- প্রচ্ছদ
- Topic
মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোকে কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যারা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণীর কথা বলেন, সবার আগে তাদের নিজেদের সরকারের আচরণ ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা মূল্যায়ন করা উচিত। মূলত বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার জেরে বাহরাইনের শাসকের এক মন্তব্যের কড়া জবাব দিতে গিয়েই এ কথা বলেছে তেহরান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) আরবি ভাষায় দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। পবিত্র কোরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদার ভিত্তি আরবি ভাষা বা ভৌগোলিক অবস্থান নয়; বরং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, কেবল আরব বা আরবি ভাষাভাষী হওয়ার কারণে কোনো শাসক নিজেকে মহানবী (সা.)-এর মিশনের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করতে পারেন না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইরান সব সময় সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এই নীতি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই কূটনৈতিক বাগবিতণ্ডার সূত্রপাত মূলত বাহরাইনের শাসক হামাদ বিন ঈসা আল খলিফার একটি মন্তব্যের জেরে। সম্প্রতি তিনি ইরানকে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি দাবি করেন, মহানবী (সা.) ইরানকে শতাব্দীর অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিক, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোর পথ দেখিয়েছিলেন, আর সেই কৃতজ্ঞতার খাতিরেই তেহরানের উচিত বাহরাইনে হামলা না করা। এর জবাবে বাঘাই প্রশ্ন তোলেন, একটি মুসলিম দেশের ওপর হামলা চালানো শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করা কিংবা মুসলমানদের শত্রুদের আশ্রয় ও সহায়তা দেওয়া কি ইসলামের ন্যায়বিচার ও মুসলিম ঐক্যের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তিনি কোরআনের আয়াত ও মহানবীর (সা.) বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, মুসলমানদের কখনোই জালিমের পক্ষ নেওয়া বা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করা উচিত নয়। ইসলামের বিকাশে দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গণিতে ইরানের ঐতিহাসিক অবদানের কথাও এ সময় স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ের শুরু থেকে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক হামলা চালিয়ে আসছে। এর জবাবে ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে বাহরাইনসহ ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটেই ইরান তার প্রতিবেশীদের ইসলামি মূল্যবোধ ও ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিল।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যে অঞ্চলটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত অঞ্চল ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। রবিবার প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো পৃথকভাবে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। দূতাবাসগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য। তেহরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় সমঝোতা না হলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব কঠোর’ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে এবং তিনি দেশটির প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কনস্যুলার অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নাগরিকদের সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং ভ্রমণ-সংক্রান্ত নানা বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানায়, অঞ্চলটিতে অবস্থানরত নাগরিকদের সব সময় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিমান সংস্থার সর্বশেষ ঘোষণা ও স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন মধ্যপ্রাচ্যে স্বাভাবিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। আবার কিছু সংস্থা নির্দিষ্ট রুটে ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে অঞ্চল ত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদেরও ওই অঞ্চল হয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থার সর্বশেষ তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে। দেশভেদে দূতাবাসগুলো অতিরিক্ত নিরাপত্তা নির্দেশনাও দিয়েছে। জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়া সামরিক স্থাপনার আশপাশ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলে অবস্থানকারীদের নিকটতম আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান আগে থেকেই জেনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং ইরানের সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক বিমান চলাচলেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাজায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান ঘটাতে নতুন একটি শান্তি উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একটি ধাপভিত্তিক রোডম্যাপে শর্তসাপেক্ষে নিরস্ত্রীকরণে সম্মতি দিয়েছে হামাস। তবে সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করলেই কেবল তারা নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ জানিয়েছেন, নিরস্ত্রীকরণ কোনো একতরফা পদক্ষেপ হবে না। এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে ইসরায়েল চুক্তির অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে কি না তার ওপর। তার ভাষায়, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরুর নিশ্চয়তা মিললেই ধাপে ধাপে অস্ত্র হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেন, ‘বোর্ড অব পিস’ হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি ‘ঐতিহাসিক’ সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার দাবি, এই পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে হামাসের অস্ত্র অপসারণ করা হবে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলও পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা পরিকল্পনায় হামাসের অস্ত্র একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কারিগরি কমিটির তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণের কথা রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে গাজায় নতুন একটি বেসামরিক প্রশাসন গঠনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা কার্যকর হয়নি। হামাস বলছে, ইসরায়েল যদি সেনা প্রত্যাহার, মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং পুনর্গঠনের বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে না। অন্যদিকে ইসরায়েল সরকারও এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়নি এবং এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আপত্তি রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এই পরিকল্পনা মূলত চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত একটি ১৫ দফা রোডম্যাপের ধারাবাহিকতা। সেখানে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, গাজার প্রশাসন একটি নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির হাতে হস্তান্তর, ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ এবং পরে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গাজার দীর্ঘ সংঘাত নিরসনের পথে বড় অগ্রগতি হতে পারে। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চুক্তির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নের জটিলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নের পথ সহজ হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আবহে নিজেদের সামরিক শক্তি জোরদারে বিকল্প পথে হাঁটছে যুক্তরাজ্য। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে গভীর রাত পর্যন্ত পার্টি বা পড়াশোনায় অভ্যস্ত, সেখানে একদল শিক্ষার্থী ভোরে উঠেই অংশ নিচ্ছেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর খণ্ডকালীন প্রশিক্ষণে। ইউনিভার্সিটি অফিসার ট্রেনিং কর্পস (ইউওটিসি) নামের এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৪০০ তরুণ-তরুণী সামরিক প্রশিক্ষণে যুক্ত হচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের ৫০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান এই কর্মসূচিতে স্নাতক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বছরে ৩৮ দিন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বিনিময়ে তারা বার্ষিক ১ হাজার ৬০০ পাউণ্ড সম্মানী, নতুন দক্ষতা এবং ভবিষ্যতে সামরিক বাহিনীতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পান। মূলত যুদ্ধ শুরু হলে দেশে যেন যোগ্য সেনা কর্মকর্তাদের একটি প্রস্তুত দল থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনছে এই কর্মসূচি। ২১ বছর বয়সী ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী এসমে বেকলি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন, কিন্তু এই প্রশিক্ষণ তাকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। অফিসার ক্যাডেটরা সপ্তাহে একদিন বিকেল এবং বছরে পাঁচটি সাপ্তাহিক ছুটি ও দুই সপ্তাহের বিশেষ অনুশীলনে অংশ নেন, যেখানে তাদের রাইফেল চালানো থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং টিকে থাকার কৌশল শেখানো হয়। এই কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ৩০ শতাংশ, যা মূল সামরিক বাহিনীর (১২ শতাংশ) চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ ও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হারও মূল বাহিনীর সমান। ১৯ বছর বয়সী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থী ডিলান ক্রোমার্টি এবং ২৪ বছর বয়সী কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ডিলান বেঙ্গির মতো তরুণরা এই প্রশিক্ষণ থেকে কেবল সামরিক জ্ঞানই নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দারুণ দক্ষতা অর্জন করছেন। কর্মসূচিটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেললেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যাডেট নিয়মিত বা সংরক্ষিত বাহিনীতে যোগ দিলেও, এর পেছনে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তাছাড়া দীর্ঘদিনের নিয়ম অনুযায়ী, ক্যাডেটরা নিজেরা সংরক্ষিত বা নিয়মিত বাহিনীতে যোগ না দিলে তাদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠানো যায় না, ফলে জাতীয় নিরাপত্তায় এর সরাসরি অবদান পরিমাপ করা কঠিন। তবে সাবেক মন্ত্রী স্যার জুলিয়ান ব্রেজিয়ারের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সক্ষমতা ধরে রাখতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মন্টি ওয়াকার বা অলিভিয়া হাচিনসনের মতো অনেকেই সামরিক পরিবারের সন্তান হয়েও শুরুতে অনাগ্রহী ছিলেন, কিন্তু এখন তারা কর্পোরেট জীবনের পাশাপাশি সামরিক রণকৌশল ও 'সফট স্কিল' শেখার এই দুর্দান্ত সুযোগটি দারুণভাবে উপভোগ করছেন।
আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার পাঁচ মাসের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবের। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাক ও ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়াদের ধারাবাহিক ও সমন্বিত হামলার মুখে পড়ে রিয়াদ এখন এক বহুমুখী যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষ বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবকে অত্যন্ত জটিল ও ত্রিমুখী নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। একদিকে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা দেশটির লোহিত সাগর উপকূলীয় তেল স্থাপনা ও ট্যাংকারে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রো-ইরানি মিলিশিয়ারা রাজধানী রিয়াদসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে। এর বাইরে তেহরানের পক্ষ থেকেও নতুন করে বিভিন্ন হুমকি ও উসকানিমূলক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন একটি পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে দীর্ঘ সংযমের নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে সৌদি প্রশাসন। গত মঙ্গলবার ভোরে মার্কিন যুদ্ধবিমানের সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে সক্রিয় মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর শক্ত ঘাঁটি লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বিমান বাহিনী। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দেশের নিরাপত্তা এবং তেল স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রিয়াদের বহু বছরের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সংস্কার এজেন্ডাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। গত এক দশক ধরে সৌদি আরব মূলত দেশের অর্থনীতিকে বৈষয়িক বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের আঞ্চলিক পাওয়ারহাউস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে আসছে। আর এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবেই বহু বছর ধরে চলা বৈরিতা ভুলে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে তেহরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল রিয়াদ। তবে বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং ত্রিমুখী যুদ্ধের পদধ্বনিতে সেই কৌশলগত কূটনীতি এখন প্রায় জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। অসামান্য সমরাস্ত্র এবং আধুনিক প্রযুক্তির অধিকারী হলেও বিশাল ভূখণ্ড এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তেল শোধনাগারগুলোকে সার্বক্ষণিক সুরক্ষিত রাখা যেকোনো সামরিক পরিকল্পনাবিদের জন্যই এক দুঃস্বপ্নস্বরূপ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিল, ঠিক তখন হুথিদের সামুদ্রিক অবরোধ ও ট্যাংকারের ওপর হামলা সেই বিকল্প পথগুলোকেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের আকস্মিক ও পরিবর্তনশীল নীতিমালার মাঝে নিজেদের ভাগ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে রিয়াদ। ওয়াশিংটনের সহায়তা বা আগ্রহ যেকোনো মুহূর্তে কমে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় সৌদি আরব এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষার স্বার্থে সরাসরি ও আক্রমণাত্মক পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের শান্তি ও উন্নয়নের প্রচেষ্টা বাদ দিয়ে দেশটি শেষ পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের চোরাবালিতে আসলে জড়িয়ে পড়ল কি না, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: সিএনএন
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ওপর আকস্মিক হামলা চালানোর উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছিল ইরান। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকায় ইরান থেকে ধেয়ে আসা সবগুলো ক্ষেপণাস্ত্রই সফলভাবে মাঝপথে প্রতিহত বা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। সেন্টকম তাদের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও নিশ্চিত করেছে যে, এই অতর্কিত হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ হামলা মোকাবিলায় তারা পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলেও ওই বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক এই হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তেহরানের বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষাপটেই ইরানের ওপর চলমান সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি সমঝোতা না হলে আবারও আগের মতো পূর্ণ মাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। সোমবার (২৭ জুলাই) মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সফররত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। খবর সিএনএন-এর। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "তারা (ইরান) অত্যন্ত নম্রভাবে আমাদের অনুরোধ করেছে, 'অনুগ্রহ করে আপাতত হামলা বন্ধ রাখুন, আসুন আমরা আলোচনার টেবিলে বসি।' আমরা তাদের সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে এখন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়! যদি কোনো যৌক্তিক সমঝোতায় না পৌঁছানো যায়, তবে আমরা আবারও আগের কঠোর সামরিক অবস্থানে ফিরে যাব।" ইরানের ওপর টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অব্যাহত বিমান ও সামরিক হামলা চালিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই হুট করে অভিযানের গতি কমিয়ে এনে সামরিক বিরতির ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এই বিরতিকালে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর ও হোয়াইট হাউস তেহরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী কৌশলগত ও সামরিক পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সামরিক অভিযান আরও দীর্ঘায়িত করার বিষয়ে নিজেদের শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্র ও গোলাবারুদের পর্যাপ্ত মজুতে বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ভেতরে অভ্যন্তরীণ সামরিক চাপের কারণেই আলোচনার এই কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন, যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে একে ইরানের অনুরোধ বলে তুলে ধরছেন। আপাতত দুই দেশের আলোচনার টেবিলের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের রূপরেখা।
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার কার্যালয় জানিয়েছে, সফরকালে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যানুষ্ঠানেও অংশ নেবেন। গ্রাহাম দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে নেতানিয়াহু বলেন, বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে থাকা সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে ইরান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পরিধি বাড়ানো এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হবে বলে জানান তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অভিজ্ঞতায় এমন সংকটপূর্ণ সময়ে দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতা, উভয়ই প্রয়োজন। তিনি বলেন, এই সফরের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এটি হবে দুই নেতার অষ্টম বৈঠক। তার দাবি, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অন্য যেকোনো বিশ্বনেতার তুলনায় তার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি বৈঠক হয়েছে ট্রাম্পের। নেতানিয়াহুর ভাষায়, এটি যেমন সম্মানের বিষয়, তেমনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় দায়িত্বও। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, এই বৈঠক এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক ও কূটনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে গাজা পরিস্থিতি, লেবানন সীমান্তের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতিও আলোচনায় স্থান পেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠক শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্যই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বৈঠক শেষে কী ধরনের সিদ্ধান্ত বা যৌথ ঘোষণা আসে, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান কেন আজও সম্ভব হয়নিএ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের দুই দশকেরও বেশি পুরোনো মন্তব্য আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় সামনে এসেছে। ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিড শান্তি সম্মেলনে ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির চেষ্টা করেছিলেন। আলোচনায় সীমান্ত, জেরুজালেমের মর্যাদা, নিরাপত্তা, শরণার্থী এবং সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের মতো সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি। সম্মেলন শেষে বিল ক্লিনটন বলেন, উভয় পক্ষই ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে নজিরবিহীন আলোচনা করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, তবুও মূল বিষয়গুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল এবং শান্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। বর্তমানে প্রো-ইসরায়েল অবস্থানের অনেক বিশ্লেষক ও রক্ষণশীল রাজনীতিক দাবি করছেন, অতীতের বিভিন্ন শান্তি প্রস্তাব ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এই ইতিহাস বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত হয় এবং তা সংঘাতের বাস্তব চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের স্বীকৃতির বিষয়টিকেও আলোচনার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানান। অন্যদিকে সমালোচক ও বহু গবেষক মনে করেন, সংঘাতের ব্যর্থতার জন্য একক কোনো পক্ষকে দায়ী করা যায় না। তাদের মতে, সীমান্ত নির্ধারণ, ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের দাবি, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—এসব দীর্ঘদিনের জটিল ইস্যু শান্তিচুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ক্যাম্প ডেভিড আলোচনার ব্যর্থতা এখনো মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেই আলোচনা এবং বিল ক্লিনটনের মন্তব্য নতুন করে মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে চালানো সামরিক অভিযানে দুই শতাধিক মার্কিন সেনাকে হত্যার দাবি জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশন গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)। তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন মোহেবি জানান, অপারেশন ভিক্টরি-টু অভিযানের ফলে নিহত আমেরিকানদের সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়েছে এবং আহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক এই নতুন উত্তেজনার সূচনা হয় জুলাই মাসের শুরুর দিকে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন দক্ষিণ ইরানে বিমান হামলা চালায়। এই মার্কিন হামলার জবাবে তেহরান বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক নিজেদের হতাহতের বিষয়ে প্রকাশিত সকল প্রতিবেদন সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন জেনারেল মোহেবি। পাশাপাশি, ইরান অতীতে যেসব মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছে, সেখানে স্বাধীন সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন এই সামরিক কর্মকর্তা।
সৌদি আরবে গত এক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় ১৫ হাজার অভিবাসীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ অভিযানে মোট ১৪ হাজার ৯৭০ জন আইন অমান্যকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে আবাসন বা ইকামাসংক্রান্ত আইন ভঙ্গের দায়ে ৭ হাজার ৪৩৭ জন, সীমান্ত সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনে ৩ হাজার ৯৯১ জন এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার ৫৪২ জন রয়েছেন। এছাড়া অবৈধ উপায়ে সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি আরবে প্রবেশের সময় আরও ১ হাজার ৬২৬ জনকে আটক করা হয়, যাদের সিংহভাগই ইথিওপিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিক। একইসঙ্গে অবৈধভাবে দেশত্যাগের সময় ৩৩ জন এবং অপরাধীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা বা আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং এর মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে ইতোমধ্যে নিজ দেশে ডিপোর্ট বা ফেরত পাঠানো হয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড বা অপরাধ চোখে পড়লে তা দ্রুত পুলিশকে গোপনে জানানোর জন্য সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সূত্র: গালফ নিউজ
কূটনৈতিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দরজা খোলা রাখতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের ওপর চলা সামরিক আক্রমণ সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন জাতিসংঘের মার্কিন প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ। তিনি জানান, পারস্পরিক সংলাপের প্রক্রিয়াকে সফল করে তুলতে মার্কিন প্রশাসন পরিস্থিতি কিছুটা নমনীয় রাখছে এবং প্রয়োজনীয় সময় দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগের নির্দিষ্ট রূপরেখা বা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তিনি সরাসরি মুখ না খুললেও, এই সিদ্ধান্তের ফলে গত সপ্তাহের শেষভাগ থেকেই সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। প্রায় টানা দুই সপ্তাহ বা তেরো দিন ধরে চলা তীব্র বিমান হামলার কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। এছাড়া এই বিরতির সুবাদে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ইরানের আশপাশের দেশগুলোতেও সপ্তাহজুড়ে নতুন কোনো হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। চলমান এই সামরিক বিরতি দুই দেশের মধ্যকার চরম বৈরিতা ও উত্তেজনা প্রশমনে কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। তবে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পরবর্তী কার্যক্রম বা পরবর্তী রূপরেখা সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে সংঘাতপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক এই মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন সবার নজর রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত জব্দ বা সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি বিশেষ সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে এ পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল বিশেষ সামরিক অভিযানের একটি হতে পারে। এতে ইরানের সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা, বিশেষ করে ফোরদো, ইসফাহান এবং নাতাঞ্জের কাছে অবস্থিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ কমপ্লেক্সকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযানে হাজারো সেনা, বিশেষ বাহিনী, প্রকৌশল ইউনিট এবং বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দলের সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, কূটনৈতিক আলোচনা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এ সম্ভাব্য অভিযান সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনা এবং সেখানে সংরক্ষিত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে আরও তথ্য চেয়ে আসছে। এ ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনও অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা থেকে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো সামরিক অভিযান বাস্তবায়িত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এটি কেবল বিবেচনাধীন একটি পরিকল্পনা; যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযান চালানোর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান। শনিবার এক টেলিফোন আলাপে দুই নেতা লোহিত সাগর ও আরব উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ফোনালাপে দুই মন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং পারস্পরিক সমন্বয় ও পরামর্শ অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক সমাধানে পৌঁছানোর অংশ হিসেবে উত্তেজনা কমানো এবং আরব উপসাগর ও লোহিত সাগরে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে উভয় নেতাই একমত পোষণ করেছেন। মূলত লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক সময়ে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় একটি সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে নিন্দার ঝড় ওঠে এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়। উদ্ভূত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝেই সৌদি আরব ও পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিকদের এই আলোচনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এগিয়ে নেওয়া হবে না। তার ভাষায়, সৌদি আরবকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এ যোগ দিতে হবে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবের এখন আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার সময় এসেছে। তিনি দাবি করেন, এই শর্ত নতুন নয়; বরং শুরু থেকেই এটি দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার অংশ ছিল। এর আগে বুধবার মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সহায়তায় বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তিটি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, সৌদি আরব যদি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করে, তাহলে এই পরমাণু চুক্তি কার্যকর হবে না। তিনি আরও বলেন, এই কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ বেসামরিক ব্যবহারের জন্য হবে এবং এতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ থাকবে না। শুক্রবারও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তিনি জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করেননি। তবে তার দাবি, সৌদি আরব এবং সংশ্লিষ্ট সবাই জানত যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাই চুক্তির অন্যতম শর্ত। এদিকে ট্রাম্পের নতুন শর্তের বিষয়ে সৌদি আরব তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় পথ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না। এই অবস্থান সৌদি আরব একাধিকবার প্রকাশ্যে পুনর্ব্যক্ত করেছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবকে এই উদ্যোগে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা কয়েক দশকব্যাপী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশের আশঙ্কা, এই ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তির বিস্তার নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। তবে মার্কিন প্রশাসন জোর দিয়ে বলছে, চুক্তিটি কেবল শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনের জন্য এবং এটি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে এলিট ট্রুপস, ফাইটার জেট ও সামরিক চিকিৎসকদের মোতায়েন করে পেন্টাগন যখন ব্যাপক সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর ‘ভয়াবহ হামলার’ কথা বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, "আমি একটি ভয়াবহ হামলার কথা ভাবছি; এমন কিছু যা আগে কখনো হয়নি। আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি রয়েছি এবং আমরা এর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।" তিনি আরও জানান, তিনি চাইলে ইসরায়েলও 'দুই মিনিটের মধ্যে' যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই অভিযানে যোগ দেবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই সম্ভাব্য হামলা চালানোর জন্য তাদের ‘অন্য কারও প্রয়োজন নেই’। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান, প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে নেতানিয়াহু আগামী সপ্তাহে শহরে এলে তার সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, গত সপ্তাহে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের উপস্থিতি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে এবং এই অঞ্চলে ফাইটার স্কোয়াড্রনগুলোকে নতুন করে মোতায়েন করেছে। গত শুক্রবার জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। পেন্টাগন নিহত ওই সেনাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে—তারা হলেন হাওয়াইয়ের ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জে. ফিহান, টেক্সাসের প্রাইভেট ইসাবেলা গঞ্জালেস এবং নিউইয়র্কের আর্মি সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল এস. র্যাম্পারসাদ। সেনাসদস্যদের থাকার বাসস্থানে এই আঘাত হানা হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই ঘাঁটিতে এটি ছিল ইরানের তিনটি পৃথক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি। সম্ভাব্য হতাহতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জার্মানির ল্যান্ডস্টুল রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ১৫০ জন সামরিক চিকিৎসাকর্মীকে পাঠানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আহত সেনাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান হাসপাতাল। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী বি-১ দূরপাল্লার বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। গত ১২ দিন আগে ইরানের সঙ্গে পুনরায় লড়াই শুরু হওয়ার পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বি-১ মিশন, যা সংঘাতের বড় ধরনের বৃদ্ধির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেছেন, একটি শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার মতো "যথেষ্ট কষ্ট ইরান এখনো পায়নি," তবে তেহরান "আলোচনা করতে চায়।" অন্যদিকে একটি আঞ্চলিক সূত্রের মতে, মধ্যস্থতাকারীদের জন্য ইরানের সাথে যোগাযোগ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার পক্ষে থাকা রাজনীতিক এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাওয়া কট্টরপন্থীদের মধ্যে দেশটি এখন গভীরভাবে বিভক্ত। সূত্রটি জানায়, মূলত ইরানের ভেতরে দুটি পক্ষ ক্রমশ বিপরীত দিকে এগোচ্ছে, যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো ভাঙন ধরেনি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আকস্মিক শক্তি বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ক্রমশ নির্ভুল ও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা। জর্ডানের ঘাঁটিতে তিনটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে আঘাত হানতে সক্ষম হয়, যা ওই অঞ্চলে মোতায়েনকৃত প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনাকে তেহরানের ক্রমশ আধুনিক হতে থাকা অস্ত্রশস্ত্র থেকে রক্ষার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জকেই তুলে ধরে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একাধিক কৌশলগত ঘাটিতে প্রথমবারের মতো দূরপাল্লার বিধ্বংসী ‘বি-১’ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী। নতুন করে সংঘাত ছড়ানোর ১২ দিনের মাথায় ওয়াশিংটনের এই ভারী বি-১ মিশন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। মঙ্গলবার সংঘটিত এই বিশেষ অপারেশনে অংশ নেওয়া সুবিশাল ‘বি-১’ বিমানটি একযোগেই ২৪টি দুই হাজার পাউন্ড ওজনের মারাত্মক বোমা কিংবা ডজনখানেক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা এই যুদ্ধবিমানটির অবস্থান ও গতিবিধি ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মগুলোতেও চিহ্নিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আইআরজিসির মিলিটারি অপারেশন সেন্টার, ড্রোন পার্কিং, এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গার, নৌ-ঘাঁটি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট নেটওয়ার্ককে মূল লক্ষ্য বানিয়ে এ হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল রুট হরমুজ প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপত্তায় ইরানের তৈরি করা ঝুঁকি নস্যাৎ করতেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি ওয়াশিংটনের। সংঘাতের আবহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চরম হুঁশিয়ারিতে জানান, হরমুজ প্রণালীতে তেহরান যদি কোনো হামলা চালায়, তবে রাজধানী তেহরানসহ দেশটির মূল অবকাঠামোতে আরও বড় আঘাত হানা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন হুঙ্কারের বিপরীতে কড়া জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরানও। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় পাল্টা হামলার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে তেহরান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক চেষ্টা চালানো হলেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষ এখনো কোনো যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ২৭ সেন্টে পৌঁছায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮ ডলার ৪৮ সেন্টে। তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নতুন করে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে দায়ী করা হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করার হুমকি দিয়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, তারা দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের চিহ্নিত করা সৌদি পতাকাবাহী ‘এনসেলিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। হুথিরা আরও দাবি করেছে, সৌদি বন্দরের দিকে যাওয়া প্রায় ১০টি জাহাজকে সতর্ক করে তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জানিয়েছে, একটি তেলবাহী ট্যাংকার বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। তাদের দাবি, জাহাজটি এমন একটি পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, যেটিকে তারা মাইন পাতা এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেছে। আরও দুটি জাহাজ ফিরে গেছে বলেও জানিয়েছে তারা। আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং কার্যত বন্ধ রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো জাহাজকে ওই পথ দিয়ে প্রবেশ বা বের হতে দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এনার্জি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির গবেষণা প্রধান সল কেভোনিক বলেন, লোহিত সাগরে নতুন করে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি তৈরি হলে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনের বিকল্প পথও এতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে টানা ১২তম রাতের মতো হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে ইরানি হামলা হলে ইরানের একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করার হুমকি দেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কোনো আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না এবং প্রয়োজনে এ লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। বুধবার (২২ জুলাই) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, কিন্তু এখনো আলোচনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে তার বিশ্বাস, তেহরান শিগগিরই আলোচনায় বসতে প্রস্তুত হবে। এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে বলা হয়েছিল হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে শুধুমাত্র আইআরজিসি নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে হবে। সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৯০০টির বেশি জাহাজ মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় নিরাপদে এই জলপথ অতিক্রম করেছে। ট্রাম্প আরও সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে যদি ইরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে আবারও হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর জবাবে আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল মাজিদ মুসাভি বলেন, ইরানের সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং যেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, সেসব অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি স্পষ্ট চোখের বদলে চোখ।" তিনি বলেন, ইরানের অবকাঠামোসহ দেশের যেকোনো স্থাপনায় হামলা হলে তার জবাব শক্ত ও দৃঢ়ভাবে দেওয়া হবে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সূত্র: শাফাক নিউজ, রয়টার্স, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, সৌদি আরবগামী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। গোষ্ঠীটির ভাষ্য, তাদের ঘোষিত সামুদ্রিক অবরোধ অমান্য করে সৌদি বন্দরের দিকে যাওয়ায় ‘এনসেলিয়া’ (Encelia) ও ‘লায়লা’ (Layla) নামের ট্যাংকার দুটিকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি এক বিবৃতিতে জানান, অভিযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তার দাবি, হামলায় দুটি ট্যাংকারেই আগুন ধরে যায় এবং অভিযান সফল হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। হুথিরা আরও দাবি করেছে, হামলার পাশাপাশি অন্তত ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের গন্তব্য পরিবর্তন করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এই দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সৌদি আরবের আল-শুকাইক উপকূল থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে জাহাজে আগুন লাগে এবং নাবিকরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। সংস্থাটি জানায়, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। নৌ-নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাতপ্রাপ্ত জাহাজটি সৌদি পতাকাবাহী এনসেলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় ট্যাংকার লায়লা-তে হামলার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জাহাজ দুটির ক্ষয়ক্ষতি, নাবিকদের অবস্থা কিংবা সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এর কয়েক দিন আগেই হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার কথা জানায়। তাদের অভিযোগ, ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখা এবং হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ওপর বিধিনিষেধ বজায় রাখার জবাব হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট তখন সতর্ক করে বলেছিল, এ ধরনের হুমকির জবাব তারা "কঠোরভাবে" দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ। এ অঞ্চলে নতুন করে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সূত্র: রয়টার্স, ইউকেএমটিও।
মার্কিন সিদ্ধান্ত ও সামরিক পদক্ষেপের কারণেই মূলত ইসরায়েল টিকে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সঠিক সময়ে পদক্ষেপে না নিত এবং ইরানে হামলা না চালাত, তবে বিশ্বের মানচিত্র থেকে ইসরায়েল দেশটির নামই মুছে যেত। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তার নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের কারণেই ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারেনি। চুক্তিটি বহাল থাকলে বহু বছর আগেই তেহরান পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতো, যা ইসরায়েলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিত। তিনি আরও জানান, তার প্রশাসনের সময়ে তৎকালীন বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সফল আঘাত হানা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় সামরিক পদক্ষেপ না নিলে ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করত এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে খুঁজে পাওয়া যেত না। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের এই পারমাণবিক শক্তির হুমকিতে কেবল ইসরায়েলই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। সূত্র: আল জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।