দীর্ঘ তিন দশক ধরে বিশ্বজুড়ে সামরিক অভিযানে আকাশপথে প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান সংঘাত সেই আধিপত্যের ধারণাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পশ্চিম ইরানে একটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ধ্বংস হওয়ার ঘটনাকে বিশ্লেষকেরা প্রতীকী দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। যদিও পরবর্তীতে চালককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবুও ঘটনাটি ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছে। একই দিনে পারস্য উপসাগর সংলগ্ন কুয়েত এলাকায় আরও একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ বিমান ধ্বংস হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে বোঝা যাচ্ছে, স্টেলথ সুবিধাবিহীন এবং নিম্ন উচ্চতায় উড্ডয়নকারী বিমানগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস দাবি করেছে, উদ্ধার অভিযানের সময় আরও কিছু মার্কিন উড়োজাহাজ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। যদিও এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এটি স্পষ্ট যে সংঘাতের প্রকৃতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দাবি—তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে এবং বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় সফল হামলা চালাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আংশিক দুর্বল করা আর সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেওয়া এক বিষয় নয়। ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামো এখনও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। সংঘাতের শুরুর দিকেই ইসফাহান ও বুশেহর এলাকায় একাধিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও মার্কিন বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও ড্রোন ক্ষয়ক্ষতি রাজনৈতিকভাবে কম সংবেদনশীল, তবুও গোয়েন্দা নজরদারি ও লক্ষ্য নির্ধারণে এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক যুদ্ধে কেবল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং সক্ষম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই মানেই দীর্ঘস্থায়ী চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষয়ক্ষতি। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এর বাস্তবতার সঙ্গেও মিল খুঁজে দেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ কৌশলে স্টেলথ প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ড্রোন ব্যবহারে আরও গুরুত্ব দিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আকাশ শক্তির পাশাপাশি সাইবার সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক তৎপরতার সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে যুদ্ধের ফলাফল। সব মিলিয়ে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি দুর্বল না করলেও ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য’-এর ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, ইরান-এর সঙ্গে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে এবং দ্রুতই এর সমাপ্তি ঘটতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম The New York Post-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে ইরানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘ সময় অবস্থান করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। ট্রাম্পের ভাষ্য, “আমরা সেখানে আর খুব বেশিদিন থাকব না।” তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরানের অবশিষ্ট সামরিক শক্তি মোকাবিলায় এখনো কিছু কার্যক্রম বাকি রয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, এই নৌপথ ব্যবহারকারী দেশগুলো চাইলে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে এটি সচল করতে পারে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রণালিটি “স্বয়ংক্রিয়ভাবে” খুলে যেতে পারে। তার দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা আর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল এবং সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরান-এর রাজধানী তেহরান এখন ভয়, অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসস্তূপের এক বাস্তবতার মুখোমুখি। সামরিক সাফল্যের দাবির বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বিমান হামলায় বেসামরিক এলাকাগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যদিও হামলাকারী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। তেহরানের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আহমদ রেজা জানান, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা তার চশমার দোকান এক হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ভাষায়, “বছরের পর বছর ধরে যা গড়ে তুলেছিলাম, সবকিছু এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।” তিনি বলেন, দোকানে থাকা আমদানিকৃত পণ্য সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে এবং এখন তিনি দেনার চাপে দিশেহারা। তার দাবি, দোকানের আশপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না, তবুও কেন এটি লক্ষ্যবস্তু হলো—সে প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। অন্যদিকে, তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলে একটি বিউটি পারলারে কর্মরত মিনা জানান, বিমান হামলার আগের রাত থেকেই আতঙ্কে কাটিয়েছেন তারা। পরদিন কর্মস্থলে গিয়ে দেখেন পুরো ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। “সব আয়না ভেঙে গেছে, যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন আমরা কেউই কাজ করার মতো অবস্থায় নেই,” বলেন তিনি। যুদ্ধের কারণে শুধু ব্যবসা নয়, ভেঙে পড়ছে তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বপ্নও। ২৯ বছর বয়সী নাগমেহ ও তার সহকর্মীরা মিলে একটি পোশাকের ব্র্যান্ড শুরু করেছিলেন। কিন্তু একটি বিস্ফোরণের আগুনে তাদের স্টুডিও ও পণ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। নাগমেহ বলেন, “আমরা নিজেদের জন্য নতুন কিছু গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন সবকিছুই শেষ।” একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন উত্তর তেহরানের এক রেস্তোরাঁ মালিকও। তার পারিবারিক ব্যবসা, যা কয়েক দশক ধরে চালু ছিল, এক হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বেসামরিক এলাকায় হামলার মাত্রা বাড়ছে। এতে মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক ও ক্ষোভ। অনেকেই বলছেন, এই সংঘাত এখন আর কৌশল বা রাজনীতির বিষয় নয়; বরং এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। তেহরানের বাসিন্দাদের কণ্ঠে এখন একটাই আকুতি—এই যুদ্ধের দ্রুত অবসান। তাদের ভাষায়, “আমরা এই যুদ্ধ চাইনি, কিন্তু তবুও আমাদের এর মধ্যেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে।”
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোলাবারুদের মজুত নিয়ে চাপে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কিছু অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে পেন্টাগন—এমন তথ্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভেতরের আলোচনায় থাকা এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ দেশটির ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর গত চার সপ্তাহে ৯ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এতে ব্যবহৃত হয়েছে বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গোলাবারুদ। ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো জানায়, ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র—অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এসব অস্ত্র মূলত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো-এর একটি কর্মসূচির আওতায় সংগ্রহ করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে মিত্রদেশগুলো ইউক্রেনের জন্য মার্কিন অস্ত্র কিনে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক সহায়তার বড় অংশ সীমিত করলেও ‘ইউক্রেনের অগ্রাধিকারমূলক তালিকা’ কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অংশের গোলাবারুদ সরবরাহ করা হচ্ছে। এদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দুইজন ইউরোপীয় কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দ্রুতগতিতে গোলাবারুদ ব্যবহার করছে, তাতে ইউরোপের নিজস্ব অস্ত্র সরবরাহও বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেনে চলমান সরঞ্জাম সহায়তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। রাশিয়ার হামলার মুখে ইউক্রেনের জন্য এই আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে সরবরাহে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হলে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্পষ্ট করে জানায়নি—এই অস্ত্রগুলো পরে সরবরাহ করা হবে, নাকি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরুরি সামরিক প্রয়োজন দেখা দিলে পেন্টাগন সরবরাহের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে পারে। এদিকে সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়। বিশেষ করে কাতার ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে হামলার ঘটনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ইতোমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ চাপের মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এবং ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র-এ হামলার ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের একটি বড় অংশ ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি স্থাপনা বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ কোটি ঘনফুট। বাকি ঘাটতি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়, যার বড় অংশই আসে কাতার থেকে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেল ছাড়াও এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য উৎস থেকেও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পট মার্কেট থেকে কেনা সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এদিকে শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আপাতত মজুত জ্বালানি ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ মোতায়েন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সরকার ট্রাম্পের এই আচরণকে ‘অত্যন্ত লেনদেনমুখী’ বা হিসেবী হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের বারবার করা দাবির প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে এটি একটি অস্বাভাবিক ও সোজাসাপ্টা মূল্যায়ন। ব্রিটিশ কর্ম ও পেনশন বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অনুরোধ করলেই তাতে রাজি হতে যুক্তরাজ্য বাধ্য নয়। হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে জাহাজ সরবরাহ না করলে মিত্রদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকির জবাবে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘বাগাড়ম্বর’ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখা জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটি একটি লেনদেনমুখী প্রেসিডেন্সি এবং এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যুক্তরাজ্যকে পথ খুঁজে নিতে হবে। পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে জাহাজ পাঠানোর পরিবর্তে যুক্তরাজ্য বর্তমানে মাইন অপসারণকারী ড্রোন পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, ট্রাম্পের দাবি সরাসরি মেনে নিলে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ইরান আক্রমণে সরাসরি সমর্থনের অভাব দেখে ট্রাম্প বারবার তার সমালোচনা করে আসছেন। এমনকি স্টারমারকে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, তিনি ‘উইনস্টন চার্চিল নন’। ডাউনিং স্ট্রিট নিশ্চিত করেছে যে, ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে কেবল রক্ষণাত্মক ব্যবস্থায় সমর্থন দেওয়ার এই অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। রোববার দুই নেতার ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হলেও, যুদ্ধের প্রধান পক্ষ হতে চায় না বলে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে যুক্তরাজ্য।
ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মোট ১১টি উন্নতমানের ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সর্বশেষ অভিযানে আরও দুটি ড্রোন হারানোর পর এ সংখ্যা ১১–তে পৌঁছেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, ভূপাতিত হওয়া ড্রোনগুলো এমকিউ–৯ রিপার মডেলের, যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আধুনিক মানববিহীন আকাশযান হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের ড্রোন মূলত গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও সীমিত সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এগুলো কার্যকর হলেও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসম্পন্ন দেশের বিরুদ্ধে এগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। প্রতিটি এমকিউ–৯ রিপার ড্রোনের মূল্য কয়েক কোটি মার্কিন ডলার। সে হিসেবে ১১টি ড্রোন হারানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, রিপার ড্রোনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ মাইল, যা আধুনিক যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক কম। এ কারণে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা অঞ্চলে এগুলো সহজেই প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। তাদের মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি হলে এমন ড্রোন ব্যবহারে ঝুঁকি বাড়ে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাজারো বিক্ষোভকারী মধ্য লন্ডন থেকে মার্কিন দূতাবাসের দিকে পদযাত্রা করেন এবং যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানান। শনিবার বিকেলে ওয়েস্টমিনস্টারের কাছে মিলব্যাংক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। পরে ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট (সিএনডি), স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন, প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন, মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন, প্যালেস্টিনিয়ান ফোরাম ইন ব্রিটেন এবং ফ্রেন্ডস অব আল-আকসা সংগঠনের নেতৃত্বে মার্কিন দূতাবাসের উদ্দেশে পদযাত্রা শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে ছিল ইরান ও ফিলিস্তিনের পতাকা। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘ইরানে যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করো’ এবং ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’। মার্কিন দূতাবাসের সামনে আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, অতীতের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময়ও একইভাবে মানুষ প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছিল। বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে নতুন করে কোনো যুদ্ধ শুরু করা উচিত নয়। তারা যুক্তরাজ্য সরকারকে সতর্ক করে বলেন, দেশটিকে যেন আর কোনো সংঘাতে জড়িয়ে না ফেলা হয়। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী একাধিক বক্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুসরণ করেছে। ভবিষ্যতে পররাষ্ট্রনীতিতে সহযোগিতা, সমতা ও সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। পুলিশের এক কর্মকর্তার ধারণা, এ বিক্ষোভে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভ চলাকালে একটি প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরও তিনজনকে বিভিন্ন অভিযোগে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। বিক্ষোভকারীরা মিছিলের সময় স্লোগান দেন ‘এখনই বোমা হামলা বন্ধ করো’ এবং ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, আগামী ২৮ মার্চ মধ্য লন্ডনে আবারও একটি পদযাত্রা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়াশিংটন: ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে আসছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টমাহক ভূমি-আক্রমণ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এসএম-৩ প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কৌশলগত অস্ত্রের রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলার মাত্রা “উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি” পেতে পারে বলে ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে। চলমান পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মজুদে চাপ তৈরি হয়েছে। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত দূরপাল্লার নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে স্থলভিত্তিক সামরিক স্থাপনায়। অন্যদিকে এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয়, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দুই ধরনের অস্ত্রই চলমান সংঘাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো বা মিত্র দেশগুলোর সহায়তা নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক কৌশলেও পরিবর্তন আসতে পারে, যাতে বিদ্যমান মজুদ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা যায়। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তা এখন নির্ভর করছে সংঘাতের তীব্রতা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। তবে ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের খবর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews