- প্রচ্ছদ
- Topic
ইউরোপ
যুক্তরাষ্ট্রের ধনী নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও তাদের আয়ু ইউরোপের কিছু দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম হতে পারে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা, বেশি সম্পদ মানেই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন, এই গবেষণার ফলাফলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ৭৩ হাজারের বেশি বয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ১০ বছর ধরে তাদের বেঁচে থাকার হার ও মৃত্যুর তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, একই অর্থনৈতিক স্তরের মানুষের তুলনা করলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মৃত্যুঝুঁকি ইউরোপের অনেক দেশের মানুষের তুলনায় বেশি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ২৫ শতাংশ মানুষের বেঁচে থাকার হার উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২৫ শতাংশ মানুষের কাছাকাছি। গবেষণায় জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের মানুষের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্পদ স্তরের মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তুলনা করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সাধারণত ভালো স্বাস্থ্যের সম্পর্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে সেই সুবিধা অনেকাংশে সীমিত হয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পার্থক্যের পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রোগের তুলনামূলক বেশি হার, স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ খরচ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং দৈনন্দিন জীবনের বাড়তি চাপ। গবেষকদের মতে, ইউরোপের অনেক দেশে শক্তিশালী সরকারি অবকাঠামো, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো থাকায় মানুষের আয় ও আয়ুর পার্থক্য তুলনামূলক কম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভূমিকা বেশি হওয়ায় ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য স্বাস্থ্য ফলাফলেও প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের আয়ু বাড়াতে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর সামাজিক ও নীতিগত পরিবর্তন, যাতে স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার সুযোগ আরও কার্যকরভাবে সবার কাছে পৌঁছানো যায়। গবেষকদের মতে, সম্পদ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে, তবে দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইউরোপজুড়ে মুসলিম জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ জনমিতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী ইউরোপে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ মুসলিম বসবাস করছেন, যা মহাদেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। জনসংখ্যাগত এই পরিবর্তনের ফলে মুসলিমরা ইউরোপের অন্যতম বড় ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় বলা হয়েছে, গত এক দশকে ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। গবেষকদের মতে, অভিবাসন, তুলনামূলকভাবে কম বয়সী জনগোষ্ঠী এবং স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধিই এ প্রবণতার প্রধান কারণ। একই সময়ে ইউরোপে ধর্মীয় পরিচয়হীন মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমেছে। দেশভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সে ইউরোপের সর্বাধিক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। দেশটিতে প্রায় ৬০ লাখ মুসলিম রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অভিবাসী পরিবার বা তাদের উত্তরসূরি। জার্মানিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ তুর্কি বংশোদ্ভূত। কয়েক দশক ধরে দেশটির শিল্প, উৎপাদন ও শ্রমবাজারে এই জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে প্রায় সাড়ে ৪০ লাখ মুসলিম বসবাস করেন। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত, বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজনীতি ও সরকারি বিভিন্ন খাতে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন অব্যাহত থাকলে এবং বর্তমান জনমিতিক প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী বছরগুলোতেও মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে পারে। তবে ভবিষ্যতে এই বৃদ্ধির হার অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ওপরও নির্ভর করবে।
রেকর্ড তাপমাত্রা ও দীর্ঘ খরার কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ দাবানলে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা ইউরোপ। গ্রীষ্মের এই চরম বৈরী আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে গ্রিস, ফ্রান্স, স্পেন ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলো। এর মধ্যে গ্রিসে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় দুটি অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টারের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালক নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের উত্তর-পশ্চিমে এবং আতিকা অঞ্চলের পসাথা এলাকায় আগুন নেভানোর সময় আকাশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় একটি হেলিকপ্টারে থাকা গ্রিক ও ডেনিশ নাগরিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তবে অন্য হেলিকপ্টারে থাকা একজন গ্রিক ও একজন ব্রিটিশ নাগরিক অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন। ঠিক কী কারণে আকাশে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল, তা উদঘাটনে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এদিকে, বোয়োটিয়া অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া আগুন বাতাসের তীব্রতায় দ্রুত আতিকা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টি করেছে। ভয়াবহ এই দাবানলে ইতোমধ্যে ওই এলাকার প্রায় ১০০টিরও বেশি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, একটি পবন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মূল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের বেসরকারি লাইনে সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গ থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত। কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে এ ঘটনায় দুই গ্রিক নাগরিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দাবানল পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় মেগারা শহরের দিকে আগুন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস থাকা এই শহর এবং এর আশপাশের এলাকায় চরম সতর্কতা জারি করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ কেফালোনিয়াতেও নতুন করে দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় সেখানকার বেশ কয়েকটি এলাকাও ইতোমধ্যে খালি করে দেওয়া হয়েছে।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নেপলসের উপকণ্ঠে ৪ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪৬ মিনিটে (১৭:৪৬ জিএমটি) এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে নেপলস ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, সাময়িকভাবে ট্রেন ও মেট্রো চলাচল বন্ধ রাখা হয় এবং কয়েকটি ভবনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি। এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জিওফিজিক্স অ্যান্ড ভলক্যানোলজি (আইএনজিভি) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নেপলসের পশ্চিমে অবস্থিত কাম্পি ফ্লেগ্রেই আগ্নেয়গিরি অঞ্চল। ভূগর্ভের মাত্র ৩ কিলোমিটার গভীরে এর কেন্দ্রস্থল হওয়ায় কম্পনটি বেশ তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ইতালীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতেও বাসিন্দাদের আতঙ্কিত অবস্থায় বাইরে জড়ো হতে দেখা গেছে। ইতালির ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, কয়েকটি ভবনে ফাটল ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া কাউকে উদ্ধারের জন্য জরুরি সহায়তার আবেদন আসেনি। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন এবং ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভূমিকম্পের পর নিরাপত্তার স্বার্থে নেপলসের কিছু রেলপথ ও মেট্রো পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বিঘ্নিত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে সেবা চালু করার উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। কাম্পি ফ্লেগ্রেই ইউরোপের সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি অঞ্চলগুলোর একটি এবং এটি একটি সুপারভলকানো হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক বছরে সেখানে ভূকম্পন ও ভূত্বকের অস্বাভাবিক নড়াচড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে ইতালির ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলে ছোট মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই ঘটে। তবে এবারের মতো শক্তিশালী কম্পন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকের ভূমিকম্পের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময়ের ধারাবাহিক ভূকম্পনের কারণে হাজার হাজার মানুষকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিল। ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে ইতালির অতীতেও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৬ সালে মধ্য ইতালিতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এরও আগে ১৯৮০ সালে দক্ষিণাঞ্চলের এরপিনিয়া অঞ্চলে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত হন এবং শত শত শহর ও গ্রাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় সামরিক বিমানটিকে এবার ফ্রান্সের ভয়াবহ দাবানল নেভানোর কাজে নামানো হয়েছে। এয়ারবাসের তৈরি 'এ৪০০এম অ্যাটলাস' (A400M Atlas) নামের এই বিমানটি সাধারণত সেনা ও সামরিক যান বহনে ব্যবহৃত হলেও, প্রকৌশলীদের জরুরি পরিবর্তনের পর এটি এখন ২২ টন ধারণক্ষমতার বিশালাকার 'ওয়াটার বোমারু' হিসেবে কাজ করছে। কার্গো হোল্ডে বসানো এই বিশেষ পানির ট্যাংক ব্যবহার করে বিমানটি মাটি থেকে মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে উন্মুক্ত র্যাম্পে বসানো পাইপের মাধ্যমে পানি বা রাসায়নিক ফায়ার রিটার্ডেন্ট (অগ্নিনির্বাপক পদার্থ) ফেলতে সক্ষম। ২০২২ সাল থেকে এই অগ্নিনির্বাপণ প্রযুক্তির উন্নয়ন কাজ চলছিল। তবে ফ্রান্সে দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করায় ফরাসি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে গত সপ্তাহে এর চূড়ান্ত পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। কাজ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রথম এয়ারবাস বিমানটি বোর্দোর কাছাকাছি অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এই দাবানলকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের 'সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যার কারণে দেশটিতে ইতোমধ্যে তিন লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী গিয়ম ফোরি জানিয়েছেন, অগ্নিনির্বাপণের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা না হলেও, সামরিক বাহিনীতে সহজলভ্য হওয়ায় এই বিমানগুলোকে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কাজে লাগানো হচ্ছে। সচরাচর ব্যবহৃত হলুদ রঙের ক্যানাডায়ার (Canadair) ওয়াটার বোমারুর চেয়ে এটি তিনগুণ বেশি তরল বহন করতে পারে। মাত্র এক আঘাতেই এটি ৪,৪০০ গ্যালন তরল ফেলতে পারে, যা ১,৩০০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ এলাকা ভিজিয়ে দিতে সক্ষম। ক্যানাডায়ারের মতো এটি হ্রদ বা সমুদ্র থেকে সরাসরি পানি তুলতে না পারলেও, মাটি থেকে ফায়ার রিটার্ডেন্ট লোড করার ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি কার্যকর। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজে লাগিয়ে কার্গো বিমানের পেছনের র্যাম্প দিয়ে সহজেই এই পানির ট্যাংক প্রবেশ করানো যায় এবং মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই একটি সাধারণ সামরিক বিমানকে অগ্নিনির্বাপক বিমানে রূপান্তর করা সম্ভব। ঘণ্টায় ৫৫০ মাইল বেগে উড়তে সক্ষম এই বিমানটি সাধারণ ক্যানাডায়ার বিমানের চেয়ে অনেক দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি হওয়ায় দুর্গম বা অস্থায়ী রানওয়েতেও এটি সহজেই ওঠানামা করতে পারে। এয়ারবাস জানিয়েছে, দাবানলের কারণে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে কীভাবে বিমান নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সে বিষয়ে তারা আরও পাইলটকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। চলতি বছরেই এই ফায়ারফাইটিং কিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে স্পেনও তাদের সামরিক বহরে থাকা এ৪০০এম বিমানগুলোকে একইভাবে রূপান্তর করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে। নতুন নিয়মে সীমান্তে পৌঁছানো অভিবাসীদের দ্রুত নিবন্ধন, নিরাপত্তা যাচাই, আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি এবং আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। নতুন কাঠামোর আওতায় ইইউর সব সদস্য রাষ্ট্রে একই ধরনের আশ্রয় প্রক্রিয়া চালু হবে। সীমান্তে আগত ব্যক্তিদের পরিচয়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা যাচাই সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদনের অনুমোদনের হার কম, তাদের আবেদন সীমান্তেই দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে এবং প্রয়োজন হলে তাদের নিজ দেশ বা নিরাপদ তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া অভিবাসনের চাপ বেশি থাকা দেশগুলোর বোঝা ভাগাভাগি করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন সংহতি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো দেশ আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ না করলে আর্থিক বা অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকবে। ইউরোপীয় কমিশনের দাবি, নতুন নিয়ম সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে, আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের ফেরত পাঠানোর হার বাড়বে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এসব বিধান বাস্তবায়িত হলে সীমান্তে আটক, দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পাঁচটি দেশ প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশসহ যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হবে, তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে সাময়িকভাবে ইউরোপের বাইরে কোনো দেশে রাখা হতে পারে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস যৌথভাবে এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন রিটার্ন রেগুলেশনকে ভিত্তি করে পরিকল্পনাটি তৈরি করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সদস্যদেশগুলো ইইউর বাইরে রিটার্ন হাব স্থাপন করতে পারবে। সম্ভাব্য স্বাগতিক দেশ হিসেবে কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এই উদ্যোগে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে গ্রিস। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকে রিটার্ন হাব চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের এসব রিটার্ন হাবে রাখা হতে পারে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে ইউরোপের এই উদ্যোগ সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও প্রস্তাবটি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থা শুধু বাংলাদেশিদের জন্য নয়; বরং যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলোর লক্ষ্য হলো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করা। বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের বিষয়ে এক কর্মকর্তা জানান, ইউরোপে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ। নতুন রেগুলেশন কার্যকর হলে নতুন আশ্রয় আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে এবং বাতিল হওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমানে যেসব অভিবাসীর বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত হয়, তাদের বড় একটি অংশকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না। ফলে অনেক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে অবস্থান করেন, যা অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তবে রিটার্ন হাব পরিকল্পনা নিয়ে মানবাধিকার মহলে উদ্বেগ রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনারসহ বিভিন্ন অধিকার সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, ইইউর বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, আপিলের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। এই নীতির অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তার নির্যাতন বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে অন্যতম বড় উৎস দেশগুলোর একটি। ২০২৫ সালে ইইউতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রায় ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন। নতুন রিটার্ন হাব ব্যবস্থা কার্যকর হলে ইউরোপে থাকা প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি এবং এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ইউরোপীয় আইন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির ওপর।
অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ কমাতে স্পেনের জনপ্রিয় শহর বার্সেলোনা নতুন করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পথে হাঁটছে। শহর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা, আবাসন ব্যবস্থা এবং নগর পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফক্স লস অ্যাঞ্জেলেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ পর্যটন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রুজ জাহাজে আসা পর্যটকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পর্যটন কর বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পর্যটনপ্রবণ এলাকায় চাপ কমানোর উদ্যোগ। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য বার্সেলোনায় প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ভিড় করেন। শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমুদ্রসৈকত, খাবার ও সংস্কৃতির আকর্ষণে পর্যটকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, রাস্তায় ভিড়, শব্দদূষণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ক্রুজ পর্যটন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অল্প সময়ের জন্য হাজার হাজার পর্যটক শহরে প্রবেশ করলেও তারা একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলোতে ভিড় তৈরি করেন। ফলে অবকাঠামো ও স্থানীয় পরিষেবার ওপর চাপ পড়ে। বার্সেলোনা এর আগেও পর্যটন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। শহরটি স্বল্পমেয়াদি ভাড়া বাসার সংখ্যা সীমিত করা, পর্যটন কর ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং কিছু এলাকায় পর্যটকের চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
ইউরোপের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলো যখন অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন স্পেনের বার্সেলোনা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে, "আর একজন পর্যটকও নয়।" সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণ-পর্যটনের (ম্যাস ট্যুরিজম) অন্যতম কড়া সমালোচক হয়ে উঠেছে শহরটি। বার্সেলোনার টেকসই পর্যটন বিষয়ক কমিশনার হোসে আন্তোনিও দোনাইরে মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এড়ানোর এই উদ্যোগে আরও জোর দিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, শহরটি আর পর্যটকের সংখ্যা বাড়াতে চায় না। ২০২৫ সালে শহরটিতে ১৫.৭ মিলিয়ন পর্যটক এসেছিলেন, যা তাদের ধারণক্ষমতার একেবারে দ্বারপ্রান্তে। দোনাইরে জানান, বার্সেলোনার জন্য সর্বোচ্চ ১৬ মিলিয়ন পর্যটকই যথেষ্ট, এর বেশি আর তারা গ্রহণ করবেন না। পর্যটকদের ঢল সামলাতে শহরটি বেশ কিছু কঠোর আর্থিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্রুজ বা প্রমোদতরীর যেসব যাত্রী ১২ ঘণ্টার কম সময় বার্সেলোনায় অবস্থান করবেন, তাদের প্রায় ৩০ ইউরো (৩৫ ডলার) সমন্বিত কর দিতে হতে পারে। ১৫ জুলাইয়ের এক মিটিংয়ের পর বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ ১২ ঘণ্টার কম থাকা ক্রুজ যাত্রীদের ওপর সর্বোচ্চ ২৪ ইউরো মিউনিসিপ্যাল কর আরোপের প্রস্তাব করেছে, যা আগের পরিকল্পিত ৮ ইউরোর চেয়ে তিনগুণ বেশি। এর পাশাপাশি, বার্সেলোনার মেয়র জাউমে কলবোনি ক্রুজ যাত্রীদের ওপর বর্তমানের ৪ ইউরো কর শতভাগ বাড়িয়ে রাতপ্রতি ৮ ইউরো করার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া, গত ১ এপ্রিল থেকে বার্সেলোনা তাদের হোটেল ট্যাক্স প্রায় দ্বিগুণ করেছে, যা জনপ্রতি প্রতি রাতে ৫-৯ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০-১৭ ডলার করা হয়েছে। পর্যটকদের এই বিশাল উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আবাসন খরচ বৃদ্ধি, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড় এবং ঐতিহাসিক এলাকাগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় শহরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। গত গ্রীষ্মে বার্সেলোনার নাগরিকরা বড় ধরনের বিক্ষোভ করেন, যেখানে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেকে পর্যটকদের গায়ে খেলনা বন্দুক (ওয়াটার গান) দিয়ে পানি ছিটিয়ে প্রতিবাদ জানান; ঠিক যেমনটা ২০২৪ সালেও ঘটেছিল। "একজন পর্যটক বাড়া মানে একজন বাসিন্দা কমা" এবং "পর্যটকরা বাড়ি ফিরে যাও"—এমন সব প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীরা তাদের স্থানীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনের দাবি জানান। আন্দ্রেউ মার্তিনেজ নামের এক বাসিন্দা জানান, তার এলাকার অ্যাপার্টমেন্টগুলো এখন প্রতিনিয়ত স্বল্পমেয়াদী ছুটির জন্য ভাড়া দেওয়ায় তার বাড়িভাড়া ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে। তার মতে, বার্সেলোনাকে পর্যটকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং এখন সময় এসেছে শহরটিকে তার বাসিন্দাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার। তবে কমিশনার দোনাইরে দাবি করেছেন, নতুন এসব নিয়মকানুন মোটেও পর্যটক-বিরোধী নয়; বরং এটি আরও মানসম্মত ও বৈচিত্র্যময় পর্যটক গোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার কৌশল। তারা মূলত এমন দর্শনার্থীদের চাইছেন যারা ব্যবসা বা সাংস্কৃতিক আকর্ষণের টানে সেখানে যাবেন। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় বাসিন্দারা যেন তাদের নিজেদের এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেমন—রুটি বা বই সহজে কিনতে পারেন। শহরটির পুরো জায়গা যেন শুধু স্যুভেনির, ফোন কেস বা কাবাবের দোকানে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আড়াই লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা ঘরের ভেতরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, দমকল বাহিনী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বড় ধরনের অভিযান চলছে। পরিস্থিতিকে উভয় দেশই সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ ও লঁদ অঞ্চলে দাবানল সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বোর্দোর উপকণ্ঠ পর্যন্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাপকভাবে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জিরন্দ অঞ্চল থেকেই প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ফ্রান্সে প্রায় দুই লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় দেড় হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে ফরাসি সরকার। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে প্রবল বাতাস, শুষ্ক আবহাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত জটিল বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। অন্যদিকে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক দাবানল একত্রিত হয়ে বড় আকার ধারণ করায় দেশটির সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে দাবানল-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। শনিবার মাদ্রিদের কাছে সেনিসিয়েন্তোস এলাকার অগ্নিনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনো কঠিন লড়াই বাকি রয়েছে। মাদ্রিদ অঞ্চলের জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দাবানল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি নিয়ন্ত্রণে দমকল বাহিনীকে নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ থেকেও অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও সহায়তা পাঠানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে চলমান ধারাবাহিক তাপপ্রবাহ, দীর্ঘদিনের খরা এবং প্রবল বাতাস দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।
ইউরোপের অন্যতম ঐতিহাসিক দেশ স্পেনে বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ইসলাম। সাম্প্রতিক এক জনমিতিক (ডেমোগ্রাফিক) সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে বসবাসরত মুসলিম জনসংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ২৫ লাখের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। স্পেনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনকে একটি বড় রূপান্তর হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের এই ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক (অনূর্ধ্ব ৫০ শতাংশ) অংশই এখন দেশটির স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ স্পেনে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বাকিরা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘস্থায়ী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট প্রমাণ করে যে মুসলিম সম্প্রদায় এখন আর কেবল অস্থায়ী অভিবাসী বা বহিরাগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা স্পেনের মূলধারার সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে স্থায়ীভাবে মিশে গেছে। বর্তমানে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল কাতালোনিয়া, আন্দালুসিয়া এবং রাজধানী মাদ্রিদে মুসলিমদের বসতি ও ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে এই সম্প্রদায় দেশটির দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জনসংখ্যাগত এই রূপান্তর, সুনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন নীতি এবং নতুন প্রজন্মের দ্রুত বিকাশের ফলে স্পেনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই শক্তিশালী উপস্থিতি আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে।
ইউরোপের দেশগুলোতে জুনের শেষভাগে আঘাত হানা রেকর্ডভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে ১০ হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমর্থিত নেটওয়ার্ক ‘ইউরোমমো’র প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই তীব্র গরমে মৃতদের মধ্যে প্রায় ৯ হাজারেরই বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের শরীরে হিটস্ট্রোকের কারণ হতে পারে। এর পাশাপাশি এটি হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা শারীরিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে, যার ফলে বয়স্ক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। ডেনমার্কের স্টেটেনস সিরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান চিকিৎসক লাসে ভেস্টারগার্ড জানান, বছরের এই সময়ে এমন অতিরিক্ত মৃত্যু অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক। তীব্র তাপপ্রবাহ ছাড়া মৃত্যুর এই অস্বাভাবিক হারের অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই জুনের শেষের দিকে এই রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে গরম যখন চরম আকার ধারণ করেছিল, সেই সাত দিনের তথ্যের ভিত্তিতেই এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। অথচ এর আগের আট সপ্তাহে এই দেশগুলোর সম্মিলিত মৃত্যুহার স্বাভাবিকের চেয়েও কম ছিল। ইউরোমমো আলাদাভাবে প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ না করলেও জানিয়েছে যে, জুনের শেষ সপ্তাহে ইউরোপের মধ্যে কেবল ফ্রান্স ও বেলজিয়ামেই সবচেয়ে বেশি ‘অত্যধিক মৃত্যুহার’ রেকর্ড করা হয়েছে। বেলজিয়ামের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে দেশটিতে কোনো তাপপ্রবাহে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, শুধুমাত্র মে ও জুন মাসের তাপপ্রবাহেই ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং ইউকে মেট অফিসের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মৃত্যুর ৪২ শতাংশেরই প্রধান কারণ ছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আবহাওয়া ও তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়া।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে ইতালিতে স্বপ্নের ছুটি কাটাতে গিয়ে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হয়েছেন ৩৬ বছর বয়সি স্টেফানি নামের এক নারী। গত অক্টোবরে বন্ধুদের সঙ্গে ইউরোপ ভ্রমণে যান পেশায় করপোরেট এক্সিকিউটিভ এই পর্যটক। বন্ধুরা দেশে ফিরে গেলেও ইতালির 'এক ইউরোতে বাড়ি' বিক্রির প্রকল্প এবং সিসিলির মার্সালার কাছে লো স্তাগনোন শহরে কাইটবোর্ডিংয়ের আকর্ষণে সেখানে থেকে যান তিনি। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই তাকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেয়, যখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভিন্ন দুই ব্যক্তির হাতে দুবার অপহরণের শিকার হন তিনি। স্থানীয় একদল কাইটবোর্ডারদের সঙ্গে একটি আড্ডায় যোগ দিয়েছিলেন স্টেফানি, যা প্রাথমিকভাবে বেশ স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। আড্ডা শেষে অন্য একটি বারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এক বিদেশি প্রবাসীর গাড়িতে ওঠেন তিনি। কিন্তু গাড়িতে ওঠার পরপরই চালক তীব্র গতিতে গাড়ি চালাতে শুরু করেন। স্টেফানি জানান, চালক সরু সিসিলিয়ান রাস্তায় ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি ভয় পেয়ে চালককে থামাতে অনুনয়-বিনয় ও চিৎকার করলেও চালক গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দেন। এমনকি গাড়ির সামনের সিটে বসা ওই চালকের বন্ধুও পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে হতবাক হয়ে যান। উপায় না দেখে স্টেফানি চুপচাপ নিজের কাইটবোর্ড প্রশিক্ষককে নিজের লোকেশন পাঠিয়ে দেন। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর গাড়িটি একটি দেয়ালঘেরা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে। চালকের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এবং সামনের সিটে বসা বন্ধুটির কোনো প্রতিবাদ না দেখে স্টেফানি নিজেই বাঁচার পথ খুঁজতে থাকেন। গাড়ির দরজা আনলক করা আছে বুঝতে পেরেই তিনি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন। কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে থাকেন তিনি। কয়েক কিলোমিটার হাঁটার পর একটি শান্ত শহরে পৌঁছান স্টেফানি। সেখানে সতর্কবাতি জ্বালানো একটি গাড়িতে এক নিরাপত্তাকর্মীকে দেখতে পেয়ে ফোনের ট্রান্সলেশন অ্যাপ ব্যবহার করে তাকে সব ঘটনা খুলে বলেন। ওই নিরাপত্তাকর্মী তাকে হোটেলে পৌঁছে দিতে রাজি হন এবং নিজের বসকেও বিষয়টি ফোনে জানান। স্টেফানি ভেবেছিলেন তিনি এবার নিরাপদ। কিন্তু মাঝপথে ওই রক্ষী একটি গলিতে গাড়ি থামিয়ে ট্রান্সলেশন অ্যাপে লিখে স্টেফানিকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমাকে যে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি, এর বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দেবে?' বিপদের আভাস পেয়ে আবারও গাড়ির দরজা খুলে সোজা একটি আঙুরবাগানে দৌড়ে পালিয়ে যান স্টেফানি। এরপর আর কোনো পথচারীর ওপর ভরসা না করে তিনি নিজেই হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। পথে দূর থেকে কোনো গাড়ির হেডলাইট দেখলেই তিনি লুকিয়ে পড়তেন। এমনকি নিজের গতিপথের প্রমাণ রাখতে রাস্তার ধারের ভেন্ডিং মেশিন থেকে পানীয়ও কেনেন তিনি। অবশেষে নিরাপদে হোটেলে ফিরে পরদিন সারা দিন কেঁদে কাটান তিনি। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে অন্যান্য পর্যটকদের সতর্ক করলেও স্টেফানি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রথম অপহরণকারী ইতালীয় ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ইউরোপীয় প্রবাসী।
চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকে গত জুন মাসের শেষ পর্যন্ত জার্মানিতে তীব্র দাবদাহ বা হিট ওয়েভে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৫ হাজার ১২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বার্লিনভিত্তিক দেশটির শীর্ষ জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট (আরকেআই) বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের জুনের এই মৃত্যুর সংখ্যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জার্মানিতে প্রতি বছর গরমে গড়ে ২ হাজার ৯০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এবার মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই সেই গড় সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির ফেডারেল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিস এবং জার্মান আবহাওয়া দপ্তরের (ডিডব্লিউডি) মৃত্যু ও আবহাওয়ার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে আরকেআই। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গত ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যবর্তী সপ্তাহে জার্মানির ওপর দিয়ে সবচেয়ে তীব্র দাবদাহ বয়ে যায় এবং ঠিক এই এক সপ্তাহেই রেকর্ড ৪ হাজার ৩১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। ওই সময়ে দেশের কিছু কিছু অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর আগে এপ্রিল থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ৮১০ জনের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গিয়েছিল, যার প্রায় সবই জুনের ১৫ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে ঘটে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই তীব্র গরমে বয়স্ক মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছেন। গত ২৮ জুন পর্যন্ত মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৫০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছর বা তার বেশি। এছাড়া ৭৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১ হাজার ৩২০ জন, ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৫০ জন এবং ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জার্মান আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আবহাওয়া রেকর্ড বা ইতিহাস পর্যালোচনায় ২০২৬ সালের জুন মাসটি ছিল দেশটির ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ জুন মাস। এর আগে কেবল ২০১৯ সালে এর চেয়ে বেশি গরম পড়েছিল। জুনের শেষের দিকে এই তাপদাহের কারণে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল এবং গত ২৭ জুন দেশের ৪৬টি আবহাওয়া স্টেশনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি রেকর্ড করা হয়েছিল।
জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপের প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বতন্ত্র ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব (Islamic Theology) অনুষদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর লক্ষ্যে বর্তমানে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এ ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের অনুষদগুলোকে একই ক্যাম্পাসে একত্রিত করা হবে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে (DW)-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরে ২০২১ সাল থেকে ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এর নির্মাণকাজ চলছে। নতুন এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা, গবেষণা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করা। নবগঠিত ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মোহানাদ খোরশিদে বলেন, এই উদ্যোগের অংশ হতে পারা তার জন্য অত্যন্ত গর্বের। মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই অনুষদের প্রতিষ্ঠা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার মতে, নতুন অনুষদে ইসলামের উদার, গবেষণাভিত্তিক এবং মুক্তচিন্তার ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। খোরশিদে এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন অনুষদ প্রতিষ্ঠার ফলে ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব বিভাগ এখন নিজস্বভাবে পিএইচডি এবং অন্যান্য উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান ও বিভিন্ন তহবিল পাওয়ার সুযোগও আরও বাড়বে। ২০১২ সালে মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী এবং তিনজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি। বর্তমানে সেখানে আটজন অধ্যাপক এবং ৫০ জনের বেশি শিক্ষক-কর্মকর্তা কাজ করছেন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জার্মানির সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা সম্প্রসারণের ফলে দক্ষ শিক্ষকের চাহিদাও দ্রুত বেড়েছে। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া-তে প্রায় তিন হাজার ইসলাম ধর্মের শিক্ষকের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৩০ জন। ফলে নতুন অনুষদটি শিক্ষক সংকট দূর করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খোরশিদে জানান, ২০২৭ সাল থেকে ‘ইসলাম অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়ার্ক’ নামে একটি নতুন স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই কোর্সের মাধ্যমে যুব উন্নয়ন, হাসপাতালভিত্তিক ধর্মীয় পরামর্শ, প্রবীণদের সেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা হবে। নতুন অনুষদের নীতিমালায় ইসলাম ও গণতন্ত্রের সহাবস্থান, কোরআনের সমসাময়িক ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং আন্তধর্মীয় সংলাপকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চরমপন্থা, ইসলামবাদ এবং ইহুদিবিদ্বেষের বিরোধিতার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খোরশিদে বলেন, অনুষদ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রকাশের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এ উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তার মতে, বিশ্বের অনেক মানুষ ইসলামের উদার ও গবেষণানির্ভর ব্যাখ্যার প্রতি আগ্রহী। দীর্ঘমেয়াদে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ বৈশ্বিক ইসলামিক গবেষণা ও চিন্তাচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রবার্স বলেন, একই ক্যাম্পাসে খ্রিস্টান ও ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের অনুষদ প্রতিষ্ঠা আন্তধর্মীয় বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অন্যদিকে জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেত্তে শাভান এই উদ্যোগকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ইউরোপে একাডেমিক ধর্মতত্ত্ব চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ইউরোপজুড়ে জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে মোট ৩ হাজার ৭০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তিন দেশের সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত টানা আট দিন ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে। ইউরোপের স্বাভাবিক জলবায়ুর তুলনায় এই তাপমাত্রা ছিল অনেক বেশি, যা মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপপ্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ। জলবায়ু ও আবহাওয়া বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন চরম তাপমাত্রা দেখা দিয়েছে। মৃতদের বিষয়ে জানা গেছে, অধিকাংশই আগে থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, তাপপ্রবাহ না হলে তাদের অনেকেই হয়তো আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতেন। তিন দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে ফ্রান্স-এ। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট এক টেলিভিশন ভাষণে জানিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে ফ্রান্সে ২ হাজার ২৫ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, “সরকারি হিসাবে যে সংখ্যা পাওয়া গেছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।” অন্যদিকে বেলজিয়াম-এর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত ১১ দিনে দেশটিতে ১ হাজার ২০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৫৩০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছরের বেশি। এছাড়া ১৮০ জনের বয়স ৬৫ বছরের কম এবং বাকিরা ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। এক বিবৃতিতে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, “এই মাত্রার অতিরিক্ত মৃত্যু আমাদের জন্য অভূতপূর্ব। অতীতে কোনো গ্রীষ্মে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।” নেদারল্যান্ডস-এও একই চিত্র দেখা গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আট দিনের তাপপ্রবাহে সেখানে ৪৮০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বেশিরভাগের বয়স ছিল ৮০ বছরের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এমন পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন ও তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে।
তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইউরোপের জনজীবন। স্মরণকালের ভয়াবহ এই গরমে ফ্রান্সে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। লাশের সারি দীর্ঘ হতে থাকায় দেশটির হিমাগারগুলোতেও আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। অতিরিক্ত মৃত্যুর এই চাপ সামলাতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খাচ্ছেন শেষকৃত্য সম্পন্নকারী সেবাদাতারা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা নিহতের পরিবার, বৃদ্ধাশ্রম ও পুলিশের অসংখ্য অনুরোধ ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য দেশের চিত্রও বেশ নাজুক। জার্মানিতে তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। দেশটির অধিকাংশ আবাসিক ভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় ঘরের ভেতরেই চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রাজধানী বার্লিনের বাসিন্দারা। প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের হিরোস স্কয়ারে পথচারী ও পর্যটকদের ওপর ঠান্ডা পানি ছিটাচ্ছে পুলিশ ও দমকল বাহিনী। এছাড়া রোমানিয়ার ব্রাশভ ও রাজধানী বুখারেস্ট, আলবেনিয়ার সমুদ্রসৈকত এবং সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের মানুষ একটু স্বস্তির খোঁজে সুইমিংপুল, ফোয়ারা ও ছায়াযুক্ত স্থানে ভিড় জমাচ্ছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তর সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কিছুটা কমার পূর্বাভাস দিলেও পরবর্তীতে তা আবারও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপার্নিকাস মেরিন সার্ভিস’ সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ ছিল ব্যতিক্রমী মাত্রায় সমুদ্র উষ্ণতার একটি সময়। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, জুন মাসে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৬৯.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের আগের সব রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এই তাপমাত্রা আরও বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইইউ-এর সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাস বৈশ্বিক মহাসাগরের বিশাল অংশজুড়ে ক্রমাগত উচ্চ তাপমাত্রা এবং সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে। এই চরম পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’-এর পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি নতুন ধাপের সূচনা নির্দেশ করতে পারে, যা বিশ্ববাসীকে আবারও এক অজানা ও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ইরান সংঘাতের প্রভাব এবং সৌদি আরবের ভিসা বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো কমেছে। এর ফলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে সামগ্রিক বিদেশগামী কর্মসংস্থান কমলেও ইউরোপে বৈধভাবে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪৪৫ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপে বৈধ অভিবাসন বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ কমে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৭ জনে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৩। ফলে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানও বছরওয়ারি হিসাবে প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ইউরোপে বৈধ অভিবাসনে বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের ধারা চলতি বছরও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, যা ২০২৪ সালে ছিল ২২ হাজার ২৭১ জন। এর আগে ২০২৩ সালের ৪৬ হাজার ৪৫৫ জন থেকে ২০২৪ সালে ইউরোপমুখী বৈধ অভিবাসন অর্ধেকেরও বেশি কমে গিয়েছিল। বিএমইটির মতে, ইরান সংঘাত এবং সৌদি আরবের ভিসা নীতির কড়াকড়ি উপসাগরীয় শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে। ইউরোপে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ইতালিকে কেন্দ্র করে। মানবপাচার প্রতিরোধ এবং বৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ও ইতালি সরকারের যৌথ উদ্যোগের পর দেশটি বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালি ৪ হাজার ৬৪৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩৬৫ জন, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ১ হাজার ১৬২। ইতালি মূলত কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে মৌসুমি কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া পর্তুগাল, সার্বিয়া, রোমানিয়া, রাশিয়া ও বেলারুশেও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বেড়েছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাইরে শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের সরকারি প্রচেষ্টা এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতালির সাফল্যের পর সরকার সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল ও রাশিয়াসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রম অভিবাসন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর উপসাগরীয় শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ইউরোপে বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়া এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে সীমিত থাকায় ইউরোপে এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানে ইউরোপের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে গেছেন ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি, যা মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি। শ্রম রপ্তানিকারকরা বলছেন, দক্ষ কর্মীর ঘাটতি, নথি জালিয়াতির কারণে ভিসা অনুমোদনের হার কমে যাওয়া এবং নিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের কারণে ইউরোপের বাড়তে থাকা শ্রমিক চাহিদার পুরো সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া ও মন্টেনেগ্রোর মতো দেশগুলোর অনেক নিয়োগকারী বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, অনেক কর্মী গন্তব্য দেশে পৌঁছে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপে বেশি মজুরির চাকরির উদ্দেশ্যে চলে যান। তবে পর্তুগাল, সাইপ্রাস, মলদোভা, বেলারুশ, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো উদীয়মান শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপে কর্মী পাঠানো প্রতিষ্ঠান ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেড চলতি বছর মলদোভায় ৩৭ জন কর্মী পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ জন কংক্রিট শ্রমিক, ছয়জন পেভিং স্টোন ইনস্টলার এবং চারজন কৃষি শ্রমিক রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মলদোভায় ওয়েল্ডার, মেকানিক, ভারী যন্ত্রপাতি চালক এবং নির্মাণ ও কৃষি খাতে দক্ষ ও অদক্ষ উভয় ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাসিক বেতন সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলারের বেশি হয়ে থাকে। ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেডের চেয়ারম্যান শারমিন আফরোজ সুমি বলেন, হাতে-কলমে দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদেরই নিয়োগকারীরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু কর্মী গন্তব্য দেশে পৌঁছে অবৈধভাবে অন্য ইউরোপীয় দেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করায় নিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও কঠোর হয়েছে। ইউরোপে বৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসনও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্র ও স্থলপথে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি অনিয়মিতভাবে ইউরোপে পৌঁছেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশিরা প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা যুক্তরাজ্যের প্রায় দ্বিগুণ। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপে প্রায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছিলেন। এর মধ্যে ৬ লাখ ৫২ হাজার ছিলেন যুক্তরাজ্যে। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে ইউরোপে বাংলাদেশির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে এ সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে ইউরোপ থেকে। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবদান ছিল ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫০ জন বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ গেছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইউরোপে গেছেন মাত্র ৫ শতাংশ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন, আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়লেও দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় এই বাজারের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারবে না। বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীমা আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, গন্তব্য দেশে পৌঁছে কিছু কর্মীর অবৈধভাবে অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঘটনায় অনেক দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে। তিনি বলেন, অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও কাজের মানে নিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না, যা ভবিষ্যৎ নিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও জানান, ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভিসা আবেদন বাংলাদেশে নয়, ভারতে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়। ভারতের ভিসা পেতে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়।
ইউরোপজুড়ে বইছে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ দাবদাহ। গত ২১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ায় এখন পর্যন্ত ১,৩০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রাণহানির পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, গলে যাচ্ছে সড়কের পিচ এবং ব্যাহত হচ্ছে রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি পরিষেবাগুলোকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন দেশে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। দাবদাহের এই তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্স, যেখানে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় এক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, তাপপ্রবাহের সবচেয়ে চরম দিনগুলোতে দেশটিতে দৈনিক মৃত্যুর গড় সংখ্যা স্বাভাবিক ৯০০ থেকে লাফিয়ে ১,৪০০ ছাড়িয়ে যায়। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে সেখানে অতিরিক্ত এক হাজার মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়, যাঁদের ৮৫ শতাংশেরই বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, ফ্রান্সের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় সর্বোচ্চ 'রেড অ্যালার্ট' জারি করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে জার্মানিতেও ভেঙে গেছে তাপমাত্রার অতীত সব রেকর্ড। মকার্ন-ড্রেউইটজে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং কুবশুৎজে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষদের চিকিৎসা দিতে বার্লিনে অতিরিক্ত ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স নামাতে হয়। এমনকি ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের কাছে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের শরীর ঠান্ডা রাখতে পুলিশকে জলকামান দিয়ে পানি ছিটাতেও দেখা গেছে। জার্মানির বনাঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত গরমের কারণে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাইসেনের বনে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের চরম বিপাকে পড়তে হয়, কারণ সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কিছু অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ আগুনের তাপে বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তাপে মহাসড়কের কংক্রিট ফেটে যাওয়ার পাশাপাশি হামবুর্গ থেকে প্রাগগামী একটি ট্রেনের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে গেলে ৬০০ যাত্রীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ সুইডেন, ডেনমার্ক এবং গ্রিসেও। সুইডেনের একটি পার্কে বজ্রপাতে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন, ডেনমার্কে বয়ে গেছে তীব্র ঝড় এবং গ্রিসের একাধিক অঞ্চলে দাবানলের নতুন সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেউসুস এই পরিস্থিতিকে একটি 'নীরব ঘাতক' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ এই চরম তাপমাত্রার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। একসময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন দাবদাহের দেখা মিললেও, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা এখন প্রায় প্রতি বছরই আঘাত হানছে। ইউরোপীয় জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন-এর বিশ্লেষণ বলছে, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, ৫০ বছর আগে এমন দাবদাহের কথা কল্পনাও করা যেত না, যা আজ থেকে ২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে প্রায় ২০০ গুণ বেশি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে শত শত মানুষের মৃত্যুর পর এবার তীব্র তাপদাহ বা হিটওয়েভ পূর্ব ইউরোপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পোল্যান্ড, চেকিয়া (চেক প্রজাতন্ত্র) এবং স্লোভাকিয়ায় তাপমাত্রা রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তীব্র গরমের কারণে জার্মানি থেকে হাঙ্গেরি পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় ১৯ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হচ্ছেন। পোল্যান্ডে ১৯২১ সালের পর এবারই প্রথম সর্বোচ্চ তাপমাত্রার শত বছরের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা নাগরিকদের তীব্র রোদ ও কঠোর পরিশ্রম এড়িয়ে চলার পাশাপাশি প্রচুর পানি পানের পরামর্শ দিয়েছে। চেকিয়ার আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনেক স্থানেই তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং সেখানে রাতকালীন তাপমাত্রাও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। জার্মানিতেও তীব্র গরমের কারণে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। বার্লিনে নাগরিকদের স্বস্তি দিতে পুলিশ জলকামান দিয়ে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করেছে এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। স্লোভাকিয়ার আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, ১৮৭১ সালের পর দেশটিতে এবারই প্রথম টানা তিন দিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে থাকতে পারে। এদিকে ফ্রান্সে এই তাপদাহে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দেশটির জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ১,০০০ মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী এবং অনেকে ঘরে একা থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। এছাড়া স্পেনেও তাপদাহের কারণে ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তীব্র এই গরমের মাঝেই উত্তর ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে আকস্মিক ও শক্তিশালী ঝড় আঘাত হেনেছে। ঝোড়ো হাওয়া ও বজ্রপাতের কারণে বহু গাছপালা উপড়ে গেছে এবং ৬০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের কাছে চলন্ত গাড়ির ওপর গাছ ভেঙে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বজ্রপাতের কারণে সৃষ্ট আগুনে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্সে অতিরিক্ত অন্তত ১ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার দেশটির জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা স্যঁতে পাবলিক প্রকাশিত এক প্রাথমিক পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, তাপপ্রবাহজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আরও অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের তথ্য এখনো পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সংস্থাটি অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাথমিক হিসাব তুলে ধরে জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ। কেয়ার হোম ও ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য হাতে এলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ ইউরোপের ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। তারা বলছেন, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপের জলবায়ু আরও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে দেশটির পূর্বাঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় চরম গরম কিছুটা কমলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি অঞ্চল এখনও তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তার আওতায় রয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ট বলেছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও এই তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "এই দুর্যোগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি।" স্যঁতে পাবলিক জানিয়েছে, মৃতদের অধিকাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। তবে তীব্র গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি সব বয়সী মানুষের ওপরই প্রভাব ফেলেছে। সূত্র: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।