ত্রের অংশীদারত্ব আরো গভীর হলো। আমরা ২০০কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছি,যেখানে উভয় পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। আমরা বিশ্বকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি যে নিয়মভিত্তিক সহযোগিতা এখনো বড় সাফল্য এনে দিতে পারে।আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল শুরু,এ সাফল্যের ওপর ভর করে আমরা সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করব।’ বর্তমানে ইইউও ভারতের মধ্যে বছরে১৮০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি পণ্যওসেবার বাণিজ্য হয়, যা ইইউর প্রায় আট লাখ কর্মসংস্থানকে সমর্থন করে।এ চুক্তির ফলে ২০৩২সালের মধ্যে ভারতে ইইউর পণ্য রফতানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ভারতে ইইউর ৯৬ দশমিক৬ শতাংশ পণ্য রফতানির ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাতিল বা কমানো হবে। সামগ্রিকভাবেএ শুল্ক হ্রাসের ফলে ইউরোপীয় পণ্যের ক্ষেত্রে বছরে প্রায়৪ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়,ইইউও ভারতের মধ্যে এফটিএ আলোচনা প্রথম শুরু হয় ২০০৭ সালে।২০১৩ সালে আলোচনা স্থগিত হয় এবং ২০২২ সালে পুনরায় শুরু হয়। শেষ(১৪তম) আনুষ্ঠানিক আলোচনার রাউন্ড হয়২০২৫ সালের অক্টোবরে।একই সঙ্গে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই)ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। এফটিএ আলোচনা সম্পন্নের ঘোষণায় ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের।কারণ বাংলাদেশী পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় অঞ্চল ইইউ। অর্থমূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির ৮১ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। পণ্যটির মোট রফতানির৫০ শতাংশই হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয়। ফলে সুতাওকাপড় উৎপাদনে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় আরো বেড়ে গেছে। ভারত-ইইউ এফটিএর প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই।সরকারের প্রস্তুতি নেয়ার কথা কিন্তু নিচ্ছে না।বরং সরকার মনে করছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের কিছু হবে না। যেহেতু ভারত এফটিএ করছে, আরএমুহূর্তে আমরা যেহেতু পারছি না,উচিত ছিল ফেব্রুয়ারিতেই আবেদনের মাধ্যমে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রক্রিয়াটি অন্তত তিন বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়া।এতে করে আমরা অন্তত ছয় বছর সময় পেতে পারতাম ইইউর সঙ্গে এফটিএ করার জন্য। ভারত কমপক্ষে৯-১০ বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় এফটিএ আলোচনা সম্পন্ন করেছে। আমাদেরও অন্তত নয় বছর সময় লাগবে। এফটিএ কার্যকর হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের২৪ শতাংশের গ্যাপ তৈরি হবে। বাংলাদেশ শূন্য শুল্ক পরিশোধ করত। গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশকে১২ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। ভারত বর্তমানে ১২ শতাংশ দিলেও এফটিএ কার্যকর হওয়ায় কোনো শুল্ক দেবে না। এভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের২৪ শতাংশের গ্যাপ তৈরি হবে। ফলে প্রভাব কী ধরনের হবে তা সহজেই অনুমেয়। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কোনো সুযোগই বাংলাদেশের থাকবে না।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন,ইইউর সঙ্গে এফটিএ করার বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে।তাদের দিক থেকে সম্মতি পেলে আলোচনা শুরু হবে।বেশি দেরি হবে না।ভারতের সঙ্গে আলোচনায় ইইউর যে সময় লেগেছে সেটা স্বাভাবিক না। ভারত-ইইউ চুক্তি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে প্রভাব ফেলতে পারে কিনা,এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘আমরাএরকমটা মনে করছি না। আমরা ইইউতে জিএসপি প্লাস এবং এফটিএ—দুই ধরনের চেষ্টাই করছি। আশা করি দ্রুত আলোচনা সম্পন্ন করতে পারব। বাংলাদেশে ইইউর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনায় তাদের আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।’ ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,২০২৪ সালে বাংলাদেশ ওভারত থেকে ইইউর পোশাক আমদানির অর্থমূল্য ছিল যথাক্রমে ১ হাজার৮২৭ কোটিও৪১৮ কোটি ডলার। ২০২৫সালের১১ মাসে বাংলাদেশ ওভারত থেকে ইইউ পোশাক আমদানি করেছে যথাক্রমে১ হাজার ৮০৫ কোটি ও ৪২৪ কোটি ডলারের। দুই দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৫ও৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন দুই দেশের রফতানিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ওপর ভারত-ইইউর এফটিএর কোনো প্রভাব না পড়লেও অঞ্চলটির সঙ্গে এফটিএ করতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন,আপাতত কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ আমরা শূন্য শুল্কে রয়েছি।এটা অব্যাহত থাকবে ২০২৯সাল পর্যন্ত। ওই পর্যন্ত আমাদের কোনো সমস্যা নেই।এ সময়ের মধ্যে দ্রুতগতিতে আমাদের প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট এবং এফটিএ করতে হবে।এ সময়ের মধ্যে ইইউর সঙ্গে পিটিএওএফটিএ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় করে ফেলবে বলে আজই আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, ভারতের এফটিএ করতে ১৯বছর সময় লেগেছে, আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কনফিডেন্সের সঙ্গে বলা হয়েছে যে হাতে চার বছর সময় আছে,এসময়ের মধ্যে বাংলাদেশ চুক্তি করে ফেলবে।এ প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু করা উচিত ছিল। আপাতত আমরা ২০২৯ সাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারব।কিন্তু তারপর আমরা বাজার হারাব, যদি নাএসময়ের মধ্যে আমরা পিটিএ, এফটিএর মতো কিছু করতে না পারি। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বস্ত্র খাতে আগ্রাসী শিল্পনীতি সহায়তা যেমন কম দামে জমি, বিক্রয়ের ওপর আয়করের অব্যাহতি, দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে দেশটির মিলগুলো প্রায় ৪০সেন্টের সমপরিমাণ সহায়তা পেয়ে প্রতি কেজি সুতা রফতানিতে উৎপাদন খরচের চেয়ে ৪০-৫০ সেন্ট মূল্য কমিয়ে বাংলাদেশে রফতানি করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্থানীয় দেশীয় মিলগুলো প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রণোদনা প্রদত্ত মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলেএখাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে এবং তাদের বিনিয়োগ হুমকির মধ্যে পড়েছে।তৈরি পোশাকের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজেরএ ভঙ্গুরতা ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর-পরবর্তী বাংলাদেশের শঙ্কাকে আরো ঘনীভূত করবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আরএপিআইডি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে হলে বাংলাদেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প শক্তিশালী করার পাশাপাশিএর ব্যাপ্তি অনেক বাড়াতে হবে। অতি সম্প্রতি যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল স্টেজ সুবিধা বহাল রেখেছে। ফলে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এফটিএ হওয়ার পরও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটিতে সমতা থাকবে। প্রচেষ্টা চালিয়ে ইইউ থেকেও একই ধরণের সুবিধা আদায় করে প্রতিযোগীতায় সমতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও যথাযথ নীতি কার্যকর করতে হবে,যাতে করে মূল্য কমানোর অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এড়ানো যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশে ইইউ ডেলিগেশন সূত্রে জানা গেছে,গত সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছে ইইউ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের কার্যালয়।এ চিঠিতে বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্যও বিনিয়োগ সম্পর্ক-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে।চিহ্নিত নন-ট্যারিফ, নিয়ন্ত্রক, অন্যান্যসহ মোট ১৩টি চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ-ইইউর দীর্ঘমেয়াদিও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নয়নে চিহ্নিত ১৩টি চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথম পাঁচটি অশুল্ক বাধা-বিষয়ক। পরবর্তী আটটি নিয়ন্ত্রক বা নীতিগত ও অন্যান্য সমস্যা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। ইইউ-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিঠিতে উল্লেখ করা উদ্বেগগুলো বিবেচনায় নিলে ইইউ ধরে নেবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছে তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশ যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। ইইউর উত্থাপন করা বিষয়গুলোয় বাংলাদেশ যথাযথ গুরুত্ব দিলে তা এফটিএ সহায়ক হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের পথে অগ্রসর হলে এফটিএর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি সহজ হবে। প্রতিবেদক: শ্যামল সান্যাল
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে Department of Homeland Security (ডিএইচএস)। ডিএইচএসের এক মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, “Operation Catch of the Day” নামে এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটিতে অবস্থানরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযানটি পরিচালনায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংস বা গুরুতর অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। ডিএইচএস আরও জানায়, আইন মেনে বসবাসকারী বা অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। তবে মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ নিয়ে তারা স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেইনে এই অভিযান শুরুর মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও বিস্তৃত পরিসরে জোরদার হলো। এর প্রভাব স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও পড়তে পারে। সূত্র: ABC News
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নিয়মিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি মৌসুমি অতিথি শ্রমিক ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে বলা হয়, দেশীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে যেসব মার্কিন নিয়োগকর্তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, মূলত তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এই অতিরিক্ত ভিসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরে নির্ধারিত ৬৬ হাজার এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাতে যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে নির্মাণ শিল্প, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, ল্যান্ডস্কেপিং এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের মতো শ্রমনির্ভর মৌসুমি শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ স্থানীয় কর্মীর অভাবে বিদেশি শ্রমিক আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন নিয়োগকর্তারা। ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় শ্রমঘাটতি মোকাবিলায় এইচ-২বি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও রয়েছে। অভিবাসন কমানোর পক্ষে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক প্রবেশ করলে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে পেন্টাগন ও শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটন খাত সচল রাখতে এই মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের বিকল্প নেই। ফেডারেল রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত এইচ-২বি ভিসা কার্যকরের বিশেষ বিধিমালা আগামী মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এরপরই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস